অমূলক গল্প অথবা, অসহায় কথক

প্রবুদ্ধ ঘোষ


আর, কথক ডুবে আছে। জলের শোক তাকে তার কান্না ভুলিয়ে দিচ্ছে। এই গল্পের কথক খুব আলতো ভঙ্গিমায় দেখে নিচ্ছে খাদ্য ও খাদকদের। সে জানে তার ভাষা শুদ্ধতা পায়নি। লেখ্য ব্যবহার জানেনা, তাই একদিন অন্য মহাদেশ অন্য অন্য বর্ণের হাতে তার অক্ষর, বোধ বন্দী হবে। কথক আবাহন দেখে, শোনে এক রাজার আখ্যান। বহুদূর যাবে সেই রাজা। যুদ্ধ। সঙ্গে যাবে তাকে নিয়ে লেখা গল্প। কথক জানে তার মতই আরো অনেকে শুনে নেবে সেই রাজার বিজয়কাহিনী। তারপর ডালপালা, পাতা, ফুল, ফল, বীজ। আর শিকড় ছড়াবে। শিকারের গল্পে গল্পে সবাই জেনে যাবে অয়নোন্মুখ রাজার ইচ্ছা-আদেশ। কিছুটা সাদার সাথে গোলাপি মিশবে, কোথাও সবুজের ওপর সাদা রং হবে, কখনো লাল ঘিরে নীল। অথবা কালোর ওপরে সাদা ঘষে ঘষে... অতএব, মুখে মুখে জন্মাবে মিথ্‌। অতএব একসময় সেই রাজা আর শিকার করবেনা। হয়তো রাজসংখ্যা বাড়বে। শিকারের মিথ, যুদ্ধের ভয় ঢেলে দেবে চেতন-অবচেতনে। তার স্তুতি নির্বিকার ভঙ্গিতে গ্রাস করে নেবে আগামী। কথক বর্তমানে আছে। কথক টের পেয়েছে ধ্বংসের শোক। কথক ডুবে আছে। জল মুছিয়ে দিচ্ছে তার চোখ।
কিন্তু, পাঠক, আপনি তো কথক চান। ন্যারেটর-এর বাংলা করছি- কথক। (কেউ কেউ আখ্যায়ক বলে থাকেন, কিংবা বাচক। তবু, আমি কথক বলছি)। গল্পে একজন অনিবার্য প্রোট্যাগনিস্ট। এ লেখায় কথক দুর্বল। আর, আগে থেকে বলে দেওয়াই ভাল যে, কথক খুব গুছিয়ে সাজিয়ে কথনের অবস্থায় নেই, সে ডুবছে। অথবা তাকে ডোবানো হচ্ছে। হয়তো সে শেষাবধি তলিয়ে যাবেনা। আর, সে এখানে দর্শক। অন্য সবার মত। সময়ের মত।
ডাক্তার দু’দিন বুঝতে পারেনি। নসিয়া, হেডেক্‌, ভমিটিং নিয়ে ভর্তি। সোমবার সকাল। মা। প্রথমদিন হঠাৎ চিনতে পারছিল না কিছু। বমি, মাথাব্যথা রোগ প্রায়ই হয়। জোফার ট্যাবলেটে কমে। এবার জোফার ইঞ্জেকশনেও কমেনি। প্যান-ফর্টি ইঞ্জেকশনে কয়েকঘণ্টার সাময়িক স্বস্তি। মঙ্গলবার বিকেলে সিটি-স্ক্যান। ল্যাবেই রিপোর্ট কানে এল। সেরিব্র্যাল হেমারেজ্‌। পা সামান্য টলে গেলেও, পড়ার উপায় নেই। এমুহূর্তেই ডায়াগোন্‌স্টিক সেণ্টার থেকে নার্সিঙ্গহোম ফিরতে হবে। ডাক্তারবাবুকে ফোন। হয়তো আইসিইউ। অনিবার্য ভয়। অ্যাম্বুলেন্সে মা-র অসহ যন্ত্রণা। আবার দৌড়তে হবে রিপোর্ট আনতে। তারপর চেম্বার। ম্যানিটল্‌ চালু হচ্ছে। মা-কে বিছানায় রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছি। ছুঁচ- স্যালাইন- স্পিরিটের গন্ধ। একটা অবশতা। ডাক্তারবাবুকে আবার ফোন। প্রেসারের ওষুধ নিয়মিত খেতনা। শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের সোমবারের উপোস। ওষুধের ওপরেই থাকা জেনেও কেন খেতেন না ওষুধ? আমি জবাবটা...
ঠিক তখনই একজন ফাঁদ পেতে বসে আছে। সে ছেড়ে এসেছে তার সংসার, পরিজন। ছাড়তে তাকে হতই। আর, নিজের ভিতরে দস্যুতা আর কবিত্বের দ্বন্দ বয়ে চলা সহজ নয়। কোনো এক দস্যুতা তাকে রোজগারে নামাত, লুঠ করতে বেড়িয়ে পড়ত সে। এখন এই ফাঁদ সে পেতেছে হয়তো তেমনই মনোবৃত্তি থেকে। মাঝে মাঝেই তার বিগত জীবন ভাষা পায় তার ভাবনায়। নিঃসাড়ে বসে থাকা তার শিকার আয়োজনে। তার চোখে পাতার পর পাতা সাদা, উড়ছে। সে জানে কলম কোথায়, জানে অক্ষরমালা। শিখেছে অনেক প্রয়াসে। শিখতে হচ্ছে লিখনকৌশল, অসংস্কৃত থেকে তার অভিমুখ সুনিবিড় ভাষাবন্ধে। সে জানে লেখা হচ্ছে তার এই উৎকর্ষের ব্যাপ্তি, জানে তার আলোময় যাত্রাপথের পরিমাপ লেখা হচ্ছে। তবু, কেউ বলছেনা তার সংসারের দিনাতিপাতকথা। বিগত দস্যুতা এই সংসারবৃত্তেরই প্রতিটি বিন্দু যথাযথ রাখতে। অথচ, এই বৃত্তই তাকে একদিন বাধা দিচ্ছে। কিছুতেই মেনে নিচ্ছেনা দুষ্কৃতকারী সত্তা। সে ভয় পাচ্ছেনা পরজন্মের অথবা অন্য লৌকিকতার। ভয় পাচ্ছে অস্তিত্বের, নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছে সমাজদর্শনে। বড় ভারি হচ্ছে কথা। অলসতার নামান্তর। বহুক্ষণ হল, ফাঁদ পাতা আছে। অথচ, এ শিকারে, এই মাংসে অধিকার সে স্বেচ্ছায় ছাড়ছে। তার নির্ধারিত নিরামিষ, নির্ধারিত অজিন, মাপা কমণ্ডলু-জল। তবু তার শিকার চাই। ছেড়ে আসা বৃত্ত ভরাটে। এদিকে লেখা হচ্ছে তার উত্তরাশ্রমের কথা, পূর্বাশ্রমকথা যতটুকু থাকছে তাতে স্বীকৃত হবে কবি হয়ে ওঠা। এখনো যে শিকারী-সত্তা তার, সেকথা জানছেনা এমনকি সৃষ্ট চরিত্ররাও, অথবা ভবিষ্যৎ পাঠক। আরো এক রহস্য থেকে যাচ্ছে। আসলে, শোক চাই তার। ক্ষমাহীন, লীন শোক। নয়তো আখরমালা কিছুতেই সাজছেনা, অমসৃণ থেকে যাচ্ছে ছন্দ। শিকারের কথাই লিখছে সে। অযূতশিকার। যূথবদ্ধ শিকার পরম্পরা বিস্তৃত হচ্ছে তারই লেখার হাতে হাত রেখে। প্রতিটি শব্দের মাঝে যতটুকু সময়, সেখানেই যুগান্তরের সাম্রাজ্যবিস্তার কথা। সে জানে। হননকাল ভবিষ্যত জুড়ে। তবু, এখন তার অপেক্ষা হননের। এই হননে যে শোক, তা দিয়েই শুরু হবে বই। ওই যে দুটি পাখি রতিরত, বসছে অদূরে। এরাই তার বৃত্তের ক্ষুধা মেটাবে। আর, এরাই হয়ে উঠছে তার পুঁথির প্রথম জাতক-জাতিকা। কবিসত্তা তীর তুলে আছে। দেখতে পাচ্ছে পাখিটির মিলনশোক, শুনতে পাচ্ছে এই শোক কাল থেকে কালান্তরে ছড়িয়ে যাচ্ছে...
আপাততঃ সুস্থ। ম্যানিটল্‌ সুস্থ রেখেছে, ওই দুঃসহ ব্যথা কিছু কম। হেমারেজ ক্লট্‌টা আরেকটু বাঁ দিকে হলেই প্যারালিসিস হতে পারত। অথবা, আরো বড়ো স্মৃতিভ্রংশ বা বাক্‌শক্তিরহিত। মাঝে মাঝে কিছু অসংলগ্নকথা অবশ্য বলছে। আর, মাথা সামান্য দপ্‌দপ। কোত্থেকে যেন বারবার রক্তের আঁশটে গন্ধ। একটা একঘেয়ে স্পিরিট গন্ধ। বমিভাব থাকছে। হাল্কা, তবু থাকছে। আগের রাতে হঠাৎ হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেছে। ধোঁয়াটে ছবি। বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি, রক্ত ছিট্‌কোচ্ছে। ছেঁড়া ছেঁড়া। তাই, ঘুমের ওষুধ দেওয়া হচ্ছে আজ। সুগার প্রায় বিপদসীমার কাছাকাছি। বি.পি ১২০/৭০, নর্ম্যাল হচ্ছে। ওই মাথা দপ্‌দপ, মাথা ঘোরা থাকবে কিছুদিন। আস্তে আস্তে তরল রক্তে মিশে যাবে জমাট রক্ত। অসংগতি গুলো থাকবেনা। আর, স্বপ্নগুলো দুর্বলতা থেকে, পটাসিয়াম কম ৩.২। ডাক্তারকে বলছি হেমারেজ আগে হয়েছে চোখে ২০১২-র ডিসেম্বর শেষ দিকে। তার আগে ২০০২ ফেব্রুয়ারিতে ক্যানসার হয়েছিল। ১৯৮৬, ১৯শে এপ্রিল বাঁ-চোখে থ্রম্বোসিস। ১৯৯০, ২অগাস্টে আবার। ২০০৩ মার্চে গল্‌ব্লাডার স্টোন্‌। ২০০৭-এর জানুয়ারি অস্ট্র - আর্থ্রাইটিস্‌ । অসুখগুলো বদলে, ফিরে আসছে। থেকে যাচ্ছে। বাইরের খাবার? না। তেল-ঝাল বেশি? না। মিষ্টির ভক্ত? না। কাঁচা নুন? ন্না, না। তা’লে সুগার আর প্রেসার এত বাড়ার কারণ? টেন্‌সন এত কী নিয়ে? আমার ভেতরে একটা ভয়...
পাঠক, ক্রমশঃ বুঝছেন যে, একটা মোটিফ চাই? স্ট্রং মোটিফ! অঙ্কের প্রমাণের মতো আমরা জানি, কালো বর্ডার ছাড়া সাদা রঙ খোলতাই হয়না। মানে, খল বা অপকারণ কিছু একটা প্রয়োজন। আর, আপনি নিশ্চই খেয়াল করছেন যে, কথক তৈরি হয়েছে এ গল্পের। অন্ততঃ গল্পটার প্রথম দিকে আপনার না হোক, লেখকের মনে একটা অনিশ্চয় তৈরি হচ্ছিল কথকের অবস্থান, অস্তিত্ব নিয়ে। আপাততঃ তা নেই। কিন্তু, কথনের সূত্রগুলো ভাঙ্গা। ছেঁড়া। অনেকটা যেন যুদ্ধফ্রেমের মধ্যে ছড়ানো ছেটানো পদাতিক। ৬৪ ঘরের মধ্যে ডিস্‌কভারি চেক্‌ খাওয়া মিডল্‌গেম... যাইহোক,
অথচ তার তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি। কোনোদিনও। আজও হবেনা। তাকে বিদ্ধ করতেই হবে। অন্ততঃ দশটি পাখির মাংস বিক্রি করতে না-পারলে আগামী দু’দিনের সংস্থান হবেনা। এখনো কিছু সময় পরে থাকবে। তার মধ্যেই শিকার বাড়াতে হবে। সন্ধ্যের হাট। তারপর দিনের জোগাড় করে ফেরা। তখন কিছু হাসিমুখ থাকবে। ভরণ-পোষণ। টান নয়, আন্তরিক নিবেদন নয়। নির্লিপ্ত কর্তব্যবোধ থেকে শিকার হবে। তাদের বস্তিতে এই পেশা। নেশা থেকে বেরনো তীর-ধনুক হাতে, তা ভুলে যাবে ধীরে ধীরে সে। ক্ষুধা শুধু তাড়িয়ে বেড়াবে। রাজকর দেওয়া ক্রমশঃ ভারবহ। সবসময় কী একটা ভয়। ওইসব লোকগুলোকে। রাজাদেশে ক্ষত্রিয় অথবা ব্রাহ্মণ পুত্রদের পড়ানো, শেখানো, গান- তাদের বর্ণ। তারাই এরপর ক্রমে চাপ বাড়াবে প্রাণীহত্যা বন্ধ করাতে। দুধ-ফল-ঘি পুষ্ট মগজে তারা রাজাকে ভুলিয়ে দেবে অন্যতর প্রজাদের কথা। রাজা বেরোবে শিকারে। রাজা যাবে যুদ্ধে। কিন্তু, সে তো আমোদ, কিছুটা হা-হা অবসর কাটবে। ওতে পাপ নেই। অথবা ব্রাহ্মণ গুরু অস্ত্রপাঠ, নিখুঁত লক্ষ্যভেদ, পাখির চোখবেঁধা শেখাবে। তাতে রাষ্ট্রসম্মতি। কিন্তু, তার, তাদের কী হবে তখন? রোজগারের পথ? সংস্থান? এসব ভাবতে ভাবতেই পথ চলছে সে। মনোযোগ ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে। পিছলে যাচ্ছে। তবু, মন দিতে হবে পাখির ডাকে। শিস্‌ শুনেই সে বলে দিতে পারবে, কোনটা কি। অভিজ্ঞতা। যা নির্মম করে তুলবে তাকে আরো। সেদিন একটি পাখির সাথে তার শাবককেও বিঁধেছিল। নইলে কি নিয়ে যেত বাড়িতে? সে ক্রমশঃ ভুলে যাবে প্রথম প্রথম আহত পাখিকে শুশ্রুষা করত। যুগল, শাবকদের কখনো মারত না। এক নিয়ত দ্বন্দ। পরিবারে দিনের ভাগ তুলে দেবার চাপ। রাজাদেশে জীবিকাসঙ্কটের তাপ। কঠিন করে তুলবে তাকে আরো। সূর্য হেলছে, ছায়া পিছোচ্ছে। বড়ো। ওই তো। একটা ডাক। দু’টো। মিশবে। ডাক ঘনতর। তবে কি? আহ! কোথায়? যদি দুটোকেই একসাথে... এখনই দশটা হবে। এমুহূর্তে পেশি টানটান হবে। কান স্থির। আওয়াজ বাড়বে। লক্ষ্য কাছেই। কোনো দ্বন্দ কাজ করবে না। এখন বিগত সব ভুলে যেতে হবে। শুধু ক্ষুধা কিছু, ওটাই উত্তেজিত করে তুলবে দেহ। জ্যা কান অবধি টানা। বেশ উঁচু গাছ, ঘন পাতা। তবু, বিঁধবেই সে। সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষা। ভুলে যাবে আশপাশের সব কিছু। কেউ তাকে দেখছে কিনা, অন্য কেউ অন্যদিকে শিকারী কিনা, আকাশটা লালরং খেলবে কিনা, পাশের জলা থেকে তক্ষক বেরোল কিনা। কিচ্ছুতে মন থাকবে না আর। শুধু এই দুটি পাখি। লগ্ন। মগ্ন। সে একটা মন্ত্র পড়বে এরপর, নিজস্ব। তোকে অন্ন দেব তাই/ আমি অস্ত্র হাতে লগ্নজীবন/ শিকার করে যাই... সঠিক সময়। তীর ছুটবে। অন্ততঃ ক্রৌঞ্চকে বিঁধবেই
একটা ঠাণ্ডা যুদ্ধ সতর্কতা। রোগ আর রুগীর। বরাবরই চলে। কোথাও ডাক্তার শক্ত হাতে হাল ধরেন, কোথাও রোগ আর রুগীর মাঝে ঈশ্বর দাঁড়ান। প্রার্থনায় তিনি জীবন দেন, অবনতি রোধ করেন। তেমনই বিশ্বাস। ডাক্তার আগামীকাল ছেড়ে দিচ্ছে। এখন রেস্ট। ডায়াবেটিক ডায়েট্‌ আর পরিমিত যাপন। উত্তেজনা চলবে না। স্ট্যাম্‌লো-৫ আর ন্যট্রোপিল্‌ নিয়মিত। ভালো হয়ে যাবে, ধীরে। এখন, সুস্থ। ডাক্তারকে বলতে পারিনি মা-কে সেদিন ইণ্টারনেটে ওই ছবিগুলো দেখাচ্ছিলাম। বিদেশী এক ডাক্তার গাজায় চিকিৎসা করছে। মার্কিন প্রেসিডেণ্ট-কে চিঠি লিখেছে। সন্ততিদেহ হাতে বাবা ছুটছে। ঘিলুহীন, খুলিভাঙ্গা শিশু। নথিতে মৃত ২০০০জন। একটা হাসপাতাল দাউদাউ। মা-র মুখটা কি একটু ফ্যাকাশে লাগছিল তখন? ২০১২-র ডিসেম্বরে এরকমই কয়েকটা ছবি দেখতে দেখতে চোখ বন্ধ করে নিয়েছিল। হঠাৎ। ১৭ই ডিসেম্বর চোখে ঝাপসা দেখছিল। ধরা পড়ে হেমারেজ। রক্ত জমছে। ২০০২ ফেব্রুয়ারির শেষে, মনে আছে মায়ের পেটে টিউমার। ৫লিটার জল বেরিয়েছিল অপারেশন করে। আর, কাগজে এরকম একটা পেট-চেরার কথা পড়ে প্রথম কেমো-টা নিয়েছিল। এগুলো মেডিকেল হিস্ট্রি। ইতিহাস। একটা ওয়াই=এফ(এক্স) রয়েছে হয়তো। আমি জানি, কিংবা জানিনা। অমূলক। ভয়ের কারণ ডাক্তারকে বলা যায়নি। আর জানি, ঠাণ্ডা যুদ্ধটা চলবেই। রোগ থাকবে। মা থাকবে। ঈশ্বর থাকবে। ডাক্তার থাকবে। ভয় রইল। ইতিহাস রইল। ভবিষ্যৎ...
পাঠক, খেয়াল করুন আমি আপাতকথকের ভূমিকা নিয়েছিলাম। প্রথমেই বলেছিলাম ডুবন্ত কথকের কথা। সে দর্শক, ভূমিকাহীন। সরাসরি প্লট বা সিচ্যুয়েশনে নাক গলাতে পারছে না! সে শুনবে ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ছে। সে শুনবে আর্তনাদ। সে শুনবে স্বীকৃতি পাচ্ছে দখল। সে শুনবে রাজাদের শিকার-আমোদ, বিজয়কথা। লোকমুখে স্তুতি। সে হয়তো পড়বে ডিস্‌কোর্স, কনসেণ্ট। কিন্তু, সে অসহায়। সম্মিলিত ভীড়ে কিছুটা ব্যক্তিঅভিঘাত, কিছুটা ভয়, কিছুটা প্রাণপণ সোচ্চারতা, কিছুটা ডুব-ইচ্ছা তার রয়ে যাবে। সে বলবে, কিন্তু নির্বাক। ব্যাধের নাম সে জানবেনা। যে কৌপীন-কমণ্ডলুধারী শিকার করতে এসেছিল কিন্তু, ব্যাধটি শিকার ছিনিয়ে নেওয়ায় ‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ...’ বলবে। অথবা সে নিজেই ক্রৌঞ্চবধ করে শোকবিহ্বল হয়ে উচ্চারণ করেছিল- আখ্যানে দোষী হবে নিষাদ। তাকেও সে চিনবেনা। সে শুধু জানবে এরকম হবে। বধভয় থাকবে। অস্থিরতা। আর, অসুস্থতা।
সময়। তাকে ঘণ্টা-দিন-তারিখ দিয়ে মাপা হয়। আর, এ গল্পের শুরুর তারিখ জানিনা। গল্পটার কোনো শেষ আছে কি? অথবা, কিভাবে? জানিনা, বিশ্বাস করুন, জানিনা। সংলাপ থাকছেনা গল্পে, থাকবেনা। বা, অসংলগ্ন। নতুবা, অপ্রয়োজনীয়। পাত্র আর কাল ভেদে বদলে যাবে এর অবস্থান। ব্যধ এবং ক্রৌঞ্চ কখনো একে অপরের রূপ বদলাবে। সেই দস্যু-কবি বদলে যাবে কথকে। প্লট বদলে যাবে আরওয়াল বা লক্ষ্ণণপুর-বাথে। সিচ্যুয়েশন রূপান্তরিত হবে উপসাগরীয় যুদ্ধে। আপনি বদলে যাবেন রুগীতে। অথবা, মা ডাক্তারে। ক্রৌঞ্চী কবিতে। এবং, ভাইসি-ভার্সা। সমাজ হেমারেজে। আমি বদলে যাব গণহত্যায়। আমি বদলে যাব কামমোহিতাম্‌ বা মা নিষাদে। অতএব, গল্পটা চলতেই হবে। পাঠক, আপনিই হয়ে উঠুন বাকি লেখক...

আপনার মতামত জানান