জন্মদিনের দিন

সুপ্রভাত রায়

ছবি- চারকোল



সিগারেটের ছাইটা আগুন সমেত জিনস্‌-এর উপর এসে পড়ল। ঝাড়তে ঝাড়তে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল অভিমান। আজ তার জন্মদিন, আরো এক টা বছরের পুড়ে যাওয়া। কলেজ শেষ, বন্ধুরা ফিকে হতে শুরু করেছে ক্রমশ... বন্ধ ক্যমপিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে অনেকক্ষন ধরে কি একটা ভাবছিল সে। সন্ধে, বাড়িতে কেউ নেই। অভিমান ভাবছে মৃত্যু। চেয়ার থেকে উঠে টিভির সামনে গিয়ে বসল। টিভি চালাল। একটার পর একটা চ্যানেল পার করল, দিয়ে ঝিলঝিল করে দিল। কিছুক্ষন সেটাই চলল। সেই ছোটবেলায় তারা যখন একটা বাড়িতে ভাড়া থাকত। তখন উঠোনে অ্যান্টেনা পোঁতা ছিল । ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছবি আনতে হত। বাবা ঘোরাতো আর অভিমান ছোট ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টিভিটার দিকে তাকিয়ে ‘এসেছে এসেছে’ বলে চিৎকার করে উঠত উল্লাসে। মা ঘর গোছাতে গোছাতে দেখত। এখন ঘরে কেউ নেই, বাবা মা কেউ নেই। রিমোটটা রেখে বাথরুমে ঢুকল অভিমান। পেচ্ছাপ করল। তারপর কল খুলে দাঁড়িয়ে থাকল। জল পড়ছে ঝরঝর করে... জল পড়ছে আর ভিজে যাচ্ছে পা। সেবার বাবা মায়ের সাথে প্রথম পুরী গেছিল সে। সমুদ্রের ধারে হাফ প্যান্ট বয়সে দাঁড়িয়েছিল। ঢেউ এসে পা ধুয়ে দিয়েছিল তার প্রথম। একটু একটু করে যেন বড়ও করে দিয়ে গেছিল তাকে। একটা লোক ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলে দিয়েছিল। কি অবাক করে সেই লোকটাই হোটেলে এসে ছবি দিয়ে টাকা নিয়ে গেছিল বাবার কাছে। কলটা বন্ধ করে দিল। বাথরুম থেকে বেরিয়ে নিজের টেবিলের সামনে এল। এটাসেটা ছড়ানো। একটা খাতার ভিতর থেকে সেই ছবিটা বের করল। লালচে হয়ে আসা একটা ছবি। রেখে দিল। খাতা খুলে লিখল ‘জন্মদিন’। কেটে দিল। লিখল ‘মৃত্যুদিন’। কেটে দিল। খাতাটা রেখে দিয়ে ফোনটা নিয়ে দেখল তেরোটা মিসড্‌ কল্‌ আর তিনটে মেসেজ। ফোনটা বন্ধ করে দিল। সিগারেটের প্যাকেট, দেশলাই, ফোন নিয়ে তালা লাগিয়ে চাবিটা রেখে দিয়ে বেরিয়ে আসে অভিমান বাড়ি থেকে। তার বাড়িতে কেউ মনে রাখেনি আজ তার জন্মদিন। এটা প্রথমবার না। অভিমান আগেও দেখেছে , বাবা মা কেউ মনে রাখেনি। রাতে বাড়ি ফিরে দু’জন দু’জন কে দোষ দিয়ে ঝগড়া করেছে। পাড়ার রাস্তায় গলিগুলোকে পেরোতে পেরোতে স্টেশনের দিকে এগোতে থাকল অভিমান। আলগা ভিড় নিয়ে সন্ধের স্টেশন মোড়। তাদের বাড়ি থেকে কাছেই। অভিমান যেন আস্তে আস্তে নিজের কাছে ফুরিয়ে আসছে। কোনোদিন তাকে নিয়ে কেউ উৎফুল্ল হয়নি। পড়াশুনোতেও কোনোদিন ভাল ছিল না সে। সব পরীক্ষায় সাধারনের দুটো দাগ পেয়ে এসেছে। বাবা ভাবত ডাক্তার হবে ছেলে। ডক্টর বানান শিখিয়েছিল অনেক ছোট বেলায়। তখনও নিজের নামের ইংরেজি বানান শেখেনি অভিমান। তারপর সে ব্যর্থ হতে থাকে। একটার পর একটা পরীক্ষায় ব্যর্থ হতে থাকে। এবং জানিয়ে দিতে থাকে সে খুব সাধারন মাপের স্টুডেন্ট। বাবামায়ের উৎসাহ ফুরোতে থাকে তাকে ঘিরে। ফুটপাথের একটা খাবার দোকানের বেঞ্চে বসল অভিমান। এই দোকানটা সন্ধে থেকে সারারাত খোলা থাকে। তরকা রুটি ঘুগনি মাংস চা এসব বিক্রি হয় সারাসারা রাত। অনেক অনেক রাতের দিকে ডিমটোষ্ট ছাড়া খুব একটা কিছু পাওয়া যায় না। রাতের দিকে সে এসেছে। ডিম সেদ্ধ আর চা খেয়ে আবার ফিরে গ্যাছে। মেঘাদা ছিল পাগল। ওই রকম তেড়ে আসা দাঁতমুখ বের করা পাগল না। তাদের পাড়ায় আসত । কেউ কেউ ‘এই মেঘা শোলের ডায়লগটা বলতো দেখি’ বললেই ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ‘আরে ও শামা কিত্‌নে ইনাম রক্‌খে হ্যায় রে সরকার...’ থেকে শুরু করে দিত। গরগর করে মুখস্থ বলত। ‘যা... যা’ বললে আবার মাথা নাড়তে নাড়তে চলে যেত। পাড়ার কেউ জ্বলাত না ওকে। এখানে ওখানে ঘুমিয়ে পড়ত। কি হতে চেয়েছিল ছোটবেলায় মেঘাদা? অভিমানেরও এখন আর মনে পড়ে না কি হতে চেয়েছিল সে ছোটবেলায় ! এই ভিড়টা একটা অলস ভিড়, ফলের দোকানগুলো থেকে ঝুলে থাকা আলো—রিক্সা চেপে ট্রেন ধরতে আসা লোক; কারোর জীবনে খুব বেশি তাড়া নেই। অভিমান ভাবছে মৃত্যু। একটা মানুষের মাথার ভিতর কি চলে পাশে বসেও আর একটা মানুষ বুঝতেই পারে না। আরো একটা সিগারেট ধরাতে গিয়ে রেখে দিল। এক প্লেট ঘুগনি নিল। খেল। তারপর পয়সা দিয়ে, সিগারেটটা ধরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনের দিকে এগোতে থাকল। চটিটা ছিঁড়ে গেছিল। সাদা আলোর সন্ধের স্টেশন। ফাঁকা ফাঁকা। ট্রেন ঢুকলে ভিড় হয়। রিক্সাওয়ালারা এগিয়ে আসে। সাতটা কুড়িতে ইন্টার সিটি এক্সপ্রেস ঢুকবে। এখন স্টেশনের ডিজিটাল ঘড়িতে সাড়েছ’টা। ওই উঁচু আলোটার ঠিক নিচেই একটা মুচি বসে। চটিটা সারিয়ে নিল অভিমান। সেলাই করে দিল লোকটা। দু’টাকা নিল। যেবার মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোলো বাবা বলেছিল, ‘ছেলের রেজাল্টের জন্যে তো ক’দিন বাড়ি থেকে বেরোনো যাবে না দেখছি’। শুনতে পেয়েছিল সে। কাঁদেনি। তাদের পাড়ায় তিনজন স্টার পেয়েছিল। অপূর্ব পেয়েছিল স্টার, তার পাশের বাড়ির বন্ধু। ওর পিসির মেয়ে আসত পুজোর সময় বাবা মায়ের সাথে। শ্রাবণ। শ্রাবণকে খুব ভাল লাগত অভিমানের সেই ছোটবেলা থেকে। অষ্টমীতে শাড়ি পড়ত শ্রাবণ—তাকে কি যে বড়বড় লাগত। আলো মেখে এগিয়ে আসত শ্রাবণ। মানাত না, অভিমানকে তার পাশে একদমই মানাত না। একবার হঠাৎ আসা বন্ধ করে দিল শ্রাবণরা। অভিমানের পুজোয় মেঘ করে এল সেবার থেকে। আসলে এসব কিছুই না, অভিমান ভাবছে মৃত্যু। সাতটা কুড়িতে ইন্টার সিটি ঢুকবে, এক্সপ্রেস ট্রেন। প্ল্যাটফর্ম টিকিট লাগে না ঢুকতে গেলে। লাগে না মানে কেউ কাটে না, কেউ দ্যাখেও না। একটা মেটাল ডিটেকট্‌র বসানো। অভিমান ভাবলো একটা মানুষ যখন আত্মহত্যা ভেবে মেটাল ডিটেকট্‌র পেরোচ্ছে, তখন সেই যন্ত্র কি ভাবে ? এই যে নিজের ভিতর ভিতর বয়ে বেরানো আত্মহত্যা প্রবনতা; কোন আলো জ্বেলে জানান দেবে সে। কাকে কাকে সবথেকে বেশি মনে পড়ছে অভিমানের? মা? গুমটির দোকানের বুড়োটা? পায়েলদি ? অমল? বিল্টুদা ? ছোটোপিসি ? কাকে বলে যেতে ইচ্ছে করছে ? জানে না। অল্প অল্প সন্ধের হাওয়ায় কিছু পাতা উড়ে গেল এটিএম কাউন্টারটার দিকে। পাশে যে ছেলেটা সারাক্ষন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা বিক্রি করে, সে খুচরো গুনছে। একবার ক্লাস ফাইভ এ পড়ার সময় একটা একটাকার কয়েনকে রেললাইন-এর উপর শুইয়ে দিয়েছিল। তার উপর দিয়ে ট্রেন পেরিয়ে যাবার পর কয়েনটা চাকতির মতো বড় হয়ে গেছিল। ওটা আর টাকা ছিল না। ওই এক টাকার কয়েনটাকে সেদিন কি মৃত ঘোষনা করেছিল অভিমান? ওভার ব্রিজ পেরোতে গিয়ে একটা হোঁচট খেল। চটিটা আবার ছিঁড়ে গেল। এক নম্বর প্লাটফর্মের একটু শেষের দিকে একটা বাঁধানো গাছতলায় বসল অভিমান। সিগারেট বের করল। দেশলাইটা হাতে নিয়ে এপকেট সেপকেট খুঁজল...তারপর খুঁজে পেয়ে ধরালো সিগারেটটা। অভিমানের পিঠে হাত দিয়ে ডাকল একজন। চমকে উঠে ঘুরে তাকিয়ে দেখল একটা লোক তার কাছে দেশলাই চাইছে। নিজেকে সামলে নিয়ে দেশলাইটা বারিয়ে দিল সে। লোকটা সিগারেটটা ধরিয়ে পাশে সরে গেল। আর কুড়ি মিনিট পর ট্রেনটা ঢুকবে। সিগারেটটা শেষ করে ফোনটা বের করল পকেট থেকে। অন্‌ ,করল। সব মেসেজ সেনট্‌ আইটেমস্‌ কনট্যাক্টস্‌ ডিলিট করে দিল। ফোনটা বন্ধ করে পাশে রাখল। আবার সিগারেট ধরালো অভিমান। সমস্ত আয়নারা আস্তে আস্তে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তার কাছ থেকে। নিজের কাছে নিজে ফিকে হয়ে এসেছে ক্রমশ। পায়ের কাছে অনেকগুলো সিগারেটের পোড়া ফিল্টার পড়ে। অভিমান ভাবছে মৃত্যু। মাথার জনলাগুলো সব যেন বন্ধ হয়ে আসছে। একটা হেরে যাওয়া মানুষের পৃথিবীর কাছে ফুরিয়ে আসার সময়। কোনো পিছুটান তাকে ছুঁতে পারছে না। কোনো সুইসাইড নোট রেখে আসেনি সে। কি লিখত, আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয় ? কোনো একটা কারণ কে তো সে দোষ দিতে চাইনি। কোনো একটা ঘটনাকেউ না। অভিমান যেন অনেকগুলো বছর ধরে আস্তে আস্তে এগিয়েছে মৃত্যুর প্ল্যাটফর্মের দিকে মনে মনে। আজ শুধু শরীরের ঝাঁপটা দিয়ে দেওয়ার দিন। শেষ সিগারেটটা ধরালো অভিমান। ট্রেন ঢুকছে। দু’টান টেনেই মাটিতে ফেলে পিষে দিল পায়ে করে। ট্রেন ঢুকছে... শার্টটা খুলে ফ্যালে সে। ওটা দিয়ে কানামাছির মতো চোখটা বেঁধে নেয়। ট্রেন ঢুকছে, অভিমান ঝঁপাবে। ঠিক অভিমানের ঝাঁপাতে যাওয়ার আগের মুহূর্তে একটা তীব্র হইহল্লা তাকে চমকে দেয়। যেন এক গভীর ঘুমের ঘোর থেকে ফেরে সে। একটানে চোখ থেকে বাঁধন খুলে ফ্যালে। লোকজন ছুটে আসছে এইদিকে... আর ট্রেন পেরিয়ে যাবার পর তার থেকে ঠিক একটু সামনের দিকে রেল লাইনে একটা লোক পড়ে। যে এখন লাশ হয়ে গ্যাছে। কোথাও একটুও রক্ত লেগে নেই। অভিমানের আগেই ঝাঁপিয়ে দিয়েছে লোকটা, যে একটু আগেই অভিমানের কাছে আগুন চেয়েছিলো। শার্ট পড়তে পড়তে আত্মহত্যা মুলতুবি রেখে ভিড়টার দিকে এগিয়ে গেল অভিমান...

আপনার মতামত জানান