হার মানা her পরাবো তোমার গলে

ঋতম ঘোষাল

লোকটা একা। যেভাবে আমরা অনেকেই পছন্দের মানুষকে খুঁজে না পেয়ে,অথবা খুঁজে পেয়েও ক্রমিক অপছন্দের শিকার হয়ে,বা আরোপিত দূরত্বের কারণে একা।লোকটার চাকরিটাও বড় অদ্ভূত।অন্য লোকের হয়ে তাদের হাতের লেখা নকল করে তাদের প্রিয়জনদের ফরমায়েশি চিঠি লেখা।অন্য লোকের প্রেম-ভালবাসা-অভিমান সে ফুটিয়ে তোলে অটোমেটেড সফটওয়্যারের মাধ্যমে।তার লেখা চিঠি পেয়ে নিশ্চিত হয় প্রাপক-এই তো!প্রিয় মানুষটা লুকিয়ে আছে কয়েকটা হরফের আড়ালে।আর লোকটার সেই সময় কাটে মনখারাপ করা স্বপ্নে।যে স্বপ্নে তার প্রাক্তন স্ত্রীর নিত্যই আসাযাওয়া।পুরোনো স্মৃতির ভারে ঘুম ভেঙে উঠে বসে সে। গলা শুকিয়ে কাঠ।ভিড় ট্রেনে মোবাইলে লুকিয়ে পর্ন দেখে ঢাকতে চায় যাপন।
এমন সময়ে গল্পে আসে একটি “বুদ্ধিমান” অপারেটিং সিস্টেম সামান্থা।আর স্পাইক জোন্সের চিত্র্রনাট্য ও পরিচালনায় সেলুলয়েডে জন্ম নেয় আধুনিক রূপকথা “হার”।আমার ব্যক্তিগত পছন্দের ছবি “বিইং জন মালকোভিচের” পরিচালক স্পাইক এই প্রথম নিজের লেখা গল্প নিয়ে ছবি বানালেন।এই প্রথম স্পাইকের কোনও ফিচার ছবির বিষয় একদম নির্জলা প্রেম।এবং কল্পবিজ্ঞান।কল্পবিজ্ ঞানের ছবিকে যেসব সমালচকরা পাত্তা দিতেন না,এ ছবি তাদের আবারো ভাবাবে।
রোবটের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা নিয়ে দিস্তাদিস্তা লেখা হয়েছে।সিনেমাও বানানো হয়েছে বিস্তর।কুব্রিকের মত পরিচালক তঁার সিগনেচার রেখে গেছেন।কিন্তু প্রেমিক অপারেটিং সিস্টেম?উঁহু,মনে পড়ছে না।
সামান্থার সাথে গল্পের নায়ক থিওডরের ক্রমে সাহচর্য থেকে বদলে যাওয়া প্রেম,তীব্র আকাঙ্খা-লিপ্সা,একলা অন্ধকার ঘরে সামান্থার সাথে ভারচুয়াল শরীরী মিলন,শীৎকার,প্রাক্তন স্ত্রীর সাথে থিওডরের দেখা করার সময় সামান্থার ইচ্ছাকৃত জেলাসি আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রেমের ফঁাদ কি অনন্য তরিকায় পাতা যায় এ ভুবনে।থিওডরের নিসংগতা,স্মৃতির ভারে ভারাক্রান্ত মুখের ভঁাজে ঘোরাফেরা করে হয়তে ভ্যান হয়তেমার ক্যামেরা।ঠিক মানুষের মতো সামান্থার অন্য অপারেটিং সিস্টেমের সাথে মেলামেশা ভাল চোখে দেখতে পারে না থিওডর।প্রাক্তন স্ত্রী রুনি মারা তাকে এসে বলে যায় তার মানুষের সাথে মেশার সীমাবদ্ধতার কথা।এ যেন আমরা আগের থেকেই জানি,একদিন চলে যাবে সামান্থা।হারিয়ে যাবে কোন দিকশুন্যপুরে।একা নিলু থুড়ি থিওডর ফিরে আসবে আবার মানুষের রাজ্যে।রয়ে যাবে শুধু ফেলে যাওয়া মন খারাপ,ভুলে যাওয়া আলতো হাতের স্পর্শের মতো অনেক বিষন্নতা।শেক্সপিয়রের নায়ক যেমন প্রথম থেকেই জানে লাস্ট সিনে তার মৃত্যু নিশ্চিত,জঙ্গল আসবে এগিয়ে,মারা যাবে দেসদিমনা,সেইরকম থিওডরও যেন জানতো এই প্রেম টেকার নয়।কিন্তু বেরতে পারেনি। সামান্থা পেরেছে।সর্বজ্ঞ অপারেটিং সিস্টেম কি আগে থেকেই জানতো?উত্তর জানলেও বলেননি স্পাইক বাবু।
এই ছবিতে প্রধান অভিনেতা জোয়াকিম ফিনিক্স অভিনয় করেন না,তিনি বিহেভ করেন।অভিনয় তো করেন অন্যরা।রুনি মারা,অ্যামি অ্যাডাম্মস,এবং অবশ্যই সামান্থার গলায় স্কারলেট জোহান্সন।জোয়াকিম শুধু থাকেন।তাঁর মুখে খেলা করে যায় সাংহাই এর রোদ,চশমার কঁাচে ফুটে উঁচুনিচু স্কাইলাইন,যা সতত মানবহৃদয়ের মতোই বন্ধুর।উঠতি অভিনেতারা জোয়াকিমের থেকে আন্ডারঅ্যাক্টিং পাঠ নিতেই পারেন।হাতের কাছেই কপিবুক মজুত আছে তো।একদা অভিনয় থেকে স্বেচ্ছাবসর নেওয়া জোয়াকিম ফিনিক্স ভবিষ্যতে আরও অনেক মনিমুক্তো উপহার দেবেন,আশা রাখি।স্পাইক জোন্সের চিত্রনাট্যর গুণেই বোধহয় ছবি শেষ হওয়ার পরে চেপে ধরে ভাললাগা আর হাল্কা মন খারাপ।ঠোঙার শেষ বাদামটার মত খঁুজে আনতে ইচ্ছে করে জমানো কথা।কারুর খোঁজ নিতে ইচ্ছে করে।অস্কার না পাওয়ার ব্যাখ্যা আকাদেমি দিতে পারবেনা,জানা কথা।ছবিটা অবশ্যই দেখুন সবাই,আর সম্ভব হলে পরিচালকের “আই অ্যাম হিয়ার” নামের শর্ট ফিল্ম টাও,যেটা ইউটিউবে পাওয়া যায়।

রাতের কড়া নেড়ে সামান্থা আর জিজ্ঞেস করবেনা থিওডোর বাড়ি আছো কিনা ।

ছবি-হার
পরিচালক-স্পাইক জোন্স
অভিনয়-জোয়াকিম ফিনিক্স,স্কারলেট জোহান্স্‌, রুনি মারা,অ্যামি অ্যাডাম্মস।
ক্যামেরা-হয়তে ভ্যান হয়তেমা

আপনার মতামত জানান