আয়ুধ...

সুগত সরকার

পতিত পাবন পতিতুন্ড পেশায় একজন স্বর্ণব্যবসায়ী। বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি । ছোটখাটো রোগা চেহারা,মাথার সামনের দিকে চুল একটু কম। চোখ দুটো কেমন নিষ্প্রভ। ঠোঁটের উপর একটা কাঁচা পাকা সরু মোচ।পেটের উপর বেল্ট আঁটা প্যান্ট। শার্ট ভিতরে ইন করা । একটা নিরীহ আপাত মস্তক ভদ্রলোক বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই। না একটু ভুল হল। একটা নিরীহ আপাদমস্তক পত্নী নিষ্ঠ ভদ্রলোক বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই।
পতিত বাবুর বিয়ে হয়েছে প্রায় বছর পনের হল।কিন্তু যবে থেকে পতিতবাবুর বিয়ে হয়েছে তার জীবন যেন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিয়ের পর ফুলশয্যার রাতে যখন নববিবাহিতা স্ত্রী করুণার সাথে প্রথম আলাপ হয়,তখন পতিতবাবুর মনে হয় এ মেয়ের রূপ হয়তো নেই তবে মেয়েটি বেশ ঠাণ্ডা এবং শান্ত প্রকৃতির হবে।
কিন্তু বিয়ের মাস কয়েকের মধ্যেই তার সেই ভুল ভেঙে গেল। সেদিন কি একটা কারনে পতিতবাবু আনাথবাবুর বাড়ি গিয়েছিলেন। চা খেয়ে ফিরতে একটু দেরী হয়েছে। ব্যাস করুনার মুখ দিয়ে করুনাধারার বর্ষণ শুরু। প্রথমটাই সে একটু গলাফেরে কেঁদে নিল তারপর ঝেঁঝিয়ে উঠল ‘ ওই টেকো বুড়োটার বাড়ি গিয়েছিলে কেন? ওর বউ ওই হারামজাদী ডাগর মাগিটার সাথে পিরিত করতে। ঝেঁটিয়ে তোমার পিরিত নামিয়ে দেব। বেরোও বলছি......... আজ দুপুরে তোমার ভাত বন্ধ।’ পতিতবাবু ব্যপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না। তিনি ঝামেলা না বাড়িয়ে সোজা দোকানে চলে গেলেন। দুপুরে দোকানের নেপালি দারোয়ান দলজিত থাপা খাবার নিতে এল। কিন্তু তাকে খালি হাতেই ফিরতে হল। সেদিন রাতেও পতিতবাবুর আর রাঁধা ভাত জুটল না। শুকনো মুড়ি চিবিয়েই তার পেটকে শান্ত করতে হল। তারপর থেকে নিঃসন্তান পতিতবাবুর জীবনে নিত্যদিন এমনটা ঘটেই চলেছে। তাকে কখনো অভুক্ত কখনো বা অর্ধভুক্ত থাকতে হয়েছে।
দোকান থেকে রাতে একটু ফিরতে দেরী হলে ‘ওই প্রশান্ত মিনসেটার বাড়ি গিয়েছিলে বুঝি? কেন ওর কচি বউটাকে না দেখলে রাতে ঘুম হচ্ছে না ?” । হাটের থেকে ফিরতে দেরী হলে “ চক্রবর্তীর বাড়ি গিয়েছিলে ?ওর বোন ওই ধুমসো মাগীটা এইসময় একা থাকে একটু খুনসুটি করে এলে বুঝি ?” । ট্যাক্স কন্সালটেন্ট ত্রিদিপবাবুর বাড়ি গেলে “ কেন ত্রিদিপ ঘোষের বউ ওই আঁটকুড়োর বিটির হাতে চা না খেলে বুঝি পেটের ভাত হজম হয় না?”। এইরকম হাজারো মাথামুণ্ডুহীন প্রশ্ন।
প্রথমটায় পতিতবাবু একটু প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছিলেন বটে, কিন্তু তাতে বিশেষ কিছু ফল হয় নি। বরং হিতে বিপরীতটাই হয়েছে।চক্রবর্তীর পরামর্শে ঘরে শান্তির জন্য সত্যনারায়ান পুজোও দিয়েছেন। কিন্তু কোনোকিছুতেই কোন ফল হয় নি। তাই পতিতবাবু মৌনব্রত নেওয়াই শ্রেয় মনে করেছেন।
তার উপর গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে শহর জুড়ে ছিনতাই আর তোলাবাজির উপদ্রব। এইতো সেদিন পতিতবাবুর হাঁটুর বয়সী কতগুলো চাংড়া ছোঁড়া পতিতবাবুকে হুমকি দিয়ে গেল।পাড়ার ক্লাবঘর নির্মাণের জন্য পার্টী আফিসে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিতে হবে অন্যথায় ফল ভালো হবে না। পতিতবাবু একটু আমতা আমতা করে বললেন “বাবা অত টাকা আমি কোথায় পাব। তোমরা বরং পাঁচ হাজার টাকা নিও।” সঙ্গে সঙ্গে একটা ছোকরা বলে উঠল “এই বুড়ো রাতে তো একা একা ক্যাশ নিয়ে বাড়ি যাস। যদি সেটা একটা ঘোড়া দেখিয়ে কেউ কেড়ে নেয়,তখন কি হবে ?” পতিতবাবুর মুখের সামনে ফস করে সিগারেটের ধোঁয়াটা ছেড়ে আর এক মুষকো মাস্তান বলে গেল “কিম্বা ধরুন একটা ভোজালি দিয়ে যদি আপনার এই শরীরটাকে কুচি কুচি করে কেটে বস্তাই ভরে কেউ জঙ্গলের ধারে ফেলে রাখে। সামনের মাসের পাঁচ তারিখ আসব। টাকাটা জোগাড় করে রাখবেন। কখন পার্টি আফিসে যেতে হবে খবরটা দিয়ে যাব।”
ওরা যা ফেরোসাস বিশ্বাস নেই। পতিতবাবু রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন। তারপর তাঁর বন্ধু উকিল সরোজ সামন্তকে ফোন করলেন। সব কিছু শুনে সরোজবাবু বললেন “ শোন পতিত যেখানে ওরা তোমাকে পার্টি আফিসে টাকা দেওয়ার কথা বলছে তার মানে হল এই ,পার্টি ব্যাপারটাতে ইনভল্ভ। সুতরাং পুলিশে কমপ্লেন করে খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হয় না । পুলিশ এখন পার্টির কথায় ওঠে বসে। তাছাড়া এতে ওরা তোমার উপর চড়াও হতে পারে। তার থেকে তুমি বরং দোকানে দুটো প্রাইভেট সিকিউরিটি রাখো আর তোমার ওই নেপালি দরোয়ানটাকে বলো ক্যাশ নিয়ে তুমি যখন বাড়ি ফিরবে তোমার সাথে বাড়ি পর্যন্ত যেতে। আর আমি এদিকে পার্টীর ব্লক সভাপতি চানুদার সঙ্গে কথা বলে একটা রফা করার চেষ্টা করছি।” তারপর থেকে পতিতবাবু সকালে দুজন ও রাতে দুজন প্রাইভেট সিকিউরিটি রেখেছেন এবং দলজিত তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দেয়।
পতিতবাবুর এই দোকানটি পৈতৃক সূত্রে পাওয়া। দোকানটির বয়স তা প্রায় একশ বছর তো বটেই। পতিতবাবুর প্রপিতামহ ঈশ্বর বিপিন বিহারী পতিতুন্ড এই দোকান প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর তাঁর পিতামহ এবং বাবার হাত বদল হয়ে এই দোকানের মালিকানা এখন তাঁর হাতে। ছোট মফস্বল শহরের মধ্যে বেশ বড় একটা জুয়েলারির দোকান। তাছাড়া এত বছরের সুনাম। তাই দোকানে খরিদদারের অভাব নেই। সুতরাং মা লক্ষ্মীর কৃপা দৃষ্টি পতিতবাবুর উপর অব্যাহত।
আজ দুপুর থেকেই আকাশের মুখ ভার। বিকেল থেকে অনবরত মুশলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।বাজারে লোকজন বিশেষ নেই।ব্যবসায়ীদের ভাষায় যাকে বলে মন্দা বাজার। পতিতবাবু রাস্তার দিকে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখছেন। দলজিতের স্ত্রী বেশ কয়েক দিন ধরে জ্বরে ভুগছে। তাই দলজিত পতিতবাবুর কাছে আজ হাফবেলা ছুটি নিয়েছে। স্ত্রীকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাবে। সাড়ে সাতটা বাজল। বৃষ্টি এবার ধরে এসেছে। আকাশের অন্ধকারভাবটা অনেকটা কেটে গেছে। পতিতবাবু দুরের কর্মচারীদের একে একে ছেড়ে দিলেন। তারা লাস্ট বাস ধরে বাড়ি ফিরবে। নাইট শিফটের প্রাইভেট সিকিউরিটি চলে এসেছে।
পতিতবাবু ঘড়ি দেখলেন আটটা পনের।পতিতবাবু সিন্ধুক থেকে ক্যাশ বের করে গুছোতে লাগলেন। আজ পতিতবাবুকে একা বাড়ি ফিরতে হবে তাই সম্পূর্ণ ক্যাশ তিনি নিলেন না। ক্যাশ গুছিয়ে সাইড ব্যাগে ভরলেন এবং গয়নাগাটি সব সিন্ধুকে ভরে চাবি দিয়ে দিলেন।তারপর সব দেখে শুনে বিশুকে দোকান বন্ধ করতে বললেন। বিশু তালা লাগাতে শুরু করল। তারপর দুজনে মিলে সদর দরজার সাটার টেনে দিলেন। পতিতবাবু নিজে সদর দরজার তালা লাগালেন।
দুজনে মিলে রওনা দিলেন। পতিতবাবু একটা রিক্সার জন্য এদিক ওদিক দেখতে লাগলেন। বিশু বলল “ যা বৃষ্টি হয়ে গেল দাদা, রিক্সা মনে হয় না পাওয়া যাবে। বরং চলুন আমার সাইকেলে করে আপনাকে ছেড়ে দিয়ে আসি।” পতিতবাবু ইতস্তত করলেন। বললেন “ও আমি ঠিক চলে যাব ক্ষণ ।” কিন্তু বিশু নাছোড়বান্দা। অবশেষে পতিতবাবু বললেন “আচ্ছা ঠিক আছে চল আমাকে ঐ কাঁচা রাস্তার মোড়ে নামিয়ে দিবি।” পতিতবাবু বিশুর সাইকেলে উঠে বসলেন।
দোকান থেকে পতিতবাবুর বাড়ি মাইল দেড়েকের হাঁটা পথ। মফস্বল শহরের একপ্রান্তে বাড়ি পতিতবাবুর। সকালবেলা পতিতবাবু হেঁটেই দোকানে যান । তাতে ওনার সকালের মর্নিং ওয়াকটাও হয়ে যায়।ইদানিং পতিতবাবুর আবার সুগার ধরা পড়েছে।ডাক্তারবাবু আধঘণ্টা করে হাঁটতে বলেছেন।
আকাশের গুমভাবটা অনেকটাই কমে গেছে। কালো মেঘ অনেকটাই কেটে গেছে। শুক্ল পক্ষের বাঁকা চাঁদ আকাশে উঁকি দিচ্ছে। বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা অনুভূত হচ্ছে। বিশু পতিতবাবুকে কাঁচা রাস্তার মোড়ে নামিয়ে চলে গেল। পতিতবাবু কাঁচা রাস্তা ধরে দ্রুত হাঁটতে লাগলেন। সামনে শাল-সেগুনের একটা বাগান। তার ভিতর দিয়ে মিনিট পাঁচেক হাঁটলেই পতিতবাবুর বাড়ি।আজ রাস্তার স্ট্রীট লাইটগুলো জ্বলে নি।শুক্ল পক্ষের চাঁদের আলো শাল-সেগুনের পাতার ভিতর দিয়ে এসে বাঁকাভাবে পড়ছে কাদা চপচপে কাঁচা মোরাম রাস্তায়। পতিতবাবু ব্যাগ থেকে তিন ব্যাটারি টর্চটা বের করে সেটা জ্বালিয়ে দ্রুত পা চালাতে লাগলেন। পতিতবাবুর একটু ভয় হতে লাগল। রাস্তায় যদি ঐ মুষকো ছেলেটা ভোজালি হাতে দাঁড়িয়ে থাকে। পতিতবাবু রুদ্ধশ্বাসে আরও দ্রুত হাঁটতে লাগলেন। না, বলতে একটু ভুল হল। প্রায় ছুটতে লাগলেন।
কিছুটা এসে একাটা সেগুন গাছের তলায় এসে পতিতবাবু পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নিয়ে কোনরকমে থমকে দাঁড়ালেন। তারপর সড়সড় করে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে হাঁপাতে লাগলেন।
সামনে সেগুন গাছের গোঁড়ায় মোরামের কাদায় কি একটা পড়ে আছে । তির্যক চাঁদের আলোয় সেটা কুণ্ডলী পাকানো একটা কেউটের মত চকচক করছে। পতিত বাবু টর্চের আলোয় যা দেখলেন তাতে তিনি আঁতকে উঠলেন। একটা আস্ত পিস্তল ।পতিতবাবু ভয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগলেন। তাঁর গলাটা কেমন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। শরীর থেকে সমস্ত জল যেন সহস্র ছিদ্র দিয়ে ঘাম হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। পতিতবাবু চিৎকার করে কারো সাহায্য প্রার্থনার চেষ্টা করলেন। কিন্তু গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বেরচ্ছে না। পতিতবাবু শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে পিস্তলটাকে পাশ কাটিয়ে কোনরকমে ছুটে সেখান থেকে পালিয়ে এলেন। কিছুদুর এসে পতিতবাবু একটা গাছের গোঁড়ায় দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগলেন। তারপর পকেট থেকে রুমালটা বের করে কপালের ঘাম মুছতে লাগলেন। ব্যাগ থেকে জলের বোতলটা বের করে মুখে চোখে একটু জলের ঝাঁপটা নিলেন। তারপর ঢকঢক করে এক নিঃশ্বাসে সমস্ত জলটা খেয়ে ফেললেন। এতক্ষণে পতিতবাবুর ভয় অনেকটা কেটে গেছে। তিনি যেন ঐ পিস্তলটার প্রতি একটা অদ্ভুত নৈসর্গিক আকর্ষণ অনুভব করলেন। তিনি পুনরায় সেই সেগুন গাছটার কাছে গেলেন।পিস্তলটা যেমনভাবে পড়ে ছিল ঠিক তেমনভাবেই পড়ে আছে। পতিতবাবু মাটিতে ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে সেটাকে তুলতে গেলেন। তারপর কি একটা ভেবে একটু ইতস্তত করলেন। অনেকক্ষণ সেটাকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন। অবশেষে সেটাকে সযত্নে তুলে, পকেট থেকে রুমালটা বের করে তার উপর লেগে থাকা কাদা মুছে ফেললেন। তিনি পিস্তলটাকে হাতে নিয়ে ভালো করে দেখতে লাগলেন।পিস্তলটা লোডেড। অনেকক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সেটাকে দেখার পর সেটাকে কোমরে গুঁজে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলেন।
পিস্তলটা কোমরে গুঁজে পতিতবাবুর নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ মনে হতে লাগল। তাঁর অজান্তেই তাঁর হাঁটাচলার মধ্যে একটা পরিবর্তন ঘটে গেছে।তিনি হাতের টর্চটা নিভিয়ে বীরদর্পে হেঁটে চলেছেন।পতিতবাবু নিজের মনে বিড়বিড় করতে লাগলেন “ এখন একবার সামনে আসুক না সেই ভোজালিওয়ালা মুষকো ছোঁড়াটা, ব্যাটাকে প্যান্টে হিসু করিয়ে তবে ছাড়বো।আর সেই ব্যাটা কি যেন বলেছিল? ক্যাশ ছিনতাই করবে,একবার সামনে এসে দেখ তোর জামা প্যান্ট ছিনতাই করে তোকে ন্যাংটো করে বাড়ি না পাঠালে আমার নাম পতিত পাবন নয়।” এমন সময় একটা নেড়ি কুকুর পতিতবাবুকে তেড়ে এল।পতিতবাবু দু’পা পিছিয়ে গিয়ে মুখে হ্যাট হ্যাট শব্দ করলেন। কিন্তু না এতে কুকুরটা বিন্দুমাত্র ভয় পেল না বরং আরও বেশী করে ঘেউ ঘেউ করে পতিতবাবুর দিকে আগাতে লাগল। আর একটু হলেই পতিতবাবুর পায়ে তার ধারালো দাঁত বসিয়ে দিয়েছিল প্রায়। পতিতবাবুর সেই চাংড়া ছোঁড়াগুলোর প্রত্যেকটার মুখগুলো মনে পড়ে গেল। রাগে, অপমানে পতিতবাবুর মুখ লাল হয়ে গেল, নিষ্প্রভ চোখ দুটো হঠাৎ ভীষণ হিংস্র হয়ে উঠলো। তিনি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়লেন। বিদ্যুৎ বেগে কোমর থেকে পিস্তলটা বের করে ট্রিগারটা টিপলেন।পিস্তল গর্জে উঠলো। অভ্রান্ত নিশানা।পিস্তলের গুলি গিয়ে লাগল কুকুরটার বাম কানের পিছনে।
কুকুরটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কুঁই কুঁই করে শেষ আর্তনাদ করতে লাগল। তাজা রক্তে লাল মোরামের রাস্তা আরও রিক্ত হয়ে উঠলো। কয়েকবার কাটা মুরগীর মত ছটফট করল। অবশেষে কুকুরটার আর নড়াচড়ার ক্ষমতা রইল না । শেষবারের মত সামনের পা দুটো কোনরকমে জোড়া করে কয়েকবার লেজটা নেড়ে সে তার কৃতকর্মের জন্য পতিতবাবুর কাছ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করল।তারপর ক্রমে স্থির হয়ে গেল। পতিতবাবুর চোখে মুখে একটা যুদ্ধ জয়ের তৃপ্তি। তিনি সেখানে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর একটা ব্যঙ্গ হাসি হেসে বাড়ির দিকে রওনা দিলেন।
বাড়ি ফিরতেই করুনা শুরু হয়ে গেল। পতিতবাবু গর্জে করুনার দিকে তাকালেন। তারপর স্নানঘরে চলে গেলেন। পতিতবাবুর এই রূপ করুনা আগে কখনো দেখে নি। সে আর কথা বাড়ালো না।
স্নানঘরে গিয়ে পতিতবাবু পিস্তলটিকে স্বস্নেহে দেখতে লাগলেন। তারপর পিস্তলটিকে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে সেটাকে পুনরায় কোমরে গুঁজে রাখলেন। স্নানঘর থেকে বেড়িয়ে তিনি তার নিজের ঘরে চলে গেলেন। তারপর আলমারি খুলে পিস্তলটাকে ক্যাশের সাথে সযত্নে ভরে রাখলেন।
সে রাতে পতিতবাবু আর কিছু খেলেন না। জানলার পাশে সিঙ্গেল খাটে তিনি শুয়ে পড়লেন। করুনার নীচে মেঝেতে বিছানা পেতে শোয়ার অভ্যাস। পতিতবাবু খাটে এপাশ ওপাশ করতে লাগলেন। ঘুম আর তাঁর আসে না।
কিছুক্ষণ পর পতিতবাবু বিছানার উপর উঠে বসলেন। সারাদিন খাটা খাটনির পর করুনা বেঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছে। পতিতবাবু বিছানা থেকে নেমে আলমারির কাছে গেলেন। প্রায় নিঃশব্দে আলমারি খুলে পিস্তলটি বের করলেন। জানলা দিয়ে ঘরে চাঁদের আলো ঢুকে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ছে। পতিতবাবু জানলার ধারে দাঁড়িয়ে সস্নেহে পিস্তলটিকে দেখতে লাগলেন। তার মনের ভিতর একটা অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছে। সে আনন্দ ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। তিনি পিস্তলটিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার দেখতে লাগলেন এবং বারবার তাঁর নিজেকে পৃথিবীর সবথেকে শক্তিশালী মানুষ মনে হতে লাগল। পতিতবাবু নিজের মনে অস্ফুটে হাসতে লাগলেন। তারপর পিস্তলটিকে যথাস্থানে রাখতে যাচ্ছেন এমন সময় তার চোখ পড়ল মাটিতে। যেখানে তির্যক চাঁদের আলো আছাড় খেয়ে মাটিতে পড়েছে ঠিক সেইখানটাই। ঠিক সেইখানটাই শুয়ে আছে করুনা। তাকে এই শুক্লপক্ষের চাঁদের আলোয় একটা হিংস্র অজগর সাপের মত দেখাচ্ছে। রাগে , ঘৃণায় পতিতবাবুর গা রি রি করে উঠলো। তাঁর চোখ দু’টো ক্রমশ রক্তবর্ণ হয়ে হিংস্র থেকে হিংস্রতর হয়ে উঠলো। মাথার ভিতরটা কেমন দপদপ করতে লাগল। চোয়াল দুটো ক্রমশ শক্ত হয়ে উঠলো। তিনি দিক বিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে পড়লেন। তাঁর হাত ক্রমশ পিস্তলটাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে লাগল।।

আপনার মতামত জানান