আয়ে তুম ইয়াদ মুঝে...

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

গান? না, গানের মাধ্যমে ওনার সঙ্গে প্রথম পরিচয় নয়। গান শুনেছি... কিংবা বলা চলে গায়কের কণ্ঠস্বর শুনে ওনাকে চিনেছি অনেক পরে। দূরদর্শনে শনিবার বিকেলের একটি সাদাকালো হিন্দি ছবিতে দেখেছিলাম দু’জন ব্যক্তি রেলওয়ে-স্টেশনে ট্রেনের কামরায় ছুটোছুটি করছে চোর পুলিস খেলার মত। একজায়গা দিয়ে ঢুকছে, তো আর এক জায়গা দিয়ে বেরোচ্ছে। একজন গোঁফওয়ালা দুষ্টুলোক আর একজন কে ধরতে চায়, আর সেই চোর-পুলিস খেলা ঘিরেই সমস্ত চলচ্চিত্রের গল্প। কখনও স্টেশনে, কখনও শহরের রাস্তায়, কখনও গাড়ি চেপে... তাড়া করেই চলেছে। আর যাকে তাড়া করছে, তার সব কিছুই কি সাংঘাতিক মজার! কখনও সে হাফ-প্যাণ্ট পড়ে হাতে ললিপপ কিংবা আইসক্রিম নিয়ে বাচ্চা হয়ে যায়, কখনও মেয়ে সেজে মেয়েলি গলায় নাচ-গান করে, কখনও অদ্ভুত কায়দায় ভুরু নাচায়, অস্বাভাবিক সব শব্দ করে গলা দিয়ে। সে বড়ই অদ্ভুত জিনিস... চার্লস্‌ চ্যাপলিন-এর (তখন চিনতাম চাল্লি চ্যাপলিন নামেই) সিনেমা তখন দেখেছি। চার্লি মানেই সেই চার-পাঁচ বছরের ক্ষুদে দর্শকের কাছে এক দম-ফাটা হাসির উৎস। হিন্দি সিনেমা দেখতে বসেও যে ঠিক এমন হাসা যায়, সেই প্রথম দেখলাম। ঘরে টিভির সামনে বসে থাকা সকলে হাসছে... আমিও হাসছি। দুষ্টু লোকটাকে চিনতাম, তাকে আগে দেখেছি। কিন্তু এই যাকে দেখেই হাসি পাচ্ছে, যার প্রতিটি অভিনয়ের ভঙ্গিতে হেসে ফেলছে সবাই, তার সঙ্গে সেই প্রথম পরিচয়। বড়দের মুখে নামটা শুনলাম, কিশোর কুমার। ঠিক যেমন একটা চেহারার সঙ্গে মনে একটা নাম ছেপে যায় শিশু-মনে, ঠিক যেভাবে টুপি-ছড়ি-কোট নিয়ে ব্যক্তিটি যে ‘চাল্লি’ সেটার ছাপ পড়ে গেছিল... তেমনই হিন্দি সিনেমায়ে এই সোরু গোঁফ, অদ্ভুত ভুরু আর চোখের অঙ্গভঙ্গি করা, ঈষৎ বড় মাপের মাথার এই ব্যক্তিটির চেহারাও ওই একটা সিনেমা দেখেই মাথায় বসে গেছিল পাকাপাকি ভাবে। হ্যাঁ, হাফ-টিকিট... এই হাফ-টিকিট দেখেই কিংবদন্তি কিশোর কুমারের বহুমুখি প্রতিভার একটির সঙ্গে প্রথম পরিচয়।

এরপর, যখনই দূরদর্শনে কোনও গান বা কোনও সিনেমায় হঠাৎ এই চেহারাটা চোখে পড়ত, টিভি-র সামনে তখনই বসে পড়তাম। সেই ‘স্ক্রিন প্রেজেন্স’-টাই যেন এমন, যা চুম্বকের মত আকর্ষণ করে। একেবারে অন্যরকম, অদ্বিতীয় এক উপস্থাপনা যা দর্শক তার আগেও হিন্দি ছবিতে দেখেনি, পরেও দেখতে পাবে না (পারলেও, সে যে ওই প্রবাদপ্রতিম শিল্পীর সচেষ্ট অনুকরণের সীমিত প্রচেষ্টা, তা স্পষ্ট বোঝা যায়)। হাফ-টিকিট, চলতি কা নাম গাড়ি, লুকোচুরি, পাড়োসান... কিশোর কুমারের সিনেমা জেনে দেখিনি একটাও। টিভির পর্দায় কিশোর কুমারের সেই উপস্থিতি, মন আর দৃষ্টি দুই কেড়ে নিয়েছে, তবে সেই সিনেমা দেখেছি। অত অল্প বয়সে, কোন সিনেমার কেমন গল্প, সেসব তেমন গুরুত্ব পেতো না... শুধু সেই মজার মানুষটা কত কিছু করছে – কি অদ্ভুত প্রাণবন্ত, চোখে মুখে কথা... আশ্চর্য রকমের সাবলীল বিচরণ ছোট থেকে বড় সকলকে আকৃষ্ট করে... সেই কিশোর কুমারই শুধু গুরুত্ব পেত। ভোরবেলা আকাশবাণী কলকাতা ক-তে বাংলা গানের অনুষ্ঠান ‘চয়ন’-এ ‘সিং নেই তবু নাম তার সিংহ’ গানটা হলে একটা অন্যরকম আনন্দ দিয়ে দিন শুরু হ’ত। কিশোর কুমার কেমন কৌতুকময় অঙ্গভঙ্গি করে একদম আসর জমিয়ে ঐ গানের অভিনয়টা করেছিল, সেটা চোখের সামনে ভেসে উঠত। মনের মধ্যে ‘আয় ঝুকুমায় ঝুকুমায় ঝুকুমাকি’ বাজতে বাজতে স্কুলে চলে যেতাম। কিশোর কুমারকে চিনেছি, তাকে দেখলেই হাসি পাচ্ছে, ভীষণ জমিয়ে উপভোগ করছি সব কিছু... গাইতে দেখছি, নাচতে দেখছি। অন্যদের অদ্ভুত ভাবে উত্যক্ত করতে দেখছি (সেই ভাবে বড়দের উত্যক্ত করতে গিয়ে বকুনি বরাদ্য ছিলো)... অথচ তখনও গায়ক কিশোর কুমারের সঙ্গে পরিচিতি ঘটেনি। সেই আকাশবাণীতেই, দিল্লী থেকে রাতে সম্প্রচারিত হ’ত ‘ভুলে বিছড়ে গীত’। পুরনো দিনের একের পর এক অনবদ্য হিন্দি গান। শুধু গান আর সুর কানে আসত, ঘুমিয়ে না পড়া অবধি। সঞ্চালক কি বলছেন গানের মাঝেমাঝে, খুব একটা মন দিয়ে খেয়াল করতাম না। একদিন হঠাৎ করেই কানে এলো – “ফিল্ম কা নাম গ্যাম্বলার, ধুন এস ডি বর্মন, আওয়াজ কিশোর কুমার”... শুরু হ’ল গান ‘চুড়ি নেহি ইয়ে মেরা, দিল হ্যায়’। অন্যসময় হ’লে হয়ত মনে সে ভাবে প্রবেশ করত না, কিন্তু ওই ‘আওয়াজ কিশোর কুমার’-টা কেমন খচ্‌ করে কানে লাগল। মা-কে জিজ্ঞেস করলাম এটা কোন কিশোর কুমার? মা একটা হালকা ধমক দিয়ে বলল, “কোন কিশোর কুমার মানে? কিশোর কুমার ক’টা?” আমি অবাক হয়ে বললাম, “সে তো সিনেমা করে! গান ও গায়?” মা বলল, “সব পারে...” সেই শুরু, তারপর যতবার শুনেছি, ততবার আরও একটু বেশি করে ভাললাগায় জড়িয়ে নিয়েছে আমাকে। ঠিক যেমন একটা সিগনেচার ফর্ম অফ অ্যাক্টিং, ঠিক সেইরকমই একটা সিগনেচার ফর্ম অফ সিংগিং... এই সিগনেচার ব্র্যান্ড-এর নাম ‘কিশোর কুমার’!

যেদিন প্রথম গায়ক কিশোর কুমারকে চিনলাম, সেদিন ওই ‘চুড়ি নেহি ইয়ে মেরা’-র পরেই বাজল ‘পল পল দিল কে পাস’, এবারে সতর্ক ছিলাম... আবার ভেসে এলো সঞ্চালকের কণ্ঠস্বর – ‘আওয়াজ কিশোর কুমার’। ওই দমফাটা হাসাতে পারা মজার-মানুষটাই যে এই গানগুলো সব গায়, শুনে সেই ছোট্ট ছেলেটার বিস্ময়ের সীমা ছিল না। সত্যি বলতে, এর আগে কাউকে চিনতামই না যে গানও গায় আর অভিনয়ও করে। হাফ-টিকিটের সেই মজার মানুষটি এক মুহূর্তে সুপার-হিরো হয়ে গেছিল... অল রাউণ্ডার... ‘সব পারে!’ কিন্তু, যথেষ্ট হতাশা নিয়েই বলছি, হিন্দি সিনেমা কিংবা বাংলা ছায়াছবির জগৎ সেই ভাবে ওনার অভিনয় প্রতিভার প্রকাশ দেখতে পায়নি। আমরা বঞ্চিত। যখন ২০০০ সালের আমরা প্রবেশ করলাম, একুশ শতকের দোরগোড়ায়... মিলেনিয়ামের সব কিছু সেরা বাছাইয়ের একটা হিড়িক পড়েছিল। পেলে না মারাদোনা, শচীন না ডন ব্র্যাডম্যান, রাজেশ খান্না না অমিতাভ বচ্চন... ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং সংবাদ মাধ্যমের ঝলমলে প্রচার এবং জনমতের হুড়োহুড়ি। টিভিতে দেখলাম এক বেসরকারি সংবাদ সংস্থার চ্যানেলে হিন্দি ছবি’র সীরা কৌতুক অভিনেতার জন্য ভোটাভুটি করছে। না, সেরা কৌতুক অভিনেতা নয়... মিলেনিয়ামের সেরা কৌতুক অভিনেতা! (যদিও এই মিলেনিয়ামের সেরা বেছে নেওয়া ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি বলেই মনে হয়) সেখানে মেহমুদ, জনি ওয়াকার, আই সে জোহার থেকে শুরু করে জনি লিভার, অনুপম খের, কাদের খান... সকলের নাম। একের পর এক দম ফাটানো হাসির দৃশ্য এবং সংলাপ। কিন্তু সকলকে মাইল খানেক পেছনে ফেলে আনডিস্‌পিউটেড চ্যাম্পিয়ন কিশোর কুমার! বিশাল মার্জিনে জয়ী, মিলেনিয়ামের সেরা কৌতুক অভিনেতা কিশোর কুমার। সেই মানুষটা, যিনি নাকি হাতে গুনে পনেরো-ষোলোটি হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছেন, যার মধ্যে অর্ধেক টিভিতে দেখানই হয় না এবং সিডি/ডিভিডি পাওয়া যায় না। চলতি কা নাম গাড়ি, হাফ-টিকিট, পড়োসান... এই তো মনে আছে সকলের হাসির সিনেমা বলে। ‘বড়তি কা নাম দাড়ি’ আর কতজন দেখার সুযোগ পেয়েছে? এ ছাড়া ঝুমরু, কিংবা দিল্লি কা ঠগ তো আর সেই অর্থে হাস্য-কৌতুকের গল্পই নয়... মাপা হাসি – চাপা কান্না নিয়ে কিশোর কুমারের অনবদ্য অভিনয়। কিন্তু এই সীমিত পরিসরে যা আত্মপ্রকাশ, সেই দিয়েই কিশোর কুমার সমগ্র দেশবাসীর মনে যে কি জায়গা করে নিয়েছিলেন, এখনও কি ভাবে ‘রাজ’ করছেন সকলের মনে... সেই ভালবাসা-শ্রদ্ধার স্মারক। কৌতুক অভিনেতা নয়, শিল্পী কিশোর কুমার সর্বজনগ্রাহ্য শতাব্দীর সেরা পারফর্মার। আমরা কেবলমাত্র টিভিতে অথবা রেকর্ড-করা ভিডিওতে ওনার পার্ফরমেন্স দেখে রোমাঞ্চিত হই। যাঁরা সামনে থেকে দেখেছেন, কিশোর-ম্যাজিক উপভোগ করার সরাসরি অভিজ্ঞতা যাদের হয়েছে, সেই সৌভাগ্যবানরাই স্মৃতির রোমন্থন করে আক্ষরিক অর্থে বলতে পারবেন, সেই উন্মাদনা ঠিক কেমন ছিল। অথচ এই বিরল প্রতিভার শিল্পী মানুষটি, নিজের অনিচ্ছা কিংবা উদাসীনতার কারণেই হোক, মনের কোণে জমে থাকা কোনও ক্ষোভ অথবা গভীর যন্ত্রণার কারণেই হোক, অথবা ওনার প্রতিভার প্রতি সুবিচার হয় এমন চিত্রনাট্য না পাওয়ার কারণেই হোক... হিন্দি কিংবা বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনেতা হিসেবে আর সে ভাবে নিজের অবদান রাখলেন না। কেমন যেন একটা পরোক্ষ সলিলকি, সেই দুষ্টুমি ভরে ভুরু নাচিয়ে, সরু গোঁফের নিচে মুখভঙ্গি করে হেসে – “দেখলি তো? পারি... কিন্তু করব না... কি করবি কর!” গায়ক কিশোর কুমারের কাছ থেকে অনেক অনেক পেয়েছি আমরা, প্রাণ ভরিয়ে দিয়েছেন... আজও দিচ্ছেন অবিরত। কিন্তু অভিনেতা কিশোর কুমারের সেই সিগনেচার পার্ফরমেন্স, আরও বেশি করে তা পাওয়ার অপূর্ণ ইচ্ছেটা ব্যক্তিগত ভাবে খুব পীড়া দেয়। একটা দৃষ্টান্তমূলক অভিনয়ে দক্ষতার যে উদাহরণ ওই ক’টি সিনেমাতেই উনি রেখে গেছেন, আরও বেশি করে পেলে তা একটা লেগাসি হয়ে থাকত ছায়াছবির জগতে। অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন অথবা সংগীত শিল্পী অমিত কুমারের স্মৃতি চারণা থেকেই জানা যায় সত্তরের দশকে হরিহর আত্মা কিশোর কুমার – রাহুল দেব বর্মন মাঝে মাঝেই আবার একটা সিনেমায় অভিনয় করার ইচ্ছে প্রকাশ করতেন। গান-এর সুর দেওয়া বা রেকর্ডিং-এর সময় গায়ক কিশোর কুমারের ভেতর থেকে নানা ভাবে যে অভিনেতা কিশোর কুমার বেরিয়ে আসত, তার সাক্ষী তাঁরা সকলে যাঁরা ওনার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। মজা করেই হোক কিংবা সেই সুপ্ত ইচ্ছে থেকেই হোক, উনি অমিতাভ বচ্চন কে একবার বলেছিলেন, ‘তুমি তো এখন সুপারস্টার... একবার পঞ্চম আর আমি তোমার সঙ্গে একসঙ্গে একটা সিনেমা করলে কেমন হয়? বেশ তিন বন্ধু একসঙ্গে জমে যাবে... কি বল?” সেই হাসির পরিমণ্ডলেই সাবধানী বচ্চন সাহেব হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “আপনারা আমার বন্ধু না শত্রু! আপনারা যদি অভিনয় করেন, সেই সিনেমাতে আর আমাকে কেউ দেখবে!” হয়ত আরও একটি কিশোর-কুমার ব্র্যাণ্ড রসিকতা... কিন্তু সেই জিনিসটা বাস্তবায়িত হ’লে হিন্দি সিনেমার এক মাইল-স্টোন প্রকল্প হ’ত, সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ আছে কি? যে কারণেই হোক, আমাদের দুর্ভাগ্য, সে আর হয়ে ওঠেনি।

অনেককেই বলতে শুনেছি, এমন কি ওনার স্বনামধন্য অগ্রজ, প্রবাদপ্রতিম স্বর্গীয় অশোক কুমারকেও, তাঁর সেই স্বভাবোচিত ভঙ্গীতে “কিশোর কো হাম সাব ক্যাহতে থে... পিতাজী ভি ক্যাহতে থে... তু ‘গানা’ গানা ছোড় দে... ইয়ে তেরি ব্যস্‌ কি বাত নেহি!” আবার কখনও বলতেন “গান তো গাইতাম আমি... অনুপ তবলা বাজাতো... আর ওর কাজ ছিল খালি নকল করা আর বিরক্ত করা!” সেই যুবক আভাস কুমার গাঙ্গুলির নানা রকম গল্পর মধ্যে একতা জিনিসই স্পষ্ট ছিল - ‘নাছোড় বান্দা’। সেই সময়কার সম্মানিত সংগীতকার ক্ষেমচন্দ প্রকাশের হাত ধরে আত্মপ্রকাশ (অবশ্য তার আগে সমবেত সঙ্গীত গাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন, কোরাসে), তারপর শচীন কত্তার সুনজরে এসে একেবারে পুত্র-স্নেহ পেয়ে হিন্দি গানের জগতে কিশোর কুমার হয়ে ওঠা। সেই গায়ক কিশোর কুমারের রূপকথার যাত্রার সূচনা। সেই যাত্রার অসংখ্য মুহূর্ত, সমকালীন শিল্পী, গীতিকার, সংগীতকারদের সাক্ষাৎকারের মধ্যে, পাতায় পাতায় ধরা পড়েছে। ওই কিংবদন্তীর প্রসঙ্গ উঠলে লতা মঙ্গেশকরের মত স্বল্পভাসী শিল্পীও যেন থামতে পারেন না। রঙচঙে মানুষটির একের পর এক বর্ণময় স্মৃতি! বলা যায়, সাদাকালো যুগেই ইস্টম্যান কালারে রাঙানো ‘রঙ্গীন সুপারস্টার’ শিল্পী কিশোর কুমার। আসলে অভিনেতা কিশোর কুমার কোনওদিনই ওনার পিছু ছাড়েনি, পিছু ছাড়েনি তাদেরও যাঁরা ওনার সঙ্গে স্টুডিওতে রেকর্ডিং করেছেন, কাজ করেছেন ওনার সঙ্গে। একবার গায়িকা আশা ভোঁসলে সেই প্রসঙ্গেই বলেছিলেন, অমিত কুমার জন্মানোর আগে কিশোর কুমারের এক বিচিত্র খেয়াল হঠাৎ শুরু হয়েছিল। উনি এক অদৃশ্য কোন শিশুকে সঙ্গে নিয়ে রোজ স্টুডিওতে আসতে রেকর্ডিং-এর সময়। কেউ নেই সঙ্গে, অথচ তিনি কারও সঙ্গে কথা বলছে, তাকে বলছেন বাকিদের ‘হেলো’ বলতে ‘আঙ্কল/আন্টি’-দের সঙ্গে কথা বলতে। এবং নিজেই তারপর সেই বাচ্চাদের মত গলা করে কথাগুলো বলতেন। সেই অভিনয়ের খেলা অনেকদিন চলেছিল, তারপর একসময় সত্যিই একটি ছোট্ট ছেলে ওনার হাত ধরে স্টুডিওতে এলো, ওনার সেই মানসপুত্র, অমিত। আমরা যে ওনার ‘ভয়েস মডিউলেশন শুনেছি, অথবা গায়েকির মধ্যে ওই আকস্মিক অথবা পরিকল্পিত রকমফের... স্পষ্ট বোঝা যায়, গায়েকির মধ্যেই একের পর এক দৃশ্যগুলি অভিনীত হচ্ছে। একজন উৎকৃষ্ট মানের অভিনেতাই নিজের গানের মধ্যে দিয়ে পর্দার নায়কের প্রতিটি ভঙ্গিকে ওই ভাবে রূপ দিতে পারেন। আর সেই জন্যই বোধহয় তালাত মেহমুদ, মহম্মদ রফি, মুকেশ, মান্না দে এবং ব্যারিটোন ভয়েস হেমন্ত কুমারের মত ঈশ্বরদত্ত কণ্ঠের অধিকারী শিল্পীদের স্থাপত্যের মাঝেই নিজের একটা সাম্রাজ্য বিস্তার করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। কে এল সায়গলকে অনুসরণ করে সংগীতের জগতে আসা কিশোর কুমারকে অনেকেই বলেছেন, গলায় প্লে-ব্যাক সিংগারের ‘মিঠাস’ নেই। কিন্তু ক্রমে প্রকাশ পেলো, ওনার মুন্সিয়ানা একেবারে নিজেস্ব। কিশোর কুমার একেবারে অন্যরকম একজন শিল্পী যার গায়েকি এবং গলার কাজ এমনই যে – যখন যে অভিনেতার ঠোঁটে তখন তার কণ্ঠস্বর হয়ে যায়। একটা প্রজন্মে রাজ কাপুর মানেই মুকেশ, শাম্মি কাপুর অথবা রাজেন্দ্র কুমার মানেই মহম্মদ রফি... সেই প্রজন্মকে অতিক্রম করে রাজেশ খান্না, দেব আনন্দ থেকে অমিতাভ বচ্চন, ঋষি কাপুর... একদম অনিল কাপুর, সঞ্জয় দত্ত পর্যন্ত... সকলের কণ্ঠে একজনই, কিশোর কুমার।

সত্তরের দশকটা যেন অপেক্ষাই করছিল কিশোর কুমারকে একদম ক্যাটাপাল্ট করে সকলের ওপরে বসিয়ে দেওয়ার জন্য। সুপারস্টার রাজেশ খান্না অথবা দেব আনন্দের একের পর এক ছবি সুপারহিট হচ্ছে, নেপথ্যে একজনেরই কণ্ঠস্বর... দ্য গ্রেট কিশোর। হিন্দি সিনেমার জগতে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্বদের অন্তর্বর্তী বোঝাপড়া, এবং ‘লবি’-র শক্তি প্রকাশ বার বার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আমরা স্পষ্ট দেখেছি, কি ভাবে একজনের উত্থান আর একজনের পতনের কারণ হয়ে ওঠে। কী ভাবে, কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তি চাইলেই অন্য একজনকে কোণঠাসা করে দিতে পারে। এক গোষ্ঠী বনাম আর এক গোষ্ঠী ঠাণ্ডা-যুদ্ধ’র গল্পও খুঁজলে পাওয়া যাবে অনেক। কিন্তু সকলের ঊর্দ্ধে, সকলের এক নম্বর চাহিদা ‘কিশোর দা’। মনমোহন দেসাই থেকে শক্তি সামন্ত, ইয়াশ চোপড়া থেকে ঋষিকেশ মুখার্জী... সকলের কাছেই উনি অপরিহার্য ছিলেন, বার বার ডাক পড়েছে তাঁদের সব ছবিতে। সকলের মন জয় করে নেওয়ার এর থেকে বড় সার্থকতার মানদণ্ড আর কী বা হতে পারে? হিন্দি এবং বাংলা উভয় ক্ষেত্রেই সঙ্গীত জগতে একছত্র সম্রাট। তাঁর হাজার খামখেয়ালি অভ্যেস, বিচিত্র স্বভাব, মেজাজ... এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে স্পষ্ট উপেক্ষা এবং বিরক্তিকেও একেবারে সামলে নিয়ে এস ডি বর্মন, আর ডি বর্মন, লক্ষীকান্ত-পেয়ারেলাল, কল্যাণজী-আনন্দজী... এমন কি রাজেশ রোশান, বাপ্পী লাহিড়ী পর্যন্ত, সকলে ওনাকে কাছে ডেকে নিয়েছেন, সকলের চোখের মণি হয়ে থেকেছেন কিশোর কুমার। যদি কোনও ছবিতে একটাই ভিন্নধর্মী গান হয়, তাহলে সেই একটা গানের জন্যই কিশোর কুমারের ডাক পড়ত, এবং সেই একটা গানেই সিনেমা হিট... কিশোর কুমার বছরের সেরা শিল্পী! শুধু শিল্পী সত্ত্বা বা অনবদ্য পারফর্মার হিসেবেই নয়... ওই মার্কেট-ক্যাপচার করা অস্বাভাবিক বিপুল জনপ্রিয়তা অন্য সব গায়কদের (যাঁরা ওনার অনেক আগে শুরু করেছেন এবং অসামান্য প্রতিভার অধিকারী) অনেকটা ওপরে এই ব্র্যাণ্ড ‘কিশোর কুমার’-কে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়। শুধু সংগীত পরিচালকরাই নন... সিনেমার পরিচালক, প্রযোজক, বিলগ্নিকারী কোনও বাণিজ্যিক সংস্থা... এমন কি প্রভাবশালী নায়করাও তাঁদের সাফল্যের জন্য ভীষণ ভাবে নির্ভর করতেন এই জাদুকরের ওপর। ‘হর কোই চাহ্‌তা হ্যায় এক মুট্‌ঠি আসমান’... বার বার শোনা এই গান, কিন্তু ছবিটি কত জনের মনে আছে? ‘চলতে চলতে মেরে ইয়ে গীত ইয়াদ রখনা’ এখনও সাংঘাতিক জনপ্রিয় গান... কিন্তু যে ছবির গান সেই ছবিটির বক্স অফিসে কি অবস্থা হয়েছিল? ‘আজ এই দিনটাকে মনের খাতায় লিখে রাখো’, চিরঞ্জিতের লিপ-এ এই বাংলা ছায়াছবির এই গান, ছায়াছবিটি সকলের দেখা তো? এই গানটি কিন্তু এখনও পাড়ায় পাড়ায় পুজোর সময় মাইক-এ বাজে... কিশোর কণ্ঠিগণ চুলে আলফেট কেটে ঘার বেঁকিয়ে চোখ বন্ধ করে সিন্থেসাইজারের তালে তালে এই গান গেয়ে মজলিস জমিয়ে দেন। অভিনয়, গায়েকি, মঞ্চে গান গাওয়ার সময় একটা অদ্ভুত উপস্থাপনা, মুগ্ধ করে দেওয়া বহুমুখী প্রতিভা... সব কিছুর এক প্যাকেজ ‘কিশোর কুমার’-ই হিন্দি-বাংলা গানের জগতে প্রথম বাণিজ্যিক সাফল্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র, যে নক্ষত্র থেকে জ্যোতি আজও সমান ঔজ্জ্বল্যের সঙ্গে বিচ্ছুরিত হয়।

সিনেমায় সেরা নেপথ্যকণ্ঠ হিসেবে আট বার ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার, ১৯৬৯ থেকে ১৯৮৫ এই ষোলো বছরে প্রায় প্রতি বছর কোনও না কোনও মন্ত্রমুগ্ধ করে দেওয়া গানের জন্য ফিল্ম-ফেয়ার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়া, এছাড়াও সমগ্র দেশবাশী কে পাগলা করে দেওয়ার মতন একের পর এক মন-মাতানো লাড়ে-লাপ্পা গান (যেখানে ভীষণ ভাবে থাকত য়ুডলেইং আর গানের মধ্যে ঘুরেফিরে বেড়ানো ভিন্নধর্মী শব্দের বিচিত্র স্বাদ)। কখনও শচীন দেব বর্মনের সুর দেওয়া গানের সুরেলা মূর্ছনা, কখনও রাহুল দেব বর্মনের অনবদ্য স্টাইলে প্রাণবন্ত কিশোর, কখনও এলপি জুটির রোমাণ্টিক গান... একের পর এক সারা রাত জাগিয়ে রাখা লাইভ স্টেজ পারফর্মেন্স। কিশোর কুমারের উপস্থিতি মানেই এক উন্মাদনা (ঢাকুরিয়া লেকের সেই কিশোর কুমার নাইটের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাও এমনই এক উন্মাদনার ফল)। সেই কিশোর কুমার নাইট-এর জাড্য এমনই... যে কিশোর কুমারের অবর্তমানেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিল্পীরা সশ্রদ্ধ নিবেদন এখনও করে চলেছেন সেই একই নামে, এমনই ম্যাজিক ওই ব্র্যাণ্ডে! এদিকে বাংলা গানেও একের পর এক জনপ্রিয় বেসিক ডিস্ক, সত্যজিৎ রায়ের ছবিতেও গান গেয়ে ফেলেছেন (সেই সত্যজিৎ রায়, যিনি খুব ভেবে চিনতে ছায়াছবিতে গান রাখতেন প্রয়োজনীয়তার নিরিখে, এবং একদম নির্দিষ্ট শিল্পীকেই আহ্বান করতেন), তাও রবীন্দ্রসংগীত! কিশোর কুমার মানেই যেন সাফল্যের মূর্ত্য প্রকাশ! আর কী বা পাওয়ার থাকতে পারে এমন একজন সোনালি-স্পর্শ স্বয়ং-সম্পূর্ণ প্রতিভার? একজন শিল্পী হাজার চেষ্টা করলেও এর থেকে বেশি জনপ্রিয়তা আর সম্মান কি জীবনে পেতে পারে? আর কী বা দাবি থেকে যায় জীবনের কাছ থেকে? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনুভব করি কোথাও একটা অনধিকার চর্চা হয়ে যাওয়ার অবকাশ থেকে যায়। একদা চলচিত্র-সাংবাদিক দুলেন্দ্র ভৌমিকের সেই কথাটা মনে পড়ে যায় ‘কিশোর কুমার এর সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় একটা কথাই স্পষ্ট বুঝেছি... যতই হাসুক, পাগলামো করুক... আসলে মানুষটা বড় একা!” মঞ্চে হোক, কর্মজীবনে হোক, বা চলচ্চিত্রের পর্দায়... ওই সদা হাস্যময়, কৌতুকপ্রবন, ক্ষ্যাপাটে সভাবের সব কিছুর আড়ালে ঠিক চার্ল্‌স চ্যাপলিনের মতই কিশোর কুমারকেও আজীবন তাড়া করে বেড়িয়েছে ‘আ শোম্যান’স মেলানকলি’। একের পর এক ব্যক্তিগত দুর্যোগে, নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে করতে জর্জরিত একটি মানুষ যে ঠিক কি ভাবে অন্তর্মুখী যুদ্ধটা একা একা লড়তেন, তারই বহিপ্রকাশ হয়ত তাঁর যাবতীয় উদ্ভট কীর্তি, মানুষকে চমকে দেওয়া সিদ্ধান্ত... যাকে আমরা অনেক দূর থেকে পাগলামো ভাবি। আসলে এত বড় মাপের মানুষদের, ভেতরের ক্ষতগুলো, কোনওদিনও আরোগ্য লাভ না করা আঘাৎগুলো কেউই বাইরে থেকে সেভাবে অনুভব করতে পারে না... মাঝে মাঝে আভাস পায়, আন্দাজ করতে পারে মাত্র, কোনও বিশেষ স্পর্শ কাতর মুহূর্তে। রুমা গুহঠাকুরতার সঙ্গে সম্পর্ক, ঘনিষ্ঠতা এবং বিচ্ছেদ, কিংবদন্তী অভিনেত্রী মধুবালার অসুস্থতা এবং অকাল প্রয়াণ, অভিনেত্রী যোগিতা বালীর সঙ্গে সম্পর্কের তিক্ত অবসান, এবং অবশেষে অভিনেত্রী লীনা চন্দ্রভারকারের সঙ্গে সম্পর্ক (যিনি নিজেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে সাংঘাতিক ভাবে বিধ্বস্ত ছিলেন)। একের পর এক আঘাতে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পাল-টাকে আবার ম্যারামৎ করে নৌকোকে উজানে ভাসানোর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন আজীবন। লীনা চন্দ্রভারকার বলেছিলেন, ‘এত ঝড়-ঝাপটার পর ওনার জীবনের সব থেকে খুশির মুহুর্ত বোধহয় ছিল সুমিতের আসা... ওনাকে আগে কখনও অত আনন্দ করতে দেখিনি!’ এই ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিকূলতা, বয়ে বেড়ানোর ক্রমবর্ধমান আঘাতের ভারই হয়ত কিশোর কুমারকে এমন এক অনবদ্য শিল্পী করে তুলেছিলো, যিনি ট্র্যাজিক গানগুলির মধ্যে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করতে পারতেন সাবলীল ভাবে। ‘অনেক জমানো ব্যথা বেদনা, কি করে গান হ’ল জানি না’, ‘কোই হামদাম না রাহা, কোই সাহারা না রাহা’, ‘বড়ি সুনি সুনি হ্যায়, জিন্দেগী ইয়ে জিন্দেগী’... গানগুলো শোনার সময় সত্যিই বুঝতে পারি না, এ কি নেহাতই চলচ্চিত্রের কোনও গান? নাকি শিল্পীর বুকে বেঁধা কাঁটা থেকে টপটপ করে রক্তগুলো ঝরে পড়ছে। আর আমরা কাকে দেখেছি? হাসতে হাসতে একে-তাকে চরম উত্যক্ত করা খামখেয়ালি কিশোর কুমার। ‘তুম বিন যাউঁ কাঁহা’-র রেকর্ডিং করতে করতে তিনি কেবল মুখভঙ্গি করে মহম্মদ রফি-র পেটে খিল ধরিয়ে রেকর্ডিং বন্ধ করে দিতেন, ‘বড়ে আচ্ছে লাগতে হ্যায়’ গাওয়ার সময় যেতে-আসতে পুত্র অমিত কুমারের সামনে ‘বড়েএএএএএ’ বলে হাঁক দিয়ে মনসংযোগের বারোটা বাজাতে পারতেন, দুলেন্দ্র ভৌমিককে সরাসরি বলতে পারতেন ‘আমি এখন জগিং করব, ইন্টারভিউ নিতে গিলে ছুটতে ছুটতে ইন্টারভিউ নিতে হবে’ (উনি তাই করেছিলেন), বাড়িতে রঙ করতে আসা রঙের মিস্ত্রী কে বলতে পারেন ‘পানের পিকের মত ডিজাইন করে দাও সারা ঘরে’। এ যেন পাড়ার সেই মজলিসি জ্যেঠামশাইয়ের মত, যিনি আসতে-যেতে পাড়ার সকলকে দোতলার বারান্দা থেকে হাঁক পেরে মশকরা করেন... সকলে ভাবি লোকটা কি হাসিখুশি দিলখোলা মানুষ! কিন্তু ওনার অন্দরমহলে পরলোকগতা স্ত্রীর ফ্রেমে বাঁধানো ছবির সঙ্গে ওনার কি কথা হয়, তা আর আমাদের কতজনের কানে পৌঁছয়?

ভারতীয় সংগীতের জগৎ এমনিতেই ভীষণ বিস্তৃত। আসমুদ্র হিমাচল বহু বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী একের পর এক দশক সসম্ভ্রমে অধিষ্ঠান করেছেন। বড় বড় মহীরুহর ভিড়ে বহু লতাগুল্ম হারিয়ে গেছে অচিরেই। সেইরকম এক সংগীতের তীর্থক্ষেত্রে বহু লিজেণ্ড এর মাঝে আক্ষরিক অর্থেই নিজের ভিন্নধর্মী সত্ত্বাকে নিয়ে অমর শিল্পী হয়ে আছেন ‘দ্য গ্রেট কিশোর’, থাকবেনও আগামী আরও অনেক দশক ধরে। কারও কাছে থাকবেন চিরাচরিৎ প্রথার বাইরে এসেও নিজের ইচ্ছেকে বাঁচিয়ে রাখার অনুপ্রেরণা হিসেবে। কারও কাছে থাকবেন প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের কাজকে এতটুকু অবহেলা না করা বিশাল মাপের কর্মযোগী হিসেবে। আবার কারও কাছে থাকবেন চার্লস্‌ চ্যাপলিনের মতই এক দার্শনিক শিল্পী হিসেবে, যিনি তাঁর জীবনের প্রতিমুহুর্তে প্রমাণ করে গেছেন... কি করে অন্য সকলকে আনন্দ দিয়ে নিজের ব্যক্তিগত অপূর্ণতাকে দূরে ঠেলে দেওয়া যায় হাসিমুখে। বর্ণময় মানুষ এবং বিচিত্র মুহূর্তে পরিপূর্ণ তাঁর জীবন। এমন কি মৃত্যু নিয়েও ইয়ার্কি করে গেছেন ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মাঝে। চোখের সামনে ওনার মরদেহ দেখেও আর ডি বর্মন ভেবেছিলেন ‘আবার একটা প্র্যাঙ্ক’, এখুনি জেগে উঠে সকলকে নিয়ে ঠাট্টা করবে! সাফল্যের শিখরেই থেকেছেন, সেই শিখরে থাকতে থাকতেই চলে গেছেন... রেখে গেছেন এক ‘নেভার এন্ডিং লেগাসি’ যা হয়ে রইল বহু শিল্পীর জীবিকা, মিউজিকাল ইন্ডাস্ট্রির ব্লাড ব্যাঙ্ক, ভবিষ্যতে উঠে আসা আরও বহু নেপথ্য-গায়কের কাছে এক আইডল হিসেবে। প্রতি বছর ৪ই আগস্ট তো বিশেষ করে শ্রদ্ধা জানানোর একটা দিন মাত্র, আসলে তো সারা বছরই ওনার এক একটা গান আমাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে থাকবে...
সেই জাদুভরা কণ্ঠ কখনও গেয়ে ওঠে – “জিন্দেগি, হাসনে গানে কিয়ে লিয়ে হ্যায় পল্‌, দো পল্‌”,
কখনও বুঝিয়ে দেয় – “জিন্দেগি এক সফর হ্যায় সুহানা, ইয়াহাঁ কাল ক্যায়া হো কিস্‌নে জানা”...
আবার কখনও শুনতে পাই – “জিন্দেগি কা সফর, হ্যায় ইয়ে ক্যায়েসা সফর, কোই সমঝা নেহি, কোই জানা নেহি”।

আপনার মতামত জানান