আমার বাবা

পুণ্যলতা চক্রবর্তী
হাফটোন ছবি ছাপার প্রণালী নিজের চেষ্টায় শিখে নিয়ে বাবা কয়েকটি লোককে শিখিয়ে তৈরি করে নিলেন, তারপর আমাদের দেশে উচ্চশ্রেণীর ছবি ছাপার জন্য ভালরকম আয়োজন করলেন। এবার আমরা আরও বড় একটা বাড়িতে উঠে এলাম। এখানে তিনতলার উপরে কাচের ছাতওয়ালা সুন্দর স্টুডিও তৈরি হল। মেঘলাদিনে অথবা রাত্রে সূর্যের আলোর কাজ চালাবার জন্য প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড আর্ক-ল্যাম্প এল, নতুন ক্যামেরা, প্রেস এবং আরও অনেক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম এল। বিস্তর টাকা খরচ করে বিপুল উৎসাহের সঙ্গে কাজ আরম্ভ হল।
অল্পদিনের মধ্যেই বাবার এই প্রতিষ্ঠান—“ইউ রায় এন্ড সন্স” আমাদে দেশে সর্বপ্রথম এবং সর্বপ্রধান বলে বিখ্যাত হল। এ বিষয়ে গবেষণা করে বাবা হাফটোন ছবি সম্বন্ধে কতগুলি নতুন তথ্য আবিষ্কার করলেন এবং সেগুলি বিলেতে কোনও প্রসিদ্ধ কাগজে প্রকাশ করে ওদেশেও অনেক প্রশংসা পেলেন। দাদা বড় হয়ে যখন বিলেতে গিয়েছিলেন, তখন দেখেছিলেন, লন্ডনের কোনো প্রসিদ্ধ স্টুডিয়োতে বাবার পরিকল্পিত যন্ত্র দিয়ে তার উদ্ভাবিত প্রণালীতে কাজ হচ্ছে।
এই সব কাজ নিয়ে যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, বাবা তাঁর সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছবি আঁকা ও গান বাজনা কোনও দিনই ভোলেননি। ছোট্টবেলার ঝাপসা স্মৃতির মধ্যেও বাবার দুটি মূর্তি মনে জাগে : রঙ তুলি নিয়ে বাবা আঁকছেন আর বাবা বেহালা বাজাচ্ছেন। কী সুন্দর কতরকমের ছবির পর ছবিই যে তিনি আঁকতেন। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি আঁকতে তাঁর সমকক্ষ খুব কমই দেখতে পাওয়া যেত।
আমাদেরও বাবা ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকতে উৎসাহ দিতেন। আঁকবার সরঞ্জাম এনে দিতেন, আমরা নিজেদের মনের মতন যার যা ইচ্ছা ছবি আঁকতাম, বাবা দেখে যেটুকু ভাল হয়েছে তাঁর প্রশংসা করতেন, আর দোষ ত্রুটি যা থাকত তাও সুন্দর করে বুঝিয়ে দিতেন। দিদি, দাদা আর টুনির ছবি আঁকার হাত খুব সুন্দর ছিল। দিদি ফুল-পাতা, পাখি, গাছপালা ইত্যাদি সুন্দর জিনিসের ছবি আঁকতে ভালবাসত, আর দাদার প্রধান ঝোঁক ছিল মজার ছবির উপর। দাদার বই খাতা কত মজার মজার ছবিতে ভরা থাকত, পড়ার বইয়ের সাদা-কালো ছবিগুলি সব রঙিন হয়ে যেত।
একবার আমরা তিনজনে তবে ফুলগাছ লাগালাম। দিদি আর সুরমামাসির গাছে কি সুন্দর নীল রঙের ফুল ফুটল, আর আমার গাছে সাদা কুঁড়ি ধরল দেখে আমার ভারি দুঃখ হল। পরদিন সকালে উঠে দেখি, আমার গাছে ওদের চেয়েও সুন্দর নানা রঙের ফুল ফুটেছে। আমার তো আনন্দ ধরে না। অনেকক্ষণ পড়ে মেজেতে রঙের ছিটা দেখে লক্ষ্য করে বুঝতে পারলাম যে, এগুলো আসলে রঙিন ফুল নয়, কোন ভোরে উঠে দাদা রঙ তুলি নিয়ে আমার সাদা ফুলগুলোকে রাঙিয়ে দিয়ে গিয়েছে।
নানারকম বাজনা বাবা ভাল বাজাতে পারতেন। সেতার, পাখোয়াজ, হারমোনিয়াম, বাঁশি, বেহালা। তার মধ্যে বেহালা তাঁর যেমন প্রিয় ছিল, বেহালার হাত ছিল তাঁর তেমনই অসাধারণ। বেহালাখানি হাতে তুলে নিলে তিনি আর সব ভুলে গিয়ে একেবারে তন্ময় হয়ে বাজিয়ে চলতেন, লোকে মুগ্ধ হয়ে শুনত। একবার দিদির খুব অসুখ হয়েছিল। যন্ত্রণায় কিছুতেই ঘুম হত না, ঘুমের ওষুধেও কাজ হত না। কিন্তু বাবা যখন পাশে বসে বেহালা বাজাতেন তখন সে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। চিরজীবন বেহালাখানি তাঁর নিত্যসঙ্গী ছিল। শেষ জীবনে রোগশয্যায়ও প্রতিদিন উঠে বসে বেহালা বাজাতেন, বাজাতে বাজাতে রোগযন্ত্রণা সংসারের নানা ভাবনা চিন্তা সমস্ত ভুলে যেতেন।
ছবি আঁকা ও গান বাজনার ঝোঁক নাকি বাবার ছেলেবেলা থেকেই ছিল। যখন ময়মনসিং জেলা স্কুলে পড়তেন, একদিন বাংলার ছোটলাট তাঁদের স্কুল দেখতে এলেন। বাবাদের ক্লাসে ঢুকে সাহেব হঠাৎ লক্ষ্য করলেন যে, বাবা মাথা নিচু করে একমনে খাতা পেনসিল নিয়ে কী করছেন। চট করে খাতাটা চেয়ে নিয়ে দেখলেন যে, এই কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাবা সাহেবের বেশ সুন্দর একটা ছবি এঁকে ফেলেছেন। শিক্ষকমশাইরা তো ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, না জানি সাহেব কী মনে করবেন। সাহেব কিন্তু ভারি খুশি হয়ে বাবার পিঠ চাপড়ে বললেন, “এ জিনিসের চর্চা তুমি কখনও ছেড়ো না, বড় হয়ে তুমি এই লাইনেই যেয়ো।”
এন্ট্রান্স পরীক্ষার অল্প আগে, নতুন বেহালা কিনে বাবা তাই নিয়েই ভুলে রইলেন, পড়াশুনার দিকে একেবারেই খেয়াল রইল না। শেষে প্রধান শিক্ষকমশাই একদিন তাঁকে ডেকে নিয়ে বললেন, “তোমার ওপর আমরা অনেক আশা রাখি, তুমি আমাদের নিরাশ কোরো না।” সেই দিনই বাড়ি এসে সাধের বেহালাখানি ভেঙে ফেলে বাবা পড়ায় মন দিলেন।
প্রথম বিভাগে পাশ করে বৃত্তি পেয়ে তিনি কলকাতায় পড়তে এলেন এবং যথা সময়ে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বি এ পাশ করে বেরোলেন। কলেজে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় মহাশয় তাঁর সহপাঠী ছিলেন। বাবার কাছে শুনেছি, আশুতোষের ‘নোটস’ এমন চমৎকার ছিল যে, তার জন্য ছেলেরা তাকে ভারি জ্বালাতন করত। ক্রমাগত চেয়ে নিয়ে যেত, তাঁর নিজের দরকারের সময় তিনি পেতেন না, তাই চুপিচুপি বাবার কাছে তিনি নোটের খাতা রেখে দিয়ে বলতেন, “তুমি তো এসব পড় না বলেই সবাই জানে, তোমার কাছে থাকলে কেউ খোঁজ পাবে না।” বাস্তবিক কলেজের পড়ার বইয়ের চেয়ে গান বাজনা ও ছবি আঁকার দিকেই বাবার বেশি ঝোঁক ছিল। কলকাতায় এসে সেসব চর্চার সুযোগও তিনি পেলেন।
ভাল ওস্তাদের কাছে তিনি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চা করতেন, ব্রহ্মসঙ্গীত তাঁর অতি প্রিয় ছিল। তিনি নিজেও কতগুলি সুন্দর সঙ্গীত রচনা করেছিলেন। আজও তাঁর “জাগো পুরবাসি” গানটি দিয়ে প্রতি বৎসর আমাদের মন্দিরে মাঘোৎসবের উপাসনা আরম্ভ হয়, খ্রিস্টানদের ধর্মোৎসবেও এই গানটি হতে শুনেছি। ছোটদের জন্যও তিনি অনেক সুন্দর সুন্দর গান লিখে গিয়েছেন।
বড় বড় সভা-সমিতি ও সঙ্গীত-সম্মেলনে যেমন তাঁর গান বাজনার আদর ছিল, তেমনি ছোটখাটো নানা অনুষ্ঠানেও তাকে অনুরোধ করে কেউ কোনো দিন নিরাশ হতো না। গান বাজনায় নিজে যেমন আনন্দ পেতেন, গান বাজনা শোনাতে আর শেখাতেও তাঁর তেমনি আনন্দ ছিল। এ বিষয়ে কখনই তাঁর ক্লান্তি-বিরক্তি ছিল না।
আমাদের রোজ নিয়মমতো বাবা গান বাজনা শেখাতেন, তাছাড়া কত যে তাঁর ছাত্রছাত্রী এসে জুটতো! তাঁর উপরে ছিল মন্দিরে উৎসবের গান, স্কুলের প্রাইজের গান, কত বিয়ে ও সভা-সমিতির গান। একেক সময় বাড়িটাই যেন গানের স্কুল হয়ে যেত। বেশ মনে পড়ে, শীতকালে সন্ধ্যায়-সন্ধ্যায় খেয়ে আমরা লেপের মধ্যে শুয়ে পড়েছি। ওদিকে পড়বার ঘরে অনেক লোক জড়ো হয়ে কংগ্রেসের গান রিহার্সাল দিচ্ছে—‘চল রে চল সবে ভারতসন্তান’। সঙ্গে অর্গ্যান বাজছে, বেহালা বাজছে, সারা বাড়িটা যেন গমগম করছে। বিছানায় শুয়ে ‘এক মন্ত্রে কর জপ, এক তন্ত্রে তপ’ শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি , কত রাত অবধি গান চলেছে, কিছুই জানি না।
গান শিখতে কিংবা ভারতীয় সঙ্গীত সম্বন্ধে আলোচনা করতে কত বিচিত্র রকমের লোককে তাঁর কাছে আসতে দেখা যেত। আমেরিকান যুবক, ঘেমচন্দ্র গম্ভীর স্বরে গাইছেন—‘প্রো-ভা-টে বি-ম-লো আ-ন-ন্‌-ডে’। (প্রভাতে বিমল আনন্দে)। কিংবা মধ্যবয়সী সিকিম ভদ্রলোক, মিহি মোলায়েম গলা, সুরটাও ধরেছেন ঠিক, কিন্তু ‘তা-তা থৈ-থৈ’ কিছুতেই মুখে আসছে না। ‘তা-তা তৈ-তৈ’, ‘দা-দা দৈ-দৈ’ কতরকমই যে হচ্ছে।
‘ছেলেদের রামায়ণ’ আর ‘ছেলেদের মহাভারত’ বাবা আগে লিখেছিলেন। এবার একে একে ‘মহাভারতের গল্প’, ‘ছোট্ট রামায়ণ’, টুনটুনির বই’ ‘সেকালের কথা’ ইত্যাদি সুন্দর সুন্দর বই তিনি ছোটোদের জন্য লিখলেন। এইসব বই-এর চমৎকার ছবিগুলিও সব তাঁর নিজের আঁকা। বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য যারা সৃষ্টি করেছিলেন, বাবা তাঁদের মধ্যে একজন অগ্রণী ছিলেন।
ছোট ছেলেমেয়েদের বাবা বড় ভালোবাসতেন। শিশুদের সঙ্গে শিশুর মতই আনন্দে তিনি হাসি খেলা নাচ গানে মেটে উঠতেন। ছোটদের ভালবাসতেন, তাদের মন বুঝতেন বলেই বুঝি এমন সুন্দর সহজ মিষ্টি হতো তাঁর লেখা।
বাবার মতো মিষ্টি কথাবার্তা খুব কম লোকের মুখেই শুনেছি। ছোট বড় সকলের সঙ্গেই সমান মিষ্টি ও ভদ্র ছিল তাঁর ব্যবহার। কাউকে অভদ্রতা করতে দেখলে বেশ চমৎকার করে তাকে ভদ্রতা শেখাতেন।
একবার কী কাজে পোস্টাফিসে গিয়েছেন, পোস্টমাস্টারটির যেমন ঢিলেঢালা কাজ, তেমনি তিরিক্ষি তাঁর মেজাজ। সামান্য কাজে এত দেরী করছেন যে, লোকে ক্রমেই অধৈর্য হয়ে উঠছে। বাবা খুব ভদ্রভাবে তাঁর কাজটির জন্য অনুরোধ করতেই ভদ্রলোক একেবারে খিঁচিয়ে উঠলেন—“দেখছেন তো মশাই কাজ করছি, আমার কি চারটে হাত?” শান্ত স্বরে বাবা বললেন, “কী জানি মশাই, বয়েস তো অনেক হয়েছে, অনেক দেশে ঘুরেছিও, কিন্তু চারটে হাতওয়ালা পোস্টমাস্টার তো কখনও কোত্থাও দেখিনি। তবে দুটো হাত দিয়েই তাঁরা অনেক তাড়াতাড়ি কাজ করেন।” আশেপাশের লোক সবাই হেসে উঠল আর পোস্টমাস্টারটিও লজ্জিত হয়ে তাড়াতাড়ি কাজটি সেরে দিলেন।
আরেকটি ঘটনা বলি। নিমন্ত্রণ-বাড়িতে বামুনঠাকুররা পরিবেশন করছে, বাড়ির কর্তা দাঁড়িয়ে তদারক করছেন। গণ্যমান্য লোকেদের খুব আদর আপ্যায়ন হচ্ছে, কিন্তু নিমন্ত্রিত গরিব ভদ্রলোকেদের কেউ যত্ন আদর করছে না। “গরম লুচি! গরম লুচি!” হাঁক শুনে একজন বললেন, “ঠাকুর আমাকে দুখানা গরম লুচি দাও তো?” কর্তা ওমনি বলে উঠলেন, “তা বলে পাতের ঠাণ্ডা লুচিগুলো ফেলে দেবেন না যেন!” তারপরই বাবার কাছে এসে খাতির করে বললেন, “আপনাকে দুখানা গরম লুচি দিক?” বাবা অত্যন্ত বিনীতভাবে উত্তর দিলেন—“কিন্তু আমার পাতের ঠাণ্ডা লুচি ফুরোয়নি।” তখন গৃহকর্তা লজ্জা পেয়ে সেই ভদ্রলোককে এবং সবাইকে সমান যত্ন করে খাওয়ালেন।

পুরোনো বানান অপরিবর্তিত।

আপনার মতামত জানান