পারাপার/জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

প্রথম পর্ব

ছুটির দিনে বিকেলের দিকে যখন কিছুক্ষণের জন্য হাঁটতে বেরোই, অনেক সময় দেখি পথের দু’ধারে, এদিক ওদিক, নানা ধরণের গাছের পাতা পড়ে আছে। কেউ সবুজ, কেউ হলুদ, কেউ শুষ্ক খসখসে, আবার কেউ ছিন্ন-কুঞ্চিত। এরা সকলে নিস্তেজ, নিষ্প্রাণ দেহে পথের ধুলোয় পড়ে থাকে। কখনও হালকা বাতাসে কিছুটা গতি পায়, এদিক সেদিক সরে যায়। সেই পাতাদের সম্পূর্ণরূপে মাটিতে মিশে যাওয়া, বা পঞ্চভূতে লীন হওয়ার অপেক্ষা ভিন্ন আর কিছু করার নেই। দিনের পর দিন এই পাতাগুলোকে দেখতে দেখতে মনে হয় আমরাও যেন পাতাগুলোর মত।

জগৎসংসার নামক বৃহৎ মহীরূহর শাখা-প্রশাখা আলো করে থাকা হাজার হাজার ছোট বড় পাতা। কচি শ্যামল সজীবতা নিয়ে তারা একদিন আত্মপ্রকাশ করে, এবং যত দিন যেতে থাকে ক্রমে পূর্ণ প্রকাশিত হয়ে ওঠে। বয়স যতই ঊর্ধ্বমুখী হোক, সবুজ থাকার ইচ্ছে বা চেষ্টা কিছু মাত্র কমে না সবুজ থাকা প্রয়োজন, না হলে জগৎসংসারের কাছে নিষ্প্রয়োজন হয়ে যেতে হয়। সেই সব পাতারা সমস্ত গ্রীষ্ম দাবদাহ সহ্য করে বর্ষার প্রথম বৃষ্টির অপেক্ষা করে। কিন্তু সেই আষাঢ়ের প্রথম বর্ষণের আগেই সর্বনাশিনী কালবৈশাখী তাদের কতজনকে উপড়িয়ে চিরকালের জন্য গাছ থেকে আলাদা করে দেয়। যারা নিস্তার পেল তারা সৌভাগ্যবান। শরতের শিশির, হেমন্তের হিম, শীতের উত্তরে বাতাস সব কিছু আকণ্ঠ আস্বাদন করে তারাই বসন্তোৎসব দেখতে পায়। তারাই মহাবৃক্ষের ফুল ও ফলের স্বরূপ দর্শনের সুযোগ পায়। তবে বসন্তের ঠিক আগে, প্রবল শীতে বেশ কিছু পাতা শুষ্ক হয়ে ঝরে পড়ে, তাদের কথা ভেবে প্রকৃতিও বিশেষ ভারাক্রান্ত হ’ন বলে মনে হয় না। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে রঙিন ফাগুন সাজানো যায় না।

এই সকল পত্ররাজির ব্যক্তিগত জীবন যেমনই হোক, দ্রষ্টার দৃষ্টি চিরকালই তাদের সবুজ রঙটাই দেখতে চায়। সেই সজীবতাকেই সারা জীবন মনে রাখতে চায়। পথের ধুলোয় পড়ে থাকা বিবর্ণ শুষ্ক পাতা কারো চিত্তাকর্ষণ করে না। তারা কোনও মর্মস্পর্শী সাহিত্যের সুন্দর রূপক হ’তে পারে না। কোনও গাছের দিকে দূর থেকে তাকালে, কেবল তার ঘন সবুজ পাতার ছাউনি চোখে পড়ে। যত কাছে আসা যায়, তত বোঝা যায় সেই সবুজ পাতাদের মাঝে কোনও কোনও স্থানে বিবর্ণ হয়ে আসা পাতা আড়াল হয়ে আছে। যেন সবুজের মাঝে নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। আরও কিছু কাছে এলে দেখা যায় সেই গাছের গোরায় পরে থাকা অজস্র শুকনো পাতা। যারা কিছু দিন আগেও ওই গাছের অবিচ্ছিন্ন অংশ ছিল। এখন তারা মাটিতে পড়ে... কিছুদিন পর মাটিতেই মিশে যাবে।

… … …

নদীর পারের থেকে বেশ কিছুটা দূর দিয়ে নৌকো এগিয়ে চলেছে, তবে পুব দিকের কূল পশ্চিম-কূলের থেকে বেশি স্পষ্ট। ভাদ্রের বেলা, অপরাহ্ণের পড়ন্ত রোদ দু’হাত দিয়ে মেঘ সরিয়ে শেষবারের মত নিজের তেজ বর্ষণ করছে। আকাশের দিকে তাকানো যায় না। নদীর বুকের হালকা বাতাস শরীরের ঘাম শুষে নিলেও, গরম খুব একটা কমে না। দু’পাশের মাঝি-মাল্লারা মাথায় ভিজে গামছা দিয়ে এক মনে দাঁড় টানছে। মাঝে মাঝে তাদের কপালের ঘাম কানের পাশ দিয়ে গড়িয়ে টপ করে নদীর জলে পড়ছে। নৌকোর খোলে বসে থাকা যাত্রীরা ছায়াতে বসে অপেক্ষা করছে কখন নৌকো ঘাটে গিয়ে ঠেকবে। ঘাটে নৌকো ঠেকলেই আজকের মত তাদের যাত্রা শেষ, যে যায় গন্তব্যের দিকে রওনা হবে। কিন্তু ওই তিনজন মাঝিকে আবার পশ্চিম কূলে রওনা হ’তে হবে। রাত হওয়ার আগে আর দু’বার পারাপার করতেই হবে। তাই, যখন যাত্রীরা গরম হাওয়া খাচ্ছে, কেউ হেলান দিয়ে পড়ে আছে, কারও চোখে এসে ভাত-ঘুম, তখন হারান, পবন, সনাতনরা আরও দম দিয়ে দাঁড় বাইছে, প্রতিকূল স্রোতে নৌকো ধীরে এগিয়ে চলেছে। জলের ছোট ছোট ঢেউয়ের ওঠা নামার তালে তালে তাদের পাঁজর হাপরের মত ওঠা নামা করছে। “আর আধ ঘণ্টা বাদেই ঘাটে পৌঁসে যাবো গো হারান খুড়ো... নয়?’ বলে সনাতন নদীথেকে হাতে করে জল তুলে গায় ছিটিয়ে নিলো। সনাতন এদের মধ্যে সব থেকে ছোট। এখনও বয়স পঁচিশ হয়েনি। বাপ জোর করে বছর দেড়েক আগে বিয়ে দিয়েছে, মেলা টাকা পাওয়া গেছে বিয়েতে। সেই টাকায় বাপ একটা চায়ের দোকান দিয়েছে। আর সনাতন লেগেছে বাপের পুরনো কাজে, দাঁড় বাইতে, বাপের বন্ধু হারান আর তার ছেলের সাথে।

হারান চোখের ওপর হাত ফেলে দূরে দেখার চেষ্টা করল। বয়স হয়েছে, চোখে অল্প ছানি পড়তে শুরু করেছে। রোদের ঝলকানিতে বহুদূরের ঘাট ঠিক কোথায় তা ঠাওর করা যায় না। অভিজ্ঞতায় ভর করে আজও সে তার ছেলে পবন বা সনাতনের থেকে দক্ষ। সেই দক্ষতার অহংকারে হোক বা বৃদ্ধ বয়সের ক্লান্তির কারণে হোক, নিজের দাঁড়টা সনাতনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল “আগে এটারে ঠিক করি সামাল দেখি... ঘাটও এসি যাবে সময় মত... দম নিয়ে জরি জরি টান... আমি বরং হালটা ধরি।” উলটো দিক থেকে পবন তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল “ও ছোঁড়ার কি দাঁড় টানার খ্যামতা আসে? জলদি বাসায় ফিরি বউয়ের মুখ দেখবে বলি আনসান করসে... সেই টানে যদি একটু হাত লাগায়।” সনাতন একথার উত্তর দিলে আর কাল থেকে এদের সাথে নৌকোয় আসা হবে না, আর বাড়িতে বাবা রক্ষে রাখবে না। তাই কোনও উত্তর না দিয়ে দাঁড় টানায় মন দিলো। সূর্য আবার মেঘের আড়ালে যাচ্ছে। কিছুক্ষণেই ঘাটে গিয়ে নৌকো ভিড়বে।

সন্ধের সময় গঞ্জের দিক থেকে অনেক লোকে এপারের ঘাটে আসে। পশ্চিম পারে গঞ্জের ঘাট। ওই পার আলোয় ঝলমল করে সন্ধেবেলা। নদীর জলে সেই আলোর প্রতিবিম্ব আলোকমালার মত ওঠা নামা করে ঢেউয়ের তালে তালে। দূরে কলকারখানার কলোনি, সেদিকটাও বেশ আলো হয়ে থাকে। সন্ধের সময় ভিড় করে লোকজন যখন ভটভটি করে আসে তখন বিভূতির দোকানের সব থেকে ভাল সময়। দিনে দু’বার দোকানে ভিড় হয়। একবার ভোরে, যখন বাজার বসে, আর একবার সন্ধের সময়। বিভূতি হ’ল সনাতনের সেই বাপ, যে তাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দোকান খুলে বসেছে। শুধু দাঁড় টেনে সংসার চলছিল না। ভাগ্যিস ছেলে ছিল, তাই বিয়ে দিয়ে একটা দোকান খোলার মত ব্যবস্থা করা গেল। ঘরে দু-তিনটে সোমত্ত মেয়ে থাকলে কি করত ভাবলেই হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে বিভূতির। আর একটু রাত হলে নৌকো নিয়ে হারান ফিরবে, ছেলেটাও ফিরবে ওদের সাথে। তারপর একসাথে বাসায় ফেরা যাবে...
“কাকা, জলদি তিনটে চা লাগাও, একটা দুধ ছাড়া... ” খদ্দেরের হাঁকে আবার চা, মাটির খুঁড়ি, স্টোভ, হারিকেনের মাঝে ফিরে এলো বিভূতি। দোকানে এবার ভিড় জমবে। সে ব্যস্ত হয়ে বলল “এই যে কত্তা, দু’মিনিট বসেন, এখুনি হই যাবে... বিস্কুট কি নেবেন বলেন... ফুলুরি, প্যাঁজি কিসু লাগবে?”

এই ভাবেই দিনের পর দিন চলতে থাকে, আজও আলাদা কিছু না। একটু পরে রাত হওয়ার সাথে সাথে তিনজন মূর্তি দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো। তারপর দু’জোরা বাপ ছেলে একসাথে নিজের নিজের বাসায় ফিরে গেল। দু’টি ঘরেই রয়েছে অপেক্ষারত চোখ... বেড়ে রাখা ভাত ঠাণ্ডা হয়ে যায়।

… … …

হারান, বিভূতি, সনাতন, এদের পরিবার... তাদের জীবনে কোনও কিছু নতুন নেই, কোনও আতিশয্য নেই, বিলাসিতা নেই, জীবন-অভিযানের দুঃসাহসিকতা নেই। সব বড়ই স্বাভাবিক, বড়ই মৌলিক, যা বহিরাগতের কৌতূহলের বিষয় হয় না। বাংলার বহু দরিদ্র দিন আনা দিন খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের ইতিকথা। সে গল্পের বল্লাল সেনের রাজত্বে, নবাবের হুকুমতে বা কোনও রাজনৈতিক দলের শাসনে বিশেষ রকমফের হয় না। কেবল নাম আর চেহারা পালটে যেতে থাকে। নৌকো একই থাকে, শুধু মাঝি আর যাত্রীরা সময়ের নিয়মে পরিবর্তিত হয়। কখনও মাঝির নাম শক্তিনাথ, কখনও ফজল, কখনও হারান... আর সেই পরিবারের স্ত্রীলোকেরা জন্ম-জন্মান্তর বোধ করি অপেক্ষায় কাটিয়ে দেয়। কখনও স্বামীর ঘরে ফেরার অপেক্ষা, কখনও ঘরে চাল-আনাজের অপেক্ষা, কখনও প্রথম পুত্র-সন্তানের অপেক্ষা, যে কিনা ঠিক তার বাপের মত নৌকোর দাঁড় টানতে পারবে। সব অপেক্ষা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ওপারে যাওয়ার অপেক্ষায় মিশে যায়। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম, অপেক্ষার আর শেষ নেই! তবে এই বিশাল পৃথিবীর প্রতিটি জীবের জীবন-কাহিনী যদি বিধাতাপুরুষ একই রকম করে রচনা করতেন, তাহলে হয়ত ওনার এবং পাপ-পুণ্যের বিচারক অন্য দেবতাদের কাজ অনেক সহজ হ’ত। সেই জীবনচরিৎগুলো আপাতদৃষ্টিতে এক হয়েও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। তাই আস্তিকের আরাধ্য দেবতাগনও কখনও স্তুতি, কখনও প্রশংসা, কখনও বিদ্রূপ আবার কখনও আর্তের চাপা বিক্ষোভের সম্মুখীন হ’ন। প্রতিদিন একই নদীতে পারাপার হওয়া নৌকো, হঠাৎ একদিন যে কোনও ঘূর্ণাবর্তের মাঝে পড়বে না, বা বানের মুখে টাল খাবে না, বা টাল খেলেও শেষ রক্ষা হবে কি না, এই সকল প্রশ্নে তাঁদের বিব্রত করার মানে হয় না। তার চেয়ে আমরা দেখি সেই অনন্তকাল ধরে এক ভাবে জীবনযাপন করে আসা মানুষের সেই সকল প্রতিনিধিদের ললাটে বিধাতাপুরুষ কি রচনা করেছেন।

হারান মণ্ডলের অবস্থা বিভূতি পাইনের থেকে কিছুটা হলেও ভালো। হারানরা বংশ পরম্পরায় নৌকো চালিয়ে আসছে। তিন পুরুষ আগে পর্যন্ত তাদের নিজেদেরই তিনটে নৌকো ছিল। এখন তিনটে নৌকো সামলানোর লোকবল নেই। তাই হারানের বাপের আমলেই তারা একটা নৌকোতে নেমে এসেছিল। তবে কেবল একটা নৌকোই সম্বল নয়। এদিক সেদিক থেকে রোজগার আসত, সে এখনও আসে। সেই রোজকারের পথ কতটা ঋজু আর কতটা বক্র তা হলফ করে বলা মুস্কিল। তবে হারানের আমলে গোয়ালে দুধেল গাই এসেছে। কানাঘুষো শোনা যায় পবন নাকি ঘরে বিজলি বাতি আনার চেষ্টা করছে। হারানও হয়ত দাঁড় বাইবার কাজ শিগগির বন্ধ করবে। হারানের স্ত্রী হারানের মতই শক্ত-সমর্থ। ছেলের বউয়ের থেকে বেশি কাজ নিজেই করে, অন্ততঃ পাড়ার সকলের কাছে তার সেরকমই দাবি।

অপর দিকে বিভূতি পাইনের বাপ-ঠাকুরদার কেউ কস্মিনকালেও দাঁড় বায়নি। তারা ছিল পূর্ব বঙ্গের এক জমিদারিতে ভাগ-চাষি। দেশ ভাগের সময়, হিন্দু বলে, যা কিছু সম্বল দু’খানা পুঁটলিতে বেঁধে বিভূতির বাপ সপরিবারে এই গ্রামে চলে আসে। তারা কি ভাবে এসেছিল, আর কি করে এই পারেই রয়ে গেলো, সেই কাহিনী সেই সময় পূর্ব বঙ্গ থেকে আসা বহু উদ্বাস্তুদের থেকে বিশেষ আলাদা নয়। পূর্ব-পশ্চিম প্রসঙ্গ উঠলেই রাজাদের খেয়ালে উলু-খাগড়ার রক্তে দু’কূল ভাসার সেই কথা যুগে যুগে প্রতিধ্বনি হবে। পুনরায় সেই প্রসঙ্গ নাই বা উত্থাপন করলাম। নিয়মের প্রবল ব্যতিক্রমে হোক, বা অন্য কোনও কারণেই হোক, বিভূতিই তার পিতার একমাত্র সন্তান ছিল। সে বুঝেছিল এক সন্তান বলেই বাপ এ যাত্রায় সব কিছু সামলে নিলো। তাই প্রথমবার সনাতনের মুখ দেখে বিভূতি সাহস করে দ্বিতীয়বার বংশবৃদ্ধির চেষ্টা করেনি। কোনক্রমে টিকিয়ে রাখা সংসার বলেই বোধহয় বাড়বাড়ন্তও তেমন হয়নি। পরাণ ঘোষের ছোট মেয়ের সাথে সনাতনের বিয়েটা দিতে পারল বলে ঘরে লক্ষ্মী উঠল। সনাতনের গোরা থেকেই বিয়েতে মত ছিল না, কিন্তু কে কার বাপ? বিভূতির কথাই শেষ কথা। হারানের মত গোয়ালে গরু না থাকলেও সংসারে শ্রী ফিরেছে। হারানের বাপের কাছে যখন বিভূতির বাপ ছুটে গেলো, তখন সে এক কথায় রাজি হয়ে গেছিল বিভূতিকে নৌকোর মাঝি করে নিতে। হারানও বিভূতিকে নিরাশ করেনি। সনাতনকে বিভূতির স্থান নিতে দিয়েছে। কিন্তু হারান, বিভূতি, এদের মাথার চুলে পাক ধরেছে, কপালের চুল পাতলা হয়ে আসছে। এদের কপালে বিধাতাপুরুষ যা লিখেছেন, তার প্রায় শেষ অধ্যায় উপনীত হয়েছে। আর জীবনের থেকে নতুন কিছু পাওয়ার নেই। যাদের জীবনে নতুন কিছু হ’তে পারে তারা হ’ল পবন আর সনাতন।

পবন তার বাপের মতই ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, দশাসই চেহারা... একাই একটা নৌকোর দাঁড় টেনে ওপারে নিয়ে যেতে পারে। মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চ মধ্যবিত্ত হওয়ার চিন্তা আর কিঞ্চিৎ রিপুগ্রস্ততা ছাড়া আর কিছুই তার মনে বাসা বাঁধত না। তার সমবয়সী অনেকেই নদীর পশ্চিম পারে গিয়ে নানারকম ব্যবসা করে বা কারখানায় জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু তার মনে কখনওই সেরকম ইচ্ছে দানা বাঁধেনি। বাড়তি উপার্জনের প্রয়োজনে মাসে এক-আধ বার গঞ্জে যেতে হয় ঠিকই, তবে সেও এক রাতের বেশি একটানা বাইরে থাকতে হয় না। ব্যক্তিগত চাহিদাগুলো সময়মত মেটাতে পারলে সারা জীবন সে সেই ভাবে দাঁড় টানতে রাজি আছে।

কিন্তু সনাতনের ভাবগতিক অন্যরকম। সে তার মায়ের মত পরিষ্কার রঙ পেয়েছে। চেহারাও তেল মাখানো পাকা বাঁশের লাঠির মত। ছোটবেলা থেকে বাপের সাথে নদীর ঘাট অব্ধি যেত, তারপর আবার ফিরে আসত। কিন্তু নৌকোর দাঁড় বাইবার থেকে নদীর ওপার থেকে এপারে আসা লোকগুলো তাকে বেশি টানত। প্রতিদিন সকালে পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম পারে চলে যাওয়া ব্যস্ত জনগণের ভিড়ে তার মিশে যেতে ইচ্ছে করত। ইচ্ছে করত পশ্চিম পারের দুনিয়াটা একবার ঘুরে আসতে। সে ইচ্ছে অচিরেই নদীর কূলে আছরে পরা ঢেউয়ের নিঃশ্বাসের সাথে মিশে দীর্ঘশ্বাস হয়ে শূন্যে হারিয়ে যেত। রাতের বেলা ওপারের আলোর মেলা ঘুমের মধ্যেও স্বপ্নে তাকে হাতছানি দিত। কিন্তু তার সেই আলোর জগতে যাওয়া স্বপ্নই থেকে গেলো। তার মনে ইচ্ছের প্রবল ইন্ধন টুকু যেমন সৃষ্টিকর্তা ভরে দিয়েছেন, ঠিক সেইরকম বিধান করে সেই ইচ্ছে বাস্তবায়িত হওয়ার পথেও একটা করে বাঁধ রচনা করে রেখেছেন। সেইরকম একটা ইচ্ছের নাম কাজল।

অল্প বয়সে পূর্বরাগে আক্রান্ত হয়নি এমন মনুষ্যহৃদয় পৃথিবীতে বিরল। সনাতনও তার ব্যতিক্রম নয়। কুমোর পাড়ায় নিজের সঙ্গীদের সাথে প্রায়ই যেত সে এক কালে। যুবক সনাতনের দিকে চোখ যাবে না, এমন চোখ নিয়ে কুমোর পাড়ার কোনও মেয়েমানুষ জন্মায়নি। সেখানেই এক কাজলা দিঘীর ঘাটে একদিন কাজলের সাথে দেখা হ’ল সনাতনের। তারপর কি হ’ল তা লোকচক্ষুতে বিশেষ ধরা পড়েনি। তবে যা হ’ল তা সনাতনের পক্ষে খুব একটা ভাল হ’ল না। কিছুদিনের মধ্যেই ব্যাপারটা কাজলের বাপের কানে উঠল আর সে গল্প অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ার আগেই তিনি কন্যাদায় থেকে মুক্ত হ’লেন। শুধু বিয়ে হ’লে সনাতন যতটা আহত হ’ত তার থেকেও বেশি আহত হ’ল একতা জেনে যে তার প্রাক্তন অনুরাগিণীটি তার বর্তমান সহকর্মী পবনের গৃহিণী। কাজলের অভিভাবকরা হারান মণ্ডলের পরিবারকেই বেশি সচ্ছল বলে মনে করেছিল। তাই কুমোর হয় সে কুমোরদের মাঝে জ্ঞাতি-বৃদ্ধি না করে হারান মণ্ডলের ঘরে নিজেদের মেয়েকে তুলে দিলো। এর প্রায় তিন বছর পর সনাতনও পরাণ ঘোষের কনিষ্ঠ-কন্যারূপিণী শৃঙ্খল পরিবেষ্টিত হ’ল। পরাণ ঘোষের মেয়ে শিউলির নামকরণ কে করেছিল বলতে পারি না। তবে তার চেহারায় যৌবনের লালিত্য থাকলেও শিউলি সুলভ শুভ্রতার লেশমাত্র ছিল না। ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরও কোনও চরম মুহূর্তে তাকে অস্ফুটে সুন্দরী বলতে পারতেন না। সনাতন তার প্রতি বিরূপও হ’ল না, আবার আকৃষ্টও হ’ল না। তাকে যাবজ্জীবন অবজ্ঞার দণ্ডে দণ্ডিত করল। শিউলি বাপ-ছেলের সংসারে আরও একজন সদস্য হয়ে রইল, যে কেবল রান্না করবে আর গৃহস্থালি সামলিয়ে তাদের উদ্ধার করবে। এইভাবেই এক বছরের ওপর অতিক্রান্ত হ’ল।
(ক্রমশ)
ফটোগ্রাফি- অর্পিশ চট্টোপাধ্যায়

আপনার মতামত জানান