ছয়-মন্তর

নাসরিন বেগম


অন্যদিনের চেয়ে সকালটার হয়ত আলাদা হওয়ার ই ছিল। ফিজিওগনোমী বলছিল সকালের বরাত খুলবে। রাতের পর রাত ধাক্কা খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়া কাতরানো সকালগুলোর কান্না শুকোবে কি ? তা এ আলাদা হবে কিসে? এক চিলতে রোদের রাংতায় ... না কি মন – উড়ানো সমীরণে ? এত সব অবীজগাণিতিক সমীকরণের প্রোডাক্টিবিলিটি কাটিয়ে ...যা হোক সকাল হল...
এরকম একটা কিম্ভূতকিমাকার মার্কা ‘আলাদা’ সকালে এক বুক কিউমুলোনিম্বাস নিয়ে ঘুম ভাঙল মেঘনার ... হাতের আগলেই রাখা পাবলো নেরুদার খোলা পাতা... কাল রাতে সেই খোলা পাতাতেই ঘুমটা আসে...
“Only do not forget if I wake up crying it’s only because in my dream I’m a lost child / hunting through the leaves of the night for your hands.”
বেশ ধড়ফড় করেই উঠে পড়ল মেঘনা। গত দু-আড়াই বছরে দুঃস্বপ্ন আর ইনসোমনিয়া-ই ছিল তার নৈশ ডায়েট।কিন্তু আজ? এই যে সকালটা আলাদা, কারন স্বপ্নটাও আলাদা । বিগত কয়েক বছরে তার স্বপ্নগুলো ছিল প্রায় কতগুলো নির্দিষ্ট বিষয় ঘিরে ...অন্ধকার টানেল, ঝোড়ো হাওয়া, নৌকাডুবি...কিন্তু আজ স্বপ্নে একটা মোড় আসে । তার অভ্যস্ত দুঃস্বপ্নে টানেলের মধ্যে দিয়ে হাঁটছে সে...হঠাৎ হাতে চেনা ছোঁয়া...আর আজ টানেলটাও পিচ-ডার্ক নয়...বেশ একটা chiaroscuro আমেজ.... আর দম বন্ধ করা গন্ধটাও তো মিসিং, টানেলের ও তো শেষ হয় ? টানেলের রং ধূসর। আকাশের কালো...অপেক্ষার গোলাপি , টানেল থেকে বেরিয়ে মুখটা দেখার জন্য ছটফট করে মেঘনা। দৃষ্টিতে আকুলতা। মেঘনা তাকাল ... কিন্তু একি? অন্ধগুহা নিবাসিনী মেঘনার হাত ধরেছে ....সাত্যকি।না... এ স্বপ্ন সহ্য করার মত মনের জোর ছিলনা তার। স্বপ্নভঙ্গ... ...ঘুমটা ভাঙতেই হাউ হাউ করে ছোট বাচ্চার মত কেঁদে উঠল মেঘনা। দু- আড়াই বছর ধরে একটার পর একটা দুঃস্বপ্ন , কিন্তু সাত্যকির দেখা কিছুতেই মেলেনি। কিন্তু আজ এই স্বপ্নটা সব পুরোনো স্মৃতি উথলে দিল।
সাত্যকি.... মেঘনা.... বায়োলজি কোচিং ....বর্ষা ...মন কেমন ....অভিশপ্ত ছয়-অক্ষর...
ওদের শুরুটা হয়েছিল নাটকীয়ভাবে।এক জুলাই মাসের বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যা যেন ওদের অপেক্ষাতেই ছিল....এক নতুন কাহিনী শোনাতে। মেঘনা সবে ইলেভেন-এ ওঠেছে। পড়ার বই আর গল্পের বই- এর বাইরে স্বাচ্ছন্দ্য নেই বললেই চলে। ব্যাচে বসে কিছুক্ষণ পরে মেঘনা খেয়াল করে বছর ষোলোর একটা ছিপ ছিপে ছেলে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। মেঘনা বিরক্ত হয়ে ওঠে । বিরক্তির মাত্রা আরো বাড়ে যখন পড়ার শেষে ছেলেটি মেঘনার কাছে এসে বলে , “ অ্যাই, তোর নামটা কি বলতো? তোকে আগে কোথাও দেখেছি বলে মনে হচ্ছে?” জবাব না দিয়েই- একরাশ গা- জ্বলা নিয়ে মেঘনা চলে আসে । চিরাচরিত ‘আগে কোথাও দেখেছি’- এর ট্রিক? উফফ্ ! অসহ্য!
কথার কিন্তু শুরু সেদিন থেকে ।রোজ দেখা ....কথা বলা । আস্তে আস্তে মেঘনার মনে মেঘ হাল্কা হতে শুরু করে। আরও জানতে পারে যে ছেলেটি সত্যি করেই মেঘনাকে আগে দেখেছিল, খুব ছোটবেলায় মেঘনার মা মেঘনাকে একটা খেলার মাঠে ভর্তি করেছিল। তা সেখানে সাত্যকিও যেত। ছোটবেলার স্মৃতিও মনে আছে । বাবা ! স্মৃতিশক্তি বটে।
তো এভাবে মেঘনা আর সাত্যকির বন্ধুত্ব হল। যেমন বন্ধুত্ব তেমনি ঝগড়া , সব কিছুতেই ঝগড়া। যুবরাজ সিং এর স্টিকার মেঘনা পেন্সিল বক্সে চিটোলে সাত্যকি রেগে ছিড়ে ফেলে .... প্রতিশোধ নিতে গিয়ে মেঘনার মুখের বাবল গাম সাত্যকির চুলে।
এই যাই তো সেই যাই অবস্থা।কোচিং-এর স্যার বলে দিলেন ... “ লঙ্কাকাণ্ড না বন্ধ করলে বনবাসে যাও”, তা এইসব ‘সাউন্ড’ আর ‘ফিউরি’ কে আরেকজন দুচোখে দেখতে পারত না। সে হল প্রজ্ঞাপারমিতা। নামটার মতোই ভারী চেহারা । তবে এহেন মানুষটির নাকটা ছিল অসাধারন । মনে হত কিং কং একটু আগে পেরোলো নাকের উপর দিয়ে। এটা সাত্যকিকে বলতে গেলেই সাত্যকি বলে ওঠত “শোন সবাই কি তোর মত উচ্চিংড়ে হবে নাকি? টমবয় কোথাকার? প্রজ্ঞা খুব ভালো। পুরো “ইন্ডিয়ান টাইপ”।
কথাটা কানে বাজত মেঘনার। একদম ভালো লাগত না। কেন? কিছুদিন পরে রহস্যর জট খুলতে শুরু করে ।
সেদিনটা ছিল বৃষ্টিভেজা সেপ্টেম্বরের সন্ধ্যা...অকাল-বারিশ। মেঘনার আজ পড়তে যেতে ইচ্ছা করছিল না। একের পর এক গান চলছে ....বর্ষাকালের আবদারেই যেন গান গুলো প্লে করছে মেঘনা ....
“মেরা কুছ শামান ...তুমহারে পাশ পড়া হ্যয়”
“ শাওন বরসে তরসে দিল”
“ May be I’m addicted”
মা ঠেলে পাঠাল। বাবার শরীরও ভাল নেই। একাই যেতে হল অগত্যা। গিয়ে আবার ঝামেলা। রাজদীপ বলে একটা ছেলে নাকি সাত্যকিকে শাসিয়ে গেছে ... “ তোর সাথে মেঘনার কি সম্পর্ক বল্ তো সাত্যকি? তোর জন্য মেঘনা আমায় হ্যাঁ বলছেনা”। সাত্যকি ফুঁসতে থাকে।রাগ ঝাড়তে থাকে মেঘনার উপর ,
“ তুই আর রাজ ৯০% উপরে পাওয়া ছেলে-মেয়ে । কিন্তু তোর জন্য আমাকে অপমান সহ্য করতে হবে কেন?”
“ কি যা তা বলছিস ! আমি কি করলাম সাত্যকি?”
স্যার এসে পড়ল, বৃষ্টিও আরও ঝেঁপে এল। স্যার বললেন্ “ শোন্ তোরা একটু মেয়েগুলোকে এগিয়ে দিয়ে আসবি?”
হায় আল্লা! মেঘনার বরাতে সেই সাত্যকি। অগত্যা রামগরুড়ের ছানার সাথেই যাত্রা। কুইনাইনের চেয়েও তেতো বৃষ্টি। মুখে দুজনেরই কুলুপ আঁটা।
এদিকে আকাশ তো তেতে উঠেছে। বর্ষার ‘লাইট আর সাউন্ড শো’- এর মহরা চলছে। মেঘনা এবার কি করবে? প্রচণ্ড ভয় লাগে তার বাজের শব্দে। আবার সাথে এই ঝগড়ুটে ভলডারমট।
... মেঘনার বাজের শব্দে ভয়...এই চেম্বার অফ সিকরেটসে্র মুখ খুললে মেঘনার ভাগ্যে কাল থেকে বরাদ্দ হবে প্যাঁক এর নামতা। তাড়াতাড়ি পা চালাতে শুরু করে মেঘনা । কিন্তু শেষ রক্ষা হলনা । বাড়ির গলিতে ঢোকার আগেই বিদঘুটে বাজটাকে পড়তে হত? চোখ দুটো টিপে বন্ধ করে ফেলেছে মেঘনা । মুখ থেকে ‘মাগো’ আওয়াজটা বেরোতে যাবে, তার আগেই সাত্যকির হাত মেঘনার হাতকে আশ্বাস জানায়, “ ভয় কি? আমি আছি তো”... এক মুহূর্তে প্রশ্নগুলো ঘিরে ধরে মেঘনাকে । সাত্যকি কি জানত তার ফোবিয়া টা? তাহলে কি করে এত আশ্বাস দিল ? মেঘনারই বা সব ভয় এক নিমেষে চলে গেল কি করে ? Why? What for? How? সব ১৫-১৬ বছরের কিশোর-কিশোরীদেরই এই Wh-question গুলোর মুখোমুখি হতে হয়.... কোনও এক ঝড় বৃষ্টির রাতেই বোধ হয় এই সব Quest এর শুরু।
বাড়ি ফিরে ...ঘোর ...খালি রবীন্দ্রসঙ্গীত । আর ওই মুহূর্তর জাবর কাটা।
“ সে সুধাবচন, সে সুখপরশ, অঙ্গে বাজিছে বাঁশি তাই শুনিয়া শুনিয়া ...”
এই একরাতেই মেঘবালিকার মধ্যে রাইকিশোরীর লক্ষণ ফুটে ওঠে।
দুদিন পর ব্যাচে যাওয়া। সবই নর্মাল। সাত্যকি কোনও কথাই তুলল না ঐ রাত্রির, আগের মতোই খুনসুটি করে সাত্যকি। ব্যাচে একসাথে মারপিট। কোনো কোনো ছুটির দিনে বন্ধুরা মিলে সদরঘাটের বালিতে পিকনিক। বালিতে মেঘনার নাম লিখে তার পাশে ভূতের ছবি আঁকা। আবার প্রজ্ঞাও যেন বেশীই গদগদ হয়ে উঠেছে সাত্যকির উপর ।
সবার মাঝে একা হয়ে পড়ে মেঘনা । ডানপিটে মেঘনা সবার চোখ এড়িয়ে লাজুক হয়ে ওঠে । সাত্যকিকে দেখে ব্লাশ করা... সন্ধ্যে হলেই মন কেমন ...রাতে পাশ ফিরে মন খারাপের গজল... আর স্কুলে বই এর তলায় লুকিয়ে অজস্র ছাইপাঁশ কবিতা লিখে ফেলা ...
এভাবে দিনের পর দিন ...মাসের পর মাস .... এসে যখন একবছরে ঠেকে... তখন টেস্ট পরীক্ষার ঠিক আগে আগমন হয় অনুঘটকের। দুদিনের ছুটিতে বেরাতে আসা তার মাসতুতো দিদির । এই সমস্ত পরিস্থিতিতে অনুঘটকরা ঠিক যে ভুমিকা পালন করে আর কি ... মেঘনা প্রায় নিশ্চিত হয়ে ওঠে । সাত্যকিকে সব জানাবে। একটা কার্ড ও কিনে ফেলে...লেখে এক প্রিয় কবির লাইন ,
“We shall / Be one and one another’s all”
এই সব ভেবে টেবে মেঘনা একদিন দুরু দুরু বক্ষে ব্যাচে গিয়ে বসেছে। সকালে একটি SMS ও করে রেখেছিল সাত্যকিকে ...
“ ব্যাচের পর দাঁড়াবি ! কথা আছে”
আজ নীল রঙের চুড়িদার পরেছে সে। সাত্যকির প্রিয় রঙ । স্যার আসতে দেরী করছে । সাত্যকিও দেরী করছে। হঠাৎ সাত্যকির আর এক বন্ধু সুজিত একটা কথা বলে ওঠে ।
“ মেঘনা জানিস ? সাত্যকি প্রেমে পড়েছে”।
“কই ! আমি জানতাম না তো ?”
“কি মুশকিল ! সব কথাই কি তোকে বলবে ?”
“ কে? বল্ না”
“ না বলব না”
“ একটু ...হিন্ট দে”।
“ আচ্ছা ! তার নাম ছয় অক্ষরের”।
“ ক- অক্ষর?”
“ ছয়...”
হঠাৎ করে সব কিছু মিলে গেল । প্র-জ্ঞা-পা-র-মি-তা।
সাত্যকির প্রতি প্রজ্ঞার গদগদ ভাব । প্রজ্ঞাকেও সাত্যকির সমর্থন । এক ঝটকায় মেঘনাকে এই কাহিনী থেকে দূরে সরিয়ে দিল ।
বাচের শেষে সেদিন যখন সাত্যকি জিজ্ঞাসা করতে এল , “ মেঘ-রে ! কি বলবি বল?”
এক মিথ্যার আশ্রয় নিল মেঘনা । তাড়াতাড়ি বলে উঠল , “ ভাবছি রাজদীপকে হ্যাঁ বলব কিনা?”
“এইটাই তোর বলার ছিল?”
“হ্যাঁ , তোর মতামত চাইছিলাম”।
“ভালোই তো, যা তোর মন চায় তাই কর”।
মেঘনা আর দাঁড়াতে পারছে না। আর একটুক্ষন সাত্যকি দাঁড়ালেই মেঘ হয়ত বলে ফেলবে তার মনের কথা। কোনোরকমে সাইকেলটা চালিয়ে বাড়ি এসে বিছানায় মুখ লুকোল। রাতে কিছু খেল না ,ঘুমোল না,কাঁদল না ... স্থির হয়ে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে থাকল....সারা রাত।
এদিকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা চলে এল । মা বাবা এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তাকে মানুষ করেছে। এখন কি তাদের দিকে তাকানোর সময় নয়? মনের দুঃখ গিলে নিয়েও পড়তে যে হবে তাকেই। খুব ভালো রেজাল্ট ও হয়। খবরটা শেয়ার করতে সাত্যকিকে ফোনও করে সে । সাত্যকির ভালো ফল হয়নি। মেঘনা সান্তনা জানাতে যাবে তার আগেই সাত্যকি বিশ্রীভাবে ফোনটা কেটে দেয়
এভাবে দিন কাটে , দিন কাটে... দিওয়ানাপন কাটতে চায় না। সেসব দিন গুলোতে হোয়াটস অ্যাপ বা ফেসবুক মেঘদূতের কাজ করত না। মেঘনার সম্বল বলতে ঐ সাত্যকির একটা ফোটোগ্রাফ।
১৭ বছর বয়সী কিশরীর বিরহ বড়ই নিবিড়। বাস্তববোধ, সান্তনা- কিছুরই বাঁধনে কমে না সেই বিরহ। তবু সবেধন নীলমণির মত গান ও কবিতাকে আঁকড়ে ধরে মেঘনা। ঠিক যতটা আঁকড়ে ধরলে বিরহ ও কবিতার মধ্যে একটা ‘নো-ম্যানসল্যান্ড’ এর সৃষ্টি হয়। যেখানে মেঘনা দাড়িয়ে দু-এক ফোঁটা অক্সিজেন খুঁজে বাঁচার চেষ্টা করে।
নতুন বছর। নতুন কলেজ। মেঘনা ভালো ফল করেছিল বলে তাকে নিয়ে তার কলেজের সবাই- এর উন্মাদনা অনেক। কিন্তু এসব কিছুই তাকে ভোলাতে পারে না,বিরহের কভারেজ বেড়েই চলে।।
কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে পাশের সাবজেক্ট পড়তে গিয়ে কোচিং এ দেখা আবার সাত্যকি ও প্রজ্ঞার সাথে। জানতে পারে যে সাত্যকি ও প্রজ্ঞা ডেট করছে। কানাঘুষো শোনে যে , প্রজ্ঞা সাত্যকিকে প্রপোজ করেছিল। কেউ বা বলে যে সাত্যকিই প্রেম নিবেদন করেছিল।মেঘনা ভাবে যেই শুরুটা করে থাকুকনা কেন, মোদ্দা কথা হচ্ছে ওরা একে অপরকে ভালবাসে।আর প্রজ্ঞার পুরো নাম ছয় অক্ষরের, নামমিলান্তি...প্রেমমিল ান্তি।
কিন্তু সাত্যকি আবার আগের মতই মেঘনার প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়। সেই রকম সব খুনসুটি। মেঘনাও এ প্রলোভন এড়াতে পারে না। বাদ সাধে প্রজ্ঞাপারমিতার প্রজ্ঞা।
একদিন ফোনে থতমত গলায় সাত্যকি জানায়, “ সরি রে প্রজ্ঞা খুব ভুল বুঝছে আমাদের বন্ধুত্ব টাকে। তাই আর কথা বলা হবে না”। মেঘনা “ঠিক আছে” বলে তড়িঘড়ি ফোনটা কেটে দেয়। ব্যাচ ও ছেড়ে দেয় পরের সপ্তাহে ।
মনে মনে ফুরিয়ে যেতে থাকে মেঘনা। দিনের পর দিন ... এত অস্থিরতা, এত আকুলতা ... আর কুলিয়ে উঠতে পারছিল না সে । এরকম করে কেটে গেল আড়াইটা বছর। একটা দিনের জন্যও সাত্যকিকে দেখতে পায়নি সে । কিন্তু আজ এই পাষাণগুহা পেরিয়ে কি করে স্বপ্নদর্শন হল?
“আর কতক্ষণ ঘুমাবি? আজই তো ক্লাস শুরু M.Sc এর । দেরী করিস না”।
মা এর কথায় সম্বিৎ ফিরল তার। ছুটতে ছুটতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এসে যখন পৌঁছল , ছাত্রদের ‘পরিচিতি পর্ব’ শুরু হয়ে গেছে। আজ প্রথম দিন । বেশ তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেল।
মেঘনা ছুটির পর হনহন করে সাইকেল স্ট্যান্ডের দিকে চলছে। হঠাৎ পিছন থেকে আওয়াজ , “মেঘ! মেঘ!”
এ নামে তো একজনেরই ডাকার অধিকার ছিল । ঠিক তাই। ঘুরে দেখে মেঘ... সাত্যকি। জমাট দাড়িতে বয়সটা কি একটু বাড়ল তবে? গালটাও একটু বসে গেছে। অত ফর্সা রং-এ তেও tan পড়ছে। মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
গুনে গুনে আড়াই বছর পরে দেখা । মেঘনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সাত্যকি। এগিয়ে এসে একগাল হাসি।
“ সত্যি মেঘ! তোর পি.টি.ঊষা টাইপ হাঁটাটা একই থাকল। কেমন আছিস বল ?”
“ হ্যাঁ, ঠিকঠাক, তুই?”
“ আমি? ....খুব ভালো। কতদিন পরে দেখা বল তো? চল্ কোথাও বসে গল্প করি”।
“ না, আমার তাড়া আছে”।
“ন্যাকামোটা ছাড় মেঘ! কত বছর যাইনি সদরঘাটের ধারে । সেই লাস্ট তোদের সাথেই যাওয়া, চল্ ওখানে ঘুরে আসি...চল তো!”
মেঘ সাইকেলটা জমা রেখে চেপে পড়ল অগত্যা সাত্যকির বাইকে।সাত্যকির আবদার খণ্ডাবে সে? তা আবার হয় নাকি?
মোটরবাইক ছুটছে ... মেঘের হঠাৎ নিজেকে রিপ ভ্যান উইঙ্কেল মনে হল। আড়াই বছরের শীতঘুম কাটিয়ে ওঠে সে যেন দেখছে সব তিক্ত অতীত আজ পিছনে মিলিয়ে গেছে। সদরঘাটে বালির উপরে এসে সেই অতীতের প্রিয় জায়গাতে সবে বসেছে ...পশ্চিমে তখন মেঘ জমেছে।
“কতদিন তোর গলায় কবিতা শুনিনি মেঘ!একটা নেরুদা হয়ে যাক...জলদি”।
“কোন বাহানা ছাড়াই মেঘের মুখ থেকে বেরিয়ে এল নেরুদা ...নেরুদাই তাকে যে বোঝেন....
“ Leaning into the afternoons I cast
My sad nets.
towards your oceanic eyes
there in the highest blaze my
solitude lengthens and flames,
its arms turning like a drowning man’s…”

“মেঘ! দেখ রে আকাশে তোর সাম্রাজ্য”
“ এমা, চল্ উঠে যাই...”
“ দাঁড়া না, আরেকটু বসি”।
একি আবদার। মন খারাপের মেঘ... পাশে সাত্যকি। আবার আড়াই বছরের বিরহ ঋণ। এরকম এক সব্বোনেশে দিনে মেঘের নিচে কি থাকতে আছে রাইকিশোরীদের?
আবার সেই মেঘাক্রান্ত মুহূর্ত। আলোর ঝলকানি। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। মেঘের হাতে নেমে এল সাত্যকির হাত...
“ ভয় নেই!আমি তো আছি”
এক ঝটকায় হাত সরিয়ে নিল মেঘনা। সব এলোমেলো হয়ে যাওয়ার প্রাক-মুহূর্ত। সংযত তো তাকে হতেই হবে।
“চল্ উঠি!মা-বাবা চিন্তা করবে। প্রজ্ঞাপারমিতাও উদ্বিগ্ন হবে”।
কিছুক্ষণ সব নিস্তব্ধ। তারপর সাত্যকি বলে উঠল , “ মেঘ! আমি ভালো নেই”।
মেঘ এত অসহায় আগে কোনদিন বোধ করেনি ... “কেন?”
“প্রজ্ঞা আমাকে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে ধরতে চায়।
কিচ্ছু মেলে না আমাদের”।
“তুই তো ওকেই ভালবাসতিস? তাহলে এসব হঠাৎ?”
“ মেঘ সব কিছু জানাবার একটা সময় থাকে। আমার জীবনে সেটা আসেনি। আমি প্রথম দেখাতেই একজনের প্রেমে পড়েছিলাম। কিন্তু তার মেধার দীপ্তি আমাকে তার কাছে পৌঁছাতে বাধা দেয়। সেও সমমেধার দিকে আকৃষ্ট হয় । পরে তাকে ভোলার জন্য প্রজ্ঞার প্রপোজালে হ্যাঁ বলে দিই। কিন্তু তাকে কি ভোলা যায়?”
“কেন? প্রজ্ঞাপারমিতার ও তো ছয় অক্ষরের নাম।আর সুজিত ই তো বলেছিল যে তুই যাকে ভালবাসিস তার নামে ছয়টি অক্ষর। তাহলে সে কে ?” হিসাব না মেলাতে পেরে ছটফট করে ওঠে মেঘ ।
“ তুই ঠিক ই শুনেছিলিস। যে পাগলীকে আমি ভালবেসেছিলাম তাকেও ছয় অক্ষরে বাঁধা যায়। তবে ...থাক না মেঘ ... এই শোন্ না তোর নামের পাশে আজও কেউ বালিতে ছবি আঁকে?”
সাত্যকি কথাটা এড়িয়ে যাচ্ছে কেন? এত বছর পরে সে কার নাম বলতে চাইছে?আর এত গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গের মধ্যে বালিতে নাম লেখার মত ছোটখাটো কথা কেন তুলছে? মেঘনা নিশ্চুপ।
সাত্যকি বালির উপর মেঘনার নাম লেখে। সেই আগের মত। নামের পাশে দাঁত বার করা কার্টুন।এরপর আস্তে আস্তে উঠে পড়ল সে, “আয়! অনেক দেরী হয়ে গেছে।জোর বৃষ্টি নামবে, মেঘ। আমি অপেক্ষা করছি বাইকের সামনে”।
সত্যিই , দেরী হয়ে গেছে । মেঘ উঠতে যাবে। ঠিক তখনি চোখে পড়ল সাত্যকির আঙুলের কাজে ... বালির উপরে বড় বড় করে ইংরেজীতে লেখা ... M-E-G-H-N-A সব মিলিয়ে অক্ষর... ছয়টি।

আপনার মতামত জানান