মাসকাওয়াথ আহসান

মহানায়ক ও পাখীবৃত্তান্ত


বেহেশতে এসে দেবুদা সারাক্ষণ ইভেন্ট করে বেড়ায়। আজ এই হয়েছে তো কাল সেই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় শরত বাবুর ফেসবুক আইডিতে মেসেজ পাঠান, দেবুর হয়েছেটা কী! শরতবাবু উত্তর দেন, গান্ধীজীর ব্যামো।

দেবু বেহেশতের সাম্যবাদী ও কাম্যবাদী দলের বাইরে একটি থার্ড ফোর্স তৈরী করতে চায়। দলে জনপ্রিয় লোকদের ভেড়ানোর জন্য দিনরাত ছুটে বেড়ায় জনপ্রিয়দের পেছনে। শরতবাবু ফোন করে ধমক দেন, দেবু তোমার কী খেয়ে দেয়ে কাজ নেই। পার্বতীর সঙ্গে বিয়ের জন্য এতো যে আকুল হয়েছিলে; রোজরাতে এসে ঘ্যান ঘ্যান করতে, ও দাদা পারুর সঙ্গে বে থা করিয়ে দেন; নইলে বাঁচবো না। তো এখন তো বেশ পার্বতীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে; থাকো সুখে। এই পলিটিক্যাল ডার্ট-এর মধ্যে যাচ্ছো কেন?

দেবুদার ভীষণ রাগ হয়।শরত বাবুকে দুকথা শুনিয়ে দেয়। দাদা আজ আমার সব ক্ষোভ আপনার উপর। এই পারুর মতো মেয়ের সঙ্গে আপনিই পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। সারাক্ষণ হিন্দী সিরিয়াল দেখে। আজকালতো বাংলা বলা ছেড়েই দিয়েছে। রান্নাঘরে সে যায়না। বাঙ্গালী খাবার তার মুখে রুচে না। খালি পিটযা আর পাস্তা অর্ডার করে।

শরত বাবু টুক করে ফোনের লাইনটা কেটে দেন। মনে মনে ভাবেন বানশালী বেটাকে হিন্দীতে দেবদাস ফিল্ম বানাতে দেয়াই ভুল হয়েছে। পার্বতীর মধ্যে একটা উটকো বড়লোকি ভাব এসে গেছে।

দেবুদা একটা ট্যাক্সি নিয়ে উত্তম কুমারের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ট্যাক্সিচালক আনন্দে উথলে ওঠে। দেবুদাও বিস্মিত। চুনিলাল। কতদিন পরে দেখা! চুনিলাল দেবুদাকে জড়িয়ে ধরে। দেবুদা জিজ্ঞেস করে, তুমি বেহেশতে চান্স পেলে কীভাবে! যে ফক্কর লোক ছিলে তুমি। চুনি ফিক ফিক করে হাসে, প্রথমে জায়গা মতোই পাঠিয়েছিল। একেবারে হাবিয়াহ দোজখে। পরে উপায়ান্তর না দেখে চন্দ্রমুখীদিকে ফোন করলাম। উনি বেহেশতের ইমিগ্রেশন দপ্তরকে ধরে আমাকে বেহেশতে আনার ব্যবস্থা করেছে। তবে আমার উপর নিষেধাজ্ঞা আছে; আঙ্গুরের রস স্পর্শ
করলেই আবার হাবিয়াতে ফেরত পাঠানো হবে। আজ কাজও দিয়েছে ট্যাক্সি চালানোর। তবে আমি খুশী দেবুদা। নরক যন্ত্রণার চেয়ে ট্যাক্সি চালানো ভালো। আর নরকে যত ফোরটোয়েন্টি
করাপ্ট পলিটিক্যাল লিডার, ক্যাডার, আমলা, ব্যবসায়ী, পুলিশ। এদের সঙ্গে কী থাকা যায়!

মহানায়ক উত্তম কুমার বাড়ীর বাগানে বসে হলিউডের অড্রে হেপবার্ণের সঙ্গে গল্প করছেন আর চুকচুক করে রুহ আফজা খাচ্ছেন। দেবুদা মনে মনে ভাবে, ভুল সময়ে এসে পড়লাম নাকি। কারণ ভি আই পিরা সবচেয়ে বিরক্ত হন বান্ধবীর সঙ্গে গল্প করার সময় কেউ এলে।

দেবুদা নমস্কার বলে চুনিলাল সহ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে। উত্তম কুমার একটি সিগ্রেট ধরিয়ে স্লো মোশানে টানছিলেন। মহানায়কের এই মন্থর ভাবভঙ্গীতে অড্রে হেপবার্ণ বেশ ইমপ্রেসড মনে
হচ্ছে। উত্তম কুমার ঘাড় একশো পঁচিশ ডিগ্রী ঘুরিয়ে মিষ্টি হাসেন। ভুবন ভোলানো হাসি।

দেবুদা মুগ্ধ হয়ে যায়; এই না হলে মহানায়ক; আজকাল কীসব নায়ক জুটেছে অসম্ভবকে সম্ভব করতে চাওয়া লোকজন। চুনিলালের রুহ আফজা দেখেই হয়ে গেছে। সে চেষ্টা করে এ জিনিস নজরে না আনতে। উত্তম কুমার বলেন, কই দেবুদা ঢালো। চুনিদাকে বেশী করে দিও। চুনিলাল ইতস্ততঃ করে। ইয়ে মানে মহানায়ক আমার ওসব খেতে বারণ।
অড্রে হেপবার্ণ অবাক, খেতে বারণ মানে!
দেবুদা ব্যাপারটা ম্যানেজ করে, না মানে চুনিদা তার আবে হায়াতের কোটা মর্ত্যেই শেষ করে ফেলেছেন।

উত্তম কুমার নিজেই উঠে যান চুনিলালের জন্য চা বানাতে। দেবুদা স্তম্ভিত হয়ে যায়; যে উত্তমদার বেশীরভাগ ফিল্মে উনি শুয়ে বসে সিগ্রেট ফুঁকতেন; আর ঘর গুছানো থেকে সব কাজ সুচিত্রা সেনকে করতে দেখা যেতো; তিনি আজ নিজ হাতে চা বানাচ্ছেন। এও কী সম্ভব! হেপবার্ণ বলেন, আজকাল হেলপ করতে চাইলেও উত্তম নেয় না। ও বলে নিজের কাজ নিজে না করে সুচিত্রার উপর নির্ভরশীল হবার কারণে জীবনে সব নারীই ওর হৃদয় নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে। এখনো সুচিত্রা ফোন করে বলে, লিখে রেখো এক ফোটা দিলেম শিশির।

দেবুদা বলে, আমারও একি অবস্থা। পার্বতীতো আজকাল একটা কাঠি ভেঙ্গে দু’ভাগ করেনা। আমাকে সারাক্ষণ হুকুম করে। ফুটফরমায়েশ খাটার ভয়েই বাড়ীর বাইরে বাইরে থাকি।

উত্তম চা এগিয়ে দেন চুনিলালের দিকে।
চুনি মুচকি হেসে বলে, মহানায়কের তৈরী করা চায়ে চুমুক দেবার আগেই টিপসি লাগছে!

দেবুদা কথা শুরু করেন, মহানায়ক; আজকাল একটা ট্রেন্ড দেখছি, গায়ক-অভিনেতা এরা সব কাম্যবাদী দলে চলে যাচ্ছে।

চুনিলাল যোগ করে, জীবনমুখী গান গাওয়া লোকজন মরণমুখী রাজনীতি শুরু করেছে।

অড্রে হেপবার্ণ বলেন, আর তোমাদের ওখানে গায়ক-টায়কের নাম ডাক হলেই গয়না-গাটি পরে। আজকাল মেয়েদেরও তো এমন গয়নার বাক্স নেই মনে হয়।

মহানায়ক বলেন, দেখো বেহেশতে যে রাজনৈতিক নেতা রয়েছেন; এরা ছিলেন নেতা। লিডার যাকে বলে।বঙ্গবন্ধু- জ্যোতিবসু। সব আইকনিক ফিগার। মানুষের সেবা করাটাই ছিলো তাদের ব্রত। আর এখন রাজনীতিতে সেবা বলে কিছু নেই; সবই সেবার অভিনয়; তাই প্রয়োজন অভিনেতা।

অড্রে রিনিঝিনি হেসে বলেন, থার্ড ক্লাস অভিনেতারাই রাজনীতিতে আসে; রোনাল্ড রেগান থেকে আর্নল্ড সোয়ার্জনিগার পর্যন্ত যা দেখছি; আর এরা সব কেন যেন রাইট উইং গার।

মহানায়ক বিস্ময় প্রকাশ করেন, একজন শিল্পী রাইট উইং গার হয় কীভাবে। সেকুলারিজমই তো শিল্পের গোড়ার কথা।

দেবুদা মুখ পাংশু করে বলে, কী আর বলবো দাদা লতা মাঙ্গেশকারের মতো গায়িকা মোদীর ব্রান্ড এমব্যাস্যাডর হয়েছেন।

চুনিলাল বলে, ভারতীয় উপমহাদেশে বুড়ো বয়েসে মৃত্যুভয় থেকে একটা ভীমরতি ধরে সবার। আর শিল্পীদের রাজ-শিল্পী হবার রাজ রোগ সব যুগেই ছিল।

উত্তম কুমার বলেন, কই সত্যজিত রায়ও তো বুড়ো হয়েছিলেন; কোনই পরিবর্তন দেখিনি। আসলে শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারটাই মূখ্য।

দেবুদা হাসেন, শিক্ষা দিয়ে আর কী হবে! এখন ভারতীয় উপমহাদেশে ক্ষমতায় যাবার পূর্বশর্ত অশিক্ষিত হতে হবে।কারো কারো সার্টিফিকেট আছে; কিন্তু শিক্ষাটা নেই।

উত্তম জিজ্ঞেস করেন, আজকাল শুনলাম এলিটিস্ট ফিল্ম হচ্ছে!

চুনিলাল ফোড়ন কাটে, বাংলা-ইংজিরি-হিন্দী মিশিয়ে কিছু ছেঁড়া ছেঁড়া ডায়ালগ, মেয়ে গুলো বিলিতি মেমের মতো জামা-কাপড় পরা, কথায় কথা রবীন্দ্র সঙ্গীতের সব্বনাশ করে ছাড়া; একটা বড়লোকির মধ্যে কী যেন নেই; কী যেন নেই; লাইফ ইজ মিনিংলেস ভাবসাব নিয়ে ঘোরা।

অড্রে হেপবার্ণ বলেন, ওরা হয়তো এলিয়েনেশনের রোগী; নাগরিক বিচ্ছিন্নতা ফুটিয়ে তুলতে চায়।

দেবুদা ক্ষিপ্ত হয়, দেশের মানুষের জীবনে সমস্যার তো শেষ নেই; এখন টিকেট কেটে কতগুলো উতচিংড়ে এংলো-ইন্ডিয়ান ভাবসাবের বার্গার সমাজের সমস্যা দেখে নতুন হতাশা বাধানোর দরকার কী!

মহানায়ক বলেন, এগুলোকে সেলফি ফিল্ম বলা যায়; একটু এফলুয়েন্স শো অফ করা। দেখবে এদের চেহারা-পত্তরের ভূগোল বেশ করুণ; সেটাকেই এসব আগড়ুম বাগরুম জিনস-টিশার্ট-হ্যাট কিংবা ডার্ক আই-শ্যাডো দিয়ে ঢেকে রাখা।


অড্রে হেপবার্ণ রিনর ঝিনি হেসে বলেন, এই রোগ এমেরিকায় ১৯২০ থেকে ৩০ সালের মধ্যে বেড়েছিল; প্রায় একশো বছর পর এরোগ ভারতে।

মহানায়ক বলেন, নাগরিক বিচ্ছিন্নতার কথা তিরিশেই পাঁচজন কবি লিখে গেছেন। কই তাদেরকে টেক্সাসের কাউ বয় সেজে ঘুরতে দেখেনি কেউ!

হঠাত বেহেশতের কিছু পুলিশ এসে উপস্থিত। একজন মহানায়কের দিকে তাকিয়ে বলে, সরি স্যার খুব বিব্রত বোধ করছি। দেবদাসের একটা গ্রেফতারী পরোয়ানা আছে।

উত্তম বিস্মিত, সে কী কেন। ওতো হার্মলেস লোক। দেবু আমি কী আসবো তোমার সঙ্গে!

দেবুদা পুলিশকে জিজ্ঞেস করে, কী ব্যাপার।

-চলুন থানায় গিয়েই কথা হবে।

চুনিলাল অভ্যাস বশতঃ কিছু টাকা গুঁজে দিতে চেষ্টা করে পুলিশের পকেটে।

পুলিশ ধমক দেয়, এটা কী আপনার দক্ষিণ এশিয়া পেয়েছেন মশাই; এটা বেহেশত, এখানে ঘুষ ফুষ চলেনা।

পুলিশ দেবুদাকে নিয়ে যায়। থানায় গিয়ে দেখে পার্বতী বসে।

থানার দারোগা চোখে সুরমা দিতে দিতে বলে, এই মহিলাই আপনার বিরুদ্ধে ডায়েরী করেছেন। অভিযোগ গুরুতর; তাই আপনাকে গ্রেফতার করতে হয়েছে।

দেবুদা পার্বতীকে জিজ্ঞেস করে, কী ব্যাপার আমি আবার কী করলাম!

--কী করলাম মানে! আমি তোমাকে পঁই পঁই করে বললাম একটা পাখী ড্রেস কিনে দিতে; তুমি কানেই তুললে না। দিয়েছিক কেস ঠুকে।

দারোগা ভ্রু কাঁপিয়ে বলে, আপনার সঙ্গে পারুর ফেসবুক ইনবক্স চ্যাটিং-এর স্ক্রিণ শট জমা দিয়েছেন উনি।আপনিতো হার্টলেস মশাই। পারু আপনাকে সিল্কের পাঞ্জাবী, হাল ফ্যাশানের ধুতি, নক্সী স্যান্ডেল কত কিছু গিফট করেছে; আর আপনি কীনা একটা পাখি ড্রেস কিনে দিতে পারেননি। আপনি কী পাষন্ড মশাই!

আপনার মতামত জানান