প্রতিবেশী

ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়


ছবি- বিক্রমাদিত্য গুহ রায়

৫ই নভেম্বর, ২০১৩, সকাল আটটা
মুকুন্দপুরের একটি ফ্ল্যাটবাড়ির গ্রাউন্ড ফ্লোরের ফ্ল্যাটটির সামনে জড়ো হয়েছেন পাড়ার কয়েকজন মানুষ। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। ডেকে সাড়া মিলছে না। একটা পচা গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল গতকাল বিকেল থেকে। আজ সকালে তা তীব্রতর। পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে।
- মাসিমাকে কিন্তু বেশ কয়েকদিন দেখিনি, আপনি দেখেছেন?
- কি জানি, ঠিক খেয়াল করিনি। আসলে এত ঝামেলা চলছে আজকাল...
বয়স্ক মানুষটি একাই থাকতেন। খুব একটা মিশতেন না কারও সঙ্গে। শরীর ও ভাল ছিল না। ঠিকে ঝি একটা আসতো দুবেলা। জানা গেল সেও দিনকয়েক হল দেশে গেছে।
ঘণ্টা-দুয়েক পর পুলিশ দরজা ভেঙ্গে বের করে বৃদ্ধার মৃতদেহ। পচন শুরু হয়েছে অনেক আগেই। প্রাথমিক ভাবে পুলিশের অনুমান দিন তিনেক আগে মৃত্যু হয়েছিল তাঁর।
- ওঃ মাগো! কি ভয়ঙ্কর!
- কতই না কষ্ট পেয়েছেন! একটু ডাকতেও তো পারতেন আমাদের কাউকে?
- ফোন ছিল না? মোবাইল?
আশেপাশে পায়রার খোপের মধ্যে ঠাসাঠাসি অগুন্তি মানুষ। তার মধ্যেই অসুস্থ, বিপন্ন মানুষটি সবার অগোচরে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন!

(২)

৫ই নভেম্বর, ২০১৩, সকাল দশটা
দক্ষিণ কলকাতার একটি হাউসিং কমপ্লেক্সের আটতলার ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হল এক মধ্যবয়সী ব্যাক্তির ঝুলন্ত দেহ। ফ্ল্যাটে একাই ছিলেন ভদ্রলোক। তাঁর স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে বাপের বাড়ি ছুটি কাটাতে গেছেন দিন কয়েকের জন্য। সকালে ভেজানো দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে হাউমাউ করে চেঁচিয়ে ওঠে কাজের মেয়েটি।
পুলিশ বডি নিয়ে যাওয়ার পর এখানে ওখানে ছোটখাটো জটলা।
- এই তো গত পরশুই মলির এনগেজমেনট পার্টিতে হেসে হেসে কত গল্প করে গেলেন। কে জানে ওনার মনে এই ছিল!
- শুনেছি অনেক ধারদেনা ছিল। ব্যাবসার হাল তেমন ভাল ছিল না।
- এই সেদিনও তো বাজারে দেখা হল। মেয়ের লেখাপড়া নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।
- স্ত্রীর সঙ্গেও কিসব ঝামেলা–টামেলা ছিল বলে শুনেছি।
- সত্যিই, মানুষের বাইরেটা দেখে ভিতরটা......
- কিন্তু তেমন সমস্যায় পড়লে আমাদের তো বলতে পারতেন!
শেষ কথাটা উচ্চারণের সময় গলাটা কেঁপে যায়, কেমন দুর্বল শোনায়। যথেষ্ট আত্মসমর্থন না পেলে যেমন হয়। পাশের মানুষগুলির মুখের ওপর ছায়া আরও গভীর হয়ে নামে ক্রমশঃ। আত্মসর্বস্ব বিচ্ছিন্ন মানুষগুলি পরস্পরের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়, কে জানে কার মনে ঘাপটি মেরে আছে মৃত্যুর ইশারা...

(৩)

৫ই নভেম্বর, ২০১৩, বেলা বারোটা
খিদিরপুরের শান্ত মহল্লাটিতে হঠাৎই একটা শোরগোল। বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিৎকার করছে রবিউল, সালেহা বিবির ভাই।
- আপনারা তো সব জানতেন। কেন কোনদিন বলেননি কিছু? কেমন মানুষ আপনারা?
দু’বছর হল বউ হয়ে এ পাড়ায় এসেছে সালেহা বিবি। বিয়ের পর থেকেই মারধোর, অপমান, অত্যাচার নিত্যসঙ্গী। পরবের দিনে মসজিদে এলে বোরখার ফাঁক দিয়ে তার করুণ চোখদুটি দেখা যেত। সেই চোখে যে এক সমুদ্র কান্না ছিল আর সারা শরীরে ছিল অজস্র কালশিটের দাগ, তা চোখে দেখা না গেলেও আন্দাজ করতে পারতেন কেউ কেউ। এই দু’বছরে অনেক কিছুই তাঁদের কানে এসেছে। তবু কে আর অন্যের সংসারে নাক গলাতে যায়!
তিনদিন আগে মেয়েটির গায়ে গরম ফ্যান ঢেলে দিয়েছে তার শাশুড়ি। পোড়া চামড়া উঠে এসে দগদগে ঘা শরীরে। কোনও চিকিৎসাও হয় নি। মৃতপ্রায় মেয়েটি ঝিমিয়ে পড়ে রয়েছে একটি অন্ধকার ঘরে খাটের নীচে। আজ সালেহার ভাই হঠাৎই এসেছে দিদির খোঁজ নিতে, যেমন মাঝে মাঝে আসে। দিদিকে এই অবস্থায় দেখে মাথা খারাপ হয়ে যায় রবিউলের। খানিক চেঁচামেচি করে উদভ্রান্তের মত চলে যায় কোথায়। হয়ত বা থানায়, কিম্বা হাসপাতালে।
জানতে চায় নি কেউ। তার সঙ্গে থাকার প্রয়োজন আছে কি না জানতে চায়নি। জটলা করেছে একটু দূরে, যে যার বাড়ির সামনে। কি দরকার ঝামেলায় যাওয়ার! এরপর পুলিশ এলে সে আর এক হ্যাঙ্গাম। কে না জানে, পুলিশে ছুঁলে......তাই সবার চোখের সামনে দিয়েই বিনা বাধায় পালিয়ে গেল মেয়েটির শ্বশুর, শাশুড়ি ও স্বামী।
(৪)
৫ই নভেম্বর, ২০১৩, অপরাহ্ন ২.৩৮
শ্রীহরিকোটা থেকে সফল উৎক্ষেপণ হল মঙ্গলযান-এর। ইসরোর মুকুটে আর একটি উজ্জ্বল পালক। অভিনন্দনের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে দেশ। এগারো মাস ধরে কোটি কোটি কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে এই যান মঙ্গলে পৌঁছবে, করবে প্রাণের সন্ধান।
মঙ্গলের পরিবেশ প্রাণের অনুকুল। মঙ্গলযান ছুটে চলেছে, গ্রহান্তরে মানুষের নিকটতম প্রতিবেশীর খোঁজে......

আপনার মতামত জানান