সে

তৃতীয় পর্ব
৬।।
ভিখিরি বলে তাদের যাদের টাকা পয়সা নেই, সহায় সম্বলহীন, ঘরদোর নেই, মানে কিছুই নেই যাদের। আর নিকিরি বলে সেই মালগুলোকে যাদের আছে অনেক কিছুই কিন্তু থেকেও আসলে কিছু নেই। এই রাঘব বোস হল তার মধ্যে একটা। এসেছিস সেই আসানসোল থেকে কলকাতায় ছেলের মেয়ে দেখতে তা ঠিক আছে কিন্তু এ কী রে বাপু! কথায় কথায় হুমকি। পার্কিংয়ে টাকা যেখানে লাগবে সেখানে করবি না,কোন গলিতে গুঁজে রাখ গাড়িটা, এ কী গাড়ি না খেলনা যে গুঁজে রাখবে! আর পার্কিংয়ে টাকা তো লাগবেই। কলকাতা তো আর গ্রাম না যে পুকুরের সামনে গাড়িটা রেখে হেগে, মুতে, স্নান, টান করে আসা যায়! আর এই লোকটা গড়িয়াহাটের ভিড় রাস্তায় বলে কিনা গাড়ি দাঁড় করা, মিষ্টি নিতে হবে!
বিশু এই জন্য এদের সাথে কোথাও আসতে চায় না। কিন্তু কি করবে, পাপ্পুর সব গাড়ি আজকে ভাড়া হয়ে গেছে আর মরবি তো মর তার গাড়িতেই আসতে হল রাঘব বোসকে। পেটের ব্যাপার, না-ও করতে পারে না। এই লোকটার সাথে যতবার সে কোথাও গেছে ততবার ঝামেলা লেগেছে। হয় পেমেন্ট নিয়ে, নয় সময় নিয়ে, প্রত্যেকবারই বেরনোর সময় যদি বলে সকালে গিয়ে বিকেলে ফিরে আসবে, আদতে দেখা যায় ব্যাপারটা পুরো উল্টো। নাইট স্টে করাবে আবার তার জন্য যে চার্জটা লাগে সেটাও দেবে না। হাড় বজ্জাত লোক। অথচ ব্যাটার বড় রঙের দোকান আছে এক্কেবারে বাজারের মাঝখানে, মাক্ষিচুষটার ভাল রোজগারও হয় সেটা থেকে, হোল ফ্যামিলিই তো সেটায় লেগে আছে, কিন্তু যখনই টাকা ফেলতে হয়, অমনি নিকিরিগিরি শুরু।
শক্তিগড়ে গাড়ি দাঁড় করালে কম বেশি সবাই আর কিছু না খাওয়াক চা-টা অন্তত অফার করে, এদের গুষ্টি সে সবের ধারে কাছ দিয়ে যায় না। বিশু ঠিকই করে রেখেছে, এই শেষ, এরপরে পাপ্পু যাই করুক না কেন, এই রাঘব বোসের ভাড়ায় আর আসবে না। বলে কি না, টোলের টাকা তো আমার দেওয়ার কথা না, ওটাতো ভাড়ার মধ্যেই পড়ে, মামদোবাজি আর কি! সে বলে দিয়েছিল হয় টোলের টাকা দিন, নইলে বলুন, গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছি। ব্যাজার মুখে টাকা বের করে দিয়েছিল তখন। মনে হচ্ছিল ব্যাটার হার্ট অ্যাটাকই না হয়ে যায়। আর রাঘব বোসের বড় ছেলে ঝন্টু বোস, যে ব্যাটার বউ বিয়ের রাতেই পালিয়েছিল, সেটার জন্য মেয়ে দেখতে যাচ্ছে। কেন যাবে না? মালটাকে দেখলেই তো মনে হয় দিনে দুপুরে গাঁজা মেরে বসে থাকা। ভাটার মত লাল চোখ, ছ ফুট লম্বা চেহারা, আর লিকলিকে রোগা। হেঁটে গেলে মনে হয় পেন্সিলের উপরে কেউ কালো কুত্তার লোম আঠা দিয়ে বসিয়েছে। বিশু ভাবছিল কলকাতার মেয়েদের কি আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই যে এই টাইপের পাব্লিকের সাথে বিয়ে হবে! তবে ছেলে যখন ডিসপুট মাল তখন মেয়েও নির্ঘাত তাই হবে। সে দেখেছে ডিসপুট মালের সাথে সব সময় ডিসপুট মালেরই বিয়ে হয়। মেয়েও হয় বিধবা নয়ত ডিভোর্স কেসই হবে।
তবে সে একটা দিক থেকে নিশ্চিন্ত হল মেয়ের বাড়ির গলিতে ঢুকে, এখানে গাড়ি পার্কিংয়ের খুব একটা গেরো নেই। পাড়ার মধ্যেই একটা গলিতে গাড়ি দিব্যি সাঁটিয়ে রাখা যাবে। সে বুঝল রাঘব বোসও এটা দেখে খুশি হয়েছে। বাড়িটা খুব বেশি বড় না, তবে খুব একটা ছোটও না। বিশু একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তার খুব ইচ্ছা ছিল, কলকাতার মেয়ে বিয়ে করার, কত ঠাট বাট জানে এরা। কিন্তু কি করবে, ট্যাঁকের জোর তার আর কোথায়, সেই ঝাঁটার কাঠির কপালেই নাচছে কলকাতার মেয়ে।
গাড়ি খালি হয়ে গেলে সে রাস্তাটায় খানিক টহল দিল, বেশ অনেকগুলি ফ্ল্যাটবাড়ি উঠে গেছে এর মধ্যেই। কলকাতার মেয়ে তার পছন্দ হলেও কলকাতা তার কখনোই খুব একটা পছন্দের জায়গা নয়। এখানে এলেই তার চোখ জ্বলে, সব সময় ট্রাফিক পুলিশের ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকতে হয়, আর কতরকম নোটিস, এই রাস্তায় ৪০ কিলোমিটারের বেশি স্পিডে যেতে পারবে না, এই গরমের মধ্যে সিট বেল্ট বেঁধে রাখো, কত যে ফ্যাঁকড়া। নেহাৎ পেটের জ্বালা বড় জ্বালা, নইলে কলকাতা আসতে তার বয়েই গেছে। বেশির ভাগ ভাড়াই তো কলকাতা, ভোরের ফ্লাইট, সেই রাত থাকতে উঠে গাড়ি নিয়ে বেরোও, অবশ্য বেশ কিছু ভাল ভাড়াও আছে। পালকাকুর ছেলে যতবার ফেরে বিদেশ থেকে ততবার বিশু আলাদা বকশিস পায়, এইগুলি আছে বলে তো এখনো এই লাইনে কিছু হলেও মজা আছে নইলে এই সব ড্রাইভারি ছেড়ে কবে জামাইবাবুর ধাবায় লেগে পড়ত সে। দিদি তো অনেকবারই বলেছে। অবশ্য তার একটা স্বপ্নও আছে। এইভাবে টাকা জমিয়ে জমিয়ে নিজের একটা গাড়ি কিনবে, সেকেন্ড হ্যান্ড হলেও হবে, পানাগড়ের সিং চাচার সাথে কথাও হয়ে আছে, মোটামুটি পঞ্চাশ ষাটে একটা ধোপদুরস্ত অ্যাম্বাসাডার হয়ে যাবে বলেছে, তাহলে এই পাপ্পুর কথা অনুযায়ী এই খরুশ ভাড়াগুলোয় আর আসতে হবে না তাকে।
খানিকটা হেঁটে সে বড় রাস্তায় বাস স্ট্যান্ডের পাশের পানগুমটিটায় দাঁড়াল। খৈনি আর বিড়ির প্যাকেট কিনল। চুন তার পকেটেই থাকে সব সময়। খৈনি ডলা শুরু করল বাস স্ট্যান্ডটায় বসে। রাস্তায় গাড়ির ছড়াছড়ি। ডলা প্রায় শেষের দিকে কে একটা হাত পেতে দিল তার সামনে, সে নিবিষ্ট মনে খৈনি ডলছিল, হাতটা দেখে চমকে তাকাল। বেশ অভিজাত চেহারার একটা লোক, তবে চেহারাটায় কেমন মরচে ধরে গেছে, জামাটাও ময়লা। চোখ দুটোও কেমন নেশাখোরের মত। সে দেখেছে, খৈনি একা খেয়ে যা সুখ, পার্টনার পেলে আরও বেশি সুখ, লোকটাকে সে “আর একটু টাইম লাগবে দাদা” বলায় লোকটা তার পাশে বসল।
ডলা শেষ হলে লোকটা খৈনিটা মুখে পুরে দিয়েই বলল “মিত্র বাড়িতে এসছেন নাকি? কোত্থেকে?”
বিশুও মুখের কোণে দিয়েছিল খৈনিটা, লোকটার কথা শুনে বুঝল, এ এই পাড়ারই হবে। বলল “হ্যাঁ দাদা, আসানসোল থেকে”।
“তা ছেলে কি করে?”
“রঙের বিজনেস দাদা। বড় দোকান আছে আসানসোলে”।
“হু”।
অনেকক্ষণ কোন কথা বলল না লোকটা। বিশুও বেশি বকল না। বেশি কথা বলে কি হবে, রাঘব বোস নিকিরি সেসব একে বলে লাভ নেই। লোকে বলে অতীত থেকে শিক্ষা নিতে, সে ওই অতীত থেকেই শিক্ষা নিয়েছে। একবার এক ছেলেপক্ষকে নিয়ে বিয়েতে গিয়ে ছেলের নামে উল্টোপালটা বলে দিয়েছিল এক অচেনা লোককে, পরে দেখা গেল সেই লোকটা মেয়ের আপন মামা। সে কি অবস্থা। সেই থেকে সে ঠিক করে নিয়েছে, এই সব বিয়ে শাদী কেসে স্পিকটি নট। কোন দরকার নেই মুখ খোলার।
রাস্তায় একটা বড় জ্যাম হয়েছে। সামনে আবার কিছু ঘটল নাকি কে জানে। কলকাতা এলে এই এক ভয়। কখন যে কি লাফড়া শুরু হয়ে যায় কে জানে।
থু থু করে বেশ খানিকটা থুতু ফেলে লোকটা বলল “মিত্র বাড়ির মেয়েটা খানকি বুঝলেন? এদিক ওদিক লাগিয়ে বেড়ায়। খুব বাজে মেয়ে। ওই যাদের সাথে এসছেন, তাদের বলে দেবেন, নইলে পরে অশান্তিতে পড়ে যাবেন”।
বিশু হঠাৎ এই কথায় চমকে লোকটার দিকে তাকাল। লোকটা ভাবলেশহীন মুখে উঠে দাঁড়াল, তার কাঁধে একটা চাপড় মেরে “আসি কেমন?” বলে রাস্তায় হাঁটা লাগাল।
বিশু ফ্যালফ্যাল করে সে দিকে তাকিয়ে থাকল।

৭।।
অফিস থেকে বেরনোর ঠিক পাঁচ মিনিট আগে বসের যে কেন তাকে মনে পড়ে বুঝে উঠতে পারে না পিঙ্গল। আধঘণ্টা ভাট বকে সময়টার সর্বনাশ করে তারপরে ছাড়ান দেয় তাকে। আর এই সময়ে তার মনে হয় পীযূষদাকে মেরেই ফেলে। লোকটা এমনি ভাল কিন্তু এই এক বদ দোষ। জ্ঞান দিতে বসলে আর সময় মনে থাকে না ওর। আর সারা দিনের পর সন্ধ্যের দিকে চাপটাও কম থাকে অনেক, তাই ভাট বকতেও সমস্যা থাকে না। আর সবকিছুতেই অবধারিতভাবে ঘুরে ফিরে তার বিয়ে প্রসঙ্গ আসবে। ওর এক দূরসম্পর্কের শালী আছে। তাকে যেভাবেই হোক তার গলায় ঝুলানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে এখন। বিয়েটা ভেঙে যাবার পর থেকে কলিগরা যেভাবে সিমপ্যাথি দিচ্ছে তাতে তার মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে এবার অন্য চাকরি দেখতে হবে তাকে। কি কুক্ষণেই না ভাস্করকে মুখ ফসকে বলে দিয়েছিল কথাটা, তারপর থেকে এই শুরু হয়েছে।
এই রোববার তাকে বাড়িতে নেমন্তন্নও করে বসেছে পীযূষদা, তার যাবার একেবারে ইচ্ছা না থাকলেও কিছু করার নেই তার। বস যখন, না যাওয়াটা অভদ্রতা হবে।
অফিস থেকে বেরিয়েই সে বুঝল আজকেও বৃষ্টিতে ভিজতে হবে তাকে, দুদিন ধরে এমনিতেই ভিজেছে। অফিসের গাড়ি তাকে যেখানে নামায়, সেখান থেকে আরও খানিকটা হেঁটে তারপরে বাড়ি যেতে হয়। ওই রাস্তাটুকুই ভিজে যায় সে। আর ছাতা নিতে তার বরাবরের ল্যাদ। পীযূষদা প্রায় সাতটা বাজিয়ে দিয়ে শেষে বলল তার সাথেই যেতে।
সে আর না করতে পারল না, অফিসের গাড়িটা বেরিয়ে গেছে, আবার ওটার জন্য বসে থাকলেও অনেকক্ষণ লাগবে।
তার নিজেরও গাড়ি কেনার ইচ্ছে আছে, ঠিক করেছিল বিয়ের পরেই কিনবে একবারে, এখন ভাবছে এই সব ঝামেলায় না গিয়ে গাড়িটা কিনে নিলেই হয়। মাঝে মাঝে লং ড্রাইভেও যাওয়া যাবে।
পীযূষদার গাড়িটা সেডান, নিজেই চালান, গাড়ির পিছনের সীটে বসতে গিয়েও বসল না সে। বস ড্রাইভ করবে আর সে পিছনে বসবে এটা একটু কেমন যেন লাগে তার কাছে। গাড়িটা অফিস থেকে বেরতেই দেখল ফোনটা পকেটে নড়ে চড়ে উঠল, সে সিটবেল্ট বাঁধছিল, সেটা বাঁধা হওয়ার পরে সি এল আইতে নম্বরটা দেখে চমকাল খানিকটা, তনুশ্রী। প্রথমে ভাবল ধরবেনা, তারপর ধরেই ফেলল, হ্যালো বলতে ওপাশ থেকে বেশ তড়বড়িয়েই শুরু করল তনুশ্রী “আমি কি ডিস্টার্ব করলাম?”
সে অবাক হল, হঠাৎ কি হল আবার। বলল “না, ঠিক আছে, কি ব্যাপার বলুন?”
“আমি কি এখন একটু আপনার সাথে দেখা করতে পারি?”
“এখন?” প্রস্তাবটায় চমকাল পিঙ্গল। এর আবার হঠাৎ কি হল? বিয়েটা তো ভেঙেই গেছে। কাটাতে চাইল সে “না, এখন একটু অসুবিধা ছিল”।
মেয়েটা যেন ভেবেই ছিল সে এটা বলতে পারে, “না বলবেন না প্লিজ একটু দেখা করুন, আমি বেশি সময় নেব না”।
তার সমস্যা হল সে কাউকে না বলতে পারে না। এর আগেও এরকম হয়েছে অনেকবার। মনে মনে বিরক্ত হলেও সে বলল “ঠিক আছে, কোথায় যেতে হবে বলুন”।
“আমাদের পাশের পাড়ায় সিসিডিটা চেনেন তো? ওখানে আসুন, আপনি অফিস থেকে বেরিয়েছেন তো?”
“হু, আমি ফোন করছি পৌঁছে”।
ফোনটা রেখে সে পীযূষের দিকে তাকাল “পীযূষদা আমি একটু নামব”।
পীযূষ তার দিকে তাকিয়ে বলল “ওহ, এখন কোথাও যাবি? সাড়ে সাতটা বাজতে চলল, তোর কাছে ছাতা আছে তো? ভিজে যাবি তো”।
পিঙ্গল মাথা নাড়ল, পীযূষ গাড়িটা দাঁড় করিয়ে একটা ছাতা বের করল পিছনের সিট থেকে “এই নে, এটা নিয়ে যা”।
সে কৃতজ্ঞ বোধ করছিল, এতটা অনেক বসই করবে না। ছাতাটার দরকার ছিল খুব। গাড়ি থেকে নেমে সে একটা ট্যাক্সি নিল। তনুশ্রীদের পাশের পাড়ার সিসিডিটা সে চেনে, একবার ওখানে দেখাও করেছে ওর সাথে। তার কৌতূহল বাড়ছিল ক্রমশ,বিয়ের ফাইল বন্ধ হবার পরে হঠাৎ করে কি এমন হল যে এভাবে দেখা করতে চাইছে মেয়েটা?
#
বৃষ্টিটা ভালই নেমেছে, তা সত্ত্বেও সিসিডিতে ভিড় আছে। একটা কোণার টেবিল ফাঁকা পেয়ে গেল তারা।এর আগে যতবার তারা দেখা করেছে, তনুশ্রী শাড়ি পরেছিল। এবার সালোয়ার কামিজ পরেছে।
তাকে দেখে হাসল তনুশ্রী, প্রত্যুত্তরে সেও হাসল, বসার পরে সে বলল “বলুন, কি বলার আছে?”
তনুশ্রী হাসিটা রেখেই বলল “আসলে ব্যাপারগুলি এমন হঠাৎ ভাবে হয়ে গেল, আমি বেশ চাপে পড়ে গিয়েছিলাম। সৌমেন আমার ফোন থেকে হঠাৎ ওই কথাগুলি বলল, বাড়ির লোকেরা দেখা করে বিয়েটা ক্যান্সেল করে দিল, আমি কিন্তু কিছুই বলতে পারলাম না। আমায় বেশ কিছুদিন ধরেই এই ব্যাপারটা ভাবাচ্ছে। আমি চাইছিলাম আপনাকে সবটা খুলে বলি”।
পিঙ্গলের বিরক্ত লাগছিল। অফিসে পীযূষদার ভাট, এতটা রাস্তা এসে যদি এখন তনুশ্রীরও এই সব প্যানপানানি শুনতে হয়...তার সেই মেয়েদের পাত্তা না দেওয়া অবতারে ফিরল সে। বলেই ফেলল সেটা “দেখুন, পোস্টমর্টেম জিনিসটা আমার একেবারেই পছন্দ নয়, আপনার একটা রিলেশন ছিল বা আছে, দ্যাটস ফাইন। আমি আর কিছু শুনতে চাইছি না, এসব ব্যাপারে আমি লিস্ট ইন্টারেস্টেড”।
তনুশ্রীর সপ্রতিভ মুখটা এবার ফ্যাকাশে হল তার কথা শুনে। সে মিইয়ে গেল গেল খানিকটা “এক্সট্রিমলি সরি, আমি আপনাকে এত কষ্ট করে আসতে বললাম, একটু ভুল হয়ে গেছে বোধহয়”।
পিঙ্গল নরম হল, বুঝল ডোজটা বেশি হয়ে গেছে, একটু হাসল। কথা ঘুরিয়ে বলল “খিদে পেয়েছে, চলুন কিছু খাওয়া যাক বরং”।
তনুশ্রী বলল “আচ্ছা, আমি শুধু একটা কফি”।
পিঙ্গল উঠে অর্ডার দিয়ে এল। তার মনে হচ্ছিল এখন তাকে কিছু ফালতু সময় কাটাতে হবে। সে বসলে তনুশ্রী বলল “ তারপরে আর কিছু প্রোগ্রেস হয়েছে?”
“কি ব্যাপারে?” বুঝল না সে।
“মানে বিয়ের ব্যাপারে... সরি একটু পার্সোনাল হয়ে গেল না প্রশ্নটা?”
“না না, ঠিক আছে”, সহজ হল সে, “না এখন ব্যাপারটা পোস্টপন করা হল, পরে দেখা যাবে”।
পিঙ্গল বুঝতে পারছিল তনুশ্রী কিছু বলার জন্য ছটফট করছে। কিন্তু সে নিজে থেকে কিছুই জানতে চাইল না। এই ব্যাপারে অহেতুক কৌতূহল দেখানোর কোন ইচ্ছাও কাজ করছিল না তার মধ্যে।
“আসলে বিয়েটা ভাঙার খবরে আমার বাবা একটু ভেঙে পড়েছে, অনেকটা কথা এগিয়েছিল তো”। তনুশ্রী আস্তে আস্তে বলল কথাটা।
তাদের কফি চলে এসেছিল। চিনি মেশাতে মেশাতে সে শুধু বলল “আচ্ছা”।
একটু বেগড়বাই দেখলে বরাবরই একটা খোলসে ঢুকে যেতে পছন্দ করে সে। এই মুহূর্তেও সেটাই করছিল সে।
তনুশ্রী বলল “দেখুন সৌমেনের সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিল, ও সেটাকে রিলেশন বলে ভুল করে। আমি কিন্তু কোনদিন...”
পিঙ্গল থামাল তনুশ্রীকে, “আমাকে প্লিজ এসব বলবেন না। আপনি কি বিয়েটা নিয়ে আমাকে আবার ভাবতে বলছেন?”
তনুশ্রী কফিটায় চুমুক দিতে গিয়েও দিল না। কাপটা নামিয়ে রেখে বলল “হ্যাঁ, আমি সেটাই বলছি”।
পিঙ্গল কথাটা শুনে আর কিছু বলল না। চুপচাপ কফি খেতে লাগল।
তনুশ্রী পিঙ্গলের চুপচাপ হয়ে যাওয়া দেখে একটু অসহিষ্ণু হল “আমাকে কি হ্যাংলার মত শোনাচ্ছে?”
পিঙ্গল হাসল না। তনুশ্রীর চোখের দিকে তাকাল, বলল “এই পরিস্থিতিতে সেটাই স্বাভাবিক নয় কি?”
তনুশ্রী নিজের কাপের দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড এভাবেই কেটে গেল। তারপর বলল “হ্যাঁ, কিন্তু আমি আসলে এই বিয়েটায় আগ্রহী ছিলাম। ব্যাপারটা ভেস্তে যাওয়ায় আমি খানিকটা ভেঙে পড়েছি বলতে পারেন”।
পিঙ্গল বুঝতে পারছিল না কি বলবে। মেয়েটার সাথে একসময় তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল, সে রাজিও ছিল এটা যেমন সত্যি, একই ভাবে এখন সে আর এই সম্পর্কটার ক্ষেত্রে একেবারেই কোন ইন্টারেস্ট পাচ্ছে না এটাও সত্যি। সারাদিন অফিসের পর তনুশ্রীর এই তলব এবং সরাসরি আবার সব কিছু কেঁচে গণ্ডূষ করার প্রস্তাবে তার মন ঠিক সায় দিচ্ছিল না।
সে তনুশ্রীর দিকে তাকিয়ে বলল “আপনি সব ভেবে চিন্তে কথাগুলি বলছেন তো? মানে হঠাৎ করে আবার যদি কোন এক্সটারনাল প্রব্লেম অ্যারাইজ করে...”
তনুশ্রীকে মরিয়া শোনাচ্ছিল “নইলে আমি কেন আপনাকে ডেকে আনব বলুন এতটা রাস্তা”।
বাইরে বৃষ্টিটা কমে আসছিল একেবারেই। পিঙ্গলের মনটা হঠাৎ বাড়ি বাড়ি করতে লাগল।

৮।
।।সে।।
অয়নদার একটা খুব গোপন কথা আছে। দিদি আমাকে বলেছিল ওর বিয়ের পরে। ফুলসজ্জার রাতে বলেছিল। একটা করে গোপন কথা বলার চুক্তি হয়েছিল নাকি ওদের মধ্যে। দিদি কি বলেছিল সেটা আমি জানি। পরে বলব। আর অয়নদা কি বলেছিল সেটা এখন বলব।
আমি কথাটা নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবি। ভাবতে না চাইলেও কথাটা আমার মাথায় ঘুরপাক খায়। আর সেটা এক অদ্ভুত অস্বস্তির সৃষ্টি করে।
অয়নদার বাড়িতে অয়নদা ওর বাবা আর মা ছাড়াও এক মেয়ে কাজের লোক থাকত। এখনো থাকে। অয়নদার থেকে দু তিন বছরের বড়। ওদের মেয়ের মতোই ওর বাবা মা বড় করেছিল। অয়নদার বিয়ের দু বছর আগে বিয়েও দিয়েছিল তবে সে বিয়েটা টেকে নি। বিয়ে ভাঙার পর আবার ওদের বাড়িতে গিয়েই উঠেছিল।
অয়নদা নাকি একবার ওর বাবাকে সেই মেয়েটার সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে ফেলেছিল। ওর মা বাজার গেছিলেন আর অয়নদা ঘুমাচ্ছিল। ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ করেই বাইরের ঘরে শব্দ পেয়ে গিয়ে বাবার সাথে সেই মেয়েটিকে ওই অবস্থায় দেখে। দেখে কিছুই করে নি। চুপচাপ আবার নিজের ঘরে এসে বসেছিল। সে সময় ও ক্লাস নাইনে পড়ে।
আমার শুনে কেমন অবাক লেগেছিল। সে ঘোর কাটতে অনেক সময় লেগেছিল। অয়নদাদের ফ্যামিলি পাড়ার বেশ অভিজাত ফ্যামিলি। গাড়ি চালিয়ে অয়নদার বাবা অফিস যেতেন। বেশ ভাল রকম চাঁদা দিতেন পাড়ার পুজোয়। বেশ হাসিখুশি লোক ছিলেন। কিন্তু ঘটনাটা শোনার পর থেকে আমি ওনাকে দেখলে একটা অস্বস্তিতে পড়ে যেতাম। আমি কথাও বলতে পারতাম না ঠিক ঠাক। পালিয়ে বাঁচতাম ওনার সামনে থেকে।
আমার কেন জানিনা মনে হয় অয়নদার বাবার হার্ট অ্যাটাকের পেছনে এটা একটা কারণ। অয়নদা, দিদির ডিভোর্সটা বড় কারণ না। অয়নদা নিশ্চয়ই নেশার ঘোরে এটা বলে ফেলেছিল ঝগড়ার সময়। তারপরেই ভদ্রলোকের হার্ট অ্যাটাক হয়। অবশ্য এটা সত্যিই হয়েছিল কিনা আমি কনফার্ম না, আমার শুধু মনে হয় এটা।
এই কথাটা দিদি যদিও আমাকে বলেছিল কাউকে না বলতে কিন্তু আমি পারি নি। বলেই ফেলেছিলাম সেই ছেলেটাকে। অথচ এই ধরণের কথা যে আমি কোন অচেনা অজানা কাউকে বলতে পারি সেটা কোনদিন ভাবিই নি। কি ভেবে বলেছিলাম কে জানে। ছেলেটা শুনে অবাক হয় নি। অফিসের ব্যাগটা রেখে দক্ষিণেশ্বরের ঘাটে বেঁধে রাখা নৌকা দেখতে দেখতে বলেছিল “এরকম হতে পারে। আসলে বয়সটা একটা বড় ফ্যাক্টর। মিডল এজে এলে অনেক যুক্তিবাদী লোক অযৌক্তিক কাজ করে ফেলতে পারে। নিজের বউকে তখন তো তার আর ভাল লাগে না। সকাল বিকেল রাত সেই একই মুখ দেখতে দেখতে লোকটা ক্লান্ত। ঘরের মধ্যে একটা কিশোরী মেয়ে, নতুন যৌবন আসছে, দেখে হয়ত ভদ্রলোক নিজেকে ধরে রাখতে পারেন নি”।
আমিও ছেলেটির কথাটা ফেলে দিতে পারি নি, তবে আমার মনে হয়েছিল অন্য কথা, “কিন্তু অয়নদা যেটা বলেছিল, সেটা অনুযায়ী ওই মেয়েটিও তো ওই ভদ্রলোকের প্রতি সমান পরিমাণ আকৃষ্ট হয়েছিল, এটা অস্বাভাবিক নয়? বরং মেয়েটির তো অয়নদার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া উচিত ছিল তাই নয় কি?”
ছেলেটা অনেকক্ষণ ভেবেছিল কথাটা নিয়ে। তারপর মাথা নেড়ে বলেছিল “নাহ, বরং এটাই স্বাভাবিক ছিল। মেয়েরা সাধারণত একটু বয়সে বড় লোক পছন্দ করে। এক্ষেত্রেও সেটাও ঘটেছে হয়ত”।
আমার মধ্যে আবার সেই প্রশ্নগুলি ভিড় করে আসছিল। আমার শুধু মনে হচ্ছিল অয়নদার মা কি এখনো জানেন ঘটনাটা? এত বড় একটা ঘটনা কি পুরোটাই তার অজান্তেই ঘটে চলেছিল।মেয়েটাকে নিজেদের মেয়ের মত করে বড় করে তুলেছিলেন তারা। যেখানে গেছেন সেখানে মেয়ে হিসেবেই পরিচয় দিতেন। এমনকি আমাদের বাড়িতেও তাই দিয়েছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে সহজ স্বাভাবিক সম্পর্ক। কিন্তু আসলে কি ভয়ংকর!
ছেলেটার সাথে সেদিন অনেকক্ষণ এই সব ভুল ভাল কথা বলে ফেলেছিলাম। মনে হয়েছিল নিজের আয়নার সামনে কথা বলছি। পুজো আমার দেওয়া হয় না। ছেলেটাও দেয় নি। বাস থেকে নেমে দুজনেই ঘাটের পাশের বসার জায়গায় গিয়ে বসে উল্টো পালটা বকেছিলাম। অনেকক্ষণ বক বক করে গেছিলাম। আমি বকে গেছি, ছেলেটা শুনে গেছিল। ছেলেটা বকে গেছে, আমি শুনে গেছিলাম। তার আগে কোন পরিচয়, কথাবার্তা কিছুই হয় নি। কিভাবে যে ছেলেটার সাথে অত কথা বললাম সেটা ভাবলে এখনো অবাক লাগে আমার। বেশ কিছুক্ষণ পরে কচুরি খেয়েছিলাম। ছেলেটাই টাকা দিয়েছিল, আমি দিতে যাই নি। কেন জানি না, ছেলেটা আমার খাবারের টাকা দিয়ে দেবে, আমার খুব একটা অস্বাভাবিক লাগে নি ব্যাপারটা।
সেদিন বাড়ি ফিরে বেশ হালকা হালকা লেগেছিল নিজেকে। আর তারপরে অনেকদিন বাস স্ট্যান্ডে যাই নি আমি। কেন জানি না, বার বার মনে হচ্ছিল গিয়ে যদি দেখি আসলে কেউ নেই, পুরোটাই আমার অবচেতন মনের সৃষ্টি! তাহলে কি হবে!
বেশ কিছুদিন রুবির দিকটা অ্যাভয়েড করে গেছিলাম আমি। আর আশ্চর্যের কথা হল সেই ছেলেটার কোন ফোন নাম্বারও নিয়ে রাখা হয় নি আমার।
(ক্রমশ)

আপনার মতামত জানান