অনুপমের গল্প

তুষ্টি ভট্টাচার্য্য


এটা অনুপমের গল্প । অনুপমের চোখের ডাক্তার না হয়ে মনের ডাক্তার হওয়া উচিত ছিল । এ কথা ও নিজেও ভালো জানে । কিন্তু পাকে চক্রে আর তা হয় নি । তবে অনুপমের গল্প বলার আগে অনুপমের নিজের সম্বন্ধে ওর নিজের কিছু কথা শুনুন ।
আমি অনুপম । বাবা পেশায় শিক্ষক ছিলেন । দাদু ছিলেন চোখের ডাক্তার । আমি আর আমার দিদি দুজনেই মেধাবী ছিলাম । দুজনেই ডাক্তারীতে চান্স পেয়ে গেছিলাম । বাবা খুব কষ্ট করে আমাদের পড়ার খরচা চালিয়েছিলেন । আমরাও সেটা উপলব্ধি করতাম , তাগিদ ছিল ভেতরের , তাই ফাঁকি দিই নি আমরা । দিদি হয়েছিল এমডি আর আমি দাদুর পথ ধরে চক্ষু বিশেষজ্ঞ । এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই চলেছিল । কলেজে পড়ার সময়ে একটা প্রেমপর্বও ঘটেছিল । এবং যথারীতি পরিণতি পায় নি । এরপরেই আমার মধ্যে একটা পরিবর্তন আসে । আমার মধ্যে যে সুবোধ-বালকটি ছিল , সে উড়ে পালায় ডানা মেলে । আমার এক গুরুদেব জুটে যায় , যার থেকে পাওয়া শিক্ষা , আজও আমার কাজে লাগছে । না , মানুষ হিসেবে আমি মোটেই খারাপ না । মরালিটি এখনও আছে , ডাক্তার হিসেবে সুনামও আছে , গরীব মানুষকে বিনে পয়সায় চিকিৎসা করি , স্যাম্পেল ওষুধ দিই । হসপিটালে রেফার করে অপারেশনের ব্যবস্থা করে দিই । শুধু ওই গুরুদেবের দয়ায় নারীশক্তি আমার সহায় । মেয়েরা চুম্বকের মত আমার দিকে আকর্ষিত হয় । আমিও বেশি সময় নিই না । আর কেউ যদি এগিয়ে না আসে , তাকে পটাতে , সে যত সুন্দরীই হোক না কেন , পাঁচদিনের বেশি সময় নিই না । তাই বলে আমাকে লুচ্চা ভাবার কোনো কারন নেই । আমি কাউকে এক্সপ্লয়েট করি না । সবার সাথেই আমার বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায় ।
অনুপম প্রায় একশ ভাগ সত্যি বলেছে নিজের সম্বন্ধে । শুধু একটা কথা লুকিয়েছে , মেয়েরা যেমন ওর দিকে চুম্বকের মত আকর্ষিত হয় , ও নিজেও তেমনি মেয়ে দেখলেই ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ে । শরীর-টরিরের টান তো আছেই , কে আর কবে ঘি আর আগুনকে আলাদা রাখতে পেরেছে ! সেসব বাদ দিয়েই বলছি , এই টান কেবল জৈবিক না , একটা অন্যরকম ব্যাপার এটা । আসলে অনুপম মেয়েদের সাথে কথা বলে ভীষণ ইন্সপায়ার্ড হয় , এক একটা ফোন সেশান ওকে যেন দীর্ঘ রোগমুক্তির স্বস্তি এনে দেয় । হোয়াটস অ্যাপ , ফেসবুকে শুধু মেয়েদের সাথে কথা বলে ও । ওর হাঁটুর বয়সী থেকে শুরু করে বেশি বয়সী , পছন্দ হলেই হল । তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে , মানে তেমন কেউ স্পেশাল রূপ -গুণের অধিকারী হলে তার জন্য থাকে স্পেশাল ব্যবস্থা । যেমন কেউ যদি গান ভালোবাসে , বা গান গায়-টায় , ও ওর বিশাল স্টক থেকে তার পছন্দ মত গান সাপ্লাই করতে থাকে ইউ টিউবে । ব্যাস , সে তো গলে জল । এবার যদি কেউ খুব পড়ুয়া হয় বা লেখা-টেখার বাতিক থাকে , তাকেও পৌঁছে দিতে থাকে তার মনের মত রসদ । আর হ্যাঁ , এইসব ও কিন্তু মন দিয়েই করে , নেহাত ফ্লার্ট করতে হবে বলে করা , এই মনোভাব নিয়ে কিছু করে না ও , ভালোবেসেই করে । অনুপমের প্রতিভা আছে , এটা মানতেই হবে একবাক্যে ।
আমি যখন ইলেভেনে পড়ি , একটি মেয়ের সাথে আমার খুব বন্ধুত্ব হয়ে যায় । শুধুই বন্ধুত্ব , এছাড়া আর কোনো ফিলিংস আমার কাজ করত না । যদিও কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পেরেছিলাম ওর তরফ থেকে কিন্তু প্রেম আসছে । আমি তখন মুখচোরা , শান্ত ছেলে । তার ওপর জন্মগত মৃগীরোগ । কিছুদিনের মধ্যেই তার বিয়ের সম্বন্ধ আসতে শুরু করল । আমায় ডেকে আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিল , ও বিয়ে করতে চায় না , আমার জন্য অপেক্ষায় থাকবে । আমি কোনো সাড়া দিতে পারিনি সেদিন । একে তো তখন অতটুকু বয়স , তার ওপর রোগের হুমকি , এছাড়াও সেরকম ভাবে প্রেম বুঝিনি আমার তরফ থেকে । চুপচাপ কেটে পড়লাম সেদিন । এরপর ডাক্তারি পড়তে চলে গেলাম । তার বিয়ে হয়ে গেল । বুকের ভেতর একটা ফাঁকা ফাঁকা অনুভূতি এলো কিছুদিন , তারপর কেটেও গেল । এরপর কলেজে একটি মেয়ের সাথে সিরিয়াস প্রেম হয়ে গেল । বেশ চলছিল এই পর্বটা । কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারলাম , এ প্রচন্ড ওপরে উঠতে চাওয়া মেয়ে । আমাকে মই ভাবছে । বাড়ি , গাড়ি , বিদেশভ্রমণ , আর যত্ত রকম পার্থিব সুখ আছে , সব পেতে চায় । আমার মত সাধারণ মানুষের পক্ষে তা অসম্ভব । পাস করে যদি একটা চাকরী পাই , দুচারটে চেম্বার করি , তাতেও ওর ডিম্যান্ড মিটবে না । এসব বোঝাবুঝির মধ্যেও কিন্তু প্রেমটা আমার রয়েই গেছিল ওর প্রতি ।
আমি যেটুকু অনুপমকে চিনি , তাতে বুঝি , সে ইলেভেনের বান্ধবীর প্রেমেও ও পড়েছিল , কিন্তু তখন ওর সাহসে কুলোয় নি বলে পিছিয়ে এসেছিল । যদিও অনুপম ভবিষ্যতে তার হাত থেকে নিস্তার পায় নি একদিনের জন্যও । এ কিস্যা আমরা ওর মুখ থেকেই শুনব একটু বাদেই । আর কলেজে যার প্রেমে ও পড়েছিল , সত্যি কথা বলতে কি , এখনও ওনুপমের মনে ওই মেয়েটির প্রতি দুর্বলতা রয়ে গেছে । বাদবাকি অনুপম যেমন প্রায় নব্বই ভাগ সত্যি বলে , তেমনই বলেছে ওর নিজের কথা । এরই মধ্যে ওর প্রেমিকার এক বান্ধবীর সাথে পরিচয় হল ওর । সেই মেয়েটাও কেন জানি ঝুঁকে গেল অনুপমের দিকে । আসলে ওর কপালটাই এমন । আর ও নিজেও তো মেয়েদের ব্যাপারে অতি আগ্রহী । তাই ক্রমশ দেখলাম এর সাথেও বেশ ভাব জমিয়ে ফেলেছে অনুপম ।
আমার সেই মিষ্টি প্রেমিকা এবার আমায় প্যাঁচে ফেলতে লাগল । একের পর এক অদ্ভুত খেয়াল আমার ওপর চাপিয়ে দিতে লাগল । আমি কাউকে তেলিয়ে চলতে পারি না , স্বাভাবিকভাবেই তাই খুঁটিনাটি নিয়ে ঝগড়া চলতে লাগল । ওর বাড়িতে আমি যেতাম , ওর বাবা-মা আমায় মেনে নিয়েছিল । একদিন ও দুম করে চলে গেল , বলে গেল – কাল যদি তুমি আমার বাড়ি গিয়ে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব না দাও , এই সম্পর্ক এখানেই শেষ । ও চলে গেল , ওর সাথে সেই আমার শেষ দেখা । আমি অবশ্যই যেতাম ওদের বাড়ি , কিন্তু আমার জীবনের মোড় ঘুড়িয়ে দিল আমার বর্তমান স্ত্রী , মানে ওর বান্ধবী ! সে আমার ওপর খুব আগ্রহী হয়ে পড়েছিল , ওর বাড়ি থেকেও বিয়ের চাপ দিচ্ছিল , পাত্র হিসেবে সে তাই আমাকেই বেছে রেখেছিল । অথচ আমাদের প্রেমের কথা ও জানত ওর বান্ধবীর মুখ থেকেই । আমাদের মনমালিন্যের কথাও জানত । সেই সুযোগটা ও কাজে লাগিয়ে নিল সময় বুঝে । আমায় কিছু না জানিয়ে , আমার আগেই সটান অনেক সকালে ও পৌঁছে গেছিল ওর বান্ধবীর বাড়ি । এবং সেখানে জাহির করে এসেছিল নিজের কথা – আমরা বিয়ে করছি ! ব্যাস , সেই শেষ , আমার প্রথম প্রেম শেষ ।
এবার থেকে মন দিলাম সেই বান্ধবীর দিকে । সত্যি বলতে কি , এই মানুষটা বেশ । সহজ , সরল , আমাকে ভালোওবাসে খুব । শুধু একটু রাগী , এই যা... আর গানও ভালো গায় । এই গানের টানেই ওর ওপর আমার টান বাড়তে থাকল একটু একটু করে । বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম শেষমেশ । আমার বৌ শহুরে মেয়ে , আমাদের মফঃস্বল এলাকায় থাকতে বোধহয় ওর অসুবিধে হচ্ছিল । সদ্য বিয়ের পরে যে শরীরের নেশা থাকে , সেটাকেও কাটিয়ে উঠতে ও একটুও সময় নষ্ট করল না । বিয়ের কয়েকদিনের মধ্যে ও এক চাকরী জুটিয়ে নিয়ে বাইরে চলে যাবে ঠিক করল । আমি সত্যি কথা বলতে কি , এই প্রথম একটু বিধ্বস্ত হয়ে পড়লাম । বিয়ের পর ভেবেছিলাম এবার একটু থিতু হব , নির্ভরশীল হব , আসলে বয়স বাড়ছিল তো ! কিন্তু তা হওয়ার ছিল না । যা ভেবেছিলাম , তার উল্টো ঘটে গেল আমার জীবনে । সেই মুহুর্তে আমার বাবার মধ্যস্থতায় ও দূরে যাওয়া বন্ধ করল বটে , কিন্তু এমন এক চাকরী জোগাড় করল যাতে ওকে খুব সকালে বেড়িয়ে যেতে হয় আর ফিরতে ফিরতে রাত । আমার ওর চাকরী করায় কোনো আপত্তি ছিল না , ওর যা যোগ্যতা তাতে ও কাছাকাছি অনেক ভালো কিছু জুটিয়ে নিতে পারত । কিন্তু তা করল না আর গানও ছেড়ে দিল । ওর এত ভালো গলা ছিল , শুধু চিৎকার-চেঁচামেচি করে নষ্ট করে দিল । বছর ঘুরতে না ঘুরতে আমাদের ছেলে এলো । আমারও ট্র্যান্সফার হয়ে গেল । বাড়ি ছেড়ে অনেক দূরে গিয়ে থাকতে শুরু করলাম । আমার এই একলা জীবনটা বেশ লাগত । মাসে একবার বাড়ি ফিরে ছেলের সাথে খুনসুটি করতাম , ছেলের ওপর বড্ড মায়া বাড়ছিল ।
ছেলে স্কুল যাওয়া শুরু করলে আমি আবার বাড়ির কাছাকাছি চলে এলাম । ওর সমস্ত দায়িত্ব আমি নিয়ে নিয়েছিলাম । তার মা তো অফিস নিয়েই ব্যস্ত । আমি হসপিটালের ডিউটি সেরে বাড়িতেই থাকতাম , ওকে সঙ্গ দিতাম । সব চেম্বার ছেড়ে দিয়েছিলাম । আমার হাতের ওপর বড় হচ্ছিল আমার সন্তান । কিন্তু ভাগ্য আমাকে ছাড়ল না । আবার এক মায়াবিনীর শিকার হলাম । বৌকে লুকিয়ে চলল আমাদের প্রেম পর্ব । হ্যাঁ , প্রেমে পড়লাম আবার । আমার নিজেকে খুব অসহায় লাগত তখন , এরকমটা তো হওয়ার কথা ছিল না । আমি কি চেয়েছিলাম প্রেমে পড়তে ? ওই মায়াবিনীই তো বাধ্য করল প্রায় । আমি আর ওই বাঁধন কেটে উঠতে পারলাম না । ভয়ংকর , ধুন্ধুমার এক প্রেম পর্ব চলতে লাগল । এদিকে আবার আমার অল্প বয়সেই চুলগুলো পেকে যাচ্ছিল । সে তো একদিন গার্নিয়ের লাগিয়েই ছাড়ল আমায় । ব্যাস চুল কালো করেই পড়লাম বিপাকে । বৌয়ের মনে সন্দেহ ঢুকল । আর তারপরই মোবাইল-টোবাইল ঘেঁটে মেসেজ দেখে বুঝে গেল সব । আর তারপর – যা হওয়ার তাইই হল । মায়াবিনীকে চার্জ করল ও । এরপরেই কিন্তু শুরু হল আসল খেলা । আমার সেই মায়াবিনী নিজেকে একদম সেফ সাইডে রেখে পুরো দোষটা আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিল । ও আমার সমস্ত মেসেজ যত্ন করে রেখে দিয়েছিল । সব দেখিয়ে দিল বৌকে । এতে প্রমাণ হয়ে গেল আমিই ওকে সিডিউস করেছি । আর আমার কাছে দেখানোর মত কিচ্ছু নেই , সব আগেই মুছে ফেলেছিলাম । আমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভেঙে গেল প্রায় ।
এতক্ষণ আমি চুপ করে ছিলাম , আনুপমের কথা শুনছিলাম মন দিয়ে । এবার আর না বলে পারলাম না । আসলে যে ভেতরে ভেতরে অনুপম ক্ষয়ে যাচ্ছিল , ভীষণ রকম বোর হয়ে যাচ্ছিল , সেটা ও চেপে গেল । এই মায়াবিনীর জন্য ও নিজেও কম মরিয়া হয়ে ওঠে নি । আরও একটা মারাত্মক চ্যাপ্টার ও চেপে যাচ্ছে । বরাবরই ব্যাপারটাকে গুরুত্বহীন দাবী করে আসছে , এখনও করে । সেই ক্লাস ইলেভেনের বান্ধবীর সাথেও ওর সম্পর্ক আবার নতুন করে শুরু হয়েছে । যবে থেকে ও বাড়িতে চলে এসেছে , আবার যোগাযোগ হয়েছে ওদের । সেই বান্ধবী এখনও ভুলতে পারে নি ওকে । বিবাহিত জীবন খুব একটা সুখের হয় নি তার । মেয়ে বড় হয়েছে , সেই তার বন্ধু । একটা গানের স্কুল খুলেছে সে আর অনুপম মিলে । রোজ একবার করে অনুপম ওই বান্ধবীর বাড়ি যায় , নিয়মিত ফোনে কথা হয় । বান্ধবীর স্বামীও কেন যেন সব মেনে নিয়েছে । হয়ত মেরুদন্ড নেই তার কিম্বা বুঝেছে আটকানো যাবে না এদের । তবে এটা ঠিক অনুপমের ওপর খুব নির্ভর করে এই বান্ধবী । ওর মেয়েও সব জানে আর মনে মনে সাপোর্টও করে দুজনকে । আসলে এই বর্তমান প্রজন্ম খুব উদার মনের । তো , ইনি যেমন রয়েই গেছেন , যা মনে হচ্ছে – থেকেও যাবেন আজীবন , সেই মায়াবিনী কিন্তু বড় দাগ রেখে চলে গেছে । বৌয়ের সঙ্গে একঘরে থাকে না অনুপম , বলা ভালো , বৌ-ই থাকে না ।
আমি এখন রিটায়ার করেছি । নানা , চাকরী থেকে না , মহিলাদের থেকে । আমার চুল অকালে প্রায় সব পেকে গেছে । এরই মধ্যে আবার হার্টের মারাত্মক কিছু কমপ্লিকেশান দেখা দিয়েছে । আমার হৃদয় নাকি বড় ! এটাই ঘটনা আর সমস্যার মূল । একমাত্র হৃদয় পরিবর্তন করলে সুরাহা মিলতে পারে , যা এদেশে প্রায় অসম্ভব আর বিদেশে গিয়ে অসব করা আমার সাধ্যের অতীত । আবার বাড়ি থেকে বহুদূরে গ্রামে বদলি হয়ে গেছি । খুব ভোরে উঠে বেড়িয়ে পড়ি । সারাদিন পাঁচ ঘন্টা জার্নি করে বিধ্বস্ত অবস্থায় বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে বসি । এই মা , যার দিকে তাকালে আমি এনার্জি পাই ভেতর থেকে । মনে হয় , হ্যাঁ , বাঁচতে হবে আরো অনেকদিন । ছেলে-বৌকে কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছি , ছেলে ওখানেই কলেজে পড়ছে । আমি ছেলেটাকে ভীষণ মিস করি , ইনফ্যাক্ট ও চলে যাওয়ার পর আমি মানসিক ভাবে খুব ভেঙে পড়েছিলাম । আবার কাটিয়ে উঠেছি সব । দিনরাত খাটি চেম্বারে । পয়সা জমাই ছেলের উচ্চ শিক্ষার জন্য । এভাবেই চলে যাচ্ছে আমার । মাঝে মাঝে শরীর সাথী হয় না , বছরে একবার করে ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ঘুরে আসি কয়েকদিনের জন্য । আমার বাইকটাকে খুব জোরে চালাই আজকাল । তেল ফুরিয়ে আসার আগে যতটা চলা যায় আর কি ! আমার চেম্বারে বা কাছেপিঠে মেয়েরা আসে , তাকিয়ে দেখি । হয়ত ফোনে কথা-টথাও হয় । কিন্তু আর জড়াতে পারি না , এড়িয়ে যাই শেষ পর্যন্ত । এভাবেই কেটে যাবে শেষ দিন পর্যন্ত , আমি জানি ।
কিছুদিন আগেও অনুপমকে ঘনিষ্ট মহলে বলতে শুনেছি – একমাত্র সেই প্রথম প্রেমই নাকি এখনও জিইয়ে আছে ওর ভেতরে । ওর কথা মনে এলেই একটা শিরশিরানি টের পায় বুকের ভেতর । ও এখন বিয়ে করে দিল্লীতে সেটেল্ড , এটুকু জানে । একদিন ওর এক পুরনো বান্ধবী দিল্লীওয়ালীর খবর দিল । ফেসবুকে ফ্রেন্ড হয়ে গেল সে আবার । কিন্তু দুজনেই ফেসবুকে অনিয়মিত আর কথা বলতেও একটা দ্বিধা কাজ করছিল । অনুপম ভীষণভাবে ওর ফোন নাম্বার চাইছিল , একবার শেষবারের মত ওর সাথে কথা বলার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল । কেন সেদিন যেতে পারেনি ওর বাড়ি , ঠিক কি পরিস্থিতির শিকার হয়েছিল ও , এটা না বোঝালে চিরকাল অপরাধী হয়ে থেকে যেতে হবে ওকে । যাই হোক , শেষপর্যন্ত পাওয়া গেল নাম্বার । ফোনাফুনি হল , অনেক মানভিমানের পালা শুরু হল । আবার পুরনো প্রেম ঝালিয়ে নিতে লাগল ওরা । একদিন দেখা করার সুযোগও এসে গেল । কনফারেন্সে গেল দিল্লী , সঙ্গে ছেলেকে নিল অনুপম ।
দিল্লী যাওয়ার সময়ে ট্রেনেই ছেলেকে বললাম – আমার এক পুরনো বান্ধবীর সাথে আলাপ করিয়ে দেব তোর । উত্তরে ছেলে বলল – বাবা , তুমি এখনও ব্লাশ করছ ! বুঝলাম ছেলে আমার আর ছোট্টটি নেই । সত্যি বলতে কি লজ্জাও যেমন পেলাম , ভালোও লাগল তেমন । আমি ওদের বাড়ি যাবো না , বলেই দিয়েছিলাম আগে । কারণ সেই প্রথম প্রেমিকার বাবা-মা তার সাথেই থাকে । আর ওনারা আমাকে বিলক্ষণ চেনেন । তাই ও , আমার আর আমার ছেলের সাথে এক রেস্তোরায় দেখা করল । ওর স্বামীরও আসার কথা ছিল । আমরা টেবিলে এসে আলাপ পরিচয় সারছি , মানে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকার অ্যাক্টিং করছি আর কি ! প্রায় আঠেরো বছর পরে দেখা আমাদের । বয়স চেহারা ভারী করেছে , ব্যক্তিত্বও । আমাদের একা কথা বলার সুযোগ দিয়ে ছেলে বাথরুম যাওয়ার নাম করে উঠে পড়ল । আমরা সবে আবেগ মাখামাখি করছি , এমন সময়ে ওর বড়লোক স্বামী হাজির । আবার ফর্ম্যাল হওয়া , ওদের দেওয়া মহার্ঘ লাঞ্চ খেয়ে ফিরে আসা । এরপর থেকে ওর আচরণে পাগলামি দেখা দিল । ও যেন সেই কলেজ পড়ুয়া ছোট্ট মেয়েটি আর আমিও সব ছেড়েছুড়ে সমস্ত মনোযোগ ওর দিকে দেব , সারাদিন ওর সাথে বকবকম করব , এরকমই দাবী করতে লাগল ! আমাকে ভাবে কি ও ? কিছুটা এড়িয়ে যেতে লাগলাম । অনেক অভিমান জমছে , বুঝেও আমি চুপ করে থাকছি । আমার কিছু করার ছিল না এছাড়া । কয়েকমাস বাদে ও মেয়ে নিয়ে কলকাতায় এলো বাপেরবাড়িতে । আমিও রিটার্ন দিলাম । ছেলের সাথে আমি আর মেয়ের সাথে ও – চারজনে মিলে চায়না টাউনে খেলাম । এবার আমার পকেট খসল । পনেরোদিন ছিল ও । তার মধ্যে আমি একদিন ওকে বললাম পার্ক স্ট্রীটে চলে আসতে , তাহলে আমি পিকআপ করে নেব , কিন্তু ও চাইল , আমি যেন ওকে ওর বাড়ি থেকে নিয়ে যাই । সাফ বলে দিলুম , অত খাটনি আমার পোষাবে না ! ব্যাস এইখানেই আমার প্রেমের ইতি । সব রোমান্টিক ব্যাপারস্যাপার গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে এখন আমি মুক্ত পুরুষ । এবার ডাক এলেই হয় । তবে তার মধ্যে ছেলের জন্য সব গুছিয়ে রেখে যেতে হবে । আর বৌ তো আমি থাকলেও যেমন আছে , না থাকলেও তেমনই থাকবে । সার বোঝা বুঝে গেছি ভাই – কেউ কারুর নয় ।
যেভাবে অনুপম বলল শেষ-টেস নিয়ে , আসলে কিন্তু ও অতটা নিরাশাবাদী না । এখনও ওর চেম্বারে মহিলা রোগিণী এলে ও বেশি সময় নেয় , যে চেম্বারে বা হসপিটাল-নার্সিঙহোমে মহিলা রিসেপশনিস্ট সেখানে একটু বেশিই গল্প করে । বেশ রসেবসেই আছে ও । মাঝখানের যা ভাংচুর , সব সারিয়ে নিয়েছে দিব্যি । অনুপমের অসাধারণ সেন্স অফ হিউমার নিয়ে ও আছে সেই আগের মতই । ইংরেজি স্কুলের ছাত্র হলেও বাংলা সাহিত্যে বেশ প্রীতি আছে । তাই এখনও পরশুরাম থেকে কোট করে । আর আছে আন্তর্জালের নেশা । সারাদিন খুটখুট চলছেই চলছেই বিভিন্ন সাইটে । তবে ওর মানসিক মাপের সাথে ফিট হয় এমন বান্ধব বা বান্ধবী ওর বিশেষ কেউ নেই । ফলে ওর একাকীত্ব আছে , আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতই । মোটের ওপর অনুপম আছে ভালোই , এককথায় অনুপম আছে অনুপমেই ।

আপনার মতামত জানান