রামধনু রঙের চা

পায়েল নন্দী


এক কাপ চা গোটা দিনের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।
গরম চা এ ফুঁ দিতে দিতে কথা টা মনে হোল।
মুষলধারে বৃষ্টি,একনাগারে,ঘণ্টা খানেক হতে চলল।
চা এর ধোঁয়া মিলিয়ে যাচ্ছে বৃষ্টিতে। প্রত্যেকটা ধোঁয়া একই দিকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। ভাঁড় শূন্য হচ্ছে অল্প অল্প।
প্রবল বৃষ্টিতে শুকনো জুতো, জ্যাকেট দেখে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি।আমি বরাবরই তাই। সুখী জীবন। ওরিজিনাল লেদারের জ্যাকেট, দামি ঘড়ি, জুতো এসব গরীবদের ঈর্ষা শেখাতে ব্যাবহার করি, তা নয়। শৌখিন থাকতে ভালোবাসি মাত্র। হিসেব মতো, দুপুর এই দেড় টার সময় গ্যাংটক থেকে কুড়ি কিলোমিটার ভেতরে খানিক অমসৃণ রাস্তার ধারে বসে চা খাওয়ার কথা নয় আমার। পাহাড় যথেষ্টই ভালো লাগে, তবে ঐ হোটেলের জানলা দিয়েই।
সামনে বিকল গাড়িটাকে ইতিমধ্যে দেখা হয়ে গেছে বেশ কয়েকবার । অসহায়ের মতো ভিজছে। ড্রাইভার মেকানিক খুঁজতে গিয়ে নিশ্চয় কোথাও নেশায় বুঁদ হয়ে গেছে। পাহাড়ের বৃষ্টি। থেমে যাওয়ার কথা। সে বেটা নির্ঘাত জানতো এ বৃষ্টি থামার নয়। উফ! আমাকে বিপদে ফেলতে যেন গোটা পৃথিবীর মানুষ ষড়যন্ত্রে সামিল।
এতক্ষণে পাশের চা ওয়ালাটি একটাও কথা বলে নি। পাহাড়ি লোকেরা কথা কম ই বলে। অথবা বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে না আমাদের সাথে। এই লোকটিকে যদিও পাহাড়ি দেখতে নয়, বরং বাঙালি হলেও আশ্চর্য হবো না। তেমন টিকালো নাক না থাকলেও চোখ খুদে নয় মোটেই। মাথার চুল কম। একটা চা ওয়ালার মাথার চুল কম। অদ্ভুত কিছুই নয় তেমন। জামাকাপড় সাদা মাটা-ই । হঠাৎ চোখাচুখি হতেই অন্যত্র মুখ ফেরাই। চা-ওয়ালা দেখা তো আর চাঁদ দেখার মতো কোন ব্যাপার নয়। দূরে বাঁ দিকে ধস পড়েছিলো বেশ ক’দিন আগে। ভাঙাচোরা রাস্তা দেখে তা বোঝা গেলো। মাটি ধসে যাওয়া দেখাটা সবার জন্যে নয়। ধসে যেতে যেতে এই রাস্তাগুলো মিলিয়ে যাবে। মিলিয়ে যাওয়া রাস্তা নতুন বাঁক তৈরি করবে। নতুন পথ তৈরি করবে। যে পথে যেতে মানুষ জানতোই না, সেই পথই নিয়ে যাবে আরও একটা ধসে যাওয়া রাস্তার দিকে।অবিকল মানুষের জীবনের মতো।
রিনাকে বিয়ে করার আগে বা পরে কখনো ভাবি নি আমরা separation এ থাকবো। শেষের দিকে ঝগড়া হতো না। ভালো করে ঝগড়া আমরা কোনোদিনই করি নি। এতো সহজে অন্যের সমস্যা টা বুঝে নিয়ে space দিতে পারতাম যে এই space টা পরের দিকে এক দেওয়াল সমান ফাঁক তৈরি করে দিলো দুটো মানুষের মধ্যে। বলার মতো কোন কথার প্রয়োজন থাকতো না।ও খেয়েছে কিনা, ভালো আছে কিনা, কষ্টে আছে কিনা সবটাই আমি অনুভব করতে পারতাম শুরু থেকেই। ওর ক্ষেত্রেও এমনটাই। সমস্যাকে বোধ হয় সহজভাবে মেনে নেওয়াটা ঠিক নয়। নাহলে সেটা একসময় এতো স্বাভাবিক হয়ে যাবে যে আমাদেরই নিয়ন্ত্রণ করে বসবে। দুঃখ- কষ্ট বহুদিন হোল জোর করে পেতে হয়। আমি বেঁচে আছি এটা ভাবতেই মাঝে মধ্যে বিস্ময় হয়। এবং বেঁচে থেকে পাহাড় , জঙ্গল- কর্মসূত্রে যেখানে পাঠানো হয় চলে যাই নির্দ্বিধায়।
-“ উঁহা ।“
ডানদিকে ডাস্টবিন টা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো চা ওয়ালা। দেখলাম ফাঁকা ভাঁড় ধরে বসে আছি। ব্যাবহারের পর ফেলে দেওয়াটা মানুষের অভ্যেস,ইচ্ছে নয় মোটেই।
চা শেষ করে খানিকক্ষণ ভাঁড় ধরে থাকতে আমার ভালই লাগে। ভাঁড় এর তলায় কিছুটা চা- জীবন পড়ে থাকবেই। সেই ঠাণ্ডা চা এর গন্ধ চোখ মুখ নাক আচ্ছন্ন করে ফেলবে। ভাবি,পৃথিবীর সমস্ত চা এর তলানি একদিন মহাসাগর তৈরি করবে। তাতে তলিয়ে যাবো সব সুখী মানুষেরা।ভেসে যেতে যেতে হাত ধরে টেনে নেবে আমাদের শৈশব। চলে যাবো প্রথম চা খাওয়ার দিনে, জিভ পুড়িয়ে মশগুল আড্ডার দিনে,দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরী প্রেমিকার বায়না রাস্তার ভাঁড় এ চা খাবে। চা ভর্তি ভাঁড় এ যেমন অর্ধেক সফল দিন দেখতে পাই, ফাঁকা ভাঁড় এ আমি ব্যর্থতা খুঁজতে থাকি ।
ডাস্টবিনে ব্যর্থতা ফেলে উঠে দাঁড়ালাম। এতক্ষণ একটা শেড এর তলায় দাঁড়িয়েছিলাম। এখনো সেখানেই। এই শেডের তলাতেই চা এর দোকান টা। যে দোকানের কোন নাম নেই। লোকটার কোন নাম নেই। ও, না, আছে- “চা ওয়ালা”। দোকানের ওপরে ঝোলানো নেই ডিমের ঝুড়ি। রাখা নেই পাউরুটি , এমনকি শিশি তে প্রজাপতি বিস্কুট, খাস্তা বিস্কুট ও ভর্তি নেই। অদ্ভুত একটা চা এর দোকান। যথার্থও বটে। চা এর দোকানে শুধু চা পাওয়া যাওয়াই উচিৎ। চা এর সাথে “টা” নয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত পেলে সেটাও অভ্যেস হয়ে যায়। আমি সমস্ত অভ্যেসের বিরুদ্ধে।
পিছনদিকটা পাহাড়ময় । পাহাড়ের খাঁজ কেটে সিঁড়ি তৈরি করা। সিঁড়িগুলো শেওলা ও ছোট ছোট বাড়িতে ভর্তি। সিঁড়ি বেয়ে ঘুরে ঘুরে পাহাড়ে ওঠা টা স্বর্গে ওঠার মতো বলে লোকে। সবেমাত্র বৃষ্টি থেমেছে। রামধনু দেখতে পাবো কি আমি? হঠাৎ বাচ্চা হয়ে গেলাম?! না,না। মা থাকতেও ছুটে গিয়ে কখনো জানলা খুলে দেখি নি রামধনু। বরং দূরে বসে মা এর বর্ণনাতেই সেটার স্পষ্ট ছবি আঁকতাম।একটা অস্পষ্ট রামধনুর আভা পড়লো সামনের ঝুড়ি ভর্তি গুচ্ছ ভাঁড় এ। এই ভাঁড় গুলো একটা একটা করে রামধনু রঙের চা ভর্তি হয়ে যাবে আর আমার মতো সফল মানুষেরা নিয়ম ভেঙে বহুবার ভাঁড় তুলে নেবে হাতে, এই রাস্তাতেই।
স্কুল ফিরতা পাহাড়ি বাচ্চারা অন্য পথ ধরেছে। টিটোর কথা মনে পড়ছে। ওর কিছু অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। বাদামি কুকুরের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বারান্দার জানলায় বসে কাটিয়ে দিতে পারে একটাও কথা না বলে। কি দ্যাখে ও, আমার আজও জিজ্ঞেস করা হয় নি। যে কোন অশান্ত পরিবেশকেই ও শান্ত স্নিগ্ধ করে তুলতে পারে। একটা অন্যরকম সরলতা আছে ওর মধ্যে। পাহাড়ি বাচ্চাগুলোর মতো হালকা হাসি, ফোলা ফোলা গাল নিয়ে সবসময়েই আজ্ঞাকারী ভৃত্যের মতো ঘুরে বেড়ায় বাড়িময়। পড়তে বসতে না চাইলেও ওকে বকতে গেলে যে কোন মানুষেরই বুক ফেটে যাবে। ওদের বাড়ি হয়ে আসার সময়ে ছুটে এলো টিটো, একা। হাসল না, হাত নাড়ল না। স্তব্ধ হয়েছিলো। টিটোর ঐ রহস্যময় মুখ আমাকে সারাটাদিন ধরে অস্বস্তি ও ক্রমাগত দুর্যোগে ফেলেছে।
-“হ্যালো, হ্যাঁ, জেনেছ? হ্যালো... হ্যালো......আহ! হ্যালো......
হ্যাঁ। শোনা যাচ্ছে?
কতো? ৫৯? কলকাতা? উম! উনষাট হচ্ছে, “উল্টোডাঙ্গা কি?”
পাশ থেকে গলা ভেসে আসে “বাগুইয়াটি “।
হতভম্ব হয়ে এই লোকটাকে ভালো করে দেখবো বলে তড়িঘড়ি ঠিকানা বলেই ফোন রাখলাম।
-“আপনি বাঙালি? আন্দাজ করেছিলাম বটে। তবে কলকাতার? এইটা একেবারেই ভাবতে পারছি না।“
চা ওয়ালা নিরুত্তর।
অগত্যা হাসি থামিয়ে মুখ ফিরিয়ে নি।
এবারে সেই গলা থেকে ভেসে এলো সুর।
-“কতদিনে তোর করুণা হবে......”
সটান উঠে দাঁড়িয়ে তার মুখের কাছে গিয়ে প্রশ্নঃ
-“ Impossible। আপনি, আপনি একজন বাঙালি তায় আমার শহরের , কলকাতা থেকে এতো দূর একটা গ্রাম এর রাস্তায় চা বানাচ্ছেন এবং শ্যামাসংগীত গাইছেন!?! এটা হয় নাকি! ওসব বৈরাগ্য টোইরাগ্য সুখী বাঙালি জাতির কম্ম নয়। দু’ চারজন exceptions ছাড়া পাহাড় টাহাড় ওই ঘুরতেই আসে অথবা কাজে। ওই অবধি ! “
-(চা ওয়ালা) “আপনি পুলিশ?”
-“যদি বলি হ্যাঁ ?”
-“তবে আর এক কাপ চা খাওয়াবো।“
-“না, আমি পুলিশ নই।“
-“ কি ছিলাম, কোথায় ছিলাম জেনে কি করবেন!
আমি পাপ করেছি। এক কাপ করে চা এ পাপ ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করি। এ রাস্তাটা কঠিন, পথ ভুলে যারা যারা চলে আসে তাদের বিনা পয়সায় চা খাওয়াই। বিস্কুট খাওয়াতে পারি না। ওই নিচ থেকে দুধ বয়ে আনতে হয়। এই আমার কাজ। যতদিন বেঁচে থাকবো এই করবো।“
-“কিসের পাপ? এটাই বা কি ধরনের প্রায়শ্চিত্ত? আপনি কি পালিয়ে এসছেন ?”
-“বউটাকে বাঁচাতে চাই নি আমি। জ্বলতে দিয়েছি। এই হাতদুটো সায় দিয়েছিলো সেদিন। এ হাতে কয়লা জ্বালাই এখন।“
আমার সারা শরীর অসাড় হয়ে গেলো। চোখ বন্ধ হয়ে আসছিলো, মাথা ঘুরতে লাগছিলো। শব্দ করে বসে পরলাম পাথরে।একটা sheer murderer এর সাথে বসে আছি দুপুর থেকে!তবে এও মনে পড়লো, যে মানুষের জন্য আর এক মানুষের অনুভূতি গুলোকে পুরনো হতে হয় এমন মানুষকে জীবনে রাখা মানে ক্ষতিকারক জীবাণু শরীরের মধ্যে ছড়িয়ে পরতে দেওয়া। দৃঢ়কণ্ঠে বললাম, “সে যদি তোমার সাথে প্রতারণা করে থাকে তবে……”
-“তবু তাকে বাঁচিয়ে রাখা উচিৎ ছিল। বেঁচে থাকলে একসাথে দোকান চালাতাম হয়তো। এখানে নয়, কলকাতায়।“
ওই পাথরে বসেই ভাবতে থাকি। সম্পর্কে থাকাটা যদি অভ্যেস হয় তবে থাকতে না পারাটা অক্ষমতা নয়। একঘেয়ে দিনলিপির পাতা ওলটাতে থাকা ক্লান্ত মানুষ যদি পাতার ফাঁকে খুঁজে পায় পুরনো ছবির একটা মুখ, তবে সে মুখ থাক। যেভাবেই হোক থাকা প্রয়োজন। সরে গেলেও আড়াল না হয়ে থাক। কলেজের এক প্রোফেসর এর কথা মনে পড়ছে। ১২ বছরের হাতধরা তাঁর গাঁটছড়ায় গিয়েছিলো তবু বছর তিনেকের মধ্যে বিচ্ছেদ। তিনি বলতেন, “যে সম্পর্ক টা না থাকার সেটা সারাজীবন টেনে নিয়ে গেলেও শুধু টানা-ই হবে তবু একসময় ছিঁড়ে যাবেই, থাকবে না।“
একটু আগের দেখতে চাওয়া রামধনুটা এখন নিশ্চিন্ত আকাশে। শুকনো ভাঁড় এ তার অগোছালো রঙগুলোতে প্রিয়জনদের মুখ দেখতে পাচ্ছি আজ।দেখছি ময়দানের লাল টিপ শাড়ি পড়া মেয়েটা রাগ চোখে দেখে নিচ্ছে হাতের ঘড়ি ও আমাকে , আমি দেখছি ওকে। আর একটা ভাঁড় এ টিটো ও তার সাথীর শান্ত মুখ দেখতে পাচ্ছি। সম্পর্কের রাস্তাগুলো সবই পাহাড়ি, অমসৃণ, ধারওয়ালা। পাশে দাঁড়ানো লোকটি একদিন এ রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে তার সম্পর্কের অর্ধেক সম পড়ে যায় সেই খাদে। সেই থেকে তার শুরু। ইট পাথর কুড়িয়ে খাদের দিকে শক্ত দেওয়াল গাঁথা। আমি সড়ে যেতে লেগেছিলাম ওই খাদের দিকে।অজান্তে অদৃশ্য খাদ ছুঁতে যাচ্ছিলাম। উনি বাঁচালেন, কতোগুলো তাজা সত্যিকে বাঁচিয়ে রাখলেন।
ড্রাইভার কে ফোন করলাম-“বউদিকে আনতে যে গাড়িটা পাঠাতে বলেছিলাম ওটা মেকানিকের কাছে নিয়ে যাও, ব্রেক খারাপ। অন্য গাড়ি পাঠাও।“
আর এক কাপ রামধনু চা এর অর্ডার দিলাম। কলকাতা ফিরে গিয়ে হয়তো একটা সাদা কাগজ সারাজীবনের মতো ছিঁড়ে ফেলবে আমাদের দায়িত্বগুলো। তা নিয়ে সত্যি আর ভাবছি না। “সম্পর্ক” ভারী শব্দটা ভাঙলে আওয়াজটা বুক চিড়ে ফেলতে পারে। পসিটিভ কিছুই ভাবা যাচ্ছে না আপাতত। কারণ ঋণাত্মক আর ধনাত্মক মিলে শেষমেশ অনেকটা ঋণী করে দিয়ে যায় আমাদের। তাই সম্পর্কের কাছে সবাই ঋণী আমরা। আমি বা অন্য যে কেউ। এ কথাগুলো চা-ওয়ালা লোকটি বলে দেয় নি।না-ই তার রামধনু চা এ ইনজেকট করে দিয়েছে সম্পর্কের আড়াল থেকে টেনে বের করা optimist কিছু theory। বক্তব্যগুলো এলোমেলোভাবে থেকেছে বহুদিন আমার মধ্যেই। জানালায় বসলে কিছু ভাবনা হয়তো উদ্বায়ী হয়ে যাচ্ছিলো এতদিন। আজ তারা প্রবল নড়েচড়ে গিয়ে আমাকে দায়মুক্ত হতে আশ্বস্ত করছে।পাহাড়ি রাস্তা ধরতে বলছে। ফিরে যাওয়ার জন্যই চলে আসতে উৎসাহ দিচ্ছে। ফিরে আসতে বলছে কাঁটা কাঁটা বক্তব্যগুলোর দিকে।ময়দান থেকে সোজা গ্যাংটকের পথে…

আপনার মতামত জানান