…সাথে কোনও ছাতা

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়



- “কেমন যেন অন্ধকার নেমে এসেছে...”
- “কোথায়?”
- “বাইরে... ওই যে...”
- “হুম... তাই তো! সঙ্গে ছাতা আছে তো?”
- “তা আছে, কিন্তু এ যা মেঘ, আকাশ ভেঙে জল নামবে! ছাতায় কি হবে?”
- “সে একটা ট্যাক্সি কিংবা যাহোক ধরে নিলেই তো হ'ল... কিছু তো একটা থাকবে...”
- “ঘোঁড়ার ডিম থাকবে!”
- “ঠিক আছে... সে তখন দেখা যাবে। কফিটা ঠাণ্ডা হচ্ছে... শেষ কর। না হ'লে ফেলে দিতে হবে!”

শহরের কফিশপগুলো কেমন ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠছে। সেই আটপৌঢ়ে কেবিনওয়ালা হোটেলদের ধীরে ধীরে অপসারিত করে বড় ব্যানারের সব ক্যাফে। এক একটি বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ঝলমলে নিওনের বোর্ড। বেশ সাজানো গুছনো অথচ ছিমছাম পরিবেশ। একটু বেশি দামে কফির সঙ্গে, সময় আর বাতানুকূল পরিবেশ... সবই কিনতে পাওয়া যায়। ভিড় বাড়ছে, ক্রমশই নতুন প্রজন্মর কাছে সময় কাটানোর নতুন ঠিকানা এই ক্যাফেগুলো। হারিয়ে যাওয়া মাঠ, পার্কের রেলিং, গলির রক... তাদের জায়গায় অভয়ারণ্য ক্যাফেগুলো। ব্যস্ত নাগরিকদের সংরক্ষিত আড্ডার ঠেক, আলোচনার জায়গা... এমন কি, ব্যক্তিগত সময়েও। কিন্তু বাতুনুকূল বলেই বোধহয়... বিপণনযোগ্য সব কিছুর মাঝেও একটা আপোশ করে নেওয়া কৃত্রিমতা। অবশ্য সব কৃত্রিমতাই তো এখন গা সওয়া। দৈনন্দিন নাগরিক জীবন, বছরের পর বছর একটা জিনিসই সব থেকে ভাল করে শেখায়... মেনে নেওয়া। যেখানে রোদ এসে পৌঁছয় না, ঋতুপরিবর্তনের মরসূমী বাতাসের প্রবেশ নিষেধ, বৃষ্টির ছাঁট কাঁচে ধাক্কা খেয়ে বাইরে থেকে ঝাপসা করে চলে যায়। গ্রীনহাউসের মত সম্পর্কের অর্কিড বাঁচিয়ে রাখে এই ক্যাফেগুলো এই ভাবে বেশ আছে। আর ভাগ্যিস আছে বলেই... প্রবাল, কৌশানীর মত কেউ কেউ সময় বাঁচিয়ে এই ভাবে দেখা করতে পারে কিছুক্ষণের জন্য, কাঁচের দেওয়ালের ওপারে বাকি সব কিছুকে কিছুক্ষণ সরিয়ে রেখে।

- “এভাবে চুপচাপ বসে মোবাইলের ভুজ্জি করার ছিল... তো আসতে বললে কেন?”
- “ক’টা পর পর আপডেট এলো তাই... বল তুই... শুনছি...”
- “না! এই সেন্সগুলো থাকা উচিৎ। ফোন আমারও আছে। সেখানেও আপডেট আসছে...”
- “ঠিক আছে ঠিক আছে... দেখছি না। শান্তি?...”
ব্যস্ত হয়েই ফোনটা পকেটে পুড়ে ফেলল প্রবাল। একটু অপরাধী মুখ করে কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, “কি জানিস... সময়ে সময়ে এই ফোনে আপডেট দেখাটা একটা অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে। একদম প্রোগ্রাম্‌ড। ঠিক স্মোকারদের যেমন স্মোক করতে ইচ্ছে করে... তখন হাতের সামনে সিগারেট না পেলে অস্বস্তি হয়। ঠিক সেরকম বুঝলি? নিজে থেকেই হাতটা ফোন খুঁজতে থাকে... না পেলে সিস্টেম যেন কোথায় একটা ধাক্কা খায়...
- “উফ! তুমি থামবে! সিস্টেম ধাক্কা খায়... ছিট ছিলোই... একা একা থেকে বেড়েছে আরো! এখানে না বসে থেকে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাও... যাও।”
- “হ্যাঁ... প্রায় সেরকমই অবস্থা... হা হা হা... ”
- “মানে! এ আবার কি কথা?”
- “নয়ত কি... সাইকিয়াট্রিস্ট মানে কি পাগলের ডাক্তার? শরীর যেমন খারাপ করলে ডাক্তার দেখাতে হয়... তেমন মন খারাপেরও ডাক্তার দেখানো উচিৎ। আমরা ইগনোর করি বলেই মনের অসুখ বেড়ে চলে... জানিস?”
কফির কাপটা তুলে চুমুক দিতে গিয়েও পারল না কৌশানী। টেবিলে নামিয়ে রাখল। চোখের চাহনি মুহূর্তে কেমন করুণ হয়ে উঠেছে, ঠিক কাঁচের ওপারে মেঘলা আকাশটার মত। ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে প্রবালের দিকে চেয়ে রইল। প্রবল চেয়ে রইল কাঁচের বাইরে... যেখানে পদাতিকের যাওয়া আসা দেখা যায় আর যত্নে রাখা বাহারি গাছের সারি। সেসব কিছুর দিকে একটানা তাকিয়ে থাকলেও কিছু আসে যায় না, কৌশানীর চোখে দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলেও আসে যায়। অথচ যতক্ষণ না প্রবাল কৌশানীর দিকে তাকাবে কৌশানী চোখ ফেরাবে না, ওর জেদটা এরকমই। ওই ভাবেই ভুরু কুঁচকে চেয়ে থাকবে। বাধ্য হয়েই নিজের দৃষ্টি কৌশানীর দিকে ফেরালো প্রবাল, বাধ্য হয়েই কফির কাপটা মুখের কাছে নিয়ে সে একটা চুমুক দিয়ে বলে উঠল “আআআআহ্‌”। প্রবালের ডান হাতে কাপ ছিল, তাই বাঁ হাতের দিকেই নিজের ডানহাতটা বাড়িয়ে দিয়ে কৌশানী বলল, “কি হয়েছে?... কি এমন হ’ল হঠাৎ... চাপ নিচ্ছো?”
- “না না... চাপ কিসের... এ তো ভেবেচিন্তেই...”
- “তাহলে?”
- “তাহলে আবার কি! দূর!”
- “না দূর নয়... তুমি বলছ না... জানই তো ঠিকমত খাচ্ছো কিনা ঘুমোচ্ছো না, এসব আদিখ্যেতা পোষায় না আমার! তাই বললে বল... না হ’লে ছাড়ো!”
- “হ্যাঁ সেই ভালো... এতদিন পর দেখা হ’ল... কথা হ’ল... দরকারি কাজ মিটলো... আবার কি চাই? তা ছাড়া আমি বেশ আছি... কোনও চাপই নেই... তুই আর নিজের চাপ বাড়াস না।”
বলে হা হা করে হেসে ফেললো প্রবাল। হাসিটা চিরকালই বেশ দিলখোলা ভাবে হাসতে পারে প্রবাল। এইভাবেই হা হা করে হাসে, স্থান-কাল-পাত্র ভুলে গিয়েই। ক্যাফেতে বসে এই ভাবে হা হা করে হেসে ওঠা বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে খুব সাধারণ ব্যাপার। এই নিয়ে কেউ বিশেষ মাথা ঘামায় না। তবু তিন-চার জন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল এই ভাবে হঠাৎ হেসে উঠতে দেখে। কৌশানীও দেখছে একই ভাবে ভুরু কুঁচকে, চোখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। আসলে, মনে মনে হাসিটাকেই মাপছে, ক’আনা খাঁটি। এর আগে, একাধিকবার এই ভাবে হাসার জন্য বহুবার অস্বস্তিতে পড়লেও, কোনওদিনও প্রবালকে থামতে বলেনি। পড়ে উত্তেজিত হয়েছে, কিন্তু হাসি থামায়নি কোনওদিন... আজও পারল না। হাসিটা থামার পরে শুধু বিরক্তিটা নিয়েই বলল “হয়েছে?” প্রবাল অবশ্য সেই বিরক্তিকে এতটুকু গ্রাহ্য করেছে বলে মনে হ’ল না। কফির কাপে স্ট্র দিয়ে একবার এদিক সেদিক করে আর একটা চুমুক দিয়ে বলল, “তারপর? তোদের সব কিছু ফাইনাল তো?”

বাইরে খুব জোড়ে মেঘ ডেকে উঠল, ব্যস্ততম রাস্তায় জানবাহনের যান্ত্রিক ধস্তাধস্তিকে ছাপিয়ে কোনও শব্দই কাঁচের এপারে আসে না। মনে হ’ল কাছাকাছি কোথাও বাজ পড়েছে, রাত হলে হয়ত ঝলসে ওঠা বিদ্যুৎ এই গর্জনের আগেই সাবধান করে দিয়ে যেতো। বাজ পড়ার তীব্র আওয়াজ একটা জোড়ালো মেঘের গর্জন হয়েই এলো কাঁচের এপারে। ফুটপাথে এদিকওদিক ছুটোছুটি শুরু করেছে লোকজন... মাথা বাঁচানোর জায়গা খুঁজছে। এতক্ষণ আকাশ কালো করে স্থিতিশক্তি সঞ্চয় করছিল... এবার ঝেঁপে বৃষ্টি নেমেছে! আচমকা জোড়ালো মেঘডাকার শব্দে কি না কে জানে, কিছু বলতে গিয়েও হঠাৎ থমকে গেল কৌশানী। দু’জনেই কিছুক্ষণ একসাথে তাকিয়ে রইল কাঁচের বাইরে। যাদের মাথা বাঁচানোর মত কিছু জোটেনি, তাদের অবস্থা শোচনীয়! প্রবালই আবার জিজ্ঞেস করল, “কি রে! সব কিছু ফাইনাল তোদের?” “আমাদের মানে?... ও... না... ভাবনা চিন্তা চলছে।”, নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তর দিলো কৌশানী।
- “এখনও ভাবনা চিন্তা? ক’মাস হ’ল যেন?”
- “প্লিজ! সবাইকে নিজের মত ভাবাটা বন্ধ কর! ভাবার প্রয়োজন আছে... আই নীড সাম টাইম।”
- “বাওয়া! আমার ওপর হাইপার হয়ে কি হবে? যাকে বলার তাকে বল না!”
- “কাউকে কিছু বলার নেই তো... বৃষ্টিটাও ছাতা এমন শুরু হ’ল... কখন যে বেরোবো...”
- “ভিসার ব্যবস্থা আগে করবি না কি আগেই... ”
- “ভিসা?... কিসের ভিসা?”
- “বাহ্‌... ডিপেন্ডেণ্ট হলেও তো ভিসা লাগে... আর বাইরে কত স্কোপ...”
- “দূর!... জানো? লাচুং যাওয়ার সময়... রাস্তার ধারে ঠিক ওইরকম দেখতে পাহাড়ী ফুল ফুটেছিল... মনে হবে মর্নিং গ্লোরি... আসলে তা নয়... জংলি ফুল সব! বেগুনী, নীল!”
প্রবাল একবার পেছন দিরে দেখল ক্যাফের ভেতরেই সেই টবে সাজানো ফুলগুলোকে, যাদের দেখে কৌশানীর হঠাৎ লাচুং-এর কথা মনে পড়ে গেছে। প্রবাল লাচুং যায়নি কোনওদিন। কিছুক্ষণ ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, “জানিস... রাজস্থানে ওই বেহালার মত ছড় ওয়ালা জিনিসটা দেখলেই লোকে বলে দেয় রাওয়ান-হাত্তা। কিন্তু জয়সালমেরে ঠিক ওইরকমই বেহালার মত ইন্সট্রুমেণ্ট পাওয়া যায়... কিন্তু রাওয়ান হাত্তা নয়, তাকে বলে কামাঞ্চা।”
- “মানে?... হঠাৎ?”
- “আর দু’টো ক্যাপুচিনো বলে দিই? না...”
- “না না... কোনও দরকার নেই... এত কফি গেলার অভ্যেস নেই আমার। ফিরতে পারলে বাঁচি... আকাশ ভেঙে পড়ছে!”
- “এই বৃষ্টিতে বেরোনো যায় নাকি! দাঁড়া একটু তোড়টা কমুক... এইখানে বসে থাকাই সেফ। না হয় আরও কিছুক্ষণ সহ্য করে নিলি... কিছু কাল আরও না হয় রহিলে কাছে, আরও কিছু ...”
- “তুমি থামবে!”
মাঝপথেই থমকে যেতে হবে এটা জানা কথা, প্রবাল নির্বিকার ভাবে পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বার করে আবার কি সব দেখতে শুরু করল আঙুল বুলিয়ে বুলিয়ে। কৌশানী এবার আর কিছু বলল না। প্লাস্টিক থেকে ছাতাটা বার করে রেখে দিলো টেবিলের ওপর। বৃষ্টিটা একটু ধরলেই বেরিয়ে পড়তে হবে। সন্ধে হতে গেলে অফিস ফিরতি লোকজনের ভিড় সামলাতে হিমসিম খেতে হবে!

- “দেখ... বৃষ্টিটা ধরেছে একটু... বেরিয়ে পর এবার।”
- “হুম... আর তুমি?”
চেয়ার ছেড়ে ছাতা হাতে উঠে পড়েছিল কৌশানী... কিন্তু এগিয়ে যেতে পারল না। এক পা এগিয়েই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ‘তুমি’-তে। প্রবাল মোবাইল ফোনটা লক করে, পকেট রেখে বলল, “হ্যাঁ... এই তো... বিল দিয়ে বেরিয়ে পড়ব...” ওয়েটার ছেলেটি কাছেই ছিল, ওদের উঠতে দেখেই ছুটে এসে বিলটা রেখে দিয়ে গেলো টেবিলের ওপর।
- “কি হ’ল? তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেন? দেড়ি হয়ে যাবে তো! আমি বিল মিটিয়ে বেরিয়ে পড়ব... চাপ নেই!”
- “থামো তুমি... ছাতা কোথায়? ভিজে ভিজে যাবে নাকি!”
- “ও আমি ম্যানেজ করে নেবো...”
- “ম্যানেজ করে কৃচ্ছসাধনের কিছু নেই... আমার সঙ্গে বাস স্ট্যান্ড অবধি চলো... তুমি একটা কিছু পেয়ে গেলে, আমি ট্যাক্সি নিয়ে নেবো।”
- “সে কি! একটা ছাতা... দু’জনেই তো ভিজবো... তা’ছাড়া...”
- “ঢং কর না... চুপচাপ এসো...”
বৃষ্টিটা এখনও পড়ছে ঝিরঝির করে। যেমন অবেলায় সন্ধে নিয়ে আসা মেঘ ছিল... তাতে বৃষ্টি না থামারই কথা। তোড়টা যে কমেছে এই ঢের। সেই বৃষ্টির মধ্যে দিয়েই একটা ছাতা সম্বল করে এগিয়ে যাচ্ছিল ওরা দু’জন। কখনও ফুটপাথে জমা জল বাঁচিয়ে, কখনও উলটো দিক থেকে ধেয়ে আসা ছাতা বা দ্রুত হেঁটে আসা পথচারীকে বাঁচিয়ে... আর হয়ত অজ্ঞাতে বাঁচিয়ে, কারও কারও নজর। আগেও হেঁটেছে এই ভাবে... নজর বাঁচিয়ে ব্যস্ত ফুটপাথে। ছাতাটা প্রবালই ধরেছে চিরকাল, হয়ত ওই আপেক্ষিক উচ্চতার সান্ত্বনাটাকে নিজের মনে করে।

গতিও বড় অদ্ভুত সত্ত্বার প্রকাশ। গতিশীল কিছুর মাঝে যে এসে পড়ে, তাকে কিছুতেই সে থেমে থাকতে দেয় না। এগিয়ে চলা পদক্ষেপ, আর এই ঝির ঝির করে ক্রমাগত ধেয়ে আসা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো, এদের থামানোর চেষ্টা কি কেউ করেছে কোনওদিন? এই হঠাৎ ধেয়ে আসা বৃষ্টি, হয়ত মেঘ কেটে গেলে থেমে যাবে একসময়। এগিয়ে চলা ব্যস্ত পদক্ষেপগুলোও হয়ত জিরিয়ে নেওয়ার অবসর পাবে। কিন্তু সময়? ক্যাফে থেকে বেড়িয়ে এই ভিজে ফুটপাথে পায়ে পায়ে চলা, তার একটু আগে মুষল ধারে বৃষ্টি, তার একটু আগে কিছু কথা, তার একটু আগে জরুরি হিসেব নিকেশ, তার একটু আগে দু’কাপ ক্যাপুচিনো, তার একটু আগে অপেক্ষা... এভাবেই পিছোতে পিছোতে তো অনেকটা দূর চলে যাওয়া যায়... অনেকটা পেছনে। পিছু ডাকে সময় সারা দেয়নি কোনওদিন, জীবনও দিতে চায় না বোধহয়। শুধু ‘মন’ বলে মনগড়া নিভৃত আশ্রয়, অজ্ঞাতেই বড় বেশি সময় পিছু ফিরে চেয়ে কাটিয়ে দেয়... আর মাঝে মাঝে গোড়ালি উঁচু করে সামনে কিছু খোঁজে... কখনও উদ্বেগ, কখনও কৌতূহলকেই সম্বল করে। একটা ছাতাও হয়ত সেই মনের মতই একটা নিভৃত আশ্রয়ের নাম, যাকে অবলম্বন করে এগোতে এগোতে খেয়ালই থাকে না, ঠিক কতক্ষণ, কতটা পথ পেরোনো হ’ল... ঠিক কোথায় যাওয়ার কথা ছিল... ছাতাটাই বা আসলে কার? বৃষ্টির তোড়টা এখনও সমীহ করার মত আছে বলেই কি শুধু যতটা সম্ভব ছাতার তলায় নিজেদের জড় করে রাখার চেষ্টা করছিল প্রবাল আর কৌশানী? রাস্তার জল ছিটকে চলে যাওয়া দু’তিনটে ভিজে ঢপ হয়ে যাওয়া বাস, আপন খেয়ালে হর্ণ দিতে দিতে এগিয়ে যাওয়া ট্যাক্সি... এদের কাউকেই ওই একটা ছাতার অন্তরমহল থেকে কেন যে দেখা গেল না, রানিং বাসের পেছনে ছুটতে ছুটতে হাঁফিয়ে ওঠা ওই কাক ভেজা মানুষটা তা জানবে কেমন করে?

- “এই বৃষ্টির মধ্যে কিছু পাওয়া যায়!”
- “নাহ্‌”
- “আর ট্যাক্সিগুলো এমন জানোয়ার যে সালা ডাকলেও দাঁড়াবে না!”
- “সেই তো দেখছি...”
হাসতে ইচ্ছে করলেও হাসল না, অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে হাসিটা সামলাতে সামলতে কৌশানী বলল, “এতটা তো এসেই গেলাম, আর বাস না খুঁজে মেট্রো নিয়ে নিলেই হয়... সামনেই তো মেট্রো স্টেশন।” প্রবাল জানে, ‘সামনে’টাও আরও দশ মিনিটের হাঁটা পথ। আর মেট্রোতে গেলে ওর নিজের কোনও সুবিধেই হবে না। তবু এক কথায় রাজী হয়ে গেল, রাজী হয়ে যাওয়া ওর পুরনো অভ্যাস। ব্যস্ত ভাবে বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, সেই ভাল বল... বৃষ্টির মধ্যে গাড়ির জন্য এই ভাবে দাঁড়িয়ে ভেজার থেকে পা চালিয়ে এগিয়ে যাই... মেট্রো দিয়েই চলে যাব।” আরও দশ মিনিট, একটা ছাতার রাজত্বকাল।

মেট্রো স্টেশনের গেটটা নিজেই লাস্ট স্টেশনের মত দাঁড়িয়েছিল। কোনওরকমে ছাতা বন্ধ করে প্রবাল তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নামতে গেল, আগে লাইনে দাঁড়িয়ে দু’টো টিকিট কাটতে হবে। কিন্তু উলটো দিক থেকে লোকের ভিড় যেন বেশি। ওপরে উঠে আসা লোকের এই অনাবশ্যক ভিড় আর ব্যস্ততা দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল কয়েক ধাপ নেমেই। এই বৃষ্টির দিনে মেট্রোর স্টেশন চিরকালই শহরের সব থেকে নিরাপদ আস্তানা। তবু কেন এত বিরক্তি চোখেমুখে? প্রত্যাহত শরনার্থীদের মত সকলে পাতাল থেকে ফিরে আসছে কেন? অখুশি, বিব্রত মুখগুলো দেখেই বোঝা যায় কিছু একটা বেনিয়ম ঘটে গেছে দুর্যোগের মাঝে। সাদা পোশাক পড়া পুলিশ কোনও অফিস ফেরত প্রৌঢ়কে বাধা দিয়ে বলল, “ট্রেন লেট হবে... বেলগাছিয়ায় অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে... কখন আবার চালু হবে জানি না।” এদিক ওদিকে থেকে স্বগতোক্তি-সলিলকি ভেসে আসতে লাগল এক এক করে... “কোনও মানে হয়! এরা আর সময় পায় না!”... “এই অফিস ফেরার টাইমে ঝাঁপ দেওয়ার ছিল!”... “পাঁচ টাকা খরচ করে মরতে এসেছিল... বুঝলেন? পাঁচ টাকা খরচ করে মরতে এসেছিল!” জনস্রোত ওদের দু’পাশ দিয়ে ওপরদিকে উঠে যেতে লাগল। থমকে দাঁড়িয়েছিল প্রবাল। বুঝতেই পারেনি কখন কৌশানী ওর ঠিক পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রবাল হতাশ ভাবে পেছনে না ফিরেই বলল, “ট্রেন লেট করবে বলছে তো... ওয়েট করতে হবে...” এক হাত দিয়ে প্রবালের শার্টের হাতাটা আঁকড়ে দাঁড়িয়েছিল কৌশানী ভিড়ের মধ্যে, শুধু কাঁপা কাঁপা গলায় বলল “আ-আমি যাব না মেট্রো তে... প্লিজ বেরিয়ে চল... ক্‌-কেমন দমবন্ধ হয়ে আসছে!” বাইরে এসেও দাঁড়ালো না কৌশানী, হন হন করে বৃষ্টির মধ্যে এগিয়ে গেল বেশ খানিকটা দূরে একটা দোকানের শেডের দিকে। যেন পালিয়ে গেল মেট্রো স্টেশনের সামনে থেকে। ঠিক কি করবে বুঝে উঠতে পারল না প্রবাল, বন্ধ ছাতাটা ওর হাতের মুঠোতেই ধরা তখনও। সেই দোকানের শেড অবধি এগিয়ে গিয়ে বলল, “কি রে! হাঁপাচ্ছিস কেন? শরীর খারাপ লাগছে?... কি রে!... কিছু বল?” কেমন যেন গুম খেয়ে চুপ করে ছিল কৌশানী। প্রবালের কথার কোনও উত্তর দিলো না। কিছুক্ষণ পর বলল, “ছাতাটা তুমি নিয়ে যাও... আমি একটা ট্যাক্সি নিয়ে নিচ্ছি এখান থেকেই... দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
- “সেকি! তোর ছাতা... আমি নেব কি? বর্ষাকাল... তোর তো লাগবে!”
- “আহ্‌... কথা বাড়িও না তো! আমার কি একটা ছাতা?”
- “তাও... আজ নেওয়া মানে... আবার ফেরত...”
- “দিও ফেরত... লিস্ট বানিয়ে রেখেছো তো... জুড়ে দিও এটাকেও।”
- “কিছু বলছি না মানে এই নয়... যে যা খুশি বলে যাবি!”
চাপা স্বরে বললেও, বেশ দৃঢ়তা ছিল প্রবালের কণ্ঠে। মনে হ’ল এই প্রথম মেজাজটা হারিয়েছে এতক্ষণ পর। চোখে মুখে প্রকাশ না করলেও বিব্রত হয়েছিল কৌশানী, আঘাত একটু জোরালোই হয়ে গেছে। রাগাতে চেয়েছিল ঠিকই, তবে অতটা নয়। হাতের প্লাস্টিকের দিকে এতক্ষণ পর নজর গেল, ক্যাফে থেকে বেরোনোর পর, ছাতার নিচে এই প্লাস্টিক যেন থেকেও ছিল না... এখন হঠাৎ ফস্‌ করে বলে উঠল ‘এই তো আমি’। আঁতকে উঠল কৌশানী, “এএএএ বাবাআআ আআ... দেখেছো! সব ডকুমেন্টস ভিজে একশা!” প্রবাল একবার আড়চোখে সেদিকে তাকিয়ে বলল, “যাহ্‌... কেস তো... আবার বানাতে হবে সব নতুন করে? ঘরে দিয়ে ফ্যানের নিচে রেখে দিস...” কৌশানীকে দেখে ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না কাগজপত্র ভিজে যাওয়ার কারণে দুঃখিত না অসন্তুষ্ট। শুধু বোঝা গেল যে নির্লিপ্ত নয়। গম্ভীর মুখে একবার কাগজগুলোকে হাতে নিয়ে দেখার চেষ্টা করল, তারপর আবার ঢুকিয়ে দিলো প্লাস্টিকের ভেতরে। অন্যমনষ্ক ভাবে চেয়ে রইল সেই প্লাস্টিকের দিকেই। ছাতা মাথায় রাস্তায় নেমে প্রবাল ইতিমধ্যেই একটা চলন্ত ট্যাক্সিকে হাত দেখিয়ে থামিয়েছে। কৌশানীর হাত ধরে টান দিয়ে বলল, “এই! ট্যাক্সি এসে গেছে... উঠে পর। দেরি হলে আবার ঝাড় খাবি।” কৌশানী কোনও সারা না দিয়ে অন্যমনস্ক ভাবেই ট্যাক্সিতে গিয়ে বসল। প্রবাল ট্যাক্সিওয়ালাকে বলে দিলো, “রাসবিহারী” আর কৌশানীকে বলল, “ঘরে পৌঁছে একবার জানিয়ে দেবেন মর্জি হ’লে।” কৌশানী তখনও প্লাস্টিকটা আঁকড়ে, শুধু অঙ্ক ভুল করা স্কুলের ছাত্রীর মত খুব ক্ষীণ কণ্ঠে একবার প্রবালের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি ঠিক জানি না... কিন্তু শুনেছি লিগাল এগ্রিমেণ্টে মিউচুয়াল সেপারেশনও হয়, যেটা ঠিক ডিভোর্স নয়... যদি... ” প্রবাল ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে দেখল কৌশানীর মত সেও প্রবালের দিকে তাকিয়ে, উত্তরের অপেক্ষায়। “মিটার উঠছে... তাড়াতাড়ি এগো... আর এই নে ছাতাটা... এই বৃষ্টিতে প্রবাল মুখুজ্জে ছাতা মাথায় দিচ্ছে শুনলে ঘোড়ায় হাসবে!”, বলে হা হা করে হাসতে হাসতে ছাতাটা জানলা দিয়ে গলিয়ে দিলো প্রবাল। ভিজে ছাতাটা ঠুক করে পড়ল, কৌশানীর পায়ের কাছে।

ট্যাক্সিটা চলে গেছে অনেকক্ষণ... কৌশানী জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পিছন ফিরে তাকিয়েছিল, প্রবাল পিছন ফেরেনি... তাই দেখতে পায়নি। ভিড়ের মধ্যে নিজে একলা হয়ে যাওয়া, আর, কাউকে ভিড়ের মধ্যে একলা হয়ে যেতে দেখার মধ্যে কে বেশি বিষাদ-নীল তা বুঝে ওঠার আগেই দূরত্ব অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। পশ্চিমের ফিকে আলোটা নীল হয়ে গিয়ে পুরোপুরি সন্ধে নেমে গেছে। বৃষ্টিটা এখনও ঝিরঝির করে পড়েই চলেছে। প্রবাল হাঁটতে হাঁটতে মেট্রো রেলের গেটের দিকে এগিয়ে গেল, তারপর তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো ফুটপাথ ধরে। মেট্রোর গেটটা পার হওয়ার পর ধীরে ধীরে হ্রাস পেলো গতি। এত আলোচনা, এত তর্ক, এত উপদেশের পর নেওয়া সিদ্ধান্ত... তা একদিনের বৃষ্টি, একটা ছাতা আর খানিকটা হাঁটা পথ নিমেষে বদলে দেবে কেমন করে? বিচ্ছেদ... সে তো বিচ্ছেদই... তাকে ‘মৌখিক’ বলেই বা কোন আশা বা পরিণতিকে জিইয়ে রাখা হয়? এরকম একের পর এক প্রশ্নচিহ্ন বৃষ্টির ফোঁটা হয়ে টুপটাপ ঝড়ে পড়ছিল প্রবালের ঘাড়ে, কাঁধে, মাথায়। তবু ভাল লাগে বেশ, হিসেব নিকেশ নয়, নিজের সঙ্গে দরকষাকষি নয়... শুধু ভেজার জন্যই বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতে। ডেড-লাইন, নোটিস, সেট্‌লমেণ্ট, আইনি-জটিলতা, দূষণ, অ্যাসিড রেইন... সব কিছুকে ভুলে যাওয়া যায় বৃষ্টি ভিজে হাঁটতে হাঁটতে। রাস্তার ভিড় পেরিয়ে কখন যে প্রবাল রাজভবনের ফুটপাথে চলে এসেছে, খেয়ালই নেই... একটু পরেই আকাশবানী ভবন... আর একটু পরেই বাবুঘাট। ঘড়ির ডায়ালটা ভিজে ঝাপসা হয়ে গেছে, ঝাপসা সময়। মোবাইল ফোনের পর্দাও বোধহয় পকেটে একইরকম ঝাপসা। অনেকক্ষণ সে ভিজে ট্রাউজারের পকেটে বন্দী হয়ে আছে। এই বৃষ্টিও বেশ সময় করে আসতে জানে... শুধু ভিজিয়ে দিতে নয়, ধুয়ে দিতে... মুছে দিতে। স্তরে স্তরে মনের ওপর জমা কাঁচা রঙের প্রলেপ আর ধূলোর আস্তারণগুলো কেমন ধুয়ে মেছে যায়, শুধু সাদা রঙটা থেকে যায়। প্রবালের মনে হয়, সব রঙ ধুয়ে যাওয়ার পর যা থেকে যায় তা কেবল সাদাই। যা সব রঙ একসাথে ফিরিয়ে দিতে পারে। অথবা কালো, যা সব রঙ একসাথে দখল করে আর কিছুই ফিরিয়ে দেয় না। হাত দু’টো বড় বেশি খালি, যাবতীয় কাগজপত্র কৌশানীর হাতের সেই প্লাস্টিকে ছিল, যা ভিজে গেছে বৃষ্টিতে। হাত আর মনের মধ্যে কোনটা আসলে শূন্য তা নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই প্রবালের... শুধু দু’টো রঙ দাঁড়িপাল্লায় ভাসছে... সাদা আর কালো। সাদা না কালো, কার দিকে পক্ষপাতের কাঁটাটা হেলে থাকে ভাবতে ভাবতে... হলুদ হ্যালোজেনে আলো করা ভিজে শহরের ফুটপাথ দিয়ে ভিজতে ভিজতে এগিয়ে গেলো প্রবাল। কৌশানীর সামনেও ট্রাফিক সিগনালের লাল আলোটাও বদলে হলুদ হয়ে দপ দপ করছে... সবুজ হলেই আবার এগিয়ে যেতে হবে।

আপনার মতামত জানান