তুলে রাখা

যশোধরা রায়চৌধুরী

ছবি- চারকোল

বিয়ের পরের দিন, রিসেপশনের সময়ই, চোখে পড়েছিল ব্যাপারটা। মহিলা বিবাহ উপলক্ষ্যে আনীত উপহারসমূহ প্রায় সুনীতার হাত থেকে টেনে নিয়ে নিচ্ছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে স্যুটকেসে ভরে ফেলছিলেন। ছটা স্যুটকেস আনা হয়েছিল, একটা করে ভরছিলেন, চেপে চেপে ঢোকাচ্ছিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে তালা চাবি ঘুরিয়ে বন্ধ করে ফেলছিলেন। আর মন দিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন হিসেব করছিলেন। চাবিগুলো সব একসঙ্গে একটা সুতো দিয়ে জড়ানো ছিল, ওনার হাতের শক্ত মুঠিতে।
সেই শুরু। তারপর থেকে মহিলা, মানে সুনীতার শাশুড়ি, আজ অব্দি কিছু বাদ রাখেন নি গুটিয়ে তুলে রাখতে।
হট ওয়াটার ব্যাগে জল গরম করে কোমরে দিয়েছিল সুনীতা। কাজ শেষ করে সেই ব্যাগ জল ঝেড়ে নিজের ঘরের একটা আংটায় রেখেছিল। পরদিন দেখল উবে গেছে। ওটাও শাশুড়ি তুলে ফেলেছেন।
আজও, বিয়ের পনেরো বছর পরও, যা কিছু আনে দোকান থেকে, বাজার থেকে, যে কোন জিনিশ, তা সে বিস্কুট হোক, চানাচুর হোক, বা অন্যকিছু। সঙ্গে সঙ্গে লোপাট হয়ে যায়। মানে লোপাট হয়না আসলে। সুনীতার মনে হয় লোপাট হচ্ছে। কারণ সেগুলো ঢুকে যায় আলমারির তাকে, প্লাস্টিকবন্দী হয়ে, বা ছোট বড় বাক্সের ভেতর।
তুলে রাখা। এই শব্দবন্ধকে ঘৃণা করতে থাকে সুনীতা।
বিস্কুটটা আনলাম, মা, কোথায় গেল?
ও আমি তুলে রেখেছি।
খাব তো।
তুমি যেখানটা রেখেছিলে সেখানটায় জল ছিল। দেখে রাখবে তো।
গটগট করে, সুনীতা মায়ের গোপন বাক্সটা খুলে বিস্কুট বার করে। ইচ্ছে করে খোলা প্যাকেট অনেকক্ষণ টেবিলে রেখে দেয়। তারিয়ে তারিয়ে খায়। তারপর অনেক পরে, একটা ডাব্বা খুঁজে আনে প্লাস্টিকের, তার মধ্যে ঢেলে, একেবারে সামনে রাখে। ড্যাবড্যাব করে বিস্কুটগুলো ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তুলে রাখার প্রকোপে জামাকাপড় পরা হয়না সুব্রতর। নতুনগুলো খুঁজেই পাওয়া যায়না। আলমারির ভেতর থাকে, পুরনো আর বাজেগুলোই বাইরে। সেগুলোই পরে যেতে থাকে সুব্রত। সুনীতার বর। মায়ের আঁচলধরা ।
সুব্রতর সঙ্গে ওর মায়ের ডায়ালগ চলে সারাটা দিন। মা, আমার টিফিনটা দিলে না? মা, আমাকে কাল এক হাজারটা টাকা দিও। মা, সবিতার মায়ের মাইনেটা বার করে দাও।
সুনীতা এখানে আউটসাইডার। সুব্রত যা মাইনে পায় , সবটা মায়ের হাতে দেয়। মা আলমারিতে তুলে রাখেন। সুনীতা যা মাইনে পায়, তাই দিয়ে নিজের শাড়ি, ব্লাউজ, শখের জিনিস কেনে, আর সুপারমার্কেটে শখের খাবার দাবার।
সুব্রত মাকে বলে ওর সারাদিনের অফিসের কথা। বাড়ির খরচ আর বাবার এফ ডির কথা। মায়ের কাছে আবদার করে, তুলে রাখা নারকেল নাড়ু দিতে হবে।
সারাবাড়িতে আর কোন ডায়ালগ থাকে না। বাবা অসুস্থ তাই নীরব। সুনীতা অফিস করে, তাছাড়া উদাসীন। কথাবার্তা, পরিকল্পনা, সমস্যা ও সমাধান, সব মা ও সুব্রতর মধ্যে হয়। সুনীতা দর্শক। বাবা দর্শক।
একদিন সকালে উঠে ভাবল সুনীতা, আচ্ছা, আমাদের এই বাড়িতে আসলে দাম্পত্যটা চলে সুব্রত আর সুব্রতর মায়ের।
বাবার ডাক্তার ঠিক করে কে? মা আর সুব্রত।
জলের লাইন নিয়ে সমস্যার জন্য আলোচনা করে প্লাম্বার , কর্পোরেশনের কন্ট্র্যাকটর, কাউন্সেলরদের ডাক খোঁজ করে কে? মা আর সুব্রত।
বিছানার চাদর বা বালিশে ওয়াড় পাল্টানোর জন্য কাকে বলা হয়? মাকে বলে, সুব্রত। কারণ মা “তুলে রেখেছেন”।
প্রতিদিন সকালে উঠে সুনীতা ভাবে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। ভেবে, সে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। অফিস যায়। সারাদিন অফিসে থাকে, তারপর সন্ধেবেলা বাড়ি না ফিরে, এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। একলা একলা সিনেমা দেখার প্ল্যান করে। শপিং করে। ফিরে এসে ঘুমোবে ভেবে অনেক ক্লান্ত করে ফেলে নিজেকে।
সুব্রত এতক্ষণে নিশ্চয় অফিস থেকে ফিরেছে, মা সুব্রতর জন্য পরোটা করে দিচ্ছে। মা সুনীতার জন্য কখনো পরোটা করে দেয় না। সুনীতাকে কখনো পরোটা করতেও বলে না। সবেতে মায়ের কমপিটিশন, সুনীতা যদি একটু ভাল রান্না করে ফেলে, মায়ের থেকে সুব্রত সুনীতাকে বেশি ভালবেসে ফেলবে। তাই।
সেদিন ফিরে আসতে হয়। সুব্রতর ফোন পেয়ে। মা অজ্ঞান হয়ে গেছে। মাকে হসপিটালাইজ করতে হবে।
হাসপাতালে প্রথমে এমার্জেন্সি, আউটডোর, তারপর অ্যাডমিট কর হয় মাকে। পুরো সময় ডাক্তাররা অদ্ভুত ঠান্ডা আর ক্যাজুয়াল মুখে মায়ের বিপি চেক করে। সোডিয়াম পটাশিয়াম লেভেল চেক করে। রক্ত পরীক্ষা হয়, ক্রিয়াটানাইন লেভেল হাই পাওয়া যায়।
ডায়ালিসিস দিতে হবে মাকে। ওনার আগেকার রক্তপরীক্ষার রিপোর্টগুলো কোথায়?
বাড়ি গিয়ে সুব্রত হাতড়ে আসে আলমারি । পায়না। কাঁপে সুব্রতর হাত। মা কোথায় তুলে রেখেছে।
হাসপাতালে ফিরে সুব্রত কাঁদতে থাকে, সুনীতা সুব্রতকে সামলাতে থাকে। ডাক্তার বলেন, সেপসিস হ্যাজ সেট ইন।
ডাক্তার সুব্রতকে বলেন, আপনার মায়ের লাস্ট হসপিটালাইজেশন কবে হয়েছিল?
মা , মা, মা তো... আমার মনে নেই।
সেপসিসের ঘোরে বলে মা, তোর মনে নেই সুবু? তুই যখন হলি, তখনই তো আমি সেবার...ওরে বাবারে, কী ব্যথা। মরফিন ইঞ্জেকশন দিয়েছিল। তবু ব্যথা কমে না। তোর জন্মের সময় অবশ্য অজ্ঞান ছিলাম তিনঘন্টা। পেট কেটে তোকে বার করল।
মা, আমার কী করে মনে থাকবে, মা? আমার জন্মের কথা আমার কী করে মনে থাকবে?
ভীত, জবুথবু, কান্নায় ভেঙে পড়া সুবু। সুনীতা ঠোঁট টিপে তাকিয়ে থাকে। মা ভুল বকছেন। মায়ের মাথাটা পুরো গেছে। শরীরকে তো অযত্ন আর অবহেলা দিয়ে শেষ করেছেন। নিজের জন্য পাঁউরুটির কোনা, ডিমের হলুদ, আর পড়ে থাকা বাসি তরকারি রাখতেন ব্রেকফাস্টে, বাবাকে নরম টুকরো আর ডিমের সাদাটা দিয়ে। বাকি সব তুলে রাখতেন।
সুনীতা অফিসে, সুব্রত অফিসে। মা বাবাকে আদর যত্ন করতেন। নিজেকে করতেন না।
ঘোর ঘোর লাগা গলায়, জড়ানো অক্ষরে, মা তীব্র সংকটের ভেতর তলিয়ে যেতে যেতে বললেনঃ
ভয় নেই সুবু। সুনীতাকে বলে দিয়ে যাব। সব তুলে রাখা আছে। তোর সব জিনিস। ইশকুলের সাট্টিফিকেট, সাঁতারের মেডেল বড় ঘরে আছে, শোকেসের পেছনদিকটায়। আর তোর জন্মটা , সেই কাঁথাকানি, সেই প্রথম খাওয়া দুধের বোতল সব, শোবার ঘরের আলমারির ওপরে ছোট তাকে আছে। তোর বিয়ের কার্ডটা রেশন কার্ডের পাশে থাকে। আমি কিচ্ছু ফেলিনি রে। সব তুলে রেখে দিয়েছি।

আপনার মতামত জানান