নীলাঞ্জনা

সামিউল আজিজ সিয়াম


‘আপনার নাম কি সত্যি নীলাঞ্জনা? আপনিই কি নচিকেতার প্রথম প্রেম?”
নীলাঞ্জনা আমার দিকে চোখ তুলে তাকালো একবার। যেন এমন অদ্ভুত প্রশ্ন আগে কখনোই শোনেনি। ‘বিস্ময়সূচক দৃষ্টি’ ব্যাপারটা এতো সুন্দর কিছু হতে পারে জানা ছিল না। মনে হচ্ছিল এমন আরো কিছু উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করে বার দুয়েক বিস্মিত করে দিই, আরো কিছুক্ষণ ওই প্রাণঘাতী চাহনিতে মাখা থাক এমন মিষ্টি বিস্ময়!
ওর তাকানোর ভঙ্গিতে ভুল নেই। আমি নিজেও হয়তো কখনো কাউকে এমন অদ্ভুত প্রশ্ন করিনি। নিজেকেও করিনি বোধ হয়।
শুধু প্রশ্ন কেন, আরো অনেক অদ্ভুত কিছুই তো কখনো করা হয়নি এর আগে। কলমের পেছনের দিকটা মুখে নিয়ে ইতস্ততভাবে কামড়ানোর মতো নির্দোষ বিশেষত্বহীন এক দৃশ্য কি কখনো চোখেমুখে এমন মুগ্ধটা মেখে দেখেছি এর আগে? রোমান্টিকতম কবিটার চোখেও হয়তো বড় সাদামাটা এক দৃশ্য, অথচ আমি এমনভাবে দেখছিলাম যেন ভোরের আকাশে শুভ্র মেঘের লুকোচুরির খেলা দেখছি। যেদিকে তাকিয়ে থাকলে একটু যেন ধার নেয় আকাশের বিশালতা।
খুব সহজ একটা ফর্ম, পূরণ করতে কোনো পয়েন্টেই সন্দেহ থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু পূরণ করার আগে নীলাঞ্জনা এমনভাবে পড়ে নিচ্ছিল যেন ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন হাতে পেয়েছে। খুব ভালো প্রিপারেশন নিয়েও আসার পরও প্রশ্ন কঠিন হয়ে গেছে, চাহনিতে তাই একটু আধটু বিরক্তিমাখা মনোযোগ। প্রশ্নের উত্তরও তাই করছে সাবধানে। যেসব প্রশ্নের উত্তর জানা আছে সেগুলো আগে দাগাচ্ছে, যেগুলোর জানা নেই এড়িয়ে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে কলম মুখে দিয়ে চিন্তাভাবনা করছে। এমনকি নামটা লিখতেও কয়েক সেকেন্ড মুখে কলম নিয়ে ভাবতে হলো। কি ভাবছিলো কে জানে, এতো সুন্দর নামটা এই মলিন ফর্মে লেখা যায় কিনা, এটাই কি?
আমি তখন ভাবছি, সামান্য একটা কলমের কি সৌভাগ্য! ঐ ঠোঁটের স্পর্শ পেতে কত দীর্ঘশ্বাস পড়েছে কে জানে, অথচ পাচ টাকা দামের ওই কলম কি ভাগ্যই না করে এসেছে।
ফর্মে নামটা সে লিখলো সবার শেষে। সেরাটা শেষের জন্য তুলে রাখার নিয়ম আছে বলেই কিনা কে জানে। চোখ দুটো সেই কখন থেকে আটকে ছিল ওই চাহনির কারাগারে। সেখান থেকে কয়েক মুহূর্তের জন্য জামিন নিয়ে তাকালো ওই কাগজের টুকরোটার দিকে, যার প্রতি তার সব মনোযোগ আর যার প্রতি আমার শুধুই হিংসা। নামের ঘরে সেখানে গুটিগুটি অক্ষরে লেখা, ‘নীলাঞ্জনা’।
হাতের লেখার প্রশংসায় সবাই মুক্তোর উদাহরণ টানে। ব্যর্থতায় ভরা আমার লেখনী ওই লেখার উপমা দিতেও ব্যর্থ। মুক্তোতে আমি সেই লেখার মতো স্নিগ্ধ কোনো সৌন্দর্য কখনো পাইনি, নাহলে বাজারে বুঝি মুক্তোর দামটাই বেড়ে যেতো এরপর!
ঠিক তখনই অমন অদ্ভুতূড়ে প্রশ্নটা করলাম। ওই মুহুর্তে মনে হয়েছিল, হাজার কবিতা যদি বেকার হয়েই থাকে, তা এমন কারো জন্যই হওয়ার কথা!

খুব ভুল কি মনে হয়েছিল? স্নিগ্ধ মেঘের মতো বিস্ময়ভরা ওই চাহনির পর ঝনঝনিয়ে বৃষ্টির মতো যেই হাসিটা নেমে এলো প্রথমে চোখ থেকে গড়িয়ে এরপর ঠোঁট বেয়ে, তাতেই বুঝে গেছি, সে ধারণায় বিন্দুমাত্র ভুল নেই।
কাস্টমার কেয়ারের এই অফিস থেকে যথাযথ ‘কেয়ার’ নিয়ে নীলাঞ্জনা চলে গেল। ঠিক সামনের চেয়ারটা থেকেই উঠে হেটে গেলো দরজাটার দিকে। অথচ আমি যে তখনো শুনতে পাচ্ছি নুপূরের রিনিঝিনি শব্দের মতো ওই হাসি!
এমন তো হওয়ার কথা ছিলনা।
নীলাঞ্জনার ঠোঁটের ছোয়া পাওয়া কলমটা তখনো পড়ে আছে মুহূর্তের মধ্যে রিক্ত হয়ে যাওয়া এই টেবিলে। কলমটা আমাকে বিদ্রুপ করছিলো কিনা মনে নেই। করলেই বা কি, প্রেম নামক প্রাণনাশী ঝড়ে যে মুহূর্তেই সব হারিয়েছে তাকে কিছুই ছুয়ে যায়না। বিদ্রূপও না।

২.
মাথায় গন্ডগোল হলে কেউ পাগল বলে, কেউ বলে উন্মাদ। মনে গন্ডগোল হলে কি বলে জানা ছিলনা। প্রেমিক? তাহলে প্রেম মানে কি নিতান্তই মনের গন্ডগোল? এতসব ভেবে মাথার প্যাচটা আরো বাড়ছিল দিন দিন। মাথার প্যাচ ছুটোতে গেলে লাগছিল মনের প্যাচ।
মস্তিষ্কের নিউরনগুলো পকেটে অবহেলায় রাখা হেডফোনের মতো প্যাচিয়ে গিয়ে বিচ্ছিরি কিছু হয়েছিল বোধ হয়। নাহয় কেনই বা টানা তিনরাত অঘুমা কাটবে, মস্তিষ্কের এতোসব স্মৃতির মাঝে মাত্র কয়েক মুহূর্ত দখল করে থাকা এক রমণীর জন্য? অথচ মনে হচ্ছিল ওই মুহূর্তটুকুই জীবন, তার আগের পরের বাকি সবকিছু সেই জীবনের ছায়ার মতো। ওটুকু মেনে নেয়াও যেতো, কিন্তু মাঝে মাঝে যে নিজেকেই মনে হচ্ছিল নিজের অসম্পূর্ণ এক ছায়া। যেন আমাকে কেউ একজন চোখের পাতায় নিয়ে বেরিয়ে গেছে ঘর লাগা কোনো এক বিকেলে।
চেতনার যে তিন রাতে একদমই বিশ্রাম হয়নি তেমনটা নয়। তৃতীয় রাতে কিছুক্ষণের জন্য চোখদুটো অন্ধের মতো এদিক ওদিক হাতড়ে খুঁজে নিয়েছিল ঘুমরাজ্যের দরজা। নবটা ঘুরিয়ে দরজা খুলতেই স্বপ্ন হয়ে অপেক্ষা করছিল নীলাভ বিস্ময়। সেই সমুদ্রের পানি নীল, অসম্ভব নীল। সমুদ্রের পানিতে দু পা ডুবিয়ে বসে থাকা নীলাঞ্জনার শাড়ির নীল রঙ টুকু সমুদ্র থেকেই এসে শাড়িতে ভিড়েছিল বোধ হয়।
আমার পুরো পৃথিবীটা তখন নীলাভ হয়ে গেছে। ওপরে নীলাভ এক আকাশ, ঝড় আসার ঠিক আগমুহূর্তের ঝাঁঝালো সুন্দর এক আকাশ! সামনে নীল সমুদ্র, সমুদ্রের গা ঘেষে বসা রহস্যময়ী কে রমণী। ঘুমের ভেতরেই আমি তখন ভাবছি, সৌন্দর্য বুঝি সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। ঠিক তখনই আমার দু চোখে ফিরে তাকালো নীলাঞ্জনার দুটি চোখ। এমন গভীর নীল আমি ঠিক পাশেই থাকা সমুদ্রেও দেখিনি, যা দেখেছিলাম ওই দু চোখে। মনে হলো যেন ঝড় বয়ে গেল ঠিক এক মুহূর্তে। আকাশ যেই ঝড়ের আভাস দিচ্ছিল এতক্ষণ ধরে, তা দেখে কে-ইবা ভাবতে পারতো, ঝড়টা যে আসলে ওই দু চোখে ছিল!
বাকি রাতটা ঠিক সেভাবে জেগেছিলাম, সর্বগ্রাসী স্রোতে হারিয়ে যাওয়ার ঠিক আগে পাড়ে উঠে এসে যেমনটা বিধ্বস্ত থাকে কেউ। বাইরে তাকিয়ে দেখলাম, আকাশ শান্ত, বাতাসেও চাঞ্চল্য নেই। অথচ আমি জানি, ঝড় ঠিকই বয়ে গেছে।

ঠিকানাটা জানাই ছিল। সে জানায় বিশেষ লাভ ছিল এমনটা বলছি না। কলিং বেল চেপে দরজায় দাঁড়িয়ে নিশ্চয়ই বলা সম্ভব নয়, “আমি মারাত্মকভাবে আপনার প্রেমে পড়েছি। আপনি এখনই কিছু কড়া কথা শুনিয়ে আমাকে বিদায় করুন। তবু মুক্তির রাস্তাটা বলে দিন। আমি পুড়ছি, ভীষণ পুড়ছি। অথচ আমি জানতাম মানুষ নাকি আগুনেই পোড়ে শুধু।”
ফোন নম্বরটাও লেখা ছিল ফর্মে। ফর্মটাও প্রয়োজন নেই, অফিসের কম্পিউটার চাপলেই দিব্যি বেরিয়ে আসে নাম নম্বর ঠিকানা আরো কত সব খুঁটিনাটি তথ্য। ফোন করে নাহয় নাই বা বলা হলো, “আমি শুধু হ্যালো শুনতে ফোন করেছি, আপনি জলদি হ্যালো বলুন আমি ফোনটা রেখে দেই।” তবু নিঃশ্বব্দেও তো কিছু না কিছু ভেসে আসবে। হোক না শুধুই কিছু বৈদ্যুতিক কণা।
ফোনটা তবুও করা হতো না। অভাবটা ইচ্ছের ছিল নাকি সাহসের তা বুঝিনি কখনোই। ভয়টা হয়তো ছিল মুগ্ধতাটা হারানোর। তার পাশাপাশি তার প্রতি জমে থাকা মুগ্ধতাকেও বুঝি ভালোবসেছিলাম ততদিনে। আর একবার ওই কন্ঠ শুনেই যদি প্রেমের ডানা ঝাপটানোর শব্দে উড়ে যায় মুগ্ধতাটুকু? তার চেয়ে বরং রাতগুলো কাটুক নির্ঘুম। কোনো প্রেমিকের সারা রাত জুড়ে সহস্রবার মৃত্যুতেও পৃথিবীতে শোক দিবস পালিত হয়নি একটি ভোরেও! আমার বেলায়ও হবেনা, ক্ষতি কি!
কিন্তু সমস্যাটা যে রাতে নয়, বাড়ছিল দিনে। কিছু লিখতে গেলেই আনমনে আমি একটা নামই বারবার লিখছি ভুল করে, এটা অফিসের কারো কাকতালীয় কিছু বলে মেনে নেয়ার কোনো কারণ নেই। খালি ফর্মের পেছনে একবার কি যেন ভেবে কি ছাইপাশ লিখলাম, পাশের ডেস্কের কলিগ সেই লেখা হাতে পেয়ে জোরে জোরে সবাইকে পড়ে শোনালেন, “ততটা সময় দু চোখে দেখেছিলাম, যতটা সময়ে পরিত্যাক্ত এক নক্ষত্র ইতস্তত জ্বলেছিল হাজারো উজ্জ্বল নক্ষত্রের ভিড়ে।”
কিশোর বয়সে সদ্য লেখা প্রেমপত্র বাবার হাতে পড়ে গেলে ঠিক যেমন লজ্জায় পড়তে হয়, আমার অনুভূতি তার থেকে খুব আলাদা কিছু ছিলনা।
বসও একদিন ডেকে পাঠালেন। আমি কাচুমাচু মুখে বসের রুমে ঢুকে টেবিলের দিকে চোখ রেখে দাঁড়ালাম। একটু আগেই যে ফাইলটা তাকে পাঠিয়েছি সেটা ওই টেবিলেই রাখা। ফাইলে কোনো গন্ডগোল হয়েছে কিনা যখন ভাবছি, তখনই ফাইলের দিকে তাকাতেই ডেকে পাঠানোর কারণ বোধগম্য হয়ে গেলো। ফাইলের ওপর মার্কার দিয়ে বড় বড় করে লেখা, নীলাঞ্জনা! হাতের লেখাটা আমার, নিঃসন্দেহে আমার!

৪.
এই যন্ত্রণা কাটাতেই হয়তো শেষমেশ মোবাইলের কি প্যাডে নম্বরখানা চাপার দায়িত্বটা দেয়া হলো আমার বৃদ্ধাঙ্গুলকে। ওপাশ থেকে নূপুরের রিনিঝিনি শব্দের মতো এক হ্যালো শোনার শিহরণ জাগানো অপেক্ষায় মোবাইলটা কানে তুলে নিলাম। সেই অপেক্ষা কিনা শেষ হলো ‘এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছেনা’ এর মতো নিষ্ঠুর এক বাক্যে! পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর বাক্য, অবশ্যই তাই!
পরদিন যখন ফর্ম থেকে টুকে নেয়া ওই ঠিকানার উদ্দেশ্যে রিকশায় চেপে বসলাম, নিজেকে তখন সত্যিকারেই উন্মাদ মনে হলো। পুরো রাস্তা জুড়ে ‘কি, কেন’ প্রশ্নসূচক শব্দজোড়াই বোধ হয় বারবার শুধু টোকা দিয়েছে মনোজগতে। নিজেকে মনে হচ্ছিল উইপোকা, যাত্রাপথটা যেন আগুনে ঝাপিয়ে পড়ার এক অদ্ভুত প্রস্তুতি!
কাগজের যে বাসার ঠিকানা লেখা, ধানমন্ডির সেই বাসার দরজাটা খুললেন বৃদ্ধমতো এক ভদ্রলোক। ‘নীলাঞ্জনা নামের কেউ এই বাসায় তো বটেই, এই বিল্ডিং এই থাকে না’ এই তথ্যটা শোনার পর কিছু সময়ের জন্য বৃদ্ধকে আমার মোবাইল অপারেটরের সংযোগ দিতে অক্ষমতার কথা জানানো মহিলার চেয়েও অসহ্যকর মনে হলো।উন্মাদ উপাধিখানা নিজের নামের সাথে চিরদিনের জন্য এঁটে দিতে না চাইলে কাউকেই বোধ হয় বলা ঠিক হবেনা, তারপরেও আমি ওই বিল্ডিং এর প্রতিটা ফ্ল্যাটে গিয়েই কলিংবেল চেপে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “নীলাঞ্জনা নামে কেউ কি আছে?”
সেদিন সকালে শুধু পেপারটায় চোখ বুলিয়ে বেরোলে নীলাঞ্জনার খোঁজ পেতে এতো খাটাখাটনির কিছুই করতে হতো না।ফ্রন্ট পেজেই ছাপা হয়েছিল নীলাঞ্জনার ছবি, তার সাথে দাঁড়ানো ছিল আরো কিছু দেশি বিদেশি লোক। নিউজটা এমন- “অবশেষে আটক আন্তর্জাতিক মাদক চোরাকারবারি দল” !
নিউজ পড়েই জেনেছিলাম, মাদক নিজেও নাকি মাদক নিয়ে কারবার করতে পারে। কি চাঞ্চল্যকর এক রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক এক চোরাকারবারদের সাথে বাংলাদেশের দরিদ্র এক মেয়ের জড়িয়ে পড়ার গল্প, অথচ এতোকিছু ছাপিয়ে আমার চোখটা বারবার শুধু ওপরের ছবিটার দিকেই চলে যাচ্ছিল। নীলাঞ্জনার চোখে বিস্ময় আর হাসি দুটোই দেখেছিলাম, বিষাদটাও দেখা হয়ে গেলো! কাগজভেদ করে যেই বিষাদ আমার হৃদয় ছিড়ে কয়েক খন্ড করে ফেলে রেখেছিল স্মৃতির আস্তাকুড়ে, কতটা সময় তাও মনে নেই আজ!

৫.
নীলাঞ্জনার সাথে আবারো দেখা হবে ভাবিনি।
জেল পর্যন্ত আমি কি করে পৌছেছিলাম সেই গল্পটা নাহয় আজ থাক। বন্দির সাথে কয়েক মিনিটের দেখা করার সুযোগটা পায় শুধুই আপনজনেরা, আমাকে সুযোগটা করে দিয়েছিল একটু চেষ্টাচরিত্র আর ওপরমহলের সুপারিশ।
পনেরো মিনিট সময় ছিল, কত কিছুই না প্রশ্ন করা যেতো। একবার বলতে ইচ্ছা হলো, “আপনি কি এখানে একবারও কারো দিকে তাকিয়ে একটু হেসেছেন? আমি নিশ্চিত এই আইন কানুন, পুরো পুলিশবাহিনী সবকিছু আপনাকে ছেড়ে দেবে ওই অতটুকু হাসির জন্যই।”

বলা হয়নি। আমি সময় নিয়েছলাম মোটে তিন মিনিট। কারাগারের এপাশে দাড়ানোর সাথে সাথেই আমার জন্য অপেক্ষা করছিল নীলাঞ্জনার প্রশ্ন, “আপনি এখানে কেন এসেছেন?” দেড় মিনিটের মতো চুপ থেকে আমি বলেছিলাম, “একটা কথা জানতে এসেছি শুধু।” নীলাঞ্জনা এবার দৃষ্টিতে অদ্ভুত এক তীক্ষ্ণতা নিয়ে চোখ তুলে তাকালো আমার দিকে।
“আপনার নাম কি সত্যিই নীলাঞ্জনা? আপনিই কি নচিকেতার প্রথম প্রেম?”
নীলাঞ্জনার চোখে এবার বিস্ময় ছিলনা। আগের মতোই শব্দ করে হাসলো, তবে অনেকটা সময় ধরে। অনেকটা সময় যাকে বলছি, বেশ নিখুঁত পরিমাপেও তা বোধ হয় বেশি হলে ত্রিশ সেকেন্ড। অথচ ওই ত্রিশটা সেকেন্ডকেই কিভাবে আকড়ে ধরে কেটে গেল জীবনের কতগুলো সময়!
নীলাঞ্জনা উত্তর দেবে ভাবিনি। আমাকেই অবাক করে নীলাঞ্জনা উত্তর দিলো সেই প্রশ্নের, “না। আমার নামওতোনীলাঞ্জনা না। তাতে কি আসলেই কিছু এসে যায়?”
নীলাঞ্জনার নীল চোখে সেই এক মুহূর্তে যে বিষাদটুকু ছিল, সেই বিষাদ মেখেই আমার দুচোখ অনেকগুলো রজনী কাটাবে তা জানতাম। বিষাদ টলমল যেই দু চোখে তাকালে যে কেউ এক মুহূর্তের জন্য হলেও ভাববে, তার কিছুতেই কিছু এসে যায়না!
নীলাঞ্জনার সাথে দ্বিতীয় দেখাটাই আমার শেষ দেখা।
বের হওয়ার আগে শেষবার যখন পেছন ফিরে তাকাই, আমাকে অবাক করে দিয়ে নীলাঞ্জনা তখনো হাসছিলো। কতদিনের চেনা সেই হাসি!

আপনার মতামত জানান