জিয়াভরলি

আইভি চট্টোপাধ্যায়


আগামীকাল বৃহস্পতিবার পবিত্র হজ । 'লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্দা ওয়ানিন'মাতা লাকা ওয়াল্মুল্ক্, লা শারিকা লাকা ।' আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, তোমার দরবারে উপস্থিত হয়েছি। নিশ্চয় সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই ।
হাজিরা এখন মিনায় অবস্থান করছেন । বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় বাইশ লাখ ইসলামধর্মী মানুষ এবার হজ পালন করছেন । মিনা এখন তাঁবুর শহর । চারদিকে হজ ব্যবস্থাপনায় মুঠোফোনে খুদে বার্তা । ইন্টারঅ্যাকটিভ ভয়েস রেসপন্স, আইভিআর সার্ভিস ।

দু’তিন দিন ধরে রোজই ফোন করছে রাণী । খুব মনখারাপ ওর । এবছরও হল না । গত তিনবছর ধরে হজ করতে চাইছে ও । হজ না হলে মুক্তি নেই । কিন্তু রাণীর হজ করতে যাবার অনুমতি নেই ।
না, মৃদুল বা তার পরিবার সমস্যা নয় । রাণীর ধর্মে একা নারীর হজে যাবার অনুমতি নেই । নারীদের হজের বিষয়ে সৌদি আরবে সুনির্দিষ্ট আইন । পঁয়তাল্লিশ বছরের নিচের কোনো নারী মাহরাম ব্যক্তি বা বিয়ে জায়েজ নেই এমন ব্যক্তির সঙ্গে ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে হজে আসতে পারবে না । স্বামী-সন্তান ও বাবার মতো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন সঙ্গে চাই ।

রাণী আর মৃদুল । ফরজানা আরা আর মৃদুল ভট্টাচার্য । ওদের বিয়ে নিয়ে চেনাশোনা বৃত্তে বেশ ঝড় উঠেছিল । বন্ধুমহলে বেশ প্রশ্রয়ও পেয়েছিল ওরা । সবাই তো এমন সাহসের কাজ করতে পারে না । রাণী মৃদুল কেউ নিজের ধর্ম ত্যাগ করে নি, ধর্ম ওদের সংসারে কোনো বাধা হয় নি ।
দুই ছেলে, স্বামী, শাশুড়ি, ভাসুর দ্যাওর জা । আদর্শ পরিবার । সংসারে । সমাজেও ।
সেই রাণী । বিয়ের আঠাশ বছর পর রাণীর মনে হয়েছে, বিয়েটা মস্ত ভুল হয়েছিল ।
আজ কেঁদে ফেলেছিল, ‘আমি আজও কথা বলতে গেছিলাম । আমাকে বলেছে, স্বামীকে ধর্ম বদল করাও । যদি সে না চায়, ছেলে ধর্ম বদল করুক । স্বামী, ছেলে সঙ্গে থাকলে হজে যেতে পারবে । আপা, প্লিজ তুই মৃদুলকে বোঝা ।‘
‘মৃদুলকে? আমি? কি বলছিস তুই রাণী ? মৃদুলকে আমি বলব, ধর্ম বদল করে নিতে ? এই সামান্য কারণে ? ওর মা, ওর বাড়ির সবাই, তোদের দুই ছেলে কি বলবে ?’
‘সামান্য কারণ ? তুই এটাকে সামান্য কারণ বললি ? তুই, আপা ? তোকে আমরা সবচেয়ে বুঝদার মনে করি । তাই তো তোকেই এই সমস্যায় মনে করেছি । তুই আমাকে হেল্প করবি না ?’
‘খোদা বলেছেন, ইন্নাতায়না কাল কাওছার আমি তোমাকে দান করেছি । কোরআনের কথা, তাই না ফরজানাবিবি ?’ রাগ হয়েছে সাহিনার, ‘কাওছার । বেহেশতী সুধা । নিজের মধ্যে থেকেই খুঁজে পাওয়া যায় । এও কোরআনের কথা । মৌলবীরা পাঁচবেলা নামাজে ইন্নাতায়না করছে, কিন্তু কোথায় কাওছার জানে না ।‘
রাগ করেছে রাণীও, ‘মৌলবীদের নিয়ে কিছু বলবি না তুই । কোরআন পড়া আর ধর্ম বোঝা, এতই সহজ নাকি ? কাফের নাহয় বুঝবে না খোদা কি বলেছেন, কিন্তু তুই ? হজ না হোক, উমরা করে এসেছিস তো নিজেও । আমার বুঝি হবে না কিছু ? ওদের কাফের বললাম বলে রাগ করিস না আপা । মৃদুল, আমার ছেলেরা, সবাই কাফের । তাই তো দেয়ালে আমার পিঠ থেকে গেছে ।‘
হাউহাউ করে কান্না তারপর, ‘আমার খুব ভয় করে জানিস ? আমি মরে গেলে ওরা যদি আমাকে গোর না দিয়ে পুড়িয়ে দেয় ? আমার যে মুক্তি হবে না । একবার হজ করে এলে সব শান্তি ।‘
এই মেয়েকে কি বোঝাবে সাহিনা !

‘মৃদুলের সঙ্গে কথা বলেছিস ? ছেলেরা বড় হয়েছে, বিক্রম তো চাকরি করছে, ওরা কি বলছে ?’
‘ওরা ধর্ম বদল করবে না । মৃদুল তো কোনো ধর্মই মানে না, কোনোদিন পুজো করে না, মন্দিরে যায় না । ছেলেরাও তেমনই হয়েছে । আর আমার শ্বশুরবাড়ি ? ওরা আমায এ নিয়ে কোনো কথা বলবে না । এমনকি মৃদুল, ভিকি, রুকু আমার ধর্ম নিলেও ওরা আপত্তি করবে না ।‘
‘তুই কতখানি ভাগ্যবতী, কখনো ভেবে দেখেছিস রাণী ? এইরকম শ্বশুরবাড়ি তোর । মৃদুল তোর কোনো ধর্ম আচরণে বাধা দেয় না । এই কি কম পাওয়া ? এর পরেও তুই চাইছিস, ও তোর ধর্ম নিক ! কেন রাণী ? সব জেনেই তো বিয়ে করেছিস । তাহলে বিয়ের আঠাশ বছর পর এই অশান্তি কেন !’
‘তুই বুঝতে পারছিস না আপা, আমার কোথায় লাগছে । মৃদুল তো ধর্মই মানে না, তাহলে ধর্ম বদল নিয়ে এত রিজিড কেন ? যদি জানতাম, ওর নিজের ধর্ম নিয়ে সেন্টিমেন্ট আছে তাহলে অন্য কথা ছিল । ছেলেরা কোনো ধর্ম-আচরণ করে না, মন্দিরে যায় না, মসজিদেও না । তাহলে মাযের জন্যে এইটুকু করবে না কেন ? আর .. শ্বশুরবাড়ির উদারতা নিয়ে অত বলিস না আপা । জানিস, ক’দিন আগে আমার বড় জা কি বলল ? বলল, তুমি যে ভিকি-রুকুর পৈতে দিতে দাও নি, সে নিয়ে তো মৃদুল কোনো কথা বলে নি ! বোঝ একবার ! তার মানে এই নিয়ে মৃদুল ওদের কাছে দু:খ করেছে !’
‘কেন পৈতে দিস নি রাণী ? ব্রাহ্মণ বাড়ির ছেলে, ওদের তো মনে হতেই পারে ।‘
‘মৃদুল আমাকে পৈতের কথা বলার সাহসই করে নি । বিয়ের আগেই আমরা ঠিক করে রেখেছিলাম, কেউ কাউকে জোর করব না ।‘
‘তাহলে ? আজ জোর করছিস কেন ?’ রাণীর যুক্তিতেই যে পরষ্পরবিরোধিতা, সেটুকু বোঝার মত মানসিক অবস্থাও নেই আর । খুব চিন্তা হচ্ছে সাহিনার । রাণী-মৃদুলের বিয়েটা, রাণীর অমন জমজমাট সংসারটা ভেঙে না যায় !


****
আজ পাক গোসল । এ কলঘরটা খুব ছোট । বাড়িতে সবসময়ের কাজের লোক ছিল আগে, তখন এ কলঘর করা হয়েছিল । দুই ছেলেই বড় হয়ে গেছে, আর সবসময়ের কাজের লোক দরকার নেই । মৃদুল বলেছিল, কলঘর ভেঙে ফেলে একটা ছোট বারান্দা হোক । রাণীই রাজি হয় নি ।
কলঘর,আর লাগোয়া এই ছোট্ট জায়গাটা । নামাজের জন্যে একান্ত জায়গা । রাণীর ছোট্ট বেহেশত ।
কলঘরে ঢোকার আগে রাতপোশাকের ওপর একটা ওড়না জড়িয়ে নেয় রোজ । কলঘরে ঢুকেই মাথায় ওড়না তুলে দিয়ে ‘বিসমিল্লাহিল আলিউল আযিম’ বলে ওজুর দোয়া । একান্তে যত্ন করে ওজু করে নেয় রাণী ।
বাপের বাড়ির হুজুরাইন ছিল আম্মা । আমপারা সিপারা কোরআন পড়া শেখাত । অসুখ হলে কালো কাইতানে দোয়া পড়ে গিট্টু দিয়ে হাতে বেঁধে দিত । নিজের সংসারে নিজের ছেলেদের জন্যে কোনদিন এমন করা হয় নি । ওজু শেখানো তো দূরের কথা ।
ভিকি রুকুকে স্কুলে নিয়ে যেত, গেটের পাশে জটলা করে বসে থাকত মায়েরা । রাণীও । আড্ডা হাসি গল্প, কত নতুন বন্ধু । একদিন চোখে পড়েছিল মাদ্রাসাটা । মহিলা মাদ্রাসা । বন্ধুদের এড়িয়ে পায়ে পায়ে উঠে গেছিল রাণী । ভাগ্যিস !
নিয়মিত তালিম বৈঠক । একজন মহিলা ইমাম ছিলেন । শুদ্ধভাবে নামাজ কালাম কোরআন পড়া, কোরানের তাফসির, হাদিসের বয়ান, শরিয়তের শিক্ষা, পর্দার গুরুত্ব সব শেখাতেন । পর্দা বোরখা তো আর হবে না, ওজু নামাজ কালাম সব ভালোভাবে শিখে নিয়েছে রাণী ।
সঠিক পদ্ধতিতে ওজু শেখা খুবই জরুরী । ওজু ছাড়া নামাজ হয় না । কেউ যখন নামাজ আদায় করে তখন সে তার প্রতিপালকের সাথে নির্জনে কথা বলে । আল্লাহ বলেন, “হে মুমিনগণ ! তোমরা যখন নামাজে দণ্ডায়মান হতে চাও, তখন তোমাদের মুখ ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত কর, মাথা মাসেহ কর এবং টাখনু পর্যন্ত পা ধৌত কর”.. (সূরা আল মায়েদা, আয়াত: ৬)

ছেলেরা বড় হয়ে গেল । আর নিয়মিত তালিম বৈঠকে যাওয়া হয় না । কিন্তু ওজু করতে গেলেই রোজ সেই দিনগুলো মনে করে রাণী । ছেলেদের যদি শেখানো যেত ! একা একা কি ধর্ম পালন হয়!
গোসল করার আগেই শাওয়ারের জলের কল খুলে দেয় রাণী । ছলছল জলের সঙ্গে বুকের জমে থাকা কান্নাটা ধুয়ে যাক । ঝিরিঝিরি জল চক্রাকারে পড়ছে, চারদিকে ফেনা ফেনা একটা বৃত্ত । সেই নদীটার মত । নীল খরস্রোতা দামাল নদী ।
বিয়ের পর বেড়াতে যাওয়া হয় নি । দুই পরিবারে কান্নাকাটি । মৃদুলের বাবা ছেলের বিয়ের শোকেই অত হঠাত্‍ করে চলে গেলেন কিনা কে জানে । রাণীর নিজের বাড়িতেই বা কম কি । ভাইয়েরা সবাই কথা বন্ধ করে দিয়েছিল । আম্মার সঙ্গে দেখা করতে যেতেও পারত না । তখন তো আর এত ফোন ছিল না । ইচ্ছে থাকলেও যোগাযোগের উপায় ছিল না । আপা আসত । দুলাভাই তো শাশুড়িমাযের খুব পছন্দের মানুষ হয়ে গেছিল ।
তবু.. অনেকগুলো দিন বড্ড একা একা কেটেছে । মৃদুলও বেড়াতে যাবার কথা ভাবতে পারে নি । বিয়ের দু’বছর পর বড় ননদের ব্যবস্থায় বেড়াতে যাওয়া ।
অরুণাচল রাজ্যের তাওয়াং । তাওয়াংয়ের সাতাশ ফিট উঁচু বৌদ্ধমূর্তি, মাধুরী লেক । তারপর ভালুকপং । অসম ও অরুণাচল রাজ্যের সীমান্তজোড়া শহর ভালুকপং । অপরূপ সৌন্দর্যের শহর । শহরের মধ্যিখানে জিরো পয়েন্ট আর হলুদরঙা তোরণদ্বার । অসম ট্যুরিস্টলজের চত্ত্বর, ভারি সুন্দর । সবুজ প্রকৃতির মাঝে কাঠের তৈরি দোতলা বাংলো । বাংলোকে ঘিরে বাহারি কটেজগুলো । চোখ মেলে চাইলেই সামনে নদী । নদীর গা থেকে উঠে গেছে সবুজ পাহাড় ।
ছোট্ট সবুজ শহর, ঝিরঝির একটা নদী । জিয়াভরলি । সত্যি সত্যি মনে ভরিয়ে দিয়েছিল সেদিন ।
একলা কলঘরে মাঝে মাঝেই সেই নদীটার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় আজও ।
চোখ বন্ধ করে জলের ছায়ায় এল রাণী । আজ পাক গোসল । জলের স্পর্শে মন শান্ত, স্থির । একটা সঠিক সিদ্ধান্ত । নামাজের পর আপার সঙ্গে কথা বলতে হবে ।

আপা একটু অবাক । এত সকালে তো ফোন করে না রাণী । মৃদুল আসছে আগামীকাল, সেই ব্যাপারেই কি ?
অফিসের কাজ নিয়ে এমন আগেও এসেছে মৃদুল । এবার হজের জন্যে বড্ড ভিড় । কোনো হোটেলে জায়গা হয় নি । সাহিনার বাড়িতেই থাকবে মৃদুল । মৃদুলের জন্যে কাছিমের মাংস রান্না করবে সাহিনা । ডিমভরা ইলিশ । স্পেশাল বিরিয়ানী । সব ব্যবস্থা করে রেখেছে । রাণীর জন্যে আকাশী নীল একটা ঢাকাই মসলিন কিনে রেখেছে । মৃদুলের আসা ক্যানসেল হল নাকি ?
‘কাল সারারাত জেগে ছিলাম আপা । তারপর আজ সকালে একটা ডিসিশন নিয়েছি । তোকে দরকার আমার, কারণ একমাত্র তুই মৃদুলকে এ ব্যপারে রাজি করতে পারবি । বোঝাতে পারবি । তুই, দুলাভাই দুজনে বোঝাবি ওকে । এবার ঢাকা গিয়ে তোদের কাছেই থাকবে তো ও ।‘
‘কি বোঝাব মৃদুলকে ? ধর্ম বদল করতে বলব ? তুই কি পাগল হলি, রাণী ? আমি মৃদুলকে এ কথা বলব ? ধর, যদি বলিও, কেন বলব ? আর তারপর মৃদুল আমার কথায় রাজি হবেই বা কেন ?’
‘পুরো কথাটা না শুনেই এত রিয়াক্ট করিস কেন ? ধর্ম বদল না । আমি তো চাই, মৃদুল ছেলেরা সবাই ধর্ম বদল করে নিক । কিন্তু তা তো হবার নয় । ধর্ম বদল না ।‘ এক নি:শ্বাসে বলে গেল রাণী, একটা লম্বা শ্বাস । দীর্ঘশ্বাস ।
একটু চুপ, তারপর বলল, ‘আমি মৃদুলকে ডিভোর্স করতে চাই । আমি মৌলবীদের সঙ্গে কথা বলে একটা রাস্তা পেয়েছি । ডিভোর্স হয়ে গেলে ফরজানা আরা নামে পাসপোর্ট তৈরি করে নেব । তারপর আমি বুবলা ভাইয়ের ফ্যামিলির সঙ্গে হজ করে আসতে পারব । এসে আবার মৃদুলকেই রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করে নেব ।‘

এত অবাক হয়েছে সাহিনা যে আর কথা বলতেই পারে নি । ধর্ম কি ? যা মানুষকে ধারণ করে । ধর্মের একটা রিচুয়ালের এমন টান, যার জন্যে আঠাশ বছরের বিবাহিত সম্পর্ক ত্যাগ করা যায় ! ধর্ম নিয়ে, হজ নিয়ে এত আবেগ ! ধর্মপালনের জন্যে নিজের সঙ্গেই নিজের এমন লড়াই ?
হজ । তীর্থযাত্রা । এত কিছুর পর তীর্থযাত্রায় শান্তি পাবে তো রাণী ? তার পরেও কি লড়াইটায় জিতে যাওয়া হবে ?
কিন্তু রাণী এমন ভাবছেই না । কেউই তো ভাবে না এত ।
আহা মৃদুল !


****
এখন অনেক রাত । একটু আগে ফোনের পালা শেষ । ভিকি-রুকু দুজনের সঙ্গে কথা হয়েছে । নতুন চাকরি নিয়ে ভিকি বেশ উত্তেজিত । রুকু বরং বেশি কথা বলল না । ছেলেটা অমনই । বড্ড চাপা । মৃদুলের সঙ্গেও কথা হয়েছে । আপা-দুলাভাইয়ের কাছে বেশ আনন্দে আছে মৃদুল । কে জানে, আপা কথাটা মৃদুলের কাছে তুলবে কিনা ।
রাতজাগা একটা পাখি ডেকে উঠল । একটু চমকেই উঠেছে রাণী । দূরে রাস্তাটা নিঝুম, স্ট্রিট-লাইটের আলো পড়ে আছে জায়গায় জায়গায় । নকশাকাটা জলের পুকুরের মতো দেখাচ্ছে । বিশ্রাম নিচ্ছে একলা রাস্তা । বিশ্রাম নিচ্ছে রাতের পৃথিবী । ঘুমন্ত পৃথিবীর বুকে মাথা রেখে বিশ্রাম নিচ্ছে আকাশ । শুধু তারাগুলো চিকচিকে চোখে চেয়ে আছে ।
রাণীর বিশ্রাম নেই । একা একা চলার পথ । সামাজিকতা, ভদ্রতা, আন্তরিকতার অভিনয় করতে করতে ক্লান্ত রাণী । ডানা গুটিয়ে বসতে পারে এমন একটা আশ্রয় নেই, বিশ্রাম নেই । ক্লান্তিকর যাপনের মধ্যে এমন মুহূর্ত, যখন ভেতর থেকে উঠে আসবে হাসির ছটা । আলো এসে ভরিয়ে তুলবে জীবন । তরঙ্গ উঠবে সত্তা জুড়ে, সেই নদীটার মতো । ছলছল উচ্ছ্বল ।
নদী । সমুদ্র নয় । সমুদ্র শান্ত, গভীর । মৃদুল সমুদ্র ভালোবাসে । ছেলেরা দুজনেও । বাবার সঙ্গে এ ব্যাপারে মিল ওদের । কিন্তু সমুদ্র মনে এলেই রাণীর বুকে একটা অজানা কষ্ট ।
পুরী দীঘা শঙ্করপুর চাঁদিপুর । বারবার । মুম্বই গোয়া । কেরালা পণ্ডিচেরী কন্যাকুমারী । নানা সমুদ্র । কক্সবাজারের নীলচে সবুজ সমুদ্র, মরিশাসের অকাশী নীল সমুদ্র । বেড়াতে যাবার কথা হলেই সমুদ্র । আর সমুদ্র মানেই সেই গোপন কষ্ট ।
ভিকি ছোট্ট তখন । পুরী যাওয়া হয়েছিল । বন্ধুবান্ধবরা মিলে চার পরিবার । না না, ছোটনও তো ছিল । পাঁচ । ছোটনের অবশ্য বিয়ে হয় নি তখন । রাত জেগে আড্ডা, সমুদ্রে মাতামাতি । কুচোকাঁচাগুলোকে, ভিকি ছাড়াও নীলাদ্রির মেয়ে, বিপ্লবদের যমজ ছেলে, ছোটনই সামলাত । হোটেলের নির্জনতায় মৃদুলের সঙ্গে সেকেন্ড হানিমুন । বেশ কেটেছিল ।
সুর কেটেছিল ফিরে এসে । বন্ধুরা সবাই হৈ হৈ করে জগন্নাথ দর্শনে গেল । তখনও কিছু মনে হয় নি । মৃদুল যাবার কথা ভাবেই নি । ছোটন যায় নি । পার্টি করত তো, ও ঠাকুর দেবতা মানে না । ফিরে আসার পর এবাড়িতেই আড্ডা সেদিন । নীলাদ্রি-সুপ্তি এল জগন্নাথের প্রসাদ নিয়ে । শাশুড়িমা কি খুশি যে হলেন, ‘তাই বলো ! আমি তো ভাবলাম, এবার আর জগন্নাথ দয়া করলেন না ।‘
মৃদুলকে একান্তে বলেছিল পরে, ‘তুমি কেন মন্দিরে গেলে না ? কেন প্রসাদ এনে দিলে না বাড়িতে ?’
‘আমি ওসব মানি না রাণী, তুমি তো জানো ।‘
‘কেন মানো না ? তুমি তো ছোটনের মতো পার্টি করো না । তাহলে ?’
‘পার্টি করলেই বুঝি এই শিক্ষা হয় ? ভগবান একটা কনসেপ্ট । পরম করুণাময়, মঙ্গলময়, প্রেমময়, সুন্দর । কিন্তু তারপর ? উপবাস, অঞ্জলি, পুজো, ধর্ম । আচার-বিচার-সংস্কার । মন্দির মসজিদ চার্চ গুরুদোয়ারা । বহুবিধ সামগ্রী, আয়োজন, অনুষ্ঠান, মন্ত্র-পাঠ । আমার বিশ্বাস নেই রাণী । ধর্মপালন করতে গিয়ে মানুষ দূরে সরে যায় । তাছাড়া..’ হঠাত্‍ চুপ করে গিয়েছিল মৃদুল ।
‘তাছাড়া.. ? কি মৃদুল ? বলো, তাছাড়া কি ?’
‘কিছু না । আমাদের সম্পর্কের মধ্যে ধর্মকে আনব না কখনো, আমরা এমনটাই ঠিক করেছিলাম না?’
‘কিন্তু মা ? তোমার বাড়ির লোক ?’
‘আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে রাণী । আমাদের বাড়িতে কেউ গোঁড়া নয় । সংস্কার আছে, থাকবে । ওইটুকুই । তোমার অসম্মান হবে না কোনদিন ।‘

না, অসম্মান হয় নি । কিন্তু .. সুর কেটেছে বারবার । মৃদুলকে বারবার এ নিয়ে বিব্রত করতে মন চায় নি । একা একাই যাপন । এমনকি সেদিনের কথাটাও মৃদুলকে বলা হয় নি, এই ক’বছর আগে ভিকি যে কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে পুরী গেল, সেই কথা । পুজো-আচ্ছা ঠাকুর-দেবতা কিছুই শেখে নি ভিকি, কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে জগন্নাথ মন্দিরে পুজো দিয়ে প্রসাদ নিয়ে এসেছিল । বাড়ি ফিরে কেমন অপ্রস্তুত, শুকনো গজার বেতের ঝুড়িটা কোথায় যে রাখে !
‘আরে বাহ ! গজা এনেছিস ! দে দেখি আমায়,’ মৃদুল উল্লসিত । অপ্রস্তুত ভাবটা চাপা দেবার জন্যেই যে অমন উচ্ছ্বাস, তা রাণী বুঝবে না ? রুকু গজা নেয় নি, ও মিষ্টি খায় না ।
‘ওগুলো বরং বড়মাকে দিয়ে আসিস ভিকি । ঠাকুরের প্রসাদ, ওঁর ভালো লাগবে’, রাণীই বলেছিল ।
পাশের পাড়ায় থাকেন বড় জা । খুব ভালোবাসেন ভিকিকে । রাণীকেও । প্রসাদ পেয়ে কি যে খুশি, ‘দেখেছিস রাণী, কেমন সাব্যস্ত হয়েছে আমাদের ছেলে । বড় হয়ে গেল রে ।‘
ননদও ফোন করেছিল, ‘কেউ হাত ধরে শেখায় না রে । কেমন বুঝমান হয়েছে ভিকি । আহা, মা যদি দেখে যেতে পারত !’
বললেও কি মৃদুল বুঝবে, কোথায় লাগে ? হাতে করে বড় করল যে ছেলেকে, সে যে এমন করে বসবে, তা-ও কি ভেবেছে আগে ? একেই কি সংস্কার বলে ? জিনের প্রভাব ?
সমুদ্রের সঙ্গে এই একটা গোপন কষ্ট জড়িয়ে আছে । সমুদ্র মনে করলেই বুকের মধ্যে একটা ভয়, হারিয়ে ফেলার ভয় । সমুদ্রের কাছে গেলেই বুকের মধ্যে জমে ওঠা কান্না ।
তার চেয়ে নদীই ভালো । টুপটাপ ঝিরঝির নদী । জিয়াভরলি । মন ভরানো নদী । কুলকুল বয়ে যাচ্ছে একটানা । রিং রিং তরঙ্গ ।
না না । নদী কোথায় ! এ তো ফোনের শব্দ । এত রাতে কে ? রুকু !


****
‘কি হয়েছে রুকু ? এই তো কথা হল ।‘
‘মাম্মা, একটা কথা বলার আছে তোমায় ।‘
‘হ্যাঁ হ্যাঁ বলো । কি হয়েছে ? শরীর ঠিক আছে তো ? ভিকি ঠিক আছে তো ?’
‘সব ঠিক আছে মাম্মা । ব্রো ইজ ফাইন । বাট.. ব্রো.. ওয়েল..’
‘কি হয়েছে রুকু ? আমার টেনশন হচ্ছে । কি হয়েছে ভিকির ?’
‘না না, টেনশন করার মতো কিছু না । আসলে.. ব্রো.. ব্রো তোমাকে ফেস করতে চাইছে না । তাই আমি.. বাবাকে কল করেছিলাম.. কিন্তু..’
বাবাকে? মৃদুলকে ? ছোট থেকে ছেলেরা রাণীর কাছেই যত কথা, যত আবদার । হোস্টেলে যাবার পর অবশ্য ভিকি বাবার সঙ্গে সব শেয়ার করা শুরু করেছে । মজা করে বলত, ‘ইট’স আ ম্যান’স ওয়ার্ল্ড মাম্মা । টেকিং টিপ্স ফ্রম বাবা ।‘
সেইরকম কিছু ? তাহলে রুকু কেন ? রুকু চিরকাল অন্তর্মুখী । বাবা মা কেন, বন্ধুবান্ধবের কাছেও গলগল করে কথা বলে না । স্কুলের চার পাঁচজন বন্ধু ছাড়া বন্ধুও নেই ওর । ভিকিই একাধারে দাদা, বন্ধু । দাদা তো বলে না । ব্রো । সমস্যাটা কার ? রুকু, না তার ব্রো-র ?
‘বাবা ফিরে তোমাকে ডিটেইলস বলবে । ব্রো ইজ ইন ..’ চুপ করে গেল রুকু ।
‘ইন ? ইন ট্রাবল ? কি হয়েছে রুকু ? পরিষ্কার করে বল ।‘
‘না না । ট্রাবল কেন হবে ? ইউ আর অলওয়েজ সো হাইপার মাম্মা । ব্রো.. ওর এবারের রিলেশনশিপটা.. ওই যে মেয়েটা, ওর কলিগ ..’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ । ওই সাউথ ইন্ডিয়ান মেয়েটা । ভিকি বলেছিল । ইজ ইট সিরিয়াস ?’
‘হ্যাঁ মাম্মা । কিন্তু.. একটা প্রবলেম হয়েছে ।‘

রাধা । মেয়েটাকে দেখেছে রাণী । চাকরি পাবার পর একটা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিল ভিকি । গুছিয়ে দিয়ে এসেছে রাণী । কুক, কাজের লোক । ভিকি একা পারে নাকি ? তখনই দেখেছিল রাধাকে । মজাও করেছে, ‘কি রে ? শুধুই কলিগ, নাকি.. ?’
‘দূর । তুমিও যেমন মাম্মা । তামিল ব্রাহ্মণ । পাক্কা ভেজিটেরিয়ান । আমার দু’বেলা চিকেন চাই । পোষাবে না ।‘
ভালোবাসার কাছে এটা কোনো বাধাই নয় । ভিকি তখন জানত না ।

কিন্তু দুজনের কাছে যা বাধা নয়, তা পরিবারের কাছে মস্ত বাধা ।
মৃদুল ফেরার পর সব শোনা হল । ভিকি বাবার কাছেই আশ্রয় নিয়েছে এবার । মাযের আঁচলে থাকার দিন শেষ । সত্যিই ইট’স আ ম্যান’স ওয়ার্ল্ড । কষ্টে হাসল রাণী ।
বড্ড ইচ্ছে হত, মিষ্টি একটা মেয়ে এ সংসারের বউ হয়ে আসুক । মায়ের নামাজ পড়া নিয়ে যতই হেলা ছেদ্দা করুক ছেলেরা, বউ যদি একই ধর্মপালন করে ! বুবলাভাইয়ের মেজসম্বন্ধীর বোনের মেয়েটা, ঘননীল সলমা জরির লহঙ্গা পরে এসেছিল গত ঈদের দিন, টুকটুকে ফর্সা নম্র মেয়েটা, মনে মনে ভিকির পাশে দাঁড় করিয়ে দেখতে কি যে সুখ ! অমন রূপসী মেয়ে, আচার বিচার সংস্কার, মেয়েটা রিসার্চ করে ইউনিভার্সিটিতে, আলাপ হলে ভিকির মন জুড়ে বসবে রেশমা । মাহতাব ভাইয়ের অত পয়সা, নিজেও প্রোফেসর, মৃদুল ওদের বেশ পছন্দই করে । তা আর হবার নয় ।
রাধার পরিবারে এ বিয়েতে সায় নেই । কারণ ভিকির মা । রাণীর ধর্ম আজ তার ছেলের জীবনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে ।
বড্ড ভেঙে পড়েছে ভিকি । প্রথম ভালোবাসা হারানোর কষ্ট । আরো কষ্ট, এই হারানোর কারণ । মা । যে মাকে কষ্ট দিয়ে সাত রাজার ধন পেয়েও তৃপ্তি হবে না ভিকির ।
‘তুমি মনখারাপ কোরো না । আমি কথা বলব ওঁদের সঙ্গে ।‘ অনেকদিন পর এমন মায়ার গলায় কথা বলল মৃদুল । নিজেদের জীবন শুরু করার দিনগুলোয় এমনই মায়ায় জড়িয়ে থাকত ও । কোনো আঁচ লাগতে দেবে না রাণীর মনে । যাপনবৃত্তে হারিয়ে গেছে সুক্ষ্ম কত অনুভূতি ।
সম্পর্কে ধুলো জমেছে । এসেছে ক্লান্তি । যে ক্লান্তিতে মন জুড়ে নিরাকার মুক্তির ডাক শোনা । মনটা পাখির চোখে তীর্থযাত্রার পথে চেয়েছিল । হজ । উমরা ।
হঠাত্‍ এলোমেলো সংসার । আলগা হয়ে পড়েছে সম্পর্কের নকশিকাঁথার টানটান সুতো । মাযের জন্যে কষ্ট পাবে ভিকি ? সব তীর্থের সেরা তীর্থ, রাণীর ভালোবাসার সংসার । সেই সংসারে খড়কুটোর মত উড়ে যাবে মাযের সম্ভ্রম ? সন্তানের আস্থা ?


****
মিস্টার আইয়ার অবশেষে রাজি হয়েছেন, একবার পাত্রের বাবা-মাযের সঙ্গে দেখা করার জন্যে । ধর্ম নিয়ে আবেগ মেয়ের ভালোবাসার আবেগের কাছে এইটুকু পরীক্ষা দিতে রাজি । বিধর্মী মাযের ছেলেরা যে সংস্কার আচার বিচার নিয়েই বড় হয়েছে, পিতৃধর্মের রীতিগুলো শিখেছে, পরিবারে অন্য ধর্ম থুড়ি বিধর্মী প্রভাব একেবারেই নেই .. এই সব তথ্যগুলো ওঁরা সরেজমিন তদারক করে যাবেন ।
দুই জা বারবার বলছেন, ‘তুই একদম ভাবিস না রাণী । আমরা থাকব সেদিন । ওঁরা আমাদেরও দেখবেন তো ।‘
ভাসুররাও বলেছেন, ‘আমরা কথা বলব । ভিকি আমাদের বাড়ির ছেলে ।‘
বড়ননদ উদার আবেগে তাঁর গোপালকে বসার ঘরের তাকের ওপর দৃশ্যমান করবেন বলে দিয়েছেন । এমনি গোপাল তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী । লাল বটুয়া, বটুয়ার মধ্যে গোপাল । এবাড়িতে এতবছরের মধ্যে কোনদিন বড়ননদ গোপালকে বটুয়ার মধ্যে থেকে বার করেন নি । এখন ধর্ম নিয়ে বিপদ উপস্থিত হয়েছে । গোপাল এবাড়িতে দৃশ্যমান হলে ভিকির মুখটা থাকে ।
অবশ্য একা গোপাল নয় । শিরডি সাইবাবার একটি সুদৃশ্য মূর্তি বসার ঘরের টিভির ওপর সাজিয়ে গেছেন ভিকির হবু মাসি-শাশুড়ি ।
রাধার মাসি আগেভাগে একদিন এসে সব দেশেশুনে গেছেন । ভিকি-রাধার ভালোবাসাটা যাতে সার্থক হয়, মাসি সেজন্যে চুপিচুপি বরপক্ষে যোগ দিয়েছেন । রাণীকে বুঝিয়ে বলেছেন, ‘তুমি ভেবো না । শিরডি সাইবাবা জন্মসূত্রে তোমার ধর্মের মানুষ ।‘
মৃদুল এসব একেবারেই পছন্দ করছে না, ‘আমরা যেমন, তেমনই থাকা উচিত । হঠাত্‍ করে এত ঠাকুর দেবতা আমাদের বাড়ির মধ্যে না-ই ঢুকে পড়লেন । তুমি এমন চুপ করে আছ কেন রাণী?’
ভিকি একদিন বলল, ‘রুকুর নামটা যে বেশ বাঙালি বাঙালি, দ্যাট অ্যাডস পয়েন্ট ফর আস । আমার নামটা একটু বাঙালি হলে ভালো হত ।‘
দুলাভাই ভিকির ভালো নাম দিয়েছিলেন । বিক্রমজিত । একটু বড় হয়েই ভিকি নিজের নামটা ছোট করে নিয়েছিল । বিক্রম । রুকুর নাম দিয়েছিল রাণী নিজে । অর্কজ্যোতি । রুকুর একটুও পছন্দ নয় নামটা । মুখে মুখে নামটা ‘অর্কো’ হয়ে গেছে ।

সব দেখেশুনে মিস্টার আইয়ার এবং তাঁর পরিবার অবশ্য খুশিই হলেন । ইন্টারভিউয়ের জন্যে স্পেশাল সাজিয়ে দিল রিয়া, বড়ননদের মেয়ে । হালকা সবুজ মটকা সিল্ক, লাল বর্ডার । মাথায় সিঁদুর, কপালে টিপ বাঙালি মা তো হল না । বাঁ হাতে পাতলা একটা বালা ।
‘দেখে লোহা বাঁধানো মনে হবে, ভেবো না মামী’, রিয়া আশ্বস্ত করল । রান্নাবান্না সব বাঙালি । রাণীকে অবশ্য রান্নাঘরে যেতে দেওয়া হয় নি । কে জানে, ওঁরা খাবেন কিনা । তামিল ব্রাহ্মণ বলে কথা ।
ঘুরে ঘুরে বাড়িটা দেখলেন সবাই । বসার ঘরে গোল কাচের টেবিলে শিরডি সাইবাবা, টিভির পাশে সিংহাসনে গোপাল, দেয়ালে সোনালি ক্রুশে যিশু । বারান্দায় সবুজ এরিকা পাম, লাল-হলুদ ক্রোটন, সাদা নয়নতারা, জ্যেঠুর বাড়ি থেকে টবসুদ্ধ গাছটা নিয়ে এসেছে রুকু ।
শাশুড়িমাযের শ্বেতপাথরের থালা বাটি, কাঁসার গ্লাস .. চিরকালই নিজের হাতে রান্না করে খেতেন মৃদুলের মা.. খুশি হলেন আইয়াররা । মাযের ঘর, যেটা এখন রুকুর ঘর হয়েছে, দেয়ালে মাযের প্রিয় দক্ষিণেশ্বরের কালীমুর্তির ছবি.. বড় ননদ এনে লাগিয়ে দিয়েছেন.. হাত জোড় করে প্রণাম করলেন অতিথিরা ।
বড় শোবার ঘরে ঢুকে একটু থমকে দাঁড়ালেন আইয়ার । দেয়ালে রাণী-মৃদুলের যুগল ছবি ।
‘বিউটিফুল । নদীটা । কোথায়?’ হাত তুলে ছবিটার দিকে দেখলেন আবার, ‘ওয়েট, আমি বলছি । অরুণাচল । রাইট ? দা বিউটিফুল রিভার । কামেং । ওই যে পাহাড়গুলো, ঝরনার মতো নেমে আসছে নদীটা..’
‘না না । এটা আসাম । জায়গাটার নাম ভালুকপং । নদীটা জিয়াভরলি ।‘ মৃদুল বলল । হাসল । নদী আগল খুলে দিয়েছে । ‘অরুণাচল থেকেই আসছে নদীটা । অরুণাচলে এর নাম কামেং । আসামে এসে জিয়াভরলি ।‘
‘ইয়েস । আই রিমেমবার । অরুণাচল বর্ডারে ছিলাম তো অনেক বছর । তারপর ভালুকপং-বমডিলা হাইওয়ে ।‘
সিপিডব্লিউডি ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন আইয়ার । কর্মসূত্রেই ঘুরেছেন দেশের নানা প্রান্ত । ‘জানেন তো .. পুরাণমতে অসুররাজ বাণের পৌত্র ভালুক-এর রাজধানী ছিল এই ভালুকপং’, আইয়ার বললেন, ‘ছটফটে পাহাড়ী নদী কামেং । সমতলে এসে শান্ত ধীর স্থির । জিয়াভরলি । হোয়াট আ বিউটিফুল নেম ।‘
দূরে অরুণাচলের নীল নীল পাহাড় । একপাশে বন, অন্যপাশে বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, ঝোপঝাড় । কালচে নীল মসৃণ রাস্তা । আদিগন্ত ভেজা সবুজ । ডানদিকের জঙ্গলে বড় বড় গাছ, সাদা সাদা ফুল । একজাতের কাঞ্চন, বুনো কাঞ্চন কোনো । রাস্তা জুড়ে ঝরে পড়া ফুল ।
সেই রাস্তার ওপর দিয়ে বোড়ো মেয়েরা । মাথায় পিঠে কাঠকুটো । পরনে তাদের ট্রাডিশনাল পোষাক কাঠের মালা । কাশঝোপের আড়ালে লুকিয়ে আছে নদী । হৃদয়হরণ, হৃদয় ভরানো জিয়াভরলি ।
মাঝখান দিয়ে বয়ে গেল কতগুলো বছর । মৃদুলের সঙ্গে প্রথম দেখা । কত বাধা পেরিয়ে বিয়ে । নতুন সংসার । একে একে দুই ছেলে । নদীটা একইরকম থেকে গেছে ।

‘এই জিয়াভরলি নদীর আরেকটা স্পেশালিটি আছে । বোস্তামি কাছিম । ইংরেজি নাম ব্ল্যাক সফট-শেল টার্টল । পৃথিবীর বিলুপ্তপ্রায় কাছিমগুলোর মধ্যে একটি । একমাত্র বাংলাদেশ আর ভারতের ব্রক্ষ্মপুত্র নদের অববাহিকার কিছু অঞ্চলে এদের দেখা মেলে । জিয়াভরলি-তে বোস্তামি কাছিম দেখা যায় । ওখানের লোকজন অবশ্য এটার নাম দিয়েছে মাজারী কাছিম । একটা গল্পও আছে এদের নিয়ে । এই কাছিমগুলো নাকি কিছু পাপী লোকের বংশধর, তেরোশ’ শতাব্দীতে এক দরবেশের অভিশাপে মানুষ থেকে কাছিমে পরিণত হয়েছিল ।‘
খাটের ওপর আটপৌরে বসে পড়লেন আইয়ার, জিয়াভরলি মুখের আগল খুলে দিয়েছে । মনেরও ।
‘সাধারণ একটা নদী, আর সব নদীর মতই । অথচ কত ঐশ্বর্য ধরে রেখেছে । কেমন লাফিয়ে লাফিয়ে চলে কামেং .. পাহাড়ী নদী কিশোরী মেয়েদের মত চঞ্চল । সমতলে এসে প্রগাঢ়যৌবনা শান্তশিষ্ট জিয়াভরলি । ধৈর্যশীলা স্ত্রীর মতো, মায়ের মতো । ধারণ করাই কাজ তখন । এইভাবে নাম বদলে, পরিচয় বদলে নদী তবু দিয়েই চলে । না ? মেয়েদের জীবনের মতো । সব মেয়েদেরই জীবনেই কি তাই ? আমার মেয়েটা .. একেবারে অন্যরকম একটা পরিবার .. মেয়েটাকে আপনার হাতেই দিয়ে দিলাম মিসেস ভট্টাচারিয়া ।‘
কঠিন বর্ম ছেড়ে বেরিয়ে এলেন চিরন্তন পিতা, ‘টুয়েলভ শেষ করে থেকে বাইরে বাইরে আমার মেয়ে, ঘর সংসারের কাজ শেখে নি । একটু মানিয়ে নেবেন প্লিজ । শিখিয়ে নেবেন আপনাদের বাড়ির যোগ্য করে ।‘
সনাতনী মাযের মতই হাত জোড় করে ফেলল রাণীও, ‘একটুও ভাববেন না আপনি । আমার তো মেয়ে নেই । রাধা আমার মেয়ে হয়ে থাকবে ।‘


****
আজমের শরীফ । সুফী সাধক খাজা মঈনুদ্দিন চিশতীর মাজার শরীফ । প্রসিদ্ধ পুষ্কর তীর্থ, প্রাচীন তারা গড় দূর্গ, মনোলোভা হৃদ আর মঈনুদ্দিন চিশতীর দরগার শহর আজমীর । হিন্দু মুসলিম উভয় সংস্কৃতির মিলনকেন্দ্র ।
সপ্তম শতকে রাজা অজয়পাল চৌহানের হাতে গড়ে উঠে আজমীর শহর । রাজা অজয়পাল ভাগ্যের পরিহাসে রাজত্ব হারিয়ে অজ বা ছাগল চরিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন । তখন থেকেই তিনি রাজা ‘অজপাল’ নামে পরিচিতি লাভ করেন এবং জায়গাটি অজপাল নামে পরিচিত হয়ে পড়ে । অজপাল থেকে ক্রমপরিবর্তনে আজমের বা আজমীর হয় ।
পুরাণ মতে, ভগবান ব্রক্ষ্মা একদিন যজ্ঞের উপযুক্ত স্থান নির্বাচনের চিন্তায় বিভোর হয়ে ফুটন্ত পদ্মফুল হাতে ঘোরাফেরা করছিলেন । সেইসময় অসাবধানতায় হাতের পদ্ম থোকা থেকে একটি পদ্মফুল খসে মর্ত্যধামে পড়ে যায় । সে পদ্মের আঘাতে তিনটি সরোবর সৃষ্টি । তার একটি হল পুষ্কর সরোবর । ব্রক্ষ্মা স্বর্গ ছেড়ে এসে মর্ত্যের এই স্থানটিকে যজ্ঞস্থল হিসেবে নির্বাচন করে যজ্ঞ সম্পাদন করেন । সেই থেকে পুষ্কর হিন্দুদের এক পবিত্র তীর্থ ।
শ্রীরামচন্দ্র চোদ্দ বছর বনবাস যাপনকালে পত্নী সীতা ও অনুজ লক্ষণ সহ পুষ্করতীর্থে এসে সরোবরের পবিত্র জলে অবগাহন করেন ।

ইন্টারনেট ঘেঁটে তথ্য জোগাড় করেছে নতুন বৌমা । রাধা । বেড়াতে যাবার ছুটি পায় নি ভিকি । নতুন চাকরি । ভিকি-রাধার হানিমুন প্ল্যান করেছিলেন রাধার মাসি, থাই দেশ বেড়ানোর টিকিট থেকে সব ব্যবস্থাপনা তাঁর । রাধার বিয়েতে মাসির উপহার । আপাতত সে সব স্থগিত রইল ।
নতুন মাকে নিয়ে রাধা বেড়াতে এসেছে নতুন দেশে ।
খুব অবাক হয়েছে সবাই । রাণী নিজেও কম অবাক হয় নি । রাধা মৃদুলকেও জোর করেছিল, ‘তুমিও চলো পাপা । একা একা কী তীর্থ হয় ?’
‘তুমিও তো একাই যাচ্ছ । শাশুড়ি-বৌমা ঘুরে এসো ।‘
‘না না, আমি একা নয় । ভিকি আসবে ওখানে । শনি রবিবার । তারপর ও ফিরে যাবে মুম্বাই, আমি আম্মাকে নিয়ে ফিরে আসব । আমার তো আরো পনেরোদিন ছুটি ।‘
নতুন বৌমার আবদার । এই একটি উপহার চেয়েছে সে নতুন বাবার কাছে । না এসে উপায় কি !
রুকুও আসবে দিল্লী থেকে । ওই শনি রবিবার । রাধার প্ল্যানে কোনো খুঁত নেই ।

এসে অবশ্য বেশ লাগছে । কতবছর পর এমন দল বেঁধে বেড়াতে আসা । রুকু ছেলেমানুষের মতো উত্তেজিত । কত প্রশ্ন তার । মাঝে মাঝেই মোবাইল খুলে গুগল করে নিচ্ছে ।
কত সুবিধে আজকাল । হাতের মুঠোয় বিশ্ব । হাতের মুঠোয় তথ্যের অগাধ ভাণ্ডার ।
একটু আগে দরগা শরীফের ইতিহাস পড়ে শোনাচ্ছিলো, ‘দ্বাদশ শতকের সুফি সাধক ধর্মগুরু খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী সর্বধর্মের লোকের পরম শ্রদ্ধেয় । সম্রাট আকবরের ধর্মগুরু । কিংবদন্তী প্রবাদপুরুষ খাজা মঈনুদ্দিন চিশতীর জন্ম এগারোশ’ বিয়াল্লিশ সালে, পারস্যের সঞ্জারে । মক্কা হয়ে মদীনা যাওয়ার পথে তিনি আল্লাহর নির্দেশে ভারতবর্ষে ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে আসেন । এগারো শ’ বিরানব্বই সালে, মোহাম্মদ ঘোরীর সঙ্গে ভারতে আসেন । আজমীরে বাস শুরু করে মঈনুদ্দিন চিশতী ভারতবর্ষে ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেন । বারো শ’ ছত্রিশ সালে, চুরানব্বই বছর বয়সে এই আজমীরে তাঁর জীবন অবসান । এখানেই সমাহিত করা হয় তাঁকে । আর তাঁর মাজারকে ঘিরে গড়ে ওঠে দরগা শরীফ । আজমীর শরীফ ।‘
রাণী খুব খুশি । আঠাশ বছরের বিবাহিত সম্পর্ক, প্রথম পরিচয় থেকে হৃদয়ের সম্পর্ক আর পাঁচ বছরের । প্রিয়তম রমণী । একান্ত নিজের এই মানুষটা নিজেকেও যা না চেনে, মৃদুল তাকে চেনে । বোঝে ।
মজার ব্যাপার হল, এই ছোট্ট মেয়েটা রাণীর মনটা চিনে ফেলছে । মেয়েরা বোধ হয় এমনই হয় । ভিকি রুকু যত বড় হয়েছে, আলগা হয়েছে বাঁধন । ছেলেরা মাযের কাছে আর মন খুলে কথাই বলে না । মাযের মন চেনার কথা ভাবে কিনা কে জানে । অথচ এই মেয়েটাকে দ্যাখো, ভিকিকে ভালোবেসে এবাড়ির বউ হয়ে এসেছে । এসেই সবাইকে দু’হাতে আগলে জড়িয়ে রাখতে চাইছে । আজকাল অফিসের পর বাড়ি ফিরতে বেশ লাগে । কলিংবেল বাজানোর আগেই দরজা খুলে একমুখ হাসি, ‘এসে গেছ পাপা ? আম্মা আজ কচুরি করছে তোমার জন্যে ।‘
কিংবা ছোট্ট ছোট্ট পরোটা । ধোকলা । বৌমাকে রোজ নতুন নতুন রান্না শেখায় রাণী ।
কোনদিন দুজনে বেরিয়ে এল শপিংমল । বইমেলা । সিনেমা । দুই সখীর মতো । এই অপরূপ যাপনের জন্যেই জীবন ।

কোন নতুন বৌটা এমন গোটা পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসে ! কাল রাণীকে বলছিল, শুনে ফেলেছে মৃদুল, ‘জানো আম্মা, সাতবার আজমীর দর্শনে একবার মক্কা দর্শনের পুণ্য । তোমাকে আমি সাতবার এখানে নিয়ে আসব ।‘
কি করে জানল ও ? রাণী মুখ ফুটে গোপন ইচ্ছের কথা বলবে না । মৃদুলকেই বলে নি । সাহিনা আপা বলেছে মৃদুলকে । রাণী হজ বা উমরা করতে যেতে চায় । দু’দিন এসে এই মেয়েটা জেনে ফেলল সে কথা !
বাবার মতই যে কোন জায়গার ইতিহাস ভূগোল জেনে ফেলার আগ্রহ আইয়ারের মেয়ের । কাল এ জায়গার ইতিহাস শোনালো, ‘জানো তোমরা, মনোবাসনা পূরণের জন্য খাজাবাবার দরগাশরীফে এলেই তা পূর্ণ হয় ? সম্রাট আকবর সন্তানলাভের জন্য এই দরগায় ধরনা দিয়ে সন্তানলাভ করেন । জাহাঙ্গীরের জন্মের পর তিনি একটি মসজিদ তৈরি করে মঈনুদ্দিন চিশতীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন, ওই যে আকবরি মসজিদ । মসজিদের প্রবেশদরজা তৈরী করিয়েছিলেন হায়দ্রাবাদের নিজাম । পনেরো শ’ সাতষট্টি সালে সম্রাট আকবর চিতোর জয় করে আজমীর শহরে এলে এই দরজা প্রদান করে খাজনা দেন নিজাম । প্রতি বছর আগ্রা থেকে পায়ে হেঁটে সম্রাট আকবর এই দরগায় আসতেন ।
পরে জাহাঙ্গীর দিল্লীর সিংহাসনে বসে আরেকটি মসজিদ তৈরি করেন, যার নাম ‘চন্দ্রখানা’ মসজিদ । দরগায় আরো একটি মসজিদ তৈরি করেন সম্রাট শাহজাহান । শ্বেতপাথরের মসজিদ, ‘মুক্তো’-মসজিদ । এই আজমীরে শাহজাহানের বড়ছেলে দারার জন্মও । পাপা, ভিকি-রুকুকে নিয়ে কাল সব দেখে নিও কিন্তু । আম্মা তো দরগা ছেড়ে কোথাও যাবে না । আমি আগেও এসে দেখে গেছি । আর আম্মাকে নিয়ে আবার আসব তো । আরো অন্তত ছ’বার ।‘ দুষ্টু হাসল মেয়ে ।

যেদিকে চোখ যায়, ইতিহাস আর ইতিহাস । মৃদুল মুগ্ধ । আপ্লুত । ভাগ্যিস রাধা জোর করল !
সুলতান ইলতৎুমিস দরগা শরীফে একটি মসজিদ নির্মাণ কাজ শুরু করেন, মোঘল সম্রাট হুমায়ুনের হাতে সে নির্মাণ কাজ শেষ হয় । কুতুবউদ্দিন আইবেক এখানে আড়াই দিনে মসজিদ নির্মাণ করেন, সেটি আড়াই-দিন-কা ঝোপড়া নামে পরিচিত । এ ছাড়াও আছে প্রাচীনতম বিদ্যানিকেতন মেয়ো কলেজ । সোনাজি কা নাসিয়া, জৈন মন্দির । উনিশ শতকে তৈরি, বেলেপাথর দিয়ে তৈরি অপূর্ব মন্দির । বাইরের ও ভেতরের দেওয়াল জুড়ে কারুকার্য । জৈন ধর্মগ্রন্থের নানা কাহিনী, চিত্রের মাধ্যমে ব্যক্ত ।
ঘুরে ঘুরে সব দেখা হয়েছে । ভিকি রুকু দুজনেই ফিরে যাবে কাল । দৌলতবাগ দেখা হবে আজ বিকেলে । সবাই মিলে একসঙ্গে । রাণীও যাবে । কাল ছেলেরা ফিরে যাবে । দরগা দেখে রাণীকে নিয়ে সবাই মিলে আজ বিকেলে দৌলতবাগ, চেশমে-ই-নূর হান্টিং লজ ।


****
আপাতত আজমীরের আসল আকর্ষণ ! রাণী যেখানেই বসে আছে আজ চারদিন ধরে, বারবার । সঙ্গে রাধা । পায়ে পায়ে সেদিকেই ।
দরগার মূল মাজার শরীফের প্রবেশদ্বারে বারো মিটার উঁচু দরজা । খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতকে তা নির্মাণ করেন দিল্লীশ্বর ইলতুৎমিস । রূপোর পাতে মোড়া বিশাল দরজা । আগাগোড়া সোনায় মোড়া গম্বুজাকৃতি সিলিং ।
সমাধি বেদীর একটু দূরে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতীর কন্যা বিবি হাফিজ জামাল ও মোঘল সম্রাট শাহজাহান কন্যা চিমনি বেগমের সমাধি । এই মাজার অর্থাৎ সমাধিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মসজিদ, একটি সম্মেলন কক্ষ ।
রূপোর রেলিং দিয়ে ঘেরা ভেলভেটে মোড়া শ্বেতমর্মরের সমাধি বেদী । ভক্তরা ফুল ছড়িয়ে দেয়, গিলাফ চড়ায় । গিলাফ । মানে, চাদর । রূপোর রেলিং-এর কাছ ঘেঁষে বসে আছে রাণী । পাশেই রাধা ।

বুকের মধ্যেটা শান্ত । চোখ বেয়ে গালের ওপর নেমে এসেছে ধারা । বুকের মধ্যে শান্ত নদী । রাণী চোখ মেলে চাইল । পাশেই রাধা । মাথায় ঘোমটা, চোখ বন্ধ করে দু’হাত জোড় করে প্রণামের শান্ত ভঙ্গী । মন ভরে উঠল । কত ভাবনা ছিল । কেমন হবে ভিকির বউ । বিধর্মী শাশুড়িকে কেমন চোখে দেখবে ব্রাহ্মণ পন্ডিতের মেয়ে ! নামাজ পড়ার ছোট্ট বেহেশত কি হারিয়ে যাবে ঘরের কোণ থেকে ! বৌমা যদি পছন্দ না করে !
তা হয় নি । রাণীর ধর্ম নিয়ে, আচার নিয়ে কত কৌতুহলী প্রশ্ন মেয়ের । আঠাশ বছরের বিবাহিত সম্পর্কে এমন ভাবে কেউ জানতেই চায় নি ।
বড্ড ভয় । বুকের মধ্যে জমাট বাঁধা ভয় । এই বুঝি সংসারে অঘটন ঘটল । এই বুঝি সংসারের ছন্দ কেটে গেল । একরকমের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস । এই বুঝি ছেলেরা দূরে সরে গেল । এই বুঝি মৃদুল ধর্মপালনে বাধা দিল । এই বুঝি শ্বশুরবাড়ির লোক বাঁকা চোখে চাইল । প্রাণপণে ধর্ম আঁকড়ে বাঁচতে চাওয়া । সংসারটাকেই তো দূরের পরের মনে হচ্ছিল ।

চোখের সামনেই খাজাবাবার সমাধি । আহ শান্তি !
ভালো করে চাইতেই.. ওকি ! কে ও ! মাথায় রুমাল, মৃদুল । পাশে দুই ছেলের মাথায়ও রুমাল । প্রণামের ভঙ্গিতে হাত জোড় করে চোখ বন্ধ করে বসে ভিকি-রুকু । মৃদুল হাত জোড় করে নি । ও তো এসব বিশ্বাসই করে না । চোখে দুষ্টু হাসি, অনেকবছর আগের হাসিটা ফিরে এসেছে মুখে । রাণীর দিকেই চেয়ে আছে সোজা ।
আহ । এত সুখও ছিল ভাগ্যে ! এইভাবে সপরিবারে মাজারে বসে আছে রাণী !

বিকেলে সবাই মিলে একসঙ্গে দৌলতবাগ । কাল ছেলেরা ফিরে যাবে কাজের জায়গায় । পাপা আর আম্মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরবে রাধা ।
দৌলতবাগ । আজমীরের অন্যতম আকর্ষণ আনাসাগর হৃদের ধারে দৌলতবাগ নামক বাগিচা । মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর তৈরি করেন । পরে তাঁর পুত্র শাহজাহান হ্রদের পাড় বাঁধিয়ে এটিকে আরো সুন্দর করে তোলেন, শ্বেতপাথরের পাচঁটি ঘর তৈরি করেন ।
জলের ধারে বসে, জলের কাছে বসে রাণীর বুকের মধ্যে ফিরে এল নদী । জিয়াভরলি । কামেং আর জিয়াভরলি । একই নদী, মানুষ দুটো আলাদা নাম দিয়েছে । আজমের । দরগা আর পুষ্কর । দুজন আলাদা মানুষ দুই আলাদা টানে ফিরে ফিরে আসে একই জায়গায় ।
মায়াময় স্মৃতিময় গন্ধময় বর্ণময় জীবনময় পৃথিবী । পৃথিবীর কোন কিছুই একমাত্রিক নয় । একমুখী ধারণা, একমুখী আচারপালন, একমুখী যাপন মানুষের ক্ষতি করে । মানুষকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে একবগ্গা ছলনায় । ছলনা ছাড়া আর কি ? কোন আবরণ সরিয়ে ফেললে, কোন ধারণাকে বরণ করে নিলে জাগ্রত হবে মন, তা খুঁজে নিতে দেরি হয়ে যায় না ?
আহা রাধা । ওকে কোনো ভয় নিয়ে, ছলনা নিয়ে বাঁচতে হবে না । মায়ায়, মমতায়, ভালোবাসায় সবরকম ভয় মুছে ফেলার মন্ত্র জানে ও । প্রশ্ন আর অন্বেষণ । এই নিয়েই তো নিবিড় যাপন । ধর্ম নিয়ে, সংস্কার নিয়ে আলোচনা । যুক্তি, তর্ক, একমুখী যাপনের দ্বন্দ্ব থেকে মুক্তি, গভীর অন্বেষণ । তবেই তো দর্শন তৈরি হয় ।
জীবনদর্শন । জীবনবোধ । নদীর মত গতিময়তা । নতুন নতুন পথে, নতুন নতুন নামে বারে বারে নিজেকে আবিষ্কার । আহা রাধা । ইচ্ছে হলেই ওর নিজের মানুষের কাছে ফেরার সুখ আছে । দু’দন্ড ঈশ্বরের কাছে বসার শান্তি আছে ।

বুকের মধ্যেটা টলটল করছে । পরিপূর্ণ চোখে গভীর মমতায় পরিবারের দিকে চাইল রাণী, ‘আমার একটা প্রস্তাব আছে ।‘
‘কি আম্মা ?’ উত্সাণহে লাফিয়ে উঠল রাধা । আবার কোথাও বেড়াতে যাবার কথা বলবে আম্মা ! সপরিবারে ? ভিকি রুকু পাপা সবাই মিলে ?
‘রুকুর পৈতে দিলে হয় না ?’
মৃদুলের চোখে স্পষ্ট চমক । ‘না, দেখলে তো ? ভিকির বিয়ের সময় এ নিয়ে কত কথা উঠল । রাধার বাবা-মা যদিও পুরো ব্যাপারটা সামলে নিলেন । বিয়ের আগেই পৈতে দিলেন ভিকির । রুকুর সঙ্গেও যদি.. মানে, রুকুরও যদি বিয়ের আগে পৈতে দিতে হয় ? আমরাই আগেভাগে পৈতে দিয়ে দিলে বেশ হয়, না ?’

------------------

আপনার মতামত জানান