যাযাবরের ঘরবাড়ি

পুষ্কর ঘোষ

অলংকরণ- সুমন কা

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কুমকুমের ঘরমোছাটা পরীক্ষা করছিল নন্দিনী।কাদা কাদা করে মোছা তার একদম পছন্দ নয়।তার ওপরে এই নতুন ফ্ল্যাটটা তৈরি হবার সময় থেকেই সে নিজের চোখে দেখে সবকিছু বানিয়েছে,নাহলে অন্যান্য ফ্ল্যাটগুলোর মতো গড়পড়তা হিসেবে বানিয়ে দিত মিস্ত্রীরা। এই ব্যাপারে সঞ্জয়,নন্দিনীর সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত বলে ধরে এসেছে। আর তাছাড়া প্রোমোটারের নিজস্ব ফ্ল্যাট,একটু তো অন্যরকম হবেই।অন্য ফ্ল্যাটগুলোর তুলনায় এটা বড়,প্রায় এগারোশো স্কোয়ার ফিট,থ্রি বিএইচকে,সাউথ ফেসিং। বারান্দার সামনে কিছুটা অংশ রাস্তা,তারপরে একটা পার্ক কাম বাগান গোছের,তারপরেই একটা বিরাট ঝিল।কাজেই আলো হাওয়া খেলার কোনও অসুবিধে নেই।
এইরকমই হয়ে আসছে,হওয়াটাই স্বাভাবিক।জমি জায়গা পাওয়া থেকে শুরু করে কণস্ট্রাকশন,সবকিছুর দেখভাল যখন সঞ্জয়কেই করতে হয় তখন মনের মত ফ্ল্যাট বানাতে অসুবিধে কোথায়?আর এসব কাজতো চাট্টিখানি কথা নয়।
নন্দিনী ভুরু কুঁচকে ডাইনিং স্পেসে এসে বলল,’তুই কি জলে লাইজলটা মেশাসনি কুমকুম,গন্ধ পাচ্ছিনা তো?’
চেয়ারের তলাতে ন্যাতার টান দিতে দিতে কুমকুম বলল,’মেশাইছি তো,তুমি বুঝতে পারোনাই বৌদি।‘
‘তা হোক,তুই আরেকটু দে,নতুন বাড়ী,তারপর গ্রাউন্ড ফ্লোর,পোকামাকড় কোথায় কি থাকবে।‘
কুমকুম হেসে বলল,’নতুন রঙের গন্ধে কি পোকামাকড় আসার জো আছে?একি আমাদের বাড়ী যে আনাচে কানাচে কেরাসিন ঢালতি হবে।‘
নন্দিনী আর কথা বলল না।এই কুমকুম মেয়েটা খুব কথা বলে।কথায় কথায় শুধু নিজেদের বাড়ির কথা ওঠায়।ওদের বাড়ী নাকি এখানেই ছিল,তাতে এই ছিল,ওই ছিল।বললে বলে,’তোমাদের যেমন বাড়ী,তেমনি আমাদেরও বাড়ী গো বৌদি,হতে পারে চালা বাড়ি,কিন্তু বাড়ি তো।‘
নন্দিনী বেডরুমে এসে বিছানার চাদরটা তুলে দিল,এটা কাচতে দিতে হবে।আলমারি থেকে আরেকটা চাদর বার করে খুলে ধরল।না:!এই রোঁয়া ওঠা চাদর গুলোয় শুলে বড্ড গরম লাগে।পাতলা সূতির চাদর গুলো কোথায় গেল?আলমারি খুঁজতে লাগলো নন্দিনী।কুমকুম ঠকাস করে জল ভর্তি বালতীটা এনে মেঝেতে রাখল।নন্দিনী আড়চোখে চেয়ে বলল,’বেশি জলজল করে মুছবিনা.পায়ে পায়ে কাদা হয়।‘
‘জানিগো!এখানে আবার জল মরতে অনেক দেরি হয়।নামো জায়গা তো।‘
‘মানে?’
‘এই জায়গাটায় তো খুব জল জমতো,বর্ষার সময় কিছুতেই জল নামতে চাইতো না।তা তোমাদের তো পাকা ঘরদোর,জল জমলেই বা কি।আমাদের মতো ঘরের মদ্যি জল তো উঠে আসা তো আর হবে না।‘
নন্দিনী কিছুটা অন্যমনস্ক হয়েই বলল,’তা তোরা কি করতিস তখন?’
‘কি আর করবগো বৌদি,হেঁটোর ওপর কাপড় তুলে যাতায়াত করতাম,নোংরা জল,ওই পুকুরটা থেকি জল উঠে আসতো,কত মাছ পাওয়া যেত।–তা তোমরা এই একতলার ফ্ল্যাটটা কেনে কিনলে গো?’
নন্দিনী একটু হোঁচট খেল।গ্রাউন্ড ফ্লোরের ফ্ল্যাটটার একেবারে পছন্দ ছিলো না।এখন আবার এই জল জমার কথাটা জানা গেল।সঞ্জয় অবশ্য পাকা মাথার লোক,এই বিশ্বাস নন্দিনীর আছে।জল জমার কথাটা নিশ্চয়ই জানত আগে,নাহলে একগাদা টাকা খরচা করে কি সব লেভেলিং পাইলিং করল যে।আর লোকজন কি গাধা নাকি,এরকম জলা জায়গাতেও তো একটা ফ্ল্যাটও বাকি নেই।তাছাড়া এখন আর জল জমবে না,সবকিছু ভেবেচিন্তেই কাজটা করা হয়েছে।
আসলে সঞ্জয়ের বৃদ্ধ বাবা মায়ের কথা ভেবেই গ্রাউন্ড ফ্লোরটা বাছা হয়েছে।মায়ের পায়ে আর্থ্রাইটিস,বাবার দু`বার বাইপাস হয়ে গেছে।সিঁড়ি ভাঙা একেবারে বারণ।এই নিয়ে যে একটু মন কষাকষি হয়নি তা নয়।বাবা-মা এমনিতেই এদিকে আসতে চাননা,তবে রোগভোগের চিকিত্সাার জন্য মাঝে মধ্যেই আসতে হয় বৈকি।কবে আসবেন তার জন্য একটা গোটা ফ্ল্যাট অসুবিধে করে নিয়ে রাখতে হবে?অবশ্য এই ফ্ল্যাটেই যে জন্মজন্মান্তর ধরে তারা থেকে যাবে,তা নয়।নন্দিনীর একই জায়গাতে বেশিদিন থাকতে ভাল লাগে না।ছ`মাস ছ`মাস করে মিলিয়ে মিশিয়ে থাকে।সঞ্জয়ের আগের প্রজেক্টের যে ফ্ল্যাটগুলো নিজেদের জন্য নেওয়া হয়েছে,একটা টপ ফ্লোরে,আরেকটা সেকেন্ড ফ্লোর,সেগুলোয় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে থাকা হয়।বেশ লাগে।অন্যগুলোয় ভাড়া দেওয়া আছে।টপ ফ্লোরের ফ্ল্যাটটায় এমনি বেশ আলো হাওয়া খেলে,বেশ মালিক মালিক ফিলিং হয়,কিন্তু বড্ড গরম।এসি চালিয়েও ঘর ঠাণ্ডা হয়না।আর ওপরে একবার উঠলে আর নীচে নামতে ইচ্ছে করে না।গ্রাউন্ড ফ্লোরের এই ফ্ল্যাটটায় আপাতত ওরা কয়েক মাস থাকবে।এখান থেকে সঞ্জয়ের নেক্সট প্রজেক্টের সাইটটাও কাছে।
কুমকুমের প্রশ্নে একটু বিরক্ত হয়েও নন্দিনী বলল,’ওপরের ফ্ল্যাটে অনেক অসুবিধে,বাড়িতে বুড়ো মানুষজন আছেন,তারাও তো থাকবেন।‘
নন্দিনী হাতের কাজ থেকে মুখ তুলে দেখল কুমকুম মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে কি দেখে যাচ্ছে।হাতের ন্যাতাটা দিয়ে বালতীর জলে ভেজাচ্ছে তো ভেজাচ্ছেই।
‘কি দেখছিস কুমকুম?’
কুমকুম সলজ্জ হাসলো।হাসি,নাকি বুক খালি করে এক ঝলক বাতাস বার করল,কে জানে।নন্দিনীর কেমন একটু লাগলো।
‘তোমরাও এইখান টাতে খাট রেখেছ?আমরাও এইখান টাতেই শুতাম।‘
‘মানে?`
‘এইখান টাতেই আমাদের ঘর ছিলগো,এই জয়গাটাতেই আমাদের শোয়ার জায়গা ছিল।‘
‘কোন জায়গা দেখি।‘,নন্দিনী এগিয়ে এলো।কুমকুম খাটের তলায় একটা জায়গা দেখিয়ে বলল,’আমাদের ঘর তো খুব ছোটছোট হয়,তোমাদের মতো বড় ঘর তো নয়।এইটুকু জায়গাতেই আমরা শুয়ে পড়তাম।‘
অন্ধকার খাটের তলাতে উঁকি দিয়ে দেখল নন্দিনী।মার্বেল পাথরের মেঝেতে আঁকিবুঁকি নকশা চলে গেছে খাটের তলাকার অন্ধকারে।নন্দিনীর মনে হল কুমকুম যেন খুব যত্ন করে ওই জগত মুছছে।মুছে মুছে আর হচ্ছে না কুমকুমের।বিরক্ত গলায় নন্দিনী বলল,’আর কি ঘর নেই?ওখানে কতক্ষণ মুছবি?’
‘এই যে বৌদি যাচ্ছি।আসলে অনেকদিন থেকেছিলাম তো জায়গাটায়,তাই মনটা কেমন করে উঠল।এই একখানাই তো ঘর ছিল আমাদের,ওটা ভেঙে না দিলে.....’আর শোনা গেল না,কুমকুম পাশের ঘরে চলে গিয়েছে।নন্দিনীর কেমন গা ছমছম করে উঠল।কুমকুমের কথায় কিসের হাহাকার যেন,ঘরের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
রাতে বিছানায় শুয়ে কুমকুমের কথাগুলো মনে পড়ছিল নন্দিনীর।সঞ্জয় ক্লান্ত শরীরে পাশে শুয়ে আছে,বোধহয় ঘুমিয়েই গেছে।নন্দিনীর ঘুম আসতে দেরি হয়।অনেকক্ষণ এপাশ ওপাশ করেও কথাগুলো মাঠ থেকে বের করতে পারছিল না সে।দক্ষিণদিকের জানলার পাশেই যেখানটা শুয়ে আছে তারা,জায়গাটা সেইখানটাতেই না?কথাটা মনে হতেই গা`টা কেমন শিরশির করে উঠল নন্দিনীর।মনে হল অন্য কারোর বেডরুমে ঢুকে পড়েছে।এইখানটাতেই তো কুমকুমরা শুতো,জড়ামড়ি করে,কোনরকমে।নন্দিনী একটু বাম দিকে সরে গেল।ঈশ!ওখানটায় শুতে তার কেমন অস্বস্তি হচ্ছে।সঞ্জয়কে ধাক্কা দিয়ে বলল,’এই,তুমি ওইদিকটায় শোবে?’
ঘুম জড়ানো বিরক্ত গলায় সঞ্জয় বলল,আবার কি নতুন শুরু হল তোমার?শান্তিতে একটু ঘুমোতেও দেবে না?’
‘ওখানে শুতে আমার কিরকম লাগছে।‘
‘কেন?কি হল ওখানটায়?’,সঞ্জয় এপাশে আসতে আসতে প্রশ্ন করল।
‘কুমকুম বলছিল,ওখানটায় ওরা শুত।‘
‘আর তাই তুমি শুতে পারছো না?এটা কোনও কারণ হল?পারোও বটে।‘
নন্দিনী গুম হয়ে রইল কিছুক্ষণ।তার অস্বস্তি হচ্ছে তো সে কি করবে?কিন্তু কুমকুমের কথাগুলো খালি ঘুরপাক খেয়েই যাচ্ছে মাথায়।‘বাড়ীটা ভেঙে না দিলে....’,কি বলতে চাইছিল কুমকুম?বাড়ী ভাঙার কাজে সঞ্জয়ের হাত ছিল,সেটা ও কি জানে?ও কিকরে জানবে?সব ব্যবস্থাই খুব সাবধানে করা হয়েছিল।টাকা পয়সা খাইয়ে মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান কে হাত করা,পলিটিকাল পার্টিগুলোর খাঁই মেটানো,নেতাদের একটা করে ফ্ল্যাট ছেড়ে দেওয়া-এসব না করলে এই বিশাল ঝুপড়ি ওঠানো যেত?সঞ্জয়ের পার্টনার অধীর বাবু,এসব কাজে তুখোড়।ঝুপড়ি বাসীদের পুনর্বাসন নিয়ে একটা খোঁচা উঠেছিল বটে,তো সেটাও কিভাবে যেন ম্যানেজ হয়ে গেছে,ওই পার্টি পলিটিক্সের লোকজনই করে দিয়েছে।আর তাছাড়া,যেখানে সেখানে ঝুপড়ি বানিয়ে বসে যাওয়াটা কি বেআইনি নয়?এই জায়গাটা তো মিউনিসিপ্যালিটির।সে তার প্রয়োজনে সেটা নিতেই পারে।তোমার ইচ্ছে হবে,আর তুমি বাড়ী বানিয়ে বসে বলবে ‘উঠবো না’,তা কিকরে হয়?
কুমকুমের বাড়ীটা এখানে ছিল,তাই ওর বাড়ীর কথা মনে পড়ছে।তা সে কি করা যেতে পারে।আর একেবারে তো কিছু করা হয়নি,তাও তো নয়।অন্য জায়গায় ওদের থাকার ব্যবস্থা করাও হয়েছে বলে শুনেছে নন্দিনী। একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে পাশ ফিরলো নন্দিনী-না:,বড্ড বেশীই ভাবা হয়ে যাচ্ছে।

বাথরুমে একগাদা বাসন নিয়ে বসেছে কুমকুম।নন্দিনী রান্নাঘর থেকে একবার উঁকি মেরে দেখে গেল।কুমকুম মাঝে মধ্যেই এখানে ওখানে দাঁড়িয়ে পড়ে,কাজ করতে করতে থেমে যায়।ওর নাকি পুরনো বাড়ীর কথা মনে পড়ে যায়।কে জানে বাবা,কি মতলব,আজকাল যা সব শোনা যায়।কোনদিন হয়তো দলবল নিয়ে ঢুকে সাফা করে দিয়ে যাবে।ওকে ছাড়িয়ে দেওয়ার কথা ভেবেছে নন্দিনী।কিন্তু আর লোক পাবে কোথায়?আর এমনিতে কুমকুমের কাজকর্ম খারাপ নয়,কামাই করে না,বা করলে বলে করে।সবচেয়ে বড় কথা,ও নিজেই এসে কাজটা নিয়েছে।নতুন বাড়ীতে ঝাড়পোছ বেশী।একদিন ও নিজেই এসে বলেছিলো,’আমাকে কাজে রাখেন বৌদি,আমি আগে এইখানেই থাকতাম।‘
সঞ্জয়ের করা নির্দেশ ছিল,’এলেই হ্যাংলার মতো নিয়ে নেবে না,একটু বাজিয়ে দেখবে।‘কি বাজাবে,কোথায় বাজাবে-নন্দিনীর মাথায় কাজ করেনি তখন।ওরকম বোঝা যায় নাকি?তাও নিজের থেকেই এসেছে,ছেড়ে দেবে?সাধারণত: কোনও চেনা পরিচিতের রেফারেন্সে আসাটাই দস্তুর।নিজের থেকে আসার মধ্যে কোনও ঘাপলা নেই তো?সন্দেহটা মনের মধ্যে উঁকি দেয়নি,তা নয়।কিন্তু সেই সময় কাজের লোক পাওয়ার বড্ড দরকার ছিল।আপাততঃ থাক,পরে দেখা যাবে-এই ভেবে ওকে কাজে নিয়েছিল নন্দিনী।মাস চারেক কেটে গেছে,সেরকম কিছু নজরে পড়েনি।আর দেখেশুনেও খুব খারাপ মনেও হয়নি।এই মাস খানেক হল,ওর পুরনো বাড়ী নিয়ে বকবক করাটা নন্দিনীকে অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে।
বাথরুম থেকে জল পড়ার শব্দ ছাড়া কোনও শব্দ নেই।নন্দিনী রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে ঠিক তাই-কুমকুম বাসন কোসন ফেলে হাঁ করে জল পড়া দেখছে।
‘কি দেখছিস কুমকুম,তোর কি কাজকর্ম নেই?’
চমকে উঠে অপ্রস্তুত গলায় কুমকুম বলল,‘এই হয়ে গেছে বৌদি।আসলে তোমাদের বাড়ীটা না,আমাদের জায়গাটার মতোই।ভগমানের কি বিচার দেখো,কিচ্ছুটি পাল্টাতে দেননি।‘
নন্দিনী অবাক হয়ে বলল,’কেন আবার কি হল?’
‘এইখান টাতেই তো আমাদের টিউকলটা ছিল।সকাল থেকে জল নেওয়ার কি লাইন থাকতো।ঝগড়া ঝাঁটি লেগেই থাকতো।এইখানে আমরা চান করতাম,আর তুমিও এখানেই চান করো।হি হি !’
‘তুই কাজ শেষ কর,খালি বকবক।‘
‘এই করছি।আসলে এইখানেই এতগুলা বছর ছিলাম তো।তা একদিন বাবুর আসলেন,মাপজোক করলেন।পেথমে বুঝতে পরিনাই।আমাদের বস্তির নেতা দাদারা বললে,সরকারের জমিতে কাজ হবে,আমাদের উঠে যেতে হবে এখেন থেকে।কেউ কেউ পোতিবাদ করেছিল।একদিন রেতে একজনের লাশ পড়ে গেল।তারপর ভয়ে আর কেউ কিছু বলে নাই।‘
নন্দিনীর বুকটা ছ্যাত্‍ করে উঠল।এরকম কথা শোনার অভ্যেস তার নেই।খুন খারাপির খবর ওই কাগজ,টিভি পর্যন্তই দেখেছে,ভুলেও গেছে।কিভাবে খুন,কোথায় খুন-এসব সে কখনো জানেনি,জানতে চায়ওনি।ঢোঁক গিলে সে বলল,’তোদের থাকার জায়গা দিয়েছে না?’
‘ওই দিয়েছে।নুতুন জায়গায় আবার করে ঘরদোর বানানো কি সহজ কথা?গরীব মানুষ আমরা,পয়সা কোথায় পাব।ওই কোনও রকমে আছি।আবার কবে বলবে,উঠে যাও।সব জমিই তো সরকারের।‘
‘তাই বলে তো যেখানে সেখানে বসে গেলেই হল না,পারমিশন তো লাগে।‘
কুমকুম হাসল একটু।‘সব বলা ছিল বৌদি।আমরা না হয় লেখাপড়া জানিনা,যারা জানত,নেতাদের সাথে কথা বলে সব ঠিক করে রেখেছিল।আজ মিটিঙে চল,কাল অবরোধ করো,পরশু ভাংচুর করো-তখন কে করতো এইসব?আমাদের লোকেরাই তো যেত।তারপর যেই কাঁচা পয়সা পেল,সেই নেতারাই পাল্টি খেয়ে গেল।বলল,ঐসব কাগজের নাকি কোনও দাম নাই।‘
‘তা যেটা ঠিক সেটাই তো বলবে।সবকিছুর তো একটা নিয়ম আছে।‘
কুমকুম বাসনগুলো গুছিয়ে রাখতে রাখতে বলল,’আমরা অশিক্ষিত,কাগজ,মগজ কিছুই বুঝিনা।কি করব বলো?তা,তোমাদের তো আরো বাড়ী আছে,এইটা আবার কিনতে গেলে কেন?’
‘দরকার ছিল।বুড়ো মা বাবা আছেন,তাদের কাছাকাছি রাখলে দেখভাল করা যায়।আমিও থাকবো মাঝে মাঝে।‘
‘তা ভালো।একবার এখেনে,একবার ওখেনে,মিলিয়ে মিশিয়ে থাকা যাবে।আমরাও তো তাই থাকছি।যাযাবরের মতো।‘
কথা শোনো একবার-গা জ্বলে গেল নন্দিনীর।কিসের সাথে কিসের মিলিয়ে ফেলছে।যাযাবর!কোথায় একটা রিক্সাওয়ালা,আর কোথায় প্রোমোটার।কুমকুমের বর তো রিক্সা চালায়,একদিন এসেছিল ওকে নিতে।নন্দিনী দেখেছে,কালো ছিপছিপে শরীরের একটা অল্পবয়সী ছেলে।তারা আর ওরা,কিসের সাথে কি!কুমকুম বলে,এখন পয়সার খুব টানাটানি,তাই ওর বর নাকি জন খেটেও দেয় মাঝে মধ্যে।তা ওরা পারে।পারে তো পারে।কুমকুমের মুখে যাযাবর কথাটা কেমন বেমানান।কুমকুম জানল কিকরে কথাটা?ও মানে জানে?না জানলে বলল কিকরে?কুমকুম কি অপমান করল নাকি?
বেরিয়ে যাবার সময় নন্দিনী খেয়াল করল ব্যাপারটা।ডাইনিং টেবিলের পাশে বিশেষ একটা জায়গাতে কুমকুম প্রণাম করে গেল?
‘ওখানে আবার কি ছিল?প্রণাম করছিস?’
‘তুলুসী তলা গো বৌদি।এইখানে পোতিদিন সনঝে দিতাম।‘
রাতে খেতে বসে বার বার ওই জায়গাটায় চোখ চলে যাচ্ছিল নন্দিনীর।ওখানটা বোধহয় মাড়িয়ে ফেলেছে অসাবধানে।ঈশ!যতই হক ঠাকুরের জায়গা ছিলো,পা লেগে গেল।ঠাকুর কি আর ধনী দরিদ্র দেখেন?অজান্তেই হাতটা কপালে উঠে গেল নন্দিনীর।সঞ্জয়ের জিজ্ঞাসু চোখের উত্তরে নন্দিনী বলল,’ওইখানটায় একটা তুলসীমঞ্চ ছিলো,তাই....’
‘তাই তুমি প্রণাম করছো?অদ্ভুত!’
বিছানায় শুয়ে আবার সেই অস্বস্তি।পাশে খালিগায়ে সঞ্জয় শুয়ে আছে,ক্লান্ত।নন্দিনী একটু ঘন হবার চেষ্টা করে বলল,’খাটটা সরিয়ে রাখলে হয়না?’
‘কেন?আবার ঝামেলা করোনাতো।অনেক হ্যাপা করে ওটা ঢোকানো হয়েছে।এই জানলার ধারেই ভালো।এখন ঘুমোও।‘
নন্দিনী সঞ্জয়ের লোমশ বুকে হাত বোলাতে বোলাতে আরো ঘন হয়ে এসে বলল,’আমার ঘুম আসছে না।‘
‘আমাকে কালকে অনেকগুলো সাইটে যেতে হবে,তাড়াতাড়ি উঠতে হবে কাল।আজ থাক।‘ বলে সঞ্জয় পাশ ফিরে শুল।নন্দিনীর নিজেকে ভীষণ পুরনো মনে হচ্ছে এখন।যেন ছুড়ে ফেলে দেওয়া জঞ্জাল।এইখানেতেই কুমকুমের বিছানা ছিলনা?এইখানেই তো ওদের জড়ামড়ি করে থাক জীবন শুরু হয়েছিল।কুমকুমের বর ক্লান্ত হয়না?নন্দিনীর গলার ভেতরে পাক খাচ্ছে অপমান।স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে কালো ছিপছিপে নগ্ন শরীরটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে কুমকুমকে,জৈবিক আনন্দে ভেসে যাচ্ছে ওরা দুজন।এইখানটাতেই ঘটে চলেছে প্রলয়,এইখানেই যেন শ্মশানের হাহাকার।নন্দিনী উঠে বসল।কানমাথা গরম হয়ে আছে।উঠে গিয়ে মুখেচোখে জলের ঝাপটা দিল।তারপর ডাইনিং টেবিলের ধারে ওই বিশেষ জায়গাটায় এসে বসল।আবছা অন্ধকার দিয়ে তৈরি একটা মন্দির,তার ওপরে ছোট্ট তুলসী গাছ-নন্দিনীর চোখে মায়ার পরশ লাগিয়ে দিয়েছে।অজান্তেই মাথাটা নেমে এল মেঝেতে,গলা দিয়ে অস্ফুটে বেরল ‘মাগো!দয়া করো।’

আজকাল স্নান করতে গেলেই নন্দিনীর কেমন লজ্জা করে।খালি মনে হয় কারা যেন তাকে দেখছে।তাই আজকাল কাপড় পরেই স্নান করে সে।আজও শাওয়ারের জলের ধারায় চোখ বুজে দাঁড়িয়েছিল সে।একটা গোলমালের শব্দে চোখ খুলেই চমকে উঠল নন্দিনী।বাথরুমে এরকম সার সার বালতি কোথা থেকে এলো?এগুলো কাদের?এরকম নোংরা,ভাঙাচোরা বালতি,জলের বোতলে বাথরুমে যেন নড়ার জায়গা নেই।এগুলো করা রেখে গেল?তবে কি বাথরুমে কেউ ঢুকেছিল?স্নানরতা নন্দিনীকে দেখে ফেলল নাকি?বুকটা ধড়াস করে উঠলো নন্দিনীর।কারা ঢুকেছে ঘরের ভেতর?যাদের উপড়ে ফেলে এই বাড়ী,তারা ফিরে এসেছে,ঘিরে ধরেছে নন্দিনীকে একা পেয়ে?কোনরকমে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো নন্দিনী।গমগম করে বাজতে থাকা কলের জল পড়ার শব্দের সাথে যেন কাদের কোলাহলের আওয়াজ আসছে।কোথায় যেন ঝগড়া বেধেছে,নাকি নন্দিনীকে গালমন্দ করছে তারা?এতক্ষণ ধরে স্নান করছিল সে,হয়তো অনেকেই অপেক্ষা করছে,সবাইকে স্নান করতে হবে,কাজে যেতে হবে।বেরিয়ে আসতে গিয়েও কোনওরকমে সামলে গেল জায়গাটা,আরেকটু হলেই পা পড়ে যাচ্ছিল।ওখানে একটা ধুপ জ্বালিয়ে দিলে কেমন হয়,তাহলে আর পা লাগবে না।
দুপুরে একা এই ফ্ল্যাটে সময় কাটতে চায়না নন্দিনীর।একা থাকলেই নানারকম চিন্তা মাথায় আসে।ফ্রিজ থেকে খাবার বার করে টেবিলে রেখে রান্নাঘরে গেল নন্দিনী।ঈশ!আবার ভুল করে দেওয়ালের দিকটায় বাসন রেখে গেছে কুমকুম।ওদিকটা ওদের বাড়ির পেছন দিক ছিল,একটা ড্রেন ছিল।ওখানে বাসন রাখা যায়?বাসন রাখার জায়গাটা সরিয়ে ফেলেছে নন্দিনী।একদিন কুমকুম বাটনা বাটতে বাটতে বলেছিল,’কেমন মজা দেখ বৌদি,সব মানসের ভিটেবাড়ির মনটা একইরকম হয়।তোমার গ্যাসটা যেখানে আছে,ওখানেই আমি উনুনটা রাখতাম।এইখানেতেই রান্না করতাম গো!তারপর এইখানেই খেতি বসে যেতাম।আমাদের তো তোমাদের মতো টেবিল চেয়ার ছিলনা।‘
নন্দিনী সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বলেছিল,’আর এঁটোকাঁটা ফেলতিস কোথায়?’
‘কোথায় আর ফেলব,ওই পাশেই নর্দমাতে।ঐখানে একটা বড় নর্দমা ছিল তো।‘
মাগো!রান্নাঘরের ভেতরে নর্দমা!গা ঘিনঘিন করে উঠেছিল নন্দিনীর।তার পরেরদিনই বাসন কোসন ওইদিক থেকে সরিয়ে ফেলেছে নন্দিনী।একটু বেখাপ্পা লাগছে,কিন্তু ওই কথা শোনার পরে বড্ড ঘেন্না করে নন্দিনীর।বাইরে আকাশ কালো করে আসছে।কিছুদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছেও।নন্দিনী খেতে শুরু করল।
বিকেলে টিভি দেখতে দেখতে ব্যাপারটা খেয়াল করল নন্দিনী।কুমকুম তো টিভির দিকটা ভালকরে পরিষ্কারই করেনি।একগাদা ধুলো জমে আছে।
‘কুমকুম,এই টিভির দিকটা একবারে ঝাঁট দিসনি কেনরে?’
কুমকুম একটু হেসে দাঁড়াল।বলল,’দিয়েছি তো।‘
‘তাহলে এত নোংরা জমে কিকরে?’
কুমকুম বেজার মুখে ঝাঁটা নিয়ে এগিয়ে গেলো।‘আসলে এইদিকটায় আমাদের বাথরুম ছিলোতো,এখনো বড্ড ঘেন্না করে।‘
‘বকিস না,তোদের আবার বাথরুম।‘
‘ওই সবাইকার জন্য একটাই ব্যবস্থা ছিলো।মেয়েছেলেরা কি আর বাইরে যেতি পারে?ওইখানেই দুটো দরমা ঘেরা জায়গাতে পেচ্ছাপ,পায়খানা সব করতাম।‘
নন্দিনী সোজা হয়ে বসে বলল,’বলিস কিরে?সবাই ওখানেই?’
‘আর কোথায় যাব বল?’
নন্দিনী উঠে দাঁড়িয়ে বলল,’তুই সোফাটাকে একটু ঠেলতো।টিভিটাকেও এইদিকে সরিয়ে দে।পারবি?’
কুমকুম হেসে বলল,’তোমার বড্ড ঘেন্না ঘেন্না বাতিক বৌদি।তা বলছো যখন,চলো ধরে দিচ্ছি।‘
মাটিতে পা দিতেই নন্দিনীর গা ঘিনঘিন করছে।এখানে ওরা সবাই....ঈশ!

কয়েকদিন ভীষণ বৃষ্টি হচ্ছে।সাইটের সমস্ত কাজ হ্যাম্পারড হচ্ছে।অথচ এই প্রজেক্টটা আর মাস তিনেকের মধ্যে শেষ করতে হবে।সঞ্জয় ব্যাজার মুখে আকাশের দিকে তাকিয়েছিলো।অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে।রাস্তায় আসা যাওয়া করা মনে একটা কঠিন অঙ্ক।অর্ধসমাপ্ত বাড়ির একটা ঘরকেই বেছে নিয়ে অস্থায়ী অফিস করা হয়েছে।সেখানে বসে বসে চা আর সিগারেট খেতে খেতে ওয়েদারকে গালাগাল দেওয়া ছাড়া কিছু করার নেই সঞ্জয়ের।ফোনটা বেজে উঠতেই চমক ভাঙল,নন্দিনী ফোন করেছে।
‘হ্যাঁ বলো।‘
‘তুমি...তুমি একবার আসতে পারবে এক্ষুনি?’
‘কেন,কি হয়েছে?’
‘শিগগির এস,ভীষণ বিপদ,আমি একা পারছি না।‘
‘কি হয়েছে?’,সঞ্জয় চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
‘জল ঢুকছে ঘরে,তুমি এসো।‘,নন্দিনী ফোনটা কেটে দিতেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো সঞ্জয়।জল ঢুকছে মানে?ওই জায়গাতে জল জমার একটা বদনাম ছিলো বটে,কিন্তু সেটা আটকাতেই যে এত ট্রিটমেন্ট করা হলো?এত পিলিং,লেভেলিং,এত এত পয়সার শ্রাদ্ধ হলো।তার পরেও আবার কিকরে জল জমল,যে একেবারে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়বে?সঞ্জয় দৌড়ে গাড়ীতে চাপল।
বাড়িতে ঢুকতেই অবাক হয়ে গেলো সঞ্জয়।একি অবস্থা?ঘরের ভেতর সমস্ত যেন তছনছ করেছে কেউ।সোফাটাকে টেনে এমন ভাবে দরজার কাছে এনেছে,খোলাই যাচ্ছে না।ডাইনিং স্পেসের মাটিতে এমন ধুপ জ্বালিয়েছে কেন নন্দিনী?আর জলই বা কোথায়?
‘নন্দিনী?’
শোবার ঘর থেকে একটা কান্নার আওয়াজ পাওয়া গেলো।তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে সঞ্জয় দেখল খাটের ওপর গুটিসুটি মেরে এক কোণে নন্দিনী বসে আছে,ফুঁপিয়ে যাচ্ছে।
‘কি হয়েছে তোমার?’,সঞ্জয় একটা ঝাঁকুনি দিল।নন্দিনীর চোখ বিস্ফারিত,দৃষ্টিতে কোনও স্থিরতা নেই।
থরথর করে কাঁপতে থাকা নন্দিনী কান্না জড়ানো গলায় বলে উঠলো,’আমাদের সব ভেসে গেল।ওই দ্যাখো কিরকম জল ঢুকছে।এখানে বড় জল জমে,নোংরা জল ঢুকছে।এখন আমরা কোথায় যাব?’
‘কি পাগলের মতো বলছো বলতো।কোথায় জল?’সঞ্জয় ঝাঁকুনি দিতে দিতে বলল,’আর এসব কি করেছ?সোফাটা এমন ভাবে রেখেছ,আরেকটু হলেই আমি হোঁচট খেয়ে পড়তাম।টেবিলের পাশে ধুপ জ্বেলেছ।এসব কি পাগলামি?’
‘ওইখানটা বড্ড নোংরা,গন্ধ ওঠে।ওখানে ওরা বাথরুম করত।এত জল,আমি নামবো কিকরে.....’,নন্দিনী বলেই চলেছে।সঞ্জয়ের কেমন অসহায় লাগলো নিজেকে,এতো মানসিক রোগের পর্যায়ে চলে গেছে মনে হচ্ছে।দিনের পর দিন সঞ্জয়ের অলক্ষ্যে,উপেক্ষায় মনের কোন জটিল জগতে নিজেকে আবিষ্কার করেছে নন্দিনী?কোথাকার বাসিন্দা সে?বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের,নাকি দারিদ্র ক্লিষ্ট বস্তির?সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ কি?আকাশ পাতাল ভাবনারা হুড়মুড় করে এসে পড়ছে,সঞ্জয়ের বিহ্বল লাগছে নিজেকে।
‘কি হয়েছে গো বৌদি,কাঁদছো কেনগো?’,দরজার কাছে কুমকুমের গলা পেয়ে সঞ্জয় মুখ ফেরালো ওর দিকে।এই মেয়েটা,এই মেয়েটা যত নষ্টের গোড়া।শালাদের তাড়িয়ে দিয়েও শান্তি নেই।ঝাঁঝিয়ে উঠলো সঞ্জয়,’তুই কেন এসেছিস আবার?বেরিয়ে যা,বেরো ঘর থেকে।‘
কুমকুম থতমত খেয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।এলোমেলো ঘরের আশেপাশে চেয়ে দেখল।মুখেচোখে চাপা উত্তেজনা ফেটে বেরোতে চাইছে তার।বাইরে এসে দাঁড়াল কুমকুম।আকাশের দিকে মুখ করে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ।রাশি রাশি বৃষ্টি কণারা নেমে আসছে তার চোখেমুখে লুটিয়ে পড়তে।কুমকুমের হাসি পাচ্ছে,ভীষণ হাসতে ইচ্ছে করছে।সারা শরীরে বৃষ্টির আদর,জলতরঙ্গ বাজিয়ে বয়ে যাচ্ছে তার শিরায় শিরায়,আকস্মিক সাফল্য বার্তা নিয়ে।

আপনার মতামত জানান