মর্ফিয়ূস

আবেশ কুমার দাস

অলংকরণ- মৌমিতা ভট্টাচার্য



উত্তম পুরুষ

ভাঙাচোরা বাড়িখানা এই সেদিন অবধিও ছিল নাকি ওদের আস্তানা। নিজে অবশ্য দেখিনি কোনওকালেই কিছু। সবটাই কানাঘুঁষোয় শোনা। যাকে বলে রটনা। যারা রটাত তারাও কখনও কিছু দেখেছে বলে দাবি করেনি। অন্তত আমার কাছে। বাপ দাদাদের মুখে শোনা কথা এইভাবে রটতেই থাকে দিনকে দিন। কতকাল যে ওদের নিয়ে এই গুজবটা চলে এসেছে হিসেব রাখেনি কেউ। বেশি জিজ্ঞেস করতে গেলে মুখ চাওয়া চাওয়ি করেছে।
এত কিসের উৎসাহ হে তোমার ওই বাড়ি নিয়ে ? বিরক্ত হয়েছে চেনা অচেনা সকলেই।
ঠিক বুঝতে পারি না জান। কিন্তু আশপাশের এই এত ভিড়ভাট্টার মাঝখানে বাড়িটাকে অমন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে একটা কৌতূহল তো হবেই।
বেশি কৌতূহল ভাল নয়। এক কাজ কর, হালদারদের গলি দিয়ে যাওয়া আসা কর এখন ক’টা দিন। একটু উজোন হবে ঠিকই তোমার...
কিন্তু বেকার ঘুরতে যাবই বা কেন অতখানি ?
সত্যি সত্যিই অবাক হয়ে গেছি আমি। হচ্ছিল বাড়িটার কথা। কিছু না জান তো বলে দাও না স্পষ্টাস্পষ্টি। তা নয়, গায়ে পড়ে এমন উপদেশ দেওয়া কেন ? আমি বলি, বাস ট্রাম ধরতে তো আসতেই হবে এ রাস্তায়। তাও নাহয় গেল, কথা তো হচ্ছিল বাড়িটাকে নিয়ে...
ব্যস ব্যস, চাপা বিরক্তি থেকে আচমকা রেগে উঠেছে সবাই, চুপ করে যাও। এইজন্যেই মানা করছিলাম এই রাস্তায় আসতে। নিজের ভাল চাও তো ওদিকে আর তাকিও না।
কী ব্যাপার বলবে ? চেপে যাচ্ছ যেন কিছু। দেখেছিলে কিছু কখনও...
পালাতে পারলে বাঁচে এমন মুখের ভাব করে এরপর বলেছে সকলেই, শোন হে। একটা কথা বলে রাখি সোজাসুজি। ভেব না অত আর। তাকিয়ে দেখ, পুরসভা থেকে অবধি সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে দিয়ে গেছেÎবিপদজনক বাড়ি।
ঠিকই। কিন্তু আমি ভাবতাম সে তো পুরনো বাড়ি বলে। যে কোনওদিন হুড়মুড়িয়ে পড়তে পারে বলে। তার সাথে বাড়িটার প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলার সম্পর্ক কী ? আর জিজ্ঞেস করা হয়নি অবশ্য। আমাকে নাছোড় দেখে সবাই একে একে পগার পাড় হয়েছে এরপর। বাড়িটার কাছ থেকে নাকি আমার নাগাল থেকে বুঝতে পারিনি। ক্রমে ক্রমে একদিন টের পেলাম আমাকেই এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে সবাই। প্রথমে পাড়া পড়শি, তারপর বন্ধু বান্ধব, শেষে নিজের লোকেও।
এসব অল্প বয়সের কথা। লোকজনের মনোভাবটুকু টের পেয়ে যাওয়ার পর গুটিয়ে নিলাম নিজেকে। ওই প্রসঙ্গই তুলিনি আর। কেমন যেন ভয় হত বেশি লেবু কচলাতে গেলে শেষে আমারও হাল হবে বাড়িটার মতোই। কে বলতে পারে অদৃশ্য সাইন বোর্ড কেউ ঝুলিয়ে দিয়ে যাবে না আমার গায়েওÎবিপদজনক মানুষ।
তার চাইতে আর মুখ ফাঁক করা নয়। সবাই ভেবে নিক আমি ভুলে গেছি বাড়িটার কথা। অল্প বয়সের আগ্রহ কেটে গেছে আমার। সবাই নিশ্চিন্ত হোক। সেই অবসরে আমিও চুপি চুপি লেগে থাকব বাড়িটার পেছনে।
অকেজো দুপুরগুলোয় ফুরসৎ পেলেই তারপরে গিয়ে দাঁড়িয়েছি তেমাথা ছাড়িয়ে। সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটার ছায়ায়। কায়দা করে একটা বিড়ি ধরাতে ধরাতে আড়চোখে দেখে নিয়েছি আশপাশ। বলা তো যায় না। আমি যেমন গোয়েন্দাগিরি করছি বাড়িটাকে নিয়ে আমার পেছনেও টিকটিকি লাগেনি তো! যাচাই করে নিচ্ছে হয়ত লোকেÎসত্যি সত্যিই ভূতটা নেমেছে নাকি লোকটার ঘাড় থেকে।
গোয়েন্দাগিরি করতে গেলে সঙ্গে একটা পিস্তল না হলে মানায় না। পাঞ্জাবির পকেটে আমিও রাখতাম একটা জং ধরা মাল। তার বারুদ আবার পাওয়া যেত না সব সময়। পুজোর মরসুমে তাই গোছা ধরে কিনে রাখতাম সারা বছরের রিল ক্যাপ। মাঝে মাঝে তেল দিতাম যন্ত্রটায়। আর পুজোর দুদ্দাড় বাজির আওয়াজের তালে তালে এক আধবার ফায়ারিং করে দেখে নিতাম ঠিক আছে নাকি অস্ত্রটা। রাতে বালিশের নিচে মেশিনটাকে রেখে শুতাম। হাতে আচমকা পিস্তল দেখলে তার কার্যক্ষমতা পরখ করার আগেই পিছু হটবে যে কেউ।
রাস্তার ওপারে দোতলা বাড়িটা। আর তার ঠিক মুখোমুখি রাস্তার এপাশে এই কৃষ্ণচূড়া গাছ। আমার শহর থেকে দিনকে দিন বিরল প্রজাতি হয়ে চলা এই গাছ। এর ছায়ায় দাঁড়ালে সোজাসুজি দেখা যায় বিপদজনক বাড়িটাকে। কিন্তু ঠিক কিসের আশায় দাঁড়িয়ে থেকেছি আমি ? নিজেও জানতাম না। শুধু অবাক লাগত সদর দোরটা দু’ হাট করে খোলা থাকত প্রত্যেকদিন। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা কাঠের খড়খড়ি লাগানো জানলাগুলোকেও একদিনও বন্ধ থাকতে দেখিনি। সন্ধে হলে নিয়ম করে ঘরে ঘরে আলো জ্বলে উঠত রোজ। লোডশেডিং হলে সারা শহরের সঙ্গে সঙ্গে আচমকা অন্ধকার হত বাড়িটাও। কিন্তু জানলার গরাদের ওপাশ থেকে একদিনের জন্যও আমাদের এই পৃথিবীটার দিকে উঁকি মারতে দেখিনি ওদের কাউকেই।
যদি দেখতে পেতাম হয়ত ভালই হত আমার পক্ষে। ভূতটা নেমে যেত ঘাড় থেকে। কিন্তু ওই যে কিছুই দেখতে না পাওয়াÎনেশাটা ক্রমশ গেড়ে বসতে লাগল এই করে করে।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অবাক লাগত আমার। যাতায়াতের ব্যস্ত রাস্তায় এই এত বাস ট্যাক্সির ভিড়। দু’ দিন অন্তরই ছুতোয় নাতায় সবুজ সাদা লাল গেরুয়াদের মিছিল। ডাইনে বামে দু’ পাশে হাজারো দোকানপাট, জ্যোতিষীর চেম্বার, সিনেমার হল, বই প্রকাশকের খুপরি অফিস। এই এতসব কিছুর ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে নিজের পলেস্তারা খসা নোনা ধরা অস্তিত্বকে নিয়ে দিব্যি নির্বিকারে দাঁড়িয়ে থাকত বাড়িখানা। অ্যাকোয়ারিয়ামের শোরুমে নীল হলুদ সোনালি মাছেরা কত নিশ্চিন্তে ঘুরত ফিরত তাদের অতন্দ্র পৃথিবীতে। দেখতে দেখতে মনে হতÎআমিও তো হতে পারতাম ওদেরই একজন। বাড়িটার থাকা না থাকা নিয়ে কোনও চিন্তাই থাকত না। জুতোর শোরুমে র্যাতকে র্যাককে ঝুলত কত পরিপাটি জুতো। চোখ পড়লে মনে হতÎআমিও তো হতে পারতাম অমনই একপাটি। অপর পাটিটার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রেখে কেটে যেত সারাটা জীবন। এমনকি আমায় বাতিল করতে হলেও ফেলতে হত জোড়াতেই। মানুষের মতো এইভাবে একা একা বাতিল হয়ে সারাটা জীবন একটা বাড়ির সামনে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকতে হত না।
দোতলা বাড়ি। অনেক উঁচু সদর দরজা। খিলেনের কাজ। পলেস্তারা বেরিয়ে পড়লেও অদ্ভূত একটা গাম্ভীর্য ছিল বাড়িটার বহিরঙ্গে। শৈশবে ওই গাম্ভীর্যটাই কি টেনেছিল আমায় ? কি জানি। কবে যে প্রথম ভূতে পেয়েছিল সেই সাল তারিখও মনে পড়ে না আর। শুধু মনে হয় সে অনেক কাল আগের কথা।
যে কৃষ্ণচূড়া গাছটার ছায়ার তলায় দাঁড়িয়ে থাকতাম তার ঠিক পেছনেই অনেকখানি ফাঁকা জমি। আমার শহরে বিশেষ করে সওয়া তিনশো বছরের পুরনো এই শহরটার উত্তর গোলার্ধে যে এখনও এতখানি জমি ফাঁকা পড়ে থাকতে পারে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। অনেক দিন আগের কথাÎশুনেছিলাম এই জমিতে পার্ক বানাবে পুরসভা। শিলান্যাস হয়েছিল। জামবুড়ি দেখেছিলাম শৈশবে। কিন্তু পরে কাজ আর এগোয়নি বেশি। কানাঘুঁষোয় শুনেছিলাম অমন বাড়ির একেবারে মুখোমুখি পার্ক বানাবার ঝুঁকি নিতে চায়নি পুরসভাও।
আরও আশ্চর্য হয়েছিলাম যেদিন চোখে পড়ল বাড়িটার ঠিক ডাইনে বামে দু’টো দোকানঘরের ডাক সাকিন যথাক্রমে ৪৭ আর ৪৮। বাড়িটার নিজের ঠিকানা গেল কোথায় ? বাধ্য হয়েই একদিন জিজ্ঞেস করতে হয়েছিল সুকুমারকে। পুরসভায় কাজ করে।
খোঁজ নিয়ে দেখবে তো বাড়িটার ঠিকানা কী আছে তোমাদের খাতায়।
স্থির চোখে আমার মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল সুকুমার। তারপর একটা উত্ত্র দিতে হয় তাই দেওয়া গোছের গলায় বলল, খোঁজ নেওয়ার দড়কার নেই। ও বাড়ির কোনও ঠিকানা নেই। কোনও অস্তিত্বই নেই আমাদের খাতায়। ইচ্ছে হলে একদিন এসে দলিল ঘেঁটে ঘেঁটে দেখে যেতে পার।
অনেক প্রশ্ন করার ছিল। কিন্তু সুকুমারের মুখের ভাব দেখে আর ঘাঁটাতে সাহস হয়নি। কথাটা বেশি জানাজানি হলে মুশকিল। সবাই বুঝবে ভূত এখনও নামেনি লোকটার ঘাড় থেকে।
দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছিল এমন করেই। সেই কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। বিড়িতে সুখটান দিতে দিতে। সময় সময় পাঞ্জাবির পকেটে হাত গলিয়ে পিস্তলটাকে বুঝে নিতে নিতে। আর একদৃষ্টে সেই বাড়িটার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে। এক একদিন মনেও হয়েছে কোন কুক্ষণে যে চোখ গিয়েছিল বাড়িটার দিকে। একই রাস্তার উপরে ৪৪ দাগের ঠিকানায় জ্যোতিষাচার্য শ্রী রাজগুরু শাস্ত্রীর চেম্বার। কতদিন ভেবেছি নিজের জন্মের ছকটা জেনে আসি গিয়ে। কোন দুষ্ট নাক্ষত্রিক যোগাযোগে এমন পাগলপারা চরিত্র তৈরি হল আমার। একটা বাড়ির মোহে ভেসে গিয়ে কাজের কাজ কিছুই আর করা হল না জীবনে।
এমন সময় আচমকা একটা খবর কানে এল একদিন। প্রথমে দু’ একজন চেনা পরিচিতর মুখে। দু’ দিন যেতে না যেতেই দেখি বাসে ট্রামে রাস্তাঘাটে যেখানেই যাই রোজের আলোচনায় রাজনীতি, গুমখুন, কালো টাকা, বাজারদর, সিনেমা, ক্রিকেট সব কোথায় যেন ভেসে গেছে।
শুনেছ, আর একমাসও নেই। বিরাট এক ভূমিকম্প হবে...
ভাই, ভূমিকম্পের আগাম খবর কেউ কখনও দিতে পেরেছে ?
জাপান যে জাপান, সেও পেল না এত ক্ষয়ক্ষতির আগাম আঁচ। আর এই শহরের এই ধজামারা হাওয়া অফিস পাঁজি ধরে বলে দিচ্ছে কবে ভূমিকম্প হবে!
রিখটার স্কেলে পৌঁনে নয়। কিছু থাকবে না আর...
যাই বল ভায়া, আমার কিন্তু মন বলছে কিছু একটা হচ্ছেই এবারে...
হতেও পারে। যে পাপের রাজত্ব শুরু হয়েছে...
দিন এগিয়ে আসতে লাগল। বাড়ি বিক্রয় আছেÎবোর্ড ঝুলল অলিতে গলিতে। বিক্রি তো আছে কিন্তু কিনবেটা কে ? এককালের আত্মীয় প্রবাসে গিয়ে কবে অনাত্মীয় বনে গিয়েছিল কেউ খেয়াল রাখেনি। আজ আচমকা আচমকা সেই দূরের সম্পর্কগুলোকেই মনে পড়তে লাগল সবার। আর রোজই তালা পড়তে লাগল এক একটা বাড়িতে। শুধু আমাদের মতো কিছু ছাপোষা চুনোপুঁটি ছিল শহরটায়। পায়রার খোপের মতো চিলতে চিলতে এক একটা আস্তানায় মাথা গুঁজে যারা কোনওক্রমে রাতগুলো কাটাচ্ছিলাম এতকাল। তারাই কপাল ঠুকে পড়ে রইলাম সেই তিমিরেই।
অবশেষে জীবনের আর পাঁচটা ব্যাপারের মতোই এসে পড়ল সেই রাতটাও। সব তছনছ হওয়ার কথা যবে। ততদিনে এই ভূতের শহরের বাসিন্দা আমরা ক’টি প্রাণী একরক্ম ঠিকই করে ফেলেছি সারাটা রাত কাটাব রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ফিরে। ঘরের মধ্যে বাড়ির মধ্যে থাকার কোনও প্রশ্নই নেই। তারপর কপাল।
সেই রাতটায় যে কি হয়েছিল, আদৌ মালুম হয়েছিল নাকি কিছু, বলতে পারেনি কেউই। একটা ইমারতের একখানা ইঁটও নড়েনি একটুও।
হওয়ার মধ্যে ভোরবেলা হঠাৎ কোত্থেকে জানি এক অদ্ভূত খবর হল। তেমাথা পেরিয়ে বড়রাস্তার ওপর ৪৭ আর ৪৮ দাগের মাঝখানের সেই অনস্তিত্বশীল বাড়িখানা নাকি একেবারে ধুলোয় মিশে গেছে। রাশি রাশি ইঁট ছড়িয়ে আছে ফাঁকা জায়গাটায়। আর রাস্তার এপারে পড়ে আছে সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটাও। শিকড় ধরে উপড়ে এসেছে নাকি একেবারে। সারা শহরে ক্ষয়ক্ষতি বলতে নাকি এইটুকুই। সবাই দৌড়লাম তেমাথা পেরিয়ে।
দৃশ্যটা কেন জানি না হৃদয় বিদারকই মনে হচ্ছিল আমার। তন্ময় হয়ে যাকে দেখতে দেখতে জীবনের এই এতগুলো বছর কাটিয়ে দিলাম তার এমন পরিণতি চোখে দেখতে পারছিলাম না যেন। খালি মনে হচ্ছিল এতকাল তাও একখানা অকাজও ছিল অন্তত। আমি তো সেই মানুষ যে কখনও দশটা পাঁচটার অফিস করেনি। চায়ের ঠেকে রাজা উজির মারেনি। কাগজে প্রবন্ধ লেখেনি। বেশ্যাপাড়ায় দালালি করেনি। নিজের পাড়ায় মস্তানি করেনি। গবেষণাগারে বোমা বানায়নি। বায়োস্কোপে নায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখেনি। মাঠে ময়দানে ক্রিকেট খেলেনি। এমনকি বাসস্টপে ভিক্ষেও করতে পারেনি। কাল থেকে তাহলে কিসের টানে বাঁচব আর!
চারধারের বাক্যালাপ কানে আসতে থাকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
যতই গালাগাল দিয়ে আস এতকাল, এইবারে একেবারে পাক্কা খবর দিয়েছিল হাওয়া অফিস।
সত্যি, পৃথিবীতে কেউ কখনও পেরেছে! ভূমিকম্পের আগাম খবর এইভাবে মিলিয়ে দেওয়া। তাও এই মাপের...
ঠিক বলেছ। নইলে ওই বাড়িকে টলানোর মুরোদ আমেরিকারও ছিল না। অ্যাটম বোম ফেললেও দেখতে শহর তছনছ হয়ে গেছে ওই বাড়ি দিব্যি আছে...
কিন্তু এতবড় ব্যাপারটা হয়ে গেল আর আমরা সারারাত জেগেও টের পেলাম না একটুও কিছু...
কত কিছুই তো হয়ে যাচ্ছে রোজ। টের পাও সব ব্যাপার ? ট্রেনে করে যেতে যেতে টের পাও ট্রেনটা ছুটছে। কিন্তু এই এত ভার নিয়ে পৃথিবীটাই যে কবে থেকে ছুটে চলেছে একভাবে টের পেয়েছ কোনওদিনও ?
হক কথা বলেছ একেবারে। ছোট ছোট দুলুনিগুলো টের পাওয়া যায়। বড়সড় ব্যাপার কোথা দিয়ে যে হয়ে যায় মালুমই হয় না...
সবই ঠিক আছে। বাড়িটা গেছে আপদ গেছে। কিন্তু গাছটা ভাঙল কেন...
ওদের গুলতানি আর শেষ হয় না। আমি ধীরপায়ে বাসায় ফিরে আসি। সারাটা রাত জেগে চোখগুলো জ্বলছে তখন। ঘুমোতে হবে এইবারে।
সেই ঘুম আমার ভেঙেছিল একেবারে শেষ বিকেলে। মুখেচোখে জলের থাবড়া দিতে দিতে টের পেলাম খিদে পেয়েছে বেজায়। বারো ঘন্টার বেশি না খেয়ে থাকা। পাড়াঘরের দোকান থেকে আগে একটু চা ঢেলে আসা দরকার গলায়।
দোকানে গিয়ে দেখি বিরাট জল্পনা চলছে তখন। চেনায় অচেনায় মিশিয়ে একটা জটলা। বিস্কুটে কামড় দিতে দিতে ভেঙে পড়া বাড়িটার প্রসঙ্গ কানে আসতেই উৎকর্ণ হওয়ার চেষ্টা করি।
পালিয়ে গেছে। সব পালিয়ে গেছে। নইলে পুরসভা থেকে ক্রেন এল। পাঁজা পাঁজা ইঁট কাঠ সরিয়ে নিয়ে গেল। একটাও লাশ পাওয়া গেল না!
পালিয়ে যাবে কোথায়! ওই একখানাই তো আস্তানা ছিল ওদের।
কোথায় গেছে সে কি বলে গেছে তোমায় আমায়! এই শহরেই কোথাও লুকিয়ে আছে...
রাত হলে বেরোবে সব। দিনের আলোর সঙ্গে তো শত্রুতা ওদের...
হে ভগবান। কি যে আছে এইবার কপালে...
এর চাইতে বাড়িখানা ছিল সেই ভাল ছিল। এইবারে শুরু হবে উপদ্রব...
আমি ভাই চললাম। সন্ধের পর আর রাস্তাঘাটে বেরোচ্ছি না...
আমাকেও যেতে হবে অনেকটা। বেরিয়ে পড়ি আলো থাকতে থাকতে...
আলো আর কোথায় পাচ্ছ। ঘোর হয়েই এল।
কারা পালিয়ে গেছে, কারাই বা ছিল ওই বাড়ির বাসিন্দাÎজিজ্ঞেস করতে কেন জানি না ভরসা পেলাম না। কিন্তু একটা ব্যাপার বেশ বুঝতে পারলাম। পকেটে পিস্তল নিয়ে এত বছর গোয়েন্দাগিরি করেও বাড়িটার ব্যাপারে যা জানতে পারিনি তার সবটাই জানত আমার শহরের এই মানুষগুলো। হয়ত তাই এড়িয়ে চলত বাড়িটাকে। কিন্তু কোনও রহস্যময় কারণে কেউ কখনও কিছু খোলসা করেনি আমার কাছে। কেন ? আমাকে কি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি কারওরই ?
আরে ভাই, হাঁ করে বসে বসে এত কী ভাবছ! চাটা তাড়াতাড়ি শেষ করে উদ্ধার কর আমায়। সব যে ফাঁকা হয়ে গেল। ঝাঁপ ফেলব আমি এবারে।
চায়ের দোকানি গিরিনের আর্তস্বরে হুঁশ ফেরে আমার। বেঞ্চিগুলোকে দোকানের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে ঝাঁপ ফেলার তাড়ায় বেচারা মরিয়া। শুনশান হয়ে গেছে আমার এতকালের চেনা গলির সান্ধ্য প্রেক্ষাপট। তাকিয়ে দেখলাম নস্করদের তিনতলার কার্নিশের পেছন দিয়ে চাঁদ উঠেছে কালচে আকাশটায়।

ঘুমে অচৈতন্য হয়ে পড়েছে ট্রামলাইনের শান দেওয়া ইস্পাতগুলো অবধি। চৌমাথার মোড়ের বড় ঘড়িটায় কাঁটায় কাঁটায় রাত ঠিক তিনটে। থানার হিন্দুস্থানি টহলদার হাতের লাঠিখানাকে একবার রাস্তার কালো কালো পাথুরে ইঁটে ঠুকে বাজখাঁই গলায় আওয়াজ তুললÎজাগতে রহো। ভাঙা ইঁটের পাঁজা সরিয়ে একে একে বেরিয়ে এল ওরা সবাই। চোখের তলায়, নাকের ডগায়, হাতের চেটোয় দগদগে ঘায়ের দাগ...
শহরের পশ্চিমমুখো শ্মশানের দিকে নাকবরাবর হেঁটে চলেছি আমি। যত এগোই একরাশ জল এসে আলিঙ্গন করতে থাকে আষ্টেপৃষ্টে। গোড়ালি ডোবা জল থেকে হাঁটুজলে নামতে নামতেও বুঝিনি কি অপেক্ষা করে আছে এরপর। যেখান থেকে শহরের রাস্তা ঘুরে গেছে সোজা উত্তরেÎআর কোনওদিকে যাওয়ার জো নেইÎকোমর ছাপিয়ে বুকজলে নেমে পড়লাম সেখানে। আমার শহরের রাস্তায় এত জল এত সর্বগ্রাসী জল দেখিনি আর কখনও। কাপড় চোপড় ভিজে সপসপ করছে। তবুও এগিয়ে চলেছি জলের নেশায়। গলা জলে নামতে নামতেই মনে পড়লÎআরে, উত্তর দিকে মাথা করে তো শুতে নেই...
ভেঙে পড়া বাড়িটার জায়গায় গজিয়ে উঠেছে ঝাঁ চকচকে একটা ফ্যেং শুইয়ের শোরুম। কত লোক ঢুকছে বেরোচ্ছে মিনিটে মিনিটে। আর দরজার কাঁচের পাল্লা খোলাবন্ধ হওয়ার সময় যেটুকু ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ে এসে লাগছে প্রাণ জুড়িয়ে যায় তাতে। শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণে, পুব থেকে পশ্চিমে মুহূর্মুহূ বয়ে চলেছে সেই নিষ্করুণ শৈত্য। ফ্যেং শুইয়ের শোরুমখানা শহরের মাঝখানে গজিয়ে ওঠায় সবাই খুশি। সবার মুখে এক কথাÎএতদিনে শাপমুক্তি ঘটেছে জায়গাটার। হিল্লে হয়েছে শহরটারও। কেনাকাটা করতে যতবার লোকজন ঢুকছে বেরোচ্ছে দোকানটায় ততবারই খোলাবন্ধ হচ্ছে কাঁচের পাল্লা। আর লাফিয়ে লাফিয়ে নামছে হাওয়া অফিসের পারদ। সবাই মানছে, এতদিনে লণ্ডন হতে চলেছে রোদে পোড়া শহরটা...
আমার কিন্তু বেজায় মনখারাপ। বাড়িটার কথা খুব তাড়াতাড়ি ভুলে গেছে সবাই। অথচ আমি মেনে নিতে পারছিলাম না পোড়ো বাড়িটাকে এইভাবে শহরের অনুষঙ্গ থেকে ছেঁটে ফেলা। আগস্টের এই হাড়কাঁপানো শীতে কয়েকটা দিন জবুথবু হয়ে কম্বল গায়ে জড়িয়ে বসেছিলাম চৌকিতে। কয়েকখানা আরশোলা ফরফরিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছিল আমার চারপাশে। আর একরাশ মাছি বারে বারে এসে বসছিল মুখে। অমন ঝাঁ চকচকে দোকানে কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না আমার মন...
আড়ি ভুলে ভাব করে নেব ভেবে আজ আমিও এলাম। ঠাণ্ডা বটে দোকানের ভেতরটায়! দু’ তিন ধাপ গায়ে চড়িয়েও বাগ মানছিল না। হাঁটতে হাঁটতে একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লাম। বিবর্ণ হলুদ একটুকরো আলো জ্বলছে ভেতরে। এত যে ভিড় দোকানটায় অথচ এই ঘরে কেউ ঢুকছে না। বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে দেখলাম সার সার একরাশ পুতুল। খুঁটিয়ে দেখলে মনে হয় দেবতার মূর্তি। কিন্তু কেমন সাহেব সাহেব হাবভাব...
আমায় দেখে টাকমাথা আধবুড়ো একটা লোক মুখ তুলে চাইল। একঝলক তাকিয়েই আঁতকে উঠলাম। নাকের জায়গায় বিরাট একখানা ফুটো লোকটার। একটা আঙুল খসে পড়া ডানহাত দিয়ে একটা মূর্তি তুলে ধরে বাড়িয়ে ধরল সে আমার দিকে, নিয়ে যাও। দু’ বেলা পুজো করবে। মর্ফিয়ূস। গ্রিকদের স্বপ্নের দেবতা। অনেককাল পুজো না পেয়ে পেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে দেবতা...

উপসংহার

বছর তেইশের রোগাটে যুবকটির দু’ চোখে শূন্য চাহনি। গালে সপ্তাখানেকের না কামানো দাড়ি। বৃদ্ধ চিকিৎসকের কথাগুলো যেন ঠিক স্পর্শ করছিল না সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে অপেক্ষারত যুবকটিকে। চিকিৎসক বলছিলেন, উত্তর দিকে শুধু জল। জান তো ভাই! একেবারে দক্ষিণে গেলে তাও একটা মহাদেশ পাবে। বরফের মহাদেশ। কিন্তু উত্তরে শুধু ধু ধু জল। তোমার কাকা কি সেদিনই প্রথম উত্তরে মাথা করে ঘুমিয়েছিল ?
চমক ভেঙে যেন এতক্ষণে স্বাভাবিক হয় যুবকটি। ঘাড় হেলিয়ে বলে, সেদিনই প্রথম। মরার মাথা উত্তরমুখো রাখা হয়। কাকা কি জানত না! তাও কেন এমন গোঁয়ার্তুমি করতে গেল!
একটু একরোখা ধরনের ছিল বোধহয় মানুষটা ?
একেবারেই নয়। বরং একটু ভিতুই ছিল মনে হয়। নইলে বালিশের তলায় খেলনা পিস্তল নিয়ে ঘুমোয় কেউ ?
আশ্চর্য! ঠোঁট কামড়ে কি যেন চিন্তা করেন চিকিৎসক।
কিন্তু কাকার জ্ঞান ফিরবে কবে। বল না গো। আর্তকন্ঠে এবার প্রায় ককিয়ে ওঠে যুবকটি, আর কতদিন মানুষটাকে ফেলে রাখতে হবে হাসপাতালে ?
হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নাড়েন বৃদ্ধ চিকিৎসক, বাড়ি নিয়ে যাও ভাই ওকে। আমাদের আর কিছুই করণীয় নেই। কোমাও বলব না আমি একে। তোমার কাকা আসলে ঘুমিয়ে আছে। আর দেখেশুনে মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখে চলেছে অবিরাম। হয়ত স্বপ্নের ভেতরেও স্বপ্ন। কিংবা তারও ভেতরে। ক’ ধাপ গোলকধাঁধার ভেতরে যে ফেঁসে গেছে তোমার কাকা বাইরে থেকে বলা মুশকিল। আর এই পুরো চক্রটা থেকে নিজে বেরিয়ে আসতে না পারলে আর কোনওদিনও ঘুম ভেঙে উঠে বসা সম্ভব নয় ওর পক্ষে...
দুই গাল বেয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ে যুবকটির। বুকের মধ্যে একটু মায়া জন্মায় চিকিৎসকের। ছেলেটির কাঁধে হাত রেখে বলেন, এই নিয়ে ভেব না আর অহেতুক। একটা কথা বলি তোমায়। জান তো মানুষের মগজের কোষ আর সংখ্যায় বাড়ে না জন্মের পর থেকে। যত কোষ মগজে নিয়ে জন্মায় মানুষ তাই থেকে যায় উপরন্তু আস্তে আস্তে কমতে থাকে একটা বয়েসের পর থেকে। কিন্তু একটা অদ্ভূত ব্যাপার ধরা পড়েছে তোমার কাকার বেলায়। আমাদের যন্ত্রের ছবিতে দেখা গেছে প্রত্যেকদিনই নতুন নতুন কোষ বিভাজন ঘটছে তোমার কাকার মস্তিষ্কে। দেখেশুনে তাই মনে হয়েছে আমাদেরÎযতদিন এই স্বপ্নের ভেতর ঘুরপাক খেয়ে যাবে তোমার কাকা ততদিন যেমন বিছানা ছেড়ে উঠে বসতে পারবে না আর, তেমনই ততকাল মৃত্যুও ছুঁতে পারবে না তোমার কাকাকে...

আপনার মতামত জানান