পিচার প্ল্যান্ট

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

ছবি- বিক্রমাদিত্য গুহ রায়



নামকরা মেয়েদের স্কুলে পড়ত বিতস্তা । ছিল খেলার মাঠ । একটা প্রকান্ড চেরী গাছ, আর ছিল ডালিম,জামরুল আর আতাগাছ । বড়দির ঘরের পেছনে ছিল লিলিপুল । মাঠের একদিকে গ্রিণ হাউস । স্কুলের দুটো গেট । একটা কেবল সকালে খুলত প্রাথমিক সেকশানের জন্য আর দুপুরে খুলত দুটোই । দুই গেটের মাথায় জুঁইফুলগাছের আর্চ আর গেট পেরিয়ে স্কুল অফিসে ঢোকার মুখে দুপাশে গোলাপের কেয়ারি । কি সুন্দর পরিবেশ ! বিতস্তা ছোট থেকেই এই স্কুলটাকে বড্ড ভালোবাসত । স্কুলের দিদিমণিরাও বিতস্তাকে খুব পছন্দ করতেন ওর মিষ্টি স্বভাবের জন্যে ।

স্কুলের দুটো বিল্ডিং । একটা পুরোণো আর একটা নতুন । পুরোণো বিল্ডিংয়ে সকালবেলায় প্রাইমারীর ক্লাস হয় আর দুপুরে সেকেন্ডারির । নতুন বিল্ডিংয়ে হায়ার সেকেন্ডারির ক্লাস হয় আর সেই সাথে ল্যাব, অফিস সব চলতে থাকে । দুই বিল্ডিংয়ের মাঝে বেশ কিছুটা জমি আছে স্কুলের । সেখানটা বন্ধ করা আছে । ছোট্ট একটা গেটও আছে এবাড়ি থেকে ওবাড়ি যাবার ; টিফিনের সময় ফুচকা-আলুকাবলি ওয়ালারা ঐ গেটের কাছটাতেই হেলান দিয়ে বিক্রি করে সব । কিন্তু সেই গেটটা সচারচর খোলা থাকেনা ।
সারা স্কুল শুদ্ধ সব মেয়েদের মনে একটা ভীষণ কৌতুহল ছিল ঐ পরিত্যক্ত একফালি স্কুল জমির ওপর । একবার মেয়েরা কানাঘুষো শুনেছিল ওখানে নাকি ভূত আছে । সেই থেকে স্কুলের ভীতুমেয়ের দলেরা কক্ষণো ভুলেও ঐ মুখো হত না । আর ডেয়ার ডেভিল মেয়েগুলো টিফিনে ফুচকা খেতে গিয়ে লোহার গেটটার ওপর দিয়ে চোখ রেখে প্রাণপনে চেষ্টা করে যেত যদি বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ে কিছু নতুন গসিপের রসদ সংগ্রহ করা যায় । সেবার সরস্বতী পুজোর আগের দিন অনেক রাত অবধি আলপনা টালপনা দিয়ে দু তিন জন মেয়ে ভূত দেখবে বলে ঐ গেটের ধারে গিয়েছিল অন্ধকারে । তারপর পুজোর দিনকয়েক পর স্কুলে গিয়ে সেই ভূত দেখার সাধ মেটানোর গল্পকে রং চড়িয়ে তিল থেকে তাল করে কি সাড়াই না ফেলে দিয়েছিল ।
একবার শীতের ছুটির পর বিতস্তারা স্কুলে গিয়ে দেখল যে ঐ গেটটা রং করা হয়েছে । স্কুলের আর কোথাও কোনো রঙের ছোঁয়া নেই কিন্তু ঐ গেটটাতে নতুন রং দেখে সকলে অবাক হয়েছিল ; স্কুলে শাস্তি পাওয়ার ভয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন করেনি টিচারদের। বেশ কিছুদিন ধরে ঐ একফালি নো ম্যানস ল্যান্ড নিয়ে গার্জিয়ান মহলে এবং স্কুলের মেয়েদের মধ্যে চাপানাউতোর এতটাই দানা পাকিয়েছিল যে বাধ্য হয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ ঐ গেটটা খুলে ওখান দিয়ে প্রবেশের পথ অবারিত করে দেবার সিদ্ধান্ত নিলেন । সেবার ইষ্টারের তিনদিনের ছুটির পর সকলে স্কুলে গিয়ে দেখল গেটটা খুলে দেওয়া রয়েছে । টিফিনের সময় টিফিন খাওয়া, চোরচোর, কাবাডি সব মাথায় উঠল দিনকয়েক । প্রত্যেক ক্লাসের প্রত্যেক মেয়ে সকালে বিকেলে জনায় জনায় দেখে এসে তবে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচল ।
বিতস্তা গিয়ে মাকে বলল জানো মা? ঐ জায়গাটায় একটা ফ্যামিলি সেমেটরি রয়েছে এখনো
মা বললেন, সে তো হতেই পারে মণিকুন্তলা দেবীর বাবা তো ক্রিশ্চান ছিলেন , ওনাদের পরিবারের সকলের কবরখানা ঐটে
-জানো মা ? মণিকুন্তলা দেবী কত অল্প বয়সে মারা গেছিলেন । ওনার ভাই বোনেদের ও কত ছোট ছোট সব ক্রস দেওয়া সিমেন্টের বেদী করা রয়েছে । ভালো করে দেখলে ওনাদের পুরো ফ্যামিলি ট্রি টা লক্ষ্য করা যায় । ইষ্টার ছিল বলে কত ধূপের কাঠি আর মোমবাতির টুকরো পড়েছিল । আজ আমরা আমাদের টিফিন থেকে একটু করে খাবার রেখেছিলাম সকলের জন্যে ।
-তা বেশ করেছিস ।
-মণিকুন্তলাদেবীর জন্মদিনের দিন আমাদের স্কুল ছুটি থাকে প্রতিবছর । সেদিনটাই তো আমাদের ফাউন্ডেশান ডে । ওনার কবরটা সব চেয়ে বড় ।
-সে তো হবেই । তোকে যবে থেকে এই স্কুলে ভর্তি করেছি তবে থেকে শুনে আসছি মেয়েকে যে বড্ড ভালবাসতেন ওনার বাবা । অত কম বয়সে ওনার মেয়ে মণিকুন্তলা মারা যাওয়ায় উনি এই স্কুল খুলেছিলেন মেয়ের স্মৃতি রক্ষার্থে ।
-বড়দির ঘরে ওনার বিশাল অয়েল পেন্টিং দেখে আমি জিগেস করেছিলাম ওনার কথা । তখন বড়দি বলেছিলেন মণিকুন্তলা দেবী পড়াশুনো করতে বিলেত যাচ্ছিলেন । জাহাজে আপার ডেক থেকে লোয়ারে নামতে গিয়ে ওনার স্লিপডিস্ক হয় । তা অপারেশন করতে গিয়েই উনি মারা যান । মণিকুন্তলা দেবী বিদেশে যাবার আগে যার সাথে বাগদত্তা ছিলেন সেই ছেলেটি হিন্দু ঘরের ছেলে ছিল । কিন্তু মণিকুন্তলাদেবী মারা যাবার কয়েকদিনের মধ্যেই এক্সিডেন্টে মারা গেছিল সে। মণিকুন্তলাদেবীর বাবা তার জন্য ও একটি সমাধি তৈরী করিয়েছিলেন মণিকুন্তলার ঠিক পাশেই ।
-মণিকুন্তলাদেবীর বাবা মেয়ের নামে এই স্কুল তৈরী করেছিলেন আর মণিকুন্তলার অতৃপ্ত আত্মা নাকি এই স্কুলের সাথে ওতোপ্রতো ভাবে জড়িত আছে এখনো ...এ কথা তো স্কুলের মেয়েদের মায়েরা হামেশাই বলাবলি করে । যখনই তোকে ছোটবেলায় স্কুলে আনতে যেতাম তখনই শুনতাম এ গল্প ।
-সেই জন্যেই বোধহয় ভূতের ভয় দেখায় সকলে । আর ঐ সেমেটরির ধারে কাছে এতদিন কাউকে ঘেঁষতে দিত না আমাদের । বিতস্তা বলল
-ধ্যুত ! ভূত বলে আবার সত্যি কিছু হয় নাকি ? দেখলি তো এবার কেমন খুলে দিল, মা বললেন
-জানো মা ? ওনার নাকি খুব গাছপলার শখ ছিল । আর তাই তো প্রতিবছর বর্ষার সময় আমাদের স্কুলে বনমহোত্সব বা বৃক্ষরোপণ হয় ঘটা করে ।
-নে, এবার খেয়েদেয়ে একটু বিশ্রাম করে নে । অনেক বকবক হল । আয় তো, চুলটা ভালোকরে বেঁধে দি । বিতস্তার মা বললেন ।
-কাল তুমি আমাকে স্কুলছুটির সময় আনতে যাবে একবার ? তাহলে তোমাকে দেখাব ঐ সমাধি ক্ষেত্র ।
-তারপর যদি গোরস্থানে গোলমাল হয়?
ওটা গোরস্থানে গোলমাল নয় মা, ওটা সত্যজিত রায়ের গল্প "গোরস্থানে সাবধান" ।
-গোরস্থানের ভার্সান টু টা লেখ তুই তাহলে ঐ নাম দিয়ে..মা বললেন ।
-ওঃ দ্যাট রিমাইন্ডস মি । পরশু স্কুলে একটা ক্রিয়েটিভ রাইটিং কম্পিটিশান আছে, নাম দিয়েছি মা ।
- টপিক দিয়েছে ? মা বললেন ।
-না,কম্পিটিশানের দিনই দেবে ।
-দ্যাখ সেবারের মত যদি গল্প লিখতে দেয় তাহলে আবার প্রাইজ পেতেও পারিস ।
-ধ্যুস্‌ ! প্রতিবার কি আর অত ভালো গল্প হয় ? বিতস্তা বলল ।


আজ বিতস্তাদের স্কুলে বাংলা ক্রিয়েটিভ রাইটিং কম্পিটিশান । টপিক হল হাজার শব্দে পরিবেশ ও প্রকৃতি বিষয়ক গল্প । ফার্স্ট পিরিয়ডে বলে দেওয়া হল । স্কুল ছুটির আগে যখন হোক ঘষে মেজে সাবমিট করতে হবে বড় দিদিমণির টেবিলে । যারা নাম দিয়েছে ইচ্ছে করলে ক্লাস কেটে বাগানে বসেও গল্প লিখতে পারে । মৌলিক গল্প হওয়া চাই । লাইব্রেরী বন্ধ আজ । অতএব কোনো ব‌ই ট‌ই ঘাঁটার স্কোপ নেই ।
একবার ক্লাসঘর তারপর চেরী গাছের ছায়া । আবার ক্লাসঘর তো আবার বাঁধানো লিলিপুলের সিঁড়িতে বসে অনেক মগজ সার্ফ করেও আইডিয়া পাচ্ছেনা বিতস্তা । খানিক পাখির ডাক পোকার বন্‌বন্‌, হাওয়ার শন্‌শন্‌, পাতার খড়খড় শুনল । উদাস মনের ভেতর থেকে একটি লাইনও মাথায় এল না । গতবছর এই মেয়েটাই গল্প লিখে ফার্স্ট হয়েছিল স্কুলে । আগের বারে থার্ড, তার আগের বারে সেকেন্ড । প্রতিবছরই নাম থাকে বিতস্তা ব্যানার্জির সেরা গল্পের পুরস্কারে । দিদিমণিদেরও অনেক প্রত্যাশা বিতস্তার ওপর । কলতলায় গিয়ে জল খেল। চোখে মুখে জল দিল কিন্তু আজ গল্পের কুঁড়েঘরে ঢুকতে তার বড্ড বাধা । গ্রিনহাউসের আনাচেকানাচে সব্বোমাটি মাড়িয়ে এল । দূর থেকে নীচু ক্লাসঘর থেকে টিচার ডেস্কে জোরে জোরে ডাস্টার দিয়ে আওয়াজ করছেন । কখনো বটানির যোগমায়াদির গলার চীত্কার "কথা নয় একদম " । ল্যাবের দিকটা থেকে এইচএস প্র্যাকটিকাল ক্লাসের হাইড্রোজেন সালফাইডের পচাডিমের গন্ধ ভেসে আসছে । ক্লাস ফাইভের দিকটা নিরিবিলি । সব ক্লাসে সেলাই দিদিমণি এসেছেন । নিঃশ্বব্দে ফোঁড় তুলছে মেয়েরা । কিন্তু বিতস্তা গল্পের উঠোনে হোঁচট খেতে খেতে কাবু তখন । কিভাবে শুরু করবে বুঝে উঠতে পারছেনা । হাতের ঘড়ির কিচকিচ শব্দটাও বিরক্ত করছে । মনে মনে ভাবল পাতাটা জমা দিয়ে আসি আর বলি, আমার দ্বারা এবার আর হলনা বড়দি । একটা লাইনও লিখতে পারছিনা কিন্তু বিতস্তা নিজেও জানে যে এক লাইন শুরু করলেই ক্রমে দুই, তিন, চার করে চলতে থাকবে গল্পের রেলগাড়ি । হার মানার পাত্রী সে নয় ।

আজ কেন তার এমন হচ্ছে সে বুঝতে পারল না । এদিকে ফার্স্ট পিরিয়ড গড়িয়ে সেকেন্ড পিরিয়ডের ঘন্টাও যে পড়ে গেল । তখন দশ মিনিটের শর্ট ব্রেক । মেয়েরা সব ক্লাস থেকে বেরিয়ে পড়েছে । বিতস্তা একটু নিরিবিলি চাইল । হঠাত মনে পড়ে গেল সেই পরিত্যক্ত গোরস্থানের কথা । মন্দ নয় জায়গাটা । বেশ নির্জন আর ছায়ায় ঘেরা । বিতস্তা ছুট্টে কাগজ কলম নিয়ে হাজির হল সেই সেমেটারিতে । পায়ের দুধ সাদা কেডস এর জুতোয় মসের সবুজ কার্পেট পেরিয়ে, বিতস্তা ফুঁ দিয়ে একটা সিঁড়িতে গিয়ে বসল , পাছে সাদা স্কার্ট নোংরা হয়ে যায় । স্কাই ব্লু রঙের রিবন দিয়ে বাঁধা বিরুণি দুটিকে হেলিয়ে দিল পিঠের দিকে । একটা মাঝারি মাপের ক্রশ লাগানো সমাধি । ভাবনার খোলাখাতাও মেলে ধরল আর সেই সাথে স্কার্টের ওপর প্লাইউডের বোর্ডে আটকানো দু চারটে লাইনটানা সাদা পাতা । ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়ায় কেমন মাদকতা ছিল । অল্পেই ঘুম এসে ভর করল বিতস্তার দুচোখে । স্বপ্নের সিঁড়িতে গল্প শোনার শুরু সেইখানে ।
কিছুক্ষণ আগে একটা স্মার্ট শাওয়ার হয়ে গেছে । সেমেটারির সিঁড়ি বেয়ে একটা ছোট্ট মেয়ে ফুল দিল সবচেয়ে উঁচু সমাধির ওপরে । বিতস্তা তখন তন্দ্রা আর নিদ্রার সন্ধিক্ষণে ।
গল্প লিখবে একটা ? আমিও লিখি । আমি বলব্, তুমি শুনবে । এখন লিখনা কিন্তু তাহলেই আমি চলে যাব । মেয়েটা কাছে এসে দাঁড়াল বিতস্তার ।
দুহাতে সেই মিষ্টি মেয়ের ফুলের গন্ধ তখনো ভেসে এল বিতস্তার নাকে । মেয়ের কাছে গল্প শুনতে শুনতে বিতস্তার কানে এল অর্গ্যানের মিষ্টি আওয়াজ । কি জানি কেন্? কমন রুমে রাখা অর্গ্যানটাতো মণিকুন্তলাদেবীর ।"ল অফ এসোসিয়েশান" । সাইকলজিতে পড়েছে । স্বপ্নের ঠাস বুনুনিতে অর্গ্যানের শব্দ থেমে গেছে । স্বপ্নের পরত ছিঁড়ে বেরিয়ে এল বিতস্তা কিছুপরেই । এবার লিখে ফেলার পালা । গল্প লেখার গল্প । যা শুনল তাই তো লিখতে হবে এখুনি । নয়ত সব ভুলে যাবে যে । চলতে শুরু করল তার কর্ণিকা । বৃষ্টিতে তুলি ডুবিয়ে যেন সাতরঙা আলপনা আঁকছে পশ্চিম আকাশে । দুকূল ছাপানো আনন্দে আত্মহারা হয়ে লিখে চলেছে মেয়েটা ।
মনের কার্ণিশ বেয়ে বৃষ্টির অবিরত ফোঁটার মত গল্পের ধারাপাত । সেমেটরীর পেছনটায় কলসপত্রী গাছ আছে গ্রিন হাউসে । টুপটাপ পোকা এসে ধরা দেয় তার গন্ধে । ঝুপ করে বন্ধ হয়ে যায় কলসীর ঢাকনা । ফাঁদে পড়ে যায় পোকাটা । বটানি ক্লাসে মিস তো একদিন দেখাতে নিয়ে গেছিলেন দল বেঁধে, লাইন করে । সেদিন তো চাক্ষুষ দেখেছিল কলসগুলো । ছোট, বড় , মাঝারি কলস । লাল ফ্রিলের ঝালর প্রত্যেক কলসীর মুখে যাতে পতঙ্গরা আকৃষ্ট হয়। সাথে আটকানো ইতুর ঘটের মত সজীব ঢাকনা । কি অপূর্ব লেগেছিল বিতস্তার । সত্যি সত্যি ঈশ্বরের সৃষ্টির তারিফ করেছিল মনে মনে । বাংলায় বলে পতঙ্গভুক উদ্ভিদ । ইংরেজীতে বলে পিচার প্ল্যান্ট ; কেউ আবার বলে মাঙ্কি কাপ ; বৈজ্ঞানিক নাম Nepenthes edwardsiana |

থার্ড, ফোর্থ পিরিয়ড শেষ হয়ে টিফিনে ঘন্টা পড়ে গেছে । হুঁশ নেই মেয়েটার । কোথা দিয়ে সময় চলে গেছে । বিতস্তার খোলাখাতার আলতাগোলা আকাশে তখন চুঁইয়ে পড়ছে সূর্যের দুর্দান্ত সব রঙের ফোঁটা । খেয়ালী মন দেয়ালা করে চলেছে নিজের সাথে । কেঁপে উঠেছে কলসপত্রীর কচি কিশলয় গুলো। ছুটির ঘন্টাপড়ার আগেই শেষ হয়ে গেছে । শেষমেশ শব্দ গুনে গেঁথে এডিট করে জমা দিয়ে এসেছে বড় দিদিমণির ঘরে ।


হাজার শব্দে গল্প প্রতিযোগিতার জন্য একটা বোর্ড গঠন হয়েছে । জুরিরা আছেন হেড মিস্ট্রেস নিরূপমাদি, এসিটেন্ট হেড মিস্ট্রেস বেলাদি, বাংলার সিনিয়ার মোস্ট টিচার বন্দনাদি এবং স্কুল কমিটির প্রবীণ সদস্য সেক্রেটরী অমূল্যভূষণ রায় । যতগুলি লেখা জমা পড়েছে তার মধ্যে থেকে সিলেক্টেড শর্ট লিষ্টে রয়েছে বিতস্তার গল্পটি । বড়দির অফিসে স্কুল ছুটির পর সেদিন গল্প কম্পিটিশানের জুরিদের মিটিং । বেলাদি খুব সুন্দর পড়তে পারেন। তাই ওনাকেই বলা হল পাঠ করতে । বেলাদি শুরু করলেন..

গল্পের নাম "আয় বৃষ্টি ঝেঁপে"
বিতস্তা ব্যানার্জি
দশম শ্রেণী খ- বিভাগ
রোল নং ১৯
বৃষ্টি সেবার অধরা । ফ্যাকাসে স্কুল মাঠ, ফুটিফাটা মাটি । যেটুকুনি ঘাস ছিল সেটুকুও হলদে । জৈষ্ঠ্যের শুরুতে গোটা দুই কালবোশেখি হয়েই আষাঢ়ের প্রথম হপ্তায় নিয়মরক্ষা বর্ষার । তারপর আষাঢ়ের চৌকাঠ লাফিয়ে বর্ষা শ্রাবণের উঠোনে লাফ দিয়েছে ভাদ্রের রোদ্দুরকে সঙ্গে করে । ঠিক জৈষ্ঠ্যে যেমন লতাপাতা, পাখ-পাখালি হা-বৃষ্টি হা-বৃষ্টি করে, তেমন জল জল করে পরিত্রাহী রব চারিদিকে । এদিকে গ্রীষ্মের ছুটির পরেই বৃক্ষরোপণ উত্সবের তোড়জোড় চলছে । দস্তুর মত রিহার্সাল চলছে কমন রুমে । বনমহোত্সবের একটা স্ক্রিপট বছর বছর হয়ে আসছে । একটু রদ বদল করে কয়েকটা গান এদিক ওদিক করে নৃত্যনাট্য দাঁড় করানো হয়। সবুজ গাছ লাগানো হয় । খুব উত্সাহে মেয়েরা নাচ গান প্র্যাকটিস করে প্রতিবছর । অনুষ্ঠান শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের গান 'আয় আমাদের অঙ্গনে, অতিথিবালক তরুদল ' দিয়ে আর শেষ হয় 'মরুবিজয়ের কেতন ওড়াও, এ শূন্যে ওড়াও ওড়াও হে প্রবল প্রাণ' দিয়ে । প্রথম দৃশ্যে একদল মেয়ে নেচে নেচে মঞ্চে এসে প্রবেশ করে আর শেষ দৃশ্যে তারাই আবার প্রত্যেকে হাতে একটা করে সবুজ চারা গাছ নিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে এসে খোলা স্কুল মাঠের ধার দিয়ে নেচে নেচে চলে । গাইতে থাকে বাকি সকলে যারা এতক্ষণ ধরে গান পরিবেশন করছিল । নাচের মেয়েদের মেঘ রংয়ের শাড়ি আর সবুজ উড়নি মাথায় । গানের মেয়েরা কচিকলাপাতা রঙের শাড়ি আর মেঘ নীল ব্লাউজে । আগে থেকে স্কুলের মালি যেখানে যেখানে নতুন গাছ পোঁতা হবে তার জন্য মাটি খুঁড়ে নির্দ্দিষ্ট ব্যাবধানে গর্ত করে রাখে । নাচের মেয়েরা নাচ করতে করতে একে একে গাছগুলি সেইখানে রেখে দেয় আর গানের মেয়েরা জলঝারি দিয়ে জল দান করে সেই নতুন গাছের চারায় । এভাবেই হয়ে আসছে বছরের পর বছর ।
কিন্তু খরার সময়ে দুপুরের ঝাঁঝাঁ রোদে, গাছ পোঁতা হবে কেমন করে আর গাছ বাঁচানোই বা হবে কেমন করে । কিন্তু খরা বলে তো আর বনমহোত্সব বন্ধ হতে পারেনা । তাই গাছ না বাঁচলে আবার লাগানো হবে চারা । অন্য বছর মেঘলা আকাশে বৃষ্টি মাথায় করে দুপুর বেলা প্রোগ্রাম শুরু হয় । সেবারে বড়দি বললেন সকাল সকাল রোদের তাত বাড়ার আগেই শুরু করে দিতে । প্রাইমারী স্কুলের ক্লাস ফোরের চারটে ক্লাসরুমের পার্টিশান খুলে পেল্লাই একটা হলে ফাংশন । সেখানেই মঞ্চ । ওপর থেকে লাইব্রেরীর বারান্দা দিয়ে আরো আরো সব মেয়েরা দাঁড়িয়ে গেছে অনুষ্ঠান দেখতে । স্কুলের মালী দিবাকর বকুল,পলাশ করবী, কামিনী , কলকে ফুলের গাছের চারা রেখে গেছে মাঠের একধারে, ছায়ায় ছায়ায় । সকলের খুব মন খারাপ । অনুষ্ঠানের আগে একটুও বৃষ্টি নেই । আগের দিন রাত থেকে মাঠ ভেজানো হয়েছে । ; আবার সেদিন ভোরে।
এবার শেষ গান 'মরুবিজয়ের কেতন ওড়াও ..' গাইতে গাইতে গানের মেয়েরা স্টেজ থেকে নেমে এল আর নাচের মেয়েরা বেরিয়ে এসে একটা একটা করে চারাগাছ হাতে তুলে নিল; নাচের ছন্দে যেতে লাগল মাঠের ধারে । কেউ গ্রিন হাউসের দিকে, কেউ লিলিপুলের পেছনটায় যেখানে কলসপত্রী গাছ আছে । কেউ আবার সেমেটরীর পাঁচিলের ধারে । আটটি মেয়ে একে একে চলল । নবম কন্যা গাছ হাতে নিয়ে নাচতে নাচতে চলল তাদের পিছুপিছু । একটা প্যাটার্ন করে গাছ লাগানো হবে এবার । চতুর্ভুজের চার কোণে চারটে গাছে থাকবে । তারপর সেই চতুর্ভুজের মধ্যবিন্দুতে আরো আরো চারটে গাছ । তাই মোট আটটি গাছ লাগানোর কথা । দূর থেকে মাঠের চারিধারে দিদিমণিরা রয়েছেন ছাতা মাথায় দিয়ে । নাচের মেয়েরা নির্ধারিত মাটির গর্তে একটা করে গাছ রেখে আবার দুহাত জোড় করে প্রণাম করল গাছকে তারপর মাটিতে গড় হয়ে । নবম কন্যাটি গাছ রেখেই কোথায় যেন চলে গেল । সেটি সকলের চোখ এড়িয়ে গেলেও ক্লাস টেনের একটি মেয়ের চোখ এড়াল না । সে দেখতে লাগল মেয়েটা কোথায় যায় । ততক্ষণে সেই কলসপত্রী গাছের কাছে নবম কন্যা গিয়ে বসে পড়ল । আঙুল দিয়ে স্পর্শ করল কলসীর মুখ । বিন্দু বিন্দু রসাল আঠার মত কি যেন লাগল তার হাতের আঙুলে । একবার, দুবার, তিনবার । সেই জলবিন্দু শান্তির জলের মত ছুঁড়ে দিল মাঠের দিকে । কালো মেঘের ত্রিপলে ঢেকে গেছে মাঠ ইতিমধ্যে । মেঘের গুরু গুরু গর্জনে গান আর শোনা গেল না । মেয়েটা কলসপত্রীর কাছেই বসে ছিল । বৃষ্টির আশীর্বাদ ঝরে পড়ল স্কুল মাঠে ।
একরাশ ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটে সব এলোমেলো হয়ে গেল । যেন খুশির তুফান এসেছে নদীতে । আনন্দে সকলে লুটোপুটি খাচ্ছে তখন ।
বড়দি চীত্কার করে বললেন 'তোমরা সব ভেতরে চলে যাও , ক'দিন পরেই পরীক্ষা তোমাদের , বৃষ্টিতে আর ভিজো না'
গানের মেয়েরা তখন সব দিদিমণিদের কাছে বায়না করতে শুরু করেছে .. আমাদের স্পেশাল ট্রিট চাই দিদি । ঐ এক বাক্স খাবারে কিন্তু হবে না । আমরা এমন গান গেয়েছি যে বৃষ্টি নেমেছে..
নাচের মেয়েরা ভালো শাড়ি নষ্ট হবার ভয়ে ইতিমধ্যে দৌড়ে পালিয়েছে ক্লাসঘরে । আর ক্লাস টেনের সেই মেয়েটা তখনো মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে ...ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেছিল বলে আর কিছুই দেখতে পেলনা সে ।
গাছেরা যেন সাড়া দিয়েছে । নেচে নেচে উঠল গাছের পাতা, শাখা প্রশাখা, কুঁড়ি, কুসুম, কেশর, কিশলয়েরা । একেই বুঝি বলে পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে ... ? মেয়েটা ভাবতে ভাবতে কেমন উদাস হয়ে গেল । সে মনের ক্যানভাসে রঙ তুলি নিয়ে বর্ষার সেই ছবি তখন এঁকে চলেছে .. সেই কলসপত্রীর সাথে নবম কন্যাটির সেই অভূতপূর্ব সখ্যতায় বৃষ্টি নামার গল্প । একি সত্যি সত্যি বৃষ্টি হল প্রাকৃতিক ভাবে নাকি কৃত্রিম উপায়ে ? একি মায়া নাকি অলীক বাস্তব ? সিনেমায় বৃষ্টি বানানো হয়, কিন্তু আজ যেটা তার চোখের সামনে ঘটল সেটা কি তবে? মনে মনে বলল, মা বলেছিলেন 'বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর ....সব কিছু বিজ্ঞান দিয়ে ব্যখ্যা করতে নেই ...কিছু কিছু ঘটনা ঘটে যায় , বুদ্ধিতে যার ব্যখ্যা মেলেনা ।
পরদিন বৃষ্টিভেজা সকালে বড়দি মাঠে এলেন রাউন্ড দিতে , নতুন চারাগুলো বেঁচে গেছে আশা করি ভাবলেন মনে মনে । গতকাল নাচের মেয়েরা আটটা পূর্ব নির্ধারিত মাটির গর্তে গাছ রেখেছিল । কিন্তু আটটার জায়গায় ন'টা গাছ কেন? কি করে হল ? মালী বলল 'আমি তো দশটি চারা এনেছিলাম কিনে' আটটি লাগানোর পর দুটি পড়ে থাকার কথা । কিন্তু সেখানে পড়েছিল মোটে একটি । বড়দি ভাবলেন কেউ হয়ত বৃষ্টির সময় লাগিয়েছে । একই বাঁচুক, দুইই বাঁচুক সব কটি চারাই লেগেছে । শ্রাবণের ইতি হোক আর না হোক আজ বর্ষা এসেছে । মেয়েদের বৃক্ষরোপণের উত্সাহে প্রকৃতিও সাড়া দিয়েছে ।
কেউ জানতেও পারলনা সেই বিয়োগফলের রহস্য একমাত্র ক্লাস টেনের মেয়েটা ছাড়া ।

স্কুল সেক্রেটারী অমূল্যভূষণ বাবু স্কুল কমিটিতে আছেন প্রায় বিগত ষাট বছর ধরে । ওনার বয়স অনেক হয়েছে । চাকরী থেকে অবসর নিয়েছেন অনেক দিন কিন্তু এই মণিকুন্তলা বালিকা বিদ্যালয়কে উনি দিয়ে আসছেন অনারারি সার্ভিস । ওনার স্ত্রীও ছিলেন এই স্কুলের শিক্ষিকা । তিনি আজ বেঁচে নেই । নিঃসঙ্গ এই সিনিয়ার সিটিজেনটি স্কুল কমিটির সক্রিয় সদস্য । মেয়েদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার খোঁজ খবর আনা থেকে প্রতিবছর পুরষ্কার বিতরণীতে কি কি ব‌ই দেওয়া হবে, কাকে বিশেষ অতিথি করা হবে এই সব ব্যাপারগুলি উনি দেখে আসছেন এত বছর ধরে ।
বেলাদি গল্পটা পড়া শুরু করা থেকে উনি যেন কেমন উশখুশ করছিলেন । এক একটা জায়গা দু বারও পড়তে অনুরোধ করলেন । কিছুটা পড়ার পর থামিয়ে দিয়ে জল চাইলেন । ইতিমধ্যে বেলাদির বিতস্তার গল্প "আয় বৃষ্টি ঝেঁপে" পড়াও শেষ হয়ে গেছে ।
অমূল্যভূষণ বাবু টেবিলের ওপরে মাথাটা রেখেছেন মিনিট দুয়েক আগে । বড়দি বললেন ' কি হল আপনার? শরীর ঠিক আছে তো?'

অমূল্যবাবু বললেন 'আমার শরীর ঠিক আছে । কিচ্ছু হয়নি দিদি, ব্যস্ত হবেন না । আসলে গল্পটি পড়ার শুরু থেকেই আমি বলতে চাইছিলাম তারপর ভাবলাম্, দেখি শেষ অবধি আগে শুনি তারপর না হয় দেখা যাবে '
বড়দি বললেন 'কেন?' গল্পটা তো ভালই দাঁড়িয়েছে মনে হল ।
আপনারা কোনো বেসিক ফ্ল পেলেন ?
কোন্‌ জায়গাটায় আপত্তি রয়েছে আপনার? পরিবেশ ও প্রকৃতি বিষয়ক, হাজার শব্দে মেয়েটা তো বেশ লিখেছে বলে আমার মনে হল'
অমূল্যবাবু বললেন আমাদের স্কুল লাইব্রেরী কি খোলা আছে দিদি?
বড়দি বললেন 'সে তো দারোয়ানের কাছ থেকে চাবি নিয়ে দিবাকর এখুনি খুলতে পারে। কেন? লাইব্রেরীতে কি আছে ?'
দিবাকরকে একবার ডাকুন এখানে । অমূল্যবাবু বললেন ।
দিবাকর এসে হাজির হল চাবি নিয়ে ।
'আমাদের স্কুল লাইব্রেরীর আর্কাইভে এ যাবত কালে প্রতিবছরে যত গুলি স্কুল ম্যাগাজিনের ইস্যু বেরিয়েছে সেগুলি একবার নিয়ে আসতে হবে' অমূল্যবাবু বললেন ।
বেলাদি বললেন ' মানে স্কুল ম্যাগাজিন 'মৃত্তিকা'র পুরোনো কপিগুলি?'স্কুলের বয়স হল একশ তিন বছর । তার মানে শ'খানেক মৃত্তিকা নিয়ে এতদূরে না এসে বরং আমরাই যাই সেখানে সকলে মিলে । কিন্তু তার আগে বলুন তো কি কারণে মৃত্তিকার প্রসঙ্গ এল অমূল্যবাবু?
তা নয় সেখানে গিয়েই বলব। ভদ্রলোক বললেন ।
দাঁড়াও দিবাকর, আর্কাইভ আলমারীর চাবি তো স্কুলের মেইন চাবির গোছায় থাকেনা । বড়দি বললেন ।
দিবাকর বললে, তাহলে দিদিমণি কোথা থেকে আনতে হবে সে চাবি?
ও চাবি তো আমার ঘরের আলমারীতে থাকে, বড়দি বললেন ।
বেশ, তবে আমরা বাইরে ওয়েট করি বড়দি, আপনি চাবি নিয়ে আমাদের সাথে লাইব্রেরীতে আসুন । অমূল্যভূষণ বাবু বললেন । বেলাদি, বন্দনাদি অমূল্যবাবুকে নিয়ে মাঠের দিকে এগিয়ে গেলেন । কিছুপরেই বড়দি দিবাকরের পেছন পেছন পুরোণো বিল্ডিংয়ে লাইব্রেরীর দিকে এগুলেন ।
দিবাকর পটাপট আলো-পাখা জ্বালিয়ে দিল ।
অমূল্যভূষণ বাবুর স্মৃতিশক্তি প্রখর । আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে মল্লিকা সরকার নামে আমাদের স্কুলের একটি মেয়ে আমাদের ম্যাগাজিন 'মৃত্তিকা'তে হুবহু এমনি একটি গল্প লিখেছিল । আমার বাড়িতে ঐ মৃত্তিকাটি সযত্নে তুলে রাখা আছে কারণ আপনারা তো জানেন আমার স্ত্রী অণিমার অকাল প্রয়াণে ওঁর স্মৃতিচারণায় একটি প্রতিবেদন ঐ সংখ্যাটিতে বেরিয়েছিল । তাই আমি প্রায়ই ঐ ব‌ইখানি আমার ব‌ইয়ের আলমারী থেকে বের করে পড়ি আর গল্পটিও বহুবার মন দিয়ে পড়েছি যে ।
সে তো বহু আগেকার কথা অমূল্যবাবু । অণিমাদি তো অনেকদিন আগে ছিলেন এই স্কুলে । বড়দি বললেন ।

বেলাদি বললেন আমি জানিনা ।
বন্দনাদি বললেন আমি চিনব কেমন করে?
বড়দি বললেন আমিও কি ছাই জানি সে ঘটনা? আমি তো নর্থ বেঙ্গলে ছিলাম । এই খানে এসেছি তারো অনেক পরে । তবে শুনেছিলাম মল্লিকা নামে মেয়েটির কথা । আমার আসার দু বছর আগে হায়ার সেকেন্ডারিতে ফার্স্ট হয়েছিল । মেয়েটা নাকি বটানিতে এমএএসসি পড়ছিল । ত্রিকোণ প্রেমের চক্কোরে পড়ে আত্মঘাতী হয়েছিল ।
অমূল্যভূষণ বাবু বললেন 'দিবাকর, ঐ আলমারী থেকে ১৯৬১ সালে প্রকাশিত 'মৃত্তিকা' খানা বার করত হে '
দিবাকর টর্চ নিয়ে ভেতর থেকে হাতড়ে অনেক কসরতে শেষে বার করে আনল ব‌ইখানি । গ্যামাক্সিন না সাদা গুঁড়ো গুঁড়ো পাউডার লাগা ব‌ই । পোকায় যাতে না কাটে, যাতে উই না ধরে । তাই লাইব্রেরীতে নিয়ম করে টার্মাইট ট্রিটমেন্ট করা হয় । অনেক পুরোণো স্কুল যে । পেষ্ট কন্ট্রোল নিয়ম করে ওষুধ দিয়ে যায় । রুমাল দিয়ে ঝেড়ে পুঁছে বড়দি, বেলাদি, বন্দনাদি সকলে মিলে হামলে পড়ে ব‌ইয়ের সূচিপাতা থেকে বার করলেন ; গল্পের নাম 'মাটির গানে' লিখেছে মল্লিকা সরকার ।
'মেয়েটার কেমন নিষ্পাপ, মায়াবী মুখখানি দেখ' বেলাদি বললেন

বেলাদি বিতস্তার ম্যানাস্ক্রিপ্ট আর মল্লিকার গল্প সম্বলিত মৃত্তিকা খানি নিয়ে বাড়ি চললেন । বড়দি ওনার ওপর ভার দিয়েছেন । দুটি গল্প পড়ে দেখে তবেই বিতস্তাকে ডাকা হবে ।
পরদিন বিতস্তার ইতিহাস ক্লাস চলছে । মালি এসে ক্লাসরুমে বলে গেল 'বিতস্তা ব্যানার্জি, বড়দির অফিসে যেতে হবে এখুনি' বিতস্তার বেস্ট ফ্রেন্ড অনুশ্রী ফিসফিস করে বলে বসল ' শিগ্গিরি যা রে বিতু , আবার ফার্স্ট হয়েছিস, দেখ গিয়ে ' থাম তো তুই , বলে বিতস্তা মিসকে বলে ক্লাস থেকে বেরিয়ে এল ।
'দিদি আসছি' বলে বড়দির ঘরের পর্দা সরিয়ে ভেতরে পা রাখল ।
বড়দি গম্ভীর হয়ে বললেন গল্পটা নিজে লিখেছ ? সত্যি কথা বলবে কিন্তু ।
বিতস্তা বলল ' দিদি, তার মানে? অমি তো প্রতিবার স্কুল ম্যাগাজিনেও গল্প লিখি আপনি জানেন । এবারেও তো লিখেছি নিজেই ।
বড়দি ওর সামনে পুরোণো মৃত্তিকার কপিটা ধরিয়ে বললেন ' এখানে মল্লিকা নামের মেয়েটির গল্প আর তোমার গল্পের প্লট এক যে! এটা কি করে হয়? '
বিতস্তা বলল 'এ ব‌ই আমি কখনো চোখেই দেখিনি । এতো অনেক পুরোণো ব‌ই দিদি'
বড়দিও আদতে সেই কথাই ভাবছিলেন এতক্ষণ ; তবুও সন্দেহের বশেই এমন প্রশ্ন করে বসলেন ।
বিতস্তার দুচোখে তখন বৃষ্টি নেমেছে সেদিনের বৃক্ষরোপণের উত্সবের দিনের মত ।
বড়দি বললেন 'কাঁদছ কেন? এই গল্পটা তুমি আগে পড়েছিলে?
'না দিদি, কোনো দিনো পড়িনি' কিন্তু..
কিন্তু কি বিতস্তা ? বলো আমাকে..
ঐ প্রতিযোগিতার দিন আমি ঐ কবরখানার মধ্যে নিরিবিলিতে বসে আমার গল্প লেখার চেষ্টা করতে করতে ...বলে স্বপ্নের সব ঘটনাটা বিস্তারিত বলে ফেলল বড়দিকে ।
বেলাদি হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকেছেন মল্লিকার গল্পের জেরক্সটি নিয়ে । একটা তফাত পেয়েছি দিদি, বিতস্তা বনমহোত্সবের সূচনায় 'আয় আমাদের অঙ্গনে ' গানটির নাম করেছে । মল্লিকার লেখায় সেখানে রয়েছে ' এসো শ্যামল সুন্দর.. নাচের মেয়েরা হলুদ রঙের কলসী নিয়ে মঞ্চে এসে প্রবেশ করছিল । তারা নীল জরিপাড় ধূসর রঙা সিল্কে..কোমরে রূপোলী সলমা চুমকীর টিপ টিপ সাদা উত্তরীয়। গানের মেয়েরা সবুজ শাড়ি। মঞ্চে উপবিষ্টা '
বেলাদি পড়তে পড়তে থেমে গেলেন ।
বন্দনাদি বললেন 'কি হল, থামলে কেন ? পড় মল্লিকার লেখাটি ,শুনি আমরা ।
বড়দি বললেন ' অমূল্যবাবু, ভালো ধরেছেন। ওনার কি প্রখর স্মৃতিশক্তি ! বিতস্তার লেখাটিকে তো মনোনীত করা যাবেনা তাহলে'
বিতস্তা বলল' দিদি আমার প্রাইজ চাইনা, আমি ফার্স্ট, সেকেন্ড কিচ্ছু হতে চাইনা। আমার কথাটা আপনারা বিশ্বাস করুন'
বিতস্তা মল্লিকার গল্প 'মাটির গানে' তে চোখ রেখেই লেখার শিরোনামের নীচে দেখল মল্লিকার পাসপোর্ট সাইজের সাদাকালো ছবি । ঘষাঘষা ছবি কিন্তু এই মেয়েকেই সেদিন সেমেটারিতে বসে স্বপ্নে দেখেছে বিতস্তা । হাউমাউ করে ডুকরে কেঁদে ফেলল সে।

আপনার মতামত জানান