গাছজন্ম

স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়




মুকুলিকা জানে আর কিছুক্ষন পরেই মানুষটা বিশাল মেঘের ডানা পরে মিলিয়ে যাবে আকাশে । এখন জটিল সমীকরণের পোশাক শ্লেট থেকে মুছে পালক ফুলিয়ে লেজ নাড়ছে খদ্দরের গোলগলা পাঞ্জাবি । কোথা থেকে যেন এক টুকরো রোদ এসে পড়েছে মুকুলিকার মুখে । মুকুলিকা দ্রুত নিবিষ্ট ছায়ার কাছে সরে গেল । ভরদুপুরে সে এখন কিছুতেই রোদ্দুরকে প্রশ্রয় দেবে না , দিলেই পাতাগুলো বাইরের শরীরটাকে ভিতরের দিকে টানতে থাকবে । বাধা দিতে পারবে না মুকুলিকা ।






বিখ্যাত পত্রিকা অফিস - এর কাচঘর থেকে বেরোতে বেরোতে কপোতাক্ষ কাঁধের নীচে নামতে থাকা ঝোলাটা ঠিক করে নিল । ঘড়িতে ঠিক সাড়ে পাঁচটা । গরমের পরিপূর্ণ বিকেল । মেয়েটার দাঁড়িয়ে থাকার কথা । কে জানে অতদূর থেকে এসে পৌঁছতে পারলো কিনা । অবশ্য কপোতাক্ষ জানে এসব মেয়েরা লোভী হয় সুযোগ ছাড়বেনা । নামজাদা লোকের সঙ্গে দু'দিন ঘুরে - টুরে যদি ভালো পত্রিকায় একটা লেখাও ছাপা হয় তো সেটাই এ ধরনের মেয়েদের কাছে অনেক বেশি পাওয়া । ভালো লিখতে পারুক আর না পারুক । কপোতাক্ষ দূর থেকেই নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়ানো মেয়েটাকে দেখতে পেলো । পাঁচফুট চার ইঞ্ছির কালো পাতলা চেহারা লম্বাটে মুখে ববকাট চুল সামান্য তোলা ঠোঁটের নীচে বারবার রুমাল ঘষছে । কপোতাক্ষ কাছে যেতে ওর থুতনির ভাঁজে মৃদু হাসি ঝলকে উঠে নিভে গেলো ।

কপোতাক্ষ আর মুকুলিকা গোলপার্কের রাস্তা ধরে হাঁটছে । মেয়েটির নাম মুকুলিকা । সুশ্রী না হলেও ওর চোখদুটোর প্রসারিত ভঙ্গি আকর্ষণীয় । আয়নার মতো ঝকঝকে সুন্দর । সারা মুখে আঠা আঠা সরলতা লেপা । মেয়েটার ভিতর একটা ঢালু স্পষ্ট তারযন্ত্র আছে কিন্তু বাইরেটা বড্ড এলোমেলো কাদাপাথরের দামালপনা । কপোতাক্ষ তারগুলোর সরু হয়ে আসা প্রান্তে মোচড় দিয়ে গোলগাল বৃত্তে ডালপালা মেলে দিতে চাইলো । কাদাপাথর পিষে মূর্তিটাকে গড়তেই হবে ।




স্বাতী মাছের বাটিটা এনে দিতে কপোতাক্ষ ভাতটার মাঝখানে আঙুল ডুবিয়ে কুয়ো করে ঝোলটুকু ঢেলে দিলো । বড় মাপের মাছের মুড়োটা পাতের একপাশে সরিয়ে রেখে একগরাস ঝোলমাখা ভাত গলার মধ্যে ঠেলে দিতে নুন তেল সমেত একখণ্ড আগুন পুড়তে পুড়তে নামতে থাকলো পাকযন্ত্রে ।স্বাতী আজকাল খুব ঝাল দেয় মাছের ঝোলে নাকি কপোতাক্ষ বুড়ো হয়ে যাচ্ছে বলেই এত ঝাল লাগে ! মাছের মুড়ো বরাবরই তার প্রিয় । সেই ছোটবেলা থেকে । মুড়োর ভিতরে অদ্ভুত একটা রহস্য আছে । অনেকটা পর্দা তুলতে তুলতে বিস্ময় দেখা ডিটেকটিভ গল্পের মত । আস্তে আস্তে ভাঙতে হয় । প্রথমে গলার মাছটুকু তারপর শিরদাঁড়ার কাঁটা খুলে একটা গোল ভিজে ভিজে গর্ত , চোখের দু'পাশে একটু চাপ দিলে মাথার শক্ত আবরন দু'ভাগে ভেঙে আসে -- গুহার গায়ে বৃষ্টির অসংখ্য ছবি । মাঝখানে একটুখানি ধোঁয়াটে ঘিলু নোনতা সুস্বাদু । অনেকটা মুকুলিকার বুকের ভিতর জমতে থাকা ছোট ছোট দানার কালচে ক্ষীরের মতন ।






বিন্তি অর্থাৎ মুকুলিকা পা ছড়িয়ে ভিজে ঘাসের উপর বসেছে । মুকুলিকা যার পোশাকি নাম তার ডাকনাম বিন্তি হয় কি করে এ প্রশ্নের উত্তর সে কোনোদিন তার মনকে দিতে পারেনি । কপোতাক্ষের আজ বালীগঞ্জ লেকে দেখা করার কথা বিন্তি তাই অপেক্ষা করছে । একটু বৃষ্টি হলে এখানে সময় তেরছাভাবে হাঁটতে থাকে । মানুষটা অফিস সামলিয়ে এখানে আসবে , এসে একসঙ্গে টিফিন করবে কিছু খাবার কিনে নিয়ে আসাটা ইদানীং ওর স্বভাবে দাঁড়িয়েছে । কাঁচা-পাকা চুলের মানুষটা যখন বিন্তির কাছে আসে আশেপাশের সব সম্পর্ক ঘষা কাচ হয়ে যায় । অশোকদা মিথ্যে পাশের বাড়ির মিন্টুদা মিথ্যে , দেবাশিষ মিথ্যে ,পিলু মিথ্যে কেবল কপোতাক্ষ সত্যি । ভীষন ভীষন রকম সত্যি । বিন্তি মুকুলিকা হতে হতে জোরে জোরে শ্বাস নেয় আর বিড়বিড় করে বলে ' তোমাকে ভালবাসি কপোতাক্ষ '। একবার ... দু'বার... তিনবার ... চারবার ।

প্রথমদিন 'আপেক্ষিক' পত্রিকার ইন্টারভিউ নিতে কপোতাক্ষের কাছে গিয়েছিলো । বর্তমানে নামডাকওলা এই কবি তাদের ওই ছোট্ট কাগজে ইন্টারভিউ দেবেন না এটাই স্বাভাবিক । মনখারাপ করে বাড়ি চলে এসেছিল বিন্তি কিন্তু হাল ছাড়েনি । শেষে নাছোড়বান্দা বিন্তিকে কপোতাক্ষ ডাকল ইন্টারভিউ নিতে বদলে কপোতাক্ষকে দিতে হল বিন্তির উচ্ছলতা । যা শৈশব হবে কপোতাক্ষের শরীরে । বিন্তিও সম্পর্কের গায়ে নতুন চামড়া দেওয়ার নতুন সন্ধি- জোড়কলম করার চেষ্টা করেছে কিন্তু কপোতাক্ষের মতে এ সম্পর্ক তার তৈরি হতে থাকা নতুন লেখার গায়ে কচি সবুজ ঘাসের মত মাথা হেলিয়ে দুলিয়ে আকাশ ডাকে , মেঘ ধার করে ডানা বানিয়ে উড়ে যেতে চায় ফিরে আসবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে । সন্ধে নেমেছে । বিন্তি ডানদিকে তাকিয়ে দেখতে পেল মস্ত ঝোলা কাঁধে কপোতাক্ষ ভেজা ইটের দেওয়ালটায় লেপ্টে দাঁড়িয়ে কি যেন খোঁজার চেষ্টা করছে । গন্ধ কি ? বৃষ্টির গন্ধ ! পাঞ্জাবি - ঝোলা - দাড়িসমেত কপোতাক্ষ দেওয়ালের গায়ে ভাস্কর্য হয়ে গেল । একেবারে মুকুলিকার সামনেই ।






স্বাতী যখন সান্যাল বাড়ির বউ হয়ে এসেছিল তখন এ বাড়ির দোতলা ওঠেনি । শাশুড়ি রাধারানীর প্যারালিসিস । বিছানা ছেড়ে না উঠলেও পান থেকে চুন খসলে গা জ্বালানো কথাগুলো মুখ থেকে ভালভাবেই ঠেলে উঠত । কপোতাক্ষের তখন সামান্য আয় নামও ছিলনা তেমন । খাবারটুকু পর্যন্ত খাইয়ে দিতে হত রাধারানীকে । খাওয়ার সময় অনেক গল্প শোনাতো রাধারানী । নিজের বিয়ের গল্প , ছোট কপোতাক্ষের দুষ্টুমির গল্প । শ্বশুরের মোটা গোঁফ রাখার শখ নিয়েও বেশ মজার কয়েকটা গল্প স্বাতীকে প্রায়ই শুনতে হত । মৃত্যুর আগে রাধারানী স্বাতীকে চন্দনকাঠের মাঝারি একটা বাক্স দিয়ে গিয়েছিলো । সেটার ভিতর সযত্নে বাদামি রঙের কিছু বীজ রাখা ছিল । নিটোল গোল বীজ মাথার কাছটা সরু গোলাপি রঙের রেখা খোদাই করা । বীজগুলো কোন গাছের স্বাতী তা বুঝতে পারেনি ।

বৃষ্টি হলে কপোতাক্ষ ছাদে চলে যেত । ছাদের চওড়া আলসের গায়ে একবার একটা বটগাছ বড় হতে থাকায় স্বাতী একজন দেহাতি লোককে কিছহু টাকা দিয়ে গাছটাকে শিকড় থেকে উপড়ে ফেলার ব্যবস্থা করেছিলো । জানতে পেরে কপোতাক্ষের কি রাগ ! লোকটাকে তো তক্ষুনি তাড়িয়েছিল নিজেও পুরোদিনটা খাবার মুখে তোলেনি । সামান্য একটু মাটি পেলে যে গাছ শিকড় গাড়ে শক্তির গর্বে মাতাল হয়ে ওঠে সেই বটগাছ কয়েকদিন পরে আশ্চর্যজনকভাবে শুকিয়ে গেল । দাঁতে দাঁত এঁটে বসে থাকা শিকড়টুকু পর্যন্ত ফেঁসে যাওয়া পাটের দড়ির মতো ছন্নছাড়া হয়ে ঝুলতে থাকলো ।সেদিন ছাদে গিয়ে কপোতাক্ষ বুক চাপড়ে কেঁদেছিল । স্বাতীর দেখা দ্বিতীয় কান্না । প্রথম কান্না সে দেখেছিল ফুলশয্যার রাতে । মেয়ে মাংসের ভিতর অবধি গিয়ে কপোতাক্ষের পুরুষ হাত আঁতিপাতি করে কয়েকটা পাতা খুঁজেছিল । না পেয়ে ভীষন যন্ত্রণায় ভেঙেচুরে ফেলছিল নিজেকে । স্বাতী , না ফুটতে পারা নারী সারারাত চেষ্টা করে গেছে খুঁড়ে ফেলা অংশগুলো বুজিয়ে ফেলার ।






নিজের অংশটুকু চেটেপুটে শেষ করার পরেও অন্য অংশে ভাগ বসাতে শৈশব বারবার ঘুরে আসে । যৌবনেও বরং আরো বেশি করে । কিন্তু প্রৈঢ়ত্বে শৈশব কেবল উঁকি দেয় বহুবার । চোখটুকু , ছোট্ট নাকটুকু বা গালের একটা টুকরো বা দু' এক কুচি চুল ছাড়া কিছুই দেখা যায় না -- কেমন যেন ছায়ার ভিতরে রাখা একটা ছায়া । এইসব সময় নিজেকে নির্জন রোদ্দুর মনে হয় । গা পুড়ে যাচ্ছে অথচ ভিতরটায় এতটুকু উষ্ণতার জন্যে হাহাকার। শিরা - উপশিরা বেয়ে রক্তরস এক জায়গায় জমে মণ্ড তৈরি করে । চারপাশে রৈ রৈ একটু তরঙ্গের জন্যে । কপোতাক্ষ এইসময় একটা গাছের প্রয়োজন বোধ করে । যে কোন কোষেই গাছটা জন্মাক , ছোট্ট ছোট্ট পাতা যারা ভবিষ্যত ডালেদের ঠোঁটে খাবার গুঁজে দেবে ।চেষ্টার পর চেষ্টা করতে করতে ঘেমে স্নান করে যায় কপোতাক্ষ ।নাঃ গাছটা কিছুতেই জন্মায় না । স্বাতী ছুটে আসে রান্নাঘর থেকে । কপোতাক্ষ হাঁপাচ্ছে । এরকম হলে ওর বুকের ধুকপুকুনিটা কানের লতিতে এসে ঠেকে ।





মুকুলিকার ভিতরে একটা গাছ জন্মেছে । তারযন্ত্রের মগ্নতা কিভাবে কেলাসিত হয়ে মাটি হয়েছিল বিন্তি টা জানেনা কিন্তু মুকুলিকা জানে কপোতাক্ষের আঙুলের নখ থেকেই ও মাটি এসেছে । কপোতাক্ষ কিন্তু জানতে পারেনি । বিন্তি যেদিন জানতে পারলো পাবলিক টেলিফোন বুথ থেকে ফোন করলো কপোতাক্ষকে । কপোতাক্ষ খুব উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল তার ভীষন দেখতে ইচ্ছে করেছিল মুকুলিকাকে । বিন্নিকে মেট্রোর কাছে দাঁড়াতে বলে কোনরকমে পাঞ্জাবি গলিয়ে ছুটে গিয়েছিল সেখানে তারপর বাবুঘাটের হাওয়ায় মুকুলিকাকে বসিয়ে নিচু হয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল গাছটাকে । শিকড়ের কাছটায় খয়েরি রঙ ধরেছে পাতাগুলোর শিরায় সালোকসংশ্লেষের নরম বেগুনি ছোপ পড়েছে । কত পরিনত অথচ কি শিশু গাছ ! কপোতাক্ষ বুঝতে পারছিলো আর একটু পরেই তাকে চলে যেতে হবে মুকুলিকাকে ছেড়ে । যে বুকে বৃত্ত নেই , শরীরে বৃষ্টি নেই সেইখানে । আরো এক নতুন গাছজন্মে ।


----------------

আপনার মতামত জানান