মহানিষ্ক্রমণ/অর্ণব মজুমদার

প্রথম পর্ব


(১)
--‘আমি এমন এক আশ্রয়ে যাচ্ছি যেখানে বিরক্তি বলে কিছু নেই। আমাকে একলা হতে দাও।’
—‘একলা থাকার সময় পরে অনেক পাবে। তার আগে একবার চোখ মেলে তাকাও। দেখো।’
আর কী দেখার আছে বুঝলেন না তিনি। তবু চোখ মেলে তাকালেন তলস্তোয়।
(২)
মাঝরাতে জেগে উঠলেন তিনি। ঘুমোনোর ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু দুর্বল শরীর তন্দ্রা ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। বই পড়তে পড়তে কখন যেন লেগে এসেছিল চোখদুটো।
রাত কি অনেক? ভোর হতে কি তবে আর বেশি বাকি নেই? চোখ খুলতেই এইসব প্রশ্ন মনে জেগে উঠে উৎকন্ঠিত করে তুলল তাকে। লেপটা সরিয়ে মেঝেতে নামতে যাবেন, ঠিক সেই মুহূর্তে চোখ পড়ল ঘরের এক কোণে দাঁড়ানো ছায়ামূর্তিটার দিকে।
--‘কে?’ নীচু গলায় প্রশ্নটা করলেন বটে কিন্তু উত্তর তাঁর জানাই ছিল।
ছায়ামূর্তিটা তাঁর খাটের দিকে এগিয়ে এল। খাটের পাশে রাখা মোমবাতিটার আলোয় তাকে দেখতে পেয়ে খানিকটা যেন নিশ্চিন্ত বোধ করলেন তিনি। সে-ই, যাকে ভেবেছিলেন।
ছায়ামূর্তিটার চওড়া কপাল। শুকনো চিমসে গালে উলোঝুলো দাড়ি। চোখগুলো কোটরগত, কিন্তু বুদ্ধির দীপ্তিতে অবিশ্বাস্যরকম ঝলমলে। পরনে কালো ফ্রক কোট। সে হাসি মুখে খাটের দিকে এগিয়ে এসে বলল, ‘সুপ্রভাত, ল্যেভ্‌ নিকোলাইয়েভিচ!’
--‘ফিওদোর মিখাইলোভিচ! সত্যি বলতে কি এবার অসহ্য লাগছে। তুমি কি চাও বলো তো আমার থেকে?’
--‘ওহো, না না! আমি কিছুই চাই না। চাওয়া-পাওয়ার অনেক ঊর্ধ্বে আমি চলে গিয়েছি প্রায় ত্রিশ বছর হলো, তবে আমার মনে হয় আমাকেই তোমার দরকার।’
ল্যেভ্‌ নিকোলাইয়েভিচ কথা বলছিলেন নীচু স্বরে। কিন্তু দস্তয়েভস্কি শেষ কথাগুলো বেশ জোরের সঙ্গে জোরে জোরেই বললেন। তলস্তোয় একবার খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে নিলেন। ফিওদোর মিখাইলোভিচের গলা সোফিয়ার ঘর পর্যন্ত পৌঁছে গেল নাকি? তারপর ভাবলেন, কীসব আবোলতাবোল ভাবছি!
বিছানা ছেড়ে ড্রেসিং গাউনটা গলাতে গলাতে তিনি বললেন—‘আমার দরকার তোমাকে? আমি তোমায় ঘৃণা করি।’
দস্তয়েভস্কি হেসে বললেন—‘তা জানি। আমাকে ঘৃণা করা তোমার পক্ষে স্বাভাবিক বই কী। সৌজন্য তুর্গেনিভ।’
--‘উহু না, তুর্গেনিভের জন্যে নয়। তোমার কীর্তিকলাপের কথা তোমার জীবনীকার... কী যেন নাম ছোকরার...’
--‘স্ত্রাখভ।’
--‘হ্যাঁ, ওই স্ত্রাখভই আমাকে চিঠিতে সব জানিয়েছে। চার্তকভের১ মতো তোমার পয়সা ওড়ানোর বাইয়ের কথা। তারপর তোমার শিশুভোগের কথা...উফ! কী ভয়ানক পাষন্ড তুমি!’
--‘পাষন্ড?’ হাসলেন দস্তয়েভস্কি। ‘অনেক নরম করে বললে হে! আসলে আমি তো আর তোমার বা তুর্গেনিভের মতো অভিজাত বংশের নই। বদ রক্তের প্রভাব বলতে পার। তবে একথা তো মানবে যে বিখ্যাত মানুষদের সঙ্গে নানা গল্পকথা জুড়ে যায়। যেমন তোমার সঙ্গে জুড়ে গেছে যে আমার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে তুমি নাকি কেঁদে উঠেছিলে। অথচ তুমি নাকি আমাকে ঘৃণা কর।’
--‘থিয়েটারি করছ? তোমার উপন্যাসগুলো কেন নাটুকেপনায় ঠাসা সেটা বেশ বোঝা যায়।’
--‘কীভাবে বোঝা যায়? দিনকতক আমার সাথে কথা বলেই, নাকি ওই বইটা পড়ে?’ দস্তয়েভস্কি বিছানায় রাখা বইটার দিকে আঙুল দেখালেন। বইটা “কারামাজোভ ভায়েরা”—দস্তয়েভস্কির শেষ উপন্যাস।
--‘দুভাবেই।’ মুখ কুঁচকে বললেন তলস্তোয়।
--‘বিরক্ত হচ্ছ? আচ্ছা আমি যদি তোমাকে তোমার স্টাডিরুমের টেবিলে রাখা চিঠিটার কথা মনে করিয়ে দিই, যেটা মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে লেখা হলেও যার কথা তুমি ইতিমধ্যে ভুলতে বসেছ তাহলে কি মানবে আমার উদ্দেশ্য কোনোভাবেই তোমাকে বিরক্ত করা নয়, বরং তোমার উপকার করা।’
চিঠিটার কথা না ভুললেও সেটা লেখার পর থেকেই তলস্তোয় খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত। বারংবার মনে হচ্ছে যা করতে যাচ্ছি, ঠিক করছি তো? আবার পরক্ষণেই নিজেকে বোঝাচ্ছেন, না, না, যা করতে চলেছি তা সকলেও ভালোর জন্যেই, সর্বোপরি নিজের জন্য।
‘কী জ্বালা! তুমিও কি সোফিয়ার মতো আমার কাগজপত্র হালটাও নাকি?’ কথাটা বলে তিনি চারদিকে তাকালেন। ফিওদোর মিখাইলোভিচের ছায়ামূর্তিটাকে আর দেখতে পেলেন না।
বাঁচা গেল। এই ভেবে দরকারী কাজকর্ম সারতে শুরু করলেন তলস্তোয়। কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে নিলেন। স্টাডিতে গিয়ে চিঠিটায় আর একদফা চোখ বুলিয়ে নিলেন। ‘হ্যাঁ, ঠিকই তো আছে।’ ভাবলেন তিনি। ‘চিঠিটা পড়ে আর যাই হোক সোফিয়ার আঘাত পাবার কথা নয়। ওকে আমি ক্ষমা করেছি। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, তিনি আমাকে ক্ষমা করার ক্ষমতা প্রদান করেছেন।’
পা টিপে টিপে পাশের ঘরে চললেন তিনি। সেখানে মাকোভিৎস্কি২ ঘুমিয়ে আছেন। তাঁর ডাক্তার।
তিনি আর বিছানার কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে ডাকলেন—‘দুসান পেত্রোভিচ, দুসান পেত্রোভিচ, উঠুন।’
মাকোভিৎস্কির ঘুম ভেঙে গেল। যেন খানিকটা অবাক এত রাতে তলস্তোয় উঠে তার ঘরে এসেছেন দেখে। তলস্তোয় বললেন—‘আমি ঠিক করেছি এবাড়ি ছেড়ে চলে যাব আর তুমি আমার সঙ্গে আসবে। কিন্তু সোফিয়া আন্দ্রেইয়েভনাকে জাগিও না। আমরা বেশি কিছু নেব না, শুধুমাত্র দরকারী জিনিসপত্র ছাড়া।’
মাকোভিৎস্কি কিছুক্ষণ তার দিকে চেয়ে রইলেন। দেখলেন তলস্তোয়ের কষ্ট হচ্ছিল, বোধহয় একটানা কথা বলার ফলেই। তার মনে হলো তিনি উত্তেজিত কিন্তু তার মুখের দৃঢ় সংকল্পের অভিব্যক্তি ডাক্তারের নজর এড়ালো না।
ডাক্তারসুলভ খবরদারি তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য নয়। আর এমন এক বিশাল ব্যাক্তিত্বকে সিদ্বান্ত পরিবর্তনের জন্য জোর করা মতো চারিত্রিক দৃঢ়তা তার ছিল না। তাছাড়া তিনি ভেবেছিলেন তলস্তোয় আর জামাই সুখোতিনের জমিদারি কোচিয়েতীতে যেতে চাইছেন। তাই তিনি বাক্যব্যায় না করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন।
মাকোভিৎস্কি প্রস্তুত হতে যতটা সময় নিলেন তলস্তোয় ততক্ষণ মানসিক উত্তেজনা প্রশমনের জন্য কারামাজোভ ভাইয়েরা পড়লেন।
বাড়ি ছেড়ে যখন বেরোলেন বাইরে তখনও ঘন অন্ধকার। কনকনে ঠান্ডা। মাঝে মাঝে হিমেল বাতাস বইচ্ছে। স্ত্রী, দশ সন্তান—সবাই তখন নিদ্রামগ্ন। তলস্তোয় চললেন তার অতিস্বাদের ইয়াস্নায়া পলিয়ানার ভিটে বাড়ি ছেড়ে। চললেন নিরুদ্দেশের দেশে। দমবন্ধ করা পারিবারিক পরিবেশ থেকে মুক্তির দেশে। ছলনা, মিথ্যাচারিতা, লোভ, স্বার্থপরতার থেকে অনেক দূরে, সত্যের সন্ধানে।
অন্ধকার সত্ত্বেও অতিচেনা পথগুলো চিনতে ভুল হয় না তার। প্রায় পচাত্তর বছর ধরে পায়ে হেঁটে, ঘোড়ায় চড়ে বা সাইকেলে চেপে এই পথ ধরে অনবরত যাতায়াত করেছেন। কখনো স্ত্রীর সঙ্গে, কখনো ছেলেমেয়েদের সঙ্গে, আবার কখনো সঙ্গে ছিল চেখভ-গোর্কিরা। কখনো বা একা। আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছিলেন তিনি। মনে হচ্ছিল পিতা নিকোলাই ইলিচ, মাতা মারিয়া নিকোলাইয়েভনা আড়াল থেকে তাকে লক্ষ্য করছে। প্রিয় লেভকার জন্য লুকিয়ে চোখের জল ফেলছে তার পরম প্রিয় দুই পিসি তোয়ানেৎ ও পেলাগিয়া।
মাকোভিৎস্কিকে লুকিয়ে চোখের জল মুছলেন তলস্তোয়। --‘শক্ত থাকতে হবে।’ বললেন নিজেকে।
****

শ্চিয়োকিনোতে একটা সেকেন্ড ক্লাস কামরায় উঠলেন ওরা দুজন। সকাল সকাল এ’লাইনের ট্রেনগুলো ফাঁকাই থাকে। ল্যেভ্‌ নিকোলাইয়েভিচ জানলার ধারে একটি সিটে বসলেন। মাকোভিৎস্কি একবার একটু মৃদু আপত্তি করেছিল বটে, সকালবেলার কনকনে ঠান্ডা হাওয়া এভাবে লাগানো কি ঠিক হচ্ছে? কিন্তু তলস্তোয় কান দিলেন না দেখে তিনি আর কিছু বললেন না।
সেই একই কামরায় তাদের মুখোমুখি বসেছিল এক স্বামী-স্ত্রী। ভদ্রমহিলার পা থেকে মাথা পর্যন্ত হাল আমলের ইউরোপীয় পোশাকে ঢাকা। তার স্বামীর পরনে আস্ত্রাখানি কলার দেওয়া একটু পুরনো একটা ওভারকোট। মাথায় আস্ত্রাখানি টুপি। ভদ্রলোক একমনে কাগজ পড়ে যাচ্ছিলেন। ভদ্রমহিলাই উল্টোদিকে বসা অশীতিপর বৃদ্ধের দিকে তার দৃষ্টি আর্কষণ করলেন।
--‘আমাদের পরম সৌভাগ্য’, ভদ্রলোক তাঁকে চিনতে পেরে উঠে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে অভিবাদন জানিয়ে বললেন—‘ল্যেভ্‌ নিকোলাইয়েভিচের সহযাত্রী হতে পেরে।’
তারপর কিছুক্ষণ দুপক্ষের সৌজন্য বিনিময় চলল। তলস্তোয় হাসি মুখেই ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে গেলেন। কিন্তু মাকোভিৎস্কি তার থেমে থেমে কথা বলার অস্বাভাবিক ভঙ্গি থেকে বুঝতে পারছিল এই দুজন তাকে চিনে ফেলায় তিনি বিশেষ স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন না।
ইতিমধ্যে আরো কয়েকজন তলস্তোয়ের সঙ্গে আলাপ করে গেল। প্রবীণ লেখককে রাশিয়ার এক অতিসাধারণ রেলকামরায় পেয়ে তাদের যেন কৌতুহলের শেষ নেই। কথা বলার ফাঁকে তিনি মাকোভিৎস্কির কানে কানে কী যেন বললেন।
গর্বাচেভোতে তলস্তোয় ও মাকোভিৎস্কি একটি তৃতীয় শ্রেণীর কামরায় চলে এলেন। সাধারণ চাষাভুষো মানুষের সঙ্গ তিনি বরাবরই পছন্দ করতেন। মাকোভিৎস্কি অবাক হয়ে দেখল এবারে তিনি নিজে থেকেই একদল চাষীর সঙ্গে দিব্যি গপ্পো জুড়ে দিলেন। ফসল, মাটি, শস্য—এসব কিছু নিয়ে কথা বলতে বলতে তার মুখে শিশুসুলভ সরলতা ফুটে উঠল। মাকোভিৎস্কিকে এক ফাঁকে বললেন—‘কী সুন্দর মুক্ত পরিবেশ!’
কিন্তু এখানেও বিপত্তি। বেলা যত বাড়তে লাগল থার্ড ক্লাস কামরায় গাদাগাদি হতে লাগল। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতন কিছু মুঝিক ওর মধ্যেই ধূমপান করছিল। তলস্তোয়ের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেছে দেখে মাকোভিৎস্কি ঠেলাঠেলি করে তাকে দরজার পাশে নিয়ে গেলেন। কিন্তু এখানে আবার ঠান্ডা হাওয়ার দাপট। তবে তা অগ্রাহ্য করে তলস্তোয় সেখানে দাঁড়িয়ে বরফ-সাদা ধুধু প্রান্তরের দিকে চেয়ে রইলেন একদৃষ্টে।
পথ যেন আর ফুরোয় না! পরে মাকোভিৎস্কির মনে হয়েছিল এই শ্লথ রাশিয়ান প্যাসেঞ্জার ট্রেনই যেন ল্যেভ্‌ নিকোলাইয়েভিচকে তার চরম পরিণতির দিকে ঠেলে দিল।
একশো মাইল পথ পার হতে প্রায় সাড়ে ছ’ঘন্টা লেগে গেল। কোজিয়োলস্কে পৌঁছে একটি সন্ন্যাসীর নৌকা করে বরফে ঢাকা নদী পার হয়ে জঙ্গলের মধ্যে একটি মঠে পৌঁছলেন তলস্তোয় ও মাকোভিৎস্কি। এখানে তলস্তোয় তার সঙ্গীকে জানালেন তার আসল উদ্দেশ্য। তিনি শামারদিনো যেতে চান। সেখাকার এক মঠে তার একমাত্র বোন মারিয়া নিকোলাইয়েভনা আছেন প্রায় দু’দশক ধরে।
মঠে সন্ন্যাসীরা মঠসংলগ্ন একটা ছিমছাম ঘরে তলস্তোয় ও মাকোভিৎস্কির থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। একটা রাত কাটানোর পক্ষে যথেষ্ট আয়োজন। খাওয়া-দাওয়া সেরে ডাক্তারের সঙ্গে ঘুমোনোর জন্য শুলেও তাঁর ঘুম আসছিল না। অথচ শরীরজোড়া ক্লান্তি। সেই সকাল থেকে বৃদ্ধ, দুর্বল এই শরীরটার ওপর কম ধকল তো গেল না! একটু যেন অসুস্থও বোধ করছিলেন তিনি। কিন্তু মনটা এত চঞ্চল হয়ে আছে যে অনেকক্ষণ ছটফট করেও দু’চোখের পাতা এক করতে পারলেন না। শুধু মনে হয় বাড়িতে ওরা কী করছে? সোফিয়া কী ভাবছে? খবরটা পাওয়ার পর তার প্রথম প্রতিক্রিয়া কেমন হয়েছিল? ওরা কি সাশাকে৩ চাপ দিচ্ছে? তার এই সিদ্বান্তের কথা তো একমাত্র ওই জানে...
কিছুক্ষণ পর এইসব চিন্তা মানসিকভাবে অসহনীয় মনে হ’ল তার কাছে। তিনি উঠে বিছানার পাশের টেবিলে রাখা মোমবাতিটা জ্বেলে বই পড়তে লাগলেন। সেই কারামাজোভ ভায়েরা।
খানিকক্ষণ পড়ার পর টের পেলেন একটা ছায়ামূর্তি তাঁর পায়ের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। মুখ না দেখতে পেলেও তিনি চিনতে পারলেন।
--‘কেমন লাগছে ল্যেভ্‌ নিকোলাইয়েভিচ?’ ছায়ামূর্তিটা বলল।
--‘এখানেও?’ তলস্তোয় বই থেকে চোখ না তুলেই বলল।
--‘এই অবস্থায় কখনো তোমাকে ত্যাগ করতে পারি? বিপদে-আপদে, শ্মশানে আর বিপ্লবে পাশে থাকার নামই তো বন্ধুত্ব নাকি?’
--‘শেষ দুটো আমার ক্ষেত্রে খাটে না আপাতত। কিন্তু তোমাকে কে বলল যে আমি বিপদে পড়েছি?’
--‘রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি ছেড়ে, ভরা সংসার ছেড়ে জঙ্গলের মধ্যে এই ছোট্ট মঠে রাত কাটানোকে বিপদ বলতে ভালো লাগছে না বুঝি? তাহলে দুর্ভাগ্য শব্দটা কেমন?’
--‘বাজে বোকো না। আমি যা করেছি অনেক ভেবেচিন্তেই করেছি এবং একে আমি বিপদ বা ভাগ্যের ফের কিছুই মনে করি না।’
--‘সে তুমি যাই বলো না কেন... আচ্ছা তোমার কি মনে হয় না তুমি যে বইটা পড়ছ সেটা সম্পর্কে তোমার মতামত জানতে চাওয়াটা আমার অধিকারের মধ্যে পড়ে?’
--‘পড়ে বুঝি?’
--‘পড়ে না? বাঃ! লোকে বলে, এবং আমিও তাই মনে করি যে এটা আমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ।’
--‘হুম। দেখো তোমার আসল ধান্দা যে এই সেটা যবে থেকে বইটা পড়তে শুরু করেছি তবে থেকে তোমার ঘুরঘুর করা থেকেই বুঝতে পেরেছি।’
-‘বুঝতে যখন পেরেছ তখন কিছু বলো।’ দস্তয়েভস্কি খুশি হয়ে বলল।
--‘দ্যাখো, সবে পয়ত্রিশটা চ্যাপ্টার পড়েছি। এখন “গ্র্যান্ড ইঙ্কুউজিটর”টা পড়ছিলাম। আপাতত শুধু এইটুকুই বলতে পারি যে যারা বলে এটা তোমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ তারা ভুল বলে। আমার মতে এটা তোমার একমাত্র ভালো কাজ।’
--‘কিছু বলছেন ল্যেভ্‌ নিকোলাইয়েভিচ?’ মাকোভিৎস্কি পাশের খাট থেকে জিগ্যেস করল।
--‘ইয়ে... হুম... না।’ তলস্তোয় দেখলেন দস্তয়েভস্কি আবার অদৃশ্য হয়েছেন। –‘তুমি শুয়ে পড় দুসান পেত্রভিচ। ধন্যবাদ।’
পরদিন তারা শামারদিনোর দিকে রওনা হয়ে গেলেন। কিন্তু বিপদ যেন কিছুতেই তলস্তোয়ের পিছু ছাড়ছে না। পথে তুষারপাত শুরু হ’ল। সে’সব অগ্রাহ্য করে তিনি পথ চলাই স্থির করলেন। বোন মারিয়া নিকোলাইয়েভনার সঙ্গে দেখা করার জন্য তখন তার আর তর সইছে না।
শামারদিনোর মঠটা সন্ন্যাসিনীদের জন্য। একজন পুরুষ সেখানে প্রবেশ করতে পারেন কিন্তু বসবাস করতে পারেন না। তারা মঠের অদূরে একটা ছিমছাম হোটেল ভাড়া করলেন। মালপত্র হোটেলে মাকোভিৎস্কির কাছে রেখে তলস্তোয় গেলেন বোনের সঙ্গে দেখা করতে।
মারিয়া এবং তার মেয়ে এলিজাভেতা ভালেরিয়েভনা তাকে দেখে অত্যন্ত খুশি হলেন। যদিও তার চোখে-মুখে ক্লান্তি ও অসুস্থতার ছাপ দেখে তারা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তারা তাকে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন।
বোনের সামনে বসে তলস্তোয় নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না। মিনিটপাঁচেক শুধু কেঁদেই গেলেন। মারিয়া নিকোলাইয়েভনা বুঝলেন কোনও এক কারণে তলস্তোয় অত্যন্ত যন্ত্রনার মধ্যে আছেন। মঠে প্রায় কুড়ি বছর সন্ন্যাসজীবন কাটিয়ে তার মধ্যে একটা ধীরস্থির ভাব এসেছে। তিনি তলস্তোয়কে থামালেন না। কাঁদার সময়টুকু দিলেন। তিনি শুধু সামনে বসে রইলেন চুপ করে।
একসময় তলস্তোয় নিজেই ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে বলতে শুরু করলেন—‘আমি তোমার কাছে এসেছি কারণ... কারণ...দ্যাখো মাকে আমার সে’ভাবে মনে নেই। কিন্তু পবিত্রতা আর মা আমার কাছে সমার্থক... পিসির কাছে মায়ের অনেক কথা শুনেছি আর মায়ের পর আমার চোখে মায়ের সমতূল্য পবিত্র একমাত্র তুমি...তুমি মারিয়া।’
মারিয়া কোনও কথা বললেন না।
তলস্তোয় চোখ মুছতে মুছতে বলে চললেন—‘আমি তোমাকে জানাতে চাই আমার বিবাহিত জীবন সুখের নয়। কিন্তু কর্তব্যেকর্মে কোনো গাফিলতি কোনোপক্ষের কোনোদিন হয়নি। আমি আমার স্ত্রীর কাছে আমার উদ্দাম যৌবনের কথা গোপন করিনি, বিয়ের আগেই তাকে আমার ডায়েরি পড়তে দিয়েছিলাম। সোফিয়াও বিয়ের পর এক সঙ্গীতশিল্পীর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। কিন্তু মোটের ওপর আমরা একে অপরের প্রতি সৎ থেকেছি বলা চলে। আমার প্রতি তার কর্তব্যে এখনো কোনো খামতি নেই, কিন্তু এখন আমার পারিবারিক অশান্তি একেবারে চরমে পৌঁছেছে। আর তার কারণ আমার উইল...’
তারপর তলস্তোয় তাঁর বোনকে সমস্ত কিছু বলে গেলেন। বললেন তিনি চেয়েছিলেন তাঁর লেখা থেকে যাবতীয় আয় মানুষের কল্যাণে ব্যয় করবেন। তাঁর রচনা হবে স্বত্বমুক্ত, সাধারণ মানুষের। সেই মর্মে একটা উইলও করেছিলেন এবং তখন থেকেই অশান্তির সূত্রপাত। তাই ভগ্নশরীরে পারিবারিক শান্তি বজায় রাখতে তিনি উইল বদল করতে বাধ্য হলেন। ঠিক হ’ল ১৮৮১ সালের আগে অবধি যা যা লিখেছেন তার স্বত্বাধিকারিণী হবে সোফিয়া। জমিদারি তো আগেই স্ত্রীর নামে লিখে দিয়েছিলেন। কিন্তু তা’সত্ত্বেও সোফিয়ার মন পাননি। সন্দেহের বিষ তার মনে সেই যে ঢুকে গেল... বৃদ্ধের উপর স্ত্রীর খবরদারি তো ছিলই, এবার শুরু হ’ল নজরদারি। তার ও সোফিয়ার শোবার ঘরের মাঝে তিনটি দরজা পড়ে। সোফিয়া সেই থেকে প্রত্যেকটি দরজা খুলে রেখে রাতে শুতে যাওয়া শুরু করল। মাঝরাতে তিনি ঘুমিয়ে পড়লে তাঁর ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজত সোফিয়া, খুঁজে দেখত তাকে লুকিয়ে আবার কোনো উইল করেছেন কিনা। একবার হাতেনাতে ধরে ফেলেন তিনি। সোফিয়া অম্লানবদনে বলে তাঁর কিছু দরকার কিনা সেটা দেখতেই এসেছিল। তার একটি গোপন ডায়েরি তিনি একবার তাঁর বুটের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলেন। পরেরদিন দেখেন সেটা সেখানে নেই।
বোনের কাছে নিজের পারিবারিক পরিস্থিতির এইরকম নানা বিবরণ দিয়ে তিনি বললেন—‘আমি জানি আমার কাছের মানুষজনদের কাছে আড্ডার ছলে আমি মহিলাদের সম্পর্কে অনেক বিরূপ মন্তব্য করে ফেলি। তারা আমাকে নারীবিদ্বেষী মনে করে। কিন্তু এত কিছুর পর...’ অল্প থামলেন তলস্তোয়, তারপর আবার বললেন—‘এমনকি মায়ের বা তোমার ভাবমূর্তিও আমাকে স্বান্তনা দিতে অক্ষম।’
তার শেষ কথাগুলো মারিয়ার কানে কেমন খাপছাড়া স্বীকারোক্তি গোছের শোনাল। তিনি এই ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করলেন না। খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—‘ধর্মাচরণই মানুষের সব থেকে বড় সান্তনা। তোমার ধর্মাচরণ তোমার সত্যাশ্রয়। তুমি যা সত্য বলে মনে কর তা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আঁকড়ে থাকার মতো শক্তি যেন ঈশ্বর তোমাকে দেন।’
****
(আগামীকাল সমাপ্য)

আপনার মতামত জানান