অন্বেষা বসুর গল্প বাঁশি

দ্বিতীয় পর্ব


“কাল সারারাত জেগে কি করলি?” –- ইনফিউশানে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো ঋত।
“কবিতা পড়লাম”। -- বলল রাই।
“রাত জেগে কবিতা? আহা, আমি কবে এমন রাত পাবো? কতদিন রাত জাগিনা! এদিকে খাতার পাহাড় জমছে। আর সাতদিনের মধ্যে ৬ সেট খাতা নামিয়ে দিতে হবে। ভাবতে পারছিস? কটা খাতা দেখে দে না! দিবি?”
“তুই আমার assignment গুলো করে দে। half done ফিচারটা শেষ করে দে। articleগুলো এডিট করে দে। নেক্সট ইস্যুর কভার স্টোরিটা করে দে! দিবি?”
“বাপ রে! এতো কাজ করিস তুই? তুই তো বেশ কাজের মেয়ে!”
“অফিসে নিশ্চয়ই আমার মুখ দেখে মাইনে দেয় না!”
“আরে, এতো রেগে যাচ্ছিস কেন? ইয়ার্কি করলাম তো!”
“আমি এখন ইয়ার্কির মুডে নেই ঋত!”
“আচ্ছা, সরি। এবার বল, কী হয়েছে?”
“আমার কিছু ভাললাগছেনা রে। সব কিছু কেমন ঘেঁটে যাচ্ছে। অফিসের পরিবেশটা দিন দিন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। একটা মানুষ নেই যাকে ভরসা করা যায়। কাজের এতো চাপ। এতো কম্পিটিশান। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে আমার। আর নিতে পারছিনা রে। কোথাও একটু শান্তি পাচ্ছি না”।
“হুম। এক কাজ কর, কদিন ছুটি নে অফিস থেকে। একটু রেস্ট নে। নিজেকে একটু সময় দে, গুছিয়ে নে একটু। তারপর একদম নতুন করে, নতুন উদ্যমে শুরু কর সবটা”।
“ছুটি দেবে না রে এখন। দেখি পুজোর ছুটিটা একটু যদি extend করতে পারি। কিন্তু কী বল তো? আমার আর ওই অফিসটাতেই ঢুকতে ইচ্ছে করছে না। আমার চারপাশে কিছু শব ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিছু যন্ত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর কিছু পশু, নোংরা, হিংস্র কিছু পশু। সবটাই কমোডিটি। সব কিছু বিকোতে হয়। সব। আইডিয়া আর লেখনী থেকে শুরু করে মান, সম্মান, মন, শরীর, আত্মা- সঅঅব! আর নয়ত, পিছিয়ে পড়তে হয়। হেরে যেতে হয়। আমি আর পারছিনা রে ঋত”।
“শোন, এতো জটিল করে ভাবিস না। তুই মন দিয়ে কাজটা করে যা। নিজের মত করে। নিজের নিষ্ঠা, ভালোবাসা, জেদ সবটুকু দিয়ে কাজ করে যা। এগিয়ে যাওয়া, পিছিয়ে পড়া এগুলো ভীষণ রিলেটিভ রে। আর ভীষণ ট্রান্সিটরি। এগুলো নিয়ে এতো ভাবিস না। কলিগদের ভালো না লাগলে, এড়িয়ে চল। কাজ কর মন দিয়ে, অবসর সময়ে বই পড়। আর হার, জিত এই শব্দ গুলো খুব ছোট, খুব। জীবনটা আসলে এই শব্দ গুলোর থেকে অনেক অনেক বড়। সেটা যেদিন বুঝতে পারবি, দেখবি আর কোনও সমস্যাই থাকবেনা”।
“জানিনা”।
“সব কিছু জানিনা বলে এড়িয়ে গেলে চলবে?”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাই। এই কথার কোনও উত্তর নেই ওর কাছে। জীবনটা সত্যি ভীষণ দুর্বোধ্য ঠেকছে রাইয়ের। মনে হচ্ছে, প্রাত্যহিকতার ভিড়ে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে ও। কেমন পাগল পাগল লাগছে ওর। এই শহরটার সাথে সাথে নিজেকেও বৃদ্ধ লাগে মাঝে মাঝে। কফিহাউসে বসে আছে ওরা। রাই আর ঋত। সেই কফিহাউস। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি তে পড়ার সময় প্রায়শই আসতো এখানে। আড্ডা দিতে। আড্ডা, তর্ক, ঝগড়া, খুনসুটি, প্রেম, বিচ্ছেদ- কতকিছুর সাক্ষী এই কফিহাউস। ওদের পাঁচ বন্ধুর অস্তিত্ব ঘিরে ছিল এই কফিহাউস। পাঁচ বন্ধু- রাই, অয়ন, আত্রেয়ী, সুমন্ত আর ঋত। রাই, অয়ন আর আত্রেয়ী মাস কম ডিপার্টমেন্টের, সুমন্ত সংস্কৃত আর ঋত বাংলা। আলাদা আলাদা ডিপার্টমেন্টের হলেও ওদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল একটা সহজ সরল বন্ধুত্ব। ফার্স্ট ইয়ারের নবীন বরণ উৎসবেই ওদের পরস্পরকে চেনা। সেই অনুষ্ঠানে, রাই এর রবীন্দ্রসঙ্গীত মুগ্ধ করেছিল ঋতকে। নিজে থেকেই আলাপ করতে এসেছিল ঋত। এখনও ছবির মত মনে আছে সবটা। রাই আর আত্রেয়ী অনুষ্ঠানের পর, centenary বিল্ডিং এর সিঁড়িতে বসে গল্প করছিল। তখন পড়ন্ত বিকেল। ভারী সুন্দর হাওয়া বইছিল। দুজনেই শাড়ি পরেছিল সেদিন। রাই একটা ম্যাট-ফিনিশের জুট-সিল্ক পরেছিল। চোখে কাজল আর কানে চাম্বালামার রুপোর বালি। রাইয়ের বরাবরই মোটাসোটা বড়সড় চেহারা। লম্বায় গড়পড়তা বাঙালি মেয়েদের থেকে কিছু বেশীই। অসম্ভব ফর্সা গায়ের রং, গোলগাল মুখ, চ্যাপ্টা নাক, বড় বড় দীপ্তিময় দুটো চোখ, আর কাঁধ পর্যন্ত ছাঁটা চুল। আর আত্রেয়ী কৃশাঙ্গী। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা। কোমর ছাপিয়ে নেমে যাওয়া চুল। প্রতিমার মত মুখখানি। ওর নাকটাকে ভারী হিংসে করতো রাই। অমন লম্বা টিকলো নাক বুঝি বা কুমারটুলির মৃৎশিল্পীরাই কেবল গড়তে পারেন। ও সেদিন পরেছিল একটা magenta রঙের ঢাকাই। সঙ্গে মুক্তোর সেট। ঠোঁটে লিপস্টিক। খোলা চুলে হেনার উগ্র সুবাস। অসম্ভব সুন্দরী লাগছিল ওকে। দূর থেকে ওদের দেখছিল ঋত। মূলত আত্রেয়ীকেই। কিন্তু আলাপ করতে ইচ্ছে হচ্ছিল রাই এর সাথে। ও বসেছিল ইউনিয়ন রুমের সামনের লাল রকটায়। তখন ওর সুমন্তর সাথে অলরেডি আলাপ হয়ে গেছে। সুমন্ত ওই অনুষ্ঠানে সরদ বাজিয়েছিল। অসম্ভব দক্ষ হাত, তেমনি সুরের জ্ঞান। ভালোলাগছিল ওর সাথে গল্প করতে। যদিও ঋত নিজে কোনোটাই পারে না। কিন্তু ভালোবাসে খুব। ওর forte কবিতা। ও কবিতা পড়ে, কবিতা খায়, কবিতা পেতে ঘুমোয়, কবিতার ধারাজলে স্নান করে। নিজেও লেখে একটু-আধটু। ওর লম্বা, মেদহীন, ছিপছিপে চেহারা। শ্যামলা গায়ের রং। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল। বাঁশির মত ধারালো নাক আর উজ্জ্বল দুটো চোখ। জিন্সের ওপর একটা টি-শার্ট পরে এসেছিল ও। সুমন্তর চোখে চশমা, ফর্সা টুকটুকে গায়ের রং। গালে যত্ন করে রাখা দাড়ি। পরনে খাদির পাঞ্জাবী। কিছুক্ষণ গল্প করার পর, ঋত সুমন্ত কে বলল, “রাই বলে মেয়েটি ভালো গেয়েছে বল?” “ হ্যাঁ, চমৎকার গলা। গান শুনেই বোঝা যায়, শুধু কণ্ঠ দিয়ে নয়, অন্তর দিয়ে গেয়েছে”। “হুম, ঠিক। ওই দেখ, ওখানে বসে আছে। চল, আলাপ করবি?” সুমন্ত এতক্ষণ খেয়াল করেনি। এবার দেখতে পেয়ে বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, চল না”। এবার ওদের সামনে এসে সরাসরি কথা বলল ঋত। রাইয়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, “আমি ঋত, তুমি তো রাই?”
--“ হ্যাঁ, বলুন”।
রাইয়ের মুখে আপনি শুনে ঘাবড়ে গেল ও। আমতা আমতা করে বলল, “ইয়ে, মানে, আমি ফার্স্ট ইয়ারেই পড়ি। আপনার, মানে তোমার গান আমার ভারী ভালো লেগেছে। তাই আর কি...”
“তাই কি?”
“আলাপ করতে এলাম”।
“ওহ। আচ্ছা। ধন্যবাদ। কোন ডিপার্টমেন্ট তোর?”
আবার হোঁচট খেল। আপনি থেকে একেবারে তুই? কিন্তু ভালোও লাগল। বলল, “বাংলা। আশুতোষ বিল্ডিং, ফার্স্ট ফ্লোর। মাঝে মাঝে আসিস না, আড্ডা হবে। গান বাজনাও হবে”।
“নিশ্চয়ই। তুইও চলে আসিস আমাদের ডিপার্টমেন্টে”।
এতক্ষণ পর, কথা বলল সুমন্ত। “কোথায় গান শেখো তুমি?”
“মার কাছে। তুই সরদ কোথায় শিখিস? অসম্ভব ভালো হাত তোর”।
ক্রমে আড্ডা জমে গেল ওদের। খানিকক্ষণ বসে, দাঁড়িয়ে আড্ডা দেবার পর ওরা কফিহাউসে বসা ঠিক করলো। সেখানেই দেখা হল অয়নের সাথে। অয়ন ফটোগ্রাফি করে। ও তখন প্রেসির বন্ধুদের সাথে কফি ও সিগারেট সহ আড্ডা দিচ্ছিল। ওদের দেখতে পেয়ে ওদের টেবিলে এসে বসল। লম্বা, চওড়া, সুদর্শন চেহারা ওর। এক কথায় বলা যায়, নওলকিশোর। ঝকঝকে, স্মার্ট, আর ব্যক্তিত্বময় এই তরুণের প্রতি অমোঘ টান অনুভব করতো রাই। আর এদিকে সুন্দরী, মিতভাষী, স্নিগ্ধ আত্রেয়ী কে ভাললাগতে শুরু করেছে ঋতর। এভাবেই শুরু হয়েছিল সবটা। শুরু হয়েছিল একসাথে স্বপ্ন দেখা, একসাথে বাঁচার লড়াই। তারই মাঝে ভালবাসাবাসি। তারই মাঝে রাতজাগা, কান্না, আভিমান, বিচ্ছেদ। কিন্তু যা অনড় ও অটল ছিল, তা ওদের বন্ধুত্ব। এমনি করেই দু বছর কেটে গেল। ঋত বা রাই কারোর প্রেমই টিকলো না শেষমেশ। আত্রেয়ী আর ঋত তবু দু বছর একসাথে ছিল। রাই আর অয়নের সম্পর্ক তিন মাসেই শেষ হয়ে গেল। রাই কাঁদল খুব। কথা বন্ধ করে দিল অয়নের সাথে। দলছুট হয়ে রইল কিছুদিন। তারপর, অয়ন নিজেই একদিন ওর কাছে গিয়ে বলল, “দেখ রাই, আমাদের সম্পর্কটা থাকার ছিল না, তাই থাকেনি। আমরা তো চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু হলনা। এতে তোর, আমার কারুরই দোষ নেই। তাই যা হলনা, সেটা নিয়ে না ভেবে, যা ছিল, যা আছে, আয় না সেটাকেই দুজনে আঁকড়ে ধরি”। পুরোটা চুপ করে শুনল রাই। তারপর, বিষাদমাখা হাসি হেসে হাত টা বাড়িয়ে দিল ওর দিকে। অয়ন কাছে এসে জড়িয়ে ধরল ওকে। এবং এভাবেই রয়ে গেল ওদের বন্ধুত্ব। ওদের পাঁচজনের। রাই, সুমন্ত, অয়ন, আত্রেয়ী আর ঋতর।
তারপর কেটে গেল বেশ কিছু দিন, কিছু মাস। সম্পর্কের টানাপড়েনে ভাঙল ঋত- আত্রেয়ীর প্রেম। আরও পরে ক্রমে ওদের বন্ধুত্বের সুতো আলগা হতে লাগল। সবাই নিজের নিজের কেরিয়ার নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো। আত্রেয়ী দিল্লী চলে গেল ন্যাশানাল চ্যানেল জয়েন করতে। অয়ন ব্রিস্টল চলে গেল ফিল্ম স্কুলে ফটোগ্রাফি নিয়ে পড়াশুনা করতে। সুমন্ত নিয়মিত আকাশবাণীতে অনুষ্ঠান করার পাশাপাশি সংস্কৃত নিয়ে গবেষণা শুরু করলো। রাই একটা সংবাদপত্রের copywriter-এর চাকরি জুটিয়ে নিল আর ঋত স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা দিয়ে উত্তর কোলকাতার একটা স্কুলে চাকরি পেল। একমাত্র রাই আর ঋতর বন্ধুত্বটাই শেষ পর্যন্ত রয়ে গেল। আর দুজনেরই নিঃসঙ্গতা, একাকীত্ব, পারস্পরিক নির্ভরতা আর সহজ বন্ধুত্ব আরও আরও কাছে এনে দিয়েছিল ওদের। রাই ভালোবেসেছিল ঋতকে। আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল ওকে। ওর সমগ্রতাকে বন্দী করতে চেয়েছিল নিজের সত্তায়। ওর সাদা, কালো, আলো, অন্ধকার সবটা নিয়ে ভালবাসতে চেয়েছিল রাই। ওর মন ছুঁতে চেয়েছিল কান্না দিয়ে, ওর শরীর পোড়াতে চেয়েছিল কামনা দিয়ে। ওর ইচ্ছে-নদীতে ভেজাতে চেয়েছিল ঋতকে আশিরনখ। আর ঋত চেয়েছিল একজন সঙ্গী। একজন বন্ধু। একজন সহযোদ্ধা। ওর কাছে ভালোবাসা মানে মুক্তি। ভালোবাসা মানে আশ্রয়। ভালোবাসা মানে মন আর শরীরের সেতু বেঁধে দুটো সত্তার মিলন। দুটো প্রাণের মধ্যে অনায়াস যাতায়াত। যেখানে কোনও নিয়মের বেড়াজাল নেই, নেই কোনও বাঁধন। যেখানে আছে একটা আকাশ। আর আকাশের মাঝে একটা বাড়ি। মেঘ, বৃষ্টি আর রোদ্দুরের ভালোবাসায় গড়া। ঋত আর রাই এর বাড়ি।

আপনার মতামত জানান