বিদায়ের সানাই......

সীমা বন্দ্যোপাধ্যায় রায়


অঘ্রাণের গোধূলি, বাতাসে তখনও হাল্কা শীতের আমেজ। গাছের সবুজ পাতায় দেখা দিয়েছে হরিদ্রাভের রেখা। শরতের নীলাভ আকাশ কখন যে হেমন্তের সজ্জায় সাজিয়ে তুলেছে নিজেকে, কে জানে। শেফালী, জুঁই, চাঁপা মল্লিকা ফুলেরা তখন বিদায়ের লগ্ন গুনছে। বাজি-বাজনায় শুভাগমন জানিয়ে বর এল। পাপিয়া দেবী বরণ ডালা সাজিয়ে বরণ করে নিয়ে এলেন বরকে। বেজে উঠল শঙ্খধ্ব্নি, শুরু হল বিয়ের মাংগলিক অনুষ্ঠান।
তিনদিন ধরে নহবত চলছে বাড়ির সদর দরজায়। আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু বান্ধবে ভরে উঠেছে সুদেব বাবুর লেক গার্ডেন্সের বাড়ি। আজ তাঁর একমাত্র পুত্র ত্রিদেবের একমাত্র কন্যা বিদিশার বিয়ে। ঠিক চারবছর আগে ত্রিদেবকে হারিয়ে দারুণ শোকে ভেঙ্গে পরেছিলেন সুদেব বাবু। একমাত্র পুত্রের কাল মৃত্যুতে এ বাড়িতে নেমে এসেছিল শোকের বন্যা। আজ উৎসবের মুখরতায় আর আলোয় সেজে উঠেছে চারিদিক। সদর দরজায় জ্বলে উঠেছে মঙ্গলপ্রদীপ, তুলসী মঞ্চে পড়েছে নতুন আলপনা। সুদেব বাবুর ব্যস্ততার অন্ত নেই, আজ সারাদিনই হাঁক-ডাক চলছে তাঁর। দাস-দাসী, চাকর-বাকর সবাই ব্যস্ত। লোকের ভিড়ে ভরে উঠেছে তাঁর বিশাল বাড়ির প্রতিটি কক্ষ।
ঘরের এককোণে বসে বিদিশা, গলায় কুন্দনের হার, হীরের গয়নায় ঝলমল করছে তার দেহ। পরনে লাল বেনারসী, মাথায় লাল ওড়না, কপালে চন্দন। স্বচ্ছ লাল ওড়নার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ওর অনিন্দ্য সুন্দর মুখখানি। কাজল কালো চোখের সবটাই জুড়ে রয়েছে এক বিষণ্ণতার ছায়া।
শেষ হল বর-বধূর মালা বদলের পালা। বর কনেকে ঘিরে জমে উঠলো বাসর ঘরে জমজমাট আড্ডা আর গান-বাজনা, সবার মাঝে নিরব রইল বিদিশা। কেমন যেন উদাসীন! রাত্রি তখন দুটো বাজে বর-বধূকে ঘুমাতে দিয়ে এক এক করে বাসর ঘর ছেড়ে চলে গেল সবাই। রইল শুধু বিদিশা আর অর্চিত।
চারিদিক নিস্তব্ধ, নিঝুম। রাতের আকাশে তারারা তখন প্রহর গণনায় ব্যস্ত। সামনের কালো স্যুইমিং পুলের জলের প্রতিবিম্বিত পূর্ণিমার চাঁদ, খাটের উপর বসা বিদিশা, মাথার ওপর এখনও সেই লাল ওড়না; রূপালী জ্যোৎস্নার আলো বিদিশার মুখে এসে পড়েছে। পাশে পড়ে আছে একখানা লাল গোলাপের পাপড়ির চাদর। ঘরের ডিম করা আলোয় বিদিশার মুখের দিকে তাকিয়ে অর্চিতের মনে হল একটা কবিতার কটা লাইন-
'চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের পর
হাল ভেঙ্গে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে;-
কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল অর্চিত বিদিশার মুখের দিকে। মনে হল কি অপূর্ব সুন্দর সৃষ্টি বিধাতার!
গুনগুন করে গেয়ে উঠল ওর ঘুমন্ত শরীরের দিকে চেয়েঃ
“চন্দন সা বদন চঞ্চল চিতবান...
ধীরে সে তেরা ইয়ে মুস্কানা
মুঝে দোষ না দেনা জগবালেন...”
তারপর গিয়ে দাঁড়াল জানালায়। হাতে তার একটা জ্বলন্ত সিগারেট।
-মনের মধ্যে কেমন যেন উত্তাল ঝড় বইতে লাগল। রক্তের ধমনিতে উঠল এক অজানা স্রোতের ঢেউ। হৃৎযন্ত্র চলতে লাগল আরও দ্রুত তালে। সমস্ত মনের মধ্যে জুড়ে এক অচেনা গোপন আনন্দ- উত্তেজনায় অস্থির হয়ে উঠলো অর্চিত। মনে হল, ওর সমস্ত জীবনের এ এক প্রতিক্ষিত লগ্ন। এ লগ্নের জন্য ও অপেক্ষা করেছিল সারাটা জীবন-জন্ম-জন্মান্তর ধরে।
এ তার সমস্ত চাওয়ার পরম মুহূর্ত। নিজের মুখটা এগিয়ে নিয়ে গেল বিদিশার আরও আরও কাছে।- থমকে গেল অর্চিত, হৃদয়-তন্ত্রীতে বেজে উঠল বেসুরো সুর। সরে এল, সমস্ত চেতনা দিয়ে খুঁজে পেতে চাইল নিজের অস্তিত্বকে- কেমন যেন ক্লান্ত, অবসন্ন বোধ করল।
হঠাত নিজের বৌ্দির ডাকে ঘুম ভাঙলো অর্চিতের; উঠে বসল বিছানায়। পাশে বিদিশা ঘুমিয়ে আছে, ওর সারা মুখে ছড়িয়ে আছে এক প্রগাঢ় প্রশান্তি। পূব আকাশে তখন সিঁদুরে আলোর আভা। ভোরের পাখিরা নতুন দিনের শুরু ঘোষণা করছে চারিদিকে।
দরজা খুলতেই বৌ্দি ঘরে ঢুকলো...... সিঁদুর পরাতে হবে কনেকে। অর্চিত বিদিশাকে ডাকল একবার, দুবার, তিনবার, তারপর গায়ে হাত দিতেই চমকে উঠল অর্চিত- “বি দি শা-।”
সুদেব বাবুর প্রাসাদ তূল্য বাড়ির ইঁট-কাঠ-পাথরে প্রতিধ্ব্নিত হতে লাগল অর্চিতের আর্তনাদ। ডুকরে কেঁদে উঠলেন পাপিয়া দেবী। মেয়ে হারানোর ব্যথায়। বাসর ঘরে ঢুকে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন সুদেববাবু। কান্নার রোল ভেসে বেড়াতে লাগল সারা বাড়ি জুড়ে। থেমে গেল নহবতের সুর মূর্ছনা।
তড়িৎবেগে বৌ্দির হাত থেকে সিঁদুরের কৌ্টোটা চেয়ে নিল অর্চিত। নিজের হাতের আংটি খুলে তাতে সিঁদুর লাগিয়ে বিদিশার সীমান্ত জুড়ে সাজিয়ে দিল সীমন্তিনীর চিহ্নে। নববধূর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট দুটো দিয়ে শেষ বারের মত এঁকে দিল ভালবাসার শেষ স্বাক্ষর।
দূ-উ-রে একটা কাক 'কা -কা' করে ডেকে উঠল। কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন বৌ্দি, হাতের মধ্যে খালি ঘুমের ওষুধের খালি শিশিটা নিয়ে। হঠাৎ মুখ তুলতেই অর্চিত দেখতে পেল বিদিশার হাতের কাছে ভাঁজ করা একটা কাগজ। খুলে দেখল তাতে লেখা আছেঃ
“অর্চিত,
ঠিক চার বছর আগে এমনই এক হেমন্তের গোধূলিতে, আর একজনের সাথে জড়িয়ে ছিলাম আমার জীবন। মালা বদলের উৎসবে দুজনে দুজনকে নিবিড়ভাবে দেখেছিলাম। তখন জানতাম না, যে এই দেখাই শেষ দেখা হবে আমাদের। নিয়তির অদ্ভুত পরিহাসে সে চলে গেল ইহলোক ছেড়ে। অনেক যুদ্ধ করেছিলাম মনের সাথে -ঠাকুরদাদু আর মা এর চোখের জলের থেকে বাঁচতে আজকে এই দিনে তোমাকেও পেলাম। পারলাম না নিজের মনের সাথে প্রতারণা করতে...তাই আজ তারই কাছে নিজেকে ফিরিয়ে দিলাম। ক্ষমা করো আমাকে।
-”বিদিশা”
চিঠিটা হাতে নিয়ে অর্চিত কিছুক্ষণের জন্য স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর আসতে আসতে ঘরের বাইরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এসে বিদিশার পাশে বসে পড়ল। সবাইকে বললঃ “আমাদের ফুলশয্যার ব্যবস্থা করো। বিদিশা এখন আমার স্ত্রী।”
সবাই অবাক এই কথা শুনে। কিন্তু বার বার অর্চিতের কথায় তারা কিছু ফুল এনে ছড়িয়ে দিল বিছানায়। তারপর অর্চিত বিদিশার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে ওর পাশে শুয়ে পড়ল। আর বললঃ বিদিশা তুমি কারো ছিলে না । কারণ তুমি আমার ছিলে সব সময়। তাই আজও তুমি আমার রইলে...বলে বিদিশার হাতটা দিয়ে নিজেকে বেষ্টন করে নিল।
সবাইকে বলল- “একি! তোমরা দাঁড়িয়ে কেন? আমাদের ফুলশয্যা তোমরা দেখো না।”
দরজা ভেজিয়ে দিয়ে সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মত বেড়িয়ে গেল ঘর থেকে।
সকাল হতেও সবাই দেখে দরজা বন্ধ- তাই সবার আগে সুদেব বাবু ঘরে ঢুকেই দেখেন অর্চিতকে বেষ্টন করে তাঁর আদরের নাতনি ফুলশয্যার রাত কাটালো। এইবার তিনি অর্চিত -এর গায়ে হাত দিয়ে ডাকলেনঃ “দাদুভাই”।

কি...ন্তু...অর্চিত-এর দেহ তো ঠান্ডা বরফ। নিজের মনকে শান্ত করে শুধু হাঁক পাড়লেন... “তোমরা বর বৌকে বিদায় জানাতে সাজগোজ আরম্ভ করো। ফুলের গাড়ি ডাকো। বিদায়ের সানাই বাজুক......”
আমার দিদিভাই তার বরের সাথে নিজের বাড়ি যাচ্ছে।
সবাই এসে দেখে... আশ্চর্য্যভাবে শান্তিতে শুয়ে আছে দুজনে। বিদায়ের সানাই বেজে উঠল......
*******

আপনার মতামত জানান