সলিটেয়ার

অভীক দত্ত

সলিটেয়ার, যশোধরা রায়চৌধুরী, ছোঁয়া প্রকাশক, মূল্য ২৫০টাকা

ছোঁয়া প্রকাশনা থেকে ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে যশোধরা রায়চৌধুরীর গল্পের বই “সলিটেয়ার”। শোভন পাত্র-র ছিমছাম প্রচ্ছদ প্রথম দর্শন মুগ্ধ করে।
বইটিতে ১৩টি গল্প আছে। যশোধরা স্বনামধন্য কবি। কবিতায় তার সাবলীল বিচরণ। অনেক কবিই আছেন যাদের গদ্যে কবিতার প্রভাব থাকে। প্রথমেই বলে নেওয়া ভাল যশোধরার গদ্যে তার কবিত্ব বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করে নি। বরং স্মার্ট ঝকঝকে ভাষায় গল্পগুলি সুখপাঠ্য।
বইয়ের প্রথম গল্প “আরশোলা”।প্রকাশকাল ২০০৭। এক মহিলার অন্দরমহল কিংবা অন্তরমহল তার পুরুষের ঘনিষ্ঠ পুরুষবন্ধুর প্রতি কিভাবে প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে তাই নিয়ে গল্পটি। গল্পের ভাষা সরল। কোন আড়ষ্টতা নেই। বলে যাওয়া আছে। গল্প নিয়ে খেলা করার যশোধরাচিত স্টাইলটি প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ করবে। ছোট ছোট ডিটেইলিং, গল্পের ভাষায় সচেতনভাবে কথ্য ভাষার প্রয়োগ (“কত ভ্যাকুয়াম করেছে ঘরদোর” কিংবা “ক্যালিযুক্ত ডিটারমিনেশন”) গল্পকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। পরিণতি হাস্যরসের উদ্রেক করে। স্ত্রী চরিত্রের এত চমৎকার উন্মোচন একজন মহিলার পক্ষেই করা সম্ভব।স্বামীর বন্ধুর হাতে স্বামীর দখল হয়ে যাওয়া,নিজের প্রাইভেসি জোনে অন্যের নাকগলানো, গামছা, হজমিগুলি থেকে সাবানে পর্যন্ত দখলদারির প্রবণতা... পড়তে পড়তে ঠোঁটের কোণায় যেমন হাসি ফুটে উঠবে একই সাথে মুখ থেকে আপনা আপনি বেরিয়ে আসবে "ব্রাভো"। এত খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ সত্যিই অসামান্য।
বস্তুত গল্পগুলি পড়তে পড়তে এটা বারবার মনে হয়েছে। মনে হয়েছে, এক নিপুণ গৃহস্থ যেমন তার ঘরকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখেন, পাটপাট করে রাখা বেডসীট, মেঝেয় একফোঁটা দাগ নেই, ঘরের কোণায় কোণায় কোথাও একফোঁটা ঝুল নেই, ঠিক তেমনিভাবে যশোধরা তার গল্পগুলি লিখেছেন। গোছানো, ঠিক জায়গায় শেষ করে দেওয়া, এবং কোথাও বাড়তি কথা না বলা।
“অলৌকিক উৎপাদন শিল্প” গল্পটার কথাই ধরা যাক না। চুমকির মা সীমা দেবী সারাজীবন সব কিছুর মধ্যে অলৌকিক খুঁজে বেরিয়েছেন। তার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে তার মেয়েদের ওপর। গল্পটি শুরু থেকে পড়তে পড়তে একটা জায়গায় আসলে কখন যেন চোখের কোণ সিক্ত করে ফেলে। একটা অব্যক্ত হাহাকার এসে পড়ে।এই জিনিস আনা বড় সহজ কাজ নয়, গল্পকার মাত্রেই জানেন।
“দিল হ্যায় কে মানতা নেহী” গল্পটি একটি চমৎকার ছোটগল্প। এক আওয়ারা প্রেমিক তার প্রেমিকাকে ফোন করতে এক মেয়ের সাহায্য চাইতে গিয়ে তার প্রেমে পড়ে। এই গল্পের ভাষা আবার অন্যগুলির থেকে আলাদা। ঠিক যেমনটি গল্পের চরিত্র, গল্পটিতে তেমনভাবে ভাষার ব্যবহার হয়েছে।
“বিভাজনরেখা” গল্পটি নন্দীগ্রাম কান্ডের পরে লেখা। ঠিক যে সময়টা বুদ্ধিজীবী মহল স্পষ্টত দুভাগ হতে শুরু করে। এই গল্পটি চিরন্তন সত্য হয়ে থেকে যাবে সব দেশের সব জাতির বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রে। গল্পটি তাই যেন অমর হয়ে থাকবে। এর মৃত্যু হবে না।
আলাদা করে উল্লেখ করতে হয় “সলিটেয়ার” গল্পটির কথা। গল্পটির নাম কি হতে পারত? “ঘরে ফেরা?” এক স্বাধীন চাকরীজীবী মহিলার একাকীত্ব কিংবা আবার জীবনে ফেরা সব কিছু ভারী সুন্দরভাবে এঁকেছেন যশোধরাদেবী। গল্পের চরিত্রগুলি চোখের সামনে চলাফেরা অভিনয় করতে শুরু করে।
প্রত্যেকটি গল্পই নিখুঁত ছোটগল্প। পড়তে ভাল লাগে। গল্পকার হিসেবে যশোধরা রায়চৌধুরী যে লম্বা দৌড়ের ঘোড়া সে কথা বলাই বাহুল্য।

আপনার মতামত জানান