খাট

মালিনী ভট্টাচার্য



“এই শালী! খানকী! গতরখাকি! ওঠ বলছি! ঘুমোচ্ছে যেন নাগরের রাজ-পালঙ্কে শুয়ে...”
কংক্রিটের পাইপের ওপর নির্দয় লাঠির মারে দুলারীর স্বপ্ন খানখান হয়ে যায়। ধড়ফড়করে উঠে বসে দেখে সাদা ইউনিফর্ম কালো টুপি চোখ লাল করে ধমকাচ্ছে; কষ বেয়ে কালচে লাল রস গড়াচ্ছে; পোড়া তুবড়ির টুকরোর মতো ছিটকে আসছে চিবানো সুপুরি। ভয়ে ভয়ে ছেঁড়া পুঁটলি কোলে করে উঠে কোনরকমে পাইপের ঘেরাটোপ থেকে বেরোয়। একটা হলদে হাত-ওয়ালা গাড়ি এসেছে তার সংসার তুলে নিয়ে যাবে বলে। সাদা হেলমেট, সাদা জামা কতগুলো নীলচে কালো উর্দিকে কি সব বলে। দুলারী একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকে অপরাধীর মতো। চারদিকে প্রচুর চেঁচামেচি। অনেকেরই সংসারের পাঠ উঠল। গাছ ভেঙে পড়ার মতো আওয়াজ খালি কানে শোনে সে কিছু বোঝে না। সে এই মুলুকের ভাষা ভালোভাবেবোঝে না এখনো।
তার মুলুক ছিল সবুজ ভুট্টা ক্ষেতের দেশ। বাপ সাধ করে নাম রেখেছিল দুলারী। মা কে কখনো ছুঁয়ে দেখেনি মা-খাকী মেয়েটা। তবে বাপ আদর-সোহাগ করত। কিন্তু মেয়েকে আদর-সোহাগ করলেই তো পুরুষের সংসার চলবে না। নতুন ফসলের সঙ্গে নতুন মাও এল। সেই বর্ষাতেই বাপ মরল সাপের কামড়ে। আর তারপর থেকে দশটা বসন্ত গেল শরীরে কালশিটের দাগ রেখে। গোয়ালের খড়ের গাদায় পড়ে থাকতে থাকতে সভয়ে দেখত সামনের দেওয়ালে, লন্ঠনেরআলোয়ফুটেওঠাচৌ খুপিতে অসংখ্য পুরুষ ছায়ামূর্তির আনাগোনা। তারপর মায়ের ঘরের দরজা বন্ধ হলে সব অন্ধকারে ডুবে যেত। সেই অন্ধকার চিরে ঠিকরে উঠত চাপা হাসির ছররা আর বড় পালঙ্কটার ক্যাঁচকোঁচ। এমন পালঙ্ক কখনো দেখে নি সে। বড় বড় বাজুতে ফুলপাতার নকশা কাটা। সেই পালঙ্কে সওয়ার হয়ে সে রোজ রাতে মেঘ মাখে গায়ে। আজ ভোরে লাঠির ঘা খাওয়ার আগে অবধি মেখেছে।

হার থেকে ছিঁড়ে যাওয়া পুঁতির মতো কিছু মটরদানা নর্দমার আশেপাশে পড়ে। দলছুট একটা মুরগী গেরস্থের সঞ্চয় খুশি মনে খাচ্ছে। দুনিয়ার আজব তামাশা হাঁ করে দেখে গাছতলায় বসা দুলারী। এই শহর তামাশার শহর, সে তার মায়ের সঙ্গে এখানে তামাশা দেখতে এসেছিল। তার মা আর এক চুরুট খাওয়া বাবু ট্রেনে চাপিয়ে তাকে নিয়ে এসেছিল। বারোটা কাচের চুড়িও কিনে দিয়েছিল। এই শহরে কোথায় নাকি তার মাসির বাড়ি। ভুটভুটি চেপে গঙ্গা পেরিয়ে কত অলিগলি ঘুরল সে। একটা গলিতে রেতের বেলাও দিনের চকমকি। আকাশ থেকে যেন তারা নেমে এসেছে। রঙ, রঙ আর শুধু রঙের ছটা চোখ পুড়িয়ে দেয়। রঙিন আলো, রঙিন গান, রঙিন চোখ, রঙিন ঠোঁটের ভিড়ে ধাঁধা লেগে গিয়েছিল দুলারীর। সে মায়ের পিছন পিছন আসছিল। হঠাৎ ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এসেছিল পুরো পাড়ায়। আর তার মুখ চেপে ধরেছিল দুটো শক্ত হাত। ক’বার গোঙানোর চেষ্টা করে কোন লাভ হয়নি। কানের কাছে ফিসফিস করে বলেছিল এক মরদের গলা, “মরার শখ না জাগলে চুপ করে যা”। ততক্ষণে অন্ধকারে তার মা নিজের সর্বনাশের বহর শোনাচ্ছিল পাড়া ফাটিয়ে। গোল গোল টর্চ বাতির আলোর শিকারি চোখ এড়িয়ে একটা নোংরা চটের আড়ালে লুকনো দুলারী ভাবছিল তার হারিয়ে যাওয়াতে মায়ের এমন কি ক্ষতি হল। তবে কি নতুন মা তাকে ভালবাসত? ভাবার সময়ই সে বেশী পায়নি। মুখ-চাপা অবস্থায় এ গলি ও গলি তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিললোকটা। সদর রাস্তায় পড়ে সামনে যে বাস ছিল তাতেই হ্যাঁচকা টান মেরে তুলে নেওয়ার পর দম ফেলতে ফুরসৎ দিয়েছিল লোকটা। বাসে হলুদ নিভু নিভু বাতিতে সেই প্রথম বার তার রসিক দাসকে দেখা। ঝাঁকড়া চুলের রোগা লোকটা হলদে দাঁত বের করে বলেছিল, “বড় বাঁচা বেঁচে গেলি।”

“বউ! ও বউ! তোর কি পেতে সবচেয়ে মন জাগে রে?”
কংক্রিটের গোল পরিসীমায় বন্দি হয়ে দুলারীর শরীরে শরীর মেশাচ্ছিল রসিক। হাঁপাচ্ছিলও। তার কাচের হাতবাক্সে রাখা টিপের পাতা কাচের চুরির ওপর জ্যোৎস্নার ছোঁয়ায় বিজলির চমকানি। আনমোনা দুলারী সে দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে বলেছিল, “পলঙ্ক”। খিক খিক করে হেসেছিল রসিক। “শালা! মাথার উপর ছাত জোটাতে পারলাম না, বিবির আমার পালঙ্কের শখ!”শরীরের নিচে উপহাসে কুঁকড়ে শক্ত হতে থাকা দুলারীকে গলানোর জন্যে সে নরম গলায় বলে “তা দেব ‘খন পিয়া, তাই দেব। তোরে কত পিরিত করি বল। নিশ্চয় দেব।” ভাষার ব্যবধান পেরিয়ে স্বরের ওঠানামায় দুলারী বোঝে যে তার আর্জি মঞ্জুর হল। মনে ছলকে ওঠা আনন্দের স্রোত পা বেয়ে নেমে রসিককে ভালবাসায় ভিজিয়ে দেয়। কত পুন্নিমে আর অমাবস্যে এভাবে কেটেছে হিসাব রাখেনি দুলারী। পেটের মধ্যে গজানো আঁকুর অপুষ্টিতে ঝরে গেছে বারবার। তবু রসিক তার সাধ্য মত খেয়াল রাখে। টিপ, চুড়ি, গন্ধ-তেল বেচে আর ক’টা পয়সাই বা আসে। তাও তো সেদিনধাবা থেকে ভাঁড়ে করে খাবার নিয়ে এসেছিল। ফিলিমও দেখিয়েছে একবার। ছেলে বিয়োলে নথ দেবে বলেছে। ব্যবসা থেকে সরানো টুকিটাকি— চুলের কাঁটা, রঙিন টিপ তাকে দিয়েছে রসিক। আর দিয়েছে সিঁদুর। তার নাকি অনেক দাম, বলে রসিক। রোজ সিঁথিতে দেওয়ার সময় লাল আঙুল দেখতে দেখতে দুলারী সিঁদুরের দাম আন্দাজ করে।

গাছতলায় ছায়া গাঢ় হয়ে এল, রসিক এখনো এলো না। পুরনো জায়গায় খুঁজছে নাকি?!গাছতলা থেকে বেরিয়ে তাদের ভাঙা সংসারের দিকে এগোয় দুলারী। খুব কাছে যেতে সাহস পায় না। আবার যদি খেদিয়ে দেয়! এদিক-ওদিক দেখে। কই! নেই তো! পিঠের উপর কার হাত পড়তে চমকে ওঠে দুলারী। লখন। রসিকের লাইনের ছোঁড়া। ইশারায় তাকে তার সঙ্গে যেতে বলে। কিছুটা দোলাচল নিয়ে তার পিছু নেয় দুলারী। বাস, ট্রাম, সদর রাস্তা কত পথ ভেঙে তাকে এক লাল বাড়ির সামনে হাজির করে লখন। রসিক তবে আগে থাকতেই নতুন বাসা খুঁজে নিয়েছে! কত বড়! পালঙ্কও আছে। তবে কেমন সাদা। বেওয়ার মতো। তার চোখ রসিককে খোঁজে। সেদিন অনেক রাতে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পায় সাদা চাদরে আপাদমস্তক মোড়া রসিক। লখন আর লাইনের আরও কিছু ছেলে একটা কাঠের খাট এনেছে। তাতে দড়ি দিয়ে বাঁধা মরুনে সাদা ফুল। রসিক সেই সাদাতে মিশে গেছে। দুলারী খাট ছুঁয়ে বসে থাকে। সে কাঁদেনি, কথাও বলে নি। সবাই শুধিয়েছে “কি করবে গো বউ?” সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছে শুধু। কাগজ ছাড়াতে পুঁটলির ভিতর থেকে ভাঁজ করা নোটগুলো দিয়ে দিয়েছে এক এক করে। এখন কেউ নেই। টেরাক আনতে গেছে। রসিককে নিয়ে যাবে। খাটটা ছুঁয়ে দেখে দুলারী। খাটের উপরে শোয়া রসিককেও। কি মনে করে খাটে রসিককে জড়িয়ে শুতে যায়। প্রথম বার! রসিকের সঙ্গে খাটে! জাগাতে চায় ঠাণ্ডা করে যাওয়া মরদকে। হাল ছেড়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে।

আপনার মতামত জানান