অভীক দত্ত

দ্বিতীয় পর্ব
।।বর্তমান মোড অফ।।
।।ইতিহাস মোড অন।।
পিউর ছিল গন্ধবাতিক। তবে সেটা মারত্মক কিছু না। চুমু টুমু খাওয়ার সময় পিউ খুব একটা ঝামেলা করত না। একটা ক্লোরমিন্টে কাজ হয়ে যেত।
আর দেবোপমার সন্দেহ বাতিক। এত সন্দেহ বাতিক নিয়ে কি করে একটা মানুষ পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারে ভগবানই জানে। ওকে যত বোঝাতাম মা আমার, তুমি যা সুন্দর দেখতে তাতে আমি আর অন্য মেয়ে কি করতে দেখতে যাব! কিন্তু কে বোঝে সেই কথা। একবার ফোন এনগেজ পেলেই ব্যাস, হয়ে গেল আমার গুষ্টির দফা রফা। কি, কেন, কবে, কোথায়, ইতিহাস, ভূগোল, ভৌতবিজ্ঞান সব কিছু ওকে বলতে হবে। আর কি কুক্ষণে আমি পিউ-র কথা ওকে বলে দিয়েছিলাম। সেটা যে কি সমস্যা তৈরি করতে পারে সেটা তো আর জানতাম না।
প্রথম দিন কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না সেভাবে। স্বাভাবিকভাবেই পাস্ট রিলশন নিয়ে জিজ্ঞেস করল। ও বলল সেরকম ভাবে কিছুই হয় নি কোনদিন। আর আমি, বিরাট চালিয়াতের মত বলে ফেলেছিলাম (তাও ইংলিশে, বাংলা মায়ের অ্যাংলো ছেলের মত) পিউর ইতিহাস। সেদিন সামান্য মুখটা সামান্য ফ্যাকাশে হয়েছিল কিন্তু তখন অতটা বুঝিনি। দু দিন কথা বলার পর তিনদিন থেকে দেখি পিউর কথা জিজ্ঞেস করে যাচ্ছে সমানে। চুমু ছাড়া আর কিছু করেছি নাকি, আমি ভার্জিন কিনা ইত্যাদি। আমার হল ছেঁড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। বিষয়টা যে চুমু থেকে আমার ভার্জিনিটি তাড়া করবে আগে কি করে জানতাম ! তাহলে আর রাত কে রাত দেবোপমাকে দেখা করার জন্য কান্নাকাটি করত কোন পাগলে।
কথা বার্তাগুলি হত এরকম,
আমিঃ হ্যালো, কি করছ?
ওঃ পড়ছিলাম। তুমি কি করছ?
আমিঃ এই টিভি দেখছিলাম।
ওঃ পিউ ফোন করেছিল?
আমিঃ যাহ্‌ বাবা, এর মধ্যে পিউ এল কোত্থেকে?
ওঃ না, আমি ভাবলাম হঠাৎ মনে টনে পড়ে গেল নাকি!
আমিঃ তোমাকে তো বলেছি পিউর এখন স্টেডি বয়ফ্রেন্ড আছে।
ওঃ তাতে কি? স্টেডি বয়ফ্রেন্ড থাকলেই বা কি হল, এক্সের সাথেও তো অনেকে রিলেশন চালিয়ে যায়।
আমিঃ দূর, না, না, কি যে বল, পিউ সে টাইপের মেয়ে না।
ওঃ তাই নাকি (গলায় শ্লেষ), এত প্রেম, কোন টাইপের সবই জান, তা ব্রেক আপ করলে কেন?
এই জায়গাটা এসে আমার মনে হত ফোন টোন রেখে পালিয়ে যাই। এ যে কি যন্ত্রণা তা কি করে বোঝাব। একই কথার একই উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে যেতাম।
দেখা করতাম নন্দন চত্বরে কিংবা ফোরামে। আর এমনই কপাল খারাপ একদিন পিউর সামনে পড়ে গেলাম। সেদিন বরং ঝামেলা কম ছিল, ওর মুডটাও ভাল ছিল, প্যাটিস আর কোল্ড ড্রিঙ্ক দিয়ে জাঁকিয়ে আড্ডা মারছি, ওর দিদির বিয়ে সামনে, কি কি শপিং করবে তারই ঝেড়ে ফিরিস্তি দিচ্ছিল (দেবোপমা কেসে আমি শিখেছিলাম মেয়েরা যত বড় সাইকোই হোক, শপিংয়ের ব্যাপার হলে তাদের সাইকোগিরি একটু কম থাকে। জেন্ডার বায়াস নই আমি, চাপ নিও না গুরু, ছেলে সাইকোও প্রচুর আছে, আমার ইতিহাসের থলিতে সে গল্পও আছে তবে সবুর কর বৎস্য), লেক থেকে হালকা হালকা হাওয়া দিচ্ছিল, আমিও ভাবছিলাম যাক আজকের দিনটা শপিংয়ের গল্পের উপর দিয়ে কাটিয়ে দিলেই বেঁচে যাব, ঠিক সেই মুহূর্তে এন্ট্রি নিল পিউ। ওর বয়ফ্রেন্ডের সাথে সিনেমা দেখতে এসেছে। আমাকে দেখেই এগিয়ে এসে “কি রে কি করছিস”, ইত্যাদি ইত্যাদি শুরু করল, আমার তো ওদিকে সব কিছু মাথায় উঠে গেছে, দেবোপমার মুখ দেখেও দিব্যি বুঝতে পারছিলাম ঈশান কোণে সুনামির মেঘ জমা হচ্ছে, আমি কি করব, ক্যাবলার মত হেহে করলাম, পিউর বয়ফ্রেন্ডের সাথে হাত মেলালাম। আর পিউও আমার এমন “শুভাকাঙ্ক্ষী”, যাওয়ার সময় আবার দেবোপমাকে বলে গেল “এই ছেলেটাকে একটু সাবধানে রেখো, ভীষণ ইনোসেন্ট” ইত্যাদি, যেগুলি ওর বলার কোন মানে ছিল না...
ব্যাস!
তেলে যেন জনি ওয়াকার পড়ল। জনি ওয়াকার দামী মদ, আমি কখনও খাইনি, তবে গরম তেলে মদ টদ পড়লে কেমন আগুন বেরোয় দেখেছি, আর দামী মদ পড়লে তো কথাই নেই, মদের টাকাটাও গেল, আগুনও চরম জ্বলল।
“আমি এখনই বাড়ি যাব”, “তোমার সাথে আমার আর কোন রিলেশন নেই”... ইত্যাদি ইত্যাদি বলে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল দেবোপমা। আমি পিছু নিলাম, বেবাক নন্দন জনগণ আমাকে দেখতে লাগল, আমার ছুটতে ছুটতে “প্লিজ শোন আগে আমার কথা” ইত্যাদি শুনতে লাগল... কিন্তু হা হতোস্মি!
চলে গেল।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম ভালই হয়েছে, এই সাইকো নিয়ে চললে কিছুদিন পরে আমিও পাগল হয়ে যাব। সেই মতই করলাম। ফোন একবার করে দেখলাম ধরল না, ভাবলাম বেঁচে গেছি।
চুপচাপ ঘরে ফিরে ভাল ছেলের মত টিভি দেখে, ভাত খেয়ে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু তার ফলে যে তিনি হাতের শিরা কেটে ফেলবেন তা কে জানত!
।।৪।।
।।সে।।
ছোট মামা এলে ভদ্রতার খাতিরে দিদি আর বাবার ঝগড়ার যুদ্ধবিরতি হয়, আমার সদা সর্বদা গোমরামুখো মার মুখে হাসি ফিরে আসে আর ভাল ভাল রান্না হয়। সেদিনটা আমিও কোথাও যাই না। বেশ অন্যরকম কাটে দিনটা। মামা প্রচুর বাজার করে আনে আর আনে দিদির জন্য একটা সম্বন্ধ। একটার পর একটা। লেগেই আছে। আর দিদিও কিছুতেই আর বিয়ে করবে না। মামা, মা কিংবা বাবা ওকে অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে গাঁজাখোরটার সাথে তো তোর সংসারই হয় নি ভাল করে কিন্তু দিদিকে কে বোঝাবে। চোখ মুখ শক্ত করে বসে থাকবে। বেশি বললে বলে ফেলবে, আমি যদি অতই বোঝা হয়ে গেছি তাহলে বরং আমি কোন লেডিস হোস্টেলে গিয়ে থাকি! ব্যাস তাহলেই সবাই স্পিকটি নট হয়ে যায় আর দিদি ল্যাপটপে নাক মুখ গুঁজে বসে পড়ে। মার মুখ আবার গোমড়া হয়ে যায়।
আমি অয়নদার কথা মাঝে মাঝে রাতে ঘুমনোর সময় জিজ্ঞেস করি, কিন্তু কখনোই ঠিক ঠাক উত্তর পাই নি। বরং মুড খারাপ থাকলে বলেই বসে ‘তোর অত জেনে কি হবে, ছোট আছিস ছোটর মত থাক”। ব্যাস, আমার মুখ বন্ধ হয়ে যায়।

অথচ দিদিটা এমন ছিল না। ও যখন ক্লাস টেনে, আমি সিক্সে। অস্বস্তিকর দিনগুলি শুরু হয়েছে আমার। আর তার মধ্যেই হত দারুণ সব মজা। দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমরা পাড়ার সব ছেলেদের নম্বর দিতাম। ভোম্বলুদার ইয়া ভুঁড়ি, দিদি মাইনাস দিল। আমি বলতাম মোটা বলে কি মানুষ না? এক নম্বর দেওয়াই যায়। তারপর আমরা হিহি করে হাসতাম। পাশের ফ্ল্যাটবাড়ির একটা ছেলে আছে, আমাদের বাড়ির বারান্দায় আমাকে দেখলে ওর হাঁটাচলা অন্যরকম হয়ে যেত, ওকে আমি ছয় দিয়েছিলাম। দিদি দেখে বলল ব্যাটা মাড়োয়ারির ছেলে, ওর জন্য দুই মাইনাস করতে হবে।
আমি মানতাম না। তাই নিয়েও খুনসুটি হত কত।
অয়নদার সাথে দিদির পরিচয় হয়েছিল বাস স্ট্যান্ডে।দিদি সবে কলেজে ঢুকেছে। অয়নদা তখন ক্যাম্পাসিংয়ে নতুন চাকরি পেয়েছে, আইটি সেক্টরে। পাড়ার ব্রাইটেস্ট ছেলে। সবাই বাড়ির মেয়েটাকে ফিট করছে ওর জন্য। আর অয়নদার পছন্দ হল দিদিকে। আর আমার দিদিটাও এমন, কিছুতেই পাত্তা দিত না অয়নদাকে। বেচারা কলেজ থেকে এসে দিদির ফেরার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকত বাস স্ট্যান্ডে। দিদি একদম সটান বাড়িতে চলে আসত। আমি জিজ্ঞেস করলে বলত বেশি পাত্তা দিলেই নাকি মাথায় উঠে যায়। ছেলেদের বেশি পাত্তা দিতে নেই। এরকম ভাও নিয়ে থাকতে হয়।
প্রায় এক বছর পরিশ্রম করার পর অয়নদার কলেজ লাইফ শেষ হল, চাকরিতে ঢুকতে যাবে, তখন অয়নদা রণে ভঙ্গ দিল। ওর বাবা মাকে পাঠাল বিয়ের কথা পাকা করতে। দিদির তখন মাত্র উনিশ বছর বয়স। কিন্তু বাবা মা কি বুঝল কে জানে সম্মতি দিয়ে দিল। দিদিও না করল না। আসলে ভেতরে ভেতরে তো ভেঙে যাচ্ছিলই সেটা বোঝা গেল।
অয়নদার বাড়ি থেকে চেয়েছিল ওই অত কম বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিতে। পুনে তে থাকতে হবে যখন ছেলে বউ নিয়েই যাক। তা বিয়েও হল বিরাট ধুমধাম করে। দুবাড়িতেই প্রচুর লোক হল।
এত কিছু করে অয়নদা দিদিকে নিয়ে পুনে গেল আর ট্রেনিং পিরিয়ডে চাকরিটা খোয়াল। ওদের নাকি গোটা ব্যাচটাকেই ট্রেনিং পিরিয়ডে বসিয়ে দিয়েছিল। আত্মবিশ্বাসী অয়নদা ওই চাকরিটা যাবার পরই কেমন ভেবলু হয়ে গেল। কলেজ লাইফে যে নেশাগুলো করত, আরও বাড়িয়ে দিল সেগুলো। কলকাতা ফিরে মাঝে মাঝে মারধোরও করত দিদিকে টাকার জন্য। ওর নেশার টাকা শেষ হয়ে গেলেই হিংস্র হয়ে উঠত। অয়নদার বাবা মারা গেলেন হার্ট অ্যাটাকে। মা ছেলে অন্তপ্রাণ এমনই যে নেশাখোর ছেলের দোষ দেখত না। দিদির আর কিছু করার ছিল না। এক সকালে সব ছেড়ে ছুঁড়ে দিয়ে চলে এল। ডিভোর্সটাও অদ্ভুত শান্তিতে হয়ে গেল।
অয়নদাকে মাঝে মাঝে দেখি এখন ওই বাসস্ট্যান্ডেই দাঁড়িয়ে থাকে, আগে যেরকম থাকত। দিদি এলে চুপচাপ দেখে। মরা দৃষ্টিতে। দাঁড়ি বেড়ে গেছে, কাটে না, জামা কাপড়ও একই দিনের পর দিন পরে থাকে, কেমন পাগল পাগল হাব ভাব, দিদি ওকে ক্রস করে যখন বাড়িতে ঢোকে তখন আমি খুব তীক্ষ্ণভাবে লক্ষ্য করি দিদির চোখের কোণায় একফোঁটাও জল আছে নাকি! কিন্তু নাহ। তার কোন রকম চিহ্ন মাত্র দেখতে পাই না।
এই পাথর দিদিটাকে আগে চিনতাম না। এখন চিনি।
জ্ঞান চক্ষু খোলার পর থেকেই আমি আর দিদি আমাদের প্রেমিক কেমন হবে তা নিয়ে অনেক গবেষণা করতাম, দিদি বলত ছ ফুট লম্বা হবে, ফরসা হবে, দাঁত মাজবে রোজ। দিদি হলুদ দাঁত কিছুতেই সহ্য করত না। অয়ন দা ছ ফুট না হলেও পাঁচ ফুট দশ, গায়ের রঙটা ফরসাই ছিল আর বেশ পরিষ্কার থাকত দেখেছি, দামী দামী পারফিউম ব্যবহার করত।
আর আমার প্রেমিক আমি ভেবেছিলাম ছ ফুট না হলেও চলবে, তবে পাঁচ ফুট চার আমার থেকে অন্তত পাঁচ ছয় ইঞ্চি তো লম্বা হতেই হবে, খুব একটা ফরসা না হলেও চলবে তবে ব্যক্তিত্ব থাকতে হবে। অয়নদা যেরকম দিদির পেছনে ছুটত আমার ঠিক ভাল লাগত না। ছেলে হবে ব্যক্তিত্বপূর্ণ। মেয়েদের দেখে যার জিভ দিয়ে জল গড়াবে না। এরকম ছেলে আশা করা আজকালকার দিনে স্বপ্ন দেখা ছাড়া কিছু না সেটা জানি কিন্তু স্বপ্নে যখন পোলাও খাব তখন ঘি বেশি তো দিতেই হবে। মাঝখানে বেশ কিছুদিন অর্কুট তারপর ফেসবুকও করেছি। প্রায় চার পাঁচ বছর। প্রথম প্রথম খুব বেশি বন্ধু ছিল না। যদিও স্কুল কলেজের বাইরেও প্রচুর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আসত। বয়সে অনেক বড়, আমার বাবা কাকার বয়সী লোকেরাও দেখতাম অ্যাড করত। একটু রাত হতেই দেখতাম সেই বাবার বয়সী লোকেরাও কিসব কথা টাইপ করে পাঠাচ্ছে। গা ঘিন ঘিন করে উঠত। শেষ মেষ ফেসবুক করাও বন্ধ করে দিলাম। জীবনটাকে আরও দুর্বিষহ করে তোলার কোন ইচ্ছা ছিল না।



এক একটা ঘটনা এক একটা বাড়ির পরিবেশকে কিভাবে পাল্টে দেয়। দিদির বিয়ের আগে অবধি আমাদের বাড়িতে কত হাসি ঠাট্টা হত, মজা হত, আমি মা বাবা দিদি মিলে সবাই একসাথে সিনেমা দেখতে যেতাম, দিদির বিয়ের পরের একমাসও আমাদের কত নিশ্চিন্ত জীবন ছিল, আমার পড়াশুনা, বাবার আরও পাঁচ বছর চাকরি, সবকিছু যেন প্ল্যান প্রোগ্রাম করাই ছিল, একটা ঘটনা সব কিছু ভেঙে চুরমার করে দিয়ে চলে গেল। বাড়িটায় সব সময় কেমন যেন একটা ঝিম ধরা ভাব এসে পড়ল। মাঝে মাঝে অফিস থেকে ফিরে যখন খাওয়ার টেবিলে বাবা অকারণ গজ গজ করে দিদির উপরে, আমার মনে হয় সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে চলে যাই। বাবা আজকাল কিছুতেই বুঝতে চায় না দিদির বিয়েটার জন্য দিদি যতটা দায়ী তার সমান দায়ী আমরাও। যখন অয়নদাদের বাড়ি থেকে বিয়ের প্রস্তাব এল বাবাই তো বলেছিল যাক, রিটায়ারমেন্টের আগে অন্তত একটা মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলে মন্দ হয় না। দিদি না হয় রাজি ছিল, বাবা তো বলতে পারত, না আমার মেয়ের এখনই বিয়ে হবে না। তখন কেন এক ফোঁটাও বাঁধা দেওয়া হয় নি। একটা মেয়ের উপর এত চাপ দিলে মেয়েটা বেঁচে থাকে কি করে। দিদির মত মানসিক শক্তি আমার নেই। দিদির জায়গায় আমি থাকলে আমি নির্ঘাত সুইসাইড করতাম। তাছাড়া আমার এসব ভালোও লাগে না।
আত্মীয় স্বজন এলে ঘুরে ফিরে সবাই আমাকে নিয়ে চিন্তিত। “আহারে, ছোটটার কি হবে”। যেন আমি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছি। দিদি বাড়ি চলে আসার পর আমার খারাপ লেগেছিল ঠিকই কিন্তু স্বস্তি পেয়েছিলাম যাক, দিদিটা অন্তত একটা নরক থেকে মুক্তি পেল। আর আমার এই সহানুভূতিগুলি নরক লাগে। কেমন আমাদের বাড়িতে ঢোকার আগে দামী দামী শাড়ি গয়না পরে হাসতে হাসতে সব আসবে, আর আমাদের দেখলেই মুখটা এমন করবে যেন কেউ মরে গেছে। আমি আজকাল তাই কেউ এলে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাই। রাস্তা ঘাটে একা একা ঘুরে বেড়াই। কখনও গড়িয়াহাট, কখনও সাউথ সিটি ঘুরে বেড়াই। ভিড় ফুটপাথের মধ্যে হাঁটি, ঝকঝকে শপিং মলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি। আমার মাথাও খানিকটা আজকাল বিগড়েছে আমি ভালই বুঝতে পারি।

আর এইরকম ঘুরতে ঘুরতে আমি সেই ছেলেটার সামনে পড়ে গেলাম। পর পর দু দিন। প্রথম দিন ছিল রবিবার। সাউথ সিটির সামনে রাস্তা পার হতে গিয়ে আমায় দেখে অদ্ভুত ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আর দ্বিতীয় দিন ছিল সোমবার। রুবির মোড়ে। সেদিন আমার ইচ্ছা হয়েছিল দক্ষিণেশ্বর যাব।সকাল আটটায় উঠেই বেরিয়ে গেছি খালিপেটে। আমাদের বাড়ি সিমেন্সের কাছে।ওখান কিছু পাচ্ছি না, হাঁটতে হাঁটতে রুবি চলে এসছিলাম। দাঁড়িয়ে আছি চুপচাপ। হঠাৎ দেখি সেই ছেলেটা। আমাকে দেখে সেই অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে। অদ্ভুত মানে নোংরা না। অদ্ভুত মানে অদ্ভুতই। নোংরা চোখ আমি বেশ চিনতে পারি। বারো থেকে বিরাশি, মুখোশ পরে রাস্তাঘাটে ঘোরাফেরা করে। মেয়েদের দেখলে সেই মুখোশটা আর কদর্য জানোয়ারের মুখটা লুকোচুরি খেলে।
ছেলেটা আমাকে প্রথমে ওইভাবে দেখল কিছুক্ষণ। তারপর এগিয়ে এসে বলে বসল “আচ্ছা, আপনাকে না আমি কোথায় দেখেছি। কোথায় বলুন তো”।
আমি একটু চমকেই গেছিলাম হঠাৎ এরকম প্রশ্নে। বাস স্ট্যান্ডে তখন বেশ ভিড়। সবাই বেশ কৌতূহলী চোখেই এদিকে তাকাচ্ছে, আমি ভেবে দেখলাম কিছু একটা বলেই দি নইলে চাপ হয়ে যাবে আরও, বলে বসলাম “আমিও কোথায় যেন আপনাকে দেখেছি, মনে করতে পারছি না ঠিক”।
ছেলেটার পোশাক দেখে বোঝাই যাচ্ছে অফিস যাবে। আমার কথায় আরও খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আর কিছু মনে করতে না পেরে বলল “আপনি কি কোথায় যাচ্ছেন?”
আমার খুব হাসি পাচ্ছিল কেন জানি না। সকাল সকাল মিথ্যা বলতেও ইচ্ছা করছিল না। বললাম “হ্যাঁ, দক্ষিণেশ্বর যাচ্ছি”।
ছেলেটা বলল “ও”, বলে আরও খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। আর সেই সময় গড়িয়া-দক্ষিণেশ্বরের বাসটা চলে এল।বাসটা খুব একটা বড় না। ভিড় ছিল, তবে একেবারে বিরাট কিছু না।আমি একটু হালকা ভিড় দেখে দাঁড়ালাম। আর সামলে উঠে দেখি ছেলেটাও উঠে এসছে।আমি অবাক হয়ে বললাম “আপনিও দক্ষিণেশ্বর যাবেন নাকি?”
ছেলেটা অপ্রতিভ হাসি হেসে বলল “অফিস যাবার ছিল, কিন্তু ইচ্ছা করছে না, আজ না হয় একটু দক্ষিণেশ্বরই ঘুরে আসি”।
আমার হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু হাসলাম না। তবে কেন জানি না, রোজ যেমন মনটা ভার ভার ঠেকে, তেমনটা লাগছিল না।

৫।।
।।উপমন্যু।।
দেবোপমার বাবা আমাকে থ্রেট দিয়েছিলেন জীবনে যেন দেবোপমার একশো গজের মধ্যে না আসি। সে যাত্রা দেবোপমা বেঁচে যায়। আর আমিও সিম চেঞ্জ করে নিই। কি ভাগ্যি!দেবোপমা মরে গেলে আমার কষ্ট হত ঠিকই তবে ওর বাবার থ্রেটে আমি আরও আনন্দ পেয়েছিলাম। তখন অবশ্য মাথা টাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিলাম। ভদ্রলোক বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন। আমি অবশ্য কিছু মনে করি নি তাতে। ওনার জায়গায় আমি থাকলেও রেগে যেতাম অবশ্যই। অর্কুট প্রোফাইল ডিলিটই করে দিয়েছিলাম। কোন রিস্ক টিস্ক নিই নি। সেদিন রাতটা আমার যা গেছিল তা আমিই জানি। আর ওই মেয়ে আমার কারণে না হলেও একদিন না একদিন মরবেই। এত সন্দেহ নিয়ে ও নিজেও বাঁচবে না আর আমাকেও বাঁচতে দেবে না।
আজও মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্নে দেবোপমাকে দেখে চমকে চমকে উঠি।
এই ঘটনার পরে আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম জীবনে আর কোনদিন প্রেম ট্রেমে পড়ব না, মেয়েদের নিয়ে ক্রাইসিসেও যাব না। সব মেয়েই কমবেশি সাইকো, আর আমি তো ফুল সাইকো সুতরাং দুটো সাইকো এক হলে যে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তার থেকে দূরে থাকাই ভাল।
অর্কুটে প্রোফাইল খুললাম অন্য একটা নামে। ছবিটাও দিলাম শাহরুখ খানের। আর মাঝে মাঝে দেবোপমার প্রোফাইলে গিয়ে ঘুরে আসতাম। এই ঘটনার প্রায় ছয়মাস পরে দেখলাম ও নিজের ফটো দিয়েছে প্রোফাইলে। তারপর আর চাপ নিলাম না। ভাত ছড়ালে যেমন কাকের অভাব হয় না, সুন্দরী মেয়ের প্রোফাইল পিক দেখলে তেমনি ছেলেদের অভাবও হয় না। কোনটা ইয়া মাসল, কোনটা টুপি ফুপি পড়ে পোজ নিয়ে দাঁড়ানো ছেলেদের লাইন লেগে যাবে। তারা ইয়ো বেবি, ইয়ো বেবি করে দেবোপমাকে তুলে ফেলুক আর তারপরে দৌড়ে বেড়াক। আমার কি! আমি নিশ্চিন্ত হলাম।
বেড়াল মাছ ছাড়া থাকতে পারে না,কিন্তু প্রায় ন’মাস আমি গার্লফ্রেন্ড ছাড়া ছিলাম। আমার জীবনে পিউ একটা অভ্যাস তৈরি করে দিয়ে গেছিল। দেবোপমা সেই ঝামেলাগুলি করে চলে যাবার পরেও আমার ওই নমাসে কখনও কখনও মনে হচ্ছিল দেবোপমাই হয়ত ঠিক ছিল, ও হয়ত আমাকে বেশি ভালবাসত বলেই আমার ওপর ওই রকম জোর জারি করছিল, এবং একটা সময় এসে ঠিক করে ফেলেছিলাম অর্কুটে আবার ওকে ফ্রেন্ড লিস্টে পাঠাব ঠিক সেই সময় তানিয়াদি এল। তানিয়াদির সাথে অর্কুটেই আলাপ। কি থেকে আলাপটা হয়েছিল এখন আর মনে করতে পারছি না, তবে কোন একটা গ্রুপে ওর প্রোফাইল পিক দেখে অ্যাড করেছিলাম। মুখে একটা লাল ওড়না জড়ানো ফটো ছিল, চোখে সানগ্লাস। বেশ হট অ্যাপিয়ারেন্স। অ্যাড করার পর আমাকে স্ক্র্যাপ পাঠিয়েছিল “তোকে দেখে তো বাচ্চা ছেলে মনে হয় তা হঠাৎ এ পাড়ায় কি মনে করে?”
স্ক্র্যাপটা পড়েই মনে হয়েছিল এ এক্কেবারে চরম স্মার্ট ব্যাপারস্যাপার হবে।বেশ কিছুদিন চ্যাটে ভাটানোর পরে দেখলাম আমাদের ওয়েভলেন্থ বেশ ম্যাচ করে, ওর মেটাল পছন্দ, আমারও, ও বাংলা সাহিত্য পড়ে খুব বেশি করে, হুমায়ূন আহমেদের ফ্যান, আমিও, ও ইলিশ মাছ পছন্দ করে, আমিও, ও মাটন খায় না, আমিও পছন্দ করি না। ফোন নাম্বার নিলাম, ফোনও করলাম, চরম সিডাক্টিভ গলা।
আমার সাথে অনেকক্ষণ কথা বলেছিল, তারপর বলেছিল “তুই আমার থেকে পাঁচ বছরের ছোট, তোকে কি ভাই বলে ডাকব?”
আমি আমতা আমতা করে বলেছিলাম “বয়স কম হলে বিয়ে না হওয়াই ভাল তবে ভাই না হয়ে বন্ধুত্বটা তো হতেই পারে”।
বেশ খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল “চ, লেটস মিট, তুই আমাদের অফিসে আসতে পারবি কালকে?”
তানিয়াদির ক্ষেত্রে আমার আগের দুবারের মতন ঠিক প্রেমানুভূতি না হলেও একটা উত্তেজনা যে কাজ করছিল সে কথা বলাই বাহুল্য। তবে যাই হোক, আমি ঘরপোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাই, তাই সে রাতটা নিশ্চিন্তে ঘুমালাম। এতদিনে শিখে গিয়েছিলাম একটা মেয়ের জন্য রাতের ঘুম নষ্ট করার কোন যৌক্তিকতা নেই।
ওহ, এই এত ইতিহাস ভূগোল বলতে বলতে একটা জিনিস আমি ভুলেই গেছিলাম,আর যারা আমার গল্পটা শুনছে তারাও এটা ভাবতে পারে যে আসলে আমি করি টা কি? সারাদিন কি প্রেম করাই আমার কাজ? আসলে তা না, প্রেম অধ্যায়ের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে পড়াশুনার কথাটাই আমি মিস করে গেছি। সেই সময় আমি আইটি ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্ট ছিলাম কলকাতার একটা কলেজে, পিউর সাথে যখন আমার অ্যাফেয়ারটা ছিল তখন ফার্স্ট ইয়ার, আর দেবোপমার ঘটনাটা ঘটে একদম সেকেন্ড ইয়ারের শুরুতে। গোটা সেকেন্ড ইয়ারটা আমি ঝিমিয়ে কাটাই, আর যখন ফোর্থ সেম আসব আসব করছে তখনই আমি তানিয়াদির সাথে দেখা করতে গেলাম।
তানিয়াদিদের অফিসে সন্ধ্যে নাগাদ পৌঁছলাম। সল্টলেক সেক্টর টুতে অফিস। বেশ কয়েকটা রোটারি ঘুরে, জলের ট্যাঙ্ক ফ্যাঙ্ক খুঁজে অবশেষে পৌঁছতে পারলাম। ছোট অফিস, লোকজন সবাই দেখলাম বেশ ব্যস্ত, আমাকে নিয়ে একটা কনফারেন্স রুমে বসাল তানিয়াদি। ওদের অফিসের একটা জিনিস দেখলাম, কারও কোন বাড়তি কৌতূহল নেই, আমি গেলাম বাইরে থেকে ফোন করে তানিয়াদি আমাকে ওদের অফিসে নিয়ে গেল, সোজা কনফারেন্স রুমে বসাল, কেউই দেখলাম খুব একটা গা করল।
আমি বেশ চাপে তখন, তানিয়াদি সাধারন একটা পোশাকই পরে ছিল। আমাকে প্রথম যে কথাটা বলল “কেমন লাগল আমাদের অফিস?”
আমি বললাম “ভাল”। এছাড়া আর কিছু বলারও ছিল না। কি বলতাম! বলল “তুই চাউমিন খাস তো? আনতে দিয়েছি কিন্তু”।
আমি ভালমানুষের মত মুখ করে বললাম “হ্যাঁ, আবার এসব কেন?”
তানিয়াদি মুখ বাঁকাল, “ন্যাকামো করিস না, খা, খেলে কিছু হয় না”।
আমি চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগলাম, ঠিক কথা আসছিল না। তানিয়াদি সামনা সামনি প্রোফাইল পিকের থেকেও বেশি সুন্দরী, আমি বুঝতে পারছিলাম আমার অর্কুট ভাগ্য বেশ ভাল। তানিয়াদি বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমাকে দেখছিল। বলল “তোর গার্লফ্রেন্ড আছে না?”
তানিয়াদির সাথে এর আগে পিউ বা দেবোপমা নিয়ে কোন কথা হয় নি। বলতেও চাই নি। এবারে চেপেই গেলাম “না, এখনো নেই”। তারপর উল্টো চাপ দিলাম “তোমার আছে?”
তানিয়াদি অবাক হল, “সে কি রে? এখনো জি এফ নেই? যাহ্‌”।
-“তোমার আছে তারমানে, বি এফ?”
-“ছিল, তবে এখন নেই”।
-“ওহ”। আমি চুপচাপ বসে রইলাম। তানিয়াদি বলল “তা পড়াশুনা করছিস তো না সারাদিন অর্কুটই করিস? তোকে তো যতক্ষণই দেখি, সারাদিন রাত অর্কুটে বসে থাকিস, কি এমন মজা পাস?”
-না না, সবই করি, ল্যাপটপ অন রেখে পড়ি বলে তুমি বুঝতে পার না।
আবার খানিকক্ষণ বাজে বকা। ভাবছিলাম ওর এক্স নিয়ে জিজ্ঞেস করব নাকি, পরক্ষণেই চেপে গেলাম, কি দরকার বাজে কথা বাড়িয়ে।
চাউ এসে গেল। আমি অবাক হয়ে বললাম “সেকি? এত তাড়াতাড়ি?”
তানিয়াদি হাসল “তুই যখন করুণাময়ী থেকে ফোন করলি তখনই বলে দিয়েছি, আমরা বেরব এখন”।
একটা প্লেটে দিয়ে গেছে চাউমিনটা। আমি কাটা চামচ আর চামচ ম্যানেজ করতে করতে বললাম “কোথায় যাব?”
তানিয়াদি অবাক হল “সে কি তুই বললি না তোর ‘হিমু সমগ্র”টা দরকার, আজ নিয়ে যা, পরে কোন একদিন দিয়ে যাবি”।
“ও তোমার বাড়িতে?”
“হ্যাঁ দেরী করিস না, খেয়ে নে”।
“তোমার গাড়ি আছে?”
“অফিসের আছে, পৌঁছে দেব, প্রব্লেম নেই”।
আমি নিশ্চিন্তে চাউ খেতে লাগলাম।
#
তানিয়াদির ফ্ল্যাটটা রাজারহাটের শুরুতেই। তখনও সে জায়গাটা খুব একটা গড়ে ওঠে নি এখনকার মত। ফাঁকা ফাঁকা মাঠ। আর ওর ফ্ল্যাটে পৌঁছে একটা ধাক্কা মত খেলাম।দরজা তালা দেওয়া আর তানিয়াদি চাবি দিয়ে সেটা খুলছে। তারমানে ও এই ফ্ল্যাটে একা থাকে। এটা আমার কল্পনাতেও আসে নি। ফ্ল্যাটটা বেশ বড়। তবে আসবাব পত্র কম। বসার ঘরে শুধু টিভি আর একটা সোফা।
আমার একটা চোরা টেনশন হচ্ছিল। শেষমেষ জিজ্ঞেস করেই বসলাম “তুমি এই ফ্ল্যাটে একা থাক?”
তানিয়াদি লাইটের সুইচগুলি অন করতে করতে বলল “হ্যাঁ, তোকে বলি নি তাই না”।
“না আমি জানতাম না তো”। আমি আত্মবিশ্বাস খুঁজছিলাম।
তানিয়াদি হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার ঠোঁটে একটা চুমু খেল, আমার হাত পা অবশ হয়ে আসছিল, আমি আর বাঁধা দিতে পারলাম না।
আমার মাথা আর কাজ করছিল না, এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন স্রোতের সাথে বয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। তানিয়াদি পাগলের মত করতে শুরু করল। আমার জামা জোর করে খুলিয়ে সারা শরীরে চুমু খাওয়া শুরু করল, প্রায় পয়তাল্লিশ মিনিট বাদে ওর ফ্ল্যাট থেকে যখন বেরলাম তখন প্রথম যে কথাটা আমার মাথায় এল সেটা হল, আমি আর ভার্জিন নই। ভাল লাগা খারাপ লাগা কোন অনুভূতিই অবশ্য এল না তবে খালি মনে হচ্ছিল কত তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছনো যায়। এই একটা দিন আমাকে বড় করে দিয়েছিল।
আমি সাধারণত সব ঘটনার কথাই নিশানের সাথে শেয়ার করি, এই ঘটনাটা করলাম না। করলেও কি আর এমন হত, কিন্তু রাতে বাড়ি ফিরে যখনই ভাবছিলাম ঘটনাটার কথা আমার মনে হচ্ছিল আবার আমি ওই ফ্ল্যাটে চলে যাই। অনেকক্ষণ ছটফট করে তানিয়াদিকে ফোন করলাম রাত একটা নাগাদ, প্রথমে রিং হয়ে গেল, ধরল না। তারপর নিজেই কলব্যাক করল, সেই সিডাক্টিভ ভয়েস “কিরে, মাঝরাতে কি হল?”
আমি বললাম “এখন তোমার কাছে যেতে ইচ্ছা করছে”।
তানিয়াদি হাসল কিছুক্ষণ, তারপর বলল “ঠিক আছে, কাল ছুটি নিচ্ছি, সকাল সকাল চলে আয়, সারাদিন একসাথে কাটাব, ওকে”।
আমার মনে হচ্ছিল হৃৎপিণ্ডটা হাতে উপড়ে চলে আসবে। সে রাতটায় ঘুম আসতে আসতে ভোর চারটে হয়ে গেল।
পরের দিন ঘুম ভাঙতে ভাঙতে সকাল দশটা। ফোনে চারটে মিসড কল তানিয়াদির। কিন্তু হঠাৎ মনটা কেমন তেতো তেতো লাগছিল, মনে হচ্ছিল এ আমি কি ভুল করলাম। শেষে ফোনটা অফ করে রেখে দিলাম। দুপুরে খেতে বসেছি মা বলল “কি রে, তোর শরীর খারাপ নাকি, কেমন লাগছে?”
আমি পাতি ঢপে কাটালাম “না না, ওই সেম এসছে, পড়ছিলাম রাতে, তাই এরকম লাগছে হয়ত”।
খেয়ে টেয়ে ল্যাপটপটাও অন করলাম না, চুপচাপ খাটে শুয়ে রইলাম। আর বারবার চোখ বন্ধ করলেই তানিয়াদির বুক, পেট, নাভি সব চোখের সামনে চলে আসা শুরু করতে লাগল। যতবার ভাবছি এটা নিয়ে আর ভাবব না, ততবার ঘুরে ফিরে ফিল্মস্ট্রিপের মত এটাই আসতে লাগল।মনের সাথে যুদ্ধ করে করে শেষে আর পারলাম না। বেলা তিনটে নাগাদ জামা কাপড় পরে বেরিয়ে গেলাম, মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল “কিরে এখন আবার কোথায়?”
আমি বললাম “কলেজ যাচ্ছি, সাজেশন আছে”।
দৌড়তে লাগলাম রাস্তা জুড়ে। একটা ট্যাক্সি নিয়ে নিলাম,আর ট্যাক্সিতে উঠেই অপরাধবোধটা আবার ফিরে এল। এই রিলেশনশিপটার মধ্যে তো শরীর ছাড়া কিছু নেই, আমি কি তানিয়াদিকে বিয়ে করব? সেটা কি সম্ভব হবে? তাছাড়া আমি তো ওর সম্পর্কে কিছুই জানি না। ও কোথায় থাকে, এটাই ওর বাড়ি কিনা, ওর বাবা মা কি করে আমি কিচ্ছু জানি না। পাতি একটা অর্কুট আলাপে এত কিছু করে ফেললাম। এবার দুই অবচেতনে এমন ঝগড়া শুরু হল যে আর পারলাম না, চিংড়িহাটায় ট্যাক্সিটা ছেড়ে দিলাম।
এটাও মনে এল না যে এই ট্যাক্সিটা করেই আবার বাড়ি ফেরত যাওয়া যেত। নিজের মনে হাঁটতে লাগলাম, আর বারবার নিজের সাথে কথা বলতে লাগলাম, সেই সময়টা রাস্তাঘাটে কেউ আমাকে দেখে থাকলে নির্ঘাত পাগল ছাড়া আর কিছু ভাবত না। একসময় হাঁটতে হাঁটতেই আবিস্কার করলাম, আমি আবার তানিয়াদির ফ্ল্যাটের দরজায় এসে উপস্থিত হয়েছি। ওই দীর্ঘ রাস্তাটা আমি জীবনেও হাঁটতাম না, কিন্তু সেদিন আমার কি হয়েছিল আমিও জানি না। কখন যেন হাতটা উঠে কলিং বেলও বাজিয়ে দিয়েছে।
তানিয়াদি দরজা খুলল, একটা ক্লিভেজ বের করা টপ আর একটা থ্রি কোয়ার্টার পরে আমার দিকে তাকিয়ে বলল “কিরে, গিলটি ফিলিংস?”
আমি আর কিছু বললাম না, ওখান থেকেই ওকে জড়িয়ে ধরে দরজায় লাথি মেরে ঘরের ভিতর নিয়ে ঢুকলাম।ঠিক ও কালকে আমার সাথে যা করেছিল, তাই করতে লাগলাম, কিন্তু এবারে বেশিক্ষণ পারলাম না।আগের দিন সারারাত,সেদিন গোটা দিন এটা নিয়ে ভেবেছি, তার ওপর অতি উত্তেজনা। ওর শরীরটাকে ছেড়ে দিয়ে পাশে শুয়ে পড়লাম, তানিয়াদি তখন শীর্ষে, বেশ কিছুক্ষণ আমাকে গরম করার চেষ্টা করল, তারপরে না পেরে ওর দাঁত দিয়ে আমার ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরল, সম্পূর্ণ বিবস্ত্র দুজনেই, আমার ওপরে শুয়ে পড়ে বলল “খোকাবাবু, জলে নামলে ডুব সাতারটাও জানতে হবে”।
ওর কথাটায় অন্য টোন ছিল, ঠিক ধোপদুরস্ত পোশাক পরা অফিসগার্লের মত না। কিন্তু সেদিন আমি বুঝেছিলাম, সব উত্তেজনার শেষে জীবনটা কেমন পানসে পানসে লাগে।


(ক্রমশ)

আপনার মতামত জানান