বয়োবৃক্ষের সুখ দুঃখ

তাপসকিরণ রায়


শিবশঙ্কর বাবু ট্রেনের পাদান থেকে প্ল্যাটফর্মে পা রাখবেন । ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিল , ধীর গতিতে চলছিল। পা রাখতে রাখতেই কি করে যেন পিছলে গেলেন তিনি । তিনি কিছুই ভাল ভাবে বুঝতে পারলেন না । হাল্কা অনুভূতির মাঝে--ট্রেনের ঘট ঘটাং ক'বার শব্দ এলো । তাঁর শরীরটা প্ল্যাটফর্ম আর ট্রেনের মাঝখানের ফাঁকা জাগাটায় ঢুকে গেল । শেষ বাঁচার একটা চীৎকার মাত্র শোনা গেল । প্ল্যাটফর্মের লোকেরা হৈ হৈ করে উঠলো , ভিড়ের জটলা থেকে কেউ বলল , চেন টানো , কেউ বলল , গাড়ি থামাও , কেউ গার্ডের কামরার দিকে ছুটে গেল ।
ঘটনা অনেকেই দেখেছে--ট্রেনের বগি থেকে একজন চেন টানলো । ট্রেন ধীর হতে হতে থেমে গেল । শিবশঙ্করের গোঙানোর আওয়াজ আসছিল , সে আওয়াজও ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে থেমে গেল ।
সবাই ঝুঁকে আছে ট্রেনের কিনারা ঘেঁষে । শিবশঙ্কর বাবুর দেহ প্ল্যাটফর্মের কিনারার ফাঁকে আর রেল লাইনের পাশটাতে বসানো ছিল । তিনি নিশ্চল ।
খবর পেয়ে রেলের উদ্ধারকারীর দল ছুলে এলো , এলো ডাক্তার , নার্স , স্ট্রেচার । অনেক টেনে হেঁচড়ে তোলা হল বডি । কিন্তু এ কি ! বডির দু পা ? ও তো কাটা পড়ে লাইনের মাঝেই থেকে গেছে !
ডাক্তার বডি দেখলেন , এখনও প্রাণ আছে--হ্যারি আপ ! স্ট্রেচারে বডি তুলে নাও--পা দুটো তুলে সঙ্গে আনো , ডাক্তার তারস্বরে চীৎকার করে বললেন ।
রেলের হাসপাতালের আই.সি.ইউ.তে শিবশঙ্কর বাবু পড়ে আছেন । এখনও বেঁচে আছেন , বুকের শ্বাস ধরা পড়ছে । কিন্তু পা দুটো আর জোড়া লাগানো সম্ভব হল না । যদিও ফ্রিজ সংরক্ষণেই আছে , কিন্তু এগুলিকে এলাইভ রাখা বড় দুরূহ ব্যাপার । স্যালাইন , অক্সিজেন , তারপর ভেন্টিলেশন । কিন্তু তবু জীবনের সঙ্গে কঠোর সংঘর্ষ করে শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেলেন শিবশঙ্কর বাবু । সাত দিন পরে চোখ মেলে তাকালেন । পা দুটো আর জোড়ানো সম্ভব হল না । তাঁর মৃতপ্রায় শরীরে সার্জারি করা কোন ভাবেই সম্ভব ছিল না । পায়ের মায়ায় কষ্ট পেলেও তিনি খুব একটা ভেঙে পড়েন নি ।
দু মাস পরে হসপিটাল থেকে বাড়ি এলেন শিবশঙ্কর বাবু । বরং বলা উচিত তাঁকে বাড়ি নিয়ে আসা হল । দু পা নেই , ক্রাচ কাজে আসবে না । বডির ব্যালেন্স রাখা তাতে কোন মতই সম্ভব নয় । অগত্যা হুইল চেয়ার আনা হল । কিছু দিনের মধ্যে তিনি সে চেয়ারে সেট হয়ে গেলেন ।
শুরুতে সহানুভূতির ঝড় লেগে গিয়ে ছিল । পাড়া পড়শি , অফিসের সহকর্মী , ছেলেমেয়ের বন্ধু , বান্ধবীর দল সবাই দেখতে এসে ছিল । অনেকেই দুর্ঘটনার বর্ণনা শুনতে উৎসুক ছিল । রিপোর্টার শিবশঙ্করের সেই চরম মুহূর্তের অনুভব কেমন ছিল জানতে চেয়ে ছিল । বলেছিলেন তিনি , সেই চরম মর্ম ব্যথার কথা । শুরুতে তাঁর দেহটা প্ল্যাটফর্মের আর ট্রেনের ফাঁকে পড়ে দু তিন বার ওঠা নামা করল--সে সময় শিবশঙ্কর বাবু আকাশ ফাটা চীৎকার করে উঠে ছিলেন । তারপর দেহ সিঁধিয়ে গেল নিচের দিকে । আর পা দুটো কখন ক্ষণেকের মধ্যেই চাকার তলে গিয়ে কট কট ক্যাচ শব্দে দু খণ্ড হয়ে গেল ! শিবশঙ্কর যেন সব কিছুই স্বপ্নের ঘোরে দেখছিলেন--বুক নিংড়ে চীৎকার বেরিয়ে আসছিল--কিন্তু শব্দ কোথায় !
শুরুতে চরম হা হুতাশার একটা ব্যাপার ছিল । মন প্রায়ই দুঃখ ভারাক্রান্ত থাকত । মাঝে মধ্যে নিরালায় হঠাৎ হঠাৎ চমকে উঠতেন , স্মৃতির মধ্যে ঝড় বইত । সেই দুর্ঘটনার দৃশ্য ছবির মত চোখের সামনে ভেসে উঠত । দু এক দিন হঠাৎ নিজের অজান্তে চীৎকার করেও উঠে ছিলেন তিনি । স্ত্রী , সুরবালা ছুটে এসে ছিলেন । শিবশঙ্কর তখন তাঁর দিকে উদাসী চেয়ে থেকেছেন !
--আবার তোমার ভয় হচ্ছে গো ? এসো , মাথা ধরেছে তোমার ? তাড়াতাড়ি শিবশঙ্করের মাথায় হাত রাখতেন সুরবালা , হাত বুলাতে বুলাতে কখনও বলতেন , তুমি তো ছোট বেলায় কবিতা লিখতে--এখন ইচ্ছে হয় না লেখার ?
শিবশঙ্কর ভাবছেন । কিছু নিয়ে তো থাকতে হবে তাঁকে , না হলে কে জানে একদিন হয়তো তিনি পাগল হয়ে যাবেন !
শুরুর দিনগুলিতে স্ত্রী সুরবালা অনেক কেঁদে ছিলেন । বেচারার দুটো মাসের সমস্ত কান্নার ছাপ তাঁর মুখমণ্ডলে স্পষ্ট ছাপ ফেলে গেছে ! শিবশঙ্কর ভাল থাকতে সুরবালার দু এক দিনের কথা মনে পড়ে ।
--জানো , যার অসুখ , যে অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকে , তার দুঃখ বেদনা তো নিশ্চয় থাকবে , কিন্তু তার ঠিক পাশের লোকটা , যে সব সময়ের জন্যে অসুস্থ লোকটার সাথী , তার দুঃখ বেদনা কিন্তু অসুস্থ লোকটা থেকে কোন অংশে কম হয় না !
সত্যি হুইল চেয়ারে বসে থেকে এ কথা শিবশঙ্কর মর্মে মর্মে অনুভব করেছেন । সুরবালা কেমন যেন হয়ে গেছেন , মুখ শুকনো , শরীর আগের চেয়ে ভাঙা ভাঙা , মনের সেই উচ্ছল ভাব নেই !
--কি দেখছ অমন করে ? সুরবালা বলেছিলেন ।
এতক্ষণ শিবশঙ্কর তাকিয়েছিলেন সুরবালার দিকে , বলে উঠলেন , তোমার খুব কষ্ট না গো ? আমি জানি আমার থেকে কোন অংশে কম নয় তোমার কষ্ট ! তারপর খানিক নীরব থেকে সুরবালাকে কাছে ডেকে ছিলেন ।
সুরবালা ধীর পায়ে এসেছিলেন কাছে ।
--বস না একটু আমার পাশটিতে ।
বসে ছিলেন সুরবালা , তাঁর চোখ ছলছল করে উঠে ছিল ।
শিবশঙ্কর বলে চলে ছিলেন , কেঁদো না গো , কেঁদো না--এই দেখো আমি তো কাঁদি নি ! এত মরণ যন্ত্রণাতেও আমার চোখ ফেটে এক ফোঁটাও জল তো আসে নি ! আমার--
আর বলতে পারেন নি তিনি , আর কথা বলতে পারছিলেন না , স্ত্রীর মাথাটা নিজের কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে ছিলেন । তাঁর চোখেও কুয়াশার জাল ছেঁকে ধরেছিল ।
শিবশঙ্কর ষাটের কাছাকাছি এসে গেছেন । ঊনষাট পার হয়েই এক্সিডেন্ট ঘটেছিল । ওঁরা স্বামী স্ত্রী দুজনে এক ফ্যাটে থাকেন । ছেলে অন্যত্র চাকরি করে , তার আলাদা সংসার আছে । দুর্ঘটনার পর ওরা এসে সাত দিন থেকে গিয়েছিল । মেয়ের বিয়ে হয়েছে পুনাতে—মেয়ে-জামাই ছোট নাতনি নিয়ে এসে ছিল । শুরুতে এক মাস আশপাশের সবাই আসতো , দু চারটে কথা বলে , কুশল বিনিময় করে চলে যেত ।
আজ দু মাসের ওপর হয়ে গেল কেউ আসে না । সবাই জানে শিবশঙ্কর বাবু নিজেকে সেট করে নিয়েছেন--তাঁর দুঃখ বেদনাগুলো অনেক থিতিয়ে গেছে । জীবনে চলবার পক্ষে এটাই তো যথেষ্ট !
আর্থিক অবস্থা ভাল খারাপের মাঝে চলছিল । অভাবের তত টানাপোড়েন ছিল না । স্ত্রীর ঘাড়ে অনেক দায়িত্ব এসে পড়েছিল । সুরবালা চুপচাপ ঘরের সমস্ত কাজ চালিয়ে নিচ্ছিলেন । শিবশঙ্কর বাবু পেনশনের যে কটা টাকা পান তাতে কিছুটা অসুবিধা হলেও ছেলের কাছে তা প্রকাশ করেন নি । বরং সব সময় ছেলেকে বলে এসেছেন , না , বাবা , আমার পেনশনের টাকায় দিব্বি চলে যাচ্ছে !
ছটা মাস পরে শিবশঙ্কর বাবু মন থেকে একেবারে চাঙ্গা হয়ে উঠলেন । সময় কাটানোর জন্যে তিনি একটা খেলা আবিষ্কার করে নিয়েছেন—হ্যাঁ , এখন এ খেলায় নেশাও জাগে তাঁর । স্ত্রী অবশ্য আপত্তি করেন , বলেন , আর রাত জেগে লিখ না গো , তোমার শরীর খারাপ হবে !
--এই তো শুয়ে পড়ছি , বলেও তিনি লিখে যান , গল্প , কবিতা , কখনো নিজের জীবনের , কখনো বা মনে জমে থাকা কাহিনীর , মনের মাঝে যেমনটা ভাবের উদয় হয় তার সবটাই তিনি চেষ্টা করেন কাগজে কলমে ধরে নিতে । কিছুদিন ধরে লিখতে লিখতে এ যেন তার নেশার বস্তু হয়ে গেছে ! শুরুতে অল্প স্বল্প লিখতেন--সে সময় পত্রিকার সম্পাদকেরা জানাতেন , আপনার লেখার ত্রুটি আছে অনেক—দাড়ি , কমা , প্যারাগ্রাফের দিকটা ঠিকঠাক হয় না । তবু কাহিনী ভাল লেগেছে--আমরা এডিট করে নেব । এখন অনেকটা শুদ্ধতা এসেছে লেখায় । গত দু মাসে দুটো বইও প্রকাশিত হয়েছে ।
ইদানীং স্ত্রী সুরবালা অনেকটা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন । তাঁর একার ওপর সংসারের খাটাখাটনি তো কম যায় না ! এক শিবশঙ্করের ওপর করনীয় তাঁর অনেক কাজ থাকে--তাঁকে স্নান থেকে শুরু করে টয়লেটের যাবতীয় কাজ--তাঁকে উঠিয়ে বসাও , শোয়াও , অনেক অনেক কাজ সুরবালার ঘাড়ে ।
আজকাল সুরবালা শিবশঙ্করের কাছে অনেক কথাই চেপে যান । গত মাসে পাশের বাড়ির মেয়েটাকে নিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে এসে ছিলেন । শিবশঙ্কর তা জানেন না—হঠাৎ বিছানায় গোঁজা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন তাঁর চোখে পড়ে । লো প্রেশারে ভুগছেন সুরবালা । তাই তো শিবশঙ্কর আজকাল তাঁকে সামান্য কাজেই হাঁপাতে দেখেছেন ।
দুঃখ ভুলে থেকে আনন্দকে স্বাগত জানিয়ে বেঁচে থাকার নাম জীবন ! এই যে গল্প , কবিতা লেখেন শিবশঙ্কর , গল্প কবিতার ভাবভাবনা চরিত্রগুলি যতই কাল্পনিক হোক তাকে ভিত রেখেই রচনা করতে হয় । চরিত্রগুলি প্রায়ই শিবশঙ্করকে বড় নাড়া দিয়ে যায় । নানা চরিত্রের সুখ দুঃখের ঘটনাগুলি তাঁর জীবনের মাঝ দিয়েই যেন এগিয়ে যায় ! কাহিনীর সুখদুঃখ তাঁর নিজের সুখদুঃখ হয়ে পড়ে--এও এক বিচিত্র জগত ! এমনটাই চাই--এক পঙ্গু জীবনের বেঁচে থাকার আধার তো চাই--ভুলে থাকা—সুখ বেছে নিয়ে দুঃখকে সরিয়ে রাখা দূরে !--যে আনন্দ ফল্গুধারায় বিছিয়েছ জীবন--জেনো তা বালুচরি নয় , উত্তাল সমুদ্র জীবনের ঢেউ—সেই সুখ দুঃখ নিয়েই তো জীবন ! সুখের নীড়ে তাই প্রতিদিনের আকাশচারী পাখীদের কুলায় ফিরে যাওয়া ! ওই দিগন্তের গোধূলি আলো মেখে রাখালের সঙ্গ নাও--ওই গোপিনী চোখ , ওই গ্রামের ছাতিম তল , তোমার চির অপেক্ষার দিন গোনা । রাতের সহস্র ভাবনার মেলায় কখনো ভাবগুলি কবির মনের কড়ায় এসে নাড়া দিয়ে যায়--নির্ঘুম শিবশঙ্কর তখন তাঁর জীবনের কবিতা লিখতে বসেন ।
কদিন যাবত সুরবালা বেশ অসুস্থ । অবস্থার চাপে পড়ে রাখা ঠিকে ঝি দু বেলা ঘরের কাজ করে যায় । সময় করে সে সিদ্ধ ভাতটাও নামিয়ে দিয়ে যায় । শিবশঙ্কর কষ্ট করে নিজেই বেড়ে নিয়ে খান । প্লেটে সাজিয়ে নিয়ে স্ত্রীর জন্যে খাবার নিয়ে আসেন বিছানায় । চামচ দিয়ে ধীরে ধীরে সুরবালার মুখে তুলে দেন । সুরবালার প্রেশার খুব লো চলছে , মাথা তুলতে পারেন না । ডাক্তারের বলা মত ওষুধ খেয়ে যাচ্ছেন । দু দিন ভাল থাকেন , তারপর আবার প্রেশার নিচের দিকে নামতে থাকে । গতকাল ডাক্তার ঘরে এসে দেখে গেছেন । তাঁর এডভাইস , সুরবালাকে হসপিটালাইজড করতে হবে । সে মত শিবশঙ্কর ছেলে , মেয়ে , জামাইদের ফোন করে জানিয়েছেন । ওরা হয়তো কালই চলে আসবে ।
বেশ রাত হয়েছে , সুরবালা নিশ্চিন্ত ঘুমিয়ে আছেন । শিবশঙ্কর কষ্ট করে উপুড় হয়ে সুরবালার মুখের কাছে ঝুঁকে পড়লেন । ঘুমিয়ে আছে সুরবালা--তাঁর শ্বাস পড়ছে--বুকের ওঠা নামা ধরা পড়ছে ।
শিবশঙ্কর নিজের জাগায় এসে শুলেন । আজ ঘুম আসছে না তাঁর--হিজিবিজি হয়ে আছে--কোন ভাবনাকে ধরে রাখা যাচ্ছে না ! মাথার ডান পাশের জানলার দিকে চোখ পড়ল তাঁর । না, চাঁদের আলো নেই--হয় তো চাঁদ উঠেছে--খণ্ড চাঁদ শেষ দিগন্তে উঁকি দিয়েছে , কিন্তু তার ম্লান আলো এ ঘরটাকে আলোকিত করতে পারে নি । অস্পষ্ট জানালা দেখা যাচ্ছিল । ঘরের মাঝে ছায়া উপচ্ছায়ার ভিড় জমাট বেঁধে আছে ।
নিশুতি রাতের স্তব্ধতা বিরাজ করছিল । এ সময়টা কি ভগবান জেগে থেকে সবার ভাগ্যলিপি লেখেন ! এই নির্জনতায় নীরবতায় ভক্তরা তাঁকে বিরক্ত করবে না—তাঁর সামনে কেউ কোন আবদার রাখবে না--তাঁর পায়ে অর্ঘ নিবেদন বা মানসার শর্ত রাখবে না । ঠিক এমনি সময়টাই তাই বোধহয় ভগবান লিখে যান তাঁর দিনলিপি--মানুষের ভাগ্যলিপি !
ভোরের আলো ফোটেনি এখনও । তবে শিবশঙ্কর বুঝতে পারছেন, সমস্ত ঘর গাঢ় অন্ধকারে ছেয়ে গেছে--এটা ঊষা কাল--একটু পরেই সূর্যদেব উঠে আসবেন । তাঁর আগমন বার্তার ঈষৎ লাল ব্যাপ্ত আলোয় ঘুম ভাঙবে পৃথিবীর । আবার জীবন সরব হবে--কোলাহল মুখর হয়ে উঠবে এই চরাচর ।
ভোরের আলো ফুটে উঠছিল । ঘর ধীরে ধীরে আলোকিত হয়ে আসছিল । শিবশঙ্কর এবার আস্তে করে ডেকে উঠলেন , সুরবালা ! সুরবালা !
না , সাড়া নেই , কিন্তু অনেক তো ঘুম হল , আর নয়--আবার ডাক দিয়েন তিনি , সুরবালা , দেখো কি সুন্দর সকাল—সুরবালা , বলে এবার তিনি সুরবালাকে ধাক্কা দিয়ে জাগাতে গেলেন । কিন্তু , এ কি ! ঠাণ্ডা , বরফের মত ঠাণ্ডা সুরবালার দেহ ! স্তব্ধ হয়ে গেলেন শিবশঙ্কর , পরক্ষণেই চীৎকার করে ডেকে উঠলেন , সুরবালা , সুরবালা , বলে ।
সুরবালা স্তব্ধ হয়ে গেছেন । এ স্তব্ধতা আর ভাঙার নয় । শিবশঙ্কর জানেন এ ঘুম আর ভাঙার নয়--সে আর সাড়া দেবে না । চিরতরে সে যে স্তব্ধ হয়ে গেছে !
শিবশঙ্করের বুকের মাঝে হু হু করে ঝড়ো বাতাস বইতে লাগলো । ঝড় উঠেছে--উথাল পাথাল করা ঝড় । প্রচণ্ড শব্দ হয়ে ফেটে পড়তে চাইছে । বুকের মাঝে ঝঞ্ঝা কালো মেঘ ধাক্কা খাচ্ছে । শিবশঙ্করের চোখ ভারী হয়ে আসছে--চারিদিকে কুয়াশা জমে আসছে । এবার , এবার বৃষ্টি নেমে আসবে--চোখের দু কুল ছাপিয়ে—অজস্র , অযুত সে বৃষ্টির ফোঁটা--সারা জীবনের জমে থাকা সে উষ্ণ চেতনায় বান ডাকবে ।
--না , গলা ফেড়ে ডাক পাড়লেন শিবশঙ্কর , খাট থেকে নেমে এলেন তিনি । হুইল চেয়ারে বসে দ্রুত চলে এলেন জানলার কাছে--আকাশের দিকে তাকালেন , সেখানে লালচে রোদ ছড়িয়ে পড়েছে , কালো চিলেরা ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে । শুরুতে দু হাত দিয়ে চোখ , মুখ চেপে ধরলেন তিনি , পারছেন না--কিছুতেই আটকাতে পারছেন না । হঠাৎ হা হা হা হেসে উঠলেন শিবশঙ্কর--হা হা হা পাগলের মত অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন...

আপনার মতামত জানান