বাবা/অন্বেষা বসু

প্রথম পর্ব


শুয়ে থাকতে থাকতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়ালই করিনি। ঘুম ভাঙল হাতের আঙুলে আলতো ছোঁয়ায়। শ্রমণ।
“কটা বাজে রে? অনেক রাত হয়ে গেছে না?”
“তা একটু হয়েছে। সাড়ে এগারোটা। ওঠ, খেয়ে নে”।
“তুই রান্না করলি? ডাকলি না কেন আমায়? ছুটি কোথায়?”
“ঘুমোচ্ছে। তুই চিন্তা করিস না। আয়, খেয়ে নিই”।
“ভালোলাগছেনা রে। ইচ্ছে করছে না খেতে”।
“জানি। কিন্তু, কাল সারাদিন ট্রেন এ কাটবে। রাতে না খেলে শরীর খারাপ করবে বাবু। চল”।
“খুব ঘুম পাচ্ছে আমার। চোখ ভারী হয়ে আসছে ঘুমে”।
“আচ্ছা, আমি ঘুম পাড়িয়ে দেবো তোকে। আগে খেয়ে নে। আমি খাবার বাড়ছি। চলে আয়”।
হেসে ফেললাম আমি। ছলছলে চোখ মুছে নিলাম আঁচলের খুঁটে। ও বেরিয়ে গেলো। খেয়াল করল না বোধহয়। বালিশের একপাশে পরে থাকা ছবিটা হাতে তুলে নিলাম। আমার ছবি। বাবার কোলে। আমি তখন ছুটির বয়সী। সদ্য স্কুলে ভর্তি হয়েছি তখন। মর্নিং স্কুল। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠিয়ে দিয়ে বই নিয়ে বসিয়ে দিত মা। বাবা তখনো ঘুমোচ্ছে। মা কাজ করতে করতে পড়াত আমায়। আর আমি মাদুরে বসে ঢুলতাম। তারপর মা দাঁত মাজিয়ে, স্নান করিয়ে, হরলিক্স আর বিস্কুট খাইয়ে, জামাকাপড় পরিয়ে, ব্যাগ, টিফিন, জলের বোতল গুছিয়ে, চুল আঁচড়ে পাউডার মাখিয়ে দিতে দিতে আরেকবার পড়াগুলো ঝালিয়ে দিত। ততক্ষণে বাবা উঠে পড়ত। মুখ ধুয়ে, চা খেয়ে সাইকেলটা নিয়ে আমায় সামনের সিটে বসিয়ে বেরিয়ে যেত। নরম আলোয় দুচোখ ভরে দেখতাম আমার ছোট্ট মফঃস্বলকে। এক অজানা ভালোলাগায় ভরে যেত মন। সুড়কি ঢালা লাল রাস্তা। রাস্তার দু’ধারে সারি সারি গাছ। লাহাদের বাগানে থোকা থোকা রঙ্গন ফুল ফুটেছে। কমলা, সাদা। ফুলীদের বাড়ির পাঁচিল টপকে রাস্তায় পড়ে আছে তুলতুলে পাকা জাম। মল্লিকদের হাঁসগুলো রোজ চৌধুরীদের পুকুরে এসে খেলা করে। পাঁক থেকে গেঁড়ি গুগলি তুলে খায়। একটু বৃষ্টি হলেই শিঙ্গিপাড়া ডুবে যায়, হাঁটু সমান জল। হবে না কেন? বৃষ্টিতে বড়পুকুরের সমস্ত জলটা গিয়ে মেশে যে ওখানে! জেলে কাকুরা ভোর হতে না হতেই জাল ফেলে দেয় বড়পুকুরে, তারপর মস্ত একটা হাঁড়ি নিয়ে জলের মধ্যে নেমে পড়ে ওরা দু’ তিন জন। সবাই মিলে জাল থেকে মাছ তোলে ওই বড় হাঁড়িটায়। রুই, কাতলা, মৃগেল, পুঁটি, বাটা আরও কত কী! কালীতলায় তখন সবে দালান ধোয়া হচ্ছে। স্নান সেরে টকটকে লাল কাপড় পরে পুজোয় বসবেন ভৈরবী মা। কপালে জ্বলজ্বল করছে মস্ত সিঁদুরের টিপ। পিঠময় ছড়ান ভিজে চুল। একটু দূরেই রেলস্টেশন। এইসময় একটার পর একটা মালগাড়ি যায়। আস্তে আস্তে রোদের রঙ হলদে হয়। দোকানপাট খুলতে শুরু করে। মিষ্টির দোকানে চিনির রসে জাল দেয়। আর এসব দেখতে দেখতেই স্কুল চলে আসত আমার। ছোট্ট প্রাইমারী স্কুল। স্কুলের গেটের সামনে এসে সাইকেল থামিয়ে আমায় কোলে করে নামিয়ে দিত বাবা। ক্যারিয়ার থেকে ব্যাগটা বের করে আমার পিঠে পরিয়ে দিত, আর লাল টুকটুকে জলের বোতলটা গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে আমায় গেটের ভেতর দিয়ে আসত। কিন্তু গেটের ভেতর যেতে না যেতেই চিৎকার করে কান্না জুড়তাম আমি। কিছুতেই যাব না স্কুলের ভেতরে। গেটে স্কুলের মাসিরা দাঁড়িয়ে থাকত। ওরা নানা কথা বলে ভোলাত আমায়, কিন্তু আমার কান্না থামত না কিছুতেই। তারস্বরে চিৎকার করে কাঁদতাম আমি। শুধু জলভরা চোখে দেখতাম বাবা গেট থেকে বেরিয়ে সাইকেলে উঠে চলে যাচ্ছে। ফিরেও তাকালো না আমার দিকে। একবারও না। ভুলেও না। বাবা আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে, ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। আমি আর কিছু দেখতে পেতাম না। কিন্তু হঠাৎই কান্না থেমে যেত আমার। মল্লিকা দিদিমণি আদর করে ক্লাসে নিয়ে যেতেন আমায়। বন্ধুরা ডেকে পাশে বসাত। আর আমি সবটা ভুলে যেতাম। আমার ভালোলাগত স্কুল। দিদিমণিদের। বন্ধুদের। বাবার কথা ভুলে যেতাম আমি। আবার কোনও কোনোদিন, বাবা স্কুলগেটের সামনে এলেই কাঁদতে শুরু করতাম। কিছুতেই নামতে চাইতাম না সাইকেল থেকে। গায়ের জোড়ে চেপে বসে থাকতাম সিটে। কিছুতেই নামবো না। বাবা বকে ধমকেও নামাতে পারত না আমায়। বাড়ি ফিরে আসতাম আবার। মা তখন বাবার অফিসের রান্না করছে। ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরতাম আমি। আর বাবা সাইকেলটা রেখে ব্যাগ-বোতল নিয়ে এসে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিত। তারপর পিঠে নেমে আসত মার। আমার জন্য বাবাকে ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হয়েছে। আমার জন্য বাবার কোনও কাজ হয়নি। আমার জন্য বাজারে যাওয়া হল না। আমার জন্য বাবার অফিসের দেরী হয়ে গেল। আমার স্কুলের জন্য বাবার অনেক খরচ হচ্ছে, আর আমি স্কুলে যাচ্ছি না। মন দিয়ে পড়াশোনা করছি না। আমার জন্য। আমার জন্য… মা বাধা দিত, আমায় সরিয়ে আনত বাবার সামনে থেকে। যত্ন করে স্কুল ড্রেস ছাড়িয়ে, আঁচলে চোখ মুছে দিয়ে বিছানায় বই হাতে বসিয়ে দিত। আর আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতাম। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়তাম। শুধু আধো ঘুম, আধো জাগরণের মাঝে শুনতে পেতাম বাবা মায়ের ঝগড়া। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে দুচোখ ছাপিয়ে নেমে এসেছে নোনাজল। খেয়ালই করিনি। হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললাম আমি।
শ্রমণ আস্তে করে ঘরের আলোটা নিভিয়ে দিল। আমি কোনরকমে বলে উঠলাম, “দাঁড়া শ্রমণ। খিদে পেয়েছে আমার। খেতে দে আমায়। আমি আসছি”। ছবিটাকে মুচড়ে ফেলতে গিয়েও পারলাম না। বার বার ভাইয়ের গলাটা বাজতে লাগল কানে। “দিদি, বাবা আর নেই। ম্যাসিভ স্ট্রোক। সন্ধেবেলা টিভি দেখতে দেখতে… মা তখন রান্নাঘরে। আমি আর নিশা ফিরিনি তখনো। কিছুদিন ধরেই ভালো যাচ্ছিল না শরীরটা। তা সত্ত্বেও…” আর কোনও কথা কানে ঢুকছিল না আমার। শুধু একটাই কথা, একটাই কথা কানে বাজছিল। বাবা আর নেই। বাবা। আর নেই।

বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছি। ঘুম আসছে না কিছুতেই। ঘড়িতে দেখলাম রাত একটা। কাল সকাল নটা পঞ্চাশে ট্রেন। বাড়ি থেকে বেরতে হবে নটায়। তার আগে একগাদা কাজ সাড়তে হবে। সকালে উঠেই আগে স্কুলে ফোন করে হেডমিস্ট্রেসকে জানাতে হবে ব্যাপারটা। মধুমিতাকে জানিয়েছি যদিও। তাও ফর্মালি একবার জানানো উচিত স্কুলে। কাজের দিদি আসলে বলে দিতে হবে এই ক’দিন না আসতে। কাগজওয়ালাকে বারণ করতে হবে, দুধওয়ালাকে। ফ্রিজে যা তরকারিপাতি আছে পাশের ফ্ল্যাটের দিদিকে দিয়ে দিতে হবে। ছুটির জন্য কিছু শুকনো খাবার কিনে নিতে হবে। ছুটির স্কুলে একবার দেখা করে বলে আসতে পারলে ভালো হত। একটা চিঠি অন্তত যদি… এদিকে রান্না করে খেয়ে বেরতে হবে। এত কিছু কি সকালে সম্ভব? কিছুতেই ঘুম আসছে না। পাশ ফিরতেই ছুটির ঘুমন্ত মুখে চোখ পড়ল। হাঁ করে ঘুমোচ্ছে মেয়েটা। ছোট্ট গোলগাল মুখ। কপালের ওপর এলোমেলো চুল। ঘাম জমে আছে কপালে আর নাকের পাটায়। হাত দিয়ে চুল সরিয়ে দিলাম কপাল থেকে। ছোট্ট কপাল। ঘাম মুছে দিয়ে একটা চুমু খেলাম ওর কপালে। ঠাণ্ডা, নরম তুলতুলে গাল। ঘুমের মধ্যেই আদর করে দিলাম ওখানে। একটা ফুলছাপ সুতির পাতলা জামা পরে ঘুমোচ্ছে। এতক্ষণ খেয়াল করিনি, দুহাতে আমার নেইলপলিশ নিয়ে মেখেছে। হাতময় মাখামাখি। কাল রিমুভার দিয়ে ঘষে ঘষে তুলতে হবে এগুলো। কী যে করে না মেয়েটা! আচ্ছা, ও কি এই হাতেই খেলো? সর্বনাশ! শ্রমন তো নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছে এতক্ষণে। কিন্তু না, ও তো বিছানায় নেই! গেলো কোথায়? উঠে বারান্দায় এসে দেখি অন্ধকারের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে ও। ভারী সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে এখানে। ঘরের ভেতর ভ্যাপসা গরম। এখানটাই ভালো লাগছে। দূরে কারশিয়াং এর পাহাড়। কুচি কুচি আলো দেখা যাচ্ছে এখানে ওখানে। ঠিক যেন দীপাবলির রাত। অথবা শবেবরাতও হতে পারে। আমার লাল লঙ্কা গাছে টোপা টোপা লঙ্কা হয়েছে। রাই শাক আর মেথি শাকের গন্ধ মিশে রয়েছে জোলো হাওয়ায়। হাওয়ায় দুলছে ঝুমকোলতা। জাকারান্ডা আর বোগেইনভিলিয়ার বেগুনী গোলাপি ফুল উড়ে এসে ছড়িয়েছে বারান্দায়। শ্রমণের চোখ দুটো যেন হারিয়ে গেছে কোন অজানায়। ওর চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে হাওয়ায়। গালে হাল্কা দাড়ির আভাস। এক’দিন শেভ করেনি। কী শান্ত, কোমল দেখাচ্ছে ওকে। বড় বড় গভীর দুটো চোখ। স্নিগ্ধ, সুন্দর একটা মুখ। ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই আমার দিকে তাকাল। এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “কী রে? ঘুম এল না?”
“তুই ঘুম পাড়িয়ে দিলি না তো”। ওর কাঁধে আলতো করে মাথা রাখলাম। ও আরও কাছে টেনে নিল আমায়। গালে একটা চুমু খেয়ে বলল,
“খুব কষ্ট হচ্ছে?”
“না। কষ্ট হচ্ছে না। কার জন্য কষ্ট পাবো বল? বাবার সাথে আমার সেই ছোট থেকেই একটা ডিস্টেন্স তৈরি হয়ে গেছিল। স্কুলের পর হার্ডলি কথা বলতাম বাবার সাথে। কলেজ থেকেই টিউশান পড়াতাম, তাই পকেটমানিরও প্রয়োজন পড়েনি কখনো। বইপত্র কেনার টাকা অবশ্য বাবার থেকেই নিতাম। আসলে… বাবা বরাবর ভাইকেই বেশি ভালবাসত”।
“হয়ত তাই। একটা মানুষ দুজনকে সমান ভাবে কখনো ভালবাসতে পারে না। কাউকে একটু বেশি ভালোবাসে, কাউকে একটু কম। তাই ওসব নিয়ে ভাবিস না চেতনা। তুই তো ভালবাসতিস কাকুকে। সেটাই সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট”।
“সম্ভবত না। একটা মানুষ কখনোই দুজনকে সমান ভাবে ভালবাসতে পারেনা। ঠিক। কিন্তু সেটার কারণ যদি ছেলে বা মেয়ে হয়ে জন্মানো হয়, তাহলে তার থেকে কষ্টের আর কিছু হয় না রে। তুই বুঝবি না। তুই তো ছেলে”।
“আমি বুঝবো না? হাসালি! ছোটবেলায় দিদির ফ্রক পরতে চাইতাম বলে বাবা একদিন অসম্ভব মেরেছিল জানিস? আমি কখনো বাবার মত হতে চাইনি। আমি মায়ের মত হতে চাইতাম। আমার মা খুব সুন্দর গান গাইত। রেওয়াজ করত নিয়ম করে। বাবা অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার পর। আমিও মার শুনে শুনে গাইতাম নিজের মত করে। আমি দিদির মত লম্বা চুল রাখতে চাইতাম। কিন্তু চুল ঘাড় ছাড়ালেই বাবা সেলুনে নিয়ে গিয়ে চুল কাটিয়ে দিত। জানিস? আমার ছেলেদের সাথে খেলতে একদম ইচ্ছে করত না। ছেলেরা খেলত হয় ক্রিকেট, নয় ফুটবল। আর মেয়েরা কত কী খেলত! রুমালচোর, কানামাছি, খোখো, পিট্টু, কবাডি, কিতকিত আরও কত কী! আমার ভীষণ ভাললাগত। আমার গান গাইতে ইচ্ছে করত, কবিতা লিখতে ইচ্ছে করত। রান্না করতে ইচ্ছে করত আমার। ঘর সাজাতে ইচ্ছে করত। সবুজ মাঠ টানত না আমায়। আমি সবার মত ছিলাম না, অন্যরকম ছিলাম। তার জন্য কম কষ্ট পেতে হয়েছে আমায়? পাড়ার ছেলেরা নোংরা ভাষায় গালি দিত। আত্মীয়সজন, বন্ধুবান্ধব সবাই, সবাই হাসাহাসি করত আমায় নিয়ে। বলত মেয়েলি, লেডিস। বলত শিখণ্ডী। আরও নোংরা, নোংরা সব শব্দ। তুই তো তবু মেয়ে হয়ে জন্মেছিলি, আর আমি তো ছেলে হয়েও মেয়েদের মতন ছিলাম। পুরুষ বাবার কাছে এটা আরও বেশি কষ্টের জানিস? জানিস চেতনা, একবার দিদির নেইলপলিশ নিয়ে…”
“এই হ্যাঁ! ছুটির হাতময় নেইলপলিশ। তুই খেয়াল করিস নি? ও কি ওই হাতেই খেলো?”
“না রে। ও তো ঘুমিয়েই পড়েছিল। ওকে তুলে খাইয়ে দিয়েছি। আমার হাতেই খেয়েছে। ভয় নেই”।
“সত্যি মেয়েটা এত দুষ্টু হয়েছে না!”
“করুক না একটু দুষ্টুমি। এখনি তো দুষ্টুমি করবে। আর কিছুদিন পরেই তো বড় হয়ে যেতে হবে”।
“সেই। এই, তুই ঘুমোসনি কেন রে?”
“ব্যাগগুলো গোছালাম। মেয়ের স্কুলের জন্য একটা অ্যাপ্লিকেশান লিখলাম। আর কি কি নিতে হবে বা কিনতে হবে তার একটা লিস্ট করলাম। মাথাটা ভার লাগছিল। তাই এখানে একটু দাঁড়িয়ে ছিলাম”।
“হুম। কাল তুই একটু হেডমিস্ট্রেসের সাথে দেখা করে আসিস সকালে”।
“হ্যাঁ রে, যাব। ভাবিস না তুই। চল শুয়ে পড়ি। রাত হয়েছে”।
“হ্যাঁ, চল”।

পাক্কা দু ঘণ্টা লেট করে অবশেষে এন জে পি স্টেশনে ট্রেন ঢুকল দুপুর বারোটায়। ট্রেন ছাড়ল বারোটা দশে। ভোর থেকেই মুশলধারে বৃষ্টি। আর এখানে বৃষ্টি মানেই সারাদিন সূর্যের মুখ দেখা যাবেনা। চারদিক ঘন কুয়াশার মত ঝাপসা। হুট করে দশ ডিগ্রি টেম্পারেচার নেমে যাবে। রাস্তাঘাটে গাড়ি চলাচল কমে যাবে। দার্জিলিঙে ধসের খবর। অ্যাকসিডেন্টের খবর। আর অবধারিতভাবেই ট্রেনের গণ্ডগোল। তিনজনেই অল্পবিস্তর ভিজে গেছি। মেয়েটা কদিন আগেই জ্বর থেকে উঠল। গরমের ছুটিটা শরীর খারাপেই কেটে গেল। আবার আজ এইভাবে ভিজল। এরকম বিশ্রী ওয়েদার। আবার না জ্বরে পড়ে। হলদিবাড়ি এক্সপ্রেসে একটাই অসুবিধে, সারাদিন ঠায় বসে যেতে হয়। পুরোটাই চেয়ার কার। সারা শরীর ব্যাথা হয়ে যায়। আর ট্রেন লেট করলে তো কোনও কথাই নেই। প্রায় আধমরা। তার ওপর বৃষ্টির জন্য সমস্ত জানলার কাঁচ নামানো। দম বন্ধ হয়ে আসে আমার। গা গুলোয়, বমি পায়। কিন্তু এই ট্রেনে আসতে একটা কারণেই ভালোলাগে। অনেক পুরনো কথা মনে পড়ে। মাস্টার্সের পর প্রায় জেদ করেই কারশিয়াং এর মিশনারি স্কুলের চাকরীটা নিয়েছিলাম। বাড়িতে বাবা মায়ের শাসন দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছিল। তেইশ বছরের একটা মেয়েকে তেরো বছরের মেয়ের মত শাসন করত ওরা। কোনও স্বাধীনতা ছিল না আমার। অথচ সেই আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ক্লাস থেকেই বাচ্চাদের পড়াই আমি। হাতখরচের টাকাটা উঠে আসত অনায়াসেই। কিছু জমতও। কিন্তু খরচ করব কীসে? বন্ধু কোনদিনই ছিল না তেমন। হাতে গোনা খুব কাছের কিছু বন্ধু। সবাই স্কুলের বন্ধু। তাদের সাথে কোথাও ঘুরতে যেতে পারতাম না। বাড়িতে হাজারটা কৈফিয়ত। সবাইকে বাড়িতে আসতে হবে। ছেলেরা আসতে পারবে না, মেয়েরা। মেয়েদের সাথে মিশতে হবে। অথচ আমার বেশীরভাগ বন্ধুই ছেলে। ওরা ভীষণ ভালবাসত আমায়। কিন্তু ওদের সাথে মিশতে দেওয়া হত না আমায় স্কুলের পর। কোথাও বেড়াতে যেতাম না আমি, খেতে যেতাম না, ইচ্ছে মত পোশাক পরতে পারতাম না। শরীরঢাকা জামা পরতে হবে। রাত করে বাড়ি ফেরা যাবে না। মোবাইল পর্যন্ত ছিল না আমার। কম্পিউটার ছিল, কিন্তু ইন্টারনেট ছিল না। কষ্ট কর। পড়াশোনা কর। কাজ কর। ঘর গোছাও, রান্না কর, সাজো, মেয়ে সেজে থাকো, কিন্তু উগ্র সেজো না, শরীর দেখিও না। লুকিয়ে রাখো, গুটিয়ে থাকো। কারণ, তুমি মেয়ে। অসহ্য লাগত আমার। কান্না পেত। মরে যেতে ইচ্ছে করত। আর সবচেয়ে কষ্ট হত, যখন দেখতাম এই সমস্ত শাসন শুধুই আমার জন্য ছিল, ভাইয়ের জন্য ছিল না। ক্লাস টুয়েলভের পরীক্ষার পর ভাই বন্ধুদের সাথে লাভা লোলেগাঁও বেড়াতে গেছিল। অথচ আমি মাস্টার্স পড়ি তখন। বন্ধুদের সাথে শান্তিনিকেতন যাওয়ার প্ল্যান করলাম। সব ঠিকঠাক হয়ে গেল। বাবা বলল, যাওয়া হবে না। মা বলল, আমরা একসাথে যাব। কিন্তু আমরা কোনোদিন একসাথে কোথাও গেলাম না। আর এই ফ্রাস্ট্রেশান থেকে বেরোতে একটার পর একটা সম্পর্কে জড়ালাম। কেউ কেউ ভালবাসল, কেউ কেউ বাসল না। কেউ শুধুই প্রেম করল, ঘুরে বেড়াল, কাছে টানল, কিন্তু কাছে থাকল না। একজন, শুধু একজনই বিয়ে করতে চেয়েছিল। পাগলের মত ভালবেসেছিলাম তাকে। বাঁধতে চেয়েছিলাম। সারাজীবনের জন্য। নিজের সবটা দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ও শুধু শরীরটুকু চেয়ে বসল। আমি দিতে পারলাম না। ছেড়ে চলে গেল। আর তাই, আমিও ছেড়ে চলে যেতে চাইলাম এই চেনা, খুব নগ্নভাবে চেনা জগতটাকে। বাবামায়ের আপত্তি সত্তেও জোর করে এই মিশনারি স্কুলের চাকরীটা নিলাম। কুয়াশার শহরে। পাহাড়ে। চ্যাপ্টা ঠোঁটের ভালোবাসায় হারিয়ে গেলাম। মাঝে মাঝে স্কুলের ছুটি পড়লে বাড়ি যেতাম। এই ট্রেনে করেই। রাতের ট্রেনে ফেরায় আপত্তি ছিল বাবামার। তাই দিনের ট্রেনে ফিরতাম। বেশ লাগত তখন। বয়সটাও অল্প ছিল। প্রতিবার কত নতুন নতুন মানুষের সাথে আলাপ হত। সারাদিন জানলার ধারে বসে প্রকৃতি দেখতে দেখতে যেতাম। ব্যাগে গল্পের বই থাকত, ইচ্ছে হলে পড়তাম। কী ভীষণ স্বাধীন মনে হত নিজেকে। কী ভীষণ ভাললাগত সবকিছু। কারশিয়াং এ পড়াতে পড়াতে ভীষণ ইচ্ছে হল রিসার্চ করার। কাউকে না জানিয়ে নিজে নিজে সব পরীক্ষা ক্লিয়ার করে নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিতে পি এইচ ডি করতে শুরু করলাম। ওখানেই আলাপ হল শ্রমণের সাথে। শান্ত, স্নিগ্ধ, সবার থেকে আলাদা একটা মানুষ। যে ভালবাসতে জানে। পাশে থাকতে জানে। নরম মনের অথচ দৃঢ় একটা মানুষ। ভীষণ ভালবেসে ফেললাম ওকে। ও কখনো ছুঁতে চায়নি আমায়, শুতে চায়নি আমার সাথে। শুধু পাশে হাঁটতে চেয়েছিল হাতে হাত রেখে। আমিও ওকে বিয়ে করতে চাইনি, বাঁধতে চাইনি, শুধু মনখারাপে কাঁধে মাথা রাখতে চেয়েছিলাম। ইউনিভার্সিটির স্কলারশিপ পেতেই, স্কুলের চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে শিলিগুড়ি চলে এলাম। হস্টেলও পেয়ে গেলাম। আমরা আরও কাছে আসলাম। ওর বাড়ি ছিল কলকাতায়। আমরা একসাথে বাড়ি ফিরতাম তখন। এই ট্রেনেই। সারাদিন কত গল্প করতাম। একসাথে খেতাম। আর ঘুম পেলে ওর কাঁধে মাথা রাখতাম। ও সস্নেহে মাথায় হাত বুলিয়ে দিত আমার। আমি ঘুমিয়ে পড়তাম।

“এই, ঘুমোচ্ছিস? কাকিমা ফোন করেছিলেন তো”।
“ওহ। চোখটা লেগে গেছিল একটু। কী এল রে?”
“এই তো, মালদা ঢুকছে। তুই ফোন অফ করে রেখেছিস কেন?”
“এমনি। সবাই ফোন করছিল। ভাললাগছিল না। কী বলছিল মা?”
“জানতে চাইছিলেন কখন পৌঁছব আমরা। মননকে স্টেশনে পাঠাবেন কিনা এইসব”।
“বারণ করে দিয়েছিস তো তুই?”
“হ্যাঁ রে। তুই চিন্তা করিস না। তুই একবার বরং ফোন করে কথা বলে নে”।
“হুম। করব। হ্যাঁ রে, মা কি কান্নাকাটি করছিল?”
“না রে। তুই ফোন ধরলে হয়ত করতেন। আমি ফোন ধরেছিলাম বলে হয়ত… তবে গলাটা অ্যাস ইউসুয়াল ধরা ধরা লাগলো”।
“থাক। আমি আর ফোন করব না তাহলে। কান্নাকাটি আর ভাল লাগছে না”।
“কিন্তু কাকিমার তো তোকে প্রয়োজন বল? এই কান্নাটারও তো প্রয়োজন? তুই ফোন করে নিস একবার”।
“আচ্ছা। করব”।
“বাবা, ফারাক্কা ব্রিজ কখন আসবে?” এতক্ষণ জানলার বাইরে একদৃষ্টে তাকিয়ে বসেছিল ছুটি। বৃষ্টি থেমে গেছে, তাই কাঁচ উঠিয়ে দিয়েছে শ্রমণ।
“এই তো আসবে সোনা। মালদা চলে গেলেই ফারাক্কা আসবে”।
“কী মজা! মা, আমরা একদিন ওখানে বেড়াতে যাব?”
“হ্যাঁ, যাব। কিন্তু তুই এরকম জানলার ধারে থাকিস না রে। ঠাণ্ডা লেগে যাবে”।
“নাআআআ। আমি জানলার বাইরে যা যা আছে দেখব। তারপর মামাবাড়ি গিয়ে ওগুলোর ছবি আঁকব”।
“আচ্ছা, আঁকিস। ওখানে গিয়ে কিন্তু দুষ্টুমি করবে না। ওখানে সবার মনখারাপ তো। লক্ষ্মী হয়ে থাকবে”।
“সবার মনখারাপ কেন?”
“এসব থাক না চেতনা। ও কিচ্ছু করবে না। ও ভীষণ ভালো মেয়ে। তাই না ছুটি?”
“আর করলেই বা কি? মামাবাড়ি ভারী মজা। কিল চড় নাই!”
ওর কথা শুনে দুজনেই হেসে ফেললাম। মেয়েটার মুখের দিকে তাকালেই নিজের ছোটবেলার কত কথা মনে পড়ে। আর মনে পড়লেই গলার কাছটা ব্যাথা করে ওঠে। মায়ের কথা মনে পড়ে খুব। মাকে কী ভীষণ সুন্দর দেখতে ছিল আগে। ফর্সা টুকটুকে গায়ের রং, একমাথা কোঁকড়ানো ঘন কালো চুল, টিকলো নাক, পাতলা ঠোঁট, আর চিবুকের নীচে একটা বড় খয়েরী তিল। হাসলে কী সুন্দর দেখাত মাকে! কী সুন্দর করে সাজত মা! চোখে কাজল পরত, কপালে বড় লাল টিপ, বড় একটা খোঁপা বাঁধত চুলে। মায়ের হাতের আঙুলগুলো কি সুন্দর ছিল। বাঁ হাতে একটা আংটি ছিল মায়ের। আংটির পাথরটা আলো পড়লে জ্বলজ্বল করত। পড়াশোনায় ভীষণ ভালো ছিল মা। দাদু অনেক কষ্ট করে গ্র্যাজুয়েশান অবধি পড়িয়েছিলেন। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির মেরিট লিস্টে ওপরের দিকে র্যা ঙ্ক ছিল মার। আরও অনেক পড়াশোনা করার ইচ্ছে ছিল মায়ের। কিন্তু হয়নি। দাদুর ক্ষমতা ছিল না পড়ানোর। মা চাকরি করতে চেয়েছিল, পেয়েও গেছিল একটা অফিসে সেক্রেটারির চাকরি। কিন্তু দাদু করতে দেননি। তারপর বাবার সাথে আলাপ হল। ভালোবেসে বিয়ে করেছিল ওরা। দুই বাড়ির সম্মতিতেই। কিন্তু বিয়ের পর দুজনেই বুঝতে পারল দুটো মানুষ সম্পূর্ণ আলাদা। মা আরও পড়তে চেয়েছিল, চাকরি করতে চেয়েছিল, মফঃস্বলের সংকীর্ণ জগত ছেড়ে শহরে আসতে চেয়েছিল, নিজের একটা ছোট্ট বাড়ি চেয়েছিল, আমায় মনের মত করে মানুষ করতে চেয়েছিল, আমি যাতে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি, মাথা উঁচু করে, সবাইকে ছাপিয়ে যেতে পারি - চেয়েছিল মা। মা বেড়াতে যেতে ভালবাসত, শাড়ী কিনতে ভালবাসত, পুরনো বইএর দোকানে দরাদরি করে বই কিনতে ভালবাসত। রেস্তরাঁয় খেতে, সিনেমায় যেতে ভালবাসত। কিন্তু বাবা এসব পছন্দ করত না। বাবার অল্প মাইনের চাকরি ছিল। সবসময় হিসেব করে চলত। খরচ কম কর। এটা কিনো না, ওটা খেও না, ওখানে যেও না। খরচ হবে। মা সাজতে ভালবাসত, কিন্তু বাবার কাছে ওসব ছিল বাজে খরচ। শুধু অভাব, অভাব আর অভাব। স্কুলের মাইনেটুকু দিতেও দেরী করত বাবা। টিফিনের সময় সবাই কত কী খেত! ফুচকা, আলুকাবলি, কুলমাখা, কাঁচামিঠে আম, কামরাঙা, কালাকাট্টা, মালাই বরফ, কুলফি! আমার ভীষণ ইচ্ছে হত কিনতে। কিন্তু আমার কাছে পয়সাই থাকত না। বছরে একবারই জামাকাপড় হত আমার। শুধু পুজোর সময়। পয়লা বৈশাখ বা জন্মদিনে নতুন জামা পরা হত না আমার। কিন্তু এত অভাব সত্তেও যখন ভাই হল, তখন দেখলাম, ভাইয়ের জন্য দামি বেবিফুড, দামি পাওডার, ক্রিম, তেল, সাবান আসছে। শুধু ভাইয়ের যাতে কোনকিছুর অভাব না হয়, বাড়িতে ছাত্র পড়াতে শুরু করল বাবা। একটু বড় হতে ভাইকে ফুটবল কোচিং এ ভর্তি করে দেওয়া হল, সাঁতার শেখানো হল, রোববার করে বাবা নিজে রেলমাঠে ভাইকে নিয়ে যেত সাইকেল শেখাতে। আমায় কিন্তু কোনওদিনও শেখায়নি। স্কুলে যেতাম পায়ে হেঁটে, পড়তে যেতাম পায়ে হেঁটে। রাতে ব্যাথা করত পায়ে, ঊরুতে ঘষা লেগে ছড়ে যেত, পায়ে ফোস্কা পড়ে যেত। মা বলত, কষ্ট কর। অনেক বড় হবি তুই। অনেক ভালো ঘরে বিয়ে হবে তোর। তখন আর কষ্ট করতে হবে না তোকে। তখন সেসব কিছু মাথায় ঢুকত না। শুধু মনে হত সাইকেল শিখতে পারলে একদিন স্কুল থেকে আর বাড়ি ফিরব না। ব্যাগে করে বই আর জামা নিয়ে অনেক দূরে পালিয়ে যাব। সাইকেলে চড়ে। কেউ খুঁজে পাবে না আমায়।

(আগামীকাল সমাপ্য)

অলংকরণ- তৌসিফ হক

আপনার মতামত জানান