অর্ধেক মুখ

অদ্বয় চৌধুরী



ওয়াইপার চলছে নাগাড়ে। জলের অস্তিত্ব মুছে ফেলতে। কিন্তু পারে না। একবার সমস্ত জল সমেত নেমে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর আগেই জলের নতুন নতুন নাছোড় বিন্দুগুলো আছড়ে পড়ছে গাড়ির সামনের কাচে। অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। তীব্র, ক্ষিপ্র গতিতে। ধীরে, মাপা পদক্ষেপে দুপুর গড়িয়ে চলেছে বিকেলের দিকে। গাড়ির কাচের ওপারে কিন্তু সবকিছুই ঝাপসা। অদৃশ্য। অন্য কোন জগত। অথবা জগতহীন। এক ঝাঁক উদ্ধত বর্শার ফলার মতো কোণাকুণি নেমে আসা বৃষ্টির অগুনতি ফোঁটায় ক্ষতবিক্ষত হতে হতে এগিয়ে চলেছে গাড়ি; এগিয়ে চলেছি আমি। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে। এক ভেজা কালো উপত্যকা ধরে। বহরমপুর থেকে কলকাতার দিকে। পুরনো চাকরী থেকে নতুন চাকরী। পুরনো যাপন ছেড়ে নতুন যাপন। বুকে জেগে ওঠে, হঠাৎ, এক শিরশিরানি অনুভূতি। খানিকটা অনুভূতি, নীলরঙা, ছিটকে পড়ে জানলার কাচে।
--অদ্বয়, আমি সুদীপা।
মোবাইলের উলটো পার থেকে ভেসে আসে কিছু নাম। তারপর প্রতীক্ষা।
--সুদীপা? আমি তো ঠিক চিনতে পারলাম না... আর, আমি তো অদ্বয় নই।
--অদ্বয় নও! কি বলছ! এটা তো অদ্বয়েরই নাম্বার। ৯৮৩১...
সংখ্যায় সংখ্যা মিলে যায়। কিন্তু নাম মেলে না। অবশেষে পড়ে থাকে বিস্ময়।
--হ্যাঁ, নাম্বার তো এটাই। কিন্তু আমি অদ্বয় নই। কোনভাবে আপনার রং নাম্বার হয়েছে।



ফোনের নীলচে আলো নিভে গেলে লাইটার জ্বলে ওঠে। আবার খানিক আলো লাফিয়ে ওঠে জানলার কাচ বেয়ে। হলদেটে। ধোঁয়া ভেসে ওঠে, ছেয়ে যায়। ড্রাইভার এসি বন্ধ করার পর জানলার কাচ নেমে যায় নীচে। ধরে আসা বৃষ্টি ভেদ করে আকাশের চৌকোণা মুখ বেরিয়ে পড়ে। আহত, ক্ষতবিক্ষত মুখ। লালা ঝরে পড়ছে অনবরত। টিপটিপ করে। ভিজিয়ে দিচ্ছে জানলায় রাখা আমার হাত। শিউরে উঠি আমি। আবার ভাইব্রেশন শুরু হয় বুকে। একই নাম্বার। শেষ মুহূর্তে ফোন ধরতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে সুদীপার কণ্ঠস্বর।

--অদ্বয় তোমায় কিছুতেই পাচ্ছিলাম না। তোমার সাথে ভীষণ জরুরী কথা আছে। আমি তোমায় ছাড়া বাঁচতে পারব না। তুমি যা যা বলেছ সব আমি মেনে নিলাম। তুমি যা বলবে তাই হবে। যা বলবে... তুমি ফিরে এস। প্লিজ... কি হল? তুমি এভাবে চুপ করে আছ কেন? আমার পরশু বিয়ে। তুমি তো সব জানো। আমি তোমার কাছে চলে যেতে চাই। আমায় নিয়ে চলো... তুমি কথা বলছ না কেন? অদ্বয়?
--দেখুন, এবারও আপনার রং নাম্বার হয়েছে। আমি অদ্বয় নই।
--কি বলছ তুমি? বারবার একই কথা বলছ! তুমি আমায় অ্যাভয়েড করতে চাইছ? আমার সাথে আর কথা বলতে চাইছ না তুমি? মুক্তি পেতে চাইছ আমার থেকে?
--না না। আপনি ভুল বুঝছেন ম্যাডাম। আপনি যাকে চাইছেন আমি সেই অদ্বয় নই। সত্যিই নই।
--তা কি করে হয় বলুন তো? আমি পরশুও এই নাম্বারেই অদ্বয়কে পেয়েছি। আর আজ আপনি বলছেন যে আপনি অদ্বয় নন। অথচ নাম্বারটা একই। আপনিই বললেন সে কথা। এ কি সম্ভব কখনো?
--আপনি পরশু কথা বলেছেন? কিন্তু আমাকে এই নাম্বারের নতুন সিমকার্ড গতকাল দিয়েছে আমার নতুন অফিস থেকে। তাহলে তো বোঝাই যাচ্ছে আপনি আমার সাথে পরশু কথা বলেন নি। বলতেই পারেন না। আমি অদ্বয় নই ম্যাডাম।
--আমি বুঝতে পেরেছি। সবকিছু। বুঝতে পারছি আমি তোমার কাছে অতীত। মৃত। বেশ। সুদীপা আর মৃত্যু তাহলে এক হয়ে উঠুক।


ফোনের ব্যাকলাইট নিভে যায়। সিগারেট আগেই নিভে গেছে। জলের ঝাপটায়। সেখানে আসে নতুন এক সিগারেট। ভেসে ওঠে নতুন ধোঁয়া। ভিজে যেতে লাগি আমি। বৃষ্টিতে, ঘামে। ধোঁয়ারা শূন্যে আঁক কাটে নানারকম। মেয়েটা কি সুইসাইড করবে? ও কি সত্যি কথা বলছে? দু জন মানুষের একই ফোন নাম্বার হতে পারে? মোবাইলের সার্ভিস প্রোভাইডার ভুল করে একই নাম্বার দু বার অ্যালট করে ফেলে নি তো? গাড়ি হ্যাঁচকা মেরে থেমে যায়। চৌমাথা ক্রসিং। ওপাশ থেকে গাড়ি ঘোরাচ্ছে। আটকে গেছে রাস্তা। উলটো দিকে, একদম মুখোমুখি, বিশাল মুখওয়ালা এক ট্রলার দাঁড়িয়ে আছে। হাঁ করে গিলতে আসা মৃত্যুদূত! বিশ্রী হর্ন বেজে চলেছে। আমার দু নম্বর সিম থেকে ডায়াল করি আমারই প্রথম সিমের নাম্বার। সেই নাম্বার! দেখা যাক। বিজি টোন ভেসে আসে। কল ওয়েটিং লেখা ফুটে ওঠে আমারই ফোনে। মেয়েটা তাহলে ভুল বলছে! সেটাই তো স্বাভাবিক! আর একবার... দ্বিতীয়বার। একই ঘটনা। মেয়েটা মিথ্যে বলছে না তো? ইচ্ছা করে? গাড়ি পাশ কাটায়। ব্যাকগিয়ারের মিউজিক বৃষ্টির হালকা অথচ একঘেয়ে শব্দকে ছাপিয়ে ওঠে। গাড়ি পিছয়। ফোনের ওপারে, হঠাৎ, মিউজিক শুরু হয়! তৃতীয়বারে! রিং হচ্ছে ঐ ফোন নাম্বারে!
--হ্যালো!
পিছনের গাড়ি জোরে হর্ন বাজায়। চমকে উঠি। আচমকা থেমে যায় গাড়ি। ঝটকা লাগে। বিমূঢ়তা ঘিরে ধরে।
--হ্যাঁ, মানে, বলছি, আপনার নাম কি অদ্বয়?
--হ্যাঁ। আপনি কে বলছেন?

এক অচেনা, নামগোত্রহীন কাঁপুনি পাক খেয়ে ওঠে নীচ থেকে। গাড়ি আবার পিছতে থাকে।

--দেখুন, আমাকে আপনি চিনবেন না। আমিও আপনাকে ঠিক চিনি না। তবে নাম জানি।
--বুঝলাম না ব্যাপারটা!
--আসলে, একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। আমার এবং আপনার মোবাইল নাম্বারটা এক।
--মানে?
--মানে, আপনি এখন যে নাম্বার থেকে কথা বলছেন, সেই একই নাম্বারে আমাকেও একটি সিমকার্ড প্রোভাইড করা হয়েছে। এটা হয়তো সার্ভিস প্রোভাইডারের ভুল।
--সে কি! এ তো মারাত্মক ব্যাপার! আপনি কথা বলেছেন সার্ভিস প্রোভাইডারের সঙ্গে?
--না, এখনো বলি নি। কথা বলার আগে একবার চেক করে নিলাম।
--ভালো করেছেন। আমিও কথা বলছি কোম্পানির সঙ্গে।
--কিন্তু এছাড়াও আরও কিছু ব্যাপার আছে। আসলে, আপনার নাম এবং অস্তিত্বের হদিশ আমি পেয়েছি সুদীপার থেকে। এবং নাম্বারের ব্যাপারটাও ওর মাধ্যমেই জানতে পারি।
--সুদীপা! আপনি চেনেন তাকে?
--উনি আমায় ফোন করেছিলেন। আপনাকে করতে চাইছিলেন। কিন্তু ফোনটা চলে আসছিল আমার কাছে। বারবার।
--সুদীপার আবার কি প্রয়োজন আমার সাথে? আপনাকে কি বলেছে আমার সম্বন্ধে?
--কিছু মনে করবেন না প্লিজ। দেখুন, সুদীপার ভীষণ জরুরী কথা আছে আপনার সাথে। ওর পরশু বিয়ে। কিন্তু ও আপনাকে ছাড়া বাঁচতে পারবে না। ওর মানসিক অবস্থা খুব খারাপ। আপনি একবার অন্তত ওর সাথে কথা বলুন। একবার জাস্ট।
--দেখুন, আমার সুদীপার সাথে আর কোন কথা বলার নেই। ও আমার কাছে অতীত। এবং মৃত। এবং আমিও ওর কাছে মৃত। ওর সাথে আপনার যদি আবার কথা হয়, আপনি এই কথাগুলো জানিয়ে দেবেন। বলবেন, অদ্বয় বলেছে এই কথা।


দীর্ঘস্থায়ী, প্রায় অনন্ত নীরবতা ভেদ করে বৃষ্টি ধেয়ে আসে, হঠাৎ, উচ্চস্বরে। উদ্ধত যোদ্ধার মতো, ভীম গর্জনে, নতুন উদ্যমে। জানলার কাচ আবার বন্ধ হয়ে যায়। বৃষ্টির মতোই জীবনও ধাবমান, ক্রমশ, অন্তিম গন্তব্যের দিকে। সে দৌড়ে চলে বিস্মৃতির কালো উপত্যকা পেরিয়ে, সিক্ত, আহত। আমি বসে আছি, স্থির, অবিচল, যেখানে সময় বরফ-ঠাণ্ডায় প্রস্তরীভূত হয়ে আছে। বৃষ্টির ফলাগুলো কাচের দেওয়ালে আঘাত করছে, আঁচড় কাটছে। ভেদ করতে না পেরে গলে গলে পড়ছে। কাচ বেয়ে, ক্রমাগত। ব্যর্থ, তবু দাগ রেখে যায়। বাকি সব ঢেকে দেয়— রাস্তা, ফ্লাইওভার, ট্রাফিক সিগন্যাল, গাড়ি। বিস্মৃত অতীত। জীবিত শুধু এই ঠাণ্ডা খোলস। আর, আমি? আমি কি জীবিত? নাকি বিস্মৃত? বিস্মৃতির সীমারেখা থেকে আমার হৃৎস্পন্দন শোনা যায়, আবার। জেগে ওঠে নীলাভ অনুভূতি।
--অদ্বয়, অদ্বয়, তুমি প্লিজ বলো যে তুমিই অদ্বয়। প্লিজ আমার সাথে কথা বল। প্লিজ।
--হ্যাঁ। আমি অদ্বয়।
--আমি জানতাম! আমি জানতাম তুমিই অদ্বয়! আমি জানতাম তোমায় আমি পাবই। তুমি আমাকে একা ফেলে যেতে পারবে না। আমায় ভুলে যেতে পারবে না। মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারবে না। আমি জানতাম।
--হ্যাঁ। আমি পারব না। আমি পারলাম না।
--তুমি আসবে তো ফিরে?
--হ্যাঁ।


গাড়ি একেবারে দাঁড়িয়ে যায়, নিথর, নিস্তব্ধ। লম্বা জ্যাম। বৃষ্টির ফলে, হয়তো। সামনের গাড়ির লাল ব্যাকলাইট জ্বলছে, অবিরাম। ওয়াইপার আর চলছে না। বন্ধ। বৃষ্টির আবরণ ভেদ করে, সামনে, খুব অস্পষ্ট, নিথর গাড়িগুলোর লম্বা সারি দেখা যায়। কত লম্বা সে লাইন ঠাহর হয় না ঠিক। কাচের দেওয়ালে, দেওয়ালের ওপারে, নিয়মিত সরলরেখায় নামতে থাকা উল্লম্ব জলধারায় ঝাপসা সবকিছু। রিয়ার-ভিউ মিররে চোখ যায়। পিছনে আর কোন গাড়ি নেই। সারির একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। উন্মুক্ত রাস্তা পিছনে। তবে ঝাপসা। কাচের আবরণের ওপারে অসীম ধূসরতা ছেয়ে যায়। বৃষ্টির আঁচড়গুলো করাঘাতে পরিণত। আবার রিয়ার-ভিউ মিররে তাকাই। চমকে উঠি! আয়নায় ভেসে উঠেছে একটি অর্ধেক মুখ। অচেনা, অপরিচিত।

আপনার মতামত জানান