শেষ... বলে কিছু নেই

অলোকপর্ণা

ছবি- বিক্রমাদিত্য গুহ রায়




আর ছয়দিন বাদে আমি মারা যাবো।
আর ছয়দিন বাদে আমি মারা যাবো।
আর ছয়দিন বাদে আমি মারা যাবো।
আর ছয়দিন বাদে আমি মারা যাবো।



আর ছয়দিন বাদে আমি মারা যাবো!!!

ছয়দিন পর আমার বয়স হবে সাতাশ বছর আট মাস কুড়ি দিন। মাত্র সাতাশটা বছর, ঈশ্বর! মাত্র ছদিন! – মোড়ের মাথায় দাঁড়ানো আমার সামনে, তোবড়ানো একটা বাটি বাড়িয়ে দিল বুড়ি অন্ধ ভিখারিটা, “বাবা, ছদিন ধরে কিছু খেতে পাইনা বাবা, দুটো পয়সা দাও না বাবা!”
আমি জানি আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি তার ফাঁকা বাটির দিকে। সব ভিখিরিই বোধ হয় একটাই বাটি ব্যবহার করে, নাহলে তোবড়ানো বাটিগুলোর প্রতিটা ভাঁজ হুবহু একই রকম কি করে হয়, তা সত্যিই ভাববার বিষয়। মৃত্যুর ছয়দিন আগে এক মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে ভিখারির বাটি নিয়ে ভাবা ছাড়া আর কিছু আমার মাথায় আসছে না। সত্যিই ছয়দিন? মাত্র ছদিন!

ছদিন,
ছদিন,
ছদিন,
ছদিন,
ছদিন

আমি ছুটতে শুরু করি, মোড় পার হলে গমকল পার হলে বিজুর অ্যাকোয়ারিয়ামের দোকান পার হলে রামার চা পার হলে সুবল লন্ড্রি পার হলে ভবানী মেডিকাল, কিছুই চোখে পড়ল না আমার, আমি দৌড়চ্ছি, কেন দৌড়চ্ছি?
কিসের ভয়ে?
কোথায় দৌড়চ্ছি?
ভবানী মেডিকাল পার হয়ে শিবুদার চপ সেন্টার পার হয়ে মাসির ফুলের দোকানের সামনে এসে আমি দাঁড়িয়ে পড়ি। কারণ সাতাশ বছর আট মাস চোদ্দ দিনের জীবনে অনাবশ্যক কিছুই, আমি করিনি।
তাই অকারণ দৌড় থামিয়ে আমি দাঁড়িয়ে পড়ি মাসির ফুলের দোকানের সামনে। সেখানে বালতি ভর্তি লাল লাল গোলাপরা তখন আমার দিকেই তাকিয়ে আছে।
গোলাপ দেখেও আমায় ভয় করতে লাগল, কি তীব্র গন্ধ তাদের! যেন শেষবার শোঁকাবে বলে নিজেদের উজার করে গন্ধ ছড়াচ্ছে! উফ্‌! মন্দিরের ঘন্টা বেজে ওঠে। আমি ভাবতে থাকি, ভিতরে যাবো কি যাবো না... ভগবানের কাছে চাওয়ার মত আর কিছু বাকি আছে কি?




মৃত্যুর পাঁচরাত আগে আমার ঘুম এলোনা। সারা রাত আমি ছাত দেখে কাটিয়ে দিলাম। এখন চোখ বুজলেও বলে দিতে পারবো ছাদের ফাটলগুলোর নকশা ঠিক কি রকম।
সকালে বিছানায় শুয়ে মোবাইলের কন্ট্যাক্ট নাম্বারগুলো দেখতে শুরু করলাম।
অ- এ অজগর, ও খুবই কোল্ড। আমার এই পাঁচদিনের জীবনের কথা ওকে বললে “হুম” ছাড়া আর কিছুই বলবে না।
আ- এ আমটি, ল্যাংটো বয়সের বন্ধু, কাজেই খিল্লি করবে।
ই- তে ইঁদুরছানা, এই নাম্বারটা যে আমি কেন এতদিন ধরে পুষে রেখেছি! আজ প্রায় চার বছর হতে চলল।... না কি, পাঁচ?
ঈ- তে ঈগল, আই এস ডি করবার মত ব্যালেন্স আমার নেই, কাজেই... উ- তে উট,- আমার বাবা। কমলা খবরের কাগজ সরিয়ে একবার আমার কথা শুনবেন, তারপর আবার শেয়ারের বাজারে ডুবে যাবেন।
ঊ- এর নম্বরটা আমি পাঁচ মাস আগে ডিলিট করে দিয়েছি, চাইলে মনে করতে পারবো কিন্তু, চাইছি না।
ঋ- তে ঋষি, খুব সিরিয়াসলি নেবেন ব্যাপারটা, তেমন হলে পুলিশেও যোগাযোগ করতে পারেন আমার জন্য, পুলিশ ছুঁলে আটত্রিশ ঘা।
লিকার- শালা রোজ সকাল থেকে বোতল খুলে বসে, ভাট বকবে।
এ- তে এক্কা, ফ্রাস্টু মাল, মরার কথা বললে আরো ডিপ্রেসড হয়ে পড়বে।
ঐ- অনেক দূরে চলে গেছে এখন। খোলাখুলি বলেই উঠতে পারব না।
ও- তে ওল,- খুব ডেঞ্জারাস মানুষ। একে বিজয়া, নববর্ষ ছাড়া এস এম এস পাঠাই না, শুধুমাত্র নিজের দরকারে ফোন করাটা ভালো হবে না।
ঔ- তে ঔষধ।... ঔষধ?

আমি- “হ্যালো, আমি বলছিলাম...”
ঔষধ- “কি ব্যাপার?”
আমি- “আমি আর পাঁচ দিন বাদে মরতে চলেছি”
ঔষধ- “হা হা হা হা!! হঠাৎ! কি মনে করে?”
আমি- “জানি না”
ঔষধ- “পাঁচ দিন বাদেই কেন? আজই তো, বা গতকালও মরতে পারতে...”
আমি- “আমার হাতে আছে না কি ব্যাপারটা!”
ঔষধ- “তাহলে কার হাতে?”
আমি- “গতকাল বিল সার্কেলে একজন জ্যোতিষী বসেছিলেন, তাঁর...”
ঔষধ- “তুমি যে জ্যোতিষী মানতে না?”
আমি- “আমি মানি না”
ঔষধ- “তাহলে? ওনার কথা মানছ কেন?”
আমি- “উনি বলেননি”
ঔষধ- “তাহলে?”
আমি- “ওনার টিয়া...”
ঔষধ- “হা হা হা হা হা হা হা হা হা!”
আমি- “হেসো না”
ঔষধ- “আজকাল তুমি পশু পাখির কথাও মানছ!”
আমি- “ইটস ডেস্টিনি ঔষধ”
ঔষধ- “তোমার ডেস্টিনি টিয়া পাখির ঠোঁটে ঝুলছে বলতে চাইছ?”
আমি- “আমি জানিনা”
ঔষধ- “কিভাবে মরছ তুমি?”
আমি- “তা বলেনি”
ঔষধ- “ইউ ক্যান চ্যালেঞ্জ দা বার্ড”
আমি- “কি? কেন?”
ঔষধ- “মানে তোমার নিয়তি যে টিয়ার ঠোঁটে নেই তা তুমি প্রমান করতে পারো আজ বা কাল, মানে পাঁচ দিনের মধ্যেই আত্মহত্যা করে।”
“আমি বাঁচতে চাই ঔষধ! আমি মরতে চাই না!” ফোনের মধ্যে চেঁচিয়ে উঠি আমি।
“বলতে হয় তাই বললাম, ভেবে দেখো কি করতে চাও”, নির্লিপ্ত ভাবে বলে ঔষধ ফোন কেটে দেয়।

আত্মহত্যা! ঔষধের উপদেশ খুবই অবাস্তব ও আউট অফ দা বাউন্ডারি বলে মনে হয় আমার,

ক- এ কাকাতুয়া, স্বার্থপরের ডিম।



যেহেতু সময়টা পাঁচ দিন, পাঁচ বছর নয়, সকাল দশটার মধ্যে প্ল্যান বানিয়ে ফেললাম আমি,
• মাসির বাড়ি থেকে শেষের কবিতা ফেরত আনা
• পাগলুদের শিক কাবাব খাওয়ানো
• বিরেনদার কাছে ক্ষমা চাওয়া
• লিকার- এর সাথে কথা বলা
• জায়াকে ১০০ টাকা ফেরত দেওয়া
মোটামুটি সন্তুষ্ট হয়ে আমি বেলা বারোটায় সাইকেল নিয়ে মাসির বাড়ি এলাম। মেসোকে বলতেই শেষের কবিতা ফেরত পেলাম আর মাসির হাতের চা। এবার আমি সত্যিই মরতে পারি। শেষের কবিতা হাতে মেসোর দিকে তাকিয়ে হাসলাম। মেসোও হাসলেন,- না আমার চোখের ভুল বুঝতে পারলাম না। সাইকেলে বাড়ি এলাম। বিছানায় শুয়ে শেষের কবিতা মুখের সামনে তুলে ধরলাম। প্রথম পাতা উল্টাতে রবীন্দ্রনাথের সাদাকালো ছবির কপালে, নীল ডট পেন দিয়ে আঁকা টিপের নকশা ঝলমল করে উঠল,- শালা মেসোর বাচ্চা, মা******!

মনে পড়ল, ইঁদুরছানাকে একই বই গিফট করেছিলাম আমি। সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ঠিক ইঁদুরছানার বাড়ির সামনে এসে পৌঁছোতেই খেয়াল হল যে সে আর এখানে থাকেনা। তবু ঢুকে এলাম ভিতরে, ইঁদুরছানার বাবা বসে আছেন টিভির সামনে, সেখানে ডব্ল্যু ডব্ল্যু ই চলছে।

“আরে, কখন এলে?!”
“এইমাত্র কাকু”
“বোসো বোসো”
সোফায় বসি, টিভিতে তখন আন্ডারটেকারকে চেয়ার দিয়ে উত্তাল পিটাচ্ছে বুকার টি, রিঙে রক্ত টক্ত ছড়িয়ে একাকার। কাকু আমার দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হেসে বললেন, “কি, মজা লাগছে না?!”
আমি অস্বস্তিসহ স্লো মোশানে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাই, কাকু সন্তুষ্ট হয়ে টিভিতে মন দেন। বুকার আন্ডারটেকারকে রিং থেকে বাইরে ফেলে দিল এক ধাক্কায়, নিজের চেষ্টায় আন্ডারটেকার উঠে দাঁড়াচ্ছে আস্তে আস্তে,
“কাকু, শেষের কবিতাটা কোথায় আছে বলতে পারবেন?”
টিভি থেকে চোখ না সরিয়েই কাকু বলেন, “মিনির ঘরের দেরাজে”
আমি নিঃশব্দে উঠে ইঁদুরছানার ঘরে আসি।

জীবনের কিছু কিছু অনুভূতিকে মানুষ গন্ধ দিয়ে চিহ্নিত করে। মিনির ঘরের গন্ধটা আমাকে হুড়মুড় করে চার পাঁচ বছর আগেকার আবেগগুলো এনে দিল। দেরাজের পাল্লা খুললাম,- শেষের কবিতা।
প্রথম পাতা উল্টাতেই রবীন্দ্রনাথ,- সুস্থ আছেন। নাকের সামনে এনে বইটার গন্ধ শুঁকলাম, মিনির গন্ধ লেগে আছে বইয়ে, অথবা,- আমার মনের ভুল।
বাইরের ঘরে এসে দেখি কাকু চেয়ারে বসে কাঁদছেন, টিভিতে বুকার টি মার খাচ্ছে এখন।
“কাকু, আমি আসি”
“বই পেলে?”
“হ্যাঁ”
“কি করবে ও দিয়ে, আবার প্রেম করছ নাকি?”
“না কাকু”
“তবে শেষের কবিতা চু*** কি করবে?”
“আমি পাঁচ দিন বাদে মারা যাচ্ছি”
“অ, বাকেট লিস্টে এটাকে রেখেছ। কিন্তু কেন রেখেছ? কি আছে এই বইয়ে যে তাকে লিস্টে রাখতে হবে? কি এমন লিখে গেছে রবীন্দ্রনাথ?”
“প্রেমের কথা, জীবনের কথা, লাভ ইস আলটিমেট কাকু, এছাড়া লাইফে জেনুইন আর কিচ্ছু নেই”
“কেন? ডব্ল্যু ডব্ল্যু ই আছে, ডিমের পোচ আছে, সাইকেলের টায়ার আছে, খামোখা শুধু প্রেমই কেন আল্টিমেট হবে, বল-”
মুহূর্তে চুপসে যাই আমি, যুক্তি খুঁজে পাইনা কোনো।
“আমি,” কাকু বলে ওঠেন টিভিতে চোখ রেখে।
“হ্যাঁ কাকু”
“আমি, লাইফটা চাঁদের আলোর মত সরল, তাকে পেলব চোখে দেখ”
টিভিতে বুকার আন্ডারটেকারকে মাথায় তুলে রিঙের উপর আছড়ে ফেলল প্রচন্ড জোরে, কাকু উল্লাসে হাততালি দিয়ে উঠলেন। আমি বেরিয়ে এলাম ইঁদুরছানার বাড়ি থেকে,
সাইকেলের তালা খুলছি, ঠিক তখনই কালকের বুড়ি অন্ধ ভিখারিটা তোবড়ানো বাটি বাড়িয়ে দিল মুখের সামনে, “বাবা, পাঁচদিন ধরে কিছু খেতে পাইনা বাবা, দুটো পয়সা দাও না বাবা!”


তার বাটিতে শেষের কবিতা রেখে আমি প্যাডেলে চাপ দিলাম,
“ভগবান তোমার মঙ্গল করুন বাবা”,
পিছনে ইঁদুরছানার বাড়ি থেকে তখনও হাততালির আওয়াজ আসছে।




শিবুদার দোকান থেকে এক ঠোঙা শিক কাবাব নিয়ে আমি পাড়ায় ঢুকলাম। আমায় দেখে দূর থেকে পাগলু, লক্ষ্মী আর কাজল ছুটে এল। বিল সার্কেলে সাইকেল দাঁড় করিয়ে এক একটা মাংসের টুকরো ছুঁড়ে দিলাম পাগলুর দিকে, লক্ষ্মীর দিকে, কাজলের দিকে। ওরা পরীক্ষা দেওয়ার মত মনোযোগে খেতে শুরু করেছে। বিল সার্কেল গরম শিক কাবাবের গন্ধে ছেয়ে গেল। ওহ, শিবুদা বানায়ও! চোখ বুজে শিক কাবাবের গন্ধ শুঁকতে থাকলাম আমি। পাগল পাগল গন্ধটা! হঠাৎই কাজল, লক্ষ্মী, পাগলুকে সরিয়ে রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা মাংসের টুকরো তুলে তুলে খেতে শুরু করলাম।
পাগলু আমার দিকে দুঃখী চোখে তাকিয়ে আছে, কিচ্ছু বলছে না। আধা খাওয়া মাংস মুখে আমি ওকে বললাম, “আর পাঁচদিন পাগলু, তারপর আমি মরে যাবো। আর পাঁচদিন।” পাগলু রাস্তার কোণায় চলে গিয়ে গোল্লা পাকিয়ে শুয়ে পড়ল। আমি, লক্ষ্মী আর কাজল তিনজনে মিলে মাংস খেতে থাকলাম।


পার্টি অফিস ভরে আছে ধুপকাঠির গন্ধে। বিরেনদা তার মধ্যে সন্ন্যাসীর মত বসে আছেন। আমি ঢোকা মাত্র যেন তাঁর ধ্যানভঙ্গ হল।
“আপনি কিছু বলার আগেই আমি কথাটা বলতে চাই, আর পাঁচদিন পর আমি মরবো। কিভাবে জানিনা, কিন্তু মরছি আমি। তাই আপনার কাছে এলাম,”
বিরেনদা কিছু বললেন না। সরাসরি আমার চোখে চোখ রেখে নিশ্চুপ থাকলেন। আমার অস্বস্তি হতে লাগল। বলে ওঠার চেষ্টা করলাম, “সরি বিরেনদা, আমি খুবই দুঃখিত”, পারলাম না।
বিরেনদার বউ ঊ-এর সাথে শুয়েছিলাম আমি। প্রেম টেম করতাম না, শুধু শুতাম।
পার্টি অফিসের দোতলাতেই তাঁরা থাকেন। বিরেনদা তখন ভোটের প্রচারে ব্যস্ত, সারাদিন রাস্তায় রাস্তায়। একদিন শরীর খারাপ লাগায় দুম করে দুপুরবেলা বাড়ি ফিরে এসেছিলেন, আমি তখন ঊ- এর ভিতরে খুব ঢুকছি। বিরেনদাকে দেখেও আমরা থামতে পারিনি। টানা ত্রিশ সেকেন্ড তিনি এমনই নিশ্চুপ তাকিয়ে ছিলেন আমাদের দিকে, আর আমরা সশব্দে তাঁর দিকে।

বিরেনদার সেই চোখ মনে পড়ে প্রচন্ড অসহায় লাগল নিজেকে, আমি খুব চাইলাম বিরেনদা কিছু বলুন...
“যা, তোকে ক্ষমা করে দিলাম”
“কিন্তু আমি তো ক্ষমা চাইনি এখনও!”
“তাতে কি, তোকে আমি ক্ষমা করে দিলাম”
“আমি না চাইতে আপনি আমায় ক্ষমা করতে পারেননা।”
“কে বলেছে পারি না?”
“হবে না বিরেনদা, আমি ক্ষমা চাইনি এখনো!”
“আমি তো অলরেডি করে দিয়েছি”
গলা আটকে এল আমার, দম বন্ধ হয়ে এল, “আই হেট ইউ বিরেনদা!”
সন্ন্যাসীর চেয়ারে বসে স্মিত হেসে উঠলেন তিনি।
পাক্কা শয়তানের মত হাসতে থাকা কুটিল বিরেনদাকে পার্টি অফিসে রেখে আমি বেরিয়ে এলাম।
গলির অন্ধকারে রাখা সাইকেলের তালা খোলার সময় আমার পাশে যেন কে এসে দাঁড়াল। অন্ধকারেও বুঝলাম দোতলা থেকে নেমে এসেছে বিরেনদার বউ,- ঊ।

শাড়ির আঁচল সরিয়ে সে আমার ডান হাতটা খপ করে ধরে তার বুক ছুঁইয়ে দিল, বুঝলাম ব্লাউজ পড়েনি।- জেগে আছে। কিন্তু বিরেনদার চোখ আমায় জাগতে দিলনা।
দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে আমি সাইকেলে উঠে পালাতে লাগলাম। গলি থেকে বেরতেই রাস্তায় শুয়ে জ্যোৎস্না,- মিনির বাবা বলছিলেন, জীবনটা চাঁদের আলোর মত সরল। সাইকেল চালাতে চালাতে আকাশের দিকে তাকাই, আকাশ আলো করে ঝুলে আছে ঊ-এর বুক। সেই বুকের আলোর মধ্য দিয়ে আমি পালাতে থাকি।






লিকারের লেখার টেবিলে জানালা দিয়ে রোদ উপচে পড়ছে, তাতে চকচক করছে হুইস্কির গ্লাস আর হুইস্কিতে ভাসতে থাকা বরফ।

“মুষড়ে পড়লি কেন?”
“তুমি ভাবতে পারছ, মাত্র সাতাশ বছর!”
“সা- তা- শ ব- ছ- র!”
“খিল্লি দিও না, চারদিন পর আমায় যদি কেউ জিজ্ঞেস করে বেঁচে যে থাকলাম, তার নিট ফলটা কি, কি বলব আমি তখন?!”
“বলবি,- **ল!”
“তুমি আবার খিল্লি করছ!”
“তুই চাসটা কি? লাইফের থেকে তুই কিছু দাবী করিস!? লাইফ কি তোর বাপ? মগের মুলুক যা চাইবি মাল পকেট থেকে বের করে দিয়ে দেবে!?”
“আমি চাইনা কিছু”
“কই, এই তো বললি ফল চাস, বাঁচতে পারার ফল”
“যাব্বাবা, সাতাশটা বছর কাটালাম, রিটার্ন কিছু পাবো না!”
“হাহা দেখলি তো, সা- তা- শটা বছর যে আসলে যথেষ্ট সময়, তা তুইও মানিস”
আমি চুপ করে থাকি খানিকক্ষণ, “তাহলে বলছ লাইফ থেকে কিছুই রিটার্ন পাওয়া যাবে না...”
“দ্যাখ, জীবন তোকে শুধু জীবনই দিতে পারে, অনেক জীবন, আরো আরো বেশি করে জীবন, একঘেয়ে, থোড় বড়ি খারা জীবন, মৃত্যুর সাথে তার কোনো টাই আপ নেই।”
“তাহলে এন্ড অফ দা টানেল কি পেলাম? আলো নয়, বরং আলোরই আরো একটা টানেল?!”
“ধুর **রা, আলো ফালো কিসস্যু নেই! টানেলই নেই, তো আলো;”
“তাহলে আমরা এটা কি কাটাচ্ছি? কি করছি আমরা এখানে?”
“এখানে গল্প লেখা হচ্ছে, বুঝলি, আমরা প্রত্যেকে হচ্ছি এক একটা গল্প”
“লিখে লাভটা কি হচ্ছে?”
“লাভ একটাই, কেউ একদিন এই গল্পগুলো পড়তে পারবে, পড়ে নেবে। আচ্ছা বল তো লোকে গল্প পড়ে কেন,”
“আনন্দ পাবে বলে”
“এক্স্যাক্টলি, দুঃখের গল্প পড়েও কি মানুষ আনন্দ পায়?”
“পায়, যদি নিজের গল্পের সাথে তার মিল থাকে”
“সাব্বাশ! এইতো! শিখছিস তা’লে, এই বার তুই বলতে পারিস তোর জীবন সার্থক”, লিকার খ্যাক খ্যাক করে হেসে ওঠে।
“বাওয়াল দিও না তো!”
লিকারের হাসি থামলে আমি আবার বলি, “লাইফ তো বুঝলাম, মৃত্যুটা কি জিনিস”
“মৃত্যু এমন কিছু নয়, মৃত্যু হল একটা নিস্তব্ধতা”
“মানে?”
“লাইফ কি? লাইফ হল আওয়াজ, শব্দ। এই যে দ্যাখ, তুই গ্লাসটা টেবিল থেকে তুলে নিলি, এটা একটা ইভেন্ট, আমি ইভেন্টটাকে দেখলাম, দেখে ইন্টারপ্রেট করে নিলাম শব্দে, মানে শব্দ না থাকলে আমি নিজেকে বোঝাতে পারতাম না অ্যাকচ্যুয়ালি কি হল, শব্দ না থাকলে নিজের সাথে নিজে কথাও বলতে পারতাম না”
“কথা বলে লাভ কি?”
“গা**, কথা না বললে গল্প লিখবেটা কে, তুই যখন ঘুমাস, তোর মন তখন লুকিয়ে লুকিয়ে তোর গল্প লেখে”
“তুমি স্বপ্নের কথা বলছ?”
“নাহ্‌, স্বপ্ন হল বাতিল করা গল্প, যেগুলোকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে তোর লাইফ, তোর ঘুমের মেঝেতে”
“হুম্‌... আচ্ছা, যদি এরকম হয়, তোমার মন তোমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিল? ওয়ান্স ইন এ ফাইন মর্নিং গল্পটা লেখাই যদি বন্ধ হয়ে যায়?”
“সেটাই তো মৃত্যু”, গম্ভীর হেসে লিকার এমন অনায়াসে কথাটা বলল যে আমার সারা গায়ে কাটা লেগে গেল। তার মানে এই যে নিজের সাথে নিজে কথা বলছি, তা আর মাত্র চার দিন!


লিকার বলে ওঠে, “চার কেন, দুদিন বাদেও যদি কেউ বলে মরব, আমি খুশিই হবো”
“কেন?”- লিকারকে জিজ্ঞেস করি।
“বেঁচে থেকে হবেটা কি আগে বল”
“মানে!”
“দ্যাখ, স্ট্রেট কথা, আরো পঞ্চাশ বছর বাঁচলে তুই বাবা হবি, রিটায়ার করবি, বউয়ের মনোপজ হয়ে যাবে এর মধ্যেই, টিভিতে ডব্ল্যু ডব্ল্যু ই ছাড়া এক্সাইটিং কিছু আর খুঁজে পাবি না, তার চেয়ে এটা বেটার না, যে, কত মিস্ট্রি থেকে গেল লাইফে, অর্ধেক জিনিস জানাই হল না! এমনটা না হলে তোর আবার ফিরে আসতে ইচ্ছে করবে!”
“ফিরে আসতে মানে?”
“আরে রিবার্থ! পুনর্জন্ম”
“ধুস, কি যে বলো”
“তোর মনে হয় না, হয়ত বা হাঁস হবো, কিশোরীর ঘুঙুর রহিবে লাল পায়?”
“না, আমি হাঁস হতে চাইনা”
“দূর সালা, তাহলে তোর আজই মরা উচিত! কোথায় হাঁস হয়ে জন্মে পালকের মত ভাসবি, এক ফোঁটা জলও লাগবে না! বুঝতে পারছিস কি বলতে চাইছি... আরে পরমহংস কনসেপ্ট, ধর এই যে তুই ঊ- কে ***লি, বিরেনদা পার্টি লেলিয়ে দিল তোর **দে, তুই হাঁস হলে এসব কেস হতই না, সিমপ্লি **দে বেরিয়ে যেতি।- মাখন!”
“তোমার মনে হয় ঊ হাঁসের সাথে শোবে?”
“হাঁস কেন, ঊ নিজের সাথেও শুতে পারে”, ঢক ঢক করে গ্লাস খালি করে ফেলল লিকার।

“হাঁস হতে গেলে কিভাবে মরব?”
“কি করে জানবো, মরার কথা তোর, কিভাবে মরবি তোর হেডেক, যা ফ্রিজ থেকে বরফ নিয়ে আয়।”




খটখটাখট খটখটাখট
খটখটাখট খটখটাখট
খটখটাখট খটখটাখট
খটখটাখট খটখটাখট
খটখটাখট

কম্পিউটারের সামনে বসে জায়া পাত্তা দিচ্ছেনা আমায়। খটখটাখট আওয়াজ করে কাজ করছে গত আধ ঘন্টা ধরে। সেই খটখটাখট আওয়াজে নেশা হচ্ছে আমার। ঘোর লেগে যাচ্ছে। টেবিলে রাখা পেপার ওয়েটে চোখ রেখে আরামে চোখ বুজে আসছে।
“হ্যাঁ বলো”
জায়ার কথায় চমকে উঠে বলি,- “তিন দিন”
“তিনদিন?”
“ইয়ে, আমি তিনদিন বাদে মারা যাবো”
“তোমার ইবোলা হয়েছে?”
“না”
“তাহলে?”
“জ্যোতিষী দেখিয়েছিলাম, তিনি বলেছেন, মানে তাঁর টিয়া বলেছে”
“আচ্ছা”, খটখটাখট...
জায়া আবার কম্পিউটারে ডুবে যায়।

আমি চুপচাপ জায়ার কম্পিউটার টেবিলের এক কোণায় একটা হাজার টাকার নোট রাখি। যদিও একশ টাকাই ওর থেকে শেষবার ধার নিয়েছিলাম। চেয়ার থেকে উঠে আসতে আসতেও একটু দাঁড়িয়ে পড়ে নিজের মনেই বলে উঠি, “ধন্যবাদ, তোমার গল্পটা আমায় পড়ানোর জন্য”
কম্পিউটারের সামনে ব্যস্ত আমার প্রাক্তন বউ জায়াকে শেষবারের মত দেখে আমি বেরিয়ে আসি। রাস্তায় নামতে টের পাই বেঁচে থাকার ইচ্ছে বা মরতে চাওয়ার নেশা, কোনোটাই আমার মধ্যে আর বেঁচে নেই। নিজেকে জিজ্ঞেস করি, কি ভালোবাসিস তুই? বাঁচতে? না কি একদম মরে যেতে? যে গল্প লিখছিল এতক্ষণ ধরে, তার থেকে কোনো জবাব আসেনা।

-“বাবা, তিনদিন ধরে কিছু খেতে পাইনা বাবা, দুটো পয়সা দাও না বাবা!”
চেনা গলা শুনে সাইকেলের তালা খুলতে গিয়ে তাকিয়ে দেখি, ভবানী মেডিকালের সামনে দিয়ে বুড়ি অন্ধ ভিখারিটা তার তোবড়ানো বাটি হাতে এগিয়ে আসছে, তালা খুলে সাইকেল হাঁটিয়ে নিয়ে আমি তার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। সে আন্দাজে মুখ তুলে, তার অন্ধ চোখ দিয়ে আমার চোখের অন্ধকারে তাকায়। আমি বলি, “একটা গল্প শুনবে?”

গলির একমাত্র লাইটপোস্টের
সন্ধ্যেবেলার লাইটবাল্বের মত,
তার দাঁতহীন মুখে,- হাসি ফুটে ওঠে।

আপনার মতামত জানান