ফুকো

অনুপম মুখোপাধ্যায়


বেজায় গরম। আমরা তিনজন একটা বটগাছের তলায় বসে আছি। একটা সাদা রঙ-এর ছাগল ঘাস খাচ্ছে। তার মাথাটা কালো। আমরা আর কিছু না পেয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছি। এবং এখান থেকেই এই গপ্পের শুরু।

- এক ছিল না বিরাট রামছাগল। সে রোজ হরির চায়ের দোকানে চা খেতে যেত।
- যেতেই পারে। চায়ের দোকানে চা খেতে যাবে না তো কি বিরিয়ানি খেতে যাবে!
- বিস্কুট খেতেও তো যেতে পারে!
- চায়ের দোকানে কেউ মালাই খেতে তো যায় না। সেটার জন্য অন্য দোকান আছে।

এরকম কথাবার্তা বলছিল শ্রবণ আর কার্তিক। আমার খুব রাগ হচ্ছিল। ওরা কি আমাকে বোকা-সোকা কিছু ঠাউরেছে! এমন যুক্তিহীন কথা বলছে কেন!
আমি শোধ তুলতে বললাম, ‘আহা, পায়েসও তো একরকমের বিস্কুট !’
অমনি দুজনে আমার দিকে ফিরল। দাঁত খিঁচিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, আর তুমি যেমন একরকমের আজব গন্ডার! ওরকম শক্ত চামড়ার কবিতাই তো লেখো, যা এখানে কেউ পড়ে না, বোঝে না।’
আমি কাঁচুমাচু মুখ করে বললাম, ‘আবার আমার কবিতা তুলে কথা বলছ কেন তোমরা? কবিতা কি খাবার জিনিস?’
শ্রবণ বিচ্ছিরি মুখ করে বলল, ‘না। মাখার জিনিস। আমরা মুড়ি মাখিয়ে খাই।’
আমার একটু দুঃখ হল। কিছু বললাম না।
কার্তিক বলল, ‘এই ভরদুপুরে খাঁখাঁ রোদে কবিতা থাক। বরং একটা গল্প হোক।’
আমি মনের ভাব চেপে বললাম ‘হোক ! হোক!’
‘কিন্তু কে বলবে?’
‘শ্রবণ বলুক।’
শ্রবণ বলল, ‘না। ও বলুক।’
ও মানে আমি।
আমি বললাম, ‘তাহলে বরং কার্তিক বলুক।’
কার্তিক সবেগে ঘাড় নেড়ে বলল, ‘আমার টনসিল বেড়েছে। বকবকানি পোষাবে না। হোমিওপ্যাথ বারণ করেছে।’
এই গরমে টনসিল!
সে যাক। আবার সমস্যা দেখা দিচ্ছে। গল্পটা কে বলবে? আমি, শ্রবণ, নাকি ... কার্তিক? শ্রবণের মাথা টিপটিপ করছে সকাল থেকে। আমি তেলেভাজা খেতে গিয়ে একটু আগে জিভ কামড়ে ফেলেছি। আমাদের কারও বলার ইচ্ছে নেই। শুনতে চাই সবাই।
কী মুশকিল!

তাহলে কি শেষে ওই সাদা ছাগলটাই গল্প বলবে? আমি মনে মনে ভাবলাম। ও বেচারা তো ঘাস খেতেই ব্যস্ত!

কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ। গাছে হেলান দিয়ে বসে আছি। নিজে চোখ বুজিয়ে আছি। ওরা কী করছে বুঝছি না। ছাগলটার ঘাস চিবুনোর আওয়াজ শুধু শোনা যাচ্ছে। ওরাও কি মনে মনে ছাগলটার কথাই ভাবছে?

‘গল্পটা বলবে কে?’ হঠাৎ আমরা তিনজনে একসঙ্গে বলে উঠলাম।
এর মানে দাঁড়াচ্ছে গল্পটা আমরা কেউই বলব না। হেড-টেল করেও তো এই সমস্যার সমাধান নেই। কোনো কয়েনেই তিনটে পিঠ থাকে না।
ঠিক তখনই ছাগলটা মুখ তুলে বিরক্ত গলায় বলল, ‘তোমরা কি চাও আমি এবার কিছু বলি?’
‘তুই? মানে তুমি?’ আমরা সমস্বরে, আবার।
সত্যি কথা বলতে কী, আমরা কেউই একটুও অবাক হলাম না। ছাগল যে কথা বলতে পারে না, এটা তো নিছক লোকের মুখে শোনা কথা। আজ অবধি আমরা নিজের চোখে এমন কোনো ছাগল দেখিনি যে মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে না। অবিশ্যি বলতে পারে এমন ছাগলও দেখিনি। দুটো ব্যাপার একসঙ্গে খেয়াল করাই হয়নি।
কিন্তু তাতে কী এসে যায়?
অত দুর্বল প্রমাণে আমরা অবাক হই না।
তাছাড়া এই গরমে বেশি অবাক হলে শরীর খারাপ করতে পারে।
ছাগলটা গম্ভীরভাবে মাথা দুলিয়ে বলল, ‘তোমরা আমার নাম জানো?’
‘না।’ আবার আমরা সমস্বরে।
‘আমার নাম ফুকো।’
‘তাতে কী? অনেকেই তাদের ছাগলের নাম-টাম রাখে।’ শ্রবণ বলল, ‘আমি একটা ছাগলকে জানতাম যার নাম ছিল লম্বকর্ণ।’
কার্তিক বলল, ‘আমিও ব্যাকরণ সিং নামে একটা ছাগলকে ভালোমতো চিনি।’
আমাকে কিছু বলতে হয়। আমি বললাম, ‘আমার পাশের বাড়িতে একটা রামছাগল থাকে। তার নাম রাখা হয়েছে ভিসুভিয়াস।’
ওরা আমার দিকে কটমটিয়ে তাকাল। ছাগলটা বিচ্ছিরিভাবে হেসে বলল, ‘ভিসুভিয়াস কারো নাম হয় না। ভিসুভিয়াস হল গিয়ে... একরকমের, মানে ইয়ে, তুষারঝড় গোছের কিছু হবে।’
আমি দমলাম না। ভেংচি কেটে বললাম, ‘আজ্ঞে না, ভিসুভিয়াস একরকমের, মানে ইয়ে, পলল পাথর।’
ফুকো গম্ভীর হয়ে গেল। অপমানিত হল নাকি! কার্তিক চটে উঠে বলল, ‘জাহান্নামে যাক ভিসুভিয়াস। কথা হল, গল্পটা কে বলবে? ছাগল, মানে ফুকো যদি বলেও, সেই গল্প কি শোনা ঠিক হবে? ওর তো খাওয়াদাওয়ার অভ্যাস আমাদের চেয়ে অনেক আলাদা!’
ফুকো আরো গম্ভীর হয়ে বলল, ‘আমি কিন্তু একমাত্র ঘুষ ছাড়া মানুষ যা যা খায়, সবই খেতে পারি! অবিশ্যি মানুষ যা খায় না তাও খাই।’
আমি একটু একটু ভয়ে ভয়ে বললাম, ‘আমি ছাগলদের ফুল খেতে দেখেছি। বিশেষ করে গাঁদাফুল খুব খায়, মানে খান আপনারা।’
ফুকো মুখ বাঁকিয়ে বলল, ‘আবার আপনি-আজ্ঞে করা কেন! যেচে মান আর কেঁদে সোহাগ আমার ধাতে সয় না। হ্যাঁ, ফুল আমরা খাই। পুজোর কাজে লাগে।’
‘পুজো?’
‘পেটপুজো।’
আমি ধাতস্থ হলাম। ছাগলরা পুজোর কাজে লাগে সেটা জানি, কিন্তু তারা নিজেরা আবার যদি পুজোআচ্চা শুরু করে দেয় তাহলেই চিত্তির। এখনই একটা সাম্প্রদায়িক সমস্যা শুরু হবে।
কার্তিক বোকার মতো বলল ‘তোমরা কি পেটের মধ্যে ঠাকুর পোষো?’
ফুকো এবার ভীষণ রেগে গেল, ‘আস্ত-আস্ত ২৫শে বৈশাখ পুষি। তোমাদের আই কিউ এত কম হওয়া সত্বেও তোমরা বেঁচে আছো কী করে? শোনো, আমরা তোমাদের মতো নই যে গাছতলায় একটা লম্বা পাথর পেলেই সেখানে মন্দির করে ফেলব, আলুর শুঁড় গজালেই তাকে গণেশ ভেবে দুধ ঢালব, আর একটা পাঁচজনের নধ্যে কেউ একজন হলেই তাকে দেবতা বানিয়ে সিংহাসনে সাজিয়ে রাখব। মানুষ কোথাকার!’
জোর রেগেছে বোঝা গেল। রাগ সামলাতে না পেরে কার্তিককে ঢুঁসিয়ে না দেয়!
ওর রাগ সঙ্গত। ছাগল সমাজ সম্পর্কে কিছুই না জেনে আমাদের মন্তব্য করা উচিত হয়নি।
আমি সামলাতে চেষ্টা করলাম, ‘আহা! না জেনে বলে ফেলেছে। ছাড়ো। তা গল্পটা কি তাহলে তু্মিই বলবে?’
ফুকোর রাগ কমল না। ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, ‘তোমাদের গল্প বলে লাভ নেই। ছাগলের গল্প বোঝার বুদ্ধি তোমাদের নেই। যাও, নিজেরা নিজেদের গল্প শোনাও গে...’
খটখটিয়ে চলে গেল।
চারপাশের এত সবুজ সতেজ সৌরকরোজ্জ্বল ঘাসও ফুকোকে ধরে রাখতে পারল না!
আমরা একে অন্যের মুখের দিকে তাকালাম।
গল্পটা তাহলে কি কেউই বলবে না!




আপনার মতামত জানান