মোক্ষয়িষ্যামি

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

ছবি- বিক্রমাদিত্য গুহ রায়

(১)

- ওটা কি লিকার শপ?
- হ্যাঁ স্যার মদের দোকান, রাতভর খোলা থাকে।
- পুলিশ কিছু বলেনা?
- বলবে কেন স্যার? শাটার তো ফেলা থাকে। ভেতরে একটা লাল টুনি বাল্ব জ্বলে। শাটারে তিনটে টোকা মারলে আলতো করে আধতোলা করে দেয় শাটারটা – পুরোনো খদ্দেররা সবাই তিনটোকার হিসেবটা জানে – সেই দলে দু’চারজন ট্রাফিক কনস্টেবলও আছে।
- শোনো গাড়িটা এই গলিটার থেকে বের করে রাখা যায়না?যদি তুমি আমি ঠেলেঠুলে বের করে দিই?
- কেন স্যার?
- এই যে একটা আস্ত ভাঁটিখানা জ্বলজ্বল করছে চোখের সামনে।
- আপনার মাতালে এতো ভয় কেন স্যার?
- ভয় নয়, মাতালদের আমি একদম বিশ্বাস করিনা।
- কেন স্যার?
- আমাদের পাড়ায় সমীরকাকু মারা গেলো বুঝলে, সোমবার দিন। সিরোসিস অফ লিভার।
- লিভার পচে গেছিল স্যার?
- কাইন্ড অফ, এসব সেলিব্রিটি অসুখ বুঝলে, ঋত্বিক ঘটকেরও শুনেছি টিবি না সিরোসিস অফ লিভার কি যেন হয়েছিলো। যাই হোক, তো ওদের ফ্যামিলিতে কেউ সেলিব্রিটি হয়নি, কিন্তু বাপ ছেলে দু’জনেই সিরোসিস অফ লিভার হয়ে মরলো।
- সে কথা বুঝলাম স্যার, কিন্তু অবিশ্বাস করেন কেন?
- আরে শোনো না পুরো গল্পটা। সমীরকাকুর বাবা অমিয়দাদু ছিলো পাড়ার নামকরা মাতাল। অনেক সময় বেহেড হয়ে নালানর্দমার পাশে পড়ে থাকতো। তো বদ্রীনাথ জেঠুর মুখে একটা গল্প শুনেছি। বদ্রীনাথ জেঠু ধার্মিক মানুষ – কোনোদিন মদটদ ছুঁয়ে দেখতোনা। শুধু গাঁজা খেতো, তাও সন্ধের পরে, বাড়ি বসে, তাতে জেঠি ছাড়া কেউ কোনোদিন আপত্তি করেনি। তো বদ্রীনাথ জেঠু অমিয়দাদুকে রাস্তার ধারে বেশ কয়েকবার পড়ে থাকতে দেখে মেসোমশাই মেসোমশাই করে ডাকাডাকি করেছে। বাঙাল পাড়াগুলোতে দেখবে সেকেন্ড জেনারেশান, আই মিন যারা এই সত্তরের দশকে বড়ো হয়েছে তারা পাড়ায় বড়োদের কাকু জেঠু না বলে মেসোমশাই বলতো – মানে পাড়ার মেয়েদের বাবাকে বাবার ভাই বানাবার থেকে তাদের মাকে মায়ের বোন বানানোতে কেন জানিনা সবার ঝোঁক বেশি থাকতো। বোধহয় মেয়েরা মায়ের জাত বলে।
- ঠিকই বলেছেন স্যার, আমাদের পাড়ায় এখনো চলটা আছে। আমাদেরও ওই বাঙাল পাড়াই।
- হুঁ। তো সেই বদ্রীনাথ জেঠুকে দেখতে পেয়ে অমিয়দাদু বলতো, ‘বাবা বদ্রীনাথ, আমায় একটু বাসায় নিয়াযাবা?’ তো মোটামুটি সদাচারী বদ্রীনাথ জেঠু নিয়ে আসতো বাড়ি।
- সে তো ভালো কথা। অবিশ্বাসের কি হলো?
- আরে শোনোনা পুরোটা। যেই বাড়িতে ঢুকতো অমিয়দাদু চেল্লামিল্লি শুরু করতো নিজের ছেলেদের ডেকে, ‘সমীর, ধলু, দোরখান দিয়া দে, আমার পেছন পেছন একখান ডাকাত আইসে। দ্যাক দেহি টাহাপয়সাগুলান সব ঠিকঠাক আছে কিনা?’
(২)
আট দশটা গল্প পরপর লিখে ফেললেই – সেইসব লেখকেরা যাদের বড়ো লেখক হবার আগামী সাতশো তিন বছরে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে – নিজেদের গোরু ভাবতে আরম্ভ করে। কারণ দু’খানি – একটি খাঁটি প্রোক্যাস্টিনেশান, বাঙলায় বললে ভালো শোনায় – ল্যাদ। ‘নট আ সিঙ্গল ডে উইদাউট আ লাইন’ ওসব অবশ্যই শোনা কথা এবং শোনা কথা মহাপুরুষ এবং মহানারী যারা কালে কালে মহালেখক (ইদানীং শুনছি লেখিকা শব্দটা পুরুষতান্ত্রিক এবং সেই সহজকারণে অপমানজনক) হয়ে উঠবেন তাঁরা ছাড়া, বিশেষ কেউ বিশ্বাস করেনা।
দ্বিতীয় কারণ অবশ্য আরও টেকনিকাল এবং তাই, গভীর – প্লটের স্বল্পতা। মাথায় বুদ্ধি কম হলে যা হয়।
ফলতঃ গোরু – অর্থাৎ চারটে পা, একটি লেজ, নিরামিশাষী প্রাণী এবং মাথায় দুটো শিং আছে –তার মতো লিখতে শুরু করে, যাকে গোদা ভাষায় জাবর কাটা বললে বেড়ে শোনায় মাইরি।
বর্তমান লেখকের নিজের প্রতিভা সম্বন্ধে কোনো ভুল ধারণা নেই – তাই কালে কালে তার জ্ঞানের নাড়ি টনটনে হচ্ছে, যে জাবর কাটার দিন সমাগতপ্রায়। তাই গল্পের শুরুতে এমন একটা অধ্যায় লিখে ফেললাম, যার সাথে এই গল্পের স্থান,কাল,পাত্রের – সেরকম কোনো সম্পর্ক নেই।
কনটেকস্টটা বলেই ফেলা যাক। কারা কারা আইটিতে কাজ করেন হাত তুলুন। এবার যারা যারা কোলকাতার বাইরে সেটলড হাত নামিয়ে নিন। এবার যারা যারা বাকি আছেন, তাদের মধ্যে শিফটের কাজের সুখসাগরে নিমজ্জিত লাকি বাস্টার্ডরা (আহা রাগ করবেন না কথার কথা, আপনাদের আমি কত্তো ভালোবাসি।) হাত নামিয়ে হাতের অন্য ব্যবহার করতে পারেন।
এইবার যারা বাকি থাকলেন – সেই মায়ে খেদানো, বাপে তাড়ানোদের শোকে আসুন দু’মিনিট নীরবতা পালন করি।
...
ওভার (এই লাইনটা আপনি নিশ্চয় দুমিনিটের আগেই পড়ে ফেলেছেন, জানতাম ফাঁকি মারবেন)।
এই যে ক্ল্যানটা বাকি থেকে গেলো, এরা ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালান্স বস্তুটিকে মোটামুটি একদিকে হেলিয়ে চলছে বহুকাল। প্রোজেক্ট ডেভেলপমেন্ট হোক কি সাপোর্ট – এরা মোটামুটি সূর্যের সাথে সাথে অফিসবাস-শাটল ইত্যাদি চড়ে পূর্ব কোলকাতা শহরতলিতে পদার্পণ করে, আর বাড়ি ফেরে, না সূর্য ডোবার পরে নয় – পরদিন সূর্য ওঠার কয়েকঘন্টা আগে।
পার্থ এই আধুনিক ক্ষুদিরামদের একজন। আজকাল ওকে পাড়ায় লোক চেনেনা – কুকুররা চেনে, বাড়ি ফিরলে একমাত্র ওদের সাথেই দেখা হয় কিনা। পার্থ নিজেও ওর পাড়ার গল্পগুলো করতে গেলে ওই প্রথম অধ্যায়ের মতো ছোটোবেলার গল্প করে – কারণ ইদানীংকালের গল্পগুলো ও সাধারণতঃ দু-তিনদিন ল্যাগে জানতে পারে।
এই যেরকম সমীরকাকু মারা গেলো – দুদিন পর জানলো, নিজের মা মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিলো, সেটাও প্রায় দেড়দিন পর জেনেছিলো।
যাগগে এসব ভ্যান্তাড়া –কোনো এক বুধবার পার্থ রাত একটার সময় অফিস থেকে বেরোলো। প্রতি আইটি কোম্পানি যেহেতু হিউম্যান রিসোর্স ড্রিভেন হয় মূলতঃ তাই তাদের কয়েকটা বেসিক ডেকোরাম মানতে হয়। তার মধ্যে একটা হলো, শেষ অফিস বাস বেরিয়ে যাবার পর, কোনো এমপ্লয়ি বাড়ি ফিরতে চাইলে অফিসকে গাড়ির ব্যবস্থা করে দিতে হবে। সেটাকেই আইটির পরিভাষায় ক্যাবড্রপ বলে।
সেদিন সেরকমই একটা গাড়ি করে ফিরছিলো। পার্থর বাড়ি বেহালা পর্ণশ্রী, জোড়াপুকুর, গাড়িতে আর কেউ ছিলোনা, তাই সায়েন্স সিটির পরমা আইল্যান্ড থেকে ডানদিকে ঘুরে তপসিয়া-পার্কসার্কাস ফ্লাইওভার হয়েই ফিরছিলো।
কিন্তু পার্কসার্কাস ফ্লাইওভার অবধি আর পৌঁছোনো হলোনা। চার নম্বর ব্রিজে গাড়িটা উঠতেই ফটাস, ফিসসস এবং ফুসসস। নারায়ণ দেবনাথোচিতো এইসব শব্দবন্ধের সাবটাইটেল – গাড়ির টায়ার পাংচার হলো।
গাড়িতে এক্সট্রা টায়ার থাকে সবসময় – যন্ত্রপাতি শুদ্ধু। কিন্তু ব্রিজের ওপর রাত্তির দেড়টায় সাঁই সাঁই করে লরি যায়, সেখানে দাঁড়িয়ে টায়ার পালটানোটা একটু রিস্কি, তাই দু’জনে মিলে গাড়িটাকে ঠেলতে ঠেলতে একটা গলিতে ঢোকালো। যে বাড়িটার সামনে রাখলো, সেই বাড়িটা একটা ছোট্টো পুরোনো ভাঙা বাড়ি ছিলো, এখন ভেঙে ফ্ল্যাট হয়ে যাচ্ছে। মার্বেলের নেমপ্লেট তখনো ভাঙেনি। দেখা গেলো ভদ্রলোক পেশায় অ্যাডভোকেট – নামটা বেশ – নবকুমার দাশ, বৌয়ের নাম কপালকুন্ডলা আর শ্বশুড়ের নাম কাপালিক ছিলো কিনা জানা যায়নি।
পার্থর মোবাইলের ব্যাটারি টিমটিম করে জ্বলছিলো। মাকে একটা ফোন করে দিলো, যে দেরি হবে। মা-বাবা স্বাভাবিক নিয়মে চিন্তা করছিলো, পার্থ ঘুমোতে বললো ওদের, রাজি হলোনা। অবশেষে ঠিক হলো, পার্থ বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত কোলকাতার চারটি প্রাণী রাত জাগবে –পার্থ, বাবা, মা এবং ক্যাবড্রাইভার।

(৩)
- শোনোনা।
- বলুন স্যার।
- ব্যাস্ত হয়োনা।
- ব্যাস্ত হবোনা মানে স্যার?
- মানে গাড়ির টায়ার পাল্টাতে যেয়োনা এক্ষুণি।
- সে কি স্যার, বাড়ি ফিরতে লেট হয়ে যাবে তো।
- সে হোক গে।
- কিন্তু স্যার আমায় রিপোর্ট করতে হবে, আপনাকে ড্রপিং টাইম।
- তোমার কি আজ রাত্তিরে এরপর আর ড্রপ আছে?
- না স্যার রাত একটার ড্রপটাই লাস্ট।
- তাহলে আমি লিখে দেবো খন।
- কিন্তু স্যার আপনার বাড়ির লোক চিন্তা করবে।
- নতুন করে আর কি করবে? অনেকদিন ধরেই করছে।
- আমাকেও তো স্যার ফিরতে হবে।
- বিয়ে-থা হয়ে গেছে?
- না স্যার, এই বছর হবে। কথাবার্তা চলছে গ্রামে।
- তাহলে একদিন বাড়ি না ফিরলে কিছু হবেনা। দাঁড়াও আমি মাকে বলে দি। ফিরবো না অ্যাশিওর্যা ন্সটা পেয়েই জাগুক।
- কি বলবেন স্যার?
- বলবো তোমার গাড়ির একস্ট্রা টায়ারটার টিউবটা ফুটো।
- বদনাম দেবেন স্যার?
- তোমার নাম জানে আমার বাড়িতে?
- না স্যার।
- যার নাম নেই, তার বদনামের ভয় করতে নেই।
(৪)
পার্কসার্কাস, রাত্তির দেড়টা।
পার্কসার্কাস সোনাগাছি কি কালীঘাট নয় – এর কোনো গণিকাপল্লী নেই। নেহাৎ কনজার্ভেটিভ হা পুরোনো একটা অংশ কোলকাতার। তাই রাস্তায় কোনো জনপদবধূ এসে পসরা সাজায় না এসময়ে শহরের বেসামাল যৌনতা যাতে আরো কয়েকটা শ্লীলতাহানি করে না বসে। অবশ্য বলতে পারেন সেবাবদ তারা পয়সা পায়।
পার্কসার্কাসে বড়ো রাস্তাটা মেইনলি কমার্শিয়াল – হোটেল, রেস্টুরেন্টস, দোকান এবং একটি থানা সমৃদ্ধ অঞ্চল। কিন্তু চার নম্বর ব্রিজের থেকে নেমে বেশ কয়েকটা পুরোনো বাড়ি আছে। এগুলো লেখার অবশ্য কোনো কারণ নেই – কারণ রাত দেড়টার সময় সব বাড়িরই দরজা এবং সব দোকানেরই শাটার বন্ধ, উল্লিখিত মদের দোকানেরও।
কয়েকটা হাতে টানা রিকশা দাঁড় করানো আছে। কয়েকজন ভবঘুরে, যাদের শহর মিছিমিছি মাতাল বলে অপবাদ দেয় তারা ভ্রাম্যমাণ কিছু হোয়াইট নেমপ্লেটধারী প্রাইভেট কারকে হাত দেখিয়ে বাড়ি ফেরার চেষ্টা চালাচ্ছে। মিছিমিছি মাতাল, কারণ পেটে অ্যালকোহলের মাত্রা বেশি হলেই – কেউ মাতাল হয়না। মাতাল হওয়া একটা বহিঃপ্রকাশ, সেটা যে মানুষটা বাড়ি ফিরতে চায়, তার থেকে অনেক বেশি যে মানুষটা বাড়ির মানুষকে অপেক্ষায় রাখতে ভালোবাসে – সে।
এই হিসেবে একফোঁটা অ্যালকোহল ছাড়াই - আপাতত পার্ক সার্কাসের সবচেয়ে বড়ো মাতাল সম্ভবতঃ পার্থ।
(৫)
- কোথায় গ্রাম তোমার?
- বড়ো কাছারির কাছে।
- আমাদেরই ওদিকে, বেহালার থেকে তো বড়ো কাছারি কাছেই।
- হ্যাঁ স্যার।
- এক কাজ করবে?
- বলুন স্যার।
- চলো দু’জনে পায়ে হেঁটে এখান থেকে পার্ক সার্কাস ময়দান অবধি যাই।
- না স্যার।
- কেন?
- গাড়ি ছেড়ে যেতে পারবো না স্যার।
- গাড়ি লক করে যাবে।
- না স্যার।
- আচ্ছা তাহলে আরেকটা গল্প বলি শোনো।
- বলুন স্যার।
- বোকাবোকা গল্প কিন্তু।
- বোকাবোকা কেন স্যার?
- প্রেমের গল্প বলে। পৃথিবীতে প্রেমের মতো বোকাবোকা আর রিপিটেটিভ জিনিস আর কিছু আছে বলো? সেই মানুষ যখন ছুঁচোলো পাথর লাঠির মাথায় বেঁধে শিকারে বেরোতো তখন থেকে প্রেমে পড়ে যাচ্ছে। দুনিয়ায় শালা একটাও লোক নেই যে জীবনে একবারও প্রেমে পড়েনি। যারা বলে প্রেম করে বিয়ে করেনি, সম্বন্ধ করে করেছে – তারা আসলে এটা ভুলে যায় যে বহুবছর ধরে তারা এই অভ্যেসটা বহন করতে করতে একে অন্যের প্রেমে পড়ে গেছে। এতো ভ্যারাইটি জিনিসটার মধ্যে কিন্তু আল্টিমেটলি সেটা একটা বেসিক ইমোশন। তোমার নামটা কি?
- মোহন স্যার।
- বাহ। তো যাই হোক। সেই একটা ছেলে আর একটা মেয়ের গল্প। ছেলেটা মেয়েটাকে আকন্ঠ ভালোবাসে। আসলে নিজে তাই ভাবে। ভালোবাসা তো আসলে নিজেকে নিজে বিশ্বাস করানো – যে এই মানুষটার জন্য আমার যে ফিলিংটা, যে অনুভূতিটা আর কারো জন্য সমান নয়। আসলে তো ভালোবাসা কাউকে ছেড়ে না থাকতে পারার অভ্যেস। মানুষ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে নিজেকে – কারণ নিজেকে ছেড়ে কেউ থাকতে পারেনা।
- ভালো বলেছেন স্যার।
- হ্যাঁ তো এই ছেলেটা মেয়েটার বাড়ির সামনে দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকতে চায়, বাস-লরি-সাইকেল রিকশা সমৃদ্ধ গোটা কোলকাতা শহরটাকে অগ্রাহ্য করে। কোলকাতার প্রত্যেকটা গাড্ডা সমৃদ্ধ রাস্তার হোঁচট সাদার্ন এভিনিউয়ের মতো সুখে ভরাতে চায়।সাদার্ন এভিনিউ চেনো তো?
- ওই দেশপ্রিয় পার্কের দিকের রাস্তাটা?
- ঠিক। কি সুন্দর গাছওয়ালা রাস্তাটা না?
- হ্যাঁ স্যার গাড়ি চালিয়ে আরাম আছে গরম কালে।
- হ্যাঁ, ছেলেটা ওই রাস্তাটায় মেয়েটার সামনে একবার হাঁটু মুড়ে বসতে চায়?
- তারপর?
- তারপর পকেটে রাখা গড়িয়াহাট ফুটপাথ থেকে কেনা একটা নকলি রূপোর রিং মেয়েটার অনামিকায়, বাঁ হাতের অনামিকায় গুঁজে দিতে চায়। তার জন্য অবশ্য কোলকাতা ট্রাফিক পুলিশের সাথে একবার কথা বলে রাখতে হবে। কারণ ওই সময়টায়, ওই পাঁচ সাত সেকেন্ডে সাউথ কোলকাতায় কোনো গাড়ি চলবেনা।সব সিগনাল লাল হয়ে দপদপ করবে?
- ভয়ের মতো?
- হৃদয়ের মতো।
- আর মেয়েটার কথা বললেন না স্যার?
- মেয়েটার উপহারে অ্যালার্জি। ভালোবাসায় অনীহা। সাদার্ন এভিনিউতে সামনে দাঁড়াতে অগ্রাহ্য করা, ওর অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে। আসলে প্রেমে পড়াটা যেমন একটা অভ্যাস – প্রেমে ‘না’ বলাটাও তাই।
(৬)
রাত তিনটে থেকে শীতকালীন ভোর তখনো আরো একশো আশি মিনিট দূরে।
এইসময়টা নেড়ি কুকুরদের নাইট ডিউটি শেষ হয়ে যায়, বড়ো রাস্তাদের অবশ্য সেসব জানা থাকেনা। কিন্তু পাড়াগুলো, গলিগুলো, ডাস্টবিনগুলোর আশেপাশে নেড়িকুকুররা কুন্ডুলি পাকিয়ে শুয়ে থাকে। কখনো একা, কখনো সপ্রেমে-সপরিবারে।
হলুদ নেমপ্লেট ওয়ালা কিছু হলুদ অ্যাম্বাসেডারের ঘুম ভাঙে এই সময়টাতেই। কেউ ট্রেন ধরতে গেলে, কেউ হাসপাতাল যেতে চাইলে তাই শহর নিতান্ত অপারগ হয়না।
হুগলী নদী এবং তদসংলগ্ন সৌন্দর্যায়িত গঙ্গাতীর অবশ্য সব দেখে, সব জানে। বলতে চায়না বিশেষ কিছুই, শুধু ওই নেভির স্পিডবোটগুলোকে মাঝেমাঝে বলে ফেলে কে কোন রাত্তিরে নিজেদের মধ্যে ফোনে, এস-এম-এসে, ফেসবুক চ্যাটে ঝগড়া করে কুৎসিত রিক্ততায়। আর শেষে ‘আর এরকম বলবোনা’ বলে প্রিন্সেপঘাটের একাকীত্বে চুমু খায়, চারপাশ ভয়ে ভয়ে দেখে। সবুজ অ্যাপ্রন পড়া পার্কের কর্মীরা ঝাঁট দিতে দিতে হুগলীর সাথে এইসব দেখে কয়েকটা মুচকি হাসি চালাচালি করে।
কোলকাতা প্রেমকে স্পেস দেয়।
যৌনতা অবশ্য রাত তিনটের অপেক্ষায় থাকেনা কোনোকালেই। মোটামুটি রাত্তির একটা দুটোর মধ্যে অফিস ফিরতি অথবা গৃহকর্মেনিপুণা বেয়াকুবিনী বেডল্যাম্প নিভিয়ে বিবসনা হন – আর তারপর বেশিরভাগ বেয়াকুমের চটজলদি উপগত হওয়ার অভ্যেস সখেদে বরণ করে – শেষমেষ ঘুমিয়ে পড়েন।
বেয়াকুবেরা জানেও না, কলেজ লাইফে দেখা অধিকাংশ পর্ণোগ্রাফি এবং অগুণতি হস্তমৈথুন আসলে তাদের পুরুষকার কমিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।
কেউ কেউ অবশ্য এইসব সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে – মাঝে সাঝে।
কবিরা জাগে। কারণ কবিতার আসতে রাত হয়। যে মূহুর্তে সাদা কুয়াশা লেহন করে সাততলা অ্যাপার্টমেন্টের কাঁচের জানলা, চুপচাপ ঘাম ও দুঃখ জমে ভোররাতের জানলাগুলোয়, কবিতারা বেশিরভাগ দিন সেসময়ই আসে। অবশ্য এসব ফেসবুক কবিদের গভীর গোপন ইস্তেহার – কোনো বড়ো ম্যাগাজিন এদের খবর রাখেনা।
প্রেম হতে চায় শহর কোলকাতা – কিন্তু অভ্যেসবশতঃ নিজেকে বারবার না বলে ফেলে।
(৭)
- এবার আমি একটা গল্প বলবো স্যার?
- বলো। আমি একা একাই বকে যাচ্ছি।
- এটাও স্যার বোকাবোকা গল্পই।
- সে কি তুমি যে বললে তোমার বিয়ের কথাবার্তা চলছে?
- আগের গল্পটা তাহলে আপনারই ছিলো স্যার?
- এটা বোকাবোকা প্রশ্ন।
- জয়ন্তী আমার সাথে প্রাথমিক ইস্কুলে একসাথে পড়তো। আপনাদের মতো বড়োসড়ো সাজানো গোজানো ইস্কুল নয় স্যার আমাদের ওদিকটায়। এমনও হয়েছে, আমার বাবা ধানকাটার সময় ইস্কুলে এসে আমাকে নিয়ে চলে গেছে।জয়ন্তীর বাবা অবশ্য চাষবাস করতো না। প্রাথমিক চিকিৎসালয়ে কাজ করতো, একটা মাসমাইনে ছিলো।
- তারপর?
- বিশেষ কিছুই হয়নি স্যার। ওই একসাথে একবার চিরঞ্জিতের একটা বই দেখতে গিয়েছিলাম। হঠাৎ দেখি কানের পাশে গরম নিশ্বাস। জয়ন্তী সামনে ঝুঁকে আছে ঠোঁট এগিয়ে – আমার ঠিক সাহস হলোনা।
- তারপর?
- আমি শহরে চলে এলাম। ড্রাইভিং শিখলাম। ট্যাক্সি দিয়ে শুরু করেছিলাম, আঠেরো হয়নি তখনো। এখন তো দেখতেই পাচ্ছেন।
- ধ্যাত গল্প শেষ হয়ে গেলো তো।
- না স্যার একটু বাকি আছে।
- বলে ফেলো।
- পাপিয়া, জয়ন্তীর বোন, তার সাথেই আমার বিয়ের সম্বন্ধ চলছে। জয়ন্তীই ওর বাবাকে চাপ দিয়ে কথাটা পাড়িয়েছে।
- তারপর?
- তারপর থেকে আর আমার গ্রামে ফিরতে ইচ্ছে করেনা।
(৮)
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শুরুর আগে গান্ডীবী যখন বিহ্বল হয়েছিলেন কৃষ্ণ একমাঠ অডিয়েন্সের সামনে তেড়ে জ্ঞান দিয়েছিলেন তাঁকে – আজন্ম ছকবাজের এইরূপ বোধি দেখে কপিধ্বজের ওপরে বসা বাঁদরের মূর্তিটাও চোখ পিটপিট করে চেয়েছিলো বোধহয়।
তবে আর্যরা একটু বেশি বকতেন (আমার মতো, তবে ভাববেন না নিজেকে আর্য বলে ক্লেইম করছি, ওই ভুল মহামতি অ্যাডলফ হিটলারের পর কেউ করে? রামোঃ)- কয়েকটা সাদা সত্যি কথা বলতে চারখানা বেদ। কয়েকটা বেসিক লাইফস্কিল শেখাতে আস্ত শ্রীমদ্ভগবতগীতা।
আর এতো কথার মধ্যে আসল কথাটাই বেদব্যাস মিস করে গেলেন – সম্ভবতঃ সেই কারণেই ম্যান বুকারটা পেতে পেতেও পাননি।
দেখুন অর্জুনকে জ্ঞান দিতে তো কুরুবংশে লোকের অভাব ছিলোনা – বড়ো দাদা, দাদু, অস্ত্রশিক্ষাগুরু, মায় নিজের বিয়ে করা বউ – সবাই জ্ঞানের পর্বত পর্বতী ছিলেন। কিন্তু অর্জুন শেষমেষ কৃষ্ণের কথাই শুনলেন।
কেন?
যদি বলি দু’জনেই ঠিকঠাক প্রেমে পড়েছেন বলে কয়েকবার। কৃষ্ণ তো নিজের লাভলাইফটাকে পুরো প্রেমের বাইবেল বানিয়ে দিয়ে গেছেন। বৈষ্ণব কবিরা সেসব দেখেশুনে পূর্বরাগ-অনুরাগ কপচিয়ে বেহেস্তে গেলেন।
অর্জুনেরও কিন্তু ট্র্যাকরেকর্ড খারাপ নয়। বনবাসে গেলেন দাদার বকুনি খেয়ে, একাধিক বিয়ে নামিয়ে দিলেন চট করে। এরম আহ্লাদের বনবাস আজকাল কেন যে হয়না তা নিয়ে একটা সেমিনার হওয়া উচিৎ অবিলম্বে।
আসলে প্রেমিকের ক্ষুধা-দুঃখ-কষ্ট-বিহ্ব লতা বুঝতে বিশেষ কিছু না, প্রেমিক হতে হয়।মহাভারতে পারফেক্ট লুচ্চা কিন্তু কৃষ্ণার্জুন ছাড়া বিরল।
ভোর চারটে, আকাশটার প্রগাঢ় কৃষ্ণা রূপ তখন ঈষৎ ছায়াভ।
পার্থ ঠিক করলো বাড়ি যাবে। এই দাঁড় করানো রিকশা, হঠাৎ মাতাল, বন্ধ শাটার, পুরোনো এবং নতুন অট্টালিকার অক্ষৌহিণী পেরিয়ে গিয়ে তেত্রিশতম প্রেমপত্র লিখবে, ব্যর্থই হবে মোস্ট প্রবাবলি।
কিন্তু যাবার রাস্তাটা একটু ঘুরে যাবে। পার্ক সার্কাস থেকে পার্ক স্ট্রীট হয়ে, ইডেনের পাশ দিয়ে, বাবুঘাটের সামনে দিয়ে যাবে। কোলকাতার সূর্য কিন্তু ওঠে হাওড়া ব্রিজের পেছন থেকে, অস্ত যায় বিদ্যাসাগর সেতুর পিছনে।
হুগলী নদীতে সূর্যোদয় দেখা হয়নি কোনোদিন।

আপনার মতামত জানান