I -ঢাই মোমো শপ

কৌশানী মিত্র


জিজিয়াটা বদ্ধ পাগল । সরাসরি আমার কাছে এসে বলল “সব ব্যাবস্থা ফিক্সড” – দেখ এবার কি হয় ।
বুঝলাম জিজিয়ার একথাটার মধ্যেই ভবিষ্যতের হিরোশিমা – নাগাসাকি বোমা বিস্ফোরণ , টাটা-উচ্ছেদ কিংবা বেকারত্ব সব লুকিয়ে আছে ।
না না জিজিয়া কোন ইতিহাস শিক্ষক নয় । এস এস সি দিয়ে আপাতত বেকারত্বের খাতায় নামও লেখায়নি সে । তার দরকারও নেই বোধহয় । কারণ ও বদন এমনিই বেকার । ক্লাস এইট অব্দি পিতার আশীর্বাদ লেখা একটা খাতা আর মুণ্ডু চেবানো ফাউন্টেন কলম নিয়ে ক্লাসে যেত । তারপর এইটের ফাইটে পরাস্ত হয়ে পরপর দুবার ফেল করে আপাতত একটি এন জি ও খুলে বসেছে । না কোনও নামি-দামি পরোপকারী প্রতিষ্ঠান খোলার ইচ্ছা বা সামর্থ্য কোনটাই নেই ওর । তবে ওর সংস্থার নাম “বান্ধব নগর” । কেবল বন্ধু . কম । বন্ধুদের সাহায্য করার জন্য আমাদের জিজিয়া এক পায় খাঁড়া । তাই তো বাপের লাথি ঝ্যাটা , মায়ের চিৎকার সবকিছুকে উপেক্ষা করে আমাদের জটিল জীবনকে সহজ করার জটিল প্রতিজ্ঞা নিয়ে ফেলেছে শ্রীমান জিজিয়া । আর তাতেই কেলেঙ্কারির শুরু ।



জিজিয়ার পড়াশোনা নিয়ে অনেক কটু কথা বললাম ঠিকই আর পাঠক হিসাবে আপনারাও বিশ্বাস করে নিলেন কিন্তু সত্যি বলতে কি আমিও যে ক্লাসের ‘রত্নগর্ভা’ – প্রজেক্ট ছিলাম এমনটা ভুলেও ভাববেন না কখনও । জিজিয়ার দৌর যদি ক্লাস এইট হয় তবে আমার ঐ মাধ্যমিক । লেখাপড়া করে তো হবে ঘণ্টা তাঁর থেকে এ-বয়সেই একটা ব্যবসা শুরু করলে বিয়ের আগে ঠিক দাঁড়িয়ে যাবে । তাহলে বিয়েটাও দেখেশুনে করতে পারবো । যেকোনো মেয়েকে বিয়ে করে ফেললেই তো আর হল না শ্রীযুক্ত আমিচন্দ্রর বউ যে হবে তাকে ফ্যাশন জানতে হবে আবার ঘরের কাজেও হতে হবে দক্ষ খেলুড়ে । একটু ঝগড়া করবে , খানিক ঠোঁট ফোলাবে , আধটু অভিমান করবে তারপর আবার লজ্জায় লাল হয়ে বেনুনী পাকাবে এ না হলে বউ ।

তা এরকম বউ পাওয়ার জন্য সেরকম কড়ি থাকতে হবে । শুধু শুধু বিদ্যের জাহাজ হয়ে হবেটা কি ? অসীম বেকারত্ব ছাড়া কিছু নেই । তাইতো আমাদের পাড়ার মোড়ে একটা মোমোর দোকান খুলে বসলাম । পাশেই একটা এগ রোলের দোকান ছিল ঠিকই কিন্তু মোমো আর এগ রোলের খদ্দের আলাদা । মোমো কিছুটা সফিস্টিকেটেড খদ্দের দের জন্য তেল খাওয়া বারণ অথচ অনরোড খিদেয় পেট চুঁইচুঁই , আর অন্য দিকে ভুঁড়ি বাগিয়ে সাইকেল নিয়ে আড্ডা দিতে আসা বাবুলোক সব এগ রোল , মটন রোলের দলে । যা হোক ওদের প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই স্লিম ফিগারের ঝক্কাস মেয়েরা সব আমার দিকেই আসবে এই আনন্দে ভেসে গিয়ে খুলে ফেললাম ‘ I –ঢাই মোমো সপ’ । স্বপ্ন দেখলাম লোক থুড়ি মহিলারা পিলপিল করে আমার দোকানে লাইন লাগাচ্ছে । কিন্তু ......



শ্রীযুক্ত আমির ভাবনা এক আর কাজে কম্মে দেখা গেল তার উল্টো প্রতিক্রিয়া । না না খদ্দেরদের কোন দোষ নেই তারা আমার দোকানেই আসতে চেয়েছিল বিশ্বাস করুন ।
কিন্তু পাশের রোলের দোকানটা ভয়ঙ্কর শত্রুতা করে খুলে ফেলল মোমোর স্টল । প্রথম দিন যারা যারা রোল খেল তাদেরকে চারটে করে মোমো ফ্রী দিল ফলে আমার খদ্দেররা ওখানেই আঁটকে গেল । এমনকি এতদিন যারা মোমো চেখে পর্যন্ত দেখেনি তারাও স্বাদ পেয়ে পিপীলিকার মতো ধাইতে লাগল অদিকে । ফল স্বরূপ আমাকে কুড়িটা আর জিজিয়াকে কুড়িটা মোমো গিলতে হল । আমারই দোকানের খদ্দের নামারথে মোমো সব আমাদের পেটেই গেল ।
জিজিয়া তার এন জি ও র স্বার্থে আরও কিছু বন্ধুদের ডাকতে চেয়েছিল , আমি ধ্মক দিয়ে থামিয়েছি ।ওকেও দিতাম না যদি না ঠিক দোকান বন্ধ হওয়ার সময় উদয় হত । সন্দেহ হল মোমো খাওয়ার তালেই আগমন ঘটেছিল ওর । লাভের ওপর লাভ একেবারে কুড়িটা । খেয়েও নিল গপাগপ । তারপর মুখ মুছে আস্ত একটা চারমিনার ধরিয়ে ফেলুদা পোজ নিয়ে আমার দিকে তাকাল । -

- বল
- কী বলব ? যা তো বিরক্ত করিস না খ্যটন তো ভালই হল ।
- কিন্ত নতুন দোকানে এক সপ্তাহে খদ্দের ঢু ঢু কী করে ? যদিও খদ্দের না থাকায় আমাদেরই লাভ ......
- যা তো ভ্যজাস নি । অত্যন্ত বিরক্তি নিয়েই আমার দুর্দশার কথা শোনালাম ওকে ।
- ও এই ব্যপার টা আগে বলবি তো । কাজ হয়ে যাবে কোন চিন্তা নেই । কালকেও দোকান সাজিয়ে বসিস কেমন ? তারপর দেখছি কী করা যায় ......



সেই কাজ হয়ে গেছে বলে যখন খবর পেলাম প্রথমেই মনে হল জিজিয়া নিশ্চয় এমন কিছু করেছে যাতে খুব শিগগিরই আমার দোকানটা উঠে যাবে । এর থেকে বড় বিস্ফোরণ আর কী হতে পারে ? কারখানা উঠে গেলে শ্রমিকের কী মূল্য ?
জিজিয়াকে সরাসরি চেপে ধরলাম । ‘কি করেছিস বল শালা’ – কিন্তু এসব বৃথা জিজিয়ার মুখ দিয়ে একটা কথাও বের করা গেল না । এমনকি পুলিশে দেওয়ার কথা শুনেও সে তেরচা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে এমন একটা হাসি দিল দেখেই আমার জয় বাবা ফেলুনাথের মগন লাল মেঘরাজের কথা মনে পড়ে গেল । যেন লালমোহন কে বলছে ‘আসুন আংকেল একটু খেলা দেখাই’ ।
খেলা শুরু হল বেশ ভাল রকমই । কালো , বেঁটে , মোটা , রোগা , লেডীস-জন্ডীস সবাই এসে হাজির – হ্যাঁ আমারই দোকানে । সবার একসঙ্গে যেন মোমো খিদে পেয়েছে । দোকানের নড়বড়ে পাটাতন রীতিমত মচমচ আওয়াজ করে উঠল আর রাত আটটার আগেই আমার মোমো শেষ । সকলে পাগলের মতো কিনছে আর একই কথা বলছে ‘দাদা আমি সবচেয়ে বেশি খেলাম তো ? আমি নগেন খেয়াল রাখবেন একটু ......’ খগেন আরও এক কাঠি ওপরে সে বলল নাকি কালকেও আসবে মোমো খেতে , তখন সব মোমো একাই খাবে । আমি যতই বলতে চাই অত মোমো খাবেন না দাদা আপনাদের শরীর খারাপ করবে আর পাবলিক আমাকে ক্যালাবে । কে শোনে কার কথা ...... I –ঢাই মোমো সপ সত্যি আই-ঢাই । অথচ ওদিকে এগ রোলের দোকানে লালবাতি সবাই হাঁ করে এদিকে তাকিয়ে । কিছুক্ষন পর দোকানের মালিক বাবুদা নিজেই এসে বেশ কিছু মোমো সাবড়ে গেল । আমার মনের মধ্যে তখন কৌতূহলের কেতন উড়ছে ।




জিজিয়াকে আবারও চেপে ধরলাম । এবার না বললে ভয় দেখালাম অ-পাড়ার পিঙ্গিকে জিজিয়ার মাধ্যমিক পাশের মিথ্যেটা ফাঁস করে দেব ।
জিজিয়ার মুখটা কিছুটা ফ্যাকাসে হল । ভুরুতে ভাঁজ । বলল ‘খদ্দের পাচ্ছিস আবার ভ্যাজাচ্ছিস কেন ?’
- হুম খদ্দের আজ পাচ্ছি কাল শুনবো তুই ভুলভাল কিছু ফন্দি করে এসব করেছিস তারপর রোলের দোকানের বাবুদা পুলিশ ডেকে আনুক ......
- উফফ তোর সবেতেই বেশি বেশি , এসব কিছুই হবে না ...... তবে শোন ...
এরপর জিজিয়া যা শোনালো তাতে আমার চক্ষু চড়কগাছ । গতকল্য বৈকালে নাকি জিজিয়া মহাশয় সোজা বাবুদার রোলের দোকানে গিয়ে একপাল খদ্দেরের সামনে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেছেন বাবুদাদের মোমোর সুপে আরশোলা পাওয়া গেছে । কোথা থেকে একটা ঠ্যাঙ ছড়ানো আরশোলা নিয়ে এসে সবার সামনে তুলে ধরেছে । বাবুদাকে সরাসরি বলেছে ‘মনে পড়ে এর কথা ? যে সারাক্ষন তোমার খাটের ছত্রীর দিকে মুখ করে টেবিলে বসে থাকত ?’
অবাক বাবুদা বলে ফেলেছে ‘হ্যাঁ তো ওটা মরল কখন ?’ ব্যাস আর রক্ষে নেই ওমনি জিজিয়ার তুমুল চিৎকার ‘দেখুন বন্ধুলোক দোকানদার আপনাদের জ্যান্ত আরশোলা খাওয়ানোর তালে ছিলেন সেখানে আরশোলা মরে গেছে বলে তার দুঃখের শেষ নেই । আসলে এটা নিরীহ আরশোলার ওপর এক অমানবিক প্রতিশোধ......’
আরও পাঁচ মিনিট জ্ঞানগর্ভ বক্ত্রতার পর বাবুদাকে পেড়ে ফেলে জিজিয়া ঢুকেছে আসল কথায় । ‘বন্ধুলোক , আপনারা পাশের দোকানে যান , ঐ মোমোর দোকানটিতে । আমি এই মাত্র চল্লিশ টা মোমো খেয়ে এলাম । ওখানে সর্বচ্চ মোমো- ভুক্তদের মধ্যে থেকে লটারির মাধ্যমে একজনকে বেছে নিয়ে ইস্টবেঙ্গল – মোহনবাগান পরবর্তী খেলার টিকিট দেওয়া হবে’ ।

এতক্ষনে সবটুকু পরিষ্কার হল আর তারপরই হাত-পা আমার এমন জোরে কেঁপে উঠল যেন হঠাত মনে হল সামনেই কোনো আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণ হয়েছে । আমি সামান্য দোকানদার – কোথায় পাবো খেলার টিকিট ? হতাস চোখে জিজিয়ার দিকে তাকালাম । এখন আর রাগ করারও শক্তি নেই আমার ।
জিজিয়া মুহূর্তে ব্যাপারটা আঁচ করে বলল ‘কোনও প্রবলেম নেই দোস্ত উইনার তো একজন হবেই । যে চিরকাল হয়ে এসেছে সেই । এই জিজিয়া সরমা । সবার সামনেই আমার হাতে টিকিট তুলে দিবি তুই । সে ব্যাবস্থা আমিই করব ।
জিভ আর আলটাগরা কেমন যেন অসাড় হয়ে কথা বন্ধ হয়ে গেছে আমার তাও অনেক কষ্টে বললাম ‘আর ঐ বাবুদার টেবিলে আরশোলা ......’

‘আরে এটাও জানিস না বোকা ? ও-পাড়ার পিঙ্কি যে বাবুদার আদরের ভাগ্নি হয় রে ......’ ।

আপনার মতামত জানান