বাবা/অন্বেষা বসু

শেষ পর্ব


শান্তিনিকেতন আসতে আসতে সাড়ে ছটা বেজে গেল। খিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছে। শ্রমণের কোলে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে ছুটি। ওর একহাত মেয়ের মাথায়, আরেক হাতে একটা বই। একমনে বই পড়ছে ও।
“এই, খিদে পায়নি তোর?”
“তেমন পায়নি। মাথাটা ধরে গেছে। চা খেতে হবে একটু। তোর খিদে পেয়েছে?”
“ভীষণ। শুকনো খাবার কিছু আছে আর?”
“কেক আছে কয়েক পিস। চিঁড়েভাজা আর চিপ্স আছে অল্প। কিন্তু ছুটির ঘুম ভাঙলে খিদে পায় যদি?”
“কেকটা রেখে দে। বাকিগুলো বের কর। ঝালমুড়ি উঠলে দেখিস তো”।
“আচ্ছা। মেয়েটাও বায়না করছিল ঝালমুড়ি খাবে”।
“করুক। ট্রেনের ঝালমুড়ি দিতে হবে না। অসুখ করবে। এই কিছুদিন আগে জ্বর থেকে উঠল”।
“হুম। গা টাও কেমন ছ্যাঁক ছ্যাঁক করছে রে”।
“এই ওয়েদারে। আবার ঠাণ্ডা লাগলো কিনা কে জানে! নাক টানছে?”
“না। গা টাই শুধু গরম। জানলার ধারে বসতে দেওয়া ঠিক হয়নি”।
“তোকে বললাম আমি”।
“চিন্তা করিস না। ওষুধ তো সঙ্গেই আছে। আর রাতেই তো পৌঁছে যাচ্ছি ওখানে। তেমন হলে ডাক্তার দেখিয়ে নেব”।
“হুম”।

“দিদিভাই তোমাদের কি আসতে আরও দেরী হবে?”
“বুঝতে পারছি না রে। ট্রেন তো শুরু থেকেই দু ঘণ্টা লেটে চলছিল। আমাদের চিতপুর পৌঁছতে পৌঁছতে দশটা বাজবে মনে হচ্ছে।“
“হ্যাঁ। মা-ও আসলে চিন্তা করছেন তোমাদের জন্য। তোমার ভাই বলছিল গাড়ি নিয়ে যাবে”।
“না না, তার কোনও দরকার নেই রে। আমরা ট্যাক্সি নিয়ে নেব। মাকে চিন্তা করতে বারণ কর”।
“অত রাতে বাচ্চাটাকে নিয়ে আসবে। তোমার ভাই বরং গাড়ি নিয়ে যাক। তুমি বারণ কোরো না প্লিজ। আমরা সবাই টেনশনে থাকব”।
“ঠিক আছে। আসতে বলিস। দক্ষিণেশ্বর পেরলে ফোন করে দেব”।
“আচ্ছা গো, রাখি তাহলে?”

আমি চাইনা ভাই নিতে আসুক আমাদের। কিন্তু বারণ করলে মা চিন্তা করবে। শ্রমণকে ওরা কেউই অ্যাক্সেপ্ট করতে পারেনি। বাবা তো নয়ই। মাও শুরুর দিকে অনেক অশান্তি করেছে। পরে অবশ্য মেনে নিয়েছে। কিন্তু ভাই এখনো ঠিক করে কথা বলে না শ্রমণের সাথে। মনন আইটি এঞ্জিনিয়ার। নিশাও এঞ্জিনিয়ার। দুজনে মিলে দুহাতে টাকা রোজগার করছে। ওদের বছর দুয়েক হল বিয়ে হয়েছে। বাবা মাকে দমদমে ফ্ল্যাটে নিজেদের কাছে এনে রেখেছে। থাকা - খাওয়া- পরা, ওষুধ- পথ্যের ভার নিয়েছে। আর আমি কিছুই করিনি ওদের জন্য। পালিয়ে এসেছি সবটা ছেড়ে। দায়িত্ব এড়িয়ে চলে এসেছি ওদের থেকে অনেক অনেক দূরে। বিয়ে করেছি বাড়ির ইচ্ছের বিরুদ্ধে। শ্রমণ কোনও চাকরি করেনা। ও লেখে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ওর লেখা ছাপা হয়। কিছু পারিশ্রমিক হাতে আসে। ও গ্রুপ থিয়েটার করে। খুব স্বল্পই আয় তাতে। এছাড়া নিজের মত করে রিসার্চ করে। পেপার লেখে। নামী জার্নালে ছাপা হয় সেসব। ও বই পড়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুবে থাকে বইএর মধ্যে। ঘরের কাজ করে। রান্না করে। এছাড়া মেয়ের সব কাজ করে ও। ওকে পড়ানো, খাওয়ানো, স্নান করানো, স্কুলে নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসা, দোকান বাজার সব একা হাতে সামলায় ও। কী যায় আসে ও চাকরি করে না তো? সবাইকে একরকম হতে হবে? এক ছাঁচে ঢালা? একরকম ভাবে ভাবতে হবে? এক কাজ করতে হবে? কেন? যেদিন প্রথমবার মনন ঠাট্টা করেছিল আমাদের সম্পর্ককে নিয়ে, নিজের অজান্তেই হাতটা উঠে গিয়েছিল ওর গালে। গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে সপাটে চড় মেরেছিলাম আমি। ও বলেছিল, “সত্যি দিদি! কি করে ওই ন্যাকা ছেলেটার প্রেমে পড়লি তুই? কোমর দুলিয়ে হাঁটে! কোনও কাজও করে না। এদিকে নাকি হেব্বি সব রেজাল্ট। তা রেজাল্ট ধুয়ে কি জল খাবি? ভালো কথা বলছি শোন। এরা সব গে। তোকে বিয়ে করছে, দ্যাখ গিয়ে কোন ছেলের সাথে শোয়”।
আমি সহ্য করতে পারিনি। প্রথম চড়টা মারার পর চুলের মুঠি ধরে বের করে দিয়েছিলাম ঘর থেকে। যা পেরেছি বলে গেছি ওকে। রাগে, অপমানে দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে গেছিলাম আমি। সেই দিন থেকে শ্রমণের ওপর রাগ ভাইয়ের। কথায় কথায় অপমান করে ওকে। আমি চাইনা ওরা মুখোমুখি হোক। আমি চাইনা আর কোনও নোংরা কথা শুনতে হোক শ্রমণকে। কষ্ট, ভীষণ কষ্ট হয় আমার। বড় ভালোবাসি ওকে। কতটা আমি নিজেও জানিনা।

গত রাত থেকেই ধুম জ্বর মেয়ের। বিছানায় নেতিয়ে পড়ে আছে। কিছু খেতে চাইছে না। উঠে বসার শক্তিটুকু নেই। গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। কপালে জলপট্টি দিয়েও জ্বর নামছে না। এদিকে মাও মাঝেমাঝেই কান্নাকাটি করছে। পিসিমনিরা এসেছে, আর মামারা তো শুরু থেকেই রয়েছে। বাবাকে নিয়ে পুরনো কথা আলোচনা হচ্ছে আর কান্নার রোল উঠছে। মেয়েটার দিকে তাকানর কেউ নেই। আমিও এখানে আসায় নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। শ্রমণই সারাদিন নাওয়া খাওয়া ভুলে মেয়েকে নিয়ে আছে।
প্রায় একসপ্তাহ কেটে গেল। রোজই কিছু না কিছু আত্মীয়স্বজন আসছে। ফল, মিষ্টি, টাকাপয়সা দিয়ে যাচ্ছে। মা ছাড়া কেউই অশৌচ পালন করছে না। ভাই আর নিশা দুদিন বাড়িতে থেকেই অফিস জয়েন করেছে। ওদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর আমি এইসব নিয়ম মানি না। কাজেই… মায়ের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে মায়ের। কণ্ঠার হাড় বেরিয়ে এসেছে। মাথার চুল উস্ক খুস্ক। চোখের তলায় কালি পড়েছে। মাকে দেখে বুকের ভেতর একটা কষ্ট পাক দিয়ে উঠতে লাগল আমার। বার বার একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে মনে। মা কী তাহলে ভালো নেই?
“ভালো আর কবে ছিলাম বল? সবাই ভাবছে, আজ তোর বাবা নেই, তাই আমি ভালো নেই। আসলে আমি কোনদিনই ভালো ছিলাম না”।
“আমায় কোনোদিন বলনি কেন মা? আমার কাছে চলে এলে না কেন?”
“কী করে যেতাম বল? লোকে কী বলত? ছেলে, স্বামী থাকতে মেয়ের কাছে গিয়ে আছি”।
“কী হয়েছে তাতে? স্বামী, ছেলের কাছে যদি ভালো না থাকো, তাহলে মেয়ের কাছে গিয়েই থাকবে! আর তুমিই না বলতে মায়ের কাছে ছেলে মেয়ে সবাই সমান? তুমিও তাহলে ভাইকেই ভালোবাসো বল?”
“না রে। এটা একদম ভুল ধারণা তোর। আমি সবসময় চাইতাম আমার মেয়ে হোক। মনের মত করে মানুষ করব তাকে। কিন্তু তোর বাবা চায়নি। তোর বাবা চেয়েছিল ছেলে হবে। পড়াশোনা শিখিয়ে বড় করবে তাকে। এঞ্জিনিয়ার করবে। অনেক টাকা রোজগার করবে সে। বুড়ো বয়েসে দেখবে আমাদের। সবাইকে বড় মুখ করে বলবে আমার ছেলে এঞ্জিনিয়ার”।
“তাই তো হয়েছে মা। ভাই এঞ্জিনিয়ার হয়েছে। প্রচুর টাকা রোজগার। তোমাদের বুড়ো বয়সে দেখছে। আমি তো কিছুই করিনি তোমাদের জন্য”।
“দেখছে! দুজনে মিলে সকাল আটটায় বেরিয়ে যায় অফিসে। হা ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরে রাত নটা, সাড়ে নটা। তখন মুখের কাছে চা, জল, রাতের খাবার টা এগিয়ে দিতেই হয়। ছুটির দিন বেলা নটার আগে ঘুম থেকেই ওঠে না। বেশীরভাগ দিনই ওদের এর ওর বাড়িতে নেমন্তন্ন থাকে। ঘুরতে যায় এখানে, সেখানে। বাড়িতে প্রায় থাকে না বললেই চলে। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সব একা হাতে সামলাই। তোর বাবা তো শেষ দিকটা ভুগেই গেল। আর জীবনে জলটাও গড়িয়ে খায়নি কখনো। অথচ তার কেমন সুন্দর মৃত্যু। কষ্ট পেলো না, কিচ্ছু না। বসে বসেই চলে গেল। আর আমি এখনো খেটে যাচ্ছি। কষ্ট করে যাচ্ছি। আমার তো মরণ হচ্ছে না? তাহলে তো বেঁচে যেতাম”।
“মা প্লিজ এসব বোলো না। তুমি যাবে আমাদের সাথে? শিলিগুড়িতে? আমাদের সাথে থাকবে?”
“নিয়ে যাবি আমাকে? নিয়ে চল। আমার আর এখানে থাকতে ভাললাগেনা রে। কিন্তু শ্রমণ কী ভাববে?”
“কী ভাববে আবার? তুমি এখনো ওকে চিনলে না মা?”
“সেই। ওকে তো চেনারই সুযোগ হয়নি কোনোদিন। এখন যত দেখছি অবাক হচ্ছি। কী সুন্দর ব্যবহার। সবসময় হেসে কথা বলে। আর সারাক্ষণ মেয়েটাকে নিয়েই আছে। তোর যখন জ্বরজারি হত ছোটবেলায়, রাতে ঘুমতিস না, কাঁদতিস, একটা দিন কোলে নেয়নি তোর বাবা। ঘুমের অসুবিধে হত, বিরক্ত হয়ে পাশের ঘরে গিয়ে শুত। ডাক্তার দেখানো, ওষুধ খাওয়ানো, সব আমি করেছি। আর দেখছি শ্রমণকে। কত যত্ন, কত খেয়াল মেয়ের প্রতি। অথচ ছুটি তো তোদের…”
“মা তুমি ভাইয়ের সাথে একবার কথা বলে নাও। এসব মিটে গেলে আমাদের কাছে গিয়ে থাকবে তুমি। যতদিন খুশি। সারাজীবন ইচ্ছে হলে সারাজীবন”।
“ছোটবেলায় তোকে অনেক শাসন করেছি রে। আসলে আমি চাইনি আমার মত কোনও ভুল করে বসিস তুই। আমি চেয়েছিলাম মাথা উঁচু করে বাঁচবি তুই। কোনও পুরুষ মানুষের কাছে মাথা নোয়াবি না”।
“তাই? তাহলে শ্রমণকে কেন মেনে নাওনি তুমি মা? ভাইকেই বা কেন একটা পুরুষ তৈরি করলে বল তো? মানুষ করতে পারলে না? সরি, এভাবে বলতে চাইনি। আসলে… তুমি আমাদের সাথে চল মা। ভালো থাকবে। দেখো”।
“যাব রে। তোদের সাথেই যাব। নাতনীটাকে মানুষ করতে হবে না?”

আজ সমস্ত কাজ মিটল। কাল রাতের দার্জিলিং মেইলে রওনা হচ্ছি আমরা। একটা দিন রেস্ট নিয়ে স্কুল জয়েন করব আমি। মেয়েটাও অনেকটা পিছিয়ে পড়ল। শ্রমণ অবশ্য কিছুটা করে পড়া এগিয়ে দিয়েছে। কিন্তু খাতার কাজগুলো স্কুলে গিয়ে কপি করে নিতে হবে। সন্ধ্যে থেকেই বৃষ্টি পড়ছে এখানে। ভীষণ প্রয়োজন ছিল এটার। কটা দিন ঝড়ের বেগে কেটে গেল। মা এখন রাতের খাবার খেয়ে টিভি সিরিয়াল দেখছে। ছুটির জ্বর টা ছেড়ে গেছে। ও ছবি আঁকতে আঁকতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে কে জানে? বিছানায় ছড়িয়ে রয়েছে রং পেন্সিল, এক পাশে পড়ে রয়েছে ড্রয়িং খাতা। ওর পাশে আধশোয়া হয়ে বই পড়ছে শ্রমণ। বাবা, মেয়ে দুজনের কপালেই এলোমেলো চুল। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। এলোমেলো হাওয়া দিচ্ছে একটা! পাশের বাড়িতে বেগম আখতার বাজছে__ “জোছনা করেছে আড়ি/আসেনা আমার বাড়ি/গলি দিয়ে চলে যায়/লুটিয়ে রুপোলী শাড়ী…” বাবার বড় প্রিয় গান। বাবা গান ভালবাসত। গজল, ঠুমরী, খেয়াল ছিল বাবার পছন্দ। সন্ধ্যেয় অফিস থেকে ফিরে স্নান সেরে চা জলখাবার খেয়ে রেডিও চালিয়ে দিত। আকাশবাণী কলকাতা। তখন হিন্দুস্তানি ক্লাসিক্যাল মিউজিকের প্রোগ্রাম হত। আমি পাশের ঘরে অঙ্ক কষতাম, ভাই হাতের লেখা লিখত। মা রান্নাঘরে রুটি বানাতে বানাতে গুনগুন করে গাইত। রাত বাড়ত। ভাই বই খাতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত বিছানায়। ওর মাথাটা কোলে টেনে নিতাম আমি। হাত বুলিয়ে দিতাম মাথায়। ওর কপালে চুমু খেয়ে দেখতাম কি সুন্দর আমার ভাইটা! ও জানতেও পারত না। আমায় আর বাবাকে খেতে দিয়ে মা ভাইকে খাইয়ে দিত। ও খেতে চাইত না, কাঁদত। মা যে কখন খেত দেখতেই পেতাম না। রাত এগারোটার মধ্যে আমি আর ভাই শুয়ে পড়তাম। বাবা মা আরও দেরী করে শুত। কোনও কোনোদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে দেখতাম মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোচ্ছে বাবা। কেমন একটা মনখারাপ লাগত তখন। কেন বুঝতে পারতাম না। কিন্তু আমারও অমন করে কাউকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোতে ইচ্ছে হত। ক্লাস এইটে পড়তে একদিন পিসিমনির ছেলে অঞ্জন দাদা আচমকা জড়িয়ে ধরেছিল আমায়। ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিলাম আমি। কিন্তু ভয় কেটে যেতেই এক অন্যরকম ভালোলাগা ছড়িয়ে যাচ্ছিল শরীরে, মনে। আমি আরও আঁকড়ে ধরতে চাইছিলাম ওকে। কিন্তু একটু পরেই আস্তে আস্তে ছেড়ে দিল ও। মাথা নিচু করে বলেছিল, “সরি”। তারপর আর কোনোদিন এমন ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু আমার ইচ্ছে হত। ভীষণ। এমন বৃষ্টির রাতে আমার ভীষণ ইচ্ছে হয়। জলে ভেজা কামিনী ফুলের গন্ধে কেমন ঘোর লেগে যাচ্ছে। শ্রমণ একবারও তাকাচ্ছে না আমার দিকে। ওর দৃষ্টি বইয়ের পাতায় নিবদ্ধ। হাল্কা আকাশী রঙের টিশার্টটা ভারী সুন্দর মানিয়েছে ওকে। ওর এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে ভীষণ। ওর চিবুকের নীচটা আঙুল দিয়ে ছুঁতে ইচ্ছে করছে। ওর হাতের পাতায় চুম্বন এঁকে দিতে ইচ্ছে করছে। কত কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সেই ইউনিভার্সিটিতে পড়তে প্রথম যেদিন ছুঁয়েছিলাম ওকে। লজ্জায় লাল হয়ে গেছিল ওর কানদুটো। এলোমেলো আদর করছিলাম ওকে। কিন্তু ও ফিরিয়ে দিচ্ছিল না আমার আদরগুলো। ও কাঠ হয়ে বসেছিল। হঠাৎ দেখলাম ওর চোখ থেকে টপ টপ করে জল পড়ছে। ওর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে জানতে চাইলাম, কী হয়েছে? ও আমার দিকে অসহায়ের মত চেয়ে বলল, “আমি পারি না রে। কোনোদিন হয়ত পারব না। তুই সারাজীবন কষ্ট পাবি। আমি তোকে কষ্ট দিতে চাইনা। কিন্তু ভীষণ ভালোবাসি তোকে। আমি সবকিছু করতে পারি তোর জন্য। শুধু আদর করতে জানিনা আমি। আমি পারিনা। কিচ্ছু পারিনা”। ওর কথা শুনে ভীষণ কষ্ট হয়েছিল আমার। ওর মাথাটা বুকে টেনে নিয়ে বলেছিলাম, “কিচ্ছু করতে হবে না তোকে। কিচ্ছু চাইনা আমার। শুধু আমায় ভালবাসিস। সবসময়। সারাজীবন”। কিন্তু আজ বুঝি, কী একটা না পাওয়া রয়ে গেল। একটা ঝড়, যা কোনোদিন শান্ত হল না, একটা আগুন, যা কোনোদিন নিভল না।

দরজায় টোকা পড়তে শ্রমণই উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ভাই। শ্রমণ হেসে ভেতরে আসতে বলল ওকে। ও ভেতরে এসে ঠাণ্ডা, শান্ত গলায় বলল,
“তোর সাথে একটু কথা আছে দিদি”।
“কী কথা রে?”
“তুই আমাদের ঘরে আয়”। ওর কথার ইঙ্গিত ধরতে পেরে মায়ের সাথে গল্প করতে যাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে শ্রমণ বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ছুটি এলোমেলো হয়ে ঘুমোচ্ছে। আমি বসতে বললাম ওকে। ও বসল না।
“না, বসব না। কয়েকটা কথা বলতে এলাম তোকে”।
“কী কথা? বল”।
“মাকে তুই শিলিগুড়ি নিয়ে যাবি বলেছিস?”
“হ্যাঁ, তুই জানতিস না? টিকিট কাটাও হয়ে গেছে। দুপুরে মায়ের ব্যাগও গুছিয়ে দিয়েছি”।
“না। আমাকে মা কিছু বলার প্রয়োজন মনে করেনি। নিশা বলল। তুইও কিছু বলিসনি আমায়”।
“বলিনি, আমি জানতাম তুই জানিস। যাই হোক, হ্যাঁ যাচ্ছে। তো?”
“দ্যাখ নিশা কন্সিভ করেছে। এটা ওর ফার্স্ট টাইম। ইনিশিয়াল স্টেজ। কেউ জানেনা। মাকেও জানানো হয়নি এখনো। কিন্তু এইসময় বাড়িতে একজনের থাকাটা খুব ইম্পরট্যান্ট। ওর মা আসতে পারবেন না। কারণ ওনারও শরীর ভালো নেই। তাই মাকে এখন নিয়ে যাস না। সব মিটলে আমি নিজে দিয়ে আসব তোর কাছে। ঘুরে আসবে কদিন। কিন্তু এখন সেটা সম্ভব না”।
“প্রয়োজন মনে করলে নিশাকে দেখার জন্য আয়া রেখে দে। মা আমার সাথেই যাবে। আর সেটা ঘুরতে নয়। থাকতে। মা এখন থেকে আমাদের সাথে থাকবে”।
“তার মানে? এগুলো নিজে নিজেই ডিসাইড করে ফেললি? আমার সাথে ডিসকাস করার প্রয়োজন মনে করলি না? মা কিন্তু আমার কাস্টডিতে ছিল এতদিন। আমি দেখেছি মাকে। তুই কিছু করিসনি। আজ হঠাৎ করে দরদ উথলে উঠল মার জন্য?”
“মাকে কেমন দেখেছিস তা তো দেখতেই পাচ্ছি। মা আন্ডারওয়েট। শরীরে নানান রোগ বাসা বেঁধেছে। এই বয়েসেও তোর সংসারের সব কাজ করে মা। এত টাকা রোজগার করে একটা কাজের লোক রাখিস নি। কারণ মা তো আছেই বিনাপয়সার কাজের লোক! এখন আয়ার কাজও করতে হবে! অসাধারণ”।
“ওহ! তা তুই কোন মহৎ উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছিস মাকে? পরের মেয়েকে মানুষ করছিস কর। তাকে দেখাশোনার জন্য মাকে নিয়ে যেতে লজ্জা করেনা?”
“ব্যস। আর না। এবার চুপ কর তুই। মা আমার সাথে যাবে। এটা ফাইনাল। তোর আর কোনও কথা শুনতে চাইনা আমি”।
“কেন? লজ্জা করছে? মেয়ে মেয়ে করে তো আদিখ্যেতার শেষ নেই। মেয়ে বড় হয়ে যখন বুঝতে শিখবে ওর বাবা একটা নপুংসক, তখন তোকেই প্রশ্ন করবে ওর বাবা কে? কী উত্তর দিবি তখন?”
“তুই যাবি এখান থেকে? চলে যা তুই চোখের সামনে থেকে। তোকে ভাই বলে ভাবতে ঘেন্না করছে আমার। ছুটি আমার মেয়ে। আমার। শ্রমণ ওর বাবা। ব্যস”।
“বাবা? হাসালি! বাবা কিভাবে হয় সেটা ও জানে? আর তুই মা? আসলে নিজে মা হতে পারিস নি তো তাই এত হিংসে। তুই নিশাকে হিংসে করিস! তুই চাস না ও ভালো থাকুক। আমারও তোকে দিদি বলে ভাবতে ঘেন্না হচ্ছে!”
“প্লিজ তুই চুপ কর। আমি আর সহ্য করতে পারছি না এগুলো। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আমার। অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে। আমি তোর পায়ে পরছি ভাই। তুই এখান থেকে চলে যা। প্লিজ। প্লিজ। প্লিজ চলে যা”।
“হ্যাঁ যাচ্ছি। আর, মা তোর সাথে যাচ্ছে না। টিকিটটা কাল সকালে শ্রমণদা কে বলিস ক্যান্সেল করে আসতে। আর, সরি। আমি এভাবে বলতে চাইনি। মনে রাখিস না এগুলো। রাত হয়েছে, শুয়ে পড়”।

“কাল সকালের ট্রেনের কনফার্ম টিকিট পাবো না রে। তুই আমি নাহয় কষ্ট করে জেনারেলে চলে যেতে পারব। কিন্তু ছুটি পারবে না রে। শরীর খারাপ করবে ওর”।
“তাহলে বাসে চল। আমি আর এখানে থাকতে পারব না শ্রমণ”।
“বুঝতে পারছি রে সোনা। কিন্তু এভাবে চলে গেলে কাকিমা কষ্ট পাবেন খুব। তাছাড়া সারাদিন বাসে করে গিয়ে পরের দিন আর উঠতে পারবিনা। স্কুলটাও তো জয়েন করতে হবে তোকে বল?”
“তুই কি করে এত শান্ত আছিস আমি বুঝতে পারছি না? তোর মধ্যে কি আত্মসম্মানবোধ বলে কিছু নেই? এত কিছুর পরেও এখানে থাকতে লজ্জা করছে না তোর? তুই যা খুশি কর। আমি সকালে বাস ধরব। এটা ফাইনাল”।
“ঠিক আছে। তাই হবে। তুই এভাবে মাথাগরম করিস না চেতনা। তোর বিপি হাই এমনিতেই, শরীর খারাপ করবে”।
“ডিসগাস্টিং!”
“আসলে কি জানিস? ছোট থেকে এই কথাগুলো এত শুনেছি যে এখন আর গায়ে লাগেনা। শুধু তোকে আমার জন্য কষ্ট পেতে হল, এটাই মেনে নিতে পারছি না। কেন ভালবাসলি বলতো আমায়? কী দেখে ভাল লাগল আমায় তোর?”
“কী দেখে ভাল লাগলো? তোর মনে আছে কিনা জানিনা, এন বি ইউ তে থাকার সময় একবার জন্মদিনে ভীষণ মনখারাপ হয়েছিল আমার। একমাত্র মা ছাড়া কেউ ফোন করেনি আমায়। বন্ধুরা, দাদাদিদিরা, ভাই, সবাই ভুলে গেছিল। সবাই। এমনকি বাবাও। বাড়ির কথা মনে পড়ছিল ভীষণ। আমি দুপুরে তোর মেসে গিয়েছিলাম। তোকে জড়িয়ে ধরে ভীষণ কেঁদেছিলাম। তুই আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলি। বাচ্চা মেয়ের মত ভুলিয়েছিলি আমায়। আমায় কোলে নিয়ে তোর বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিলি। কপালে হাত বুলিয়ে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলি আমায়। বিকেলে আমাকে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলি। একটা সস্তা রেস্তরাঁয় মোমো খেলাম আমরা। আমায় কানের দুল কিনে দিলি। আমার সব মনখারাপ কোথায় হারিয়ে গেছিল। সেদিন তোর মধ্যে একটা বাবাকে খুঁজে পেয়েছিলাম আমি। ভালোবেসে ফেলেছিলাম তোকে। নিজের অজান্তেই”।
“পাগলী। আচ্ছা, ছুটি যদি বড় হয়ে জানতে চায় কখনো? কী বলবি?”
“বলে দেব সত্যিটা। ওকে যে আমরা অ্যাডপ্ট করেছি সেটা বলে দেবো। আর এটাও বলব যে ওর সত্যিকারের বাবা মা কে আমরা জানিনা, আমরা ওর মিথ্যেকারের বাবা মা। কিন্তু ও আমাদের সত্যিকারের মেয়ে”।
“কিন্তু সত্যিটা জানলে খুব কষ্ট পাবে রে মেয়েটা”। শ্রমণের কথা শুনে অল্প হাসলাম আমি। ওর বুকে মাথা রেখে জিগ্যেস করলাম,
“কাকে বেশি ভালবাসিস তুই? আমাকে না ছুটিকে?
আমার কপালে ছোট্ট চুমু খেয়ে বলল, “আমার মেয়েকে”।
ছুটির দিকে তাকিয়ে দেখি হাঁ করে ঘুমোচ্ছে মেয়েটা। এলোমেলো চুল কপালে। ওর মাথার কাছে পড়ে রয়েছে আকাশ রঙা ড্রইং খাতা আর বুকের কাছে ছড়িয়ে আছে লাল, সাদা, নীল রং পেন্সিল।
(সমাপ্ত)

আপনার মতামত জানান