সব ট্রেন থামে না স্টেশনে

সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়


কদিন ধরে বাবা একদম কথা শুনছে না। পায়ের ফোলাটাও কমার কোনও নাম নিচ্ছে না।এবং যথারীতি পাশবালিশ জড়িয়ে বিচ্ছিরি ভাবে পা মুড়ে শুচ্ছে,হুড়ুদ্দুম করে সিঁড়ি দিয়ে নামছে,এই এখুনি উঠোনে নেমে গাছে জল দিচ্ছিল।
-তুমি কি কারোর কোনও কথা শুনবে না ?
-আরে রাগ করিস না,এদিকে আয়।দেখ।মন ভাল হয়ে যাবে।
-কী?
-এই দেখ...দেখেছিস?
উঠোন ভরে বাবার অনেক গাছ,রোজ তাতে জল দেয় । দুখানা শুকনো গাছের ডালে কচি কচি দুটো পাতা এসেছে...বাবার চোখে মুখে এক উজ্জ্বল দীপ্তি...
-দেখেছিস?গাছগুলো কিন্তু মরে গেছিল।তাও আমি রোজ জল দিতাম।দেখ,সেই দুটো পাতা বেরোল তো ?
বকতে গিয়েও আর পারলাম না, মরা মানুষকে বাঁচিয়ে তোলার মত আনন্দ ...থাক!ওটা ভাঙলে পাপ হবে।
মাসখানেক পেরিয়ে গেছে আমি এ বাড়িতে।মধ্যিখানে দুটো বছরের বেশ কিছুদিন বিবাহ সূত্রে অন্য বাড়িতে কাটালাম। ব্রেক দরকার ছিল।সংসারের কূটকাচালি থেকে দূরে,রান্নাঘর বসার ঘরের প্রতিযোগিতার থেকে দূরে... এই এক নিভৃত আস্তানা আমার.. ইট ভেঙে যাওয়া উঠোনের ধার,বড় বড় ঘর,অগোছালো ! এই বাড়িটায় ঢুকলেই আমার খুব কোনও সুন্দরী মেয়ের কথা মনে হয়, যার কোনও সাজ নেই,চুল এলোমেলো,অবিন্যস্ত... যার গভীরে ঢুকতে গেলে,অনেক কসরত করতে হবে...এ যেন এক অন্যরকম সুন্দরী , যার আঁচলে কোনও প্লিট নেই,ভারী বুকের ওপর এলিয়ে পড়ে রয়েছে আঁচল,হাওয়ায় উড়ছে ,যার কোমরে মেদ,কিন্তু তা শাড়ির আঁচলে ঢেকে গিয়ে ভারী সুন্দর...ভারী নরম এক অবয়ব তৈরী করে । যার চোখের দিকে তাকালে মনে হয় কোনো পুকুর ঘাটের শ্যাওলা মাখা সিঁড়ি,পা দিলেই পিছলে পড়ে যাবে কেউ! যার প্রতিটি খাঁজে যেন বাসা বেঁধে আছে আরব্য রজনীর গল্প... কিন্তু সে কোনো শেহজাদী নয়!
এই বাড়িটায় এলে আমার এমন-ই সব মনে হয়।মা বাবা আমায় জিজ্ঞেস করে না কিছুই,কতদিন আছি,কবে যাব!কিছুই না। হাল ছেড়ে দিয়েছে হয়ত,কিংবা একটা বয়সের পর হয়ত আর এতদিকে মাথা দেওয়া যায় না! বা ভেবেছে আমার খারাপ লাগবে।আমিও আর ভাবি না...বেশ ইচ্ছে গোলাপি হয়ে বেঁচে আছি।দায় দায়িত্বহীন, দিন কাটানো শুধু!
বাড়িটার সঙ্গে সঙ্গে মা বাবার ও বয়স বেড়েছে।পাক ধরেছে চুলে। জানলার খড়খড়ি গুলো দিয়ে এখনো নরম আলো ঢোকে ঘরে।এইসব খড়খড়ি দেওয়া ঘরে জ্বর হলে খুব আরাম হত আমার...মা মাথার সরে বসে থেকে জল পট্টি দিয়ে দিত ,আর খড়খড়ি দিয়ে নরম আলো এসে পড়ত আমার বুকে,আর ওই যে ঘুলঘুলি গুলো? ওখান থেকে আলো ঢুকে কেমন ক্রিস-ক্রস খেলত দেওয়ালে! আহ! এসব কথা মনে পড়লে কেমন একটা দুধ দুধ গন্ধ পাই , মনে হয় মা এবার ঠোঁট মুছিয়ে দেবে!
একটা ঘরে এ.সি বসেছে আর তাই ঘুলঘুলিগুলো বোর্ড দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে,ঘরটা আর ভালো লাগে না আমার... বাবা বাড়ি ফিরে শুয়ে শুয়ে বই পড়ে,মাও তাই। কখনো বই,কখনো টি.ভি। বাবা ইদানিং জীবনানন্দ পড়ে খুব। বলে মৃত্যুকে এভাবে আগে তো বুঝিনি।আর তারপর আবার বেরিয়ে যায়, এই মিটিং এই মিছিল ...বাড়ি ভর্তি করে মিষ্টি আসে রোজ,বাবা নাকি কারুর চাকরি করে দিয়েছে,তো কারুর মেয়ের ভর্তি...আর পাঁচজনের মত আমাদের নিজেদের গাড়ি নেই, কিন্তু এবাড়িতে এলে এসব কথা মনে পড়া সম্ভব ই নয় কারুর।কারণ ওই যে,বাবা গাছে জল দেয় সারাদিন,আর মা রান্নাঘর সিরিয়াল বই।ভারী আটপৌরে পরিবার আমাদের...আর বাইরের যার যত ঝকঝকে জীবন,এই বাড়িতে ঢুকলেই সব আলো নিভে যাবে,শুধু জ্বলে উঠবে স্মৃতি আর বিস্মৃতির এক অদ্ভুত খেলা।এতদিন পর একটানা থাকছি তাই সব কেমন নতুন লাগছে আমার, সারা বাড়িময় একটা গন্ধ,নস্টালজিয়ার...আগে মনে আছে,এই ছোট্ট ছাদে ঘুড়ি এসে পড়ত,ছেলেরা তুলতে আসত,আমি খুব বুড়িদের মত বকতাম “খুব যে ছাদে ওঠা,পড়ে গিয়ে হাত পা ভাঙলে কে দেখবে শুনি?” আর ওরাও কেমন ভয় পেয়ে ছুট্টে ঘুড়ি নিয়ে পালাত...আর তারপর-ই ওপার থেকে ভেসে আসত খিলখিল হাসির শব্দ...আমি আর দেখতে পেতাম না ওদের...ছাদের ওপারে তো অপুদের অন্য কোনো দেশ! আমার ও নিজেকে অপু মনে হত ,দুর্গা মনে হয়নি কোনোদিন...ডানপিটে ছিলাম খুব,তবে ইস্কুলে কোনো কথাটি বলতাম না। বড় হতে হতে সব কেমন বদলে যায় , এখন আমি অনেক কথা বলি,আমার বাইরেটা খুব রূঢ় হয়ে গিয়েছে।মায়ের সঙ্গে দিদির সঙ্গে এমনকী ওর সঙ্গেও আমার ঝগড়া লাগে খুব...শুধু বাবার সঙ্গে আমার ঝগড়া হয় না সেভাবে।অনেক খারাপ লাগা,মান অভিমান,এসব হয়।তবে ঝগড়া হয় না খুব।
-বাবা তোমার মনে আছে? এইখানে একটা টগর আর রঙ্গন গাছ ছিল?তুমি অফিস যাওয়ার সময় আমাদের কোলে নিয়ে পেড়ে দিতে,আর ফুল হাতে আমরা ফিরে আসতাম ঘরে?
আরো একটা কথা বলতে গিয়ে চেপে গেলাম,আমরা একটু বড় হওয়ার পর,দিদি পড়ত রাত জেগে,মা বসত সেখানে,তারপর হয়ত ঘুমিয়ে পড়ত সেই ঘরেই,বাবা খুব চাইত আমি বাবার সঙ্গে শুই,কিন্তু আমি খুব মা নেওটা ছিলাম,আর তাই শুতাম না কখনো,আজ এত বছর পর কে জানে কেন চোখের কোলটা ভারী হয়ে আসছে,আর কেমন যেন এক অপরাধবোধ ভর করছে বুকে। আরো বড় হওয়ার পর মাকেও যে খুব সঙ্গ দিয়েছি তা তো নয় । একটা সংসারে থেকে কীভাবে ঠেলে দিয়েছি দু দুটো মানুষকে এক নিঃসঙ্গতার পৃথিবীতে! খুব জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছিল... “বাবা তোমার কষ্ট হত খুব?”
-তুই যেন কী বলছিলি?
-আমি? ওই তো টগর গাছের কথা...
-হ্যাঁ,দাঁড়া উঠোনে আবার একটা টগর গাছ লাগাব।
-কিন্তু আমরা তো আর ছোট্ট নেই।
-ওমা,সেকী কথা,তুই আবার বড় হবি কী করে! তুই তো আমার কাছে এতটুকুই।শোননা কাল সসেজ খাবি?
-তোমার কিন্তু রেড মিট খাওয়া এতটা উচিত নয়।
-কই আর খাই। তোর মা তো মাংস খাওয়াই ছেড়ে দিয়েছে!একা একা খাওয়া যায় নাকি!
আমি চুপচাপ পাশের ঘরে চলে আসি। এই ঘরটাতে ঠাম্মা থাকত। বেড সোরের গন্ধে ভরে থাকত ঘর।মা পরিস্কার করত রোজ। শুধু দায়িত্ব, অসুস্থতা, টানাটানি আর আত্মীয়স্বজনের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া,এই সব দেখতে দেখতেই কেটে যায় কত সংসার।আবার দিন বদলায়,ক্ষমতা স্টেটাস এসবের লোভে আবার ফেরে আত্মীয় স্বজনের মুখ,কিন্তু এই জীবন গুলো বদলায় না আর। কোনো ক্ষমতাই আর বদলাতে পারে না এই জীবন গুলো,বরং উচ্চাকাঙ্খার সমস্ত বীজ ই নষ্ট হয়ে যায়... পুরোনো বাড়ির এন্টিক আসবার পত্রের মত জীবন গুলোর দর বেড়ে যায়,কিন্তু তারা আর তা টের পায় না কোনোদিন।
কিন্তু এসব দেখতে দেখতে বড় হয় যারা,তারা আর এই সমস্ত মুখকে আত্মীয় ভাবতে পারে না, তারা বুঝতে পারে আত্মার যোগ না থাকলে আত্মীয় হওয়া যায় না। তাদের মুখ খোলে,প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায়, শরীরে ঘুরে দাঁড়ানোর এক তীব্র ইচ্ছে জন্ম নেয়! কিন্তু ওই যে...সেই বাড়ি...যে বাড়ি এক এলোমেলো অবিন্যস্ত মেয়ের মত,যার ভারী বুক,লেপ্টে থাকা আঁচল, কোমরে মেদ, সে এই সব বিপ্লবকে গ্রাস করে নেয় , সে শুধু চায় আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি তার আনাচ কানাচ ,তার সোজা হয়ে উঠে যাওয়া গ্রীবা,নিটোল চিবুক,আর হাতে ভর দেওয়া গাল...
আমিও তাই এসব ভাবতে ভাবতে আবার মন দিই,মাটির চির,দেওয়ালের ফাটল,জমে থাকা রঙে আটকে থাকা দরজার ছিটকিনি এসবে...
-বাবা,আমি বাইরে যাব ভাবছি
-বিদেশ?
-নাহ!তা ঠিক নয়,কলকাতায় ভাল লাগছে না কিছু
-কোথায় যাবি? পি এইচ ডি টা কর তাহলে।
-পড়াশোনায় মন নেই বাবা
-তা বললে কী করে হবে।তাহলে গিয়ে কী লাভ।
-লাভ নেই? নতুন শহর দেখব।নতুন সূর্যাস্ত। তোমাকে চিঠি লিখব সেখান থেকে। তুমি তো চাইতে আমি স্কুল টিচার হই।
-ইস্কুল দিদিমণি?(বাবা হাসে) কোচবিহার যাবি তাহলে?
কোচবিহার বাবার বানানো এক স্বপ্ন,যেখানে নাকি আমি নতুন দিদিমণি হয়ে স্কুলে পড়াব। এই গল্পের নায়িকা আমি,বাবা ডিরেক্টর । আর স্ক্রিপ্ট রাইটার আমরা দুজনেই।
-কাগজে একটা এড বেড়িয়েছে।একটা ইন্টারন্যাশ্যানাল স্কুল খুলছে।ওরা নতুন টিচার রিক্রুট করছে।
-দেশে বসে ইন্টারন্যাশনাল স্কুল।ভাল।ইন্টারভিউ দিলি?
-নাহ!দিতে যাব ভাবছি।আগামী সপ্তাহে।ওরা সি ভি টা পছন্দ করেছে।
-আর তোর লেখালিখি?
-করব তো। তুমি যাবে আমার সঙ্গে?
-নাহ!বয়স হয়ে গেল। এখন আর অন্য কোথায় যাব।
-তুমি যে বলতে , তোমার ও ইচ্ছে করে ,অনুপ কাকার সঙ্গে ট্রেনে উঠে অচেনা কোনো স্টেশনে হারিয়ে যেতে?
-হারানোর বয়স নেই আর।
-বাজে কথা...বয়স ভাবলেই বয়স।তাছাড়া এসব কথাবার্তা তুমি আগে তো বলতে না। জীবনানন্দ পড়তে হবে না আর।
- তুইও তো পড়িস।
আমি ঢোক গিলে পাশের ঘরে চলে আসি।না এটা ঠাম্মার ঘর নয়।এটা আমার আর দিদির পড়ার ঘর। এখানে অনেক জিনিষ,আমি মাটিতে মাদুর পেতে বসি। ল্যাপটপ টা খুলে একটা ইন্সট্রুমেন্টাল চালাই, হারিপ্রসাদ চৌরাসিয়া... হংসধ্বনী রাগ...
এত সুন্দর সব সুরকে কেন যে রাগ বলে!আমি হলে অভিমান বলতাম কিংবা অনুরাগ।রাগ কক্ষনো নয়।
চোখ ঢুলে আসে...
অনেক দূরে একটা ট্রেন ছাড়ার শব্দ ভেসে আসে...আমি আর বাবা ছুটতে ছুটতে উঠে পড়ি তাতে... মা, দিদি , ও...সব্বাই স্টেসনে দাঁড়িয়ে হাত নারে....বলে পৌছে খবর দিও। শুধু আমরাই জানি, নিরুদ্দেশে পৌছে গেলে কী আর খবর দেওয়া যায়?
ট্রেন ছেড়ে দেয়... আমরা দুজনেই খেয়াল রাখি জানলার দিকে...অচেনা যেকোনো স্টেশনে নেমে পড়তে হবে...কিন্তু কেউ কাউকে বলব না,এটাই নিরুদ্দেশের সর্ত!
বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে...সেই শ্যাওলা পিছল চোখ, ভারী বুক...আর শাড়িতে ঢাকা পড়া কোমরের মেদ...হাতের ওপর ভর দিয়ে রাখা গাল...আর গুন গুন করা ...হংসধ্বনি নয়...মালকোষ...টগর গাছটায় ফুল এসেছে... এইবার মালা গাঁথবে বুঝি!
পাশ থেকে কেউ উঠে যায়...আমি মুখ ঘুরিয়ে এক ছুটে হাতটা চেপে ধরি!
নিরুদ্দেশের সর্ত ভাঙে...কিন্তু আমি জানি...
অল ইজ ফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার!

মেয়েটি হালকা হাসে...,তার এলোমেলো চুলে এন্টিক আসবাবের গন্ধ, তার চোখ যেন শ্যাওলা মাখানো পিছল পুকুর ঘাটের সিঁড়ি,তার কোমরের মেদ ঢাকা পড়ে থাকে শাড়ির তলায় আর তার ভারী বুকে চাপা পড়ে থাকে যেন আরব্য রজনীর গল্প ,কিন্তু সে তো কোনো শেহজাদী নয়!
অনেক দূরে আকাশে উড়তে থাকা একটা ঘুড়ি ... কাটা পড়ে,উড়তে উড়তে এসে পড়ে একটা পুরোনো বাড়ির ছাদে...দুপুর রঙীন হয়ে ওঠে।বসন্ত এসে যায়! আর নিরুদ্দেশ?সেও ঝুলতে থাকে...ল্যাম্পপোস্টে বাঁধা কালো কালো তারে...ট্রেনের উইসল বেজে যায়...।

আপনার মতামত জানান