সাপ

অবিন সেন

ছবি- বিক্রমাদিত্য গুহ রায়

পিছনে বাঁশবন, তারপর মাঠ, ধানক্ষেত তৎসহ তাল-সারি ও আকাশ—এ ভাবেই আকাশের ইজেল জানালার সামনে দোল খায় আমাদের, মনে পড়ার মতো খেলা যে ভাবে, সে ভাবে উরু-বেয়ে হাত স্তনে তারপর বাম-স্তনে তারপর খেলার ছল। বাইরে থেকে বৃষ্টির শব্দ পাওয়া যায়, বাইসনের মতো তার গুরু মেঘ...বাগান ঘেরা একটি মাঠের কথা মনে-পড়ে গেলে অর্থাৎ বাগান ঘেরা একটি বাড়ি, বাড়ির সামনে একটি ফোয়ারা থাকতে পারে অথবা একটি নারীমূর্তি ভাস্কর্য, জানালাতে ছবির মতো পর্দা কিংবা নেহাতই শাদা পর্দা, তাতে বাতাস লেগে থাকে নিশ্চিত ও আউট-হাউস থেকে কুকুরের ডাক ভেসে আসবে নিশ্চয়ই এবং যে আমার গলা জড়িয়ে শুয়ে থাকে তাকে আমি ফুল্লরা বলে ডাকি একটা আংশিক না-চেনার ভঙ্গিমায়। বাগান ভ্রমণ বিলাসের মতো আমার হাত, যা শুধুমাত্র আমি বিহীন আমার হাত ফুল্লরার শরীর ভ্রমণ করত একটার পর একটা শাদা পর্দা সরিয়ে ফ্যালে এবং তারপরেই তার কুমারীত্ব গোছের কিছু একটা মনে পড়েও বা অথবা না পড়লেই আমি বাম হাতে সিগারেট ধরে থাকি, তা থেকে ধোঁয়ার একটা অবয়ব তৈরি হবার সূচনা করে এবং তা কেবলই গান, গানের মতো—বাইরের বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিশে আমাদের বস্ত্র-উন্মোচন করে এবং আমি নিশ্চিত ফুল্লরা গান ভালোবাসে।
ফুল্লরা যে গানটি গাইবে বলে কিছুটা অবকাশ শ্বাসের ভিতর ধারণ করে আমি তা মনে করার চেষ্টা করি কারণ এটা এক ধরনের খেলা, যে খেলা জীবনভোর চলে আসছে আমার, জানি খালেদ বলে আমার এক বন্ধু জানতে চাওয়ার মতো আমার কানের কাছে বিড় বিড় করে একসময় মৃত, তবু আজ খালেদের কথা খেলার ভিতরেই বলে, আমার মনে পড়ল তা কিন্তু উল্লাস নয় কখনোই, যদিও উল্লাসের একটা প্ররোচনা আমার ভিতরে কাজ করছিল সেই সময়, যদিও আভা আমাদের সঙ্গে মেলামেশা করলেও সে ছিল অন্য ইউনিয়নের এবং খালেদ। ঠিক কলেজ ইলেকশনের আগের দিন আভার সঙ্গে রাত কাটাবার পর ভোরবেলা দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেলে পর বারান্দায় আমি আভার ঘুঙুরের শব্দ শুনতে পাই, মনে হয় সে শব্দটা আমার মাথার কাছেই যেন থেমে ছিল, আর আমি কিছু বোঝার আগেই গলায় এক তীব্র বেদনা অনুভব করার পরে আমার ভীষণ পেচ্ছাপ পাচ্ছিল এবং কানের কাছে যেন আভার খল খল হাসি স্বত্বেও আমার হাত বালিশের নীচে থেকে একটা সরু সূচালো সাইকেলের স্পোক(এটার উপস্থিতি আভা জানত না) বার করে এবং সেটা এটি কঠিন মাংসপিণ্ডের ভিতর ঢুকিয়ে দেয়। আলোটা জ্বালতে আমি অবাক হয়ে পড়ি, খালেদ ততক্ষণে মরে গেছে। আভা থর থর করে কাঁপছিল। আমি তখনো উলঙ্গ । বুঝতে পারছিলাম খালেদের সঙ্গীরা কাছেই কোথাও আছে । এবং আমি বুঝতে পারছিলাম আমার কোনো ভয় পাচ্ছে না। আভার প্রতি একটা জান্তব ইচ্ছা আমার জেগে উঠছিল, কিন্তু আমাকে বাঁচায় গান..শুধু গান..ভোরের পাখিদের গান। আর খেলা। জীবনভোর খেলাটা তখনি আমার শুরু হয়ে যায়। নদী থেকে তখন ভোরের স্টিমার ছাড়ছিল। নদীর জলে একটা লাল আলো এসে পড়ছিল..তাতে ধাক্কা লাগছিল নামতা পড়ার মতো ছোটো ছোটো ঢেউ। সে সব ঢেউ এখনো আমার সঙ্গে আছে তৎসহ জানালার বাইরে আদিগন্ত মাঠ ও মাঠের পরে তালসারি সেই তাল-সারির পিছনে তখন বিকেলে মেঘ কেটে গেছে, মেঘের একাধিক তিমিমাছের ভিড়ে লাল সূর্য—সূর্যের আলো ফুল্লরার নগ্ন পিঠে পড়লে আলোকে কেমন পাগল মনে হয়, মনে হয় আমার হাতের সিগারেট শেষ হয়ে গেলে পর আমি জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াবো, দাঁড়ালে আমার, গাছে জল দেবার কথা মনে পড়বে যেমন মা একদিন গাছে জল দিতেন আর সেই সব গাছে জল দেবার আনন্দ। একদিন গাছে জল দেবার সময় মা এক সাপের কঙ্কাল দেখে ভয় পেয়েছিলেন। আমি গিয়ে দেখি হাড়ের মালার মতো অপরূপ সেই কঙ্কাল এবং তার আগায় লকেটের মতো মৃত সাপের মাথা। কতদিন আমি সেই মৃত সাপের অবয়বকে জ্যোৎস্নায় বাগানে চরে বেড়াতে দেখেছি। সেই সব ভয় আর না-ভয়ের দিনগুলি আজ যেন জানালার কাছে লাল সূর্যটার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ফুল্লরার গান আমাকে বসিয়ে রাখে। আমি ফুল্লরার গানের কাছে বসে থাকি। ফুল্লরা যেন গাইছিল
“আমার দিন ফুরালো ব্যাকুল বাদল সাঁঝে
গহন মেঘের নিবিড় ধারার মাঝে”।
গানের কোনো শব্দ নেই, ফুল্লরা মনে মনেই গাইছিল এবং তা আমার মরমে গাছের পাতার মৃদু আন্দোলনের মতো আন্দোলিত হয় তথা আমার সেই বাগান ঘেরা বাড়িটির কথা মনে পড়ে এবার তার পাশে অর্থাৎ সেই ছবির সাথে যুক্ত হয় পাহাড়, পাহাড় ঘেরা বাড়ি, বাড়ির জানালায় শাদা পর্দা। কখনো আউট-হাউস থেকে কুকুরের ডাক শোনা যায়। সেই বাড়ীর পর্দা ঘেরা আধো অন্ধকার কোনো ঘরে ছায়ার মতো কিছু মানুষ যাতায়াত করে। তাদের কথায় কথায় বিপ্লব। হ্যাঁ বিপ্লব। তারা মদ্যপান করতে করতে বিপ্লবের কথা বলে। ঘরে চুরুটের ধুঁয়া। মাঝে মাঝে দু একটি মেয়েও(মহিলা) আসত, তাদের সাথেও বিপ্লব, দু-একটা হাত বন্দুক। খালেদ তখন রুলিং পার্টি করত, আমি ছাত্র-পরিষদ। বিষ্ঞুপুরের কাছা কাছি একটা বা সেই করমই কোথাও বা কোনো এক গ্রামে আন্ডারগ্রাউন্ড। আমি তার পরে। খালেদ মরে যাবার পরে।
ফুল্লরা মনে হয় উঠে পড়ল বিছানা থেকে। আমি তার আবছা ছায়া দেখতে পাই দেওয়ালে। ছায়ার কি নগ্নতা বোঝা যায়? তার পেট ঈষৎ স্ফীত এবং সে হাসলে তার ছায়া দেখে তা আমি মোটেই বুঝতে পারি না। কে বা পারে ? মানুষ যদিও হাসে, মানুষের ছায়া হাসে না আর আমি সেই ছায়া লক্ষ করে হাতের মুদ্রায় একবার ফায়ার করি অথচ সেটা আমার অভিনয় বলে মনে হয় নিজেরই। মনে পড়ে কোনোদিন বিপ্লবী ছিলাম আমি।
ফুল্লরা আমার কাছে অনেকদিন আছে, তবুও মাঝে মাঝে তাকে আমার অচেনা মনে হয়—কারণ জীবন বাস্তবিক খেলা এবং তৎসহ শেষ পর্যন্ত খেলাই। আমি সেই যে বিষ্ঞুপুর না সেইরকমই কোথাও একদিন ও অনেকদিন ছিলাম অর্থাৎ থাকার প্রয়োজনে আমি মেয়েদের বিষয়ে প্রেম পরকীয়া ও বিপ্লব আবিষ্কার করি । এবং তা একদিন ঘুড়ি ওড়াবার মতো ছিল। যেমন সে সময়েই প্রথমবার আমি টিচার ফিফটি পান করবার বিলাসিতা পাই, তার আগে পর্যন্ত যা কিছু তা ও রয়্যাল স্ট্যাগ পর্যন্ত। তবু ঘুড়ি ওড়াবার বিলাসিতা বই আশ্চর্য কিছু নেই। নারীশরীরও না! সেই সময়েই কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের মতো আমি আবিষ্কার করি। দেখি অঢেল আকাশের বুকে আমার ঘুড়ি ভাসে সে ঘুড়ি আমার হৃদয়ের মতো বাতাস-বাহী--। তখন কোনো কবিতার কথা আমার মনে পড়েছিল। এবং কথোপকথন
--তুমি কবি ?
না। ( “না” টা আসলে কেউ শুনতে পায় না, কারণ সেটা ছিল না ও হ্যাঁ’র মাঝে হ্যাজাক লন্ঠন!)
--তুমি বিপ্লবী ?
একবার কোঁত পেড়ে যেন বহু গর্ব্বযন্ত্রনা পেরিয়ে—হ্যাঁ !
--তুমি খুনি ?
তখনি দেখলাম চারিদিকে ভাঙা ফুলদানি সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
ফুলদানি ও ফুলের জীবন মানুষের মতো না—
তাহা ছায়া সদৃশ—
একের পিঠে একাধিক আরোহোন করত,
একদিন কমলালেবুর মতো উন্মোচিত হতে হতে
সন্ধ্যার আশ্চর্য পেরিয়ে মাঠের দিকে নামে..
সেখানে ফড়িঙের গায়ে মাটি ও ফসলের গন্ধ..
সেই সব আদিম গন্ধ বাজুবন্ধে বেঁধে
কোনো একজন প্রেমিক ছিল যে, বিপ্লবী হবে...
এবং খুনি...

ফুল্লরা আমার স্কুল মাস্টারের মেয়ে। আমার এমনটাই মনে হয় মাঝে মাঝে। মনে হয় কোনো একদিন তার সঙ্গে আমার আলাপ হয়ে যায় অথবা আমি তাকে চিনি না, না চিনলেও এতোগুলো গুচ্ছ গুচ্ছ সময় নেহাত কম নয়, তার থেকে কিছু স্মৃতি মাইনাস করলে যদিও আমরা ডাইনোসরের ডিমের কাছাকাছি পৌছব না তথাপি হৃদয় একদিন বলিভিয়া ভ্রমণের সুখ লাভ করে এবং চে নামক এক বিপ্লবীর সঙ্গে দেখা হবে, যদিও আমি না-কম্যুনিস্ট তবু বিপ্লব মানে যা, তা বলিভিয়া, কিউবা, আফ্রিকা, আমেরিকা, ভারতবর্ষ সব একই ও কৃষকের লাঙলে অনুশাসনের মতো ফসলে তা ক্রমশ ফলবতী—তখনই মনে পড়ে আমার সেই বাড়িটি হয়তো কিউবায় নয়তো আর্জেন্টিনায়। ওকোম্পোকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আমার মনে পড়ে..” আজিকার দিন না ফুরাতে/হবে মোর এ আশা পুরাতে”—
ফুল্লরা এবার আলো জ্বালালে ছায়াকে বাঘের মতো মনেহয়, ব্যাঘ্র শিকারের মতো আমি কি ঝাঁপাবো..ফুল্লরার চুল খোলা, এবং তা ঘাড় পেরিয়ে পিঠ অবধি মনে হয় তার মাথার চারপাশে মশাল জ্বলে ওঠে, তার গলায় হাড়ের মালা—সেটা কি সেই সাপ! সেই মৃত সাপ! সেই মৃত সাপের কঙ্কাল ? আমি ঠিক ঠায়র করার আগেই মহিলা খল খল করে হেসে ওঠে..আমি তার নাম মনে করতে পারি না!
এবং এ ভাবেই বিস্মৃতির মাদুর বুনতে বুনতে ও পলাতক থেকে বুয়েনোস এয়ারিস না হলেও, লাটাভিয়া না হলেও তা বাঁকুড়া কি কমলপুর অথবা এমনি কিছু যা পরে খবর পাই পুলিশ আমার বিরুদ্ধে চার্জ গঠনই করে উঠতে পারেনি...আভা জড়িয়ে গিয়েছিল(সে পলাতক, বলে জানি), তথাপি মাথায় গামছা বেঁধে ‘শুধু বিঘা দুই ছিল মোর ভুঁই’, এখন বর্ষায় সব ভণ্ডুল হয়ে যায়। বাইসনের মতো মেঘ আবার বাইশে শ্রাবণের আকাশ দাপিয়ে বেড়ায় আজ...আমি তার কোনো কুল কিনারা করে উঠতে পারি না। অর্থাৎ কোনো লজিক! আভাকেও পুলিশ খুঁজে পেলো না...অথবা আমার প্রতি আভার প্রতারণার কোনো লজিক আজ এই বর্ষার দিনের মতো অস্পষ্ট এবং সেটা আঁকড়ে ধরার মতো করেই বাঘিনী শিকার তথা ফুল্লরাকে উন্মোচন...কিন্তু আমি তাকে ঠিক চিনতে পারি বলে মনেহয় না..সে আমার স্কুল মাস্টারের মেয়ে বলে পরিচয় দেয় এবং কোনো অলীক কারণে সমস্ত অভিলাষ নিয়ে আমার উপরে সে ঢলে পড়ে..এবং সেই থেকেই আমি তারে চেনার চেষ্টা করি...কিন্তু গতবছর যখন মা মারা গেলেন , সেই থেকে কেমন এক মায়া মায়ায় ভরে থাকে মন...কোথায় বিপ্লব ? একবার ক্ষমতায় এসে গেলে বিপ্লবীর মৃত্যু ঘটে যায়, তখন কেবলই মনে পড়ে নিজের দিকেই যেন নিজের রিভলভার তাক করা আছে...যেটা এককালে কোমরে গোঁজা থাকত এমনকি দেহ-মিলনের পূর্বে প্রাক-শৃঙ্গার পর্যন্ত এবং ভালোবাসা-বাসি পর্বেও খুনির মতো মনে হত...
যদিও ফুল্লরা এখন রান্নাঘরে গেল..গ্যাস জ্বালবে..গ্যাসের লাল আগুনে তাকে আবিষ্কারের মতো মনে হবে এই ভেবে আমি সিগারেট ধরিয়ে সেই পাহাড় ঘেরা—বাগান ঘেরা—শাদা পর্দা দেওয়া বাড়ির বারান্দায় এসে দাঁড়াই। আউট-হাউস থেকে মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক ভেসে আসে। সেই কুকুরের হাড় ও কঙ্কাল একদিন আমি অন্ধকারে স্বপ্নের ভিতর দেখেছিলুম। এখন তার ডাক শোনা যায়....বাইসনের মতো মেঘের গর্জন মনে হচ্ছে জ্বরের সময় ফুল্লরা আমার মাথার কাছে বসে..থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর দ্যাখে আমি ফুল্লরার স্তন দেখতে পাই..হাত দিলে তক্ষুনি তা ওকোম্পোর স্তনের মতো হয়ে যাবে আর মনে পড়বে শুধু গান..ডাইনোসর ও বিপ্লব। এবং সেই প্রথম ফুল্লরার প্রতি শরীর ব্যতীত আমার আংশিক প্রেম জেগে ওঠে..প্রেম যে আংশিক সেটা বাথরুমে প্রস্রাবের সময় ব্যতীত মনে পড়েনা কারো..আমারও। অথচ ফুল্লরা বিহীন কোনো আশ্রয়স্থল নেই আমার। মাও—চে—কিংবা কোনো কংগ্রেসি নেতাও না..। আজকাল তাই সেই নগ্ন নারী-ভাস্কর্যের কাছে কিংবা ফোয়ারার কাছে দাঁড়ালে একাকীত্বের বোধ তৈরি হয় এবং মনে হয় যেন অনবরত টেলিফোন বাজে তথাপি কথা বলার জন্যে আভা—কিংবা ফুল্লরা—কিংবা সেই মৃত সাপের কঙ্কাল!
রান্না ঘর থেকে ফুল্লরা ডাকলে আমার হাত থেকে সিগারেট পড়ে যায়। সেই ছড়িয়ে পড়া ছাই মাড়িয়ে আমি আমি রান্না ঘরে গেলে দেখি রান্না ঘরের মেঝেয় একটা লিকলিকে সাপ কিল বিল। কিল বিল।
কিল বিল।
কিললললললল। বিললললললল।
সেই মৃত সাপের কঙ্কাল যেন চামড়া ও মাংসের পোশাক পরে নিয়েছে। ঘরের এক কোনে থর থর করে কাঁপছে ফুল্লরা, না আভা....অবিকল সেই খালেদের খুন হবার রাতের মতো—ভোর রাতের মতো থর থর করে কাঁপে...কে..?
আভা ? ফুল্লরা ?
একেবারে অবিকল !

আপনার মতামত জানান