হল্যান্ড ফিলিপস

সংঘমিত্রা ঘোষ

আজ সকাল থেকে মেঘ করে আছে । হাতে প্রচুর কাজ । কাজ মানে মেঠো আল রাস্তা ধরে এখন পৌঁছতে হবে কাঁদোরের পাড় । ওখানে বাঁশের সাঁকো সাবধানে ডিঙিয়ে টিফিনের খাবার পৌঁছে দিতে হবে বাবাকে । বাবা এখন মাঠের কাজ দেখাশোনা করছে , বাড়ি আসার সময় নেই । ছই তাড়াতাড়ি চুল বেঁধে নিল, লাল ফিতের বিনুনি , আকাশ রঙা ফ্রক পরে তালবোনা, দাস বাগান পেরিয়ে ছুটছে তো ছুটছেই। ধানের শিশ কুড়াতে কুড়াতে শামুক গুগলিদের সঙ্গে বকবক করতে করতে ছই যাচ্ছে কাঁদর পাড় ।
উফ্‌ফ কে ডাকছে ? সকাল নটা । ঘুম ভেঙে গেল ছই-এর । ইসস্‌ আজ আর স্কুলে যাওয়া হবে না । হেড মাস্টারকে ফোন করা, ম্যানেজ করা, ভালো লাগে না বারবার এইসব । চাকরিটা এবার ছেড়ে দেবে ছই । এই এক রোগ ছই-এর , প্রতিদিন রাতে ছোটবেলায় ফিরে যায় ও । গ্রাম, ধান খেত , আলরাস্তা, তালপুকুর ভিড় করে ওর স্বপ্নে । আজ খুব মন খারাপ করে উঠল ওর । বর্তমানটা বড্ড বেশি কঠিন । শরীর মন কোনোটাই আর বর্তমানকে স্বীকার করতে পারছে না তাই বোধ এই সব স্বপ্ন দেখার বাড়াবাড়ি । যাই হোক আজ কোনও মতেই কোনো চাপের কাজ করবে না ছই । এমন কী সকালের কাগজও পড়বে না । কী করা যায় ? ঘুরে বেড়াবে এখান সেখান? গান শুনবে ? কোপাই নদীতে পা ডুবিয়ে রবীন্দ্রনাথ পড়বে ? না না কোনোটাই ভালো লাগছে না । অনেকদিন থেকে একটা কাজ করার ছিল, কিন্তু হয়ে উঠছিল না ।
রুদ্রদা বলেছিল, ‘ছই সময় পেলে একবার আমার বাড়িটা ঘুরে আসিস কেউ তো দেখার নেই। সদাইদারও বয়স হয়েছে । মন দিয়ে কাজ করে না । আমার হল্যান্ড ফিলিপসটা মাঝে মাঝে বাজাস । তোর দিদি আর আমি অনেক শখ করে ওটা কিনেছিলাম।’ রুদ্রদারা এখন বিদেশে থাকে , কালে-ভদ্রে আসে এই বাড়িতে । পূর্বপল্লীর অন্য বাড়িগুলোর মতো এই বাড়িটাও ফাঁকা । বাড়িটার নাম ‘আয়না পাখি।’ ছই লোহার গেট খুলে ঢুকল বাগানে । সদাইদা এসে ঘরের চাবি খুলে দিল । ছই-এর এবার চা তেষ্টা পেল । জীবনে এই প্রথম চা না খেয়ে বেরিয়ে পড়েছে বাড়ি থেকে । ঘরের পিছনে কিছু প্রজাপতি ওড়া উড়ি করছে । পরদা সরাতেই উড়ে গেল । ধীরে ধীরে ও হল্যান্ড ফিলিপসটার কাছে গেল । সদাইদা রান্নাঘরে চা করছে । ছই একটু তুলো আর কাপড় নিল । ধুলো জমেছে খুব । আগে ধুলো ঝেড়ে তারপর বাজাবে । ধুলো মুছতে খুব ভালো লাগে ছই-এর । ধুলো লেগে থাকা বই, ঘর, মেঝেতে যেমন অযত্ন থাকে আবার সেটা নিজের হাতে মুছতে মুছতে একটা আদরও জমে ওঠে । এটা রুদ্রদা আর দিদির খুব প্রিয় । ওরা যখন বিয়ে করেছিল তখন এক কামরার ঘর । মেঝেতে খাট নেই, আলমারি নেই শুধু একটা বিছানা তাতে শিউলি ফুল আঁকা চাদর । অনেক কষ্টে দিদির হাতে জমেছিল তেইশ হাজার টাকা। দুজনে মিলে কী কিনবে সেটাই চিন্তার । দুজনেই গান শুনতে ভালোবাসে । ঠিক করল একটা মিউজিক সিস্টেম কিনলে হয় । নিউ মার্কেটের সিমফনি গিয়ে ওরা মিউজিক সিস্টেম দেখছিল । হঠাৎ একটা অদ্ভুত সুর শুনতে পেল দুজনেই । দোকানের ছেলেটি বলল ওটা হল্যান্ড ফিলিপসের জাদু, দাম সাতাশ হাজার । হাতে তো মাত্র তেইশ । তেইশের সঙ্গে দিদির বাড়ির পুরনো রেকর্ড জমা দিয়ে হাতে এল হল্যান্ড ফিলিপস ।
মাথার ওপর গুরু পূর্ণিমার চাঁদ, ঘরের ভেতর চাঁদের আলো । দিদি আর রুদ্রদা ওই বিছানার মধ্যেই হল্যান্ড ফিলিপসকে রেখে রাতের পর রাত গান শুনেছে । আর কিছুই নেই – মেঝেতে শিউলি ফুলের বিছানা আর হল্যান্ড ফিলিপস । হল্যান্ড ফিলিপসে টিমটিম করে জ্বলা আলো, দিদি আর রুদ্রদার চোখে ছবি আঁকছে রূপকথা । আশ্চর্য সুন্দর হয়ে উঠছে ওদের রাতগুলো ।
সদাইদার ডাকে সম্বিত ফিরে এল ছই-এর । ছই বলল , ‘সদাইদা তুমি আজ এখানেই আমার রান্না চাপাও । ঘরটাকে একটু গুছিয়ে দি।’ এর মধ্যে অনেকগুলো ফোন এসেছে । ছই মোবাইলটা বন্ধ করে দিল । বাগানে ফুটেছিল কদম, গুলঞ্চ, লতানো মাধবীলতা । এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছিল কাঠবেড়ালি । কিছু সাদা গুলঞ্চ ভেঙে ছই ফুলদানিতে সাজাল । হল্যান্ড ফিলিপসটাকে টেবিলে রেখে চৌকির চাদরটাকে টানটান করে পাতলো । রুদ্রদার আতরদানিতে রাখা আতর ছড়িয়ে দিল গোটা ঘরের আনাচে কানাচে । সদাইদা খুশি হয়ে বলল, ‘দিদিমনি ঘরে মানুষ না থাকলে কি আর ঘর মানায়?’ গোটা বাড়ি আজ গোছাবে না ছই আজ তাকে হল্যান্ড ফিলিপসে পেয়েছে । সাড়ে বারোটা বাজে । স্নানে যেতে হবে ।
বাথরুমের আয়নাতে ছই জল দিয়ে লিখল আয়না পাখি । নিজেকে ওর সত্যি পাখি বলে মনে হল । ভোর বেলাতে ফ্রক পরে এই তো গ্রামের মাঠে কাঁদোর ছুঁয়ে এলো আবার দুপুরে এখানে উড়ে আসা পাখি । দুহাতে কান চাপা দিয়ে ভিজছিল ও । ঝরনার শব্দ কাঁদোরে বয়ে চলা জলের শব্দ তার সঙ্গে একটা গান গোটা শরীরে বাজছিল । ছই কি তাহলে স্বপ্নরোগী হয়ে গেল । নিজের সারা শরীরকে অনেক ক্ষণ দেখল ও । লাল কালো যত তিল সবকটাকে ছুঁলো ।ওডিকোলনের গন্ধ উঠল বাতাসে, সাদা তোয়ালেতে ।
বাথরুম থেকে ফিরে এসে আস্তে আস্তে ছই গুঁজলো তারটাকে । বিদ্যুৎ এল হল্যান্ড ফিলিপসে । ঠাণ্ডা হাতে ছুঁয়ে দিল যন্ত্রটাকে । হল্যান্ড ফিলিপসে জ্বলে উঠল আলো । ফিসফিস করে উঠল ও । ছোটোবেলার নড়বড়ে সাঁকোর পাড়ে বসে থাকা বাঁশবনের শব্দ উঠল । সেই ঝিরঝিরে জলে পা ডুবিয়ে যে শিরশিরানি হত সেই শিরশিরানি উঠল মনে । বর্ষার ভিজে ধান জমির ছায়া পড়ল ছই-এর উপর ।
ইন্দ্র ছইকে মজা করে বলত , ‘ছই তোর ছায়া নেই রে । ছায়া আর ছই একসঙ্গে না থাকলে জমে না’ ছই দেখছে ধান জমির ছায়া পড়ছে তার ওপর । ধানবীজ উথলে পড়ছে শরীরে । হল্যান্ড ফিলিপসের রঙিন আলো তখন অলৌকিক মায়া তৈরি করছে । বেহালার সুরে সব পর্ণমোচী পাতারা উড়ে যাচ্ছে । সবুজ পাতা উপচে পড়ছে গাছে । রোদ এলে রোদন আসবে । ছই এখন অলীক জলযানে হল্যান্ড ফিলিপসের সঙ্গে আলোড়িত হচ্ছে । রোদ চায় না ও । হল্যান্ড ফিলিপসকে এখন অনেক গল্প বলবে । যে সব ঐন্দ্রজালিক আঁধারে মানুষ ডুবে আছে এই অলীক সুর এখন তাদের ছায়া দেবে । প্রতিদিন সবার একটু একটু করে গড়ে তোলা পৃথিবীতে যে সব ক্ষত জন্মাচ্ছে ছই-এর গলায় ওগুলো জমে আছে । ওগলাতে হবে, বমি করতে হবে ।
হল্যান্ড ফিলিপসে মাথা দিয়ে ছই ভাবে যে মানুষগুলো সমাহিত তারা আর কোনোদিন জেগে উঠবে না। তাদের মুখ মেঘের তুলো দিয়ে মোছালেও ফিসফিস করবে না । কিন্তু আমার শরীর জাগে । আয়না আমাকে প্রতিদিন বলে বাঁচতে হবে অতীত, বর্তমানে, ভবিষ্যতে । দূরের কদম গাছটা মাথা নাড়ায় । হল্যান্ড ফিলিপসের সেই সুর ছই-এর শরীরে স্পর্শ দেয় , ভীষণ ভীষণ আদর দেয় । বিস্তীর্ণ মাঠ সব কিছু ভাসিয়ে দেওয়া নদী ছই-এর নিজস্ব রক্তে ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে ক্রমশ । এ জগৎ থেকে ও জগতে গড়াগড়ি খায়। ছই বলে আমি পালাব না । মৃত্যু, যুদ্ধ , হেরে যাওয়া সব কিছু নিয়ে আমি থাকব । হল্যান্ড ফিলিপস তখন অলৌকিক জলযান । ছই-এ ছায়া পড়েছে । হল্যান্ড ফিলিপসে মানুষের গন্ধ উঠছে , ভালোবাসার গন্ধ উঠছে । ছইকে এখন অনেক দূর যেতে হবে ।

আপনার মতামত জানান