অতঃপর অসমাপ্ত

অভীক দত্ত

ছবি- বিক্রমাদিত্য গুহ রায়


“এই বাড়ির ফ্রিজটা ও বাড়ির থেকে ভাল”। কথাটা বলেই থমকে গেল তিথি। নিজেকে একটা থাপ্পড় মারতে ইচ্ছা করছিল তার। যতবার ভেবেছে পিনাকেশের সামনে ও বাড়ির কথা বলবে না, ততবার না চাইতেও বেরিয়ে আসছে। সে নিজেও বুঝতে পারছে এ আসলে এমন একটা প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে, এটাকে আটকে রাখা দিনে দিনে বড্ড চাপ হয়ে যাচ্ছে।
পিনাকেশ রাগ করল না। সে উঠে দাঁড়িয়ে তিথির পাশে এসে দাঁড়াল। ওর একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে চুমু খেল। তারপর বলল “এগুলি হয়, রাউল আর রিনিরও হবে। মেমরি চেঞ্জ করবে না যখন ঠিক করেই নিয়েছিলে আর কি করবে বল”।
তিথি হাসতে পারছিল না। অপ্রতিভ লাগছিল তার। বলল “মেমরি চেঞ্জ করব না কারণ ওর সাথে আমার শৈশবটাও জড়িত আছে। আমি সেটাতে কোনভাবেই হাত দিতে চাই না”।
পিনাকেশ জানলার কাছে গেল। বাইরে আকাশ দেখা যাচ্ছে না হাইরাইজের জ্বালায়। তাদের একশো পনেরো তলার বিল্ডিংয়ে নেহাত কপাল খারাপ বলে তারা মাত্র দোতলাটা পেয়েছে। যদিও কাপড় কাচা শোকানোর মত ফ্ল্যাট জাতীয় দৃশ্যদূষণ এই দুহাজার পঞ্চান্নতে নেই তবু পিনাকেশ প্রচুর আক্ষেপ করে দোতলা পাবার জন্য। আরেকটা ফ্ল্যাটের জন্য সে আবেদন করেছে, তবে তার জন্য প্রচুর ক্রেডিট পয়েন্ট তাকে ছাড়তে হবে। তিথির সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করবে ঠিক করেছে সে তবে আরও কিছু দিন পরে। তার ইচ্ছা তিথি আরও কয়েকদিন থিতু হোক তার কাছে।
তার গত দুদিন ধরে একটা অদ্ভুত ধরণের অস্বস্তি হচ্ছে। সে ভেবেছিল তিথিকে সে বুঝতে পেরেছে পুরোটাই কিন্তু কেন জানে না তার মনে হচ্ছে ধারণাটা ভুল ছিল। বিশেষত কথায় কথায় এই তুলনা টানার সময় ওর গলাটায় কেমন যেন দুঃখ ভর করছে।
“তুমি কি কিছু খাবে? আমার রান্না করতে ইচ্ছা করছে খুব”। তিথির গলাটা এবার আবার অন্যরকম লাগল। পিনাকেশের এই জায়গাগুলোতেই সন্দেহ হয়। কেমন যেন অভিনয় মনে হয়।
এই জায়গা থেকে বেরনোর ইচ্ছা থেকেই সে বলল “চিকেনের কিছু কর না। সেই কবে চিকেন খেয়েছি”।
তিথি ব্যস্ত হয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। যেন তার থেকে পালিয়েই গেল। তার একটু মন খারাপ হল। বেশ কিছুক্ষণ মনমরা হয়ে বসে থাকল সে। তারপর ধীরে ধীরে রান্নাঘরে গেল। রান্নার জন্য অত্যাধুনিক রোবটটাইপ মেশিন থাকলেও তিথি সব কিছু নিজের হাতে করতেই পছন্দ করে। তার মেশিনের রান্না পছন্দ নয়। পিনাকেশেরও তাই।
“তোমার কি খুবই মন খারাপ করছে?”
পিনাকেশের কথায় তিথি একটু চমকাল যেন। তারপর হাসল “ওহ, তুমি কখন চলে এসছ দেখতেই পাই নি। নাহ, তেমন কিছু করছে না তো”। মাথা নাড়ল তিথি জোরে জোরে।
“আমি একটা কাজ করি? ডিনারে রাউল আর রিনিকে ডাকি। কি বল?”
তিথির মুখটা একটু ফ্যাকাশে হল কি? পিনাকেশ দেখতে চাইছিল। কিন্তু ও মুখ অন্যদিকে করে থাকায় দেখতে পেল না।
“ডাক। তাহলে একটু বেশি করে চিকেন করি?” নিস্তেজ গলায় বলল তিথি।
“কর, আর কিছু লাগলে বল, বলে দিই”।
“নাহ ছেড়ে দাও”, তিথি আবার রান্নায় মন দিল। “ও শোন, মিষ্টি দই পাওয়া যাবে?” হঠাৎ যেন মনে পড়ে গেল তার।
পিনাকেশ চলে যাচ্ছিল। কথাটায় থমকে দাঁড়াল। বলল “হ্যাঁ, দেখছি দাঁড়াও”।
দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াল সে। রাউল মিস্টি দইয়ের খুব ভক্ত।

২।
রাউল আর রিনি কিছুক্ষণ আগে এসেছে। তিথির রান্না পুরো হয় নি এখনও। পিনাকেশের মনে হচ্ছিল ওদের না ডাকলেই ভাল হত। রিনি তুলনায় অনেক ভাবলেশহীন। তার সামনা সামনি কিছুক্ষণ বসে রান্নাঘরে চলে গেছে তিথিকে সাহায্য করতে। রিনি যেতে কিছুটা সহজ হল পিনাকেশ। রাউল হাসল তার দিকে তাকিয়ে। “কি হে? নতুন বউ কেমন লাগছে?”
পিনাকেশ প্রত্যুত্তরে হাসল। বলল “ভাল। তুমি তো জানোই বাইরের রান্নাটা আমি একেবারেই নিতে পারি না। তিথি এই দিক দিয়ে আমায় বাঁচিয়েছে”।
রাউল চোখ টিপল “আর আমার বাইরের খাবারে ইন্টারেস্ট। তবে? একি আদ্যিকালের সিস্টেম রে ভাই, যে একবার সিঁদুর পরিয়ে নিয়ে এলে তো হয়ে গেল, তাকে নিয়েই ঘষে ঘষে যাও! ভাগ্যিস এইভাবে মিউচুয়ালি চেঞ্জ করা যায়। নইলে যে কি হত! দেখ বস, তিথির সাথে কিছুতেই আমার কম্প্যাটিবিলিটি হচ্ছিল না। আমার ঘরদোর পরিষ্কার নিয়ে খুঁতখুঁতানি নেই, যেটা রিনিরও নেই। এদিকে তোমার ছিল। তিথির ছিল। বাইরের খাবার ঘরের খাবার তো আছেই। আরও হাজার খানেক কারণ আছে। আই মাস্ট কনফেস আমাদের এই পার্টনার এক্সচেঞ্জটা দারুণভাবে ওয়ার্কআউট করবে তুমি দেখে নিও। অনেকের করেছেও”।
পিনাকেশ অপ্রতিভ হয়ে বলল “হ্যাঁ, আমি তো জানি ইট রিয়েলি ওয়ার্কস। কিন্তু তিথির কিছু আচরণ সমস্যায় ফেলছে। আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে সি ইজ নট কমফরটেবল অ্যাট অল”।
রাউল তার কথায় মুখ বিকৃত করল সামান্য, বলল “আরে ছাড়ো। ও বরাবরই এরকম। সব সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবার পরে সেটা নিয়ে শুরু হয় ওর হাজার চিন্তা। জানো, প্রথম যে বার আমরা এক সাথে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম, তারপরেও ও না করে দিয়েছিল? বলেছিল ওর বাবা নাকি পছন্দ করবে না। সেই পুরনো যত ন্যাকামো, বাবা কি বলবে, মা কি বলবে। অথচ হানিমুনে যেতে সব ঠিক। বাই দ্য ওয়ে তোমার দিক থেকে তুমি ঠিক আছ তো? রিনির চিন্তা মাথায় ঘুরছে না তো?” ঝুঁকে আসল খানিকটা রাউল তার দিকে।
পিনাকেশ হঠাৎ বুকের মধ্যে খানিকটা জ্বালা অনুভব করল। সেটা তিথিকে নিয়ে রাউলের হানিমুনে যাবার কথায় নাকি রিনির কথা আসায় সে বুঝতে পারল না।
ফ্যাকাসে ভাবে হাসল সে, “নাহ। সে সব নেই। তাছাড়া কাল থেকে আবার অফিস দৌড়তে হবে, এইসব ছোটখাট ব্যাপার নিয়ে বেশি মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই কি বল?”
রাউল একটু অস্বস্তি নিয়েই বলল “ডিড ইউ হ্যাভ সেক্স উইথ তিথি?”
পিনাকেশ এই প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না। চমকাল খানিকটা। বলল “নোপ। আরেকটু সময় দিতে চাই”। তারপর সন্তর্পণে জিজ্ঞেস করল “তোমাদের?”
রাউল হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল, “ইয়েস, অ্যান্ড আই মাস্ট কনফেস, ইওর এক্স ইজ সুপারব ইন বেড”।
কথাটা বলে রাউল একটু চুপ করে গেল। বেশ কয়েক সেকেন্ড দুজনের কেউই কোন কথা বলল না।
পিনাকেশ নীরবতা ভঙ্গ করল “আমার মনে হচ্ছে তিথি খানিকটা শকে আছে। ওর মেমোরিটা মুছে দিলে কেমন হয়”?
তাদের কথার মাঝখানেই রিনি এল, “চল ডিনার টেবিলে এসে গেছে”।
দুজনেই উঠল। রিনি ডাইনিং রুমে চলে গেলে রাউল পিনাকেশের কাঁধে একটা হাত রাখল।

৩।
দুজন পুরুষ পাশাপাশি আর দুজন নারী পাশাপাশি পরস্পরের উল্টোদিকে। পিনাকেশের সামনে তিথি বসেছে। রিনির সামনে রাউল। টেবিলে পিনাকেশের প্রিয় ডিশ। কিন্তু সেগুলির প্রতি সে কোনভাবেই কোন টান অনুভব করছিল না। তার বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল মিষ্টি দইয়ের দিকে।
ঘরে আর কোন শব্দ হচ্ছিল না। শুধু পিনাকেশের গ্রেট গ্র্যান্ডফাদার ক্লক জোরে জোরে টিক টিক করে এগিয়ে যাচ্ছিল... আরও সামনের দিকে।

আপনার মতামত জানান