বাঁশি/অন্বেষা বসু

প্রথম পর্ব

ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়া আর শিশির ভেজা ঘাসের নিবিড় আশ্লেষে ঘুম ভাঙলো রাইয়ের। রাত্রির বাসি চুলে মিশে রয়েছে হারবাল শ্যাম্পুর মিষ্টি সুবাস, শরীরে লেগে রয়েছে ব্রুটের বুনো গন্ধ আর চোখের কোলে নিভে গেছে কাজলরেখা। কাল রাতে কেঁদেছিল কি? চোখ দুটো সামান্য ফোলা যেন? কাল রাতে ঠিক কি কি হয়েছিল পরপর স্পষ্ট মনে পড়ছে না। সমগ্রটাই মিলেমিশে একটা মন্তাজের আকার নিয়েছে বুঝি বা, যা শেষপর্যন্ত রাইকে মনোযোগী করে তুলেছে মৃত্যুচিন্তায়। হলদে মৃত্যু, নীল মৃত্যু, কালো মৃত্যু- মৃত্যু, মৃত্যু, মৃত্যু! মৃত্যুর কথায় ওর রবীন্দ্রনাথ মনে পরে—“মরণ রে, তুঁহু মম শ্যামসমান”। মৃত্যুর কথা ভাবলেই, রাই এর চেতনায় ভেসে ওঠে একটা শুচি, শুভ্র ছবি। ও চোখ বুজলেই দেখতে পায়, একটা ধবধবে সাদা শাড়ি - সাদা, সাদা, সাদা শাড়ি। প্রশ্বাসে ভেসে আসে চন্দনের পবিত্র ঘ্রাণ, আর, আর রজনীগন্ধার স্নিগ্ধতা। ওর মনে পড়ে যায়, ঋতর সাথে ফুলের বাজারে ঢুকে ওর প্রচণ্ড বিবমিষা জেগেছিল, অসম্ভব শ্বাসকষ্ট হয়েছিল। কারণ, ওর মনে পড়ে গিয়েছিল একটা বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যা, একটার পর একটা শববাহী যান, অসহিষ্ণু কান্না, চিৎকার, আর পচা ফুল ও সস্তা ধূপের সম্মিলিত কটু গন্ধ এবং অতঃপর সবটা বুঝে ওঠার আগেই জেনে যাওয়া, রাই এর মা আর নেই, কোথাও নেই। তাঁর শরীর ভস্মীভূত, আর আত্মা বিলীন হয়েছে পঞ্চভূতে। ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম! কী এক অমোঘ, অতল, অনন্ত রহস্য এই “মৃত্যু” না?
রাইয়ের কোন পিছুটান নেই। বাবা তো কবেই, ওর কৈশোরেই পরলোকবাসী হন, আর গত বছর মা ও চলে গেলেন। ওর কোনও ভাই বা বোনও নেই। থাকার মধ্যে আছে কিছু আত্মীয়স্বজন, যারা না থাকলেই বোধহয় ভালো হতো এবং যাদের থাকা বা না থাকায় রাই এর কোনও কিছুই যায় বা আসে না। বন্ধুর সংখ্যা হাতে গোণা। সেও ক্যালেন্ডারের কিছু তারিখ, আর ঘড়ির কাঁটার হিসেব মিলিয়ে দেখাশোনা, আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া, বেড়ানো। ব্যাস, ওইটুকুই! একটা সবল কাঁধ নেই যেখানে ক্ষণিক আশ্রয় দাবী করা যায়, একটা বাড়িয়ে দেওয়া হাত নেই, যাকে ধরে পৃথিবীর এক দিগন্ত থেকে অন্য দিগন্তে হেঁটে আসা যায়, একটা মন নেই যার কাছে কান্না বন্ধক রাখা যায়, একটা শরীর নেই যার উষ্ণ আঁচে দুঃখ সেঁকা যায়। নেই, নেই, কিছু নেই, কেউ নেই, কোথাও নেই। সত্যিই কি নেই? ঋত নেই? না, নেই। নেই? না, নেই। রাই একা, একা, একা! সেটাই ওর একান্ত গোপন কামনা- এই একা থাকা। এটাই রাই এর একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। অতএব, রাই, একাকিনী, অনন্তবিরহিণী, প্রতীক্ষা করে শ্যামরূপী মৃত্যুর! কিন্তু, অগত্যা, ঘুম ভাঙে এক মিঠে রোদেলা রঙে ধোয়া সকালে। ওর খোলা জানলায় ভিড় করে আসে পানসী মেঘ আর বালিকা রোদ্দুর! শিশিরের শেষ ফোঁটা টুকুও শুষে নেয় পিপাসার্ত ঘাস, আর ঘাসফড়িঙগুলো হন্যে হয়ে খুঁজে ফেরে ঘাসের শরীরে শিশিরের ঘ্রাণ।
সকালবেলা মৃত্যুর এসেন্স টাই হারিয়ে যায়! ধুত্তোর! আবার সেই প্রাত্যহিকতার বোঝা- ঘর ঝাড়া, বিছানার চাদর আর জানলার পর্দা বদলানো, সারা সপ্তাহের জামাকাপড় কাচা, রান্না করা, এবং অতঃপর স্নান করে ফিচারটা নিয়ে বসা। ভাল্লাগেনা, ধুর! বিকেলের দিকে একটু ঘুরে এলে হয়। রোববার বইপাড়া বেশ ফাঁকা থাকে- কলুটোলা দিয়ে হাঁটতেও দিব্যি লাগে! অথবা, কলেজ-স্কোয়ারেও বসা যায় খানিক। পুজোর প্যান্ডেল বাঁধা প্রায় শেষ। শরতের বিকেল গুলো মনে হয় কুড়িয়ে পাওয়া শৈশব- মনে পড়ে, আকাশে শরৎ মেঘের আনাগোনা শুরু হলেই আর স্কুলে যেতে ইচ্ছে করতো না রাইয়ের! অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকত কবে পুজোর ছুটি পড়বে স্কুলে! তখন সময়টা অন্যরকম ছিল। জীবন অনেক সহজ ছিল, আর সম্পর্কগুলো জিয়ন কাঠির মত ছুঁয়ে থাকতো আশিরনখ! ওর মনে পড়ে যায়, বর্ষার কালো মেঘ দেশান্তরে গেলে সাদা নৌকোর পালে চড়ে আসতো নীলাভ শরৎ। আঁজলা ভরে নিয়ে আসতো শিশির ভেজা শিউলি, রেলমাঠ ভরে যেত কাশ ফুলে! তারপর একদিন, ঘুম ভেঙে যেত খুব ভোরে- অন্ধকারের পাতলা সরটুকু তখনো লেগে আছে আকাশে, বাবার ঘরে রেডিও চালানো- সে এক অলৌকিক ভোর, বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের ভোর। আধো ঘুম, আধো জাগরণের মাঝে, রাই মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনে যেত—মহিষাসুর মর্দিনী। আর তারপর, ঠিক পাঁচ দিন পর আসতো বহু প্রতীক্ষিত শারদীয়ার ছুটি, রাই এর একান্ত আপন পুজোর ছুটি! Holiday-homework, দূরদর্শনের ‘ছুটি ছুটি’, পূজাবার্ষিকী, নতুন জামার গন্ধ আর অকাল বোধন। মনে পড়ে, মহালয়ার দিন সকাল সকাল বাবা, ছোট্ট রাই আর ওর মা কে নিয়ে পুজোর কেনাকাটা করতে বেরতেন। সেই দিনটা যেন উৎসবের মত মনে হত। কত কী যে কেনা হত! মায়ের শাড়ি, বাবার শার্ট, পাঞ্জাবী, রাই এর ফ্রক, skirt, আর আত্মীয় স্বজনের পুজোর তত্ত্ব, কাজের আর রান্নার মাসিদের জন্য শাড়ি, পাড়ার রিক্সাওয়ালা খোকন কাকুর জন্য শার্ট, আর রেললাইনের ধারের বস্তির বাচ্চাগুলোর জন্য ফ্রক আর জামা-প্যান্টের সেট! সব নিউ-মার্কেট থেকে কেনা হতো। তারপর একটু জিরিয়ে নেওয়া কোনো এক রেস্তরাঁয়, সব শেষে, ফেরার পথে কলেজ স্ট্রীটে একবার ঢুঁ মারতেন রাইয়ের বাবা! পুড়নো বইয়ের দোকান থেকে বেশ কিছু বইপত্তর কিনতেন নিজের জন্য আর রাইয়ের জন্য ঝকঝকে নতুন ক’টা বই, এটা ছিল ওনার বিশেষ উপহার মেয়ের জন্য! দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাই। গলার কাছটা কেমন ব্যাথা করে ওঠে- কোথায় হারিয়ে গেল সেইসব দিন? হারিয়ে কোথায় যায়? হারিয়েই যাবে যদি, তবে কেন এই পিছুটান? মনের সিন্দুকে এতো কিছু জমা থাকে? খুচরো পাথরও সেখানে হুডিনির ম্যাজিকে মোহর হয়ে যায়!

স্নান সেরে অনেক ঝরঝরে লাগছে শরীরটা! এবার ঠাণ্ডা মাথায় লেখাটা নিয়ে বসতে হবে। ঋতুপর্ণকে নিয়ে একটা ফিচার লিখছে রাই। ওর ম্যাগাজিনের জন্য। ‘ছোটদের ঋতুপর্ণ’। বড়দের জন্য ছবি-বানিয়ে হিসেবেই পরিচিত ছিলেন ঋতুপর্ণ। অথচ, উনি কিন্তু ফিল্ম কেরিয়ার শুরু করেন ছোটদের ছবি দিয়েই- হীরের আংটি! খুব কমই আলোচনা হয়েছে ছবিটা নিয়ে। পরবর্তী কালে অবশ্য আরও কাজ করেন ছোটদের নিয়ে, আর বড়দের ছবিতেও ছোটদের কিছু aspects থাকেই, যেগুলো দর্শক, এমনকি চিত্র-সমালোচকরাও ওভারলুক করে যান। রাই সেটা নিয়েই লিখবে। ঋতুপর্ণর সব মুভিগুলোই বারবার করে দেখে, বিভিন্ন ইন্টারভিউগুলো বারবার শুনে, দেখে ও পড়ে, এবং ওনার লেখা আর ওনাকে নিয়ে লেখা অজস্র article পড়ে মোটামুটি একটা খসড়া বানিয়েছে রাই। এবার, ঋতুপর্ণর কাছের কিছু মানুষের সাথে একটু আলোচনা করে নিলে, বিশেষ করে ওঁর ছবিতে ছোটদের ভূমিকায় যারা অভিনয় করেছিল, তাদের সাথে একটু কথা বলা বিশেষ প্রয়োজন। দু-একজনের সাথে আলাপও আছে রাইয়ের। ফেসবুকে আলাপ, পরবর্তীকালে দেখাসাক্ষাৎ ও হয়েছে। মিডিয়ায় চাকরি করতে গেলে এইসব যোগাযোগগুলো রাখা আবশ্যিক, বলা ভালো, বাঞ্ছনীয়।
রাই ছোট থেকেই সাংবাদিক হতে চাইত। তখন অবশ্য সাংবাদিক কথাটার মানেই বুঝত না। দূরদর্শনের চৈতালি, শাশ্বতীরা ওর ভীষণ পছন্দের ছিল! মনে আছে, মায়ের টিপের পাতা থেকে বড় টিপ নিয়ে কপালে পরত আর মাথায় তোয়ালে জড়িয়ে খোঁপা তৈরি করত! তারপর মায়ের চিরুনিটা হাতে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চৈতালি দাশগুপ্তর মত কথা বলা অভ্যাস করতো! পরে, বড় হয়ে, এইসব ছেলেমানুষি চলে গেলেও ইচ্ছেটা ভেতরে ভেতরে বাড়তে থাকে। ইছে ছিল আই এম এস থেকে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশুনা করার, কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর, মায়ের প্রাইমারী স্কুল আর টিউশানের ক’টা টাকায় কোনোরকমে খেয়ে পরে, স্কুলের পড়াশুনার খরচটা উঠে গিয়েছিল, কিন্তু আই এম এস এর মত প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর সামর্থ্য রাইয়ের মায়ের ছিলনা। অগত্যা, ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স পড়ে, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটিতে মাস কমিউনিকেশানে মাস্টার্স করে রাই। পাশ করতে না করতেই, একটা ছোট সংবাদপত্রের অফিসে কাজ শুরু করে কপিরাইটার হিসেবে। পরে সেখান থেকে কোলকাতার নামকরা সংবাদপত্রে কাজ পায়। আপাতত, সেই প্রকাশনীর একটি বাংলা ম্যাগাজিনের সাব-এডিটর ও। সম্পাদনার কাজের পাশাপাশি মাঝেমাঝে কলাম লেখে, আর বিশেষ সংখ্যাগুলোয় আর্টিকেল। যেমন, এই সংখ্যাটি। বেশ কিছুক্ষণ ঘাড় গুঁজে লেখালিখির পর হঠাৎ ওর প্রবল খিদে পেল! ঘড়িতে দেখে বেলা ৩ টে বাজে! এতো দেরী হয়ে গেছে খেয়ালই করেনি! অতএব, লেখাটা ওকে টানছে, খুব খেটে মন দিয়ে লিখবে ও এই লেখাটা, লিখবেই। কিন্তু এই মুহূর্তে না খেলে আর বাঁচবে না, এতো ভয়ঙ্কর খিদে পেয়েছে! অতএব, কিছুক্ষণের বিরতি। খেতে বসে ঋতর জন্য ভীষণ মন কেমন করে উঠল রাই এর। বাঁ হাতে মোবাইলটা নিয়ে কল করলো ঋতকে। রিং হচ্ছে। হয়েই চলেছে। একবার, দুবার, তিনবার। ব্যাপার কী? ফোনটা ধরছে না কেন? কথা বলবে না? এতো ব্যাস্ত? ভালো! ধুত্তোর নিকুচি করেছে মনকেমনের। অগত্যা, খাওয়ায় মন দিল রাই। কিন্তু তরকারিটা কেমন আলোনা লাগছে, ডালটাও যেন বড্ড বেশি পাতলা হয়েছে। মাছটাও কেমন বিস্বাদ ঠেকছে। কালকের কেনা, নষ্ট হয়ে গেল নাকি? কই ভাজার সময় তো গন্ধ পেল না? তবে? তবে কি রাইয়ের মুখটাই বিস্বাদ হয়ে আছে? মুখটা, নাকি মনটা? কেন ফোন রিসিভ করলো না ঋত? খুব কান্না পেল রাইয়ের। সকালের ঝলমলে রোদ্দুরটা কেমন মিইয়ে এসেছে, জানলায় মেঘলা রঙ লেগেছে। আর খেতে ইচ্ছে করছে না রাইয়ের, খিদেটা মরে গেছে।

একটা অন্তহীন লম্বা বারান্দা। এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত দেখা যায়না। সকাল হতে না হতেই ঝাঁকে ঝাঁকে রোদ্দুর এসে জড়ো হয় সেখানে। বাচ্চারা খেলা করে চড়ুই পাখির সঙ্গে। বুড়ো ঠাকুরদা নাতি নাতনীদের পাশে বসিয়ে অঙ্ক শেখান, ইংরেজি পড়ান, পুরাণের গল্প শোনান আর সন্ধ্যের পর, তেলের বাতি জ্বেলে গোল হয়ে বসে ভূতের গল্প, ডাকাতের গল্প আরও কত কী! সেই বারান্দা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে মস্ত একটা শিউলি গাছ। রাত্রে, গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পরা বাচ্চাদের মুখের পানে চেয়ে নিঃশব্দে শিউলি ফোটে আর নীরবে শিশির মাখে ঠাকুরদালান। ওখানে তখন প্রতিমা গড়ছেন বৃদ্ধ শিল্পী! তাঁর আঙুলের স্পর্শে মৃন্ময়ী চিন্ময়ী হয়ে উঠছেন ধীরে ধীরে, আর অপার্থিব দুটো চোখ যেন স্বপ্ন দেখছে। বারান্দার লাগোয়া ঘরগুলোর একটায় রাই শুয়ে। ভীষণ মাথা ধরেছে ওর। রোজ রোজ রাত জাগা আর পোষাচ্ছে না। বইয়ের আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে ঋত। ওই আলমারিতে রাইয়ের ছোটবেলার সব বই যত্ন করে রাখা। এসব মায়ের কাজ। সারাদিন শুধু কাজ করে যান, নীরবে, নিঃশব্দে, হাসিমুখে, ভালবেসে। ঋত যেন কী একটা বলছে রাই কে, এতো যন্ত্রণা হচ্ছে মাথায়, যে, কোনও কথা কানেই ঢুকছে না। উঃ, আবার সিগারেট ধরাল। অসহ্য! কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে ওর, মুখটা বিস্বাদ হয়ে আসছে, গা গুলচ্ছে, বমি পাচ্ছে ভীষণ। মা আবার এই ধূপটা জ্বালিয়েছে? রাই কতবার বলেছে এই ধূপের গন্ধটা একদম সহ্য হয় না ওর। ওরা কেউ শোনে না ওর কথা, কেউ বোঝে না ওকে, কেউ ভাবে না ওর কষ্টের কথা। কেন, কেন, কেন? কষ্টে চোখে জল চলে আসে ওর। আবছা হয়ে আসে সব কিছু। কপালে নরম স্পর্শে আরাম লাগে ভীষণ। অস্ফুটে বলে, “ঋত? একটু কাছে থাকবি রে? একটু হাত বুলিয়ে দে না মাথায়?” মায়ের গলা পায়, “ও তো চলে গেল রে, যাওয়ার আগে কত ডাকল তোকে, সাড়া দিলি না কেন? ঘুমিয়ে পড়েছিলি?” মায়ের কথায় খুব কান্না পায় ওর, ভীষণ অভিমান হয় ঋতর ওপর। চলে গেল ওকে ফেলে? ওকে একা ফেলে? সবাই চলে যায়, সব্বাই। কেন চলে যায়? কেন, কেন, কেন? ও মায়ের কোলে মাথা রেখে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে, মায়ের ধবধবে সাদা শাড়ী ভিজে যায় রাইয়ের চোখের নোনাজলে, মায়ের গা থেকে ভেসে আসছে চন্দনের গন্ধ, বড় পবিত্র একটা গন্ধ, পুজোর ঘরে এমন গন্ধ পাওয়া যায়, মাকে ওর দেবীর মত মনে হয়। ও শিশুর মত আঁকড়ে ধরে মাকে, বলে, “মা, তুমি আমায় ছেড়ে যেও না please, সবাই আমায় ছেড়ে চলে যায়। সব্বাই। কথা দাও, যাবে না তুমি”। “ধুর বোকা, কোথায় যাব রে তোকে ছেড়ে, কোথাও যাব না, কোনদিন যাব না”। মায়ের কণ্ঠস্বর ছাপিয়ে ঠাকুরদালানে কাঁসর ঘণ্টা বেজে ওঠে ঠং, ঠং, ঠং, ঠং, ঠং। সন্ধ্যা-আরতি শুরু হল বোধহয়। ঘণ্টার শব্দটা প্রবল হতে থাকে ক্রমশ। একটা সময় মনে হয়, কানের মধ্যে ঢুকে কে যেন কাঁসর ঘণ্টা বাজাচ্ছে! কান ঝালাপালা হবার যোগাড়! উফ, মা গো! হঠাৎ সম্বিত ফিরে এল রাইয়ের। ও কোথায় শুয়ে? এ কার বিছানা? কী ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘর! কোথায় সেই বারান্দা? সেই শিউলি গাছ, ঠাকুরদালান? আর মা? মা কোথায়? ধুর, মা তো... তাহলে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল ও? সবটাই তাহলে স্বপ্ন? গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, অথচ চোখের কোণ ভেজা। স্বপ্নে কেঁদেছিল রাই? স্বপ্নেই মাকে জড়িয়ে ধরেছিল? কখন, কোন ফাঁকে এমন ভয়ঙ্কর ভাবে ঘুমিয়ে পড়লো রাই? পাশে ল্যাপটপটা পরে রয়েছে, আর এক গাদা ম্যাগাজিন, কাগজের স্তূপ! অন্ধকারে সজোরে বেজে উঠলো মোবাইলটা! ধাতস্থ হতে দেখল, ঋতর ফোন। ফোনটা রিসিভ করেই হাউহাউ করে কেঁদে ফেললো রাই।
(ক্রমশ)

আপনার মতামত জানান