মহানিষ্ক্রমণ/অর্ণব মজুমদার

শেষ পর্ব



বোনের সঙ্গে কথা বলে বেশ খানিকটা হালকা বোধ করছিলেন তলস্তোয়। যদিও শরীর অত্যন্ত দুর্বল, জ্বর-জ্বর লাগছিল। আস্তে ধীরে হেঁটে হোটেলে ফিরে এসে শুয়ে পড়লেন তিনি।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর তাঁর জন্য এক চমক অপেক্ষা করছিল।
তিনি ঘুমোচ্ছেন দেখে সাশা ঘরের এককোণে বসে মাকোভিৎস্কির সঙ্গে কথা বলছিল। তাঁকে ঘুম থেকে উঠে বসতে দেখে তাঁর বিছানার পাশে এসে বসল।
--‘বাবামশাই, কেমন আছেন? আমার সবাই অত্যন্ত উদ্বিগ্ন...’ কথাটা না বললেও চলত। তিনি বাড়ি ছেড়ে আসার পর এদের ওপর যে কী ভীষণ ধকল গেছে তা ছোটোমেয়ের মুখ দেখেই আন্দাজ করতে পারলেন তিনি। কাল রাত থেকেই শারীরিকভাবে অত্যন্ত অসুস্থ বোধ করছিলেন তিনি। এবার মনটাও কমজোরি হয়ে পড়ল।
সাশা বাড়ির কথা শুরু করল। কিছু শুনলেন, বেশিরভাগই কানে ঢুকল না তাঁর। তাঁর গৃহত্যাগের সংবাদ পেয়ে উত্তেজিত সোফিয়ার পুকুরে পড়ে যাওয়ার খবরটা শুধু ছুঁয়ে গেল তাকে। তারপর সাশা কয়েকটা চিঠি দিলেন তাঁকে। বাকি ছেলেমেয়েরা চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিগুলো মন দিয়ে পড়লেন, পড়ে কতকটা যেন হতাশই হলেন। আন্দ্রেই আর ইলিয়ার চিঠি এক গতে বাঁধা। দুজনেই মায়ের দিশাহারা অবস্থার কথা জানিয়ে তাঁকে ফিরে আসতে “আদেশ” দিয়েছে বলা যায়। তফাৎ শুধু এই যে তাদের পারিবারিক অশান্তির জন্যে আন্দ্রেই ঠারেঠোরে তাঁকেই দায়ী করেছে, সেই তুলনায় ইলিয়ার ভঙ্গি অনেক মোলায়েম। তবে বড়ছেলে সের্গেইয়ের চিঠিটা পড়ে বড় শান্তি পেলেন তিনি। বড়মেয়ে তাতিয়ানার চিঠির “বন্ধু” সম্বোধন ছুয়ে গেল তাঁর হৃদয়।
বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন তিনি। এতসব কিছুর অভিঘাতে শরীর ও মনের স্পন্দন যেন মেপে নিলেন। মানসিক দৃঢ়তা ফিরে পেলেন যদিও শরীর ভীষণ খারাপ লাগছে। টের পেলেন নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নিতে খুব অসুবিধে হচ্ছে এখন। এই অবস্থায় স্ত্রীকে স্বান্তনা দিয়ে চিঠি লিখলেন। তাকে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে বললেন। অনুরোধ করলেন তাকে যেন মানুষের মতো বাঁচতে দেওয়া হয়। সবশেষে লিখলেন—‘...হয়তো আমাদের একসাথে কাটানো দিনগুলোর চাইতে একলা থাকার দিনগুলোই বেশি মূল্যবান হয়ে উঠবে যদি তার সত্যিকারের মূল্য আমরা উপলব্ধি করতে পারি--’
তারপর থেকেই চঞ্চল হয়ে পড়লেন তলস্তোয়। এবার তিনি চাইছিলেন শামারদিনো ছেড়ে চলে যেতে। সাশাকে বললেন তক্ষুনি গাড়ি জোগাড় করতে। কিন্তু সেদিন তুষারপার হচ্ছিল। সাশা ও মাকোভিৎস্কি একটা অজুহাত পেলেন।
সন্ধেবেলা ভাগ্নী এলিজাভেতা এল তার খোঁজখবর নিতে। মারিয়া অল্প অসুস্থ, তাই নিজে আসতে পারেনি। তাকেও তলস্তোয় সারাক্ষণ ধরে একজন কোচোয়ান খুঁজে দিতে বলে চললেন। উপায়ান্তর না দেখে সাশা লিজার সামনেই বাবাকে কথা দিতে বাধ্য হলেন কাল যদি আবহাওয়া ভালো হয়ে যায় তবে তারা শামারদিনো ছেড়ে চলে যাবে।
পরেরদিন তুষারপাত সত্যিই কমল। তলস্তোয় মহানন্দে সবাইকে ঘুম থেকে তুললেন এবং যাত্রার প্রস্তুতি নিতে বললেন। কাউকে বুঝতে দিলেন না তাঁর ভিতরে কী হচ্ছে।
কিন্তু ট্রেনে উঠে ধরা পড়ে গেলেন। শ্বাসপ্রশ্বাসের কষ্ট তো ছিলই, সেই সঙ্গে সঙ্গে কম্প দিয়ে জ্বর এল। মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিলেন আরেকটু হলেই।
পরের স্টেশন আস্তাপাভায় তিন-চার জনের সাহায্যে গাড়ি থেকে নামানো হ’ল তাকে। ছোট্ট স্টেশনটার স্টেশনমাষ্টারের নাম ইভান ইভানোভিচ ওজোলিন। তলস্তোয়কে দেখে হাঁ হয়ে গেলেন তিনি। তারপর দেরি না করে তলস্তোয়কে নিজের ঘরে নিয়ে আসার অনুরোধ জানালেন। সাশাকে জানালেন ল্যেভ্‌ নিকোলাইয়েভিচকে তিনি কীরকম শ্রদ্ধার চোখে দেখেন এবং এই পরিস্থিতিতে যদি তাদের জন্য কিছু করতে পারেন তাহলে তার জীবন ধন্য হয়ে যাবে।
স্টেশনমাষ্টারের ঘরেই নিয়ে যাওয়া হ’ল তাকে। যদিও গিয়েই শুয়ে পড়লেন না। খানিকক্ষণ চেয়ারে বসে রইলেন। ইতিমধ্যে একটা ছোটোখাটো ভিড় জমে গিয়েছিল তাকে ঘিরে। তারা টুপি খুলে তাকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছিল। এই ব্যাপারটা তিনি বেশ উপভোগ করলেন।
কিন্তু এ’খানে আর কতক্ষণ? স্টেশনের ডাক্তার এসে মরফিয়ার ইঞ্জেকশান দিলেন। সকাল ন’টা নাগাদ শ্বাসপ্রশ্বাস খানিকটা স্বাভাবিক হয়ে আসতেই সাশাকে বললেন—‘এই তো আমি সুস্থ। এবার তাহলে ওঠা যাক।’
সাশা বলল—‘আজকের দিনটা থাক না বাবামশাই।’
--‘বেশ, তাহলে আগামীকাল?’
--‘আমি চাই আরো একটা দিন আপনি বিশ্রাম নিন।’
তলস্তোয় আর কিছু বললেন না। বা বলার সুযোগ পেলেন না। শ্বাসকষ্টটা আবার শুরু হ’ল। বাড়তে লাগল। এইসব সত্ত্বেও চিঠিপত্র লিখতে পারছিলেন, ডায়েরি লিখেছেন। কিন্তু দু’দিন যেতে না যেতেই মাথাটা ঘোলাটে হয়ে আসতে লাগল। চারিপাশের মানুষগুলো চেনা-অচেনার সীমারেখার যাতায়াত করতে শুরু করল...
ল্যেভ্‌ নিকোলাইয়েভিচ তলস্তোয় চৈতন্য হারালেন।
(৩)
--‘ফিওদোর মিখাইলোভিচ, আমি এমন এক আশ্রয়ে যাচ্ছি যেখানে বিরক্তি বলে কিছু নেই। আমাকে একলা হতে দাও।’
দস্তয়েভস্কি বললেন—‘একলা থাকার সময় পরে অনেক পাবে। তার আগে একবার চোখ মেলে তাকাও। দেখো।’
আর কী দেখার আছে বুঝলেন না তিনি। তবু চোখ মেলে তাকালেন তলস্তোয়। চোখের সামনে ভেসে উঠল গত দশদিনের দৃশ্য। সেইসব মিলিয়ে গেলে দেখলেন আশেপাশে কারা যেন এসে দাঁড়িয়েছে। এতক্ষণ চারিপাশের মানুষগুলোকে আবছায়ার মতো দেখাচ্ছিল। কিন্তু এদের বেশ স্পষ্টই দেখতে পেলেন।
দস্তয়েভস্কির গলা শুনতে পেলেন—‘দেখো। এরা সবাই এসেছেন তোমাকে অভ্যর্থনা জানাতে। দেখো...তোমার প্রতি এদের ভালোবাসা অনুভব করো।’
তলস্তোয় প্রত্যেককে চিনতে পারলেন। পুশকিন আর গোগোল—এককোণে দাঁড়িয়ে তার দিকে সগর্বে চেয়ে আছেন। বন্ধুবর তুর্গেনিভকে দেখলেন তাদের থেকে একটু দূরে পানায়েভ, নেক্রাসভ, গ্রিগোরোভিচ, অস্ত্রোভস্কি, গনচারভদের৪ সঙ্গে দাঁড়িয়ে। আর এককোণে দাঁড়িয়ে দাড়িতে হাত বুলোচ্ছে চেখভ। মুখে সেই লাজুক-লাজুক রমণীয় হাসি।
হাসলেন তলস্তোয়। যেন আর কোনো কষ্ট নেই। বললেন—‘সত্যিই—আমার প্রভূত ভালোবাসা এঁদের সবার প্রতি--’
--‘একে দেখলে না!’
আরে এ কে? তলস্তোয়ের মনটা খুশিতে যেন নেচে উঠল। --‘ভারভারা৫ না? তুইও এসেছিস! দুষ্টু মেয়ে!’
তারপর দস্তয়েভস্কির দিকে ফিরে ধীরেধীরে বললেন—‘ধন্যবাদ ফিওদোর মিখাইলোভিচ।’
দস্তয়েভস্কি হাসলেন।
--‘কিন্তু তোমার বইটা... ওটা শেষ করতে পারলাম না।’
দস্তয়েভস্কি হেসে বললেন--‘আমিও যে পারিনি বন্ধু।’
একটা আবছায়া মূর্তি যেন তার পাশে এসে বসল। তাঁর হাতে চুমু খেল। স্পর্শ থেকে বুঝলেন কোনো নারী। উত্তেজিত হয়ে কিছু যেন বলতে চাইছে তাকে।
তলস্তোয় মাথা ঘামালেন না। পরম শান্তিতে চোখ বুজলেন।
================================X=========================== =====


টীকা
১) চিত্রশিল্পী আন্দ্রেই পেত্রোভিচ চার্তকভ—নিকোলাই গোগোলের “প্রতিকৃতি” গল্পের প্রথম পর্বের নায়ক।
২) দুসান পেত্রোভিচ মাকোভিৎস্কি (১৮৬৬ -- ১৯২১)। তলস্তোয়ের ডাক্তার। তার ডায়েরি থেকে তলস্তোয়ের জীবনের শেষ কয়েকদিন সম্পর্কে অনেক তথ্য জানা যায়।
৩) সাশা অর্থাৎ তলস্তোয়ের কনিষ্ঠা কন্যা আলেক্সান্দ্রা (১৮/৭/১৮৮৪ – ২৬/৯/১৯৭৯), জীবিত দশ সন্তানের মধ্যে নবম। ভালোনাম আলেক্সান্দ্র বা আলেক্সান্দ্রা যাই হোক না কেন নারীপুরুষ নির্বিশেষে “সাশা” নামে ডাকা হয়।
৪) তলস্তোয় এবং তুর্গেনিভের মতোই এরা সবাই “সমসাময়িক” (রুশ -- সভ্রিয়েম্নিক) গোষ্ঠীর লেখক। ইভান ইভানোভিচ পানায়েভ (২৭/৩/১৮১২ – ২/৩/১৮৬২) লেখক, সাহিত্য সমালোচক ও “সমসাময়িক” পত্রিকার সম্পাদক। নিকোলাই আলেক্সেইয়েভিচ নেক্রাসভ (১০/১২/১৮২১ – ৮/১/১৮৭৮) কবি, সাহিত্য সমালোচক, প্রকাশক ও “সমসাময়িক” পত্রিকার সহসম্পাদক। দমিত্রি ভাসিলিয়েভিচ গ্রিগোরোভিচ (৩১/৩/১৮২২ – ৩/১/১৯০০) লেখক ও চিত্রশিল্পী। আলেক্সান্দ্র নিকোলাইইয়েভিচ অস্ত্রোভস্কি (১২/৪/১৮২৩ -- ১৪/৬/১৮৮৬) নাট্যকার [“পোক্ত হ’লো ইস্পাত” উপন্যাসের লেখক নিকোলাই আলেক্সিভিচ অস্ত্রোভস্কি (২৯/৯/১৯০৪ – ২২/১২/১৯৩৬) নন]। ইভান আলেক্সাদ্রোভিচ গনচারভ (১৮/৬/১৮১২ – ২৭/৯/১৮৯১) ঔপন্যাসিক।
৫) ভারভারা তলস্তোয়ের এক মৃতা কন্যা, তেরো সন্তানের মধ্যে অষ্টম। ১৮৭৫ সালে জন্ম, ওই বছরেই মৃত।
তথ্যসূত্র
১) তলস্তয় বিশেষসংখ্যা -- জানুয়ারী-মার্চ ২০১০ -- এবং মুশায়েরা
২) টলস্টয় – অন্নদাশঙ্কর রায়, বাণীশিল্প।
৩) লেখকের লেখক দস্তয়েভ্‌স্কি – যজ্ঞেশ্বর রায়, মিত্র ও ঘোষ।
8) রুশ সাহিত্যের ইতিহাস – অরুণ সোম, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি।
৫) যুদ্ধ ও শান্তি – ল্যেভ্‌ তল্‌স্তোয়, রুশ থেকে অনুবাদ – অরুণ সোম। সাহিত্য অকাদেমি।



আপনার মতামত জানান