মাশরুম আকৃতির মেঘ

সুপ্রিয় কাঞ্জিলাল

দিনের শুরুটা কেমন রঙের হয়, আমি টের পাইনা। টের পাচ্ছি আমার অবচেতন নিয়ে কারা দু দান খেলে-টেলে চলে গেছে, আর আমার ব্রহ্মপশ্চাতে ভরে দিয়ে গেছে দুটো কাঁটা। ঘড়ির ঘণ্টা আর মিনিটের কাঁটা দুটো। ঘুমের গুষ্টি মাড়িয়ে, ক্যাঁক-ক্যাঁক-ক্যাঁক-ক ্যাঁক করে এলোর, আমার প্রতিটা দিনের শুভ আরম্ভ চটকে দেয়। তারপর হাগা-মোতা, ওঠা-বসা, খাওয়া-যাওয়া—সারাটা দিন জুড়ে ঘড়ির শাসন। বিরক্তি এতটাই চেবাতে থাকে যে, রাস্তায় ঘড়ির দোকান পড়লে, দোকানদারকে মা-বোন তুলে খিস্তি দিয়ে ফেলি মনে মনে। আমার ঘরে কোনো ঘড়ি রাখিনি। ঘরের লোকেরা জি-বাংলার সিরিয়াল দেখে সময় বুঝে নেয়। অফিসের কম্পিউটার মনিটারের ডানদিকের কোনটায়, চিউইংগাম চিটিয়ে রাখি। তাতেও লাভ হয়না খুব একটা, টের পাই পশ্চাতের কাঁটা দুটো যথাযথ পশ্চাতেই আছে। সারাটা দিন এই ভাবে অসহ্যগুলোকে দলা পাকিয়ে গিলতে গিলতে আমি অপেক্ষা করতে থাকি রাতের। বেশ্যাদের মতো অপেক্ষা।

দিনের পৃথিবীর লোকেদের কাছে যেটা রাত, সেটাই রাতের পৃথিবী নয়। রাতের পৃথিবীটা হাইড করা থাকে দিনের পৃথিবীর ফোল্ডারে। যারা ভিউ অপশনে গিয়ে ঠিকঠাক ক্লিক করতে পারে তারা টের পায় রাতের মৌতাত।

আদিখ্যেতক, মর্ষকামী, ফেসবুকজীবি এবং আরো অন্যান্য সামাজিক নিঁদ-মাড়ানিদের জন্য রাত যতোটা আহ্লাদের, আমার তার থেকেও তীব্র। রাত আমার সাধনার সময়। সত্ত্বাকে উর্দ্ধমুখী করে ইড়া-পিঙ্গলা-সুষুম্না হয়ে আজ্ঞাচক্র-ফক্রের নিবিড় ধাস্টামোর কথা বলছি না, বলছি নিজেকে নিজের চোখ দিয়ে দেখার কথা, অনুসন্ধান করে দেখার কথা। আমি দেখি। আমার লিঙ্গ থেকে আলজিভ পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখি আমি। সমগ্র অস্তিত্বকে প্রগাঢ় ভাবে দেখতে থাকি। আলো জ্বালিয়ে দেখি, আলো নিভিয়ে দেখি, তন্ন তন্ন করে দেখি আমি। দেখতে দেখতে অনুরণন হয়, দেখতে দেখতে আচ্ছন্ন লাগে। আমার ধ্যান শুরু হয়। মগ্ন অনুধ্যান।

বছর তিনেক ধরে মাথা পুরো খিঁচে রয়েছে। মুখ-টুখ খুলতে ইচ্ছে করছে না। যা দেখছি, যা পড়ছি, অল্পস্বল্প দেশকাল সম্পর্কে যা বুঝছি..... থাক সে কথা বলতে গেলে আবার খিস্তি তিষ্যটি বেরিয়ে যাবে। শালা রগরগে করে দু কথা বলতে ইচ্ছে করে। চোখের সামনে ঘটেচলা ধাষ্টামো গুলোর কলার ধরে ইইইয়া কষে লাগাতে হাত নিশপিশ করে, অথচ এঁটুলির মতো লেগে থাকা মধ্যবিত্তিপনা আমাকে প্রয়োজনীয় ধৃষ্টতা যোগান দেয়না। কেউ কেউ আওয়াজ দেয়, আমি নাকি সামাজিক-রাজনৈতিক সহ ইত্যাদি হেড্ডাবেড্ডা বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া করিনা। ঠিক, প্রতিক্রিয়া আমি করি না বটে, কিন্তু বাঞ্চোদ্দেরকে বোঝাই কী করে, চায়ের দোকানে বসে ভোটব্যাঙ্ক, ছত্রিশগড় ট্রাইব, তেলেঙ্গানা, সিডবিল, ব্লাকমানি, এফ ডি আই, রেপ, সেকুলার, রাজাকার, কাইরো, ব্রাজিল, গাজা... এসব কপচে টপছে হাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে ধন্য হয়ে ঘরে ফিরতে চেষ্টা আমিও করেছি, তাতে আমার পোষায়নি। নিজেকে ফাঁকি দেওয়া, বিড়ির আগুনের মতো জাগ্রত স্বত্বাটাকে ফাঁকি দেওয়া,- বাঞ্চোদ সস্তা নয় বে।

লোকে বলছে আমার ভাষা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। বলছে আমার কথায় গা জ্বলে যাচ্ছে লোকের। আমি বলছিনা কিছুই, বলতে খুব কাম জাগেনা আমার। শুধু আমার ঘিলুতে কাঠি করতে এলে আমি নিজের বিরক্তি সামলে রাখতে পারিনা। তবুও সাধনা করছি আমি রাতের আশ্রয়ে, ধ্যান করছি নিজের অস্বস্তির উৎসমুখ খুঁজে পেতে।

কানটা কটকট করছে দেখে, একটা ক্যালেন্ডারকে গুটিয়ে সেই রাতে ডান কানের ছিদ্রে ভরে দিতেই বাঁ কান থেকে ঝরঝর করে পড়তে শুরু করলো ধূসর অথচ বহুবর্ণের জিজ্ঞাসা চিহ্ন। কোনোটা ‘জবাব চাই’ রঙের। কোনোটার রঙ, ‘কবে হবে’। কোনোটা ‘কোথায় যাব’ রঙের, তো কোনোটার রঙ আর কতদিন। টেবিল ক্লথ থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে সে সব প্রশ্নচিহ্ন গুলো ঘরময় বিস্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে দেখে ক্যালেন্ডারটা কান থেকে বের করে নিলাম। লোকে বলছে আমি প্রতিক্রিয়া করছিনা, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়াটাও শিখতে পারলাম কই?
কান খুঁটতে ইচ্ছে করছিল আবারো, কিন্তু এতক্ষণ হাতটাকে কানের সঙ্গে L আকৃতির করে রাখার জন্য ব্যথা করছিল কচি বাইসেপসে। সিদ্ধান্ত বদলে গেল। একটু চেষ্টা চরিত্র করে পুরো মাথাটাকেই হেলমেট খোলার কায়দায় খুলে ফেললাম। সে এক ব্যাপার, দৃষ্টির ভঙ্গিটাই সিনেমাটিক হয়ে গেল। যেদিকে খুশি প্যান করো, যতোটা খুশি টিল করো, পুরো ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ। অনেকক্ষন কুরোসোয়া কুরোসোয়া খেলার পর মনে পড়ল কান খোঁটানোর ইচ্ছেটা। আবারো সিদ্ধান্ত বদল হলো। মুণ্ডুটার ডান দিকটা চেপে ধরে বাঁ কানের ছিদ্রে আঙুল ঢুকিয়ে, বিয়ারের ক্যান খোলার মতো আলতো করে খুলে ফেললাম এক ফালি করোটি। উত্তেজনায় আমার বাঁ দিকটা কাঁপছিল ঢিপঢিপ করে। কাঁপা আঙ্গুল নিয়েই আমি প্রথমবার স্পর্শ করলাম আমার নিজের, একান্তই নিজের, থকথকে, কোমল, উষ্ণ, আমার মগজ। প্রথমবার প্রেমিকার স্তন স্পর্শ করার মতো শিহরনে আমার লিঙ্গ শক্ত হয়ে উঠছিল। স্পর্শ দৃঢ় করতে করতে আঙ্গুল ক্রমশ চলে যাচ্ছিল গভীরে। টের পাচ্ছিলাম উত্তাপ। আহা: উত্তাপ। হাতে রাখা মুণ্ডুর চোখের পাতাগুলো একাগ্রতায় বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি ধ্যানস্থ হয়ে পড়ছিলাম। আমি নিজেকে দেখছিলাম চোখ বন্ধ করে। দেখছিলাম আঙ্গুলের স্পর্শ দিয়ে, অনুভূত উত্তাপ দিয়ে। দেখছিলাম নাকি টের পাচ্ছিলাম একটা মাশরুম আকৃতির মেঘ। মেরুদণ্ডের উৎস থেকে ঊর্ধ্বমুখী, মানবিক বিস্ফোরণের দাহ নিয়ে মস্তিষ্কে ভর করা মাশরুম আকৃতির একটা মেঘ।
বিস্ফোরণ পারমাণবিক হোক বা মানবিক, বিপর্যয়ের স্মারক হয়ে জেগে থাকে মাশরুম আকৃতির একটা মেঘ। সেই সঙ্গে অনিবার্য ভাবে বিকীর্ণ হয় রেডিয়েশন। রেডিয়েশন আমার শব্দভাণ্ডার কে গনগনে করে তুলছে কি না আমি জানিনা, জানি না এর সঙ্গে আমার কথায় লোকের গা জ্বলে যাওয়ার কোনো সম্পর্ক আছে কি না। আপাতত আমি জানতে চাইছি দিনের শুরুটা দেখতে কেমন রঙের হয়।

আপনার মতামত জানান