গিরিডির স্মৃতি

হিতেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
(১)

তখন আমার বয়স হবে আট কি নয়- আমরা গিরিডির বারগেণ্ডা অঞ্চলে থাকতাম। বাড়িটার নাম ছিল ‘লালকুঠি’- কেউ কেউ আবার ‘আশুবাবুর বাংলো’ও বলতো। আমরা গিয়েছিলাম চেঞ্জে, কিন্তু জায়গাটা আমাদের এত ভালো লাগল যে কয়েক বছর আমরা সেখানেই থেকে গেলাম, সেখানেই লেখাপড়া করতে লাগলাম। সেইসময় ‘সন্দেশ’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা আমার জ্যাঠামশাই উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী গেলেন বায়ু পরিবর্তনে। তিনি আমাদের বাড়ির কাছেই একটা বাড়ি ভাড়া নিলেন। বাড়িটা ছিল বিখ্যাত ডাক্তার স্যার নীলরতন সরকারের ছোটভাই নানুবাবুর। বাড়িটা উশ্রী নদীর ওপরেই – নামটা যতদূর মনে পড়ে ‘নর্থ ভিউ’।
একদিন জ্যাঠামশাই উপেন্দ্রকিশোর আমাকে ডেকে বললেন, ‘জেঠু তোমাদের জন্য ‘সন্দেশ’ এনেছি।’ ভাবলাম জ্যাঠামশাই হয়তো আমাদের জন্য সত্যি-সত্যিই ভীমনাগের সন্দেশ কলকাতা থেকে এনেছেন। ছোটবেলা সন্দেশ খেতে ততটা পছন্দ করতাম না, গলায় কেমন যেন আটকে যেত, কাজেই সন্দেশের নাম শুনে খুব উৎসাহ পেলাম না। তবুও জ্যাঠামশাই যখন এনেছেন নিতেই হবে। রসিকপুরুষ ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর, আর শিশুমন কিভাবে জয় করা যায় তা তিনি বিশেষভাবেই জানতেন। একটা মোড়ক আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘জেঠু, এই নাও- আমার সামনেই খোল।’ মোড়কটা খুলতে লাগলাম, কিন্তু কই – সন্দেশ বলে তো মনে হচ্ছে না ? খুলতে খুলতে বেরিয়ে এল ‘সন্দেশ’ পত্রিকার কয়েকটি সংখ্যা। ঘটনাটা কোন সালের ঠিক আজ আর তা মনে নেই, তবে পঞ্চাশ বছর আগের তো হবেই। বইগুলো হাতে পেয়ে সেদিন কি যে আনন্দ হয়েছিল তা বলতে পারি না। দৌড়ে গিয়ে একটা ঘরে বসলাম ‘সন্দেশগুলো’ নিয়ে- পড়তে পড়তে যেন কোন রাজ্যে চলে এলাম! পঞ্চাশবছর আগে শিশুদের জন্য কয়েকটি মাত্র বাংলা পত্রিকা ছিল- এ বিষয় নিয়ে কেউ বিশেষ মাথা ঘামাতো বলেও মনে হয় না। এরই মধ্যে উপেন্দ্রকিশোর প্রতিষ্ঠা করেন ‘সন্দেশ’। তখনকার দিনে অনেক অভিভাবকের ধারণা ছিল ছোট ছেলেমেয়েরা পড়ার বই ছাড়া অন্য কোন-ও বইই পড়বে না। আমরা কিন্তু নিয়মিতভাবে ‘সন্দেশ’ পড়তে লাগলাম- বাইরের জগতের সঙ্গে ‘সন্দেশে’র মাধ্যমেই আমাদের যোগসূত্র স্থাপিত হল। আমরা পৃথিবীর নানা জায়গার বিষয় কত কিছু জানবার সুযোগ পেলাম। সেদিন হেলেন কেলারের বিষয় পড়ে আমি বিশেষভাবে অভিভূত হয়েছিলাম, আজও মনে পড়ে।
উপেন্দ্রকিশোর যতদিন গিরিডিতে ছিলেন ততদিন বারগেণ্ডা র ছেলেমেয়েরা এক নূতন উৎসাহে মেতে উঠেছিল। উনি নিয়মিতভাবে রোজবিকেলে বেড়াতে যেতেন- সঙ্গে জুটিয়ে নিতেন বারগেণ্ডার অন্তত কুড়ি-পঁচিশজন ছেলেমেয়ে। আমার স্পষ্ট মনে আছে, সেই সময়ের বিকেলগুলোর জন্য আমরা সারাদিন উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করতাম, সারাদিনের কাজগুলি করতেও যেন রীতিমত উৎসাহ পেতাম। উপেন্দ্রকিশোর আমাদের নিয়ে যেতেন উশ্রীনদীর চরে। সেখানে ছেলেমেয়েদের নিয়ে তিনি নানারকম খেলা করতেন। আজ ভাবলে সত্যি আশ্চর্য মনে হয়- তাঁর বয়স তখন প্রায় পঞ্চাশ হবে, আর মধ্যে যে সবচাইতে বড় ছিল তার বয়স হবে চোদ্দ। বয়সের এত পার্থক্য সত্ত্বেও মনে হত যেন উনি আমাদের সমবয়সী।
একটা খেলা ওঁর খুবই প্রিয় ছিল- নাম তার “যষ্টিহরণ’’ অর্থাৎ লাঠি চুরি করা। লাঠিটা অবশ্য তাঁরই ছিল, সেটাই চুরি করতে হবে। কুড়ি-পঁচিশ হাতের একটা চক্র করা হত বালির উপর দাগ কেটে, তার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে পুঁতে রাখা হত তার হাতের লাঠিটা। একজন হত পাহারাওয়ালা, সে লাঠিটা পাহারা দেবে কিন্তু তাকে লাঠিটা থেকে অন্তত তিন হাত দূরে থাকতে হবে। আর অন্য সকলে চেষ্টা করবে লাঠিটা সরিয়ে আনতে। লাঠিটা চুরি করতে গিয়ে পাহারাওয়ালা যদি চক্রের ভিতর কাউকে ছুঁয়ে দেয়, তখন সে নেবে পাহারাওয়ালার স্থান। আর সত্যিই যদি কেউ লাঠিটাকে সরিয়ে আনতে পারে, তাহলে পাহারাওয়ালার হবে শাস্তি। বিচারকে ভূমিকায় থাকতেন উপেন্দ্রকিশোর নিজে। শাস্তিও খুব মজার- ষোলবার জোরে জোরে লাফাতে হবে। উদ্দেশ্য ছিলো বোধয় দোইহিক পরিশ্রম। এইদলের মধ্যে ছিল আমার দিদি ইন্দু, জ্যাঠতুত বোন বুলুদি, পিস্তুত বোন মালতীদি ও এদেরই সমবয়সী কয়েকজন তের-চোদ্দ বছরের মেয়ে। এরা কেউ কেউ কিছুতেই লাফাতে চাইত না, লজ্জা পেত। তাদের জন্য উপেন্দ্রকিশোর অভিনব শাস্তির ব্যবস্থা করেছিলেন। তাদের শাস্তি ছিল একটা করা গান গাওয়া। উপেন্দ্রকিশোর গানবাজনা অত্যন্ত ভালোবাসতেন- এটা তাঁরই একটা ছোট্ট পরিচয়। শিশুরাই একদিন হবে জাতির কর্ণধার, কাজেই বলিষ্ঠ জাতি গড়ে তুলতে হলে- শিশুদের শরীর ও মনকে প্রথমে সুস্থ ও সবল করে গড়ে তুলতে হবে, এটাই ছিল উপেন্দ্রকিশোরের স্বপ্ন- কাজেই তিনি শিশুদের নিয়ে মেতে থাকতেন।
একবার গিরিডিতে বোলতার খুব প্রাদুর্ভাব হল। সারাদিন কানের কাছে ভন্‌ভন্‌, খাবারের জিনিসের ওপর ভন্‌ভন্‌, অনেকেই বোলতার কামড় খেতে লাগল- সকলেই অস্থির হয়ে উঠল। প্রত্যেক বাড়িতেই এক কথা, ‘কি আপদ এসে জ্বালিয়ে মারল!’ সেইসময় একদিন সকালবেলা কি কাজে জ্যাঠামশাইরবাড়িতে গেছি। জ্যাঠামশাই তখন বেহালা বাজাচ্ছিলেন, আমার গলা শুনে আমায় ডাকলেন – তাঁর ঘরে গেলাম। খুব মজা করার মত মাথা নেড়ে আমায় বললেন, ‘জেঠু, একটা বোলতা তো আমায় মেরে দিতে হচ্ছে, কিন্তু দেখো ওর গায়ের কোনও অংশে যেন আঘাত লেগে কোনও রকম জখম না হয়।’ জ্যাঠামশাইরএকাজটা পেয়ে যেন নিজেকে ‘হিরো’ বলে মনে হল।
জ্যাঠাইমা’র এক ভাইয়ের ছেলে সুধীরও ওদের বাড়িতে থাকতো- সুধীর আমারই সমবয়সী ছিল। আমরা দুজনে মিলে জল্পনা-কল্পনা করতে লাগলাম কি করে বোলতা মারা যায়, অথচ তার কোন অঙ্গ জখম হবেনা। ভয়ও ছিল, মারতে গিয়ে আবার কামড় না খাই। অনেক পরামর্শ করে উপায় ঠিক করা হল। একটা হাতপাখার বাতাস দিয়ে একটা বোলতাকে ধরাশায়ী করব, আর সুধীর একটা বাটি চাপা দিয়ে ওটাকে বন্দী করে ফেলবে। এরপর আমাদের বন্দী শ্ত্রুকে একটা গরম জলের পাত্রে ফেলে হত্যা করা হবে। সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু হয়ে গেল এবং অনায়াসে তা সম্পন্নও হয়ে গেল। তারপর আমাদের মৃত শত্রুকেও নিয়ে গেলাম জ্যাঠামশাইরঘরে। উনি বোলতাটাকে খানিকক্ষণ হাতে নিয়ে পরীক্ষা করলেন, তারপর আমাদের ‘সাবাস’ বলে পিঠ চাপড়ে দিলেন।
সব চাইতে অবাক হলাম, ঠিক পরের মাসেই দেখলাম ‘সন্দেশে’ উপেন্দ্রকিশোরের লেখা একটি প্রবন্ধ – নাম ‘বোলতা’। তাতে একটি বোলতার ফোটো ছিল। সকলের কাছেই গর্ব করে বলতে লাগলাম- আমরাই বোলতাটা মেরে জ্যাঠামশাইকে দিয়েছিলাম। এখানে উপেন্দ্রকিশোরের অভিনব দৃষ্টিভঙ্গির একটা পরিচয় পাওয়া যায়। গিরিডির সকলেই যখন বোলতার উৎপাতে উত্যক্ত, উপেন্দ্রকিশোর তার ভিতর থেকেই শিশুমনের খোরাক জোগাড় করে দিলেন।
মাঝে মাঝে উপেন্দ্রকিশোর গ্রহ-নক্ষত্র সম্বন্ধে আমাদের বলতেন। যেদিন খুব পরিষ্কার আকাশ থাকত, সমস্ত তারা স্পষ্ট ফুটে উঠত আকাশে, উনি ছোটদের নিয়ে জড়ো করতেন গিরিডির বাড়ির মাঠে। তারপর শুরু করতেন গ্রহ-নক্ষত্র সম্বন্ধে তাঁর কথা। কত মজার করে, কত পৌরাণিক গল্পের ভিতর দিয়ে আমাদের অতি সহজে পরিচয় করিয়ে দিতেন ওগুলোর সঙ্গে। সেসব দিনের কথা কোনদিন ভুলব না। কতদিন হয়ে গেছে কিন্তু মনে হয় যেন সেদিনের ঘটনা। আজও আকাশে ‘কালপুরুষ’ দেখলে সঙ্গে সঙ্গে জ্যাঠামশাইরকথা মনে পড়ে।

(২)

আর একটি লোকের সান্নিধ্যে এসেছিলুম গিরিডিতে। তিনি হলেন বাংলা শিশুসাহিত্যের সম্রাট, বিখ্যাত ‘হাসিখুসি’র লেখক যোগীন্দ্রনাথ সরকার। নূতন করে তার পরিচয় দেওয়া অনাবশ্যক। যোগীন্দ্রনাথের মত এমন হাস্যরসিক লোক আর কখনো দেখিনি। প্রত্যেক কথার মধ্যেই যেন তাঁর কৌতুক ছড়িয়ে থাকত। শিশুদের দেখলে উনি সব ভুলে যেতেন। যোগীন্দ্রনাথের সাথে আলাপ করতে আমাদের মন সবসময়ই উৎসুক থাকত। কত মজার মজার গল্প উনি আমাদের বলতেন। ওঁকে দেখলেই আমরা বলতাম, ‘মেসোমশাই একটা গল্প বলুন।’ তাঁকেও আমাদের কাছে গল্প বলতে কখনো আপত্তি করতে শুনিনি।
তাঁর বারগেণ্ডার বাড়ি ‘গোলকুঠি’তে রোজ গিরিডির জ্ঞানীগুণীদের আসর বসত। ‘গোলকুঠি’র সামনে বেশ বড় একটা খোলা বারান্দা ছিল, তাতে গোল করে বাঁধানো বসবার জায়গা ছিল- সেখানেই আসরটা বসত। সন্ধ্যেবেলা ‘গোলকুঠি’র সামনে দিয়ে গেলে যোগীন্দ্রনাথের প্রাণখোলা হাসি সর্বদাই শোনা যেত।
যোগীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটি মজার ঘটনা বলব। একদিন তিনি আমাদের গিরিডির বাড়িতে এলেন বেড়াতে। মা খাবার দিয়ে গেলেন, আর উনি খেতে খেতে আমাদের সঙ্গে মজার মজার গল্প বলতে লাগলেন। এমন সময় মা আবার একটা মিষ্টি এনে ওঁকে খাবার জন্য পিড়াপিড়ি করতে লাগলেন- উনি বললেন, ‘না,না, আবার দেবেন না, আমি আর খেতে পারব না- এত খেয়ে প্রাণটা আমার একেবারে গলা পর্যন্ত এসে গেছে, এরপর আরও একটা খেলে এক্ষুণি প্রাণটা বেরিয়ে যাবে।’ এমন মজা করে কথাগুলি বলছিলেন, যে আমরা না হেসে থাকতে পারলাম না, তবুও আমরা জোর করে বলতে লাগলাম, ‘না মেসোমশাই, আপনার এই মিষ্টিটা খেতেই হবে।’ উনি ছিলেন শিশুদের পরম বন্ধু, তাই ওঁকে খাওয়াতে পারলেই যেন আমাদের পরম তৃপ্তি। শেষে উনি বললেন, ‘তাহলে তমরা চাও যে আমি মরে যাই ? আচ্ছা তাই হোক। ’ এই বলে মিষ্টিটা মুখে দিয়ে খেতে খেতে হঠাৎ চোখ বন্ধ করে খাটের ওপর দুম করে পড়ে গেলেন।
আমরা ভয় পেয়ে বলে উঠলাম, ‘কি হল, মেসোমশাই, কি হল?’ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে রসিকপুরুষ যোগীন্দ্রনাথ আস্তে আস্তে উঠে এসে বললেন, ‘আরে প্রাণটা তো গলার কাছেই এসে গিয়েছিল, মিষ্টিটা খেতেই যে জায়গাটুকু ছিল ওটাই ও দখল করে নিল আর প্রাণটা টুপ্‌ করে বেরিয়ে গেল।’ তাঁর বলার ভঙ্গিতে আমরা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লাম। শিশুমনকে আকর্ষণ করবার কি অদ্ভুত ভঙ্গি। এমনই ছিল তাঁর শিশুদরদী মন। যোগীন্দ্রনাথকে বাংলার শিশুরা কোনদিনই ভুলবে না। আজ পঞ্চাশ বছরেরও ওপর হয়ে গেছে এসব ঘটনা কিন্তু এখনও যেন চোখের সামনে ভাসে। সত্যিই আমরা ভাগ্যবান যে এ সমস্ত লোকের সাহচর্যে আসার সৌভাগ্য হয়েছিল।

একবার দাদা অর্থাৎ ‘আবোল-তাবোল’-এর লেখক সুকুমার রায় গিরিডিতে গেলেন। তার পিতা উপেন্দ্রকিশোর তখন গিরিডিতে ছিলেন না, কাজেই দাদা এসে আমাদের সঙ্গে ‘লালকুঠিতে’ই রইলেন। দাদাকে পেয়ে তখন আমাদের সে কি আনন্দ, যেন ঠিক উপেন্দ্রকিশোরেরই প্রতিচ্ছায়া। সদা হাস্যময় রসিক পুরুষ। দাদার বয়স তখন খুব কম, সবেমাত্র বিলেত থেকে ফিরেছেন কিন্তু তার প্রতিভ এরই মধ্যে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
উনি গিরিডিতে যেতেই সেখানকার যুবক সম্প্রদায় একদিন আমাদের বাড়ি এসে দাদাকে ‘পূর্ণিমা সম্মেলন’ করতে অনুরোধ করল। দাদারও এসবে খুবই উৎসাহ ছিল, কাজেই আমাদের বাড়িতে রিহার্সাল আরম্ভ হয়ে গেল। অন্যান্য নাচ-গানের সঙ্গেই তাঁর লেখা ‘ভাবুক সভা’ ও ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’। ‘ভাবুক সভা’য় দাদা নিলেন ভাবুক দাদা’র পার্ট, আর ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’-এ রামের পার্ট।
তখনকার রিহার্সালের দিনগুলোকে আজও মনে হয় যেন আমরা কোন স্বপ্নরাজ্যে ছিলাম। দিনগুলো কেমন করে কেটে যেতে লাগল যেন বুঝতেই পারলাম না। এখানে একটা বড় মজার ঘটনা ঘটেছিল- সেটা আর না বলে পারছি না। ট্যামবাবু বলে ভদ্রলোকের নামটা- আজ আর মনে নেই, স্কলে তাঁকে ওই নামেই ডাকত, টম থেকে ট্যাম হয়েছিল কিনা জানিনা- গিরিডীর একটি যুবক এসে দাদাকে ধরলেন, তাঁকে একতা পার্ট দিতে হবে। তাঁকে একটু পরীক্ষা করে দেখা গেল একটা কথাও বলতে পারে না, অথচ তাঁর স্টেজে ওঠার ভীষণ শখ। শেষে অনেক সাধাসাধির পর দাদা তাঁকে রামের অতিরিক্ত একজন সভাসদের পার্ট দিলেন, যাতে একটা মাত্র কথা তাঁকে বলতে হবে। একটা দৃশ্যে হনুমানকে যখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তখন উনি শুধু বলবেন, ‘হনুমান ব্যাটা গেল কোথায়,’ এই পার্টটুকু পেয়েই ট্যামবাবুর কি উৎসাহ। তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলতে শুরু করে দিলেন- তাঁর মোটেই পার্ট নেবার ইচ্ছে ছিল না, সুকুমার নিজে ডেকে তাঁকে পার্ট দিয়েছেন, সুকুমার বাবুকে ত আর না বলা যায় না, ইত্যাদি ইত্যাদি।
ট্যামবাবুকে নিয়ে গিরিডির ছেলেমেয়েরা নানারকম ঠাট্টা-তামাশা করত, কাজেই তাঁর একথা শুনে সবাই একটু অবাক হয়ে গেল, সবাই ভাবল দেখা যাক ট্যামবাবু কি করেন। তারপর একদিন ‘পূর্ণিমা সম্মেলন’ হল। গিরিডির সবাই গিয়ে জড়ো হল সম্মেলনে যোগ দিতে, হলও খুব চমৎকার। এরপর গিরিডিতে অনেকবারই ‘পূর্ণিমা সম্মেলন’ হয়েছে কিন্তু তেমনটি আর হয় নি। তবে ট্যামবাবু বেশ একটা হাসির ব্যাপার করে ফেললেন। তিনি ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’ নাটকে প্রায় প্রত্যেক দৃশ্যেই রামের সঙ্গে সভায় আসতে লাগলেন, কিন্তু কোনও কথা নেই।
প্রত্যকেবারই স্টেজে এসে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলেন। তাঁর মন চলে যাচ্ছিল দর্শকের কাছে – তাঁকে দেখে দর্শকরা কি ভাবছে, বিশেষ করে মেয়েরা। তারপর এল তাঁর কথা বলার পালা কিন্তু তাঁর দৃষ্টি তখন দর্শকদের দিকে গভীর ভাবে নিবিষ্ট- সেই দৃশ্যে যে কি হচ্ছে সেদিকে তাঁর কোনও খেয়ালই নেই। এদিকে হনুমানের খোঁজ পড়েছে, অথচ ট্যামবাবুর কোন উচ্চবাচ্য নাই, তিনি একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছেন দর্শকদের দিকে।
পাশেই রামবেশে দাদা ছিলেন – উনি ট্যামবাবুর অন্যমনস্কতা লক্ষ্য করে ওর হাঁটুতে দিলেন এক রামচিমটি। সঙ্গে সঙ্গে ট্যামবাবু উঃ বলে এক চীৎকার, আর সঙ্গে দর্শকদের হো হো করে সেকি হাসির ধুম। এদিকে নিরুপায় হয়ে পাশ থেকে আরেকজন সভাসদ যখন বলে উঠলেন, ‘হনুমান ব্যাটা গেল কোথায়’, তখন ভদ্রলোকের চৈতন্য হল, তিনি লম্বা জিভ্‌ কেটে ফেললেন। এই নিয়ে সেদিন নাটকের পর সকলে মিলে ট্যামবাবুকে যা নাস্তানাবুদ করেছিল, তা আর বলার নয়।
দাদার গল্প বলার ভঙ্গি ছিল অসম্ভব মজার। ছোট ছোট ঘটনা এবং গল্প এমন মজার করে, এমন রস দিয়ে বলতেন যে হাসতে হাসতে পেট ফেটে যাবার জোগাড় হত। গিরিডীতে আমরা ছোটরে একদিন ধরলাম দাদাকে একটা গল্প বলার জন্য। দাদা হেসে বললেন, ‘আচ্ছা একটা ছোট গল্প বলছি শোন।’ আমরা তাঁর চারপাশে গোল হয়ে বসলাম। গলাটা অদ্ভুত ধরনের করে বলতে শুরু করলেন, - ‘নীলুখুড়ো মফস্বল থেকে রোজ ট্রেনে করে যেতেন কলকাতা, কোন এক অফিসে কাজ করতে। একদিন ট্রেনে উঠতে গিয়ে নীলুখুড়ো কাটা পড়লেন। তাঁর কোমরের কাছ থেকে দু’ভাগ হয়ে গেল, আর নীলুখুড়োর নীচের দিকটা ট্রেনের তলায় কোথায় যে চলে গেল তা আর খুঁজেই পাওয়া গেল না। তাড়াতাড়ি ওর ওপরের দিকটাই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। একটা গরুও সেই সময় সেই ট্রেনেই কাটা পড়েছিল। তক্ষুণি গরুর নীচের দিকটা নিয়ে গিয়ে নীলুখুড়োর কোমরের সঙ্গে সেলাই করে জুড়ে দেওয়া হল। নীলুখুড়ো হাসপাতালে আস্তে আস্তে ভালো হয়ে উঠতে লাগলেন, আবার ট্রেনে চড়ে যাতায়াত করতে লাগলেন। আর সব চাইতে মজার হল নীলুখুড়ো ত্রিশটাকা করে মাইনে পান আর ত্রিশ সের করে দুধও দেন।’ – শুনেই আমরা হো হো করে হাসতে লাগলাম ;হাসি আর থামতেই চায় না। আজ কত বছর হয়ে গেছে, আমি অনেক আসরে এখনও সুকুমার রায়ের নাম করে নীলুখুড়োর গল্পটা বলি – গল্প শুনে ছোট-বড় সকলেই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে, সকলেই বলে কি আশ্চর্য ক্ষমতা! এতবড় প্রতিভার কত তাড়াতাড়ি অবসান হয়ে গেল- কত অল্প বয়সে দাদাকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হল। এই গল্পটি সন্দেশেও প্রকাশিত হয়েছিল।
আজ গিরিডী আমার কাছ থেকে অনেকদূরে সরে গেছে, আর হয়ত কোনদিন সেখানে যাওয়াও হবে না কিন্তু গিরিডির হারানো দিনের কথা ভোলা অসম্ভব। আজ স্মৃতি মন্থন করতে গিয়ে গিরিডির আরও কত কথা, কত ঘটনা মনে পড়ছে কিন্তু সব এখনি আর লেখা সম্ভব নয়।

পুরোনো বানান অপরিবর্তিত।

আপনার মতামত জানান