কিশোর কুমার এবং দুঃখের মানচিত্র

অনুপম মুখোপাধ্যায়

যারা কন্ঠস্বরে আবেগ ঢেলে দিতে চান, আমার মনে হয় তাঁরা কিশোর কুমার শোনেন না। এটা মনে হয় কারণ, একবার ওঁর গান শোনার পরে নিজের কন্ঠস্বরের প্রতি বিশ্বাস টলে যায়। এমনকি নিজের অশিক্ষার প্রতিও বিশ্বাস টলে যায়।
পারি, নাকি জানি?
জানি, নাকি পারি?
একজন কবির পক্ষে কিশোর কুমারের ভক্ত হওয়া, এবং নিজের কবিতায় আবেগ নিয়ে সুবিচার করা, আমার মনে হয় না একসঙ্গে হয়।
আমি কিশোরের ভক্ত। এর ফলেই আমার অসুবিধে হয় না কবিতা থেকে আবেগকে বাদ দেওয়ার অভিনয়টা করতে। কিশোর যে অভিনেতা ছিলেন, তার ফলেই কি ওই অপরূপ বিষাদ ঢেলে তিনি গানগুলো গাইতে পারতেন, যেগুলো আমার কৈশোরের দুপুরগুলোকে আমার কৈশোরের দুপুর করে রেখেছে?
অতখানি রক্তক্ষরণ নিশ্চয়ই তাঁর বুকে হত না! অতগুলো বিয়ে মাথায় রেখেই বলছি। এতটা একা তিনি ছিলেন না অবশ্যই! কারণ, একা তিনি অবশ্যই হতে চাননি, হতে দেননি নিজেকে কোনো না কোনো ফিকিরে।
তবু এই যে ঘাতক বিষাদ, রাজকীয় একাকীত্ব, প্রাপ্ত সুর, এবং প্রচ্ছন্ন অভিনয়ের ধারণা, কোথায় যেন এর ফলেই ‘দুঃখের কবিতা’ ব্যাপারটা আমার কাছে সোনার পাথরবাটি হয়ে গেল। দুঃখের কথা একটাও লেখা হল না কবিতায়।
এখানে কেউ বলতেই পারেন, ‘দুঃখের কথা আপনি একটাও লিখতে পারলেন না কবিতা।’ এক তরুণ কবি তো গতকাল ফেসবুকে বলেই দিয়েছেন দুজন ছাড়া কোনো কবি নাকি শূন্য দশকে নেই! আমি তাঁদের একজনের কবিতা পড়িনি। আরেকজনের বেশ কিছু পড়েছি। এবং... আমি আপাতত ২০০০-এর মানচিত্র খুঁজছি।
এই মানচিত্রের ব্যাপারে কিশোর কুমার কী বলবেন? তাঁর গাওয়া রবীন্দ্র সঙ্গীতগুলো যখন সরস্বতী পুজোর প্যান্ডেলে বাজে, কোথায় যেন মনে হয়, কিশোর কেন এটা করলেন? এটা তো তাঁর স্পেস নয়!
নিজের স্পেস এভাবে ভুলে যাওয়া কখনো সখনো শিল্পীর খামখেয়াল, কখনো মোহ।
কিন্তু কিশোর! অনেক সময় এমনকি দেব আনন্দকে দেখে মনে হয় তাঁকে দেখতে পাচ্ছি না, কিশোরকে শুনছি মাত্র... ‘লেকিন লাগায়া হ্যায় জো দাঁও হামনে...’ মনে হয় ওটা তো কিশোর কুমার! দেব আনন্দের মতো লাগছে কেন! দেবসাবের মতো একটি স্টাইল আইকনকে যিনি এভাবে আড়াল থেকে আড়াল করতে পারেন, তাঁর জন্য কোনো কুর্নিশ পর্যাপ্ত নয়।
নিজেকেও তো দেখতে পাই! যখন শুনছি, ‘কোই হোতা জিসকো আপনা, হাম আপনা কেহে লেতে ইয়ারোঁ...’ আরে!!! এই তো নিজেকে দেখতে পাচ্ছি! এভাবে দেখাশোনার ব্যাপারটা ঘুলিয়ে দিতে পেরেছিলেন কিশোর। মহম্মদ রফিকে মাথায় রেখেই বলতে হয়, তাঁর তুলনা কারো সঙ্গে হয় না। রফির মতো উচ্চাশা ওঁর ছিল না। হ্যাঁ, মহম্মদ রফি নামটা আমার কাছে এম্বিশনের দ্যোতক। ঠিক যেমন একটা এভারেস্ট এভারেস্ট হতে চেয়েছিল। মান্না দে-র মতো ক্ল্যাসিকাল বেস কদাপি এবং সর্বজনবিদিতভাবেই কিশোরের ছিল না। এমনকি মুকেশের মতো দরদিয়া গলাও ওঁর নয়।
কিন্তু চাঁদের সঙ্গে মঙ্গলগ্রহ, ধ্রুবতারা, বা হ্যালির ধূমকেতুর তুলনা ঠিক নয়। আমাদের চাঁদ দেখলে আবেগ আসে, মঙ্গলগ্রহের রক্তলাল রঙ সেই প্যাশন জাগাতে পারে না।
তবু, হ্যাঁ, একটা বিষয় হল, এই কিশোর কুমার গাঙ্গুলী লোকটার গায়ক হওয়ার কথা নয়। সেই অধিকারটা উনি আসলে ছিনিয়ে নিয়েছেন। অমিতাভ বচ্চনের অভিনেতা হওয়ার কথা নয় ওই চেহারা নিয়ে। সেই অধিকার বেঢপ লম্বা লোকটা ছিনিয়ে নিয়েছেন।
এঁরাই ইন্সপায়ার করেন। কেন বলুন তো? আমারও তো কবি হওয়ার কথা নয়।
আপনার অবিশ্যি কবি না হয়ে উপায় নেই।

আপনার মতামত জানান