যেদিকে যায় রাস্তা

অভীক দত্ত

১।
গাড়িটা যখন দ্বিতীয় হুগলী সেতু ক্রস করল কৌশিক ফোনটা অন করল। বিকেলের মধ্যে পৌঁছে যাবার কথা। শনিবার রবিবারগুলি সাধারণত মন্দারমণিতে প্রচুর রাশ থাকে। সে বুকিং করার চেষ্টা করেছিল কয়েকটা জায়গায় কিন্তু কোন জায়গাতেই করে উঠতে পারে নি। সব কটা হোটেলই বলে দিল বুকড আছে। তবু তার বরাবরেরই স্বভাব, সিদ্ধান্ত নেবার পরে আর ভেবে লাভ নেই। এসকরট সার্ভিসে ফোন করে মেয়েটাকে গাড়িতে তুলে বেরিয়ে পড়ল সে।
মেয়ে ঠিক বলা ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছিল না। বউদি বলাটা বেটার হবে হয়ত। কৌশিকের মাথায় এই প্ল্যানটা আগে আসে নি। কালকে রতনদা দিল। রতনদার মাথায় যত আজগুবি প্ল্যান আসে। তার সামনে বিয়ে জানার পর থেকেই প্ল্যানের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। কোনটাই শোনে না সে।
কিন্তু ক্যান্টিনে বসে বার্গার সাঁটাতে সাঁটাতে যখন তাকে চুপি চুপি বলল “ওরে তোর সামনে বিয়ে, একটা চিনিস না জানিস না মেয়ে। শেষ মেষ দেখা গেল কিছুই করতে পারছিস না। তখন কি করবি? আমার কথা শোন, একটা এসকরট ভাড়া করে চলে যা মন্দারমণি। মস্তিও পাবি, আবার বুঝেও যাবি যে আলটিমেটলি তুই টেস্ট প্লেয়ার না ওয়ান ডে”।
সে জিজ্ঞেস করল “এসকরট মানে কি?”
রতনদা তার থুতনি নেড়ে বলল “ওরে আমার নাড়ুগোপাল রে। তোর মত এক্সিকিউটিভদের জন্য তো আর ১০টাকা পার নাইটের সুয়েজ খাল হয়ে যাওয়া মেয়ে চলবে না। তোর স্ট্যাটাসওয়ালা মেয়ে দরকার। প্রচুর রেট। কথা বলে সুখ পাবি। আবার...” একটা ইঙ্গিতপূর্ণ চোখ মারার পর তার কাঁধে একটা থাবড়া মেরে কথাটা আর শেষ করল না রতনদা।
তখনকার মত কথাটা উড়িয়ে দিলেও কৌশিক বাড়ি এসে বেশ খানিকক্ষণ ভেবেছে। রাত ন’টা নাগাদ রতনকে ফোন করে সে। “পথে এসো বাছা” ইত্যাদি বলার পর রতনদাই ব্যবস্থা করে দিল। টাকাটা বড্ড বেশিই লাগছে কিন্তু কৌশিক অন্য চিন্তা করে নি। কলকাতার বাড়িতে সে একাই আছে। বাবা মা বাইরে বেড়াতে গেছে। উইকএন্ডটা মন্দারমণিতে কাটানোটাই মনস্থির করে নিল।
“আপনি ব্রেকফাস্ট করেছেন?”
একটা হালকা সবুজও না অথচ সবুজ রঙের শাড়ি পড়েছে মহিলা।কৌশিক এত রং টং বোঝে না। তার কাছে সবুজই মনে হচ্ছিল রঙটা।
মহিলা কৌশিকের প্রশ্নের উত্তরে হেসে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। আভিজাত্য ঝরে পড়ছে গোটা শরীর থেকে। কৌশিক ঠিক স্বাভাবিক হতে পারছিল না। তার যে মেয়েটার সাথে বিয়ে হবে সেই রুপালী এর কাছে গুণে গুণে পাঁচ গোল খাবে গ্ল্যামারের দিক দিয়ে।
কৌশিক দ্বিতীয় প্রশ্নটা করে ফেলল “আপনি কি ম্যারেড, আপনার নামটা তো ঠিক জানা হল না”।
“রঞ্জনা। হ্যাঁ আমি ম্যারেড আর তুমিটা ঠিক আছে”।
রতনদা বলছিল এরা সব সময় সত্যি কথা বলে না। হতে পারে এই নামটাও হয়ত মিথ্যে করেই বলল। তাতে কৌশিকের অসুবিধা হবে না। একটা নাম তো চাই ডাকার মত।এর অ্যাক্সেন্টে একটা ইংরেজি টান আছে। ইংলিশ মিডিয়াম হয়ত।
গাড়ি সাঁতরাগাছি পেরল। আগের মাসেই কেনা হয়েছে গাড়িটা। এস ইউ ভি। মা বলছিল তারাপীঠ যাবার কথা। তার আগেই মন্দারমণি হয়ে যাচ্ছে। পুজোও দেওয়া হয়নি গাড়িটার এখনও। তার কাছে অবশ্য এগুলি কুসংস্কার ছাড়া কিছু না। কতগুলি ফুল বেল পাতা না দিলে গাড়ি গড়াবে না, এটা একেবারে হাস্যকর কনসেপ্ট তার কাছে।
“ডিড ইউ হ্যাভ সেক্স বিফোর?”
প্রশ্নটা শুনে সামান্য ঘাবড়াল কৌশিক। এটাই প্রথম এই সম্বন্ধীয় কথা। সে বলল “না”।
হাতের আই ফোনটা ঘাটতে ঘাটতে তার দিকে না তাকিয়েই রঞ্জনা জবাব দিল “আমারও সেটাও মনে হচ্ছিল। তা টিউশন দিতে হবে তাইত?”
একটা সাদা রঙের অ্যাম্বাসাডর কিছুতেই সাইড দিতে চাইছে না। সেটাকে হর্নে বিরক্ত করতে করতে কৌশিক জবাব দিল “খানিকটা সেরকমই”।
হাই তুলল রঞ্জনা শব্দ করে। “হু” বলে আবার মোবাইল ঘাটা শুরু করল। গাড়িটা চালাতে খাসা লাগছিল কৌশিকের। কেমন মসৃণভাবে চলে যাওয়া যায়। গান চালিয়ে দিল একটা। লোবোর গান। তার বেশ প্রিয়।
প্রশ্নটা করবে কি করবে না ভাবতে ভাবতে করেই ফেলল সে “আপনার হাসব্যান্ড কি করেন?”
রঞ্জনা তার দিকে তাকিয়ে বলল “সব প্রশ্ন কি এখনি করে ফেলার ইচ্ছা আছে নাকি?”
অপ্রস্তুত হল খানিকটা সে। বলল “এমনি বললাম, কিছু তো বলতে হবে”।
-আমি তো মিথ্যাও বলতে পারি।
-হ্যাঁ তা তো পারেনই।
-দুরকম হতে পারে। তার থেকে একটা বেছে নাও।
-যেমন?
-এক, আমার হাসব্যান্ড অসুস্থ। হিন্দি সিনেমায় যেমন দেখায়। অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার জন্য এই প্রফেশনে নেমেছি। দুই, আমার হাসব্যান্ড বাইরে বাইরে থাকে। আমি পকেটমানি আরন করার জন্য এটা করি।এবার যে কোন একটা বেছে নাও।
কৌশিক মহিলার বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তায় চমৎকৃত হচ্ছিল। মজাও পাচ্ছিল।
সে বলল “থাক, ধরে নিলাম দুটোই”।
রঞ্জনা বলল “বিয়ে কবে?”
সে বলল “সামনেই, দেড় মাস বাদে”।
“এর আগে প্রেম ট্রেম কিছু হয় নি তো?”
“নাহ”।
“বাহ। পিওর ভার্জিন। তা ভারজিনিটি নষ্ট হবে যে”।
কৌশিক উত্তর দিল না। কথার পিঠে কথা জমে যাচ্ছে একের পর এক। সে এবার প্রশ্নকর্তার ভূমিকায় আসার চেষ্টা করল “এই কাজ কবে থেকে করছেন?”
“বললাম তো তুমিটা ঠিক আছে”।
কৌশিক শুধরে নিল “এই কাজ কবে থেকে করছ?”
“বলব কেন?” রঞ্জনার গলায় কৌতুকের সুর।
কৌশিক কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। তাকে বাঁচাতেই যেন ফোনটা বেজে উঠল। সে বলল “একটু চুপ থাকবে, মা ফোন করেছে”।
রঞ্জনা মৃদু হেসে সামনের দিকে তাকাল।
“হ্যাঁ মা, অফিসের কাজে যাচ্ছি, হ্যাঁ... হ্যাঁ... গাড়ি চালাচ্ছি পরে ফোন করছি...”
ফোনটা রাখতেই রঞ্জনা জিজ্ঞেস করল “তোমার উড বি তো একবারও করল না। ফোনে কথা হয় টয় না?”
“হয়, কম। তোমার হাসব্যান্ডও তো ফোন করল না? কথা হয় না?”
জুতমতো একটা প্রশ্ন করতে পেরে খুশি হল কৌশিক। রঞ্জনা কিন্তু মচকাল না। বলল “হয় তো। প্রচুর কথা হয়”।
কৌশিকের মনে হচ্ছিল তার পাশে একটা আস্ত গোলকধাঁধা বসে আছে। যে তার সব কিছুই ধীরে ধীরে জেনে নিচ্ছে অথচ নিজেকে পুরো কুয়াশায় মুড়ে রেখেছে।
সে আবার প্রশ্ন করল “তোমার বিয়ে ক বছর হয়েছে”?
রঞ্জনা একটা সিগারেট বের করল। বলল “এসিটা বন্ধ করে কাঁচটা খুলে দাও প্লিজ”।
কৌশিক বলল “তা না করে আমি বরং গাড়িটা দাঁড় করাচ্ছি। ওটা শেষ হয়ে গেলে তারপর...”
রঞ্জনা সিগারেটটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দিল। বলল “নাহ। ঠিক আছে”।
গলায় সামান্য বিরক্তির ছোঁয়াচ টের পেল কৌশিক।
সে পাত্তা দিল না। নিজেকে মালিক ভাবতে চেষ্টা করল। টাকা দিয়ে একটা মেয়েকে নিয়ে এসছে তাকে প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশি ভাও দেওয়া হয়ে যাচ্ছে সে বুঝতে পারছিল।তার অন্য একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। ওই দিকের লেন দিয়ে কোন গাড়ি কলকাতামুখী হচ্ছে না। ব্যাপারটা বুঝতে পারছিল না সে।
খানিক এগোতেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হল। লাইন দিয়ে সার সার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। বিরাট জ্যাম সামনে। অগত্যা তাকেও দাঁড়াতে হল।
একটা লরি এক পথচারীকে মেরে বেরিয়ে গেছে। এলাকার লোক “শান্তিপূর্ণ” অবরোধ করেছে।
কাঁচ খুলে দিয়ে রঞ্জনার দিকে তাকিয়ে বলল “এবার সিগারেটটা ধরানো যেতে পারে, আমাকেও একটা দিও”।
রঞ্জনা আবার হাসল। ব্যাগ খুলে সিগারেট বের করল। সিগারেটটা ধরাতেই আবার ফোনটা বেজে উঠল। নম্বরটা দেখে কৌশিক একটু চমকেই গেল। রূপালী।
#
বাকি সব গাড়ির সাথে কৌশিকের এস ইউ ভিটা প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে জ্যাম থেকে ছাড়া পেল। সামনের কাঁচ ভাঙা লরি পেরিয়ে আরও খানিকটা গিয়ে গতি নিল গাড়িটা। রঞ্জনা মোবাইলটা নিয়ে খুট খুট করে যাচ্ছে। কৌশিক একবার আড়চোখে দেখল। ক্যান্ডি ক্রাশ। এই খেলাটা রূপালীও খেলে। তাদের বসও খেলেন। মিটিংয়ের মাঝে একবার মোবাইলটা টেবিলের উপর রাখা ছিল। পরিষ্কার দেখতে পেয়েছিল কৌশিক। সে ক্যান্ডি ক্রাশ খেলতে পারে না। তবে এই মুহূর্তে রঞ্জনাকে খেলতে দেখে তার মনে হল একদিন খেলে দেখা যেতেই পারে।
“চার বছর”। মোবাইল থেকে মাথাটা না তুলেই বলল রঞ্জনা।
“কি?” চমকাল খানিকটা সে।
“আমার বিয়ে হয়েছে”।
“এতক্ষণ প্রশ্নটা মনে ছিল?” অবাক হওয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিল না তার।
“রবি ঠাকুর নেই?” আবার প্রসঙ্গান্তরে গেল রঞ্জনা।
“গান?”
“হু”।
“আছে বোধহয়’’।
“পারলে দাও, ভাল লাগবে”।
“তুমিই কর, এই যে সিডিগুলি’’।
বেশ খানিকক্ষণ নাড়া ঘাটা করার পর একটা সিডি পছন্দ হল। “এইটা দাও”।
“ওকে”।
“কোলাঘাটে দাঁড়ানো যায়?”
“কেন?”
“হাগিস আনিনি যে”।
হেসে ফেলল কৌশিক। কথায় এর সাথে পারা যাবে না বোঝাই যাচ্ছে।
“সরি। বুঝতে পারি নি”।
“বুঝেছি, বলে বোঝাতে হবে না”।
“কোলাঘাটে তাহলে কিছু খেয়েও নিতে হবে, ওখান থেকে তো বেশ দূর, মাঝে কিছু খাবার জায়গাও তো নেই”।
“আছে, কোলাঘাটের বেশ খানিকটা পরে হাইওয়ের ওপরেই লজিং ফুডিং দুইই আছে, ওখানে নাইট স্টেও হয়, বেশ ভাল কিছু হোটেল আছে”।
“ওখানে?” কৌশিক ইতস্তত ভাবে বলল।
“অনেকেই যায়, রাস্তায় কিছুক্ষণ পর আমায় দেখে লোভ সামলাতে পারে না যারা, ইমপেশেন্ট হয়ে যায় আর কি”। শব্দ করে হাসল রঞ্জনা।
এবার একটু অস্বস্তি হল কৌশিকের। কিছুটা দ্বিধা ছিল শুরু থেকেই। অস্বস্তিটা কাটাতে সে কথা ঘুরাতে চাইল “মন্দারমণিতে হোটেল না পেলে কি করা যেতে পারে?”
রঞ্জনা উত্তর না দিয়ে ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে’র সাথে গলা মেলাল।
গলা বেশ ভাল। কৌশিক আর কোন কথা বলল না।

২।
বন্ধুরা এলে রূপার খারাপ লাগে না কিন্তু আজকে একটা চোরা টেনশন কাজ করছে তার। অবশ্য যেদিন থেকে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে সেদিন থেকেই এটা তার পিছু নিয়েছে। মাঝরাতে হঠাৎ হোয়াটস অ্যাপের মেসেজ টোন শুনতে পেলে ঘুমের মধ্যেও তার বুকটা ধক করে ওঠে। এই বুঝি কোন উদ্ভট প্রশ্ন করে বসল কৌশিক আর সে উত্তর দিতে পারবে না।
বরাবরই উল্টো পালটা কথা বলা পৃথার বদভ্যাস। তার ঘরে ঢুকেই ওর প্রথম প্রশ্ন ছিল “কিরে বিয়ের আগে জায়গামত হাত পড়েছে?”
পৃথার কথায় রূপা একবার হেসেই গম্ভীর হয়ে গেল।
তার মুডটা ঠিক লাগছিল না। একবার ফোন ধরলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয় কে জানে। সে মুখ গোমড়া করে রইল।
ভাস্বতী তার বেস্ট ফ্রেন্ড, সেই ক্লাস ওয়ান থেকে। সে বলল “কি ব্যাপার বলত? ঝগড়া টগরা করেছিস নাকি?”
রূপা হাসার চেষ্টা করল, “ধুস, সে সব কিছু না, ও এমনি”।
ভাস্বতী তবু ছাড়ল না “আরে বলই না কি হয়েছে”।
রূপা মাথা নাড়ল, “আরে বলছি তো নট সো সিরিয়াস”।
ভাস্বতী হাসল “দেন হোয়াই সো সিরিয়াস?”
রূপা বলল “আরে ওসব কিছু না, তোর কথা বল, পুস্পেন্দু কি বলছে?”
ভাস্বতী উত্তর দেবার আগেই পৃথা বলল “কি আর বলবে, ওরা বলে কম, ওদের থিম হল কর্মই ধর্ম”।
এবার হেসে ফেলল রূপা। ভাস্বতীও হাসল, বলল “এই তুই থামবি? শুধু ওই সব কথা তোর,না?”
পৃথা চোখ মারল “সত্যি কথা ফাঁস হল বল?”
ভাস্বতী ওকে কাটানোর চেষ্টা করল। বলল “ছাড় যত ভুল ভাল বকা, তোরা কাল দুপুরে আমাদের বাড়ি আসিস, মা তোকে আইবুড়ো ভাত খাওয়াবে বলেছে, আর পৃথা আপনিও যাবেন প্লিজ”।
পৃথা জিভ কাটল “এহ, আমিও ভুলে মেরে দিয়েছিলাম, তোরা একটা দিন ফিক্স কর, দেখ যেদিন সুবিধা হয়, গড়িয়াহাট যাব, প্রচুর শপিং বাকি তো”।
মা এসে বসল তাদের সাথে। পৃথার কথার শেষটা শুনতে পেয়েই হয়ত বলল “বেশ কিছু গয়না বাকি আছে এখনও কিনতে, কালকে বেরব ভাবছি, তোরা যাবি কি?”
দুজনেই হই হই করে উঠল ওরা। রূপা বারান্দায় বেরিয়ে এল, আরেকবার ট্রাই করল কৌশিকের ফোন, এবার নট রিচেবল বলছে। সে ঠিক করল আর ফোন করবে না, দেখাই যাক কখন করেন উনি। কাল রাতে একবার বলেছিল বটে অফিসের কাজে বাইরে যাবে, হয়ত সে ব্যাপারেই কোথাও গেছে, তবে একবার কি ফোন করা যেত না সকালে? পাকা কথার পরের দিন থেকে তো বেশ কয়েকবার ফোন করেছিল, ইদানীং তো সকাল সন্ধ্যা নিয়মিত হয়ে গেছে ব্যাপারটা। একবার ভাববে না, যে তার চিন্তা হতে পারে! অভিমান হল তার। ফোনটা অফ করে দিল সে। মরুক গে। এবার কোন টেনশন নেবে না। ও যদি ফোন না করে তবে সেও আর করবে না।
#
মন খারাপ হলে রূপা জ্যেঠুর ঘরে গিয়ে বসে। আগের মাসে রূপার জ্যেঠু প্রিয়তোষবাবু রিটায়ার করেছেন ব্যাঙ্কের চাকরি থেকে।তিনি অকৃতদার। প্রিয়তোষবাবু নাকি জীবনে একবারই মেয়ে দেখতে গেছিলেন বিয়ের জন্য। পাত্রীকে জিজ্ঞেস করে বসেন ফিক্সড ডিপোজিট লাভজনক নাকি রেকারিং। পাত্রী বলতে না পারায় সেই যে তার মোহভঙ্গ হল, তারপর আর কোনদিন বিয়ের কথা উচ্চারণ করেননি। প্রিয়তোষবাবুর মা বাবা তাদের কম বয়সে মারা যান বলে জোর করার লোকের অভাব ছিল। রূপার মা বাবা চেষ্টা করেছিলেন কয়েকবার কিন্তু ওই একবার ছাড়া কোনবারই পাত্রী দেখতে নিয়ে যেতে পারেননি। এখন তাঁর কাজ বলতে সারাদিন সি এন বি সি খুলে বসে থাকা। তিনি সাধারণ খবরের কাগজ পড়েন না।তাঁর পাঠ্য দুটি সংবাদপত্র হল ইকোনমিক টাইমস আর বিজনেস এক্সপ্রেস। নিজেই বলেন টাকা পয়সার হিসেব করতে করতে কখন যে জড় পদার্থ হয়ে গেছেন জানেন না।
রূপা সব কথা তাঁর জ্যেঠুকে বলে। আসলে জ্যেঠুকে কিছু বলা মানে গাছকে বলা। কাগজ পড়তে পড়তে কিম্বা টিভি দেখতে দেখতে তিনি সব শোনেন। কোন মন্তব্যও করেন না। কাউকে কিছু বলেনও না। অথচ রূপা জানে তার জ্যেঠু তাকে সব থেকে বেশি ভালবাসেন। তার যখন ছোটবেলায় জ্বর হত তখন সব থেকে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তেন জ্যেঠু। বাড়িশুদ্ধ লোককে অস্থির করে দিতেন।
ধীরে ধীরে সে যখন বড় হয়েছে তখন থেকেই জ্যেঠুকে সব কথা বলত। জ্যেঠু কোনদিনই মতামত দেন না। শুধু চুপ চাপ শুনে যান। মাঝে মাঝে দুয়েকটা প্রশ্ন করেন।
ঘরে ঢুকতেই সে দেখতে পেল যথারীতি টিভি চলছে আর প্রিয়তোষবাবু নিবিষ্ট মনে কাগজ পড়ে যাচ্ছেন। সে ঘরে ঢুকতেই তিনি বলে উঠলেন “পি এস কেমিক্যালসটা বিচ্ছিরিভাবে ফল করছে, কি যে করি”।
সে চুপচাপ বসল। প্রিয়তোষবাবু থামলেন না “এস আর বি ব্যাঙ্কটাও দেখ পড়ছে। পি ফার্মাসিউটিকলসটা বরং একটু হাই আছে। দেখব না বেঁচে দেব? কি বলিস?”
রূপা সে কথার উত্তর না দিয়ে বলল “সকাল থেকে ফোন ধরছে না”।
প্রিয়তোষবাবু কাগজ থেকে মুখ না তুলেই প্রশ্ন করলেন “কৌশিক?”
রূপা বলল “হু”।
-করবে ঠিকই, বিজি আছে হয়ত।
রূপা বলল “আমার কেন জানি না মনে হয় জ্যেঠু এই বিয়েটা হবে না, তুমি দেখে নিও”।
প্রিয়তোষবাবু এ কথার কোন জবাব দিলেন না।
রূপা বলল “যেদিন থেকে বিয়েটা ঠিক হয়েছে, সেদিন থেকেই আমার মনে হচ্ছে এই বিয়েটা হবে না, কিছুতেই হবে না। কিছু না কিছু একটা ঘটবে যেটা এই বিয়েটা হতে দেবে না”।
বিজ্ঞাপন শুরু হওয়ায় প্রিয়তোষবাবু চ্যানেল চেঞ্জ করলেন। জি বিজনেসেও বিজ্ঞাপন। আরও কয়েকটা চ্যানেলে ঘুরে ফিরে বেজার হয়ে রিমোটটা কাগজের উপর রাখলেন।
রূপা চুপ করে থাকল। প্রিয়তোষবাবু এবার মোবাইল বের করে ব্যস্ত হয়ে কাকে ফোন করলেন, ওদিক থেকে রিসিভ হতেই বলে চললেন “হ্যাঁ রে বিশু, তুই কি পি এন ফার্মা রাখবি না ঝেড়ে দিবি?
...
না আমি কিন্তু ঝাড়ছি না, আরও বাড়ুক... হ্যাঁ পারলে রাখ, ওটা কখন কি খেল দেখাবে ঠিক নেই, বাডিং কোম্পানি, বলা যায় না কি থেকে কি হয়ে গেল তখন হাত কামড়াতে হবে... রেখে দে শালা পরে দেখা যাবে...”
ফোনটা কেটে আবার টিভি দেখতে থাকলেন। রূপা বলল “ আমি তোমার মত সারাজীবন বিয়ে না করে থাকতে পারি না?”
প্রিয়তোষবাবু মোবাইলে গেম খেলা শুরু করলেন।
রূপা বলল “রাতে পরোটা আর চিকেন খাবে?”
প্রিয়তোষ এবার কথা বললেন,মোবাইল থেকে অবশ্য চোখ তুললেন না “তুই রাঁধবি?”
রূপা বলল “হ্যাঁ”।
প্রিয়তোষ উৎসাহিত গলায় বললেন “রাঁধ। ঝাল বেশি দিবি চিকেনে, বহুদিন ঝাল কিছু খাওয়া হচ্ছে না। ঝাল খেলে শরীর ভাল থাকে আমার। এই স্টু করবি না কিন্তু, আমি মোটেও পেটরোগা নই”।
রূপা এবার একটু হাসল।

৩।
“মাছ না মাংস?” হোটেলের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে প্রথম প্রশ্ন করল কৌশিক। রঞ্জনা বলল “ওয়াশ রুম থেকে এসে বলছি”।
রঞ্জনা ওয়াশরুমে ঢুকলে মোবাইলটা চেক করল কৌশিক। বেশ কয়েকটা মিসড কল। এস এম এস ও কয়েকটা। সে বুঝতে পারছিল না কি করবে। মিথ্যে কথা বলাটা তার কোন কালেই পছন্দ নয়। সকাল থেকে বেশ কিছু মিথ্যা বলতে হয়েছে। হোটেলের রিসেপশনেও। রূপালী এস এম এস করেছে। “khub busy na thakle phone koro”.
রূপালীর সাথে আজ আর কথা বলতে ইচ্ছা করছিল না তার। সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টা বেজে গেছে। অনেক ভেবে চিন্তে ফোনটা আবার মৃত করে ফেলল সে। বহির্বিশ্ব যোগাযোগ রাখলে তার কাজটা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে যাবে।
এখন পাওয়ার কাট চলছে। আটটায় পাওয়ার আসবে বলেছে। জেনারেটর বন্ধ রাখে নাকি এরা সকাল বিকেল দু ঘণ্টা করে। কোলাঘাটের পর থেকে বাকি জার্নিটা টেনশনে কেটেছে তার। একে টায়ার্ড লাগছিল। তার উপর হোটেল পাবে নাকি সে ব্যাপারটাও ছিল। এসে দেখা গেল কপালজোরে তার জন্যই এই হোটেলে যেন একটা হানিমুন স্যুট রাখা ছিল।
খুব একটা গরম না লাগলেও পাওয়ার আসার অপেক্ষা করছিল সে। মোমবাতির আলোয় কেমন আবছা লাগছে সবকিছু। এমন আবছা পরিবেশ তার পছন্দ না। সব সময় উজ্জ্বল আলোয় থাকলে সে স্বচ্ছন্দ বোধ করে।
বেশ খানিকক্ষণ পরে ওয়াশরুম থেকে বেরল রঞ্জনা। ফ্রেশ লাগছে। কৌশিকের অস্বস্তি বোধটা আবার ফিরে এল। রঞ্জনা তাকে দেখে কাঁধ ঝাঁকাল “কি করবে বুঝতে পারছ না বুঝি? নাও যা করার কর! অল ইজ ইয়োরস”!
কৌশিক কথা ঘোরানোর চেষ্টা করল “মাছ না মাংস বললে না যে?”
রঞ্জনা চুল মুছতে মুছতে বলল “শুধু শুধু? একটু হুইস্কি হলে হত না?”
রঞ্জনার কথায় কৌশিকের মনে পড়ল কালকে রাতেই একটা দামি স্কচ কেনা হয়েছিল। তার ব্যাগেই আছে। বের করল সে তড়িঘড়ি করে। তারপর বিজয়ীর ভঙ্গিতে দেখাল সেটা।
রঞ্জনা এবার বসল খাটে, বলল “বাহ, ভাল জুগাড়ু তো তুমি! কিছু দিয়ে খেতে হবে তো? আমি অবশ্য মাছ ভাজা প্রেফার করব। তুমি?”
কৌশিক বলল “তাই হোক, মাছ ভাজা বলে দিই তাহলে, আর ডিনারে তাহলে চিকেন খাওয়া যাবে”।
রঞ্জনা ঘাড় নাড়ল “নট ব্যাড”।
বেশ কিছুক্ষণের মধ্যেই সব ব্যবস্থা হয়ে গেল। সিগারেট, স্কচ আর সুন্দরীর সাহচর্যে কৌশিকের খারাপ লাগছিল না। বেশ খানিকক্ষণ চুপ থাকার পর রঞ্জনা সিগারেটে লম্বা টান মেরে বলল “এই যে গুচ্ছ টাকা খরচা করে আমাকে নিয়ে এলে তা কিছু করবে টরবে তো? তোমাকে দেখে আমার এইট্টিজের শেখর সুমনের একটা সিনেমার কথা মনে পড়ছে। অবশ্য তুমি একা না, তোমার মত অনেকেই আছে। হঠাৎ ভদ্র হয়ে গেল এসে। প্রেম প্রেম দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকানো। যেন আমি প্রেম করতে এসছি”।
স্কচটা কৌশিককে সাহসী করে তুলছিল ধীরে ধীরে। সে বলল “প্রেম করতে এলে তোমাকে আনতাম না”।
তার দিকে ঝুঁকে পড়ে রঞ্জনা বলল “কাকে আনতে? উড বি কে?”
সে প্রশ্নটা কাটিয়ে দিল। বলল “একটা গান কর”।
রঞ্জনা বলল “গান গাইতে পারি। কিন্তু নাচতে বোল না প্লিজ, খ্যামটা নাচটা আমার ঠিক আসে না”।
হঠাৎ করে কৌশিকের মনে হল বলে, খ্যামটা নাচতেই তো এসেছ, কিন্তু সে কথাটা বলল না। মুখে বলল “সেটা তো বলিনি। গান গাও, গাড়িতে যেটা গাইছিলে সেটাই গাও না হয়”।
রঞ্জনা জোরে হেসে উঠল, বলল “এরপর নিশ্চয়ই অন্ত্যাক্ষরী খেলবে। তুমি আ দিয়ে গান করবে আমি ন দিয়ে। হা হা হা। এরপর তুমি তাস বের করবে, আমরা রং মিলান্তি খেলব। তারপর তোমাকে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াব। হা হা”।
আবছা অন্ধকার, স্কচ, সিগারেট, রঞ্জনা সব একসাথে রি অ্যাকশান করছিল কৌশিকের মাথায়। সে খানিকটা বেপরোয়া হয়েই রঞ্জনাকে কাছে টানল। নারী শরীর তার কাছে অপরিচিত।এত কাছে কোন মেয়েকেই সে পায়নি। গায়ের সাথে লেগে থাকা রঞ্জনার শরীরটা তাকে মোহগ্রস্থ করে তুলছিল। রঞ্জনা বলল “আঁতে লাগল নাকি কথাটা?”
তার চোখ গেল রঞ্জনার কপালের দিকে। সিঁথির শুরুতে খুব হালকা করে একটা লাল দাগটানা। কৌশিক খানিকক্ষণ সেটা দেখে ধীরে ধীর হাতের জোর আলগা করল। বলল “তোমার হাসব্যান্ড জানে তুমি এসব কর?”
রঞ্জনা আরেকটা সিগারেট ধরাল। বলল “জানে হয়ত, কি আসে যায় তাতে?”
নেশাটা কৌশিককে অধৈর্যও করছিল, সে বলল “তুমি এত হেঁয়ালি করে কথা বল কেন? অবশ্য তোমার সম্পর্কে জেনেই বা আমার কি আসবে যাবে!”
রঞ্জনা তার কাঁধে একটা হাত রাখল “রাইট। তুমি আমাকে নিয়ে এসেছ, আমার সাথে শোবে, তার জন্য আমাকে একটা ভাল অ্যামাউন্টের টাকা দেবে, আমি আমার পথে, তুমি তোমার। এখানে আমার বর কি করে জেনে কি লাভ?”
রঞ্জনার কথাকে সমর্থন জানাতেই যেন ঘরটা আলোয় ভর্তি হয়ে গেল। কৌশিক পেগটা এক চুমুকে শেষ করে বলল “বাঁচা গেছে”। রঞ্জনা হাসল। ব্যঙ্গের হাসি। বলল “বাঁচা গেল?”
কৌশিক নিজেকে বাঁচাতে চাইল “অন্ধকার আমার ঠিক সহ্য হয় না”।
রঞ্জনা “হু” করল একটা। তারপর বল “মাছটা কিন্তু বেশ ভাল। রাতে চিকেন না খেয়ে মাছ খাওয়া যায় না?”
কৌশিক মেনে নিল “অ্যাজ ইয়ু উইশ”।
বেশ খানিকক্ষণ কেউ কোন কথা বলল না। চুপচাপ সিগারেট খেয়ে যেতে লাগল। প্রায় মিনিট পনেরো বাদে নীরবতা ভাঙল রঞ্জনা “আমার হাজব্যান্ড জানলে কি হবে জানি না, তবে তোমার বউ যদি জানতে পারে তাহলে কি হবে?”
কৌশিক জোর দিয়ে বলল “জানবে না, কিছুতেই জানবে না। আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেব”।
রঞ্জনা উঠল, খাটের পাশে পায়চারি করতে করতে বলল “ম্যানেজের ওপরেই তো চলছে সব, ম্যানেজ মানে কি তবে? মিথ্যা কথা বলা?”
কৌশিক বিরক্ত হল, “উফ, তুমি কি ফিলোজফার?”
রঞ্জনা দাঁড়িয়ে পড়ল।তারপর তার চোখে চোখ রেখে বলল “না আমি বেশ্যা।ডু ইউ হ্যাভ এনি ডাউট?”
কৌশিককে অপ্রস্তুত হতে হল। বলল “এসকরট আর বেশ্যার মধ্যে ডিফারেন্স আছে”।
রঞ্জনা হাসল শব্দ করে। তারপর আবার পায়চারি শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে বলল “কি ডিফারেন্স? বেশ্যারা কমদামী ব্লাউস পরে আর এসকরটরা দামি লিঙ্গারি? হ্যাঁ, একটা কথা বলতে পার, অ্যাট দ্য এন্ড অফ জার্নি এসকরটরা বাড়ি ফেরে। কিন্তু বাড়ি মানে কি? সেটা কোথায়?”
হঠাৎ করে এতগুলো কথায় কৌশিক থতমত খেয়ে গেল। বলল “আমি এতসব জানি না”।
রঞ্জনা সিগারেট ধরাল আবার, একটা লম্বা টান দিয়ে বলল “হু। সবাই তো আর তোমার মত খোকাবাবু নয়, গাড়ি থেকেই কেউ কেউ বুকে হাত দেওয়া শুরু করে। তা তুমি কি করবে বল তো? সিরিয়াসলি বল! এখনও ইনডিশিসনে ভুগছ?”
কৌশিক চুপচাপ বসে থাকল কিছুক্ষণ। রঞ্জনা আর কোন কথা বলল না, সিগারেট খেতে খেতে পায়চারি করতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ পর কৌশিক বলল “চল”।
রঞ্জনা অবাক চোখে তাকাল। বলল “কোথায়?”
কৌশিক বলল “ফিরে যাই”।
-“এত রাতে?”
কৌশিক ঘড়ি দেখল “কত রাত আর? আটটা কুড়ি সবে”।
রঞ্জনা বলল “ফিরে যাবে? এর চাইতে আরও দূরে কোথাও গেলে হত না?”
কৌশিক হাসল এবার, বলল “তুমি সত্যিই ফিলোজফার, বেশ্যা না”!

৪।
বেশ কয়েকদিন পরে প্রিয়তোষ বেরোলেন। ব্যাঙ্কে কিছু কাজ ছিল। যদিও সেটা না গেলেও হত, তবে ঘরে থাকতে ইচ্ছা করছিল না তার।
ব্যাঙ্কের কাজ সেরে বেরতে গিয়ে সোমনাথের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল তার। একই পাড়ায় থাকেন তারা অথচ বহুদিন দেখা সাক্ষাৎ নেই। সোমনাথ অবশ্য বাইরে ছিল বহুদিন। ক’দিন আগে শুনেছিলেন বটে সোমনাথ ফিরেছে, তবে দেখা করতে যান নি। আজকাল সব কিছু থেকেই আগ্রহহীন হয়ে পড়ছেন তিনি।
তাকে দেখে অবশ্য সোমনাথই এগিয়ে এল, “কি রে? তুই বেঁচে আছিস? আমি ভাবলাম বোধ হয় টপকে গেছিস! বাঙালির তো আবার বাতের ব্যথা আর হার্টের মহামারি লেগেই আছে, তার উপর তোর বয়সে”।
প্রিয়তোষ হেসে ফেললেন “তা তুই কি ব্রিটিশ নাকি শালা?”
সোমনাথ প্রিয়তোষের ভুঁড়িতে একটা কিল মেরে বললেন “এই মধ্যপ্রদেশটি তো নেই রে পাগলা। এখনও মর্নিং ওয়াক করি, নিয়মিত এক্সারসাইজ করি, নো সুগার, নো প্রেশার। তবে? ব্যতিক্রমী বাঙালি নই বলছিস?”
প্রিয়তোষ বললেন “তা বটে, তাছাড়া তোর মধ্যে একটা পরিবর্তনও দেখছি। বেশ বিদেশি বিদেশি ভাব আছে, শরীরটাও ভাল মেন্টেন করছিস, নট ব্যাড!”
সোমনাথ প্রিয়তোষের আপাদমস্তক দেখলেন একবার ভাল করে, তারপর বললেন “তবে তোরও কিন্তু ফিগারটা খুব একটা খারাপ না যা বুঝছি, প্রেশার সুগার নেই নিশ্চয়ই?”
প্রিয়তোষ বললেন “আছে, সামান্য প্রেশার, তবে এবার দুটোই ধরতে পারে, রিটায়ারমেন্টের পর খুব একটা বেরনো হয় না, সারাদিন ঘরেই টিভি দেখি”।
সোমনাথ এবার একটু ব্যস্ত হলেন “দাঁড়া, আজ তোকে ছাড়ছি না, তোর কি ব্যাঙ্কের কাজটা হয়ে গেছে?”
প্রিয়তোষ বললেন “হ্যাঁ, এই তো, কেন বলতো?”
সোমনাথ বললেন “তাহলে একটা কাজ কর, একটু বস, আমি ম্যানেজারের সঙ্গে একটু কথা বলে আসি”।
প্রিয়তোষ ‘হ্যাঁ’ বলতে সোমনাথ ম্যানেজারের চেম্বারের দিকে এগোলেন। তিনি একটা চেয়ারে বসলেন। ব্যস্ত ব্যাঙ্ক। তবে প্রাইভেট বলে একটা শৃঙ্খলার ছাপ রয়েছে। নিজে সরকারি ব্যাঙ্কে ছিলেন। কিন্তু রিটায়ারমেন্টের পরে ইচ্ছা করেই প্রাইভেট ব্যাঙ্কের মাধ্যমে ট্রানজাকশান করেন। তেমন সমস্যা হলে এরা বাড়িতে চলে আসে, সরকারি ব্যাঙ্কে এই সুবিধাগুলি পাওয়া যায় না খুব একটা।
কাউন্টারে সবাই ব্যস্ত সমস্ত হয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তার বন্ধু অম্বরীশের মেয়ে পিয়ালিকেও দেখতে পেলেন।রাস্তা ঘাটে দেখা হলে এসে কথা বলে, অথচ এখানে বোঝাই যাচ্ছে মেয়েটার চোখ তুলে তাকাবারও সময় নেই। প্রচণ্ড ব্যস্ত। লম্বা লাইন সামলাচ্ছে একদিকে, অতগুলো টাকা গুনে যাচ্ছে ঠিক করে, একই সাথে কমপিউটারে গতিতে কাজ করে যাচ্ছে, নাহ! এ প্রজন্ম সত্যিই এখন জেট গতিতে চলছে। এত গতির সাথে পাল্লা দেওয়া সত্যি কঠিন। এই সময়টা দেখে যাবার, তাদের আর কিছু করার নেই এখন। একটা টেবিলে সেলসের দুটো ছেলে বসে ক্লায়েন্ট মিট করে যাচ্ছে। কোন রকম বিরক্তি প্রকাশ না করে একের পর এক ক্লায়েন্ট কে বুঝিয়ে যাচ্ছে, তাদের টার্গেট মিট করার ব্যাপার আছে, প্রত্যেকে যেন কাঁধে করে একটা হিমালয় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে অথচ মুখ থেকে হাসি সরছে না। কেউ যেন এঁকে দিয়ে গেছে এদের হাসিটা।
বেশ কিছুক্ষণ পর সোমনাথ বেরিয়ে এল। প্রিয়তোষ উঠে দাঁড়ালেন, সোমনাথ বলল “চ এবার কোথাও গিয়ে বসি”।
প্রিয়তোষ আপত্তি করতে গেলেন “আবার কোথায়?”
সোমনাথ বললেন “আরে চ’ না, এতদিন পর দেখা, তাছাড়া এখন বাড়ি গিয়ে আমার কোন কাজও নেই করার মত”।
অগত্যা তাকে মেনে নিতে হল।
সোমনাথের গাড়ি খানা বেশ বড়। দামি গাড়ি। প্রিয়তোষের এতদিন বাদে একটা গাড়ি কিনতে ইচ্ছা করল। কিনলে রূপার বিয়ের আগেই কিনতে হবে। মেয়েটা শ্বশুরবাড়ি যাবার আগে গাড়িটা দেখে গেলে ভাল হয়।
গাড়িতে উঠে সোমনাথ ড্রাইভারকে বলে দিল কোন ভাল বারে নিয়ে যেতে। প্রিয়তোষ আর আপত্তি করলেন না। যেন অনেকক্ষণ পর মনে পড়ল সেভাবেই সোমনাথকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি “তোর একটা ছেলে ছিল না? সে কি এখানেই...?”
সোমনাথ মাথা নাড়লেন , “না না, ও তো স্টেটসে সেটল হয়ে গেছে প্রায় তিন বছর হল, অবশ্য বাঙালি মেয়েই বিয়ে দিয়েছি, তুই তো বিয়েতেও এসেছিলি, বছর পাঁচেক আগে, ভুলে গেলি নাকি?”
প্রিয়তোষ বললেন “না মনে আছে, তবে এখানে আছে না বাইরে আছে জানতাম না, আসলে আজকাল বেরই না একদম”।
সোমনাথ বললেন “কেন বেরোস না? এভাবে ঘরে বসে থেকে কি লাভ? বেরবি, হাঁটবি, এখন তো আনন্দ করার সময় রে। আমি তো দু মাস পর ওয়ার্ল্ড ট্যুরে বেরব ভাবছি। টাকা নিয়ে স্বর্গে যাব নাকি?”
সোমনাথের সঙ্গ বেশ ভাল লাগছিল প্রিয়তোষের। তবে নিজেকে ডিফেন্ড করলেন তিনি “ও বাবা, ওয়ার্ল্ড ট্যুর করলে ফতুর হয়ে যাব তো!”
সোমনাথ তার কাঁধে একটা চাপড় মারলেন “একা তো পাবলিক একটা। কত খরচ তোর? ছেড়ে দে, আচ্ছা ওয়ার্ল্ড ট্যুর না যাস, একা একা ইন্ডিয়া ট্যুরে তো বেরতে পারিস! ঘরে বসে বসে মাস্টারবেট করে জীবনটা কাটিয়ে দিলি। স্ট্রেঞ্জ!”
শেষ কথাটা তাকে খানিকটা লজ্জায় ফেলে দিল, বললেন “ধুর, কি সব বলছিস, ভীমরতিতে ধরল নাকি!”
একটা বেশ বড় বারে এসে বসলেন তারা। দুটো দামি বিয়ারের অর্ডার করে সোমনাথ বললেন “ আরে ভাই যখন মরবি উপরে গিয়ে কি জবাব দিবি? সারাজীবন টাকা গুণে কাটিয়ে দিয়েছিস?”
প্রিয়তোষ হাসলেন, বললেন “জানি না কি বলব, তবে এখন আর এসব নিয়ে কথা বলতে ভাল লাগে না”।
হতাশ ভঙ্গিতে চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিলেন সোমনাথ, পাঁচ সেকেন্ড সেভাবে থেকে আবার সামনের দিকে ঝুঁকে বললেন “ওদেশে এই বয়সে যৌবন শুরু হয়, আর এখানে তোরা সন্ন্যাস নিয়ে নিয়েছিস। তোর মনে আছে ওই ক্লাবের মাঠটায় কি ফুটবলটাই না খেলা হত! কাঁদায় মাখামাখি করে বাড়ি ফিরতাম যখন কেউ চিনতে পারত না কোনটা কে! এখন তো পাড়ার মাঠটা ফাঁকা পড়ে থাকতে দেখি। ছেলেগুলি সারাদিন মোবাইলে খেলে যাচ্ছে। এদের তো আরও আগে জরা গ্রাস করে যাচ্ছে। শিশির কি ফুটবল খেলত মনে আছে? ওই ব্যাকভলি! আর ওর ছেলেকে কালকে দেখলাম। মিনিমাম একশো কুড়ি কিলো ওজন হবে। কিরকম একটা জড়ভরত টাইম। ওকে বললাম ছেলে খেলা ধুলো করে? বলল খেলে, ফুটবল, তবে প্লে স্টেশনে! এ কি যুগ এল ভাই?”
প্রিয়তোষ কি বলবেন বুঝতে পারছিলেন না ।সোমনাথের মধ্যে এখনও যৌবনটা বেশ ভালভাবেই আছে। গত নয় খুব ভালভাবে বোঝা যাচ্ছে। এখনো হয়ত স্বাভাবিক যৌনজীবন মেন্টেন করে। কথাগুলি ফেলে দেওয়ার মত নয়। অথচ নিজেকে তিনি সমাজের একজন বলে আজকাল আর মনে করেন না।সংসার থেকেও যতটা সম্ভব দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করে যান। দূর থেকে একজন পর্যবেক্ষকের মত সব কিছু দেখতেই তার ভাল লাগে।
জড়িয়ে না পড়ার চেষ্টাই করে এসছেন সারাজীবন। এখনও তাই করলেন। সোমনাথের কথার উত্তর না দিয়ে চুপচাপ বসে রইলেন।

৫।
“ডু ইউ টেক মারিজুয়ানা?”
“রেয়ারলি। হোয়াই?এখন চাই?”
“হু। ব্যাডলি”।
“ইম্পসিবল, এখানে কি করে পাব?”
“আই ডোনট নো, বাট আই নিড ইট ইমিডিয়েটলি”
বিচ রাস্তায় উঠেছে কৌশিক বেশ কিছুক্ষণ ধরে, রাত সাড়ে এগারোটা বাজতে চলল তারা দুজনেই নেশায় চুর হয়ে গেছে এতক্ষণে। স্কচের বোতলটা প্রায় খালি হতে চলল আর এই সময় রঞ্জনার এই আবদার।
রাস্তার পাশের যে ছোট ছোট পান বিড়ি সিগারেটের দোকানগুলি থাকে সেগুলি বেশিরভাগই বন্ধ হয়ে গেছে।অবশ্য সেগুলিতে এ জিনিস পাবার আশাও কম। কৌশিক বেশ কিছুক্ষণ এদিক ওদিক দেখে হতাশ হল।
রঞ্জনা কিছুক্ষণ ছটফট করে বলল “চল, দীঘা চলে যাই, আই নো আ পার্সন দেয়ার। আই নিড দ্যাট ব্যাডলি ইয়ার, এই স্কচে আমার কিচ্ছু হচ্ছে না, অ্যান্ড প্লিজ সুইচ অফ দ্য এসি নাও, ওপন দ্য উইন্ডোজ”।
অগত্যা গাড়ি আবার দীঘা মুখী হল। নেশার ঘোরে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল, এসি বন্ধ করে জানলা খুলতেই হাওয়া এসে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তাদের। কৌশিক বলল “জানলাগুলি বন্ধ করি? ঠাণ্ডা লেগে যাবে তো!”
রঞ্জনা বলল “আরে স্কচের নেশাটা তো এই হাওয়াতেই তৈরি হবে”।
পাগলের মত গাড়ি চালাচ্ছিল কৌশিক। চালাতে চালাতে তার মনে হচ্ছিল তার কোন অতীত কিংবা ভবিষ্যৎ নেই। যা আছে, তা কেবল এই সময়টা। পাশে একজন সুন্দরী মহিলাকে বসিয়ে তীব্র গতিতে গাড়ি ছুটিয়ে নিয়ে যাওয়ার নেশাটা তাকে এক অন্য জগতে নিয়ে যাচ্ছিল। সে জোরে গান চালিয়ে দিল গাড়ির মিউজিক সিস্টেমে। রঞ্জনা হঠাৎ ঝুঁকে এসে তার ঠোঁটে চুমু খেল। ব্যাপারটা এমনভাবে হল হঠাৎ যে সে গাড়িটা থামিয়ে দিল ফাঁকা রাস্তার উপরে। এবার তার পালা। রঞ্জনাকে জড়িয়ে ধরল সে। ঠোঁটে ঠোঁটে বেশ খানিকক্ষণ বসে রইল তারা।
বেশ খানিকক্ষণ বাদে রঞ্জনা বলল “দীঘা চল”।
#
রাত দেড়টা। হোটেলের ঘরটা ধোঁয়ায় ভর্তি হয়ে যাচ্ছিল। কয়েকটা ছিলিমের পর কৌশিক বলল “আমি আর নেব না, এর বেশি নিলে চাপ হয়ে যাবে”।
রঞ্জনা বলল “কি চাপ হয়ে যাবে? এই নাও আমাকে ভালো করে জড়িয়ে ধর, এবার নাও, দেখ, এবার পারছ?”
কৌশিক জাপটে ধরল রঞ্জনাকে, বেশ খানিকক্ষণ রঞ্জনার ঠোঁটে ঠোঁট রাখল, উত্তেজনা ধীরে ধীরে সংক্রমিত হচ্ছিল তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গে। রঞ্জনা বলল “পারবে তো? নাকি ওয়াকওভার দিয়ে দেবে?”
কৌশিক রঞ্জনাকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে ফেলল। বলল “ওয়াকওভার কাওয়ারডরা দেয়, কৌশিক বোস দেয় না”।
রঞ্জনা নরম বিছানায় মিশে যেতে যেতে বলল “আই হ্যাভ ডাউটস যে তুমি ভার্জিন, ইউ নো হাউ টু আনড্রেস আ লেডি। ইউ আর গুড, ভেরি গুড”।
#
“আমার ফিরতে ইচ্ছা করছে না”। তারা দিঘা থেকে বেরিয়েছে দুপুর এগারোটায়, হোটেল থেকে চেক আউট করেই আবার কলকাতার রাস্তা ধরে নিয়েছে কৌশিক। রঞ্জনার কথায় কি বলবে বুঝতে পারছিল না সে। কাল রাতের হ্যাং ওভার এখনও কাটেনি। অবশ্য তার বেশ ফ্রেশ লাগছে স্নান করার পর থেকেই।
বেশ খানিকক্ষণ পর সে উত্তর দিল “আমারও না”।
“দেন?”
“আই ডোন্ট হ্যাভ এনি আদার অপশন, কাল ইম্পরট্যান্ট মিটিং আছে, আমাকে যেভাবেই হোক আজ রাতের মধ্যে কলকাতা ফিরতে হবে”।
“বিজি ম্যান”।
“দ্যাটস রাইট, আচ্ছা আমার একটা প্রশ্ন আছে”।
“কি?”
“আমি যদি তোমাকে নেক্সট উইকেন্ডে নিয়ে যেতে চাই, ওরা তোমাকেই দেবে তো?”
রঞ্জনা হাসল, বলল “এ নেশা কোর না, ফতুর হয়ে যাবে কিন্তু”।
কৌশিক কিছু বলল না। রঞ্জনা বলল “উইশ ইউ এ হ্যাপি ম্যারেড লাইফ, বেস্ট অফ লাক ডিয়ার”।
কৌশিক বলল “থ্যাঙ্কস। কোথায় নামাতে হবে তোমাকে?”
রঞ্জনা বলল “যেখান থেকে তুলেছিলে, ইউ হ্যাভ বিলস টু পে, ভুলে গেলে?”
কৌশিক ভুলে গেছিল। হাসল। বলল “হ্যাহ, একেবারেই ভুলে গেছিলাম”
রঞ্জনা সিডিগুলো ঘাঁটা শুরু করল “আমার ভুললে চলবে না, কোনভাবেই না। ভুলতে দেয়ও না কেউ। লাস্ট উইক এক মস্ত বড় হর্তা কর্তার সাথে শুতে গেছিলাম। অফিসের মধ্যেই দরজা বন্ধ করে পাগলের মত আমার গোটা শরীরটা কামড়াতে শুরু করল, আমি যতই বল ছাড়ুন আমাকে আমার লাগছে, পারভারটটা আমাকে চড়ের পর চড় মেরে চলেছে আর বলে যাচ্ছে তুই জানিস আমি কে। আমার লাগছে অথচ আমাকে হেসে যেতে হচ্ছে। আমাদের হাসতে হয়, নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়”।
কৌশিক গাড়িটা দাঁড় করাল রাস্তার পাশে। রঞ্জনা অবাক হয়ে বলল “হোয়াট হ্যাপেন্ড?”
কৌশিক বলল “আমি জানি না কি বলব, কালকে বেরনোর আগে অবধি আমার ডাউট ছিল, আমি কি ঠিক করছি, না ভুল করছি। আমি ভেবেছিলাম একটা রাস্তার প্রস্টিটিউটকে তুলে নিয়ে যাব, গিয়ে তার সাথে একটা দিন কাটিয়ে কলকাতা ব্যাক করে আসব। আই নেভার ফেলট দ্যাট ইউ মে বি এ সুপিরিয়ার পার্সন দ্যান আস। বিলিভ মি”।
রঞ্জনা শব্দ করে হাসল কিছুক্ষণ। কৌশিক চুপচাপ বসে রইল। বেশ কিছুক্ষণ পরে কৌশিকের পিঠ চাপড়াল রঞ্জনা, বলল “ছেলেটা সেন্টু খেয়ে গেছে। চল বস, অনেক হয়েছে, এবার ফেরা যাক”!

৬।
ঋজুর সোমবার অফ ডে থাকে। মেসের বাকিরা যখন অফিসে যাবার জন্য ছোটাছুটি করে সে দিনটা সে সকাল দশটার সময় ঘুম থেকে ওঠে। ব্রেকফাস্ট করে হাতের কাজগুলি সারে। জমে থাকা কাজের মধ্যে সব থেকে বেশি থাকে বিল জমা দেওয়ার কাজগুলি। কোন কুক্ষণে সে মোবাইলের পোস্ট পেইড কানেকশন নিয়েছিল, মাসের মধ্যে একটা অফ ডের প্রথম ভাগটা বরাদ্দ রাখতে হয় ফোনের বিল জমা দেওয়ার কাজে। ব্যাঙ্কের কাজ থাকে আরেকটা দিন। পাশ বই আপডেট করাতে বেশি দেরি হয়ে গেলে সরকারি ব্যাঙ্কের কাউন্টারের লোকটা এমনভাবে তাকায় যেন সে এইমাত্র চারটে খুন করে থানায় আত্মসমর্পণ করতে এসেছে। অফিসের সাতদিনই সে একটা ট্রাউজার পরে কাটিয়ে দেয়। দুটোর মধ্যে একটা ট্রাউজার তাই তাকে লন্ড্রিতে দিয়ে আসতে হয়। যাবার পথে সেটাও করে ফেলে সে। এবং মেসের বাজারটা সোমবার তাকে করতে হয় যেটা তার সবথেকে অপছন্দের কাজ।বাড়িতে টাকা পাঠানোর জন্য মাসের শুরুতে তাকে একবার ব্যাঙ্কেও যেতে হয়।
আজকাল তার ঘুম ভাঙে শ্রেয়ার ফোনে। শ্রেয়া এমনিতে খুব বেশি ফোন করে না তাকে কিন্তু যেদিন করে সেদিন সে বুঝে যায় তার খবর আছে। শ্রেয়া একটি “হ্যান্ডল উইথ কেয়ার” মেয়ের নাম যে তাদের এক বোর্ড অফ ডিরেক্টরের মেয়ে। অফিস পার্টিতে আলাপের পরের দিনই শ্রেয়া তাকে ফোন করে ছুটি নিতে বলে। তারা গোটা দিন কলকাতার বিভিন্ন শপিং মলে ঘুরে বেড়ায়। ঋজুর অসীম সৌভাগ্য তার টাকায় না, শ্রেয়া নিজের টাকাতেই প্রচুর জিনিসপত্র কেনে তবে তাকে সাথে থাকতে হয়। এর পর থেকে ব্যাপারটা প্রায়ই ঘটতে থাকে।
ঋজু বুঝতে পারে না শ্রেয়ার ব্যাপারটা ঠিক কি, মেয়েটা ডানা কাটা পরী না হলেও মেক আপ এবং বাজার চলতি বিভিন্ন ক্রিমের প্রভাবে যথেষ্ট আকর্ষণীয়। তার মত একজনের সাথে ঘুরে শ্রেয়া কি প্রমাণ করতে চায় তাও সে জানে না, তবে ভারসাম্য রেখে চলার খেলায় সে নিরলস প্রচেষ্টা করে চলেছে।
#
এই সোমবার বিল দেবার জন্য তার অফ ডেতে যখন সে মোবাইল কোম্পানির কিয়স্কের কাছে এসে লাইন দিয়েছে ঠিক সেই মুহূর্তে হোয়াটস অ্যাপে শ্রেয়ার মেসেজ দেখতে পেল সে “come @gariahat@ 2pm”
সে ব্যস্ত থাকবে নাকি অন্য কাজে, সে আদৌ যেতে পারবে নাকি সেসব জানার মেয়েটার কোন আগ্রহই নেই। সে বেশ বিরক্ত হল কিন্তু কিছু বলতে পারল না। চলে আসা প্রচুর রাগ সামলে সে রিপ্লাই করল “ok”.
#
দুটো দামি স্মার্ট ফোন এবং ব্যাগ সামলাতে সামলাতে তাকে দাঁড় করিয়ে শ্রেয়া এল প্রায় আধঘণ্টা দেরিতে। রাগ হবার যথেষ্ট কারণ থাকা সত্ত্বেও তাকে ভদ্রভাবে থাকতে হল। শ্রেয়ার কোন বোনের বিয়ে সে কারণে তাকে নিয়ে সে শাড়ি কিনতে যাবে। ঋজু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ধীরে ধীরে সে যে একটা ক্রীতদাসে পরিণত হয়ে পড়েছে সে বিষয়ে তার কোন সন্দেহ ছিল না।
“কি নেওয়া যায় বলত? ইক্কত নিই?”
সে বোকার মত হাসল। বলল “আমি তো এসব জানি না কোনটা কি, তোমার যেটা পছন্দ হয় সেটা নিয়ে নাও”।
শ্রেয়া এবার ন্যাকামি শুরু করল “প্লিজ দেখ না আমাকে কোনটা ভাল লাগবে”।
দোকানের বয়স্ক কর্মচারী এবং কয়েকজন ক্রেতা তাদের দিকে কৌতুকের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। শ্রেয়া সুন্দরী হোক আর না হোক, তার বসের মেয়ে হোক বা না হোক, ঋজু কিছুতেই এই ব্যাপারটাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না। শ্রেয়ার সাথে থাকার সময় তার মনে হয় সে অফিসেই আছে এবং অফিসের মতই তার ছোট খাট কোন কথা, কিংবা ভুল তার চাকরি খেয়ে নিতে পারে।
এবারেও “জয় মা কালী” মনে মনে বলে নিয়ে সে একটা হালকা গেরুয়া রঙের শাড়ি দেখিয়ে বলল “আই থিংক ওই শাড়িটা তোমাকে ভাল মানাবে”। শ্রেয়া বেশ খানিকক্ষণ ঠোঁট কামড়ে শাড়িটাকে মন দিয়ে দেখে দ্বিধাগ্রস্থ গলায় তাকে বলল “আর ইউ শিয়োর?”
শ্রেয়ার আর ইউ শিয়োরের এর উত্তরে বরাবরের মতই গলায় কনফিডেন্স এনে সে বলল “নিশ্চয়ই। এই কালারটাই বেস্ট আমার মনে হচ্ছে”।
“ওকে, আরেকটা নিই কি বল?”
ঋজু মাথা নেড়ে যায়।প্রায় আধ ঘণ্টা ধস্তাধস্তির পর শ্রেয়া প্রায় কুড়ি হাজারটাকার শাড়ি নিল।
শ্রেয়ার সাথে থেকে ঋজু আজকাল অনেক কিছু জানতে পারছে।বাপের টাকা থাকলে কি কি উপায়ে সেগুলি উড়ানো যায় সেগুলির সহজ উপায় মেয়েটি জানে। সে নিশ্চিত এই নিয়ে শ্রেয়া বই লিখলে সেটা বেস্ট সেলার হবে। টাকা পেমেন্টের সময় অবশ্য সে কাঁটা হয়ে থাকে কারণ মাঝে মাঝে কোন দোকানের কার্ড সিস্টেম কাজ না করলে তাকেই ক্যাশে টাকাটা দিতে হয় এবং সেই টাকাটা চাইতেও তার প্রচুর দ্বিধা কাজ করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সে টাকাটা উদ্ধার হয় না এবং মাসের শেষে যখন সে দেখে এই প্রচুর পরিমাণটাকা শ্রেয়ার জন্য চলে যাচ্ছে তখনো তাকে শ্রেয়ার সামনে হালকা হাসি ঝুলিয়ে কথা বলে যেতে হয় আর মেসে ফিরে মাথার চুল ছিঁড়তে হয়।
তার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল এবার যখন এই দোকানে শ্রেয়ার কার্ডটা অ্যাক্সেপ্ট করে নিল। শ্রেয়া প্যাকেটগুলি তার হাতে সপে টয়লেটে গেল।
শ্রেয়ার শাড়ির প্যাকেটগুলি সামলানোর সময়েই তার দেখা হয়ে গেল রূপা আর ওর মায়ের সাথে। প্রায় তিন বছর পরে। রূপার মা তাকে দেখে এগিয়ে এলেন “কেমন আছ তুমি? বহুদিন কোন খোঁজ খবর নেই? আমাদের ওদিকের রাস্তা তো ভুলেই গেছ দেখছি”।
সে ক্যাবলা হাসি দিল একটা। রূপার মা বললেন “আচ্ছা তুমি একটু দাঁড়াও, আমি একটু টয়লেট থেকে ঘুরে আসি”। সে কি বলবে বুঝতে না পেরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। এই দোকানে এলে কি সবার টয়লেট পেয়ে যায় নাকি সেই প্রশ্নটা হঠাৎ তার মাথায় ঘুরঘুর করতে থাকল।
রূপা তাকে দেখে হাসল। বলল “কি ব্যাপার ঋজুদা,দাদা ব্যাঙ্গালোর গেল আর তুমিও একেবারে ভুলে গেলে, কোথায় আছ এখন”?
হাতে শ্রেয়ার শাড়ির ব্যাগ আর রূপার প্রশ্নের সামনে পড়ে ঋজু বেশ অপ্রস্তুত হচ্ছিল। সে বলল “আসলে আজকাল অফিসে ভীষণ কাজ পড়ে গেছে, তাই আর যাওয়া হয় না, অর্ঘ্য ফোন করে অবশ্য মাঝে মাঝে, ও আমাকে বলেছিল তোর বিয়ের কথা, ইনফ্যাক্ট প্ল্যান ও করেছি যাব”।
রূপা বলল “হ্যাঁ দাদা আসছে তো, তুমি এস কিন্তু ভুলো না। আচ্ছা এই শাড়ি কিনছ কার জন্য, তোমারও বিয়ে নাকি?”
ঋজু সতর্কভাবে একবার শ্রেয়া আসছে নাকি দেখে বলল “না, এই অফিসের বসের মেয়ের সাথে আসতে হয়েছে, উনি কিছু শাড়ি কিনেছেন, এটা সেগুলোই”।
রূপা অবাক হল, বলল “সে কি? অফিসের বাইরেও অফিস করছ নাকি?”
ঋজু বলল “ওই একরকম”।
রূপা একটু গম্ভীর হল “তোমার বেশ উন্নতি হয়েছে দেখছি আজকাল, বন্ধুর বোনের সাথে ফুচকা খেতে লজ্জায় লাল হয়ে যেতে এককালে আর এখন বসের মেয়ের শাড়ি বইছ”।
রূপা কথাটা এমনভাবে বলবে সেটা ভাবতে পারেনি ঋজু, সে বলল “এই ব্যাপারটা আসলে আমার হাতে নেই, বসের মেয়ে চাইলে তো বেরতে হবেই, চাকরির ব্যাপার জড়িত যখন, যাক গে তোর হবু বর কি করে?” কথাটা ঘোরাতে চাইছিল সে।
“কেন তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড তোমাকে বলে নি?” প্রশ্নটা ঘুরিয়ে তাকেই করল রূপা।
যেন হঠাৎ মনে পড়ে গেল সেভাবে বলল সে “ও হ্যাঁ হ্যাঁ, বেশ বড় চাকরি বলেছে অর্ঘ্য, বেস্ট অফ লাক, উইশ ইউ এ হ্যাপি ম্যারেড লাইফ”।
রূপা উত্তর দিল না। শ্রেয়া বেশ ব্যস্তভাবে ফিরছিল। তাদের কথা বলতে দেখে এগিয়ে এল, রূপাকে পাত্তা না দিয়েই তাকে বলল “লেটস গো ঋজু, সাউথ সিটি যেতে হবে”।
ঋজু বাঁচল যেন, রূপাকে বলল “আসি রে পরে কথা হবে, আন্টিকে বলে দিস আমি যাব একদিন সময় করে”।
রূপা কিছু বলল না, ঋজু আর পিছনের দিকে তাকাল না। শ্রেয়ার পিছন পিছন দৌড়তে শুরু করল।

৭।
ল্যাপটপটা আজকাল ভীষণ ডিস্টার্ব করছে। মাঝে মাঝে হ্যাং করছে এমনভাবে প্রিয়তোষ ভীষণ অসহায় বোধ করছেন। এই নতুন ল্যাপটপটা কেনার পর থেকে এই সমস্যাটা শুরু হয়েছে। নতুন অপারেটিং সিস্টেমটাও একেবারে ভাল লাগছে না তার। অথচ রাজ্যের কাজ পড়ে আছে তার, কোম্পানি ডেটাবেসগুলি রোজ রাতে দেখেন তিনি, পড়াশুনা করেন রীতিমত। তবু লড়াই ছাড়লেন না তিনি, লড়ে যেতে লাগলেন।
রূপা এসে আবার চুপচাপ বসল। তিনি দেখে বললেন “কৌশিক ফোন করেছিল?”
রূপা বলল “হ্যাঁ, সকালেই করেছিল, অফিস ট্যুর ছিল, ফিরেছে। বস সাথে ছিল সে জন্য ফোন ধরে নি”।
প্রিয়তোষ কন্ট্রোল অলট ডেল মেরে বললেন “যাক তাহলে তো তোর আর কোন চাপ নেই”।
রূপা নখ খুটতে খুটতে বলল “আজ ঋজুদার সাথে দেখা হল”।
প্রিয়তোষ কি বোর্ড থেকে মাথা তুলে রূপার দিকে তাকালেন “তাই? কেমন দেখলি?”
রূপা হাসল “ভালই, দাদার সাথে মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয় বলল”।
প্রিয়তোষ ঘড়ির দিকে তাকালেন, তার একটা ওষুধ খাবার সময়। রূপাকে বললেন “এক গ্লাস জল এনে দে তো মা”।
রূপা জিজ্ঞেস করল “ওষুধ খাবে?”
প্রিয়তোষ হ্যাঁ বললেন। রূপা জল আনতে গেল। তিনি মোবাইলটা বের করলেন, বিশুর দুটো এস এম এস এসছে, বলছে বড় রিসেশন আসছে। শেয়ার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিক্রি না করতে পারলে কপালে দুঃখ আছে। তিনি হাসলেন, এই সব প্যানিক ছড়ানো এস এম এস গুলি আজকাল ভীষণ আসছে। অথচ দিনের শেষে দেখা যায় যে শেয়ারগুলি তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেগুলিরই সব থেকে বেশি দাম উঠে যাচ্ছে তিন থেকে চার দিনের মধ্যে। এই এস এম এসটাও সম্পূর্ণভাবে ইগনোর করলেন তিনি।
রূপা জল আনার পর ওষুধটা খেলেন। বললেন “বিশুর আবার মাথা খারাপ হয়ে গেছে”।
রূপা অবাক হল “কেন কি হয়েছে?”
-“দেখ না, এস এম এস করেছে বড় রিসেশন আসছে, সব শেয়ারটেয়ার বিক্রি করে দিতে। আমার এতদিনের এক্সপেরিয়েন্স হয়ে গেল এই লাইনে, আমি ঠিকই স্মেল পেতাম রিসেশনের। এইভাবে আমাকে বোকা বানানো যাবে না।
রূপা বলল “কি যে হচ্ছে, তোমার ল্যাপটপটা ঠিক হল না এখনও?”
প্রিয়তোষ রাগী গলায় বললেন “না, আমি এটাকে ফেলে দেব,একেবারে ওদের সার্ভিস সেন্টারে গিয়ে”।
রূপা সিরিয়াস গলায় বলল “সত্যি ফেলে দেবে? তাহলে আরেকটা নতুন কেন।”
প্রিয়তোষ বললেন “কিনব, তবে ল্যাপটপ আর কিনব না, আমার অসহ্য লাগে আজকাল, ডেস্কটপই ভাল কি বলিস”? সমর্থনের আশায় রূপার দিকে তাকালেন প্রিয়তোষ।
রূপা বলল “ঠিক আছে, ল্যাপটপটা কিন্তু আমি নেব জ্যেঠু”।
প্রিয়তোষ বললেন “তোর ল্যাপটপ চাই তা বেশ তো, আমিই কিনে দেব তোকে, এটা ইউজ করতে পারবি না।। বাজে জিমিস, এক্সচেঞ্জ করে নতুন ল্যাপটপ চলে আসবে না হয়”।
রূপার বলল “না আমার এইটাই চাই, এটা এক্সচেঞ্জ করার দরকার নেই, আমাকে এটাই দিও তাহলে।“
প্রিয়তোষ বললেন “ঠিক আছে তাহলে তাই ঠিক রইল, কাল তুই আমার সাথে বেরবি, সার্ভিস সেন্টারে গিয়ে ঠিক করিয়ে তারপর তোকে দেব না হয়”
রূপা হঠাৎ অন্য কথা বলল “ কাওয়ারডটা কি করছে জান?
প্রিয়তোষ বললেন “কে কৌশিক? অফিস গেছে বললি তো?”
রূপা মাথা নাড়ল, বলল ‘ও না আমি ঋজুদার কথা বলছি”।
প্রিয়তোষ রূপার দিকে তাকালেন “কি করছে?”
রূপা বলল “বসের মেয়েদের ব্যাগ ধরে বেড়াচ্ছে, কি অবস্থা চিন্তা কর”
প্রিয়তোষ বললেন “বাই দ্য ওয়ে, ঋজু কাওয়ারড কেন?”
রূপা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। এবার সোফায় বসল, বলল “বসের মেয়ের ব্যাগ ধরে বেড়াচ্ছে যে ছেলেটা সে আর কি করতে পারবে? আর তাছাড়া প্রপোজ করার পরে যে ছেলে ভো ভা হয়ে যায় তার সম্পর্কে কাওয়াড়ড ছাড়া আর কি বলব!”
প্রিয়তোষ বিশুর মেসেজটা ডিলিট করতে করতে বললেন “ঋজু তোকে প্রপোজ করেছিল?”
রূপা হাসল “সে এক হাস্যকর ব্যাপার।একদিন আমি স্কুল থেকে ফিরছি দেখি ঋজুদা দাঁড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছে। আমি ওকে দেখে ফুচকা খেতে গেলাম, দেখি খাবে কি লজ্জাতেই মরে যাচ্ছে। বেশ মজা পেয়েছিলাম সেদিন। এর কয়েকদিন পরে স্কুল যাবার পথে দাঁড়িয়েছিল। আমি বাস থেকে নামতেই হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে বলল পড়িস,সে দিন ওদের কলেজ ছুটি ছিল। আমি চিঠিটা দেখে অবাক। প্রপোজ করে বসেছে।আমার সাথে কথা এমন কিছু হত না, দাদার কাছে এলে ওর সাথেই আড্ডা মেরে চলে যেত, আমি তো কখনো ভাবিনি এরকম হতে পারে। আমি একবার ভাবলাম দাদাকে দেখাই। তারপর কি ভাবলাম আর দেখালাম না। আর আমি উত্তর দেব কি, তারপর থেকে আমাদের বাড়ি আসাই ছেড়ে দিল। কি অদ্ভুত বল তো!”
প্রিয়তোষ বললেন “তুই কি ওকে ভালবাসতি?”
রূপা বলল “ইলেভেনে পড়তাম তখন। অত সিরিয়াসলি ভাবি নি। এখন মনে হয় বাসতাম হয়ত, ইনফ্যাচুয়েশনও হতে পারে।“
প্রিয়তোষ বললেন “এখন?”
রূপা উত্তর দিল না, মাথা নিচু করে নখ খুটে যেতে লাগল।প্রিয়তোষ রূপাকে কি বলবেন বুঝতে পারলেন না। এই সব ব্যাপারে তিনি ঢুকতে চান না কিন্তু এই ব্যাপারটা থেকে নিজেকে সরাতে পারছিলেন না। তার মনে হচ্ছিল রূপা কোন বড় সমস্যায় পড়তে চলেছে।
বললেন “বাসিস তার মানে!”
রূপা দ্বিধা জড়ানো গলায় উত্তর দিল “না, বাসি না, ওই চ্যাপ্টারটা ক্লোজড জ্যেঠু”।
প্রিয়তোষ ইকোনমিক টাইমস খুলে চুপচাপ বসে থাকলেন। রূপা কোন কথা বলল না। বেশ খানিকক্ষণ পরে প্রিয়তোষ বললেন “ছেলেদের সমস্যা কি জানিস তো? দে নেভার ফল ইন লাভ। বিয়ে করে ফিজিক্যাল রিলেশন করার জন্য। বউয়ে স্বাদ মিটে গেলে বাইরে এক্সট্রা ম্যারিটাল করতে ছোটে। কোন পুরুষই কখনো ভাল বাসে নি, কাউকে ভালবাসেনি। আর মেয়েরা যে ভালবাসায় একবার পড়েছে সেটা থেকে উঠতে প্রচুর সময় নিয়ে নেয়। তোকে তো আমি ভালভাবে চিনি, তুই ভেবে দেখ তো ঋজুকে তুই সত্যিই ভালবাসিস কিনা, এখনও সময় আছে কিন্তু”।
রূপা বলল “তুমি এত জানলে কি করে? তুমি তো নিজে বিয়ে করনি!”
প্রিয়তোষ উত্তর দিলেন না।কাগজে মনোযোগ দিলেন। রূপা বলল “অফিসের বসের মেয়ের পেছনে দৌড়ে বেড়াচ্ছে, প্রপোজ করে লাপাতা হয়ে যায়, এরকম একটা ছেলেকে আমি ভালবাসি না জ্যেঠু”।
প্রিয়তোষ কাগজ থেকে মুখ তুললেন, বললেন “চিঠিটা আছে এখনও?”
রূপা বলল “না”।
প্রিয়তোষ বললেন “সত্যি? আমাকে মিথ্যা বলার নিশ্চয়ই কোন কারণ নেই”।
রূপা মাথা নিচু করল, পায়ের দিকে তাকিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। প্রিয়তোষ কাগজে মন দিলেন, আর কোন কথা বললেন না।
রূপার ফোনটা বেজে উঠল, কৌশিক। ফোনটা এই মুহূর্তে ধরতে ইচ্ছা করছিল না তার।রিংটা প্রথম বার বেজে বন্ধ হয়ে যাবার সাথে সাথেই আরেকবার বেজে উঠল। এবার ধরল সে, “হ্যালো”।
“বিজি খুব?” ওপাশ থেকে কৌশিকের গলাটা সতর্ক শোনাল। সে উঠে বারান্দায় এল।
“না না, ফোনটা অন্য ঘরে ছিল”। মিথ্যে করে বলল রূপা।
“ওহ, তুমি কি ঘরে আছ? এত হর্নের শব্দ আসছে”
“বারান্দায় আছি”।
“আচ্ছা আচ্ছা। আসলে একটা কথা ছিল এখন কি ফ্রি আছ?”
“হ্যাঁ আছি, বল”।
“একদিন আমাদের একটু দেখা হওয়া দরকার। আমার মনে হয় বিয়ের আগে কিছু কথা বলে নেওয়া ভাল”।
রূপা একটু থমকাল। আবার কি কথা?
“কি কথা? ফোনে বলা যাবে না?”
“ফোনে আমি খুব একটা স্বচ্ছন্দ না আর কি।আর কথাগুলি সামনা সামনি বলতে পারলে ভাল হত। তোমার খুব অসুবিধা থাকলে অবশ্য ছেড়ে দাও”।
“না ঠিক আছে, অসুবিধা নেই কোন, কোথায় মিট করবে বল”।
“ক্যাফেলা চেনো? প্রিয়া সিনেমা হলের উল্টোদিকে যুগলসের গলি দিয়ে ঢুকে বা দিকের গলিতে”।
“না না ডাইরেকশন দিতে হবে না, এর আগে আমি গেছি ক্যাফেলায়, কবে করলে সুবিধা হয় তোমার?”
“ফ্রাইডে ইভনিং? এই ছ’টা নাগাদ? অসুবিধা আছে?”
“একটু বিকেলের দিকে হয় না? পাঁচটা হলে ভাল”।
“আচ্ছা, তবে ছ’টা হলে অসুবিধা ছিল না, আমি তোমাদের বাড়িতে বলতাম, তোমাকে নামিয়ে দিয়ে যাব ফেরার সময়”।
“না না, সে কারণে না, আসলে রাতের দিকে কিছু কাজ ছিল সেদিন”।
“ওকে দেন, পাঁচটাই সেক্ষেত্রে”।
“ঠিক আছে”।
“গুড নাইট। রাখছি তাহলে”।
“গুড নাইট”।
কি কথা বলবে কে জানে। চোরা টেনশনটা আবার শুরু হল রূপার।

৮।
ক্যান্টিনে পৌছতেই রতনদা এগিয়ে এল “কিরে আজকাল আমাকে অ্যাভয়েড করছিস কেন?”
কৌশিক কাটাতে চেষ্টা করল, হেসে বলল “না তো, সেরকম কিছু না”।
রতনদা চোখ মারল “তাহলে এক্সপেরিয়েন্সটা শেয়ার করলি না যে?”
লাঞ্চ আওয়ারটা ক্যান্টিনে বেশ ভিড় থাকে, বসার জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। কাউন্টারেও ভিড় মন্দ নয়, কৌশিক লাইনের দিকে এগোতে এগোতে বলল “দাঁড়াও কিছু একটা নিয়ে নিই, তুমি বস আমি আসছি, তুমি কি কিছু নেবে?”
রতনদা বলল “নাহ, আমার এখন খিদে নেই তেমন, তুই নিয়ে আয়, তোর খাওয়া হয়ে গেলে বাইরে বেরিয়ে সিগারেট খাব”।
“ওকে” বলে কৌশিক এগোল লাইনের দিকে।
#
ট্রে-টা এনে টেবিলে রাখতে রতনদার চোখ কপালে “কি বে, শুধু স্যালাড? তুই কি আজকাল ডায়েট করছিস নাকি?”
কৌশিক হাসল “তা বটে। বিয়ের আগে কিছু ওয়েট লুজ করার প্ল্যান আছে, তবে আজকে হালকা খাচ্ছি কারণ পেটটা ট্রাবল দিচ্ছে মন্দারমণি থেকে ফিরে। ওহ, মন্দারমণি কি বলছি, তোমাকে তো বলা হয় নি, দীঘাও গেছিলাম”।
রতন ঝুঁকে এল, “সে কি রে! দীঘা গেছিলি? অতো গ্যাঞ্জামের জায়গা? কেউ দেখলে কি হত বুঝতে পারছিস?”
কৌশিক খাওয়া শুরু করল, বলল “খুব একটা বেশি সময় ছিলাম না তো, জাস্ট স্পেন্ট দ্য নাইট অ্যান্ড উই কেম ব্যাক”।
“তাও, তুই একটা রিস্ক নিয়ে ফেলেছিলিস। মন্দারমণি যাসই নি তাহলে?”
“না প্রথমে ওখানেই গেছিলাম, হোটেলও পেয়েছিলাম। তারপর কি মনে হল ওখান থেকে বেরিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ড্রাইভ করলাম। তারপর দ্যাট লেডি নিডেড মারিজুয়ানা সো উই ওয়েন্ট দীঘা, তাও রাত একটায়”।
রতন হেলান দিল “ও! আর নিশ্চয়ই হোটেলটা ওই মাগীই সাজেস্ট করেছিল?”
“ইয়েস, হোয়াই? হোয়াটস দ্য প্রবলেম?”
রতন বলল “ দালালি খেয়েছে আর কি”।
কৌশিকের বাজে লাগছিল, সে বলল “ধুস, শি ইজ নট দ্যাট কাইন্ড অফ ওম্যান”।
“হুইচ কাইন্ড অফ দেন ভাই? মাদার টেরেসা?” খুক খুক করে হাসল রতন।
“তা কেন? তবে শি ইজ ডিফরেন্ট”।
“ডিফরেন্ট? তাহলে তো নিশ্চয়ই লোকসভার ভোটের টিকিটও পেয়ে যেতে পারে কি বলিস?”
“আহ রতনদা, এটা খিল্লির ব্যাপার নয়”।
“খিল্লি না মানে? ক’টা এসকরট...” রতন প্রায় চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিল।
“আস্তে আস্তে”, কৌশিক সতর্ক করল।
গলা নিচু করে বলল রতন “কটা এসকরট দেখেছিস ভাই তুই? তোকে আগে বলেছি না, দে আর নট লাইক নরমাল প্রস্টিটিউটস? এদের চাল চলন আলাদা। অনেকেই আছে হাই সোসাইটিতে নিয়মিত যাতায়াত করে, একটা তো আমাকে একবার ডুয়ারসে কাজ টাজ হবার পর কবিতা শুনিয়েছিল। বেশ ভাল কবিতাগুলি।“
-“তাহলে দালালির কথাটা বললে কেন? খামোখা দালালি খেতে যাবে কেন?
রতন খানিকটা থতমত খেয়ে গেল কৌশিকের প্রশ্নবানে। প্রসঙ্গটা কাটানোর জন্য বলল “যাক গে এসব, আসল কথাটা বল, কেমন হল? কিছু করলি কি?”
-ইয়েস। দ্যাট ওয়াজ গুড।
রতন টেবিলে হালকা চাপড় মারল একটা, “সাবাস মেরে শের। এটাই তো চাইছিলাম, যাক তাহলে বিয়ের আগে কনফিডেন্স গেইন করলি বল?”
কৌশিকের খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। সে বেসিনে হাত ধুয়ে এলে দুজনে মিলে স্মোকিং জোনে এল। রতন আগের প্রসঙ্গই টেনে আনল “তা তুই কি প্লেয়ার? টেস্ট, ওয়ানডে নাকি টি টুয়েন্টি?”
কৌশিক হেসে ফেলল, বলল “লিভ ইট। ছাড়ো ইয়ার, এসব কথা শুনে কি মজা পাও বলত”।
রতন বলল “আবে এগুলি তো বলেই সুখ, বাই দ্য ওয়ে তোর বিয়েতে ককটেল পার্টি রাখছিস তো?”
“সেটা তো আমার ডিপার্টমেন্ট নয়, বাবা দেখছে, আচ্ছা কাল বলব জিজ্ঞেস করে”।
রতন হতাশ হল “ধুর, তুই তো কিছুই দেখছিস না তাহলে”।
কৌশিক কথা ঘোরাল “আচ্ছা রতনদা, আমি যে এসকরট নিয়ে গেছিলাম এটা কি উড বি কে বলে দিলে ভাল হয় না?”
রতন হা করে তার দিকে তাকিয়ে থাকল, বলল “ভাই তুই নোবেল পাবি। কি লেভেলের গান্ডু হলে লোকে এই প্রশ্নটা করতে পারে! এটা ভাবলিই বা কি করে?”
কৌশিক বলল “না, ইটস সিরিয়াস, আমি সিরিয়াসলি ভাবছি এটা বলে দিই। আই ওয়ান্ট টু সি হার রিঅ্যাকশান”।
রতনের হা-টা তখনও বন্ধ হয় নি, বলল “হয় তুই একদম নিচু লেভেলের গান্ডু, নয় খুব উচু লেভেলের হারামি। মাঝামাঝি তোর কোন লেভেল নেই। যে মেয়েটাকে তুই চিনিস না, জানিস না, সেই মেয়েটাকে তুই বিয়ের আগে লাগিয়ে এসছিস সেই হিস্ট্রিটা দিবি? আর তুই এক্সপেক্ট করছিস মেয়েটা তোকে বিয়ে করবে এই সব জানার পরেও”।
কৌশিক হাসল না, বলল “উহু, আমার মনে হয় রিলেশনশিপে অনেস্টির একটা ভ্যালু আছে”।
রতন তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে সিগারেটে কয়েকটা টান দিল, তারপর বলল “অনেস্টি মারাচ্ছিস? শোন তাহলে তোকে একটা গপ্পো শোনাই। তখন সবে বিয়ে হয়েছে আমার। টোটাল নেকুপুষু ভাব। ওগো, হ্যাগোটা হাগু করতে গিয়েও দিব্যি চলছে। তা দ্বিরাগমনে গেছি। ওদের পাশের বাড়ি একটা সেক্সি মেয়ে আছে। আমি একটু ঝাড়ি টারি মারছিলাম, জামাই আদর বলে খানিকটা ভাওও পাচ্ছিলাম। রাতে ওকে খালি বললাম তোমাদের পাশের বাড়ির মেয়েটা খুব স্মার্ট তো। শুনে কি করল জানিস? মুখটা এই শুকিয়ে আমসি করে ফেলল। টানা দুদিন ছুঁতে দেয় নি। বোঝ। তখন সবে বিয়ে হয়েছে, যখন তখন ইয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, আর উনি ছুঁতেও দিচ্ছেন না। অনেক কায়দা করে তারপর কেসটা সাল্টেছিল। আর এখনও ওটা নিয়ে খোঁটা শুনে যাচ্ছি।শোন ভাই বউ কখনো বন্ধু হয় না। বউকে বন্ধুর মত ট্রিট করলে ফুল ইয়ে মাড়াবি। বউয়ের কাছে সব সময় নিজের একটা আদর্শবাদী ইমেজ খাড়া করে রাখ, তুই ভাল ছেলে, অফিস যাস আর আসিস, রাস্তা ঘাটে মেয়ে দেখিস না, পার্টিতে গেলে মদ ছুঁস না, ছুঁলেও তুলসীপাতা দিয়ে ছুঁস, একদম এই টাইপ। যখনই ট্র্যাক থেকে বেরিয়েছিস, তাহলেই ভাই তুই শহিদ”।
কৌশিক হেসে ফেলল, বলল “চাপ দিয়ে দিলে তো, বিয়ের আগেই যা গল্প শোনাচ্ছ, বিয়ে হলে তো চাপ হয়ে যাবে মনে হচ্ছে”।
“চাপ বলে চাপ? আর তুই বলছিস এসব বলবি। মরবি সিমপ্লি। ভাল বুদ্ধি দিচ্ছি শোন। আর আতলামি করিস নি।আফ্রিদির মত চোখ বুঝে চালাতে যাস নি। এটা বিয়ে, লঙ ইনিংস খেলতে হবে, বরং দ্রাবিড় হ। মারার বল মারবি, ঠোকার বল ঠুকবি। আর যখন ঝামেলা দেখবি দু পা এগিয়ে এসে দিবি তাড়িয়ে।এক্কেবারে বাপি বাড়ি যা।”
“মাইরি রতনদা এবার একটা বই লেখ বরং বিয়ে নিয়ে তোমার প্রচুর জ্ঞান দেখছি” মজা পাচ্ছিল সে।
“লিখবই তো। তবে বউ পালালে”।
দুজনেই হেসে উঠল হো হো করে।
“তবে দ্য লেডি ওয়াজ রিয়েলি গুড, এই ঘটনাটা আমাকে অনেক কিছু শেখাল”। হাসি থামিয়ে বলল কৌশিক।
রতন চোখ নাচিয়ে বলল “শেখাল তো বটেই, এবার ফুলসজ্জায় ব্যাট করতে নেমেই ছয় মারবি আবার কি”।
গম্ভীর হল কৌশিক, “নাহ, সেটা নয়। আমি সেটা মিন করতে চাইনি”।
“তুই কি মিন করতে চাইছিস আমি ভাল করে বুঝেছি, কিন্তু এটা নিয়ে তুই একটু বেশিই চিন্তা করছিস। তোর ফোকাসটা কিন্তু নড়ে গেছে কৌশিক। এরকম বুঝলে আমি তোকে সাজেস্ট করতাম না এই সব। এই ব্যাপারগুলো মাথায় ঢুকাচ্ছিস কেন? আর এটা নিয়ে আমরা কথা বলছি না। ওকে?” এবার রতনের ভেতরকার কঠিন এক্সিকিউটিভ সত্ত্বাটা বাইরে বেরিয়ে এল।
কৌশিক সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে তেতো মুখে দাঁড়িয়ে রইল। বলল “হুম। ওর নাম রঞ্জনা। হ্যাভ ইউ মেট হার বিফোর? স্লেপ্ট উইথ হার?”
“আরে ভাই, তুই ভাবলি কি করে এ তোকে সত্যি নামটা বলেছে?ওভাবে চিনবই বা কি করে”।
কৌশিক মোবাইলটা বের করল, কিছুক্ষণ ঘাটাঘাটি করে রঞ্জনার একটা ফটো বের করল মোবাইলে তোলা। “দেখ”।
“তোকে ফটো তুলতে দিল?”
“পারমিশন নিইনি, চুপচাপ তুলে নিয়েছিলাম”।
“হুম, ক্লেভার। নাহ, এর সাথে আমার কোনদিন দেখা হয় নি।বাট সি ইজ হট। রিয়েলি।
- ছাড়ো, বাদ দাও।
- তোকে তো সেটাই বোঝাতে চাইছিলাম এতক্ষণ ধরে। টাকা দিয়েছিস, যা দরকার করেছিস, খেল খতম, পয়সা হজম, এখন বিয়ে থা কর, চাপ লেস ঘোর। পরে বিয়ে আলুনি লাগলে না হয় আবার ওখানে ফোন করিস। বাট রিলেশনে জড়াস না। মনে রাখিস কথাটা
- রাখব, চল এবার কাজ শুরু করি।
- গুড, চল।
দুজনে ধীরে ধীরে অফিসমধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

৯।
পাঁচটা নাগাদ ক্যাফেলার টেবিলে বসল ওরা দুজন। কৌশিক জিজ্ঞেস করল “কফি নেবে? না চা?”
রূপা বলল “কোনটাই না”।
“তাহলে ফ্রেশ লাইম সোডা?”
ঘাড় নাড়ল রূপা।
“ওকে, সুইট তো?”
“হ্যাঁ”।
অর্ডার দিয়ে কৌশিক রূপার দিকে তাকাল। খুব একটা বেশি সাজে নি মেয়েটা। খানিকটা অগোছালো ভাব। তবে মন্দ লাগছিল না। রঞ্জনার ঘটনাটার পর থেকে আজকাল সব মেয়েকেই বিবস্ত্র কল্পনা করে ফেলছে তার অবচেতন। অনেক চেষ্টা করেও ব্যাপারটা আটকাতে পারছিল না কৌশিক। রূপাকে দেখার পর সেই কল্পনাটা আসছে না। এটা কি ভাল? বুঝতে পারছিল না সে।
“প্রিপারেশন কেমন চলছে?”
রূপা কি বলবে বুঝতে পারছিল না। হাসল বোকার মত। তার বেশ টেন্সড লাগছিল। কি বলতে চায় কে জানে।
“চলছে। মা বাবাই তো করছে সব, আমি অতটা জানি না”।
“আচ্ছা। তুমি তো এক মেয়ে। আমার মতই, আমিও এক ছেলে”।
“হ্যাঁ, জানি তো”।
ক্যাফেটার এক কোণায় এক বিদেশিনী ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে, তাছাড়া খালিই আছে। তার ফ্রেশ লাইম সোডা আর কৌশিকের কফি চলে এল।
“আচ্ছা ফিশ ফিশ একটা দেবেন”। কৌশিক আরেকটা অর্ডার করল।
রূপা বলল “আমি কিন্তু আর কিছু খাব না”।
কৌশিক হাসল “না না, একটা তো খেতেই হবে। ওই চারটে মাছের চপ আমি খেলে মরে যাব যে”।
রূপা কিছু বলল না উত্তরে।
কৌশিক বলল “আসলে আমার কিছু কথা ছিল তোমাকে বলার”।
রূপা বলল “হ্যাঁ বল”।
“এই কথাটা তোমাকে বলা হয় নি। দেখো, আমরা তো বিয়ে করতে যাচ্ছি, আমার মনে হয় কিছু কথা পরিষ্কার করে দেওয়া ভাল। আমাদের সম্পর্ক এটসেট্রা। আই মিন আমরা তো একটা নতুন জার্নি...”
“আমার প্রেমিক টেমিক আছে নাকি জানতে চাইছ তো?”কৌশিককে থামিয়ে রূপা টেনশনের মধ্যেই এবার আক্রমণাত্মক হয়ে পড়ল।
কৌশিক খানিকটা অপ্রস্তুত হল। “না মানে প্রেমিক নেই সেটা তো বলেছিলে যেদিন প্রথম দেখা করেছিলাম,তাছাড়া এটা তো জোর করার কোন ব্যাপার নয়”।
“তাহলে?”
“আমি আসলে অন্য কথা বলার জন্য তোমায় ডেকেছি। তোমায় একটা কথা বলতে হবে”।
-“ কি সেটা?”
-“বিয়ের পর আমায় অন সাইটে কিছুদিন, তাও কম করে ছ’মাস অ্যারিজোনায় থাকতে হবে। তুমি সেটা জানো না। তুমি আমার সাথে যাবে তো?’”
"বিয়ের পর পরই?"
"হ্যাঁ, সাতদিনের মধ্যে"।
রূপা একটু কনফিউসড হয়ে গেল। কি বলবে বুঝতে পারল না। ছ’দিন নিজের বাড়ি ছেড়ে কোথাও থাকতে হলে তার জ্বর চলে আসে, আর এ বলছে তাকে আমেরিকায় গিয়ে থাকতে। হঠাৎই তার গা হাতপা ঠাণ্ডা হয়ে এল। এতদিন কথাটা তার মাথায় এসছে বেশ কয়েকবার,কিন্তু খুব একটা থাকেনি মাথায়। বাড়ি ছেড়ে বাবা মা ছেড়ে, তার ঘর ছেড়ে সবকিছু ছেড়ে তাকে অন্য একটা অপরিচিত পরিবারে গিয়ে থাকতে হবে। যে লোকগুলিকে এই দু মাস আগেও চিনত না, তাদের ফাইরমাস খাটতে হবে।তাছাড়া এই কথাটা আগে বলা উচিত ছিল। সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবার পর হঠাৎ এ কি ধরণের কথা, তার বিরক্ত লাগছিল। বেশ খানিকটা সময় চুপ করে থেকে সে বলল “আমি একটু টাইম নিই এই ব্যাপারটা নিয়ে?”
কৌশিক বলল “ডিসিশানটা তাড়াতাড়ি জানিও। পারলে কালকের মধ্যেই। তোমার পাসপোর্ট আছে তো?”
হ্যাঁ বলল রূপা।
কৌশিক বলল “যাক, তাহলে একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল, আর দুজনের যদি সে দেশ পছন্দ হয়ে যায়, তাহলে আমি আর ফিরবনা এই মরা শহরে”।
“আমার কখনো হবে না। কলকাতায় থাকার চেষ্টা করা যায় না?” গলাটা কাতর শোনাল রূপার।
“কি আছে বলত কলকাতায়, এত ভালবাসা কিসের, একি ভালবাসা নাকি আদিখ্যেতা?” কৌশিক অসন্তুষ্ট হল।
"জানি না কি আছে, তবে ছেড়ে যেতে ভাল লাগবে না আমার"। ঠাণ্ডা গলায় বলল রূপা।
#
ফিশ ফিশ খেতে খেতে রূপা একটা বিষম খেল। একটা মেয়ে সম্ভবত সেই বসের মেয়েকে নিয়ে দরজা ঠেলে ঢুকল ঋজু।
তাকে দেখেও দেখল না। সেও যেচে কোন কথা বলল না।
“দেখো কলকাতা নিয়ে আমারও আবেগ আছে, কিন্তু আমার মনে হয় জীবনের শুরুটা কলকাতার বাইরে কাটানোই ভাল। তাছাড়া এখন যা অবস্থা চলছে এই সময়টা...”
ঋজুকে বেশ নার্ভাস দেখাচ্ছে। রূপা বুঝল তাকে দেখতে পেয়েছে। সে কৌশিকের কথাটা শুনতে পেয়েছিল।
“আমি একটু ভাবি”।
“সারটেনলি। আমি বুঝতে পারছি আমি হঠাৎ করে বলে তোমাকে বিপদে ফেলে দিয়েছি”। কৌশিকের গলাটা নরম শোনাল।
#
“আমি কিন্তু এখান থেকে বেরিয়ে নিচের বুটিকটায় যাব”। আদুরে গলায় বলল শ্রেয়া। ঋজুর বিরক্ত লাগছিল। কদিন ধরে শ্রেয়ার ন্যাকামিটা অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। যা না বাপু, তুই যেখানে খুশি। আমাকে ছাড় এবার।
সে স্পষ্টই বুঝতে পারছিল এ চাকরি তার আর বেশিদিন করা হবে না। বিভিন্ন জায়গায় রিজিউম পাঠাতে শুরুও করে দিয়েছে সে। বাজারের হাল খারাপ খারাপ শুনে তার মাথা খারাপ হবার যোগার।
সে বলল “ঠিক আছে, যাবে, নো প্রবলেম”। তার মনে হচ্ছিল রূপা সব কথাই শুনতে পাচ্ছে তাদের। অস্বস্তিটা কাঁটার মত বিঁধছে।
শ্রেয়া নতুন মোবাইলে ফটো তোলা শুরু করল। এর এই এক শখ। হপ্তায় হপ্তায় নতুন মোবাইল কেনে। বাজারে যখনই কোন দামি মোবাইল এসে যাবে তখনই কেনার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে।
একেকটা মোবাইলের দাম তার একমাসের মাইনের সমান। ঋজু দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে কি অদ্ভুত অবস্থা। কিছু লোক খেতে পাচ্ছে না আর কিছু লোক টাকাগুলোকে নিয়ে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে।
আজকাল তার মাঝেমধ্যেই ইচ্ছা করে শ্রেয়াকে ভাল করে গালাগাল দিয়ে এই সব ঝামেলা থেকে বেরতে। প্রতিবারই ঠিক করে যখনই শ্রেয়া ফোন করবে তখনই কিছু একটা বলে কাটিয়ে দেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা হয়ে ওঠে না। সে ঠিকই ফোনটা রিসিভ করে এবং একান্ত অনুগতের মত শ্রেয়ার পেছন পেছন দৌড়ে যায়।
“আই থিংক ওই টেবিলের মেয়েটার সাথে তুমি কথা বলছিলে সেদিন?”
ফোনটা টেবিলে নামিয়ে বলল শ্রেয়া। শ্রেয়ার এই মোড চেঞ্জগুলি ঋজু বেশ ভয় পায়। মেয়েটার যেন দুটো রূপ। একটা প্রচণ্ড অহংকারী, আরেকটাকে সে এখনও চিনতে পারেনি। সে পরিষ্কার বুঝতে পারল শ্রেয়া এবার মোড চেঞ্জ করছে।
“কোন মেয়েটা?” একটু অভিনয় করল ঋজু।
“ওই তো দেখো না, ওই যে ছেলেটার সাথে বসে আছে”।
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল সে। তারপর বলল “না তো”।
“ও, তাহলে আমারই কোন ভুল হয়েছে। সে দিন কে ছিল?”
“আমার এক বন্ধুর বোন, ওর বিয়ে সামনে, শাড়ি কিনতে এসছিল”।
“ওহ, আমি ভেবেছিলাম তোমার এক্স জি এফ হয়ত”।
একটু চমকাল ঋজু। “না না”।
“তোমার এক্সপ্রেশনস দেখে কিন্তু সেটা মনে হয় নি”।
“কি মনে হয়েছিল?” শ্রেয়া আজকাল অনেক কিছুই দেখছে মনে হচ্ছিল তার।
শ্রেয়া হাসল, বলল “তোমার মুখটা দেখার মত ছিল যখন তুমি ওখান থেকে বেরোলে, ইউ কান্ট হাইড ইউর এক্সপ্রেশনস ইউ নো”।
হালকা হাসি দিয়ে কাটাতে চাইল ঋজু। “নট সো সিরিয়াস, কি খাবে? গ্রিলড চিকেন চলবে?”
শ্রেয়া হাসল “কথা ঘোরাবে তো, ঠিক আছে। গ্রিলড চিকেনই চলুক”।
রূপারা উঠল। বেরনোর সময় তাকে দেখে হাসল। কিন্তু দাঁড়াল না আর।
শ্রেয়া চোখ নাচাল “এই যে বলছিলে এই মেয়ে সে নয়? তবে?”

১০।
মায়া মাসি এলে বাড়ির পরিবেশটাই অন্যরকম হয়ে যায়। রূপা সারাক্ষণ মাসির সাথে লেগে থাকে, মা মাসি, মাসতুতো বোন আইরিন, রূপা চারজনে মিলে সারাদিন আড্ডা মারে। বাবা সেদিন তাড়াতাড়ি অফিস থেকে চলে আসেন। মেসো সন্ধ্যের দিকে চলে আসেন। প্রিয়তোষও চলে আসেন ওদের সাথে আড্ডা মারতে।
রূপা বাড়ি ফিরে দেখল মায়া মাসি এসে গেছে। মায়া মাসির আসার কথা ছিল, সেই কারণেই সে কৌশিককে পাঁচটার সময় আসতে বলেছিল।
তাকে কৌশিক নামিয়ে দিয়ে গেল। বাইরে থেকেই আড্ডার শব্দ পাচ্ছিল সে। ঘরে ঢুকতেই সবার কৌতূহলী নজর তার ওপর পড়ল। মাসি তাকে দেখেই উঠল “কিরে, কৌশিক কোথায়? ওকে আসতে বললি না?”
মা উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল “কি রে, কি জন্য ডেকেছিল”?
আইরিন বলল “কিরে রূপা আপা, কি বলল বল”। আইরিন তাকে ছোটবেলা থেকে দিদির জায়গায় আপা বলে ডাকে।
এতগুলো প্রশ্নের মুখে পড়ে রূপা চুপ হয়ে গেল। সোফায় হেলান দিয়ে বসল। বাবা জিজ্ঞেস করল, “কিরে বল কিছু”।
রূপা শান্ত গলায় বলল “আমি এই বিয়েটা করছি না”।
বাংলা সিরিয়াল দেখা অভ্যাস আছে যে সব পাঠকের তারা বুঝতেই পারছেন এই সময় কি হতে পারে। ক্যামেরাটা ঘরের সব সদস্যদের কাছেই যাবে, হতভম্ব এবং শক লেভেলের সব থেকে চূড়ায় থাকবে এই মুহূর্তে রূপার মা, তারপর মায়া মাসি, তার বাবা, মেসো, আইরিন এবং এই কথাটা যার ওপরে কোন প্রভাব ফেলতে পারল না তিনি হলেন প্রিয়তোষ।
হতভম্ব ভাব কাটিয়ে প্রথম প্রশ্নটা মা-ই করল “কেন? কি হয়েছে?”
রূপা উত্তেজিত হল না, “দেখ, বিয়ের কথা ঠিক হয়েছে, এতদিন ধরে এত কথা হয়েছে, আজকে হঠাৎ ডেকে পাঠিয়ে বলছে বিয়ের সাতদিনের মধ্যে আমাকে আমেরিকা যেতে হবে ওর সাথে। টানা ছ’মাস থাকতে হবে। ওই ছ’মাসটা এক্সটেন্ডও হতে পারে, এতো অনেকটা হুকুম করার মত শোনাচ্ছে তাই না? এ কি চাকর বাকর নাকি? যেখানে যেতে বলবে সেখানে যেতে হবে? শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত জানাচ্ছে! যেন আমি কাঁদায় পড়ে আছি, আমাকে উদ্ধার করতে হবে! আমার পক্ষে এই বিয়েটা করা সম্ভব না”।
মা আর মায়ামাসি মুখ চাওয়া চাউয়ি করল। মায়ামাসি বলল “তুই কি এটা কৌশিককে বলে দিয়েছিস?”
রূপা বলল “না বলিনি, আগে তোমাদের জানিয়ে দিলাম, এরপর বলব”।
একটা হালকা স্বস্তি ফিরে এল ওদের মুখে, বাবা বলল “ আরে এতো ভাল প্রস্তাব, আমেরিকা যাবি, ঘুরবি এতে সমস্যা কোথায়?”
রূপা জানত এই ধরণের কথাই এরা বলবে, সে প্রস্তুতি নিয়েছিল এর জন্য “সমস্যাটা তো আগে থেকে বললে ছিল না বাবা, ও বলল আজকে। যখন বিয়ে একেবারে দোরগোড়ায়। এ তো একধরণের ব্ল্যাকমেল করা! বিয়ে হবে ঠিক হয়ে গেছে, কার্ড ডিস্ট্রিবিউশন হয়ে গেছে, এখন এ কথা বলার অর্থ কি? মানে হল আমার মতামতটা এখানে কোন ব্যাপার না, মানসম্মান জড়িত আমাদের তাই আমি না-ও করতে পারব না। তাই না?”
মেয়ের কথায় খানিকটা হকচকিয়ে গেল সবাই। প্রিয়তোষ কিছু বলছিলেন না, নির্বিকার ভাবে শুনছিলেন সব কিছু।
মেসো মুখ খুলল এবার, কিছুটা ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা “দেখ তাতাই, আমি বুঝতে পারছি তুই বেশ রেগে আছিস,রাগের মাথায় এই সব ডিসিশন নিচ্ছিস, একটু মাথা ঠাণ্ডা করে ভাব, আজ রাতটা ভাব। কালকে না হয়...”
মা থামাল মেসোকে, এবার অন্যদিক থেকে আক্রমণ “তাছাড়া বিয়ের পরে কৌশিক তোর দায়িত্ব নেবে, খাওয়াবে পরাবে, ওর ও তো একটা দাবী আছে তোর ওপর তাই না?”
রূপা হাসল, “আমি ঠিক করেছি মা, অনেক হয়েছে। এবার আমি চাকরি করব, যেরকমই হোক, নিজের পায়ে দাঁড়াই নি বলে চাকর বাকর হয়ে তো থাকতে পারি না”।
মা আর কিছু বলল না। ঘরের পরিবেশটা মুহূর্তে আরও গম্ভীর হয়ে গেল। রূপা আইরিনকে ডাকল, “চ, আইরিন, আমার ঘরে আয়, আড্ডা মারি”।
আইরিন শুকনো মুখে তার সাথে চলল, রূপা ঘর থেকে বেরনোর আগে থমকে দাঁড়াল “আর বিয়েটা যে হচ্ছে না, এটা আমি জানাব না, তোমরাই জানাবে কিন্তু”।
কেউ আর কিছু বলল না।
#
“তুই বস, আমি আসছি”।
আইরিনও শকের মধ্যে ছিল। রূপার কথায় খানিকটা হকচকিয়ে গেল। “কোথায় যাবে?”
“আরে পাগলি চেঞ্জ করতে হবে তো”।
রূপা হাসল।
“ওহ, ঠিক আছে”।
আইরিন আর রূপার মধ্যে বয়সের পার্থক্য পাঁচ বছর। আইরিন স্কুলে পড়ে। আপা তার ফেভারিট। শপিংয়ের তোড়জোর চলছিল, বিয়ের জন্য একটা নতুন চশমার অর্ডারও হয়ে গেছে। বিয়েটা হচ্ছে না শুনে তার একটু অদ্ভুত লাগছিল। ঠিক বিশ্বাস হতে চাইছিল না ব্যাপারটা।
কি করবে বুঝতে না পেরে আইরিন গেম খেলা শুরু করল মোবাইলে। রূপা চেঞ্জ করে এল, তারমধ্যে কোন উত্তেজনা নেই, নিরুত্তাপ ব্যাপার।
আইরিন বলল “তুমি কি সত্যিই বিয়ে করবে না আপা?”
রূপা হাসল “কেন বিয়ে করব না? করব হয়ত কোনদিন, কিন্তু এই বিয়েটা আমি করব না”।
আইরিন বলল “আমেরিকা যাবে না বলে?”
রূপা বলল “হ্যাঁ, তোদের ছেড়ে আমি কোথাও যাবনা”।
“কিন্তু সবাই যে জেনে গেছে!”
“আবার জানবে। কি অসুবিধা! জানিয়ে দিলেই জানবে যে দাদারা দিদিরা, আপনারা যে বিয়েটার জন্য নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন, সেটি হচ্ছে না, অসুবিধাকে লিয়ে খেদ হে”।
বলে হেসে ফেলল রূপা।
আইরিন ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল “ধুস, ওইসময়টা আমার টিউশনে এক্সাম আছে। ভেবেছিলাম তোমার বিয়ে হলে ওটা কাটিয়ে দেব”।
রূপা আইরিনের কান ধরল “কি পাজি রে তুই! আমার বিয়ের নাম করে এক্সাম থেকে পালাবি!”
আইরিন হাসতে লাগল।
মা এল ঘরে, রূপা আইরিনকে বলল “ওই দেখ, ড্যামেজ কন্ট্রোল শুরু হয়ে গেছে”।
মা কাঁদো কাঁদো প্রায়, যে কোন সময় বৃষ্টি নামতে পারে এরকম মুখ করে বলল “রূপা তোর বাবার কথাটা ভাববি না মা! বিয়ে বাড়ি বুকিং হয়ে গেছে, ক্যাটারার অ্যাডভান্স হয়ে গেছে। এখন এরকম করলে হবে বল? তুই বুঝতে পারছিস না? এতগুলো টাকার ব্যাপার?”
রূপা চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল “মা, এই যে দাদা একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছিল। তারপর কিছুদিন পড়ে বলল ওই কলেজে পড়বে না।আবার অন্য কলেজে ভর্তি হল।তখন টাকাটা নষ্ট হল না?”
মা এবার তেরিয়া হল “এটা আর সেটা এক হল? আমাদের ফ্যামিলির প্রেস্টিজ জড়িয়ে নেই এখানে?”
রূপা বলল “বিয়েটা ভেঙে গেলে ভাল হত মা? তখন প্রেস্টিজের কি হত?”
মায়া মাসি চলে এল,মা তাকেই খড়কুটোর মত আঁকড়ে ধরতে চাইল “দেখ মায়া, মেয়ে কি বলছে”।
মায়া মাসি বলল "রূপা, এখন কিন্তু সত্যি দেরী হয়ে গেছে। তোর মেসো যেটা বলল সেটা কর। আজ রাতটা ভাব, তারপর না হয় দেখা যাবে"।
রূপা হাসল "মাসি আমি কিন্তু রাস্তায় আসতে আসতেই ডিসিশন নিয়ে নিয়েছি, এই নিয়ে আর আমায় কোন কথা বোল না।প্লিজ"।
মা আর মাসি চুপ করে বসে রইল।
মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল "কি যে করি, সবাই জেনে গেছে, মান সম্মান নিয়ে টানাটানি শুরু হবে এবার"।
রূপা উত্তর দেবার আগেই বাইরে থেকে প্রিয়তোষের গলা ভেসে এল "রূপা, একটু আমার ঘরে আয় তো, ল্যাপটপটা আবার বিগড়েছে মনে হচ্ছে"।
রূপা আইরিনকে বলল "চ' ওই ঘরে চ', এই ঘরের টেম্পারেচার বাড়বে এবার"।
মা আক্রমণাত্মক হবার আগেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল সে।

১১।
কৌশিকের আজকাল প্রায়ই মাঝরাতের দিকে ঘুম ভেঙে যায়, বেশিরভাগ সময়ে একবার পেচ্ছাপ করতে উঠলে তারপরে আর ঘুমই আসতে চায় না। অস্বস্তিকর ভাবে শুধু রঞ্জনার কথাই বারবার মনে আসে। সে বুঝতে পারছে আসলে সে প্রবলভাবে রঞ্জনার প্রেমে পড়ে গেছে।
অন সাইটে যাবার কথা প্রথমে তার ছিল না। এতদিন ধরে অন সাইটটাকে বরং নানাভাবে অ্যাভয়েড করে যাচ্ছিল সে। ইদানীং বুঝতে পারছে কলকাতা থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তার পালানো দরকার। রাতের ঘুম না আসা গুলোকে আসলে নানাভাবে রঞ্জনার স্মৃতি প্রভাবিত করে চলেছে।
ফেরা থেকে তার মধ্যে যে লক্ষণগুলি দেখা যাচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম হল ক্যান্ডি ক্রাশ খেলা। ঘুম ভেঙে গেলে সে ক্যান্ডি ক্রাশ খেলতে বসে। খেলাটা সত্যিই একটা নেশার মত। অথচ একটানা পাঁচবারের বেশি খেলা যায় না,সেক্ষেত্রে টাকা দিয়ে খেলতে হয়। তার পেছনেও তার ক্রেডিট কার্ডকে লাগিয়ে দিয়েছে সে। সারারাতধরে ক্যান্ডি ক্রাশ খেলে ভোরের দিকে ঘুম। এবং অবধারিত ভাবে অফিসে লেট পৌছনো।
রূপার সাথে দেখা করার পর থেকেই সে বুঝতে পারছিল রূপা তার মনকে কোনভাবে দখল করতে পারেনি। রূপার মুখ মনে করতে গেলে বারবার রঞ্জনার মুখটাই মনে পড়ে যাচ্ছে তার।
রাত দেড়টা নাগাদ টয়লেট থেকে ফিরে লাইট অন করল সে। বুঝে গেল আজকের মত ঘুমের ইতি হয়ে গেল। অবশ্য উইক এন্ড শুরু হচ্ছে পরের দিন থেকে।
খেলতে খেলতেই টের পেল তার ঘরের দরজায় কেউ নক করছে। চেঁচাল সে “কে?”
বাইরে থেকে বাবার কণ্ঠস্বর ভেসে এল “আমি”।
“খোলা আছে, আস”।
কৌশিকের বাবার সাথে আমাদের পরিচয় হয় নি। ভদ্রলোক কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী ছিলেন, কলকাতা ছাড়াও বিভিন্ন শহরে ঘুরতে হয়েছে তাকে।তবে তাদের একান্নবর্তী পরিবার বলে কৌশিক আর তার মা কলকাতাতেই থাকত। বাবার সাথে কৌশিকের বরাবরই একটা দূরত্ব থেকে গেছে।
গৌতম বোস বেশ রাশভারি অফিসারই ছিলেন। বাষট্টি বছর বয়সেও বেশ ফিট রেখেছেন নিজেকে। ব্যক্তিত্বে অবশ্য এখনও কোনরকম মরচের লেশমাত্র ধরে নি।
গৌতম বাবু এসে খাটে বসলেন। ছেলেকে তিনি বরাবরই তুমি করে বলেন। তুই টাতে ঠিক সড়গড় নন।
“তুমি আজকাল বেশিরভাগ দিনই দেখছি জেগে কাটিয়ে দিচ্ছ। খুব স্ট্রেস যাচ্ছে নাকি?”
কৌশিক মোবাইলটা রাখল। বলল “হ্যাঁ ওই একটু যাচ্ছে”।
গৌতম বাবু তার দিকে তাকালেন। বললেন “ডার্কসার্কল আসাও শুরু হয়ে গেছে। এইভাবে জেগে থাকাটা কিন্তু শরীরের পক্ষে মারাত্মক হতেপারে। তুমি সেরকম বুঝলে ঘুমের ওষুধ ট্রাই করতে পার। তবে অবশ্যই ডাক্তার মিত্রের সাথে কনসাল্ট করে”।
কৌশিক এটা ভেবে দেখে নি। ঠিকই, তার যা অবস্থাযাচ্ছে তাতে এটা করাই যেতে পারে। বাবার কাছে হঠাৎই সে কৃতজ্ঞ বোধ করল।
“কালকে তাহলে ডাক্তার মিত্রের কাছে একবার যাব”।
“হ্যাঁ, অবশ্যই যাও। দিস ইজ নট গুড। বাই দ্য ওয়ে তুমি অ্যারিজোনা যাচ্ছ এটা ওই বাড়িতে জানিয়েছ তো?”
“আজকে জানালাম রূপাকে”।
মাথা নাড়লেন গৌতম। “এটা অনেক আগে বলা উচিত ছিল।আশা করব এটা নিয়ে কোন জটিলতা তৈরি হবে না”।
কৌশিক হাসল “না না, আমি বলার পরে খুব একটা রেগে যায় নি তো। একটু ভেবে দেখার টাইম নিয়েছে, তবে সেটার মধ্যেও নেগেটিভ কিছু দেখলাম না”।
“গুড। তাহলে অবশ্য কোন সমস্যা নেই”।
“না সেরকম কিছু নেই। তবে ও যদি বলে অ্যারিজোনা যাবে না, সেক্ষেত্রে ছ’মাস এই বাড়িতে থাকলে কোন অসুবিধা নেই তো?”
গৌতম অবাক হলেন। “এটা কি পসিবল? তুমি বিয়ের সাতদিনের মধ্যে চলে যাবে, আর ও এখানে একা থাকবে! তাছাড়া অনেক রকম প্রবলেম অ্যারাইস করতে পারে সেক্ষেত্রে, তুমি সবরকমভাবে চেষ্টা কর যাতে ও তোমার সাথে যায়, দরকার পড়লে আমিও কথা বলব ওদের ফ্যামিলির সাথে”।
কৌশিক বিরক্ত হল, কিন্তু মুখে কিছু বলল না। সে স্পষ্টতই বুঝতে পারছিল বাবা দায়িত্ব নিতে চাইছে না।
“ঠিক আছে। দেখছি”।
“গুড। সেটা হওয়াটাই ভাল। সেরকম চেষ্টাই কোর”।
উঠলেন গৌতম। বেরনোর সময় থমকালেন একটু “বাই দ্যওয়ে, আজ রাতের জন্য একটা অ্যালজোলাম চাইলে নিতে পার”।
কৌশিক হাসল “না ঠিক আছে”।
“ওকে দেন, গুড নাইট”।
“গুড নাইট”।
বাবা ঘর থেকে বেরলে সে বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকল। তারপর হঠাৎ এসকরট সার্ভিসের নাম্বারটা খোঁজা শুরু করল। তার মনে হচ্ছিল খুব শিগগিরি তার রঞ্জনার সাথে দেখা হওয়াটা দরকার। ভীষণ দরকার।
#
“হ্যালো রতনদা”।
“কি রে? সাতসকালে ফোন করছিস? এনি প্রবলেম?”
“আরে, তুমি যে এসকরট সার্ভিসের নাম্বারটা দিয়েছিলে সেটা কিভাবে যেন ফোন থেকে ডেল হয়ে গেছে। ওটা একবার রি সেন্ড কর প্লিজ”।
“কেন? আবার যাবি নাকি?”
“হ্যাঁ, আমার রঞ্জনার সাথে কথা বলতে হবে আর্জেন্ট”।
“কি পাগলামি হচ্ছে কৌশিক, এভাবে তোকে ওরা নম্বর দেবে নাকি? “
“না দিক, আমি সেক্ষেত্রে ওকে আগের দিনের মতোই তুলে নেব ওখান থেকে”।
“তুই পাগল হয়ে গেছিস, আরে সামনে তোর বিয়ে, একটা রাস্তার মেয়েকে নিয়ে এসব করিস না”।
“আমি কিছু করব না রতনদা আমাকে নম্বরটা দাও, আমার খুব জরুরি দরকার নম্বরটা বিশ্বাস কর”।
“বিশ্বাস অবিশ্বাসের ব্যাপার এটা নয় কৌশিক। আমার একটা নৈতিক দায় আছে এই ব্যাপারটায়, তোকে আমি কিছুতেই আর বিগড়োতে দিতে পারি না, ইনফ্যাক্ট এখন বুঝতে পারছি তোকে আমার এখানে যেতে বলাটাই বিরাট ভুল হয়ে গেছে”।
“তুমি দেবে কি দেবে না?”
“দেব না, আই অ্যাম সরি”
“ওয়েল, সেক্ষেত্রে আমি ওদের অফিসেই যাচ্ছি তাহলে”।
“কৌশিক, পাগলামি করিস না ভাই। তুই...”
রতনদা আর কিছু বলার আগে ফোনটা কেটে দিল কৌশিক।

১২।
ছোটবেলা থেকেই ঋজু ভীতু। সব কিছুতেই তার বড় ভয়। নার্সারি স্কুলে গিয়ে প্রথম প্রথম খুব কাঁদত। তারপর আরেকটু বড় হলে সিটিয়ে থাকত স্কুলের মধ্যে। সব খানে সব জায়গাতেই সে মুখচোরা, লাজুক।
টুয়েলভ অবধি সে ছেলেদের স্কুলে পড়ত। তাদের বাকি বন্ধুরা ব্যাচে মেয়েদের সাথে স্বাভাবিকভাবে কথাবার্তা বললেও সে কোনদিন পারে নি সেটা। সব সময় দূরে দূরে থাকত। এই নিয়ে অনেকে খ্যাপাতোও তাকে।
কলকাতা আসার পরে সে পড়ল মহা ফাঁপরে। তাদের ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভ মেয়ে, তার ল্যাবের পার্টনার মেয়ে, সব খানেই মেয়ে। মেয়েদের সাথে কমিউনিকেট করতে না পারলে কিছুই হবে না। আর সে ভয় পেল র‍্যাগিংয়ে। তাকে ডেকে দুজন সিনিয়র একদিন বলল তাদের ক্লাসের একটা মেয়েকে বিয়ে করতে হবে। জুতোর মালা পরিয়ে। তার মনে হয়েছিল মাটি কেন দুভাগ হয়ে যায় না, তাহলে সীতার মত সেও তলিয়ে যেতে পারত। র‍্যাগিংয়ের ভয়ে সে ক্যান্টিনে খেতেও যেতে পারত না। ভাবত এই বুঝি তাকে কেউ ধরে ভালমতন র‍্যাগিং করে। ক্লাসের বাকিদের র‍্যাগিংয়ের গল্প শুনে তখন তার ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা।
এই অবস্থা থেকে তাকে বাঁচাল অর্ঘ্য। অর্ঘ্য তাকে টিফিন খাওয়াত, নোটস যোগার করে দিত। বাড়িতেও নিয়ে যেত প্রায়শই। রূপা তখন স্কুলে পড়ত। প্রায়ই তাদের ঘরে আসত। অর্ঘ্যর সাথে নানান ব্যাপারে ঝগড়া। আর সে সিটিয়ে থেকে দেখত সে সব। যে ঝগড়াগুলি সে কোনদিন করতে পারে নি। রূপা যখন তাকে হঠাৎ কোন প্রশ্ন করে বসত তখন কোন উত্তর দিতে পারত না।
মেসে ফিরে খালি নিজেকে হাঁদা বলে মনে হত তার। সে প্রশ্নগুলির কতরকম উত্তর সে সময় মাথায় আসত কিন্তু কোনটাই সে বলতে পারে নি কোনদিন।
দিনের পর দিন, রিহার্সাল দিয়েছে, রূপাকে বলবে ভেবেছে। কিন্তু তার মধ্যে প্রবলভাবে দ্বিধা এসে দাঁড়িয়েছে। অর্ঘ্যর বিশ্বাসের কথাও ভেবেছে সে।
কলেজ কেটে শেষ মেষ রুপার অপেক্ষায় দাঁড়ানো শুরু করল সে। অজুহাত না খুঁজে পেয়ে ফুচকা খেত। একদিন হঠাৎ রূপা চলে এল, তার সাথে ফুচকা খেতে। আরও একবার সেই সিকোয়েন্সটা এল তার। মনে হচ্ছিল পায়ের তলার মাটি দুভাগ হয়ে যাক।
সে রাতে মেসের বাকি ছেলেদের সাথে মদ খেয়ে বিরাট এক প্রেমপত্র লিখল সে। তারপর সেটা দিতে লাগল আরও দিন সাতেক। প্রতিদিনই পকেটে করে নিয়ে যেত। আর ঘুরে চলে আসত। একদিন দিতে পারল সে। রূপাকে দাঁড় করাল। রূপা জিজ্ঞেস করল “কি ব্যাপার ঋজুদা আজ কলেজ যাও নি?”
সে বলেছিল “কলেজ ছুটি আছে”। অর্ঘ্য সেই সময় ওর মাসির বাড়ি নয়ডাতে গেছিল। তার মিথ্যেটা তাই রূপা ধরতে পারে নি।
হঠাৎ করেই সে রুপার হাতে চিঠিটা ধরিয়ে দেয়। বলেছিল “এটা পড়িস”।
বলে আর দাঁড়ায় নি। পালিয়ে এসছিল সেখান থেকে। রূপা থতমত খেয়ে গেছিল।
সে যখন সেখান থেকে যাচ্ছিল তার মনে হচ্ছিল গোটা কলকাতা তার পেছনে পড়েছে। সবাই তাকে তাড়া করছে। সবাই খুঁজছে তাকে। এক ভয়াবহ অপরাধ করে ফেলেছে সে।
অর্ঘ্য ফিরলে ভালভাবে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কথাও বলতে পারত না সে।
কয়েকদিন যাবার পর বুঝেছিল রূপা কিছুই বলে নি কাউকে। কিন্তু তারপর থেকে সে আর কোনদিন রূপাদের বাড়িতে যায় নি।
কিছুদিন আগে অর্ঘ্য যখন ফোন করে রূপার বিয়ের কথাটা বলেছিল,তখন ভীষণ কষ্ট হল তার। কিন্তু কাউকে কিছু বলল না। আর আশ্চর্যজনকভাবে সে দেখতে পাচ্ছে তার পর থেকেই নানাভাবে রূপার সামনে পড়ে যাচ্ছে সে। কিভাবে এর থেকে পালাবে সে বুঝতে পারছে না।
একদিকে শ্রেয়ার এই অসহ্য জ্বালাতন যদিও বা সে সহ্য করছিল কোনরকমে, রূপার সাথে এই হঠাৎ হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়াটা তাকে নানাভাবে ক্ষত বিক্ষত করে তুলছিল।
এই উইকএন্ডে তাই সে সিদ্ধান্ত নিল বাড়ি যাবে। কলকাতা থাকলেই শ্রেয়ার সাথে ঘুরতে হবে, তার চেয়ে বাড়ি যাওয়াটাই ভাল। সকালে ঘুম থেকে উঠেই গোছগাছ শুরু করল সে।
তার সোমবার অফ থাকে, শনি রবি সে অফিসে বলে ছুটি নিয়ে নিল।
ফোনটা সুইচ অফ করতে যেতেই দেখল একটা আন নোন নম্বর থেকে ফোন আসছে, ধরল না প্রথমবার। দ্বিতীয়বার ধরতেই ওপাশ থেকে একটা বয়স্ক পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এল “ঋজু বলছ?”
“হ্যাঁ বলছি”।
“আমি প্রিয়তোষ বলছি, অর্ঘ্যর জ্যেঠু, চিনতে পারছ?”
“হ্যাঁ বলুন”।
“তুমি কি একটু আমার সাথে দেখা করতে পারবে আজ?”
একটু ভাবল ঋজু। হঠাৎ অর্ঘ্যর জ্যেঠু দেখা করতে চাইছে কেন। কিছুই বুঝতে পারছিল না সে।
“আসলে আমি একটু বাড়ি যাচ্ছিলাম আজ”।
“তাই? তুমি কি বেরিয়ে গেছ? কোথায় বাড়ি তোমার?”
“বোলপুর”।
“ওহ, তাহলে আজ কি আর হচ্ছে না?”
না বলবে না হ্যাঁ বলবে বুঝতে পারছিল না সে। শেষমেষ বলল “কোথায় দেখা করবেন?আপনাদের বাড়ি যাব?”
“নাহ্, তুমি একটা কাজ কর, এই সাড়ে দশটা নাগাদ টালিগঞ্জ মেট্রোর ওখানে চলে আস, ওখান থেকে দেখি কোথায় যাওয়া যায়”।
“ঠিক আছে”।
“তাহলে দেখা হচ্ছে?”
“হ্যাঁ, আমি তাহলে দেখা করে বাড়ির দিকে রওনা হব না হয়”।
“ওকে, চলে আস”।
ফোনটা রাখলেন প্রিয়তোষ। আর ঋজু ফোনটা রাখার সাথে সাথে দেখল শ্রেয়ার এস এম এস এসে গেছে, “come @south city @12”.
সে তৎক্ষণাৎ রিপ্লাই করে দিল “going home, will return on Tuesday”.
শ্রেয়া ছোট করে উত্তর দিল “ok, have a safe journey”.
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। একটা অস্বস্তি ধীরে ধীরে গ্রাস করছিল তাকে। কি বলবে অর্ঘ্যর জ্যেঠু? কিছুই বুঝতে পারছিল না। ব্যাগটা গুছিয়ে স্নানে ঢুকল সে। ন’টা বেজে গেছে। স্নান সেরেই তাকে দৌড়তে হবে।
#
প্রিয়তোষের সাথে ঋজুর খুব একটা দেখা সাক্ষাৎ হত না অর্ঘ্যদের বাড়ি গেলে। বেশিরভাগ সময়েই অফিসে থাকতেন। আর না হলে ঘরে। অর্ঘ্যর সাথে ওর জ্যেঠুর খুব একটা যোগাযোগ ছিল না। থাকলেও সেটা ক্ষীণ। হঠাৎ কেন ভদ্রলোক দেখা করতে চাইছেন সেটা সে ধরতে পারছিল না।
মেট্রোর টিকেট কাউন্টারের সামনেই প্রিয়তোষ দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাকে আসতে দেখে এগিয়ে এলেন “এসে গেছ? বেশ। চল আমরা কোথাও একটা গিয়ে বসি”।
ঋজু বুঝতে পারছিল না কোথায় বসবে। প্রিয়তোষ বললেন “আচ্ছা চল, একটা ট্যাক্সি নি। আমার একটা ফ্ল্যাট আছে নাকতলায়, ওখানেই গিয়ে বসা যাক”।
ঋজু আর না করল না। খানিকটা হাঁটতেই ট্যাক্সি পাওয়া গেল। ট্যাক্সিতে বসে দিকনির্দেশ দিয়ে প্রিয়তোষ বললেন “তাহলে তোমরা এ দেশী তাইত?”
ঋজু হকচকিয়ে গেল হঠাৎ প্রশ্নটা শুনে। বলল “না, আমাদের পূর্বপুরুষ ওপার বাংলার ছিলেন। বিয়াল্লিশ সালে অবশ্য আমার ঠাকুরদা চলে আসেন, পার্টিশানের আগেই। উনি কেন বোলপুরে বাড়ি কিনেছিলেন সেটা অবশ্য বলতে পারব না”।
“ও আচ্ছা। তোমার সাথে অর্ঘ্যর যোগাযোগ আছে?”
“কম, ফোন করে মাঝে মাঝে”।
“হুম, ওকে”।
বাকি রাস্তা প্রিয়তোষ তার সাথে আর কোন কথা বললেন না। কোনও শেয়ারের দালালের সাথে ফোনে কথা বলে চললেন অনেকটা সময় ধরে। সে শনিবারের ব্যস্ত কলকাতা দেখেই কাটাল বাকি সময়টা।
নাকতলায় বেশ ভাল একটা কমপ্লেক্সে ফ্ল্যাট ভদ্রলোকের। দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল ঋজুর। সে বুঝতে পারছিল বহুদিন চাকরি করলেও এরকম একটা ফ্ল্যাট বাগানো তার কাছে বেশ কষ্টসাধ্য। অবশ্য ভদ্রলোক বিয়ে থা করেননি। সেভিংসের ক্ষেত্রে খুব একটা সমস্যা হয় নি।
ফ্ল্যাটের ইন্টিরিওর দামী ফার্নিচার দিয়ে সাজানো। বেশ নরম একটা সোফায় বসে প্রিয়তোষ বললেন “এই ফ্ল্যাটের কথাটা আমাদের বাড়ির কেউ জানে না, তিন বছর আগে কিনেছিলাম”।
ঋজু অবাক হল কথাটা শুনে । কি বলবে বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকল।
প্রিয়তোষ বলে চললেন “ইচ্ছা ছিল রূপার বিয়েতে সবাইকে চমকে দেব এই ফ্ল্যাটটা দেখিয়ে। সারপ্রাইজ দেব। রূপার জন্য এই ফ্ল্যাটটা কিনেছিলাম।আমার জীবনের সঞ্চয়ের একটা বড় অংশ দিয়ে। ওকে দেব বলে।আমার সব চেয়ে প্রিয় ভাইঝি। কিন্তু একটা সমস্যা হয়ে গেল। কালকে রাতে রূপা হঠাৎ ঘোষণা করল ও এই বিয়েটা করবে না। এবার কি করা উচিত আমার?”
ঋজুর হার্টবিট মিস হল একটা। সে বুঝতে পারছিল না, প্রিয়তোষ হঠাৎ তাকে এইসব কথা বলছেন কেন! তাহলে কি রূপা ওকে ওর ব্যাপারে সব বলে দিয়েছে? যদি বলে থাকে তাহলে সেটা তার পক্ষে ভাল না খারাপ সেটাও বুঝতে পারছিল না সে।
সে কিছু না বোঝার ভান করে বলল “আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না, মানে, এই ব্যাপারে আমি কি করব...”
প্রিয়তোষ একটা সিগারেট ধরালেন “তুমি একটা নেবে? আমাকে লজ্জা পেও না,একটা নিতেই পার”।
ঋজু বলল “না, ট্রায়িং টু কুইট”।
“ওহ, গুড। এটা ভাল। আমিও বহুবার চেষ্টা করেছি বাট ফেইল্ড। যাক গে, যেটা বলছিলাম, এবার রূপা বলছে বিয়েটা করবে না, কি সমস্যা বল তো”।
ঋজু বলল “আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না আমি কি বলব এই ব্যাপারে। কেন করবে না সেটা বলেছে কিছু?”
প্রিয়তোষ একটা লম্বা টান দিলেন সিগারেটে “হ্যাঁ বলেছে, ওর মনে হয়েছে, কৌশিক, মানে যার সাথে ওর বিয়ে হবার কথা ছিল সে ওকে ডমিনেট করার চেষ্টা করছে, এটাই বলেছে”।
ঋজু সতর্ক ভাবে বলল “আচ্ছা”।
প্রিয়তোষ বললেন “তা আমি ভাবছি, বিয়েটা তো ভেঙেই যাবে, তার আগে একটা লাস্ট চান্স নিলে কেমন হত? মানে তুমি যদি ওকে একটু বোঝাতে এই ব্যাপারে”।
ঋজু অবাক হল। “আমি? মানে আমি এখানে কি করে এলাম কিছু বুঝতে পারছি না তো। রূপাকে আমি কি বলব, আর ওই বা আমার কথা শুনবে কেন? মানে ও অর্ঘ্যর বোন, অর্ঘ্য আমার কলেজ লাইফের বন্ধু, খুব বেশি হলে দশ বারোবার আপনাদের বাড়ি গেছি, তাও কলেজের ব্যাপারে। রূপাকে তো আমি চিনিই না ভাল করে। আমি ওকে কি বোঝাব? আমি বুঝালেই বা ও কেন শুনবে? তাছাড়া আমি তো আজ বাড়ি যাব। এই ব্যাপারে আমি আসছি কেন সেটাই তো বুঝছি না”।
প্রিয়তোষের ঠোঁটের কোণায় একটা হাসি ফুটে উঠল, বললেন “আসলে একটা রিসার্চের ব্যাপারে পড়ছিলাম সেদিন। কোন এক মনোবিজ্ঞানী বলেছেন আমরা নাকি ঘরের লোকেদের থেকে বাইরের লোকেদের কথা বেশি শুনতে পছন্দ করি। সো কালকে রাতে আমি আমাদের পরিচিত লোকেদের নাম নিয়ে একটা লটারি করলাম। তাতে দেখলাম তোমার নামটা উঠেছে। দেন আই কলড ইউ ইন দ্য মর্নিং। এবার তোমাকে তো আমাকে হেল্প করতেই হবে, বুঝতেই পারছ এটার সাথে একটা ফ্যামিলি প্রেস্টিজ জড়িত। ওর উড বি কৌশিক একটা বিরাট চাকরি করে। আমেরিকায় নিয়ে যেতে চাইছে ওকে বিয়ের সাতদিনের মধ্যে। ও নারাজ। কেন কৌশিক ওকে বিয়ের ঠিক পনেরো দিন আগে এই কথাটা বলেছে এই নিয়ে ওর রাগ, তোমাকে এটাই বোঝাতে হবে কৌশিক সব ওর ভালোর জন্য করছে, দ্যাটস ইট!”
ঋজুর মনে হল সে শুনেছিল বটে লোকজনদের বিয়ে না হলে নানারকম বাতিক চাগাড় দেয়, সে আজ চাক্ষুস দেখতে পেল। সে উঠে পড়ল, বলল “দেখুন, এই ব্যাপারে আমি আপনাকে কোনরকম সাহায্য করতে পারব না। আমি এমনিতেই অনেকরকম সমস্যায় জর্জরিত, তার ওপর এই ধরণের রিসার্চের গিনিপিগ হওয়ায় আমার বেশ আপত্তি আছে”।
প্রিয়তোষ সিগারেট খেতে খেতে হাতের ইশারায় তাকে বসতে বললেন। তারপর বললেন “তুমি আগেই না বলছ কেন? আগে পুরোটা শোন। এটা তো একটা সিক্রেট মিশন। এর জন্য তোমাকে আমি একটা গুড অ্যামাউন্ট অফ মানি পেও করব। ধর লাখ দেড়েক টাকা তো বটেই”।
ঋজু বেশ রেগে মেগেই বলল “আপনি আমাকে টাকার লোভ দেখাবেন না প্লিজ”।
“আহ, তুমি রেগে যাচ্ছ কেন? টাকাটা তো তোমার সময়ের দাম মাত্র। তুমি এই কাজটাতে ইনভলভ হবে, তোমার একটা সময় অপচয় হবে, তার পরিবর্তে তো এইটাকাটা আমি তোমাকে দিচ্ছি। তোমাকে টাকা দিয়ে অসম্মান করার কোনরকম অভিপ্রায় আমার নেই”।
ঋজু কি বলবে বুঝতে পারছিল না। এ তো আচ্ছা সমস্যায় পড়া গেল। সে যত ভাবে এই সব সমস্যার থেকে দূরে থাকবে, আরও বেশি করে তাকে জড়িয়ে পড়তে হয়।
দুজনেই বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে থাকল। নীরবতা ভঙ্গ করল ঋজুই “কিন্তু রূপাই বা কেন আমার সাথে কথা বলবে এই ব্যাপারে। আমি একটা বাইরের লোক”।
প্রিয়তোষ আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললেন “বলবে বলবে। সে দায়িত্ব আমার। তুমি একটা কাজ কর, কাল দুপুর নাগাদ আমাদের বাড়িতে আস। কাল রূপার বাবা মা বাইরে যাবে একটা কাজে। বাড়িতে আমি আর রূপা থাকব। তুমি আস। আমি তোমার সাথে রূপার রি ইন্ট্রোডাকশান করিয়ে দেব। সাধারন কথাবার্তা বলবে। তারপর ধীরে ধীরে হাড়ির খবর বের করা শুরু করবে। নট আ বিগ ডিল, তুমি দেখে নিও, আর তোমার মেইল আইডিটা দাও, আমি আরও কিছু ইন্সট্রাকশান্স তোমাকে সেন্ড করে দেব কিভাবে ওকে কৌশিকের ব্যাপারে মন ঘোরাতে হবে সে নিয়ে ”।
ঋজু বেশ শক্তভাবে বলল “না, আমি পারব না, আমি আজ বাড়ি যাব, কিছুতেই এই সব কাজে আমি জড়াব না”।
প্রিয়তোষ উঠলেন “এত নেগেটিভ ভাববে না কিছু, ভাব, ভাব। আজকের দিনটা ভাব। কাল দুপুর বারোটা নাগাদ চলে আসো। কোন সমস্যা নেই। আমি থাকব। চল তোমাকে টালিগঞ্জ পৌঁছে দিই। আর তুমি কোথাও যাচ্ছ না আজ। নেক্সট উইক বাড়ি যেও না হয়”।
ঋজু উত্তর দিল না কোন, প্রিয়তোষ লোকটাকে তার ঠিক সুস্থ বলে মনে হচ্ছিল না।

১৩।
“গুড মর্নিং স্যার”
“গুড মর্নিং”
“আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি”?
“অ্যাকচুয়ালি আই এম ফাইন্ডিং সামওয়ান”।
“ডু ইউ নিড আওয়ার সার্ভিস স্যার?”
“নো, নো, নট একজ্যাক্টলি সো। উইল ইউ প্লিজ টেল মি অ্যাবাউট রঞ্জনা?”
“স্যার, এইভাবে আমি আপনাকে কোনরকম হেল্প করতে পারব না। আমাদের উপর স্ট্রিক্ট ইন্সট্রাকশন আছে আমরা কারও সম্পর্কেই কোনরকম ডেটা কাস্টমারদের দিতে পারব না, আপনার যদি কাউকে দরকার হয় তাকে হায়ার করতে পারেন, বাট স্যার...”
“ওকে, প্লিজ চেক, লাস্ট উইক আমি রঞ্জনা বলে একজনকে নিয়েছিলাম ফর টু ডেস, তাকে আজকের জন্য বুক করতে চাই, আমার নাম কৌশিক, কৌশিক বোস”।
“ওকে স্যার, প্লিজ গিভ মি সাম টাইম”।
“ওকে”।
...
...
...
“উই কান্ট টেল হার নেম স্যার, বাট দ্য লেডি ইউ টুক লাস্ট উইক, শি ইজ নট অ্যাভেইলেবল স্যার”।
“হোয়াট? ফর হাউ লং?”
“কান্ট সে স্যার”।
“হোয়াট কান্ট সে? আই নিড হার। আই নিড হার ইমিডিয়েটলি। ইটস ভেরি আর্জেন্ট”।
“কুল ডাউন স্যার, ওকে, প্লিজ লেট মি চেক”।
“ওকে”।
...
...
“নো স্যার, দু মাস কোন গল্প নেই, শি ইনফরমড আস”।
“প্লিজ গিভ মি হার নাম্বার”।
“নট পসিবল স্যার”।
“হোয়াট নট পসিবল? কত টাকা চান আপনি?”
“স্যার প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড। এটা টাকার ব্যাপার না। আমরা আপনাকে দিতে পারব না তার ডিটেইলস। ইটস ট্রেড সিক্রেট”।
“শিট। শিট”।
“স্যার, প্লিজ, কুল ডাউন। আপনাকে আমি কিছু স্যাম্পেলস দেখাচ্ছি, একদম লেটেস্ট আছে, সামান্থা হার নেম, শি ইজ এক্সট্রিমলি হট স্যার, প্লিজ সি হার স্যার, শি উইল ড্রাইভ ইউ ক্রেজি”।
“গো টু হেল, জাস্ট গো টু হেল ইউ বাস্টার্ড”।
“স্যার, প্লিজ লিসন, স্যার... যাহ, চলে গেল মালটা। কতরকম যে পাগলাচোদা আসে শালা”।
#
“হ্যালো, কৌশিক”।
“হ্যাঁ বলুন”।
“আমি প্রাণতোষ বলছি, রূপার বাবা”।
“হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি, বলুন”।
“কেমন আছ?”
“ভাল আছি”।
“বিজি আছ কি খুব?”
“না, বলুন”।
“আসলে কিছু কথা ছিল, সামনাসামনি বলা দরকার, তোমার কাছে কি টাইম হবে?”
“কবে? আজকে?”
“হ্যাঁ, আজকে। বিকেলের দিকে হলে ভাল হয়”।
“হুম, না, আজকে তো হবে না, মে বি কালকে, আসলে এই উইকএন্ডটা আমি একটু ব্যস্ত আছি”।
“ওহ, নো প্রবলেম। ঠিক আছে, ঠিক আছে, তাহলে বোল তোমার কবে সুবিধা হবে। সে হিসাবে একটু বসলে ভাল হত”।
“ওকে, ঠিক আছে। বলব, রাখি এখন?”
“ওহ ইয়েস, ডেফিনিটলি, বাই, টেক কেয়ার”।
“বাই”।
#
গাড়ি নিয়ে কলকাতা শহরটা কিছুক্ষণ পাগলের মত ঘুরল কৌশিক, বেশ কয়েকবার ট্রাফিক সিগনাল ভাঙল। তারপর রাজারহাট চলে গেল। বেশ কিছুক্ষণ ফাঁকা রাস্তায় স্পিডে ড্রাইভ করল। একের পর এক সিগারেট খেয়েও বুঝতে পারছিল না কি করবে।
বেশ কিছুক্ষণ পর এয়ারপোর্ট ক্রস করে নিবেদিতা সেতু হয়ে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরল সে। প্রায় একশো কুড়ি কিলোমিটারে পাগলের মত ড্রাইভ করে দুপুর নাগাদ আসানসোল পৌঁছে গেল। আসানসোলে তার এক পিসি থাকেন। বেশ বয়স্কা। কয়েকদিন আগে এসছিল সে পিসির বাড়ি বাবা মা কে নিয়ে। আসানসোল পৌঁছে তার বাড়িতেই চলে গেল।
পিসির এক ছেলে। তার থেকে পাঁচ বছরের বড়। ওকে ভাইদা বলেই ডাকে সে ছোট থেকে। লোকাল কর্পোরেশনে কন্ট্রাক্টরি করে। তার স্ত্রী পরমা আর মেয়ে রূম্পা ক্লাস ফাইভে পড়ে। সবাই বাড়িতেই ছিল।
ডোরবেল বাজলে রূম্পা দরজা খুলল। তাকে দেখে বেশ অবাকই হল “একি কাকু তুমি?”
কৌশিক স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করল “এই এদিকে এসছিলাম ভাবলাম তোদের সাথে দেখা করে যাই। কেমন আছিস তোরা?”
ভাইদা বেরিয়ে এল। দুপুরে ভাত ঘুম দিচ্ছিল হয়ত,ফোলা চোখে তাকে দেখে বেশ অবাক হয়ে গেল “কি রে? হঠাৎ কোন খবর না দিয়ে কি ব্যাপার বলত?”
কৌশিক জুতো খুলে ঘরে ঢুকল, এবার হাসল “এই ভাবলাম তোদের একটু সারপ্রাইজ দিই, সকাল সকাল একটু লং ড্রাইভে বেরিয়েছিলাম, চলে এলাম”।
“যাহ, তা একবার খবর দিলে কি হত পাগল?”
“না না, আরে বেশিক্ষণ থাকব না”।
“দূর তা বললে চলবে নাকি। মা, দ্যাখো বাবাই এসেছে”।
এবাড়ির লোকজন তাকে বাবাই বলে ডাকে। ভাইদার ডাকে পিসি বেরিয়ে এলেন, তিনিও বেশ অবাক হয়ে তাকে দেখছিলেন “কিরে, তুই তো কোনদিন নিজে আসিস না জোর করে না নিয়ে আসলে, কি ব্যাপার বলতো? গানু, রত্নারা ভাল আছে তো?”
কৌশিক ম্যানেজ করার চেষ্টা করল “দূর, আমি যেন আসতে পারি না, ভাল পুলিসি জেরা শুরু করলে তো”।
“তা খেয়ে এসছিস তো?”
“না, খাব তো এখন”। হঠাৎ করে খিদেটা টের পাচ্ছিল সে।
মা ছেলে মুখ চাওয়া চাউয়ি করল, পিসি বললেন “দেখ কান্ড, চল, আগে বলিসও নি কিছু, যা আছে তাই দিয়ে খাবি”।
“হ্যাঁ, যা আছে দাও তো, অত স্পেশাল কিছু করতে হবে না”।
পরমা চিরকালই কৌশিকের একটু লেগ পুলিং করে, ঘর থেকে বেরিয়ে তাকে দেখে গালে হাত দিল “কি হে কৌশিকবাবু, হবু গিন্নির ভয়ে এখন থেকেই কলকাতা ছেড়ে পালাতে লেগেছ নাকি?”
কৌশিক সটান ডাইনিং রুমে গিয়ে বেসিনে হাত ধুতে ধুতে বলল “যা আছে শিগগির খেতে দাও তো, নইলে এবার তোমাদের খাওয়া শুরু করব”।
বাড়ির সবাই তাকে অবাক হয়ে দেখতে লাগল।
#
রাত দশটার দিকে রূপারা যখন সবাই খেতে বসেছিল ডোরবেলটা বেজে উঠল। প্রিয়তোষ দরজা খুলে অবাক হলেন। কৌশিক দাঁড়িয়ে আছে। বেশ বিধ্বস্ত চেহারা। বললেন “আসো ভেতরে আসো”।
কৌশিক ক্লান্তস্বরে বলল “নাহ, ভেতরে যাব না এখন, একটু রূপাকে ডেকে দেওয়া যাবে?”
“ওকে”।
প্রিয়তোষ ভেতরে গিয়ে রূপাকে বললেন “কৌশিক এসছে, তোকে ডাকছে”।
রূপা চোখ বড়বড় করে বলল “এখন? এই সময়? তোমরা কি কিছু বলেছ?”
প্রাণতোষ আর রূপার মা দুজনেই বিস্ময় লুকোতে পারছিলেন না, তারা দুজনেই মাথা নাড়লেন। রূপা ঘরের পোশাক পরে ছিল। হাত ধুয়ে একটা ওড়না জড়িয়ে বাইরে গেল।
কৌশিককে এই অবস্থায় দেখে তার মায়া হচ্ছিল। চোখ মুখ বসে গেছে রীতিমত। সে ড্রয়িংরুমে এনে বসাল ওকে।
বলল “বল, এত রাতে এই সময়? সব ঠিক আছে তো?”
কৌশিক বলল “আসলে একটা কথা বলতে এলাম। তোমার ভিসা বোধহয় এত তাড়াতাড়ি পাওয়া যাবে না। বিয়ের দু মাস পর তোমাকে যদি একা একা যেতে বলা হয় পারবে তো যেতে?”
রূপা প্রশ্নটা শুনে থমকাল। এই কথাটা বলার জন্য এত রাতে কৌশিক তাদের বাড়িতে এসছে এটা ভেবে সে একটু দ্বিধায় পড়ল। কয়েক সেকেন্ড পর বলল “পারব হয়ত”।
কৌশিক আশ্বস্ত হল, “বেশ। আমাকে একটু জল খাওয়াতে পারবে?”
“শিওর”।
“থ্যাঙ্কস”।
রূপা জল নিয়ে এসে দেখল কৌশিক নেই, বেরিয়ে গেছে।

১৪।
মেসের বাকিরা বোতল নিয়ে বসেছে। রানা, পালিত, পিঙ্কুরা। তাকে বলেছিল ওরা, কিন্তু সে না করে দিয়েছে। তার ঘরেই বসেছে। সে চুপচাপ শুয়েছিল। চিপস দিয়ে শুরু হয়েছে,কাজের মাসি মাংস করছে। আজকে আবার স্পেশাল ইন্সট্রাকশান আছে, ঝাল যেন বেশি করে হয়।
ঋজু বুঝতে পারছিল না সে কেন কোনদিন কাউকে না বলতে পারে না। শ্রেয়ার মত একটা আপদ জুটেছে তার ঘাড়ে। আজকে যুক্ত হল প্রিয়তোষ। যে মেয়ের উপর তার এককালে প্রবল চাপ ছিল, যাকে না দেখলে একসময় মনে হত দিনটা নষ্ট হয়ে গেল,যার জন্য তার একটা সেমে জঘন্য রেজাল্ট পর্যন্ত হয়ে গেছিল, এমনকি যে মেয়েটাও জানে যে সে তাকে ভালবাসে, তাকে বোঝাতে হবে সে যেন বাড়ির পছন্দ করে দেওয়া ছেলে কে বিয়ে করে!
অথচ প্রিয়তোষ যখন বলল রূপা সম্বন্ধটা কাটিয়ে দিতে চাইছে তখন তো তার বেশ আনন্দ হয়েছিল মনে মনে, যদিও সেটা প্রকাশ করে নি তখন।
কি বলে বোঝাবে রূপাকে? তখন সামনে প্রিয়তোষও থাকবে! কিছুই ঠিক করে উঠে পারছিল না সে। লোকটা কি মনে করে তাকে? টাকার জন্য সে এই কাজটা করবে? আবার মেয়েটা রূপা বলেই সে সরাসরি কাটিয়ে দিতেও পারছিল না। বরং বারবার মনে হচ্ছিল এই সুযোগে তো রূপার সাথেও দেখা হয়ে যাবে, সেটাই বা মন্দ কি!
অবশেষে রানাকে বলল “একটা পেগ বানা তো আমার জন্য”।
রানা বিরক্ত হল “আগে বলবি তো, তোর এই জিনিসটাই আমার ভাল লাগে না, সব লাস্ট মোমেন্টে এসে বলিস”।
পালিতের গন্ধেই নেশা হয়ে যায়, ও সে অবস্থাতেই হাত নাড়ল “ওসব ছাড় রানা, ঋজু খেতে চেয়েছে, ওকে দে”।
রানা বলল “সে তো দেবোই, নীচে আয়, এখানে এসে বস, তুই খাটের উপরে বসলে কিন্তু জমবে না ব্যাপারটা যাই বলিস”।
দু তিনটে নেবার পর তার খানিকটা টেনশন ফ্রি লাগছিল। মনে হচ্ছিল কি আর এমন কঠিন কাজ, ঠিকই ম্যানেজ হয়ে যাবে। হয়ত যা ভাবছে সেরকম নাও হতে পারে। প্রিয়তোষের সামনে রূপা চুপচাপ তার কথা শুনেও যেতে পারে।
রানাদের কথাবার্তা কিছুই কানে আসছিল না তার। মনের মধ্যেই রূপার সাথে কথোপকথন প্র্যাকটিস করে যাচ্ছিল সে।
রাত এগারোটা নাগাদ হঠাৎ করে দেখল শ্রেয়া ফোন করছে। ঠেক থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে ফোন ধরল সে “হ্যালো”।
“হ্যাঁ ঋজু? পৌঁছেছ?”
সে বুঝতে পারল সত্যিটা বললে শ্রেয়া আবার বিরক্ত করা শুরু করবে, তাই মিথ্যেটাই বলল সে “হ্যাঁ এই তো বিকেল নাগাদ এসে পৌঁছলাম”।
“গুড। আরে কালকে আমরা শান্তিনিকেতন প্ল্যান করছি, ভাবলাম তুমি তো আছই ওদিকে, ওই সকাল দশটা নাগাদ পৌঁছব, তুমি তাহলে চলে এস”।
নিজের দুগালে দুটো চড় কষাতে ইচ্ছে করছিল ঋজুর।
সে একটা মরিয়া চেষ্টা করল “না, আসলে কালকে আমাদের বাড়িতে একটা কাজ আছে, আমার কাকার ছেলের জন্মদিন, কালকে কোথাও বেরনো সম্ভব হবে না হয়ত”।
“ওয়াও, গ্রেট, তাহলে তো তোমাদের বাড়িই চলে যাব দুপুর নাগাদ, অ্যাড্রেসটা এস এম এস কর শিগগির”।
সে নিজেই বুঝতে পারছিল নিজের ফাঁদে নিজেই এবার আটকা পড়ে যাচ্ছে। সে এবার একটু শক্ত হল, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার জন্যই হয়ত বা, “না না, কালকে আমাদের বাড়ি না আসাই ভাল, গ্রামের মধ্যে তো, অনেকরকম কমপ্লিকেশনস আছে”।
শ্রেয়ার গলাটা এবার একটু থমথমে শোনাল “ওকে, ফাইন, গুড নাইট”।
আর কিছু না বলে ফোনটা কেটে দিল মেয়েটা। ঋজুর টেনশন হচ্ছিল। এর ফলে অফিসে না আবার কোন ঝামেলায় পড়তে হয় তাকে। অন্যদিকে মন্দ লাগছিল না। এই মেয়েটার হাত থেকে বাঁচার জন্য যদি তার চাকরি যায় যাক। আর পারা যাচ্ছে না। নেশা হলে মনের বেপরোয়া ভাবটা সরকার গঠন করে। এখন সেই বেপরোয়া ভাবটার সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণেই তার কিছুটা ফুরফুরে লাগছিল।
ঘরে ঢুকতে যেতেই ফোনের দিকে তাকাতে দেখতে পেল দুটো মিসড কল। প্রিয়তোষের। সে যখন শ্রেয়ার সাথে কথা বলছিল তখনই ফোন করেছিল হয়ত। সে কলব্যাক করল, একটা রিং হতেই ফোন ধরে নিল প্রিয়তোষ “কি ব্যাপার, এত রাতে ফোন এনগেজড, প্রেম ট্রেম কর নাকি?”
“না, অফিসের একটা কল ছিল”। সে মিথ্যে করে বলল।
“অ, আমি ভাবলাম তোমার বসের মেয়ের সাথে আবার প্রেম করছ নাকি”।
ঋজু আশ্চর্য হল। এই লোকটা কি তার ফোনে আড়ি পাতছে না পেছনে গোয়েন্দা লাগিয়েছে? নইলে বসের মেয়ের কথাই বা জানল কি করে। তারপরই তার মনে হল রূপা তাকে শ্রেয়ার সাথে দেখেছে। ওই বলেছে হয়ত। তবে এই সম্ভাবনাটা তার কাছে ক্ষীণ মনে হচ্ছিল। রূপা তার সম্পর্কে এত কথা বাড়িতে বলবে, এই ব্যাপারটা তার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না।
সে কাটাতে চেষ্টা করল “না, অফিস কল ছিল”।
“ওকে, ফাইন, তোমাকে একটা আপডেট দেবার জন্য ফোন করেছি। কিছুক্ষণ আগে কৌশিক এসছিল, ও রূপাকে বলে গেছে বিয়ের পরপরই ওর আমেরিকা যাবার দরকার নেই। দু মাস পর যেতে হবে, ভিসার সমস্যা আছে হয়ত, তারপর থেকে রূপার মনটা কিছুটা সফট হয়েছে মে বি টুওয়াড়ডস হিম। সুতরাং কাল তোমার কাজটা খুব একটা কঠিন হবার কথা নয়”।
ঋজু খুশি হবে না দুঃখ পাবে বুঝতে পারছিল না। সে তেতো গলায় বলল “ও, তাহলে তো আমি না গেলেও হয়, সিচুয়েশন তার মানে আন্ডার কন্ট্রোল হয়ে গেছে”।
“উহু, সেটা আমি ডিসাইড করব, তুমি কালকে অবশ্যই আসবে”।

১৫।
“সমস্যাটা কি?”
গৌতম এবার নক করে ঢোকেননি, কৌশিক খানিকটা হকচকিয়ে গেল। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে বারোটায় প্রবেশ করছে।
কোনরকমে বলতে পারল সে “মানে?”
“তুমি আসানসোলে গিয়েছিলে?”
“হ্যাঁ। লঙ ড্রাইভে বেরিয়েছিলাম, ভাবলাম একবার ঢু মেরে আসি”।
“স্ট্রেঞ্জ”। গৌতম খাটের কোণে বসলেন এবার সত্যিকারের অবাক হয়েই।
“কেন? স্ট্রেঞ্জ কেন?” কৌশিক খানিকটা আক্রমণাত্মক হল।
“তোমাকে কোন রিলেটিভের বাড়ি নিয়ে যেতে তোমার পা ধরতে হয় কৌশিক। এই সেদিনও আসানসোলে যাওয়া নিয়ে তোমার মায়ের সাথে কি নাটকটাই না করলে! আর সেখানে আজ তুমি নিজে নিজেই চলে গেলে?”
কৌশিক মোবাইলে খেলছিল। সেদিকে তাকিয়েই জবাব দিল, “ইচ্ছা হল তাই গেছিলাম। বেশিক্ষণ ছিলাম না তো, ওই খেয়ে দেয়েই চলে এসছিলাম”।
“হুম। খেলে এবং কাউকে বাই বলার প্রয়োজনীয়তাটুকুও বোধ করলে না? তুমি কি ড্রিঙ্ক করেছিলে নাকি? ওই অবস্থাতেই গাড়ি চালিয়েছ?”
“না, ড্রিঙ্ক করিনি। তবে বাই বলেছি কিনা মনে করতে পারছি না এই মুহূর্তে”।
গৌতম এবার রাগলেন একটু, “ফোনটা রাখো, এটা কি ধরণের ভদ্রতা”।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফোনটা রাখল কৌশিক “বল”।
“সমস্যাটা কি কৌশিক? আমি সমস্যাটা জানতে চাইছি। তোমার কি বিয়েতে কোন আপত্তি আছে? থাকলে বল, এখনও সময় আছে। হোয়াই আর ইউ বিহেভিং অ্যাবনরম্যালি? হোয়াট হ্যাপেন্ড?”
“নাহ, কোন সমস্যা নেই। সত্যিই কিছু নেই”।
“দেখ কৌশিক, তোমার সাথে আমার বন্ধুর মত সম্পর্ক নয়। এমনকি আমি সেভাবে তোমাকে চিনিও না। কিন্তু আমি একটা জিনিস জানি, তুমি স্ট্রেট লাইনে চলা ছেলে। তোমার সব কিছু সোজাসুজি হয়। যেটা কর সেটা কোয়াইট ট্রান্সপ্যারেন্ট অ্যান্ড সেটা নিজের সম্পর্কে শিওর হয়েই কর। তুমি পিসির বাড়ি যাবে বা না যাবে সেটা বিগ ডিল না, বিগ ডিল কিন্তু অন্য কিছু। দিনের পর দিন তুমি রাতে জেগে থাকছ, বাড়িতে থাকলেও যে তুমি অফিসের কাজই করে যেতে সে লঙ ড্রাইভে বেরিয়ে যাচ্ছ, রিলেটিভের বাড়ি যেতে বললে তোমার গায়ে জ্বর আসত, এখন নিজে থেকেই চলে যাচ্ছ, হোয়াটস রং উইথ ইউ? আমি তো দেখতে পারছি তোমার বিয়ে আসার সাথে সাথে তোমার আচরণগুলি এরকম অস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে! সে কারণেই আমি তোমাকে এই কথাটা বললাম। তোমার কি মেয়েটা সম্পর্কে কোন ডাউট আছে? ফ্র্যাঙ্কলি বল”।
কৌশিক হাসল “দেখ বাবা, আমি কিন্তু তোমার মতই হয়েছি। তুমিও স্ট্রেট লাইনে চলা লোক। আমিও। তুমি যে চিন্তা করছ আমাকে নিয়ে সেটা দেখে আমার খারাপ লাগছে না। বরং ভালই লাগছে। ইনফ্যাক্ট পুজোর দিনগুলিতে সবাই যখন বাবা মার সাথে মজা করত, তখনও তুমি ছুটি পেতে না। রাগ হত, অভিমান হত। ভাবতাম তুমি হয়ত আমাদের ভালবাস না। আমার উপরে তোমার কোন টানই নেই। এখন তোমার কথাগুলি শুনে মনে হচ্ছে, নাহ। আই ওয়াজ রং”।
গৌতম হাসলেন না। বললেন “সেটা হয়, বয়স বাড়ার সাথে সাথে সন্তানদের সম্পর্কে চিন্তাটা বাড়তে থাকে। আমার হয়ত সেই ফেজটাই চলছে। আমি অবশ্য সেটা ভেবে তোমাকে বলি নি। আমি বরাবর দেখে এসছি তুমি ফোকাসড। নিজের কাজটা সম্পর্কে তোমার থেকে ভাল কেউ জানে না। তোমাকে কোন সময়েই বলতে হয় নি পড় বেশি করে, আদর্শ ছেলে বলতে যা বোঝায় তুমি তাই। ক্লাসে ফার্স্ট, মাধ্যমিক, এইচ এসে স্ট্যান্ড, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট, ভাল চাকরি, তুমি সবসময় আমাদের নিশ্চিন্ত করেছ। গর্বিত করেছ বললেও কম বলা হবে না। সব বাবা মাই তোমার মত ছেলেদের জন্য প্রার্থনা করে। এই পাঁচদিনে কি এমন হল তুমি এতটা চেঞ্জ হয়ে গেলে? আমাকে বল। লেট মি সলভ ইট। দেখি পারি কিনা”।
বাবার খোলস ছাড়া দেখে হঠাৎ আমন্ত্রণ জানিয়ে বসল কৌশিক,
“সিগারেট খাবে বাবা?”
গৌতম থমকালেন, “তোমার মা জানতে পারলে...”
“জানলা খুলে দিচ্ছি, তাছাড়া মা ঘুমিয়ে পড়েছে তো”।
“ওকে, দাও একটা”।
কৌশিক সিগারেটটা ধরাল। গৌতম সেখান থেকে।
বেশ কয়েকটা টান দিয়ে গৌতম বললেন “খারাপ লাগছে না আমার ছেলের সাথে সিগারেট খেতে। আমি ক্লাস সেভেন থেকে বিড়ি ধরি। বাড়িতে বাবা জানতে পেরে সত্যিকারের জুতো পেটা করেছিলেন। সময় কেমন চেঞ্জ হয়ে যায়”।
কৌশিক অবাক হল “তুমি সেভেন থেকেই স্মোকিং কর?”
গৌতম হালকা হাসলেন “বাড়িতে তখন সতেরো থেকে কুড়িজন মেম্বার। চার পাঁচজন জ্যাঠতুতো, খুড়তুতো দাদা। ওদেরই পাল্লায় পড়ে। গোয়ালঘরে বসে লুকিয়ে লুকিয়ে খেতাম। তোর বিমানকাকা দেখে ফেলে। মহা বিচ্ছু ছিল ব্যাটা। গিয়ে ঠিক বাবাকে লাগিয়ে দিল। উফ, সে কি মার, এখনও মনে আছে”।
কৌশিকের ভাল লাগছিল “দ্যাটস রিয়েলি ফানি। আমি অবশ্য কলেজ লাইফে স্মোক করা শুরু করি”।
“হ্যাঁ, সময়ের সাথে সাথে এটা হয়েই যায়... অস্বাভাবিক নয় কোনটাই। বাই দ্য ওয়ে। এবার কি তোমার সমস্যার কথা বলবে? আমরা কিছুটা স্বাভাবিক হলাম হয়ত”। গৌতম সিরিয়াস হন।
কৌশিক চুপচাপ সিগারেট টেনে যায়। গৌতম অধৈর্য হন না , তিনিও অপেক্ষা করতে থাকলেন।
“ওয়েল”, বেশ কয়েক মিনিট পরে কৌশিক নীরবতা ভঙ্গ করল, “আমার মনে হয় তোমার কাছে কনফেস করাই যায়, আই থিংক ইউ উইল আন্ডারস্ট্যান্ড...”
“বল, বলে ফেল”। সিগারেটটা অ্যাস্ট্রেতে গুঁজলেন গৌতম।
“আই থিংক আই অ্যাম ইন লাভ”। কৌশিক গৌতমের দিকে তাকাল।
গৌতম অবাক হলেন না। এইধরনের একটা সম্ভাবনার কথা তিনিও ভেবেছিলেন, জিজ্ঞেস করলেন “বেশ তো, তাহলে তার সাথেই বিয়েটা হোক, কে সে?”
“শি ইজ ম্যারেড বাবা। তাছাড়া মেয়েটা একটা এসকরট”। কৌশিক থেমে থেমে বলল কথাগুলি।
“মাই গড”। গৌতমের মুখ থেকে আপনা আপনিই কথাগুলো বেরিয়ে এল।
বেশ কিছু সময় নিলেন নিজেকে সামলাতে। তারপর বললেন “তুমি চিনলে কি করে এই ধরণের মেয়েদের?”
“লাস্ট উইক আমি এসকরট সার্ভিস থেকে ওকে হায়ার করি, মন্দারমণি নিয়ে যাই, বাট আফটার দ্যাট ট্যুর, আই হ্যাভ ফলেন ইন লাভ উইথ হার ব্যাডলি। আমি কোনমতেই ওকে ভুলতে পারছি না ওকে, বারবার ওর মুখটাই ঘুরে ফিরে আসছে”।
গৌতম বললেন “মানে? তোমার অফিসের কাজ ছিল না লাস্ট উইক?”
“না, আই লায়েড”।
“ওহ, বুঝেছি। তুমি নিজে এসব করলে নাকি...?”
“না, ওয়ান কলিগ সাজেস্টেড, বিয়ের আগে এক্সপেরিয়েন্স হওয়া দরকার ব্লা ব্লা ব্লা...”
“হু ইজ হি? আই নো হিম?”
“দ্যাটস ইম্মেটিরিয়াল... দ্যাটস নট দ্যা প্রবলেম বাবা”।
গৌতম আর কিছু বললেন না। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন “আরেকটা সিগারেট দাও”।
কেউই কোন কথা বলল না বেশ কিছুক্ষণ। গৌতম সিগারেটে বেশ কয়েকটা টান দিয়ে বললেন “তোমার যখন বয়ঃসন্ধির সময়, তখন আমি আমদাবাদে ছিলাম। তোমার মাকে ফোন করে প্রায়ই সতর্ক করতাম তোমার ব্যাপারে। তোমাকে যেন চোখে চোখে রাখা হয়, এটসেট্রা। কিন্তু তখন দেখা গেল তুমি স্বাভাবিক ছিলে। পড়াশুনায় মন ছিল। নো অ্যাবনরম্যালিটিজ। সাধারণত ওই সময়টা আমাদের সাথে বাবা মার দূরত্বের কারণে আমরা অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করে আমাদের কৌতূহল মেটাই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি বখে যাওয়া কেউ হন, যার ফলে ওই সময়টা অনেক উল্টোপালটা জিনিসও শিখে ফেলি। তোমার মধ্যে সেই সময় তেমন কিছুই হল না। যা হল এখন এসে। এবার এই জাল কেটে বেরতে হবে তোমাকেই। তোমাকেই ঠিক করতে হবে তুমি কি চাও। তোমার, তোমার পরিবারের সম্মান জড়িত এতে। বিয়ের আর কয়েকটা দিন বাকি। টেক ইউর ডিসিশান”।
কৌশিক হতাশ গলায় বলল “ডিসিশান ইজ অবভিয়াস বাবা। আমি জানি আমাকে কি করতে হবে। কিন্তু সেটাই করতে পারছি না”।
গৌতম বললেন “স্বাভাবিক। এই পরিস্থিতিতে এই ইনফ্যাচুয়েশন কাটানো সম্ভব না সেটা বুঝতে পারি। বাট ইউ কান্ট ম্যারি আ ম্যারিড প্রস্টিটিউট, হু এভার শি মাইট বি। অ্যাম আই রাইট?”
“রাইট বাবা। বাট আই ডোন্ট থিঙ্ক দিস ইজ ইনফ্যাচুয়েশন, আই অ্যাম ইন লাভ। আই কান্ট ফরগেট ইচ অ্যানড এভরি মোমেন্ট স্পেন্ট উইথ হার”।
গৌতম গম্ভীর হলেন “ওয়েল ইন দ্যাট কেস, আরেকটা পসিবিলিটি অ্যারাইজ করছে। তোমার সাবকনশাস মাইন্ড হয়ত বলছে দিস গার্ল রূপালী ইজ নট রাইট ফর ইউ। দ্যাটস হোয়াই দ্য আদার গার্ল ইজ অ্যাট্রাক্টিং ইউ”।
কৌশিক মাথা নাড়ল, “নাহ, রূপালী ইজ আ নাইস গার্ল। আমার মনে হয় না শি ইজ আ প্রবলেম। আমার মনে হয় আমিই এই প্রবলেমটার মূলে”।
গৌতমের সিগারেটটা শেষ হয়ে গেছিল। তিনি এবার উঠলেন, বললেন “দেখো, পৃথিবীতে অনেক সমস্যা আছে, তোমার সমস্যা তার তুলনায় কিছুই নয়। তুমি আরেকটা কাজ করতে পার। গো অ্যান্ড মিট রূপালী এভ্রি ডে। ট্রাই টু স্পেন্ড মোর টাইমস টুগেদার। কাল থেকেই সেটা শুরু করতে পার। আমার মনে হয়, রূপালীর সাথে তুমি যত বেশি সময় কাটাবে, ততই তুমি আবার রাইট ট্রাকে রিটার্ন করতে পারবে। কোন সমস্যার কারণ দেখছি না”।
গৌতম বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, কৌশিক পিছু ডাকল “বাবা”।
“ইয়েস”। গৌতম ঘুরে দাঁড়ালেন।
“মাকে এসব কথা বোল না”।
“পাগল হয়েছ”। হেসে ফেললেন গৌতম “যিনি সকালে তুমি একটা পাউরুটি না খেলে সারাদিন চিন্তা করেন তাকে এত বড় সমস্যার কথা বলব!”
কৌশিকও হেসে ফেলল, “তা ঠিক”।

১৬।
রাতে ঘুম না হলে ঋজুর সকালে উঠলেই মাথা ধরতে শুরু করে। শেষ রাতের দিকে ঘুম এসেছিল তার। সাড়ে ন’টায় ঘুম ভাঙলেও তার মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গিয়েছিল।অবশ্য রাতের মদটারও প্রভাব ছিল। উঠেই স্নান করে নিল সে। রবিবারে বাকিরা সবাই দেরী করে ঘুম থেকে ওঠে। সাড়ে ন’টাতেও বাথরুম ফাঁকা পেয়ে সে একবারে স্নান সেরে নিল। দাড়িও কেটে নিল। অনেকদিন পরে অফিসিয়ালি রূপার সাথে দেখা করতে যাবে ভেবে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা হচ্ছিল। চোরা টেনশনটাও থেকে থেকে ফিরে আসছিল। দুটো টেনশন এক সাথে কাজ করছে। রূপার ব্যাপারটা আছেই, একই সাথে মনে হচ্ছিল শ্রেয়ার ব্যাপারটা নিয়ে কোন ঝামেলা না হয়! এতদিন মেয়েটার কথায় উঠেছে বসেছে সে। কাল রাতে সে শক্ত হয়ে না বলাটায় মেয়েটা নিশ্চয়ই আঘাত পেয়েছে। তবে একদিন না একদিন এই কাজটা তাকে করতেই হত। হয়ত অফিসে এই জন্য তাকে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। তার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই যে তাকে অফিস যেতে হবে সেটা পরিষ্কার বুঝতে পারছিল সে।
এতসব কিছুর মধ্যে হঠাৎ করেই তার মনে হল কাজটায় সফল হতে পারলে দেড় লাখ টাকা পাওয়া যাবে। এককালে যে মেয়েটার জন্য রাতের পর রাত ঘুম হয় নি, তাকে অন্য কারও হাতে তুলে দেবার কাজে সফল হতে পারলে দেড় লাখটাকা পাবে। ভাবতেই হেসে ফেলল সে। অথচ সে এটা খুব ভাল করে জানে মেয়েটা রূপা না হলে সে কোনমতেই এই পাগলামির কাজটা করত না।
#
বেলা পৌনে দুটো নাগাদ সে রূপাদের বাড়ি পৌঁছল। প্রিয়তোষ অপেক্ষা করছিলেন “এসছো? বাহ, ইউ আর পাংচুয়াল”।
ঋজু ভেতরে গেল। অর্ঘ্যর ঘরে সে আগে যখন আসত বাড়িটা সেরকমই আছে। তবে প্রিয়তোষের ঘরে সে কোনদিন যায় নি। প্রিয়তোষ তাকে নিজের ঘরেই নিয়ে এলেন।
“বোস, তুমি লাঞ্চ করে এসছ তো?”
“হ্যাঁ”। তার হৃৎপিণ্ডের শব্দ সে নিজেই শুনতে পাচ্ছিল।
“আমি রূপাকে ডাকছি। তুমি তৈরি?” প্রিয়তোষ সিরিয়াস হলেন।
ঋজু মাথা নাড়ল। এই মুহূর্তটায় কি বলবে সে সব সারারাত ধরে ভেবেছে সে। এখন কোন কিছুই মাথায় আসছিল না তার। প্রিয়তোষ ঘর থেকে বেরোলে সে মোবাইলটা বের করল। নার্ভাসনেস কাটানোর জন্য গেম খেলা শুরু করল।
“একি ঋজুদা হঠাৎ এতদিন পরে? জ্যেঠুর ঘরেই বা কি করছ?”
রূপার গলায় বিস্ময়। সে চমকে মাথা তুলে রূপার দিকে তাকাল। মেয়েটা কি জানত সে আসবে? নইলে এত সেজেছে কেন?
“ওকে আমিই আসতে বলেছি”। প্রিয়তোষ কথাটা বলতে বলতে ঘরে ঢুকলেন।
রূপার চোখের অবাক ভাবটা তখনও যায় নি “তুমি? কেন?”
“ইটস আ গেম। তুই যখন বললি তুই কৌশিককে বিয়ে করতে চাস না, তখন আমি একটা লটারি করলাম আমাদের পরিচিত মানুষদের নিয়ে, তাতে ঋজুর নাম উঠল। এবার ওর দায়িত্ব পড়েছে তোকে বোঝানোর তুই কেন কৌশিককে বিয়ে করবি”। প্রিয়তোষ চেয়ার টেনে বসলেন।
রূপা বসল না, প্রিয়তোষের দিকে তাকিয়ে একটু রেগেই বললাম “তোমাকে ওসব বলা ঠিক হয় নি তো! তুমি এরকম কান্ড করলে আমি কিছুই বলতাম না তোমায়। অ্যান্ড ইট ইজ নট আ গেম, ইট ইজ মাই লাইফ, ওই লটারি ফটারি বাজে কথা নিশ্চয়ই!”
ঋজু চুপচাপ শুনছিল কথোপকথন। রূপার প্রতিক্রিয়া দেখে সে বেশ গুটিয়ে যাচ্ছিল। পরিষ্কার বুঝতে পারছিল, প্রিয়তোষ কাজটা ঠাণ্ডা মাথায় করেছেন। তার চলে যাওয়া উচিত সেটাও বুঝতে পারছিল কিন্তু মনে হচ্ছিল পা দুটো মাটিতে বসে যাচ্ছে।
প্রিয়তোষ একটা সিগারেট ধরালেন “ইয়েস, আর তোর লাইফ বলেই আমি ঋজুকে এখানে ডেকে পাঠিয়েছি। তোর দ্বিধা কাটাতে। বার বার ওর মুখটা তোর সামনে চলে আসছে, তুই সেই ফেজটাকে ভুলতে পারছিস না...”
রূপা ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসল “তোমার কি হয়েছে জ্যেঠু? তোমার কি মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে? এতদিন আমাদের কোন ব্যাপারে কিছু বলতে না আজ এতবড় একটা কান্ড করে বসলে?”
ঋজু কোনমতে উঠল “আমি আসছি”।
“না তুমি যাবে না, বস”। প্রিয়তোষ বেশ চেঁচিয়েই বললেন কথাটা। তারপর রূপার দিকে তাকালেন “আমি যা করেছি ভেবেচিন্তে করেছি। এই ছেলেটা তোকে লাভ লেটার দিয়েছিল। সেটা তুই এখনও তোর কাছে রেখে দিয়েছিস, অথচ সামনে তোর বিয়ে। এটা কি বোঝায়? ইউ স্টিল লাভ হিম। আর তাই যদি হয়, কথা বল। কথা বলে একটা সিদ্ধান্তে আয়”।
“কোন কথা বলার নেই আমার ঋজুদার সাথে জ্যেঠু। আমি এখন বেরব। কৌশিক আসবে আমাকে পিক আপ করতে” নিচু গলায় বলল রূপা।
প্রিয়তোষ দৃঢ়স্বরে বললেন “তুই কোথাও যাবি না, তোর যে ছেলেটার সাথে বিয়ে তাকে এভাবে চিট করতে পারিস না। কৌশিক এখানে আসুক, ওকে সব সত্যি কথা বল। ওকে ডিসিশান নিতে দে”।
ঋজু আর রূপা দুজনেই চমকে প্রিয়তোষের দিকে তাকাল। ঋজু কিছু বলল না। রূপা বলল “আমি জানি না তোমার কি হয়েছে। তবে মনে হচ্ছে তুমি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছ। আর তাছাড়া ঋজুদা এককালে আমাকে চিঠি দিয়েছিল কিন্তু সেটা বহুদিন আগের কথা। আমাদের মধ্যে ওই চিঠির বাইরে কোন সম্পর্কই তৈরি হয় নি। ঋজুদারই বা কোন ফিলিংটা আছে?”
“আছে। নাহলে ও আসত না, ও নিজেই প্রমাণ করে দিয়েছে তোর ব্যাপারে ওর ফিলিং আছে”।
প্রিয়তোষ ধীরে ধীরে কেটে কেটে বললেন।
রূপা ফ্যাকাশেভাবে ঋজুর দিকে তাকাল। ঋজু তাকাতে পারল না। অধিক শকে সে পাথরে পরিণত হয়ে যাচ্ছিল।
“আর বিলিভ মি ঋজু, তোমাকে অপমান করার কোন রকম ইচ্ছা আমার নেই, আমি চাই তোমরা ভালভাবে থাক”।
ঋজু কিছু বলল না। ঘরের মধ্যে অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলল না।
“কৌশিকের নম্বরটা দে” নীরবতা ভঙ্গ করে বললেন প্রিয়তোষ। রূপা কিছু বলল না।
প্রিয়তোষ মাথায় হাত দিয়ে হেলান দিলেন “ঠিক আছে,ও তো আসছেই”।
রূপা অসহায়ের মতো বলল “প্লিজ এবার এ ব্যাপারটা থেকে কৌশিককে দূরে রাখো”।
প্রিয়তোষ হাত দিয়ে রূপার কথাকে উড়িয়ে দেবার ভঙ্গিতে বললেন “ও যদি বিয়ের পরে জানতে পারে তাহলে তো আরও জটিলতা বাড়বে। ধরে নে বিয়ের পরে এই ছেলেটা তোর শ্বশুরবাড়ির সামনে দিয়ে বারবার হাঁটতে থাকল, তখন কি হবে?”
ঋজু নিরুত্তর থাকল। কথা বলার মত জায়গায় সে আর নেই।
প্রিয়তোষ আবার বললেন “দে। আমাকে কৌশিকের ফোন নাম্বারটা দে”।
রূপা ফোনটা বের করে প্রিয়তোষের হাতে দিল।প্রিয়তোষ কিছুক্ষণ ঘেঁটে কৌশিকের নম্বরটা বের করে ফোন করলেন “হ্যালো, কৌশিক, আমি রূপার জ্যেঠু বলছি, তুমি এখন আমাদের বাড়ি আসছ তো?”
...
“ও এসে গেছ। দাঁড়াও আমি আসছি”।
প্রিয়তোষ ফোনটা কানে নিয়ে বেরনোর আগে দুজনকে ইশারা করলেন না বেরতে।
প্রিয়তোষ বেরতেই রূপা ঋজুকে বলল “এসব কি ঋজুদা?তুমি কেন জ্যেঠুর কথায় রাজি হতে গেলে? এখন যে সমস্যাটা তৈরি হল এটা থেকে বেরবো কি করে? আমার তোমনে হচ্ছে জ্যেঠু পাগল হয়ে গেছে। যে লোকটা কোনদিন আমাদের পারিবারিক ব্যাপারে একটা মত পর্যন্ত দিত না, সে হঠাৎ এই সব কান্ড করা শুরু করেছে”। রূপা বেশ নার্ভাস হয়ে পড়েছিল।
ঋজু কিছু বলার আগে কৌশিককে নিয়ে প্রিয়তোষ ঘরে ঢুকলেন “কৌশিক তুমি ওই চেয়ারটায় বস, ও দাঁড়াও, এক মিনিট, তোমরাও ওঠো”।
কৌশিককে বেশ অবাক লাগছিল। কিন্তু সে কিছু বলছিল না।
চারটে চেয়ারকে প্রিয়তোষ দুটো দুটো করে সামনাসামনি সাজালেন। এবার তাদের দিকে তাকালেন, “নাও বস, কৌশিক ওটায়, রূপা তুই আমার পাশের চেয়ারে বস, ঋজু তুমি কৌশিকের পাশে বস”।
প্রিয়তোষ শুরু করলেন “কৌশিক আগে তোমার সাথে ঋজুর পরিচয় করিয়ে দিই। ঋজু আমার ভাইপো মানে রূপার ভাই অর্ঘ্যর বন্ধু। আর ঋজু, কৌশিক হল রূপার উড বি”।
কৌশিকের অবস্থাটা হতভম্ব ছিল। ঋজুর দিকে তাকিয়ে বলল “আপনাকে কোথাও একটা দেখেছি মনে হচ্ছে”।
ঋজু ফ্যাকাশে ভাবে হাসল “ক্যাফেলায় কি?”
কৌশিক রূপার দিকে তাকাল “ও হ্যাঁ, তাই না?”
প্রিয়তোষ বললেন “নাও কৌশিক, উই হ্যাভ আ সিচুয়েশন, তোমরা একটা রিলেশনশিপ শুরু করতে যাচ্ছ, আমি চাই সেটা ফ্রেশ স্টার্ট হোক। তুমি কি চাও”?
কৌশিক প্রিয়তোষের কথাটা বুঝতে পারল না, বলল “মানে?”
“মানে তোমাকে যেটা বলতে চাই সেটা হল তোমাদের বিয়ের পরে অনেকরকম কমপ্লিকেশনস অ্যারাইজ করতে পারে। সেগুলি সম্পর্কে আমরা আলোচনা করব। তুমি কি রূপাকে দেখার সময় জিজ্ঞেস করেছিলে ওর বয়ফ্রেন্ড ছিল কিনা?”
কৌশিকের বিস্ময় ভাবটা কাটছিল না। সে একবার রূপার দিকে তাকিয়ে তারপর প্রিয়তোষের দিকে দেখে বলল “হ্যাঁ করেছিলাম তো?”
“ও কি বলেছিল?”
“বলেছিল সেরকম কিছু ছিল না”।
“গুড। হ্যাঁ, সেটা বলতেই পারে ও। তবে তোমাকে একটা কথা জানিয়ে রাখি, রূপা যখন ইলেভেনে পড়ত তখন ঋজু, মানে ও, রূপাকে একটা চিঠি দিয়েছিল, ওর ভাল লাগত ওকে”।
কৌশিক চুপ থাকল কিছুক্ষণ। ঘরের ভেতরে বাকি তিনজনও চুপ। মাঝে মাঝে খালি বাইরে বাস যাবার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর কৌশিক হাসবার চেষ্টা করল “এটা তোহতেই পারে, চিঠি বা ক্রাশ তো থাকতেই পারে, এটা কি খুব একটা সমস্যা তৈরি করে?”
প্রিয়তোষ কৌশিকের কথা শেষ হতেই বললেন “কিন্তু সেই চিঠিটা যদি রূপা এখনও রেখে দেয় সেক্ষেত্রে সেটা ক্রাশের পর্যায়ে থাকে কি?”
কৌশিক কিছু বলল না। রূপার লজ্জায় অপমানে মাথা হেট হয়ে যাচ্ছিল। জ্যেঠুর কি হয়েছে সেটাও সে বুঝে উঠতে পারছিল না। ঋজু কথা বলার অবস্থাতেই নেই।
প্রিয়তোষ কোন উত্তর না পেয়ে কৌশিককে বললেন “তোমার কোন অসুবিধা নেই তো সেক্ষেত্রে?”
কৌশিক বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। ঘরে কেউ কোন কথাও বলছিল না।
মিনিট পাঁচেক পর সে বলল “আমি একটা সিগারেট খেতে পারি?”
“ইয়েস সার্টেনলি”। বললেন প্রিয়তোষ।
“থ্যাঙ্কস”। কৌশিক সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে দুজনকে অফার করল। ঋজু নিল একটা। প্রিয়তোষ নিলেন না। লাইটার থেকে সিগারেট ধরাল দুজনে।
কয়েকটা টান দিয়ে কৌশিক বলল “কথাটা জানতে পেরে ভাল লাগল। আর আপনি যখন এই কথাটা আমাকে বললেন, আমারও মনে হয় আমার কিছু কথা আপনাদের জানানো দরকার”।
“তোমারও বলার আছে? গুড”। প্রিয়তোষ খুশি হলেন।
কৌশিক বলল “হ্যাঁ, এবং এই কথাটা বলার পরে বিয়েটা হয়ত নাও হতে পারে। তবু আমার মনে হয় কথাটা বলা দরকার”।
প্রিয়তোষ ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা কৌশিকের দিকে তুললেন “ক্যারি অন প্লিজ”।
কৌশিক কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকল। তারপর সিগারেটে টান দিয়ে বলল “লাস্ট উইকেন্ড আমি রূপাকে বলেছিলাম অফিসের কাজে বিজি ছিলাম। ওর ফোনও ধরিনি। আসলে আমি সেদিন অফিসের কাজে যাই নি। এক এসকরটকে নিয়ে মন্দারমণি গেছিলাম। টু এক্সপেরিয়েন্স মাই ফার্স্ট সেক্স। কিন্তু সেই জার্নিটা আমাকে অন্য কিছু শেখাল। আমি মেয়েটার প্রেমে পড়ে গেলাম। ওকে এখনও খুঁজে চলেছি। কিন্তু পাচ্ছি না। আমার মনে হয়, বিয়ের পর রূপা কেন, কোন মেয়েকেই আমি ঠিক করে ভালবাসতে পারব”।
রূপা অবাক হয়ে কৌশিকের দিকে তাকাল। ঋজু খানিকটা টাল খেল। প্রিয়তোষ টললেন না। বরং তার ঠোঁটের কোণে একটা হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠল, তিনি হাততালি দিয়ে উঠলেন জোরে জোরে, “ব্র্যাভো, ব্র্যাভো”। এবার রূপার দিকে তাকালেন তিনি “এবার বল তুই কি করবি? কৌশিককে বিয়ে করবি?”
রূপা মাথা নিচু করল , কিছু বলল না। ঋজু আবার উসখুস করছিল। সে প্রিয়তোষের দিকে তাকাল, বলল “আমার মনে হয় আমার থাকাটা ঠিক হবে না”।
প্রিয়তোষ এবার ধমকের সুরে ঋজুকে বললেন “আরে ছোকরা, তোমার এত তাড়া কিসের? ট্রেন ধরবে নাকি? তাছাড়া দেখছ না, তোমার শিকে ছেড়ার একটা ভাল চান্স আছে?”
কৌশিক চুপচাপ সিগারেট খেয়ে যেতে লাগল। ঋজু কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বলল “একটা সিগারেট হবে?”
“শিওর। এই নিন”। কৌশিক প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে দিল ঋজুকে। ঋজু নার্ভাস ভঙ্গিতে সিগারেটটা ধরাল।
প্রিয়তোষ রূপাকে বললেন “কিরে বল কি করবি?”
রূপা প্রিয়তোষের দিকে তাকাল, “আমি আর কি বলব, আমার আর কিছু বলার নেই। বিয়েটা তো হচ্ছে না, আমার মনে হয় না এত সব কিছুর পর বিয়েটা হবে”।
রূপার কথা শুনে কৌশিক কোন প্রতিক্রিয়া দিল না। সে চুপচাপ সিগারেট খেয়ে যেতে লাগল।
“আর ঋজু?” প্রিয়তোষ বললেন।
“আমার ঋজুদাকে নিয়ে কোন ফিলিং নেই আর জ্যেঠু”। রূপা ধীরে কিন্তু দৃঢ়ভাবে কথা গুলো বলল।
কৌশিক আক্রমণাত্মক হল “তাহলে ওর চিঠিটা রেখে দিয়েছিলে কেন?”
প্রিয়তোষ বললেন “হ্যাঁ, তাই তো, কৌশিক ইউ আর অ্যাবসোলিউটলি রাইট”।
রূপা বলল “ছিল হয়ত কোনকালে। কিন্তু সেটা অন্যকারণেও হতে পারে। তার আগে আমাকে কেউ লাভ লেটার দেয় নি। যখন পেয়েছিলাম, তখনও সেটা নিয়ে যথেষ্ট উত্তেজনা ছিল”।
প্রিয়তোষ বললেন “হ্যাঁ তারপরে সেটা রেখেও দিয়েছিস এতদিন ধরে!”
“কেন রেখেছি জানি না, কিন্তু আমার এই মুহূর্তে ঋজুদাকে বিয়ে করার ইচ্ছা এক ফোঁটাও হচ্ছে না, জানি না কেন”।
ঘরে আবার নীরবতা নেমে এল। কেউ কোন কথা বলল না।
প্রিয়তোষ কিছুক্ষণ পর বললেন “ওয়েল, তাহলে ম্যাচে কোন রেজাল্ট হল না। কিন্তু কাজের কাজ হল। সত্যি গুলো জানা গেল, যেগুলো আমাদের জানার দরকার ছিল, তোরা এবার যেতে পারিস, বাই দ্য ওয়ে, কৌশিক, তোমার তো রূপা কে নিয়ে বেরনোর কথা ছিল, তোমরা তাহলে আর বেরচ্ছনা তো?”
কৌশিক কাঁধ ঝাঁকাল “রূপা যা বলবে”।
প্রিয়তোষ রূপার দিকে তাকাল, রূপা বলল “আমার ঘরে থাকতে ভাল লাগছে না, আমি যাই, ঘুরে আসি একটু,” কথাটা বলতে বলতেই সে হঠাৎ ফেটে পড়ল “আই হেট ইউ জ্যেঠু, আই হেট ইউ। আমি আর কোনদিন তোমাকে কোন কথা বলব না”।
রূপার এই আক্রমণের মুখে পড়ে প্রিয়তোষ কোন কথা বলতে পারলেন না।
কৌশিক রূপার দিকে তাকাল, “তুমি ওনাকে বলছ কেন? উনি ছিলেন বলেই আজকে সত্যিকথাগুলো বাইরে বেরিয়ে এল।নইলে সারাজীবন আমরা মুখোশ পড়েই কাটিয়ে দিতাম”। সে প্রিয়তোষের দিকে তার ডান হাতটা এগিয়ে দিল “মেনি থ্যাঙ্কস স্যার,আপনি আজ যেটা করলেন, তার ভীষণ দরকার ছিল। আমার কেন জানি না ভীষণ হালকা লাগছে। বারবার খালি মনে হচ্ছিল এ’কদিন ধরে, আমি কারও ক্ষতি করে যাচ্ছি। আজ হয়ত আমার রাতে ঠিকঠাক ঘুম হবে”। প্রিয়তোষ কৌশিকের বাড়ানো হাতটা ধরলেন না। চুপচাপ বসে রইলেন নিরুত্তর।
কৌশিক ঋজুর দিকে তাকাল, “আপনিও বরং চলুন আমাদের সাথে, কোন কফিশপে বসে আড্ডা মারি তিনজনে”।
ঋজু উঠল। সে যেন বেঁচে গেল।
একে একে ওরা তিনজন বেরিয়ে গেলে প্রিয়তোষ টিভিটা ছাড়লেন।
শেয়ার সম্পর্কিত তথ্যগুলি তার মিস করলে চলবে না।

#
“তোমার জ্যেঠুকে আমার বেশ মনে ধরেছে। তোমার সাথে বিয়ে হোক না হোক আমি কিন্তু মাঝে মাঝে তোমাদের বাড়ি আসব”, গাড়িটা চালাতে চালাতে বলল কৌশিক। তার পাশে রূপা বসেছিল। পিছনের সিটে ঋজু।
রূপার তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গিয়েছে। সে একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। সে কোনরকমে বলতে পারল “আমি জানি না কি হয়েছে জ্যেঠুর। এইরকম অপ্রত্যাশিত একটা ব্যাপার হয়ে গেল আমি বুঝতে পারছি না কি বলব”।
ঋজু বলল “আমি হয়ত কিছুটা জানি কেন উনি এরকম করলেন”।
কৌশিক বা দিক করে গাড়িটা দাঁড় করাল। তারপর পেছনের দিকে ঘুরে বলল “আপনি তো সাংঘাতিক লোক মশাই। সব জেনে শুনে কিছুই বলছেন না। কি কারণ বলুন দেখি”।
রূপাও অবাক হল, “কি জান? বল তাহলে?”
ঋজু হালকা হাসল, “না না, পুরোটাই জানি বলছি না, খানিকটা জানি”।
“তাই বল না ঋজুদা” রূপা অসহায় ভঙ্গিতে বলল।
ঋজু বলল “নাকতলা চল”।
কৌশিক অবাক হল “নাকতলায়? সেখানে কি?”
“আগে চলুন, তারপর বলছি”।
কমপ্লেক্সটায় ঢুকতে একটু মিথ্যে বলতে হল ঋজুর। সে প্রিয়তোষের ফ্ল্যাটের নম্বরটা জানত না। সিকিউরিটি কিছুতেই মানছিল না। রূপা আর কৌশিক গাড়ি থেকে অবাক হয়ে দেখছিল ওর কাণ্ড। বেশ খানিকক্ষণ পরে ওদের গাড়িটা ভেতরে ঢুকতে পারল।
ঋজু ফ্ল্যাটগুলির গ্রাউন্ড ফ্লোরে লেটার বক্সের কাছে ওদের নিয়ে গেল। রূপা জিজ্ঞেস করল “কি ব্যাপার ঋজুদা এটা কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
ঋজু প্রিয়তোষের নামের লেটার বক্সটা দেখাল রূপাকে “এই নে, তোর জ্যেঠুর ফ্ল্যাট। তোর বিয়ের জন্য কিনে রেখেছেন, তুই ওনার সব থেকে কাছের ভাইঝি, তোর জন্যই উনি ওনার এই পাগলামিটা করেছেন, অন্য কেউ হলে হয়ত করতেন না”।
রূপা আর কৌশিক দুজনেই অবাক হল। কৌশিক বেশ শব্দ করেই বলল “মাই গড, এই জায়গায় ফ্ল্যাট কম করে হলেও পঞ্চাশ লাখ টাকার নিচে হবে না”!
রূপার চোখের কোণায় জল এসে যাচ্ছিল। সারাদিন টিভির সামনে বসে, খবরের কাগজ দেখে, শেয়ার মার্কেটের লাভের সবটাকায় জীবনের সর্বস্ব দিয়ে কেনা ফ্ল্যাট তার জন্য? সে কিছু বলতে পারল না। শহরটা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল।

আপনার মতামত জানান