মানুষ - নামানুষ

জয়াশিস ঘোষ



খুট করে শব্দ হতেই ঘুমটা ভেঙে গেল। কে যেন একটা সরে গেল বারান্দার দিকে। দরজাটা অর্ধেক খোলা। স্পষ্ট মনে আছে শোয়ার আগে ছিটকিনি লাগিয়েছিলাম। তবে দরজাটা খুলল কিভাবে? মফঃস্বলের ছেলে। এতদিন একটা মেসে থেকে চাকরি খুঁজছিলাম। পার্ক স্ট্রিটের এই পুরনো বাড়িটায় একটা ছোট্ট ওয়েব পেজ ডিজাইনিং এর অফিস আছে। কোম্পানির মালিক আমাকে খুঁটিয়ে দেখে বলল, ‘ওয়েব পেজ ডিজাইনার কলকাতায় কয়েক লাখ আছে, কিন্তু রাতপাহারা দেওয়ার মত বিশ্বাসী লোক বাঘের দুধের মতই দুর্লভ। এখানেই থেকে যাও। তবে রাতে লাইট জ্বালানো বারণ আছে। কেউ যেন না জানতে পারে’। এমনিতেই কলকাতায় বাড়ি ভাড়া পাওয়া খুব কঠিন। তার ওপর পয়সা লাগবে না। অগত্যা আজই লটবহর নিয়ে এখানে ঢুকে পড়েছি। বাড়িটার চেহারা দেখে অবশ্য প্রথমে একটু দমে গেছিলাম। মালিক আশ্বস্ত করেছিল যে ইঁদুর আরশোলা একটু থাকতে পারে কিন্তু সাপ খোপ এই বাড়িতে নেই। মালিকের কথায় ভরসা করার খুব একটা কারণ ছিল না। তাই দরজা জানলা ভালভাবে বন্ধ করে কম্পিউটার খুলে গেমস খেলছিলাম। চেয়ারে বসে দু চোখ লেগে গেছিল। তারপরই এই ঘটনা।
অন্ধকার ঘরে খোলা দরজা দিয়ে পার্ক স্ট্রিটের আলো এসে পড়ছে। কেমন ভয় ভয় করতে লাগলো। পুরনো দিনের অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের ভূত নাকি এখনও এসব বাড়িতে ঘোরাঘুরি করে। তার ওপর দুপুরে চাওয়ালা ছোকরাটা বলেছিল ও একদিন রাতের বেলা পেচ্ছাপ করতে গিয়ে বারান্দায় সাদা জামা পরা কোন বুড়ো লোককে দেখেছে। সেটা মনে পড়ে আরও চাপ খেয়ে গেলাম। ছোটবেলা থেকে দেখা যত ভূতের সিনেমার ভয়ানক ভয়ানক দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠলো। গলা শুকিয়ে গেছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। জল খেতে গিয়ে দেখি বোতলটা প্রায় শেষ। মনে মনে ঠিক করলাম দরকার নেই চাকরির। কোনোমতে রাতটা কাটাতে পারলে কাল মালিককে দুটো খিস্তি মেরে পালাবো। ঘড়িতে দেখলাম সবে রাত দুটো। এখনও অন্তত দুটো ঘণ্টা কাটাতে হবে। ভোরবেলা ভূত প্রেত আসে না। দরজাটা আবার ভালো করে ছিটকিনি দিলাম। সবে কম্পিউটার অন করেছি, আবার একটা শব্দ এলো পেছন থেকে। স্পষ্ট নিঃশ্বাসের আওয়াজ। কোমরের নীচ থেকে পা টা কেমন পাথরের মত হয়ে গেল। পেছনে তাকাতে ভয় লাগছে। যদি কোন বীভৎস মুখ দেখতে পাই? নিঃশ্বাসের শব্দটা ক্রমশ বাড়ছে। ইচ্ছে করছে চিৎকার করে উঠি। কিন্তু মুখ দিয়ে কোন শব্দ বেরোচ্ছে না। ধীরে ধীরে নিঃশ্বাসটা আরও কাছে এগিয়ে আসছে। এবার গলা টিপে ধরবে হয়ত। কোনোমতে মাথা গুঁজে বসে আছি। আজ শেষ দিন আমার। বাবা, মা, দাদা, বউদি, বুল্টি কেউ জানতে পারল না। নিঃশ্বাসটা আমার কানের পাশে এসে হঠাৎ থেমে গেলো।
‘ একটু ফেসবুকটা খুলবে ভাই!’ – কে যেন ফিসফিস করে বলল। আমি চোখদুটো বুজে কোনোমতে বলার চেষ্টা করলাম ‘আমাকে মেরো না, আমি কিছু করিনি। মা কালির দিব্যি’। এবার নিঃশ্বাসটা তাড়াতাড়ি দূরে সরে গেলো একটা ঠাণ্ডা হাওয়ার স্রোতের মত।
-‘ কি ঢ্যামনামি করছ? যখন তখন ওনাদের নাম করতে আছে?’ ঘরের কোনা থেকে একটা বিষণ্ণ সুর ভেসে এলো। যত সাহস আছে, সব এক করে পেছনে তাকালাম। দুটো চোখ ঘরের কোনায় জ্বলজ্বল করছে। ভূতের সিনেমায় দেখা সবুজ বা লাল নয়, মরা মাছের মত ফ্যাকাসে দুটো চোখ। নীচে একটা ধোঁয়ার মত শরীর। একবার মনে হল অজ্ঞান হয়ে যাবো। একবার মনে হল চিৎকার করে কাঁদি। নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখলাম, না মরিনি। নিজের সাহসে নিজেই অবাক হয়ে গেলাম। তারপর যত ঠাকুরের নাম জানি সব আউরাতে লাগলাম।
‘জয় মা দুর্গা, কালী, বিপদনাশিনী, শনি, মঙ্গল, সন্তোষী মা...’। চোখদুটো সারা ঘরে ছোটাছুটি করতে লাগলো। যেন ঝড় উঠেছে। দৃশ্যটা খুব ভয়ঙ্কর। কিন্তু এখন আর তেমন ভয় করছে না। মনে হচ্ছে আমার হাতে দড়িতে বাঁধা একটা নেড়ি কুকুর সারা ঘরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
‘চুপ করো। তোমার কি প্রাণে একটুও দয়া মায়া নেই?’ হাঁপাতে হাঁপাতে ছাদের কাছ থেকে চোখদুটো বলে উঠলো।
‘ আপনি কে? আমাকে মারতে চান কেন?’ আমি ছাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।
‘খামোখা তোমাকে মারতে যাবো কেন? তুমিই তো আমাকে ছুটিয়ে মারছ। একটু বসে দুটো গল্প করলে হত না’।
‘আমাকে পাগলা কুকুরে কামড়েছে? খবরদার বলছি পালান এখান থেকে। না হলে যত মন্ত্র জানি সব এক্সট্রা ভগবানের নাম জুড়ে বলতে শুরু করব’।
‘এই বাঙালীর ঝামেলা! খালি নিজের লোককে বাঁশ দেওয়ার মতলব। পড়তে কোন সাহেবের পাল্লায়। মন্ত্রতে ওরা ভয় পায় না। উলটো করে ঝুলিয়ে রাখতো, তখন বুঝতে! নিরীহ লোক পেয়ে ভয় দেখানো?’ কেন জানি না মনে হল ভুতটা খুব একটা বাজে লোক না। আমি চেয়ারে বসলাম।
‘যা বলার আছে তাড়াতাড়ি বলে কেটে পড়ুন। আর যা বলার দূর থেকে। কাছে এলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে!’
‘ একটু ফেসবুকটা খুলবে?’
‘ যা শালা! ভূতেরাও আজকাল সোশাল নেটওয়ার্ক করছে নাকি? কোন নেট স্যাভি পেত্নি জুটেছে নাকি আপনার?’
‘ভূত বলে গালি দিও না। দুমাস আগে তোমার জায়গায় আমিই ছিলাম এই অফিসে’।
মালিক শালা চেপে গেছিলো। ‘কিন্তু এই অফিসে তো মেয়ের মুখ ও দেখা যায়না!’
‘ফেসবুকেই ওর সাথে আলাপ। রাতের পর রাত জেগে চ্যাট করতাম’।
‘রাতের বেলা লোককে ডিস্টার্ব করার অভ্যেসটা তাহলে আপনার অনেকদিন থেকেই’। আমার এই কথায় ভূতটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‘প্রেমে পড়লে মানুষের ঘুম উড়ে যায়, জানো না?’
‘থামুন মশাই! ওসব ইন্টারনেটে ইন্টুপিন্টু সবাই করে। নেই কাজ তো খই ভাজ! অফিসের পয়সায় বুড়োগুলো পর্যন্ত সলমন খান সেজে আঠারো বছরের মেয়ের সাথে চালিয়ে যায়’। আমি ফোঁস করে উঠি। তিরিশ বছর বয়স হয়ে গেল। এখন রাতের বেলা একটা ভূতের কাছে প্রেমের পাঠ নিতে আমার বয়ে গেছে!
‘মুখ সামলে কথা বল ছোকরা! বুড়ো ছিলাম না আমি মোটেই। চেহারাটা ভালই ছিল’।
‘সে তো দেখতেই পাচ্ছি। গ্যাসবেলুনের মত দেখতে হয়েছেন!’
‘হু! কে ভেবেছিল যে এমন হবে? এভাবে বেলুনের মত উড়তে চাইনি আমি। ভেবেছিলাম বলেই দেব। ওদিক থেকেও সিগন্যাল আসছিল। এমন সময় একদিন শশা খেতে খেতে ডালহৌসির রাস্তা পার হচ্ছি। পেছন থেকে আসা ট্রামের ধাক্কায় উড়েই গেলাম। ওর নাম নিয়েই শেষ নিঃশ্বাসটা পড়েছিল’।
‘কি ক্যালানে মাইরি! আপনি মশাই কবিতা লিখতেন নাকি? কি নাম ছিল মেয়েটার?’
‘আসল নামটা তো জানাই হল না। ফেসবুকের প্রোফাইল নেম ছিল আবার আসিব ফিরে!’
‘ওমনি আপনি জীবনানন্দ হয়ে গেলেন! মেয়েটা নিশ্চয়ই খুব কেঁদেছে!’
‘জানবে, তারপর না কাঁদবে! জানাতেই তো পারলুম না!’
‘খবরের কাগজে বেরিয়েছিল নিশ্চয়ই। সেটা দেখে ...’
‘পল্টু দাস নামে পাঁচ নম্বর পাতার সাইডে একটুখানি খবর। কত লোকই মরছে রোজ কলকাতার রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়ে। ও জানে আমার নাম অলীক মানুষ!’
‘যাহ্‌ শালা! ওইজন্যই ফেসবুকের পাবলিককে একদম বিশ্বাস করতে নেই। অলীক মানুষ এখন লিকলিকে ভূত হয়ে নাকিকান্না কাঁদছে! তা আমাকে কি করতে হবে? তোমাকে নরক থেকে উদ্ধার করে আনতে হবে?’ অনেক আপনি করে সন্মান দেখিয়েছি। এবার সোজা তুমিতে নেমে এলাম।
‘যতদিন না মেয়েটাকে আমার মনের কথা বলতে পারছি, আমার অতৃপ্ত আত্মা এই পৃথিবী থেকে মুক্তি পাবে না! আমি চাই তুমি আমাকে হেল্প কর’।
‘একটা কচি মেয়েকে ভয় না দেখিয়ে শান্তি হচ্ছে না তোমার! ওকে ওর মত থাকতে দাও আর তুমি গুছিয়ে পাতলা হও তো বাপু। বেমক্কা একটা মেয়েকে গিয়ে বলবো একটা ভূত ওর জন্য দিওয়ানা হয়ে ঘুরছে আর সেই মেয়েটা হার্ট ফেল করুক আর কি!’
‘আহা, অন্যরকম ভাবেও তো বলা যায়! মনে কর তুমি আমি সেজে আমার ফেসবুক থেকে মেয়েটার সাথে কথা বললে আর আমার মনের কথাগুলো ওকে জানালে! আমি শুধু জানতে চাই মেয়েটা আমাকে ভালবেসেছিল কি না!’
ভেবে দেখলাম প্রস্তাবটা মন্দ নয়। এক তো পল্টু দাসের ছত্রছায়ায় থাকলে অন্য কোন ভূত আমায় বিরক্ত করবে না। দ্বিতীয়ত আমি জীবনে কখনো প্রেম করিনি। একটা মেয়ের সাথে কথা বলার জন্য যতটা বুকের পাটা দরকার তত বড় বুক আমার নেই। কলেজ পর্যন্ত খেলাধুলো করেই কেটে গেছে । তারপর গরু খোঁজার মত চাকরির জন্য কলকাতার রাস্তায় রাস্তায়। একবার কলেজের মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে ফাংশান দেখছিলাম। হাতে একটা নরম কিছুর স্পর্শে খুব আলোড়িত হয়েছিলাম। অনেকক্ষণ হাত বোলানোর পর দেখি, ওটা পাশের মেয়েটার কাঁধ থেকে ঝোলা একটা লোমওয়ালা ব্যাগ। নারী স্পর্শের ব্যাপারে সেটাই আমার একমাত্র রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। ওরকমই একটা শিহরণ খেলে গেল মনে। বাইরে তখন ভোরের আকাশ লাল। পল্টুদা পাসওয়ার্ডটা বলে অদৃশ্য হয়ে গেল।

(২)

‘কোথায় চলে গেছিলে অলীক মানুষ?’
‘কি হল? চুপ কেন? পালিয়ে গেছিলে আমার থেকে?’
‘দুমাসে একটাও মেসেজ করতে নেই? আমি বোকার মত রোজ বসে থাকি তোমার প্রোফাইল খুলে। যদি একবার অনলাইন আসো! জানো, আমার বিয়ের জন্য ছেলে দেখছে। রোববার ওদের বাড়ি থেকে লোক আসবে। খুব রাগ হয়েছে তোমার ওপর। কথা বলবো না, যাও’।
আমি টেবিলের ওপর আঙুল ঠুকছি। ভাবছি কি লেখা যায় উত্তরে।
‘জীবনে যদি কোনোদিন আর কথা বলেছি তোমার সাথে! বাই’। দুম করে সবুজ আলোটা নিভে গেল। ঘাড়ের কাছে পল্টুদা জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে হাত নেড়ে বললাম, ‘পারব না। এক তো ফ্যাচফ্যাচ করে ভূতের কান্না শোনা আমার অভ্যেস নেই। দুই নম্বর আমি কোনোদিন কোন মেয়ের সাথে ইমোশনাল কথাবার্তা বলিনি। আমার সময় লাগবে।’ পল্টুদা ধরা গলায় বলল, ‘ওর বিয়ে হয়ে গেলে আমার কি হবে?’ ঝাঁঝিয়ে বললাম, ‘বেটাইমে মরার সময় খেয়াল ছিল না? এখন লস্ট কেস হয়ে গেছে। ভুলে যাও’। পল্টুদা ফুস করে একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে কোথায় চলে গেল।
পরের দুদিন না আমি অনলাইন হলাম, না পল্টু দাসের দেখা মিলল। মোটের উপর আমার ঘুমটা শান্তিতে হল। এখন আর পুরনো বাড়িটায় ভয় লাগে না। রোববার দিন একটা ভদকার বোতল এনে সবে দু পেগ মেরেছি, পাশে দেখি পল্টুদা। চোপসানো বেলুনের মত কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে।
‘ কি গুরু? গন্ধে গন্ধে চলে এসেছ? চলবে নাকি একটু?’
‘ বিয়েটা যেমন করে পারো আটকাও ভাই। তোমাকে এক কলসি মদ খাওয়াবো’।
রাজনৈতিক নেতাদের মত আজকাল ভূতেরাও প্রতিশ্রুতি দেয়। লোকটাকে দেখে মায়া হল। নেট অন করলাম। মেয়েটা মেসেজ ছেড়ে গেছে -
‘আজকে দেখতে এসেছিল। ভূতের মত কালো লোকটা। আমি বিয়ে করবো না। বলে দিয়েছি। রাতে অনলাইন এসো। কথা আছে’।
পল্টুদা একটু খুশি খুশি গলাতে বলল, ‘সব ভূত কি কালো হয় নাকি?’ সত্যি বলতে কি, আমারও একটু আনন্দ যে হচ্ছিলো না, তা নয়। কিন্তু প্রকাশ করলাম না। হাজার হোক, অন্যের প্রেমিকা! গম্ভীর গলায় বললাম, ‘ একবার যদি স্বচক্ষে দেখত, তবে ওই কালো হুমদো লোকটাকে দৌড়ে গিয়ে বিয়ে করে ফেলত’।
‘আর অপমান কোরোনা ভাইটি। মনের কথাটা এবার বলে দাও’।
‘তোমার কাছ থেকে এর চেয়ে বেশী বুদ্ধি আশা করাই ভুল। আমাকে আমার মত করে কাজ করতে দিতে হবে। নইলে আমি পারবো না। তুমি বসে বসে আঙুল চোষো’। পায়ে ঠাণ্ডা লাগতে বুঝলাম পল্টুদা পায়ে পড়ার চেষ্টা করছে।
মদের বোতল শেষ করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পল্টুদার ডাকে ঘুম ভাঙল। চোখ কচলে স্ক্রিনের দিকে তাকালাম।
‘হাই অলীক মানুষ’।
‘হাই। এতক্ষণে সময় হল?’
‘আর বোলোনা। মা বিয়ের কথা বলে বলে পাগল করে দিচ্ছে। বিয়ে না করলে যেন জীবন বৃথা!’
‘আর এদিকে যে একজন চাতক পাখির মত বসে ছিল?’
‘বেশ হয়েছে। খবর না দিয়ে দুম করে হাওয়া হয়ে গেলে অমন ই হয়’।
‘আচ্ছা, যদি কোনোদিন শোন আমি মরে গেছি, কি করবে?’
‘বাজে কথা একদম বলবে না। জানো, আমি না একটা মেরুন আর অফ হোয়াইট ভাগলপুরি কিনেছি’।
‘গরু?’
‘এই, তোমার হোলোটা কি? আগে তো বলতে আমায় এই কম্বিনেশনটায় ভালো মানাবে’!
‘আমি তো দেখিই নি কখনো তোমাকে! জানবো কি করে কিসে মানাবে?’
‘আগে যে বলতে তুমি আমায় চোখ বুজেও দেখতে পাও? এমনকি ভেতরেরটা পর্যন্ত...! কি হয়েছে তোমার? গাঁজা খেয়েছ নাকি?’
আমি একবার পল্টুদার দিকে তাকালাম। ড্যাবড্যাব করে গিলছিল। একটু অস্বস্তিতে পড়েছে বোঝা গেল। শালা রাত জেগে রসের গল্প করত!
‘বলোনা, আমি মরে গেলে তোমায় খবর দেব কোথা থেকে? তোমার নাম, ধাম কিছুই তো জানিনা’।
‘মরে গেলে খবর দেবে মানে? চেষ্টাও করবে না! জানোনা, আমার ভূতে ভীষণ ভয়?’ দুটো দাঁত বের করা স্মাইলি এলো।
‘মেয়ে জাতটাই নেমকহারাম। মুখে বলে মরার পরেও ভালবাসবো। কেন? ভূত বলে কি মানুষ নয়?’ পল্টুদা খুব আঘাত পেয়েছে বোঝা গেল। আমি এড়িয়ে গিয়ে বললাম, ‘মানুষ তো নয়ই। চটছ কেন? বেচারি তো জানে না যে তুমি মরার পরেও ওকে ভালোবাসো!’ সে রাতে আরও কিচ্ছুক্ষণ গল্প হল। জানতে পারলাম মেয়েটার নাম সুচেতা। শ্রীরামপুরে থাকে। কলেজ শেষ করে চাকরির পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাগলের মত বিরিয়ানি ভালবাসে। এও জানলাম ওর পোষা কুকুর বৃন্দাবন ডেয়ারি মিল্ক খেতে ভালবাসে। এমনকি, ও লুকিয়ে লুকিয়ে বন্ধুর বাড়িতে ব্লু ফিল্ম দেখেছে সেটাও বলল। শুধু এটা জানতে পারলাম না, ও অলীক মানুষকে ভালবাসে কিনা! সমস্যা হল রাত তিনটের সময় যখন সুচি শুতে যাওয়ার আগে আমাকে একটা ‘কিসি’ দিতে বলল।
‘অসম্ভব!’ আমি পল্টুদার দিকে তাকিয়ে বললাম।
‘চোখ বুজে দিয়ে দাও ভাই’।
‘লজ্জা করে না আপনার? নিজের প্রেমিকাকে এভাবে...!’
‘আরে, তুমি কি আর সত্যি দিচ্ছ? তুমি তো ঠিক তুমি নও! না দিলে সন্দেহ করবে। আমি তো রোজ রাতে অফ করার আগে ওকে...!’
যদিও পল্টুদার কথাটার লজিক ঠিক বুঝলাম না, ভাবলাম লজিকের গুলি মারো। যার প্রেমিকা তার যদি কোনো আপত্তি না থাকে, আমার কি!
‘মুয়াহ!’
আমার জীবনের প্রথম চুমু।
(৩)
পার্ক স্ট্রিটের এই ভৌতিক বাড়িটাকে এখন বড্ড ভালো লাগতে শুরু করেছে। সুচির সাথে আলাপ হওয়ার আগে জানতাম না খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি ভেজার একটা আলাদা মজা রয়েছে। অনেক কিছুই নতুন লাগছে। আমার এই ম্যাড়ম্যাড়ে ডালভাত জীবনে বেশ কিছু পরিবর্তন হয়েছে। অফিসের কাজের ফাঁকে খেয়ে নেওয়ার কথাটা কেউ মনে করিয়ে দিচ্ছে। অফিস থেকে বেরিয়ে সন্ধ্যেবেলা ময়দানে একলা হাঁটছি। ধর্মতলার মোড়ে একা একাই হেসে উঠছি। ইদানীং কবিতাও পড়ছি। সুচিকে দেখার আগ্রহটা দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে। সুচি বলে দেখা হয়ে গেলেই সব রহস্য চলে যায়। ইচ্ছে করছে দৌড়ে চলে যাই।আমি অস্থির হয়ে উঠেছি। আর একজনও অস্থির হয়ে উঠেছে। পল্টু দাস। শুধু অস্থির নয়, আজকাল আমাকে সন্দেহ করতেও শুরু করেছে। এই তো সেদিন, দুপুর দুপুর অফিস ছুটি নিয়ে একটা সিনেমা দেখতে গেছি। ফেরার পর নাটক হয়ে গেল।
‘আমি বুঝিনা ভাবছিস? লুকিয়ে ঠিক দেখা করে এসেছিস ওর সাথে!’
‘বেশ করেছি। দেখা করেছি। ফুচকা খেয়েছি। প্রেম করেছি। কি করবে আমার করো!’
‘বলে দেবো ওকে যে তুই ওকে মিথ্যে কথা বলে ফাঁসিয়েছিস। আসল অলীক মানুষ মরে গেছে’।
‘ছেঁড়া গেছে! এক্ষুনি যাও। মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত। আর যদি ও কোনোভাবে এই খবর পায়, তবে কি হবে জানো তো? প্রোফাইল ডিলিট করে কেটে পড়বে। তখন মোমবাতি নিয়ে ঘুরো!’
আমি জানিনা প্রেমে পড়েছি কিনা। তবে এটা বুঝতে পারছি পল্টুদার এই ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলে গোয়েন্দাগিরি করাটা আমার মোটেই পছন্দ হচ্ছে না। আজকাল অফিস থেকে বেরিয়ে ধর্মতলার ওখানে একটা সাইবার ক্যাফেতে মাঝেমাঝেই যাই। পল্টু দাসের নাকের ডগায় বসে সব কথা বলা যায় না!
‘আজ যদি নিজের নাম না বলো, আনফ্রেন্ড করে দেবো’। সুচি আল্টিমেটাম দিলো। এতদিন অনেক চাপাচাপি করা সত্ত্বেও পরিচয় জানাইনি। কি পরিচয় জানাবো? আমি কে? সত্যি বললে যদি চলে যায়? সুচিকে হারানোর ভয় পাই। পাশ থেকে পল্টুদা বলছে, ‘ এই সুযোগ। জানিয়ে দে ওকে’। আমি একটু রেগে গিয়ে বললাম, ‘ কি বলবো? পল্টু দাস? এটা একটা নাম হল? এই নাম শুনলে কোন মেয়ে প্রেমে পড়ে?’
‘আমার প্রেমিকা। আমি বুঝবো। যেমনই হই, সুচি আমাকেই ভালোবাসে’।
‘কি করে বুঝলে? সুচি তোমাকে বলেছে?’
‘কাল রাতেই তো লিখল, তোমায় ছাড়া ঘুম আসে না!’
‘এই তুমিটা যে তুমি, সেটা কি করে জানলে? এই তুমিটা তো আমিও হতে পারি!’
‘হু! সুচির মত মেয়ে তোকে ভালবাসবে? ওই তো দেখতে! বুকের পাঁজরা গোনা যায়! এক লাইন কবিতাও লিখতে পারিস না!’
‘আর তুমি তো রবীন্দ্রনাথের মাসতুতো ভাই! আমার পাঁজরা তো তবু গোনা যায়, তোমার তো হাওয়া বেরিয়ে ফুসসস! সুচি যদি একবার দেখতে পেত তোমার রূপ!’
‘খবরদার! নাম ধরে ডাকবি না! বউদি বল। সুচি আমার। ওর জন্য আমি বহুদিন ধরে অতৃপ্ত বুকে অপেক্ষা করছি’।
‘থামো তুমি! এমন ভাব করছে যেন দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে! ব্যাটা ভূত! সুচি আমার’। ভয়ঙ্কর একটা গণ্ডগোল শুরু হল। পল্টু দাসের চোখগুলো বনবন করে ঘুরতে আরম্ভ করলো। দরজা, জানলা জোরে জোরে খুলতে আর বন্ধ হতে লাগলো। ঝড়ের মত হাওয়া এসে টেবিলের সব কাগজপত্র তছনছ করে দিলো। তারপর একসময় সব শান্ত হয়ে গেল। আমি একবারের জন্যও কোন ভগবানের নাম নিলাম না।
কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। তারপর সুচির মেসেজ বক্সে টাইপ করে দিলাম, ‘আমার নাম ঋত্বিক দত্ত। ছোট একটা অফিসে সামান্য কাজ করি। তোমাকে ভালোবাসি’।
‘এই কথাটা বলতে এত সময় নিলে? তুমি একটা পাগল!’
আজ রাতে ঘুম এলো না। ভয়ে নয়, ভালো লাগছিল জেগে থাকতে। একটা চিনচিনে কষ্ট ও কি হচ্ছিলো? কি জানি?
(৪)
ব্যারাকপুরে গঙ্গার ধারে বসে আছি। ঝিরিঝিরি হাওয়া দিচ্ছে। ধুলোপড়া কলকাতায় আজকাল নাকি বসন্ত আসে না। সুচিকে প্রথমবার দেখে মনে হল, বসন্ত এসেছে কৃষ্ণচূড়ার লাল মেখে। দেখছিলাম। দেখেই যাচ্ছিলাম। গঙ্গার ওপারে সূর্য তখন তার শেষ তুলি বুলিয়ে নিচ্ছে। আজ দিনটা অন্যরকম। আজ সকালে চাকরিটা ছেড়েছি। তারপর একটা মেস যোগাড় করেছি। আপাতত ওখানেই থাকবো। বেরোনোর আগে একটা ছোট্ট চিরকুট লিখে কম্পিউটার টেবিলে রেখে দিয়ে এসেছি -‘চলে যেও পল্টুদা। ভালো থেকো’।সুচি হেসেই যাচ্ছে। হাসির দমকে ওর উড়ে আসা চুলগুলো আমার মুখে এসে পড়ছে।
‘সকাল সকাল নেট খুলেই দেখি বাবুর জরুরি তলব! কি দরকার শুনি?’
‘তোমায় একবার দেখতে খুব ইচ্ছে করছিল’।
‘দেখা হল তো? সব রহস্য শেষ? এবার কি করবে?’
‘রোজ ঘুম থেকে উঠে দেখার বন্দোবস্ত করবো?’
‘ও! তাই বুঝি? তা কি করতে পারো তুমি আমার জন্য?’
‘ভূতের সাথে লড়াই করতে পারি’।
সুচি হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। থাক, আর বলবো না। সব কথা কি বলা যায়। অনেক কাজ। একটা চাকরি যোগাড় করতেই হবে!
ফেরার সময় একটা ক্যাফেতে ঢুকে অলীক মানুষ প্রোফাইলটা বন্ধ করে দিলাম। সুচিকে একটা ফোন করে বললাম, ‘ অলীক মানুষ আর নেই। এখন সে বাস্তব!’
-x-

আপনার মতামত জানান