ফেসবুকীয়

কেয়া মুখোপাধ্যায়

ছবি- বিক্রমাদিত্য গুহ রায়

দৃশ্য ১।
ইন্সটিট্যুট থেকে বেরিয়ে ছয় আর বারো নম্বর লাইনের কমন মেট্রো স্টেশন পাস্তুর-এ ঢোকার মুখটায় দাঁড়িয়েছিল রাই। দীপ্তর জন্য অপেক্ষা করছিল। মেসেজ টোন শুনে ফোনটা চেক করল। 'একটু আটকে গেছি। দেরি হবে। তুমি বাড়ি পৌঁছে যাও।' এটা নতুন নয়। প্রায়ই হয়। দীপ্ত নেকার ইনফ্যান্ট হসপিটাল এর ডাক্তার। ইমার্জেন্সিতে আটকে পড়ে মাঝে মাঝেই। অগত্যা রাই নীচে নেমে গেল মেট্রো ধরতে।

দৃশ্য ২।
অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে চেঞ্জ করে অপেক্ষা করছিল রাই। সময় কাটাতে ফেসবুকে লগ ইন করল। একটা পোক, ক্রিমিন্যাল কেস খেলার দুটো ইনভিটেশন, মিউচুয়াল ফ্রেন্ড ছাড়াই তিন তিনটে উটকো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আর পেজ লাইক করার একটা ইনভিটেশন দেখে বিরক্তিতে সাইন আউট করার সময় হঠাৎ একটা পোস্টে চোখ আটকে গেল। বিবিদি লাইক করার রাইয়ের হোম পেজ-এ এসেছে। পাবলিক পোস্ট। পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামের এক স্কুলের মাস্টারমশাইয়ের লেখা। একেবারে নি:স্ব কয়েকটি পরিবার থেকে আসা তিনটি ছেলে কিভাবে প্রথম বিভাগে পাশ করে সবার মুখ উজ্জ্বল করেছে সেসব কথা। সেইসঙ্গে কীভাবে এই মাস্টারমশাই আর স্কুলের অন্যরাও তাদের পাশে থেকেছেন; বই-খাতা, জামা-কাপড় থেকে শুরু করে পড়া দেখিয়ে দিয়ে সাহায্য করেছেন, তারও সংক্ষিপ্ত বিবরণ। পড়তে পড়তে চোখ ভিজে গেল রাইয়ের। ভাগ্যিস দীপ্ত নেই। থাকলেই খ্যাপাত তাকে। এমনিতে যতই স্মার্ট হোক, এইসব খবর তার মন বড় দুর্বল করে দেয়। দু’বার পড়ল পোস্টটা। তারপর তাদের বেঙ্গলি আসোসিয়েশনের পেজ-এ শেয়ার করল। পোস্ট-এ কমেন্ট করা যাবে না। ভদ্রলোকের প্রোফাইলে গিয়ে দু’-লাইন লিখল রাই। সাধুবাদ জানাল এই উদ্যোগকে। সাইন আউট করে ঘড়িটা দেখল। এবার দীপ্ত এসে পড়বে নিশ্চয়ই।

দৃশ্য ৩।
-ইমার্জেন্সি ছিল?
-একটা প্রীমি বেবির বাড়ি চলে যাবার কথা ছিল আজ। ভালোই ছিল ইনকিউবেটরের বাইরে। হঠাৎ রেস্পিরেটরি ট্রাবল শুরু হল বিকেলে।
-এখন ভাল আছে?
-হ্যাঁ..তবে আরও দু’দিন দেখে ছাড়া হবে। তুমি কি করলে ফিরে এসে?
-আমার কিচেনে যেতে ইচ্ছে করছিল না।
-যাওয়ার কথাও নয়। আমি ফিরলে এক সঙ্গে করার কথা তো, নাকি...
পেছন থেকে রাইকে জড়িয়ে ধরে গালটা রাইয়ের গালে ঘষতে থাকে দীপ্ত।
-চল বাইরে খেয়ে আসি আজ। রেডি হও তাড়াতাড়ি।
-না ছাড়লে রেডি হব কি করে?
দীপ্ত একটু বাঁধন আলগা করতেই রাই পালাতে গেল। আবার আটকে দিল দীপ্ত। বার কয়েক এরকম চলার পর ছাড়া পেল রাই। কিন্তু যেতে গিয়ে আবার থমকে গেল।
-কী হল?
-জানো আজ একটা লেখা পড়ে না খুব মন খারাপ।
-কী লেখা?
-একটা পোস্ট লিখেছেন এক মাস্টারমশাই..
-ওহ! ফেসবুক!
-হ্যাঁ ফেসবুক। তাতে কি? ঘটনাটা তো সত্যি।
-শুনব। ডিটেলে শুনব। গিয়ে অ্যাপেটাইজারটা অর্ডার করে দিয়ে, কেমন? প্লিইজ! ভীষণ খিদে পেয়েছে।

দৃশ্য ৪।
-আমরা এদের জন্য কিছু করতে পারি না?
বেঙ্গলি আসোসিয়েশনের পেজ-এ শেয়ার করা পোস্টটা পড়ার পর ফোনটা টেবিলে নামিয়ে রাখল দীপ্ত আর তখনই কথাটা জিজ্ঞেস করল রাই।
-কি করার কথা বলছ? ডোনেট করা?
-ঠিক পারসোন্যালি হয়তো নয়। আমাদের অ্যাসোসিয়েশন থেকে যদি কিছু করা যায়?
-এদেরকেই কেন? এরকম স্কুল কি দেশে একটা?
-কি আশ্চর্য! কারণ এটা আমরা জানি, তাই।
-কী জান? কতটুকু জান? কাকে জান?
-এরকম করে বলছ কেন?
-আহা! আমি কি তোমাকে বলছি? এগুলো তোমাকে অ্যাসোসিয়েশন জিজ্ঞেস করবে। সেই মত ভেবে বল।
-জানি না অতশত। এটা জেনুইন ব্যাপার, ব্যস। সেবার যখন তুমি যখন সমরেশ মজুমদারের লেখা পড়ে পুরুলিয়াতে যাবে বললে তখন কি আমি এত...
-আরে দাঁড়াও দাঁড়াও। তুমি কি কমল চক্রবর্তীর ভালোপাহাড় আর তার স্কুলের সঙ্গে এই ইন্সিডেন্টটার তুলনা করছ? আর আমি বললাম মানে? লেখাটা দুজনে মিলে একসঙ্গে বসে পড়ছিলাম একটা রোববার। ওখানে যাবার ডিসিশনও এক সঙ্গে নিয়েছিলাম রাই।
দীপ্তর হাতের ওপর হাতটা রাখল রাই। গাঢ় গলায় বলল,
-আমি ওভাবে বলিনি দীপ!
-ঠিক আছে, তুমি আর কি কি ডিটেল পাও দেখো। অ্যাসোসিয়েশনের নেক্সট মিটিংয়ে আমরা কথা বলব না হয়, ম্যাডাম।
-লাভ ইউ দীপ।
-লাভ ইউ টু, সোনা।

দৃশ্য ৫।
ফিরে এসে পরের দিনের স্কেডিউলটা চেক করছিল দীপ্ত। মিউজিক সিস্টেমটা অন করে এসে সোফায় আরাম করে বসল রাই। ফেসবুকে সাইন ইন করল আইপ্যাড থেকে। ইনবক্সে তিনটে মেসেজ, একটা নতুন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। মেসেজ তিনটের মধ্যে একটা নীতিশ দত্তর। পুরুলিয়ার সেই স্কুলের মাস্টারমশাই। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটাও ওঁর। লিখেছেন, ‘অনেক ধন্যবাদ রাই, আমি বন্ধুত্বের অনুরোধ জানালাম।’
-দীপ...
-হুঁ...
-হয়েছে তোমার?
-আর জাস্ট দশ মিনিট।
-শোন, ওই মাস্টারমশাই একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছেন। কী করব?
-কি করবে মানে? এ তো তোমার ব্যাপার। আমি কি কোনওদিন এসবে ইন্টারফেয়ার করেছি?
-আচ্ছা।
ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটা অ্যাকসেপ্ট করল রাই। সঙ্গে তিন লাইন লিখে দিল। ‘হাজার প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে যেভাবে আপনাদের স্কুলের ছাত্ররা জয়ী হয়েছে, তার পিছনে আপনাদের অসামান্য অবদান। অনেক দূরে থাকি। দেশে গেলে আপনাদের স্কুলে যাওয়ার আর সম্ভব হলে ছাত্রদের জন্যে কিছু করার খুব ইচ্ছে রইল।’
ভীষণ ঘুম পাচ্ছিল। সাইন আউট করল রাই।

দৃশ্য ৬।
সকালবেলা উঠে দম ফেলার সময় থাকে না। রাই আর দীপ্ত একসঙ্গেই বেরোয় সপ্তাহের পাঁচ দিন, শুধু বুধবার ছাড়া। বুধবার দীপ্তর মেডিক্যাল গ্র্যান্ড রাউন্ড অ্যাটেন্ড করার থাকে। সেমিনার শুরু সকাল সাতটায়। দীপ্ত সাড়ে ছ’টায় বেরিয়ে যায়। সেদিন এক ঘন্টা রিল্যাক্স করতে পারে রাই। মাইক্রোওয়েভে দুধটা গরম করতে দিয়ে সিরিয়ালের বোলটা টেবিলের ওপর রাখল। ফেসবুকে সাইন ইন করতেই গুচ্ছের নোটিফিকেশন। ঊনচল্লিশটা। প্রায় আঁতকে উঠল রাই। হলটা কি! ক’দিন তো পোস্টও করেনি কিছু! নোটিফিকেশন আইকনে ক্লিক করে দেখল পর পর ‘নীতিশ দত্ত লাইকস ইয়োর পিকচার!’ মনে মনে হেসেই ফেলল রাই। নতুন কেউ বন্ধু হলে তার টাইমলাইনটা অনেকেই দেখে; তবে এত খুঁজে খুঁজে ছবিতে লাইক! একটা বিরাট লম্বা মেসেজও আছে দেখতে পায়। পড়ার সময় নেই। তাই কোন রকমে সিরিয়াল গিলে উর্ধশ্বাসে ছুটল রাই।

দৃশ্য ৭।
'সোনা বোন,’ ধাক্কা খেল রাই। ভুরুটা কোঁচকাল একটু। সেভাবে পরিচয়ই নেই, অথচ একেবারে ‘সোনা বোন’ এবং 'তুমি!'
‘ভাবতে যে কি আশ্চর্য শিহরণ হচ্ছে যে শিল্পকলার ফরাসী শহর সুদূর প্যারিস থেকে আমার সোনা বোনের লেখা ভেসে এল আমার স্ক্রীনে। প্যারিস মানে মোনালিসার শহর। মোনালিসা কি শুধু এক সুন্দরী নারী? মোনালিসা মানে সুন্দর মনের এক নারী। যে মন আমার সোনা বোনেরও আছে। তাই সে বলেছে সে আসবে। সে এলে হেঁটে যাব দু’জনে পাশাপাশি। সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে। শিশুদের মনে বুনে দেব স্বপ্ন…’
এভাবেই কি এই ভদ্রলোক কথা বলেন সবার সঙ্গে? এত উচ্ছ্বাস নিয়ে? এত আবেগ নিয়ে? ভীষণ বাড়াবাড়ি না এটা! একটু অস্বস্তি হল রাইয়ের্। উত্তর দিল না তক্ষুণি। পুরোন পোস্টটা আবার শেয়ার করেছেন ভদ্রলোক। বিবিদি আবারও লাইক করেছে। রাই-ও লাইক করে উদ্যোগের প্রশংসা করল দু’লাইনে। তার কলিগ সোফি একটা দরকারী পেপার শেয়ার করেছে তার সঙ্গে, সেটা দেখতে যাবে রাই, হঠাৎ নোটিফিকেশন এল। তার কমেন্টটা লাইক করেছেন নীতিশ দত্ত। পেপারটা ডাউনলোড করে নিতে না নিতেই আবার নোটিফিকেশন। ভদ্রলোক কমেন্ট করেছেন। এরমধ্যেই! তার দু’ লাইনের উত্তরে বিরাট এক প্যারাগ্রাফ। চোখ বুলিয়ে লাইক ক্লিক করে সাইন আউট করতে যেতেই মেসেজ আসে ইনবক্সে। নীতিশ দত্ত। আবার! পরে পড়বে। সাইন আউট করে দিল রাই।

দৃশ্য ৮।
রু গে-লুসাক-এর লা বুলাজঁ ক্যাফের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল দীপ্ত। রাই পৌঁছে গেল।
-বাইরে বসবে তো?
-ভেতরে কোনওদিন বসলামই না সত্যি!
হেসে ফেলল রাই।
রাইয়ের চেয়ারটা টেনে দিয়ে বসতে হেল্প করে পাশের চেয়ারটায় বসে দীপ্ত।
-থ্যাঙ্ক ইউ ডক।
কোন কথা না বলে রাইকে কাছে টেনে নিয়ে একটা চুমু খেল দীপ্ত।
-কী হল হঠাৎ? এত প্যাশন? কলকাতা হলে পারতে?
-হোয়েন ইউ আর ইন রোম..
রাই যোগ দিল-
-ডু আজ দ্য রোম্যানস ডু!
দু’জনেই হেসে ওঠে। দীপ্তর গলা জড়িয়ে চুমু দিল রাই।
-খুব সুন্দর লিখেছ।
-কী গো?
-ওই যে এডুকেশন্যাল সিনারিও ইন বেঙ্গল নিয়ে যেটা লিখছ।
-ফেসবুকে? তুমি পড়েছ?
-পড়লাম আজকেরটা। আগের দু’ সপ্তাহেরও।
-তুমি এত ইরেগুলার ফেসবুকে আর লাইক কি কমেন্টও তো কর না; তাই না বললে বুঝতেই পারি না যে পড়ছ।
-যার কলম, কিংবা যার কি-প্যাড- সেই মানুষটার সব কিছুই তো লাইক করি। সেটা আলাদা করে ফেসবুকে জানাতে হয় বুঝি?
আবার রাইকে কাছে টেনে নিল দীপ্ত। দীপ্তর কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল রাই।
-কিন্তু...তোমার এই লাইক দাদা তো চিন্তায় ফেললেন!
-লাইক দাদা? মানে?
-হুম। লাইক দাদা। আমার কয়েনেজ। যা লেখো, যা ছবি দা্‌ও, যা কমেন্ট কর, ইভন অন্য লোকের পোস্ট-এ তুমি লিখলেও এই নীতিশ দত্ত হাজির! লাইক করবেনই। পাল্টা কমেন্ট করবেনই তোমার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে। স্কুলে পড়ান তো সত্যি? এত সময় পান কখন? এই জন্যেই লাটে উঠেছে পড়াশোনা সব।
-অ্যামেজিং দীপ!
-কী?
-তুমি এতসব জানলে কি করে?
-আমরা দু’জনে দু’জনের ক্লোজ ফ্রেন্ড-এ আছি না? ক্লোজ ফ্রেন্ড-এ ক্লিক করলেই তোমার পোস্ট কি কমেন্ট সব দেখতে পাই পর পর, আর সেখানে অবধারিত ভাবে হাজির এই নীতিশ দত্ত। আজ অনেকদিন পরে তোমার টাইমলাইনটাও দেখছিলাম, তখন চোখে পড়ল। নতুন প্রোফাইল পিকচার-এ কমেন্ট ‘খুব খুব খুব মিষ্টি লাগছে তোমাকে।’ তিন বার ‘খুব’ বলার দরকার ছিল কি? কিছুই না, জাস্ট বি কেয়ারফুল রাই।

দৃশ্য ৯।
লাঞ্চ ব্রেকে বিবিদির লাইক করা একটা পোস্ট চোখে পড়ল রাইয়ের।
“স্বপ্ন নাকি মায়া নাকি মতিভ্রম এ আমার
তোমায় নিয়ে দেখতে গেছি নাটক পশুখামার
পশুখামার! মঞ্চে দেখব জ্যান্ত পশু, সাচ্চা
হায়রে কপাল, এ যে দেখি সব মানুষের বাচ্চা
ভাবছি মনে কাঁধের জোন-এ কেন নরম চাপ
তাকিয়ে দেখি ঘুমিয়ে কাদা তুমি আরিব্বাপ
থার্ড রোয়ে বসে মুদিত চক্ষু এ যে ঘোর কলিকাল
আঁচল গেছে সরে কি বিপজ্জনক হাল
আলতো করে ঢেকে দেব? চাই না কারো চোখ
বসে অপাঙ্গে গিলুক তোমায়, বাড়িয়ে আমার শোক
নাটক দেখা উঠল মাথায় এ কি জ্বালাতন
হৃদ-আকাশে চিন্তার ঝড় টাইফুন সাইক্লোন
হঠাৎ যেন মঞ্চ থেকে জলোচ্ছ্বাস এসে
ভাসিয়ে দিল তোমায় আমায় সব্বাইকে শেষে
সবাই ঝুপুস! ব্যতিব্যস্ত নিজেকে সামলাতে
ফার্স্ট রো লাস্ট রো নেই কোন ভেদ মন্ত্রীতে আমলাতে
ভাবতে পার ভেজা চুলেও পড়ল হ্যাঁচকা টান
মায়া না মতিভ্রম না স্বপ্ন ভেঙ্গে খান খান
বিভ্রান্ত আমি খুঁজে পাই না কোন দিশা
ভরসা শুধু সঙ্গে আছে সোনা মোনালিসা
নিবাসটি যার বহু দূরের শিল্পকলার ভূমি
সবার অলক্ষ্যে যে আমায় নিভৃতে যায় চুমি
জানি নি না সে কি সে পটু, অঙ্কনে রন্ধনে
শুধু বুঝি জড়ায় আমায় নিবিড় বন্ধনে
আসবে সে- কথা দেওয়ার পরে দিন আসে দিন যায়
দর্শনে তার ধন্য হব, আছি প্রতীক্ষায়।”

এটা কী? এ কি কবিতা? প্রেমের কবিতা? কাকে উদ্দেশ্য করে বলা? একজনকে না একাধিক? সোনা মোনালিসা! যাচ্চলে! সব কি রকম গুলিয়ে যায় রাইয়ের। লেখক সেই নীতিশ দত্ত। কালকের মেসেজটা দেখা হয়নি খুলে। ইনবক্সে ক্লিক করে মেসেজটায়। আবারও বিশাল উচ্ছ্বাস নিয়ে লেখা- ‘কী ভীষণ উদ্বিগ্ন যে ছিলাম কাল! একবারও তোমাকে দেখলাম না ফেসবুকে। রাতে ঘুমোতে পারিনি সেই চিন্তায়। তুমি ভাল আছ তো সোনা বোন আমার? তুমি যে কবে আসবে, কবে দেখা হবে তার দিন গুনছি, সোনা বোন।’
কি মুশকিল! সে দিব্যি আছে, বহাল তবিয়তে আছে, খামোখা খারাপ থাকতে যাবে কেন! এই স্বতঃপ্রণোদিত আহ্লাদী ভাব দেখে গলে যাবার বদলে মনের মধ্যে একটা খচখচানি শুরু হল রাইয়ের।
মিতিল ডিসপ্লে পিকচার চেঞ্জ করেছে। নতুন ছবি এল। কমেন্ট লিখে সাইন আউট করার মুখে আবার মেসেজ। ‘আজকের লেখাটা দেখার সময় হয়েছে সোনা বোন? বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, ওটা তোমাকে ভেবে লেখা। তুমি যখন ঘুমিয়েছিলে আর গা থেকে আঁচল সরে যাওয়াতে শীতে কাঁপছিলে, তখন আমি সেই আঁচল টেনে দিলাম।’ এবার ভীষণ অসহ্য লাগল রাইয়ের। এই গায়ে-পড়া ভাব একদম ভাল লাগে না তার কোনকালেই। আর এসব কী কথা! যত্তসব ঝামেলা, বলে ফেসবুক বন্ধ করে দিয়ে কাজে ফিরে গেল রাই।

দৃশ্য ১০।
-এটা পড়ো।
-কী এটা? এনিথিং স্পেশ্যাল?
-দেখোই না পড়ে। ঘুমোবার আগে সোফায় বসে রোজের মত চ্যানেল সার্ফিং করছিল দীপ্ত। রাই আইপ্যাডটা বাড়িয়ে দিল।
-এ কি কবিতা? বুলশিট। স্যরি টু সে রাই, তোমার টেস্ট এইরকম খারাপ কোনওদিন ছিল না।
-আরে আমি কি লাইক করেছি নাকি?
-এই জন্যেই আমি ফেসবুক নিয়ে বিরক্ত। গয়লাকেও কবি বানিয়ে তুলল!
-সে আবার কি? কেউ গয়লা বলে কি কবিতা লিখতে পারবে না?
-তা নয়। এই হঠাৎ করে কবি ভাব চাগিয়ে ওঠাটাই অদ্ভুত। খাচ্ছিলো তাঁতি তাঁত বুনে…
যাক গে। বাদ দাও। এই নিয়ে বাজে বকে আমাদের সময়টা বরবাদ করে লাভ নেই।
রাইয়ের কাছে ঘন হয়ে আসে দীপ্ত। ঘাড়ে একটা চুমু খায়।
দীপ্তর কাঁধে মাথা রেখে বলল রাই,
-আর একটা কথা আছে।
-কী?
-নীতিশ দত্ত লিখেছে এইটা নাকি আমাকে ভেবে লেখা।
-কি?
প্রায় ছিটকে সোজা হয়ে বসে দীপ্ত ।
-হোয়াট ননসেন্স ইজ দ্যাট? আর লিখেছে মানে? কোথায় লিখেছে?
-ইনবক্সে। দেখবে?
-না। ওইসব ট্র্যাশ আমি দেখতে চাই না। তুমি কী বললে?
-কিচ্ছু না। ইগনোর করেছি।
-ব্যস। এই নিয়ে আর কোনও কথা নয় এখন। এই সময়টা শুধু আমাদের।

দৃশ্য ১১।
গভীর আদরের পর দীপ্তর চওড়া বুকে মুখ গুঁজে শুয়েছিল রাই।
-রাই?
-উম্!
-সেদিন তোমাকে একটা কথা বলিনি। তখন বললে হয়তো খারাপ লাগতো তোমার…সবে পড়েছ লেখাটা…
-কী কথা? কী বলনি?
-সমরেশদা লেখাটা লিখেছিলেন একটা প্রথম সারির কাগজের রোববারের সাপ্লিমেন্ট-এ। নিজের কলামে। কাগজটার সার্কুলেশন দিনে অন্তত দু’-তিন লাখ। অনলাইন পড়েন আরোও কয়েক লাখ মানুষ। তার সঙ্গে একটা ফেসবুক পোস্ট এর কোনও তুলনাই চলে না। ফ্রেন্ড লিস্টে কত লোক থাকবে? পাঁচ হাজার খুব বেশি হলে? তাছাড়া কোথায় সমরেশ মজুমদার আর কোথায় এই নীতিশ দত্ত।
-অ্যাই দীপ! আমাকে বারণ করে তুমি নিজে এখনও ওই সব ভাবছ?
-এখনও নয়। এখনই। হঠাৎ মনে এল কথাটা। ওঁর লেখার উদ্দেশ্য ছিল একটা ভাল প্রচেষ্টাকে সামনে নিয়ে আসা। যাতে আরো লোকে জানতে পারেন, পাশে দাঁড়াতে পারেন, হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন। উনি নিজে দেখে এসেছেন একাধিক বার। একজন ডেডিকেটেড মানুষ প্রায় একার চেষ্টাতে কী করেছেন পিছিয়ে থাকা মানুষদের জন্যে, শিশুদের জন্যে, পরিবেশের জন্যে। বান্দোয়ানের কাছে ওইরকম একটা প্রতিকূল জায়গায়। আমরাও গেছি। দেখেছি সব। এর সঙ্গে নীতিশ দত্ত-র পোস্টের তফাৎ কোথায় জান? ওই লোকটা নিজেকে সেল করছে। মার্কেটিং করছে।
-সেল করছে?
-ইয়েস। আমি পোস্টটা আবার পড়েছি রাই। ওটা আত্মপ্রচার। একটু পালিশ আছে। তাই চট করে বোঝা যায় না। কমেন্টগুলো পড়ে দেখ। সবাই মাথায় তুলছে। ভাবটা এমন, যেন উনি ভগবান। এইটাই চান উনি। কাইন্ড অফ নার্সিসিজম। নিজেকে খুব ভালবাসেন। নিজের প্রশংসা শুনতে চান। পাব্লিসিটি চান। ওখানে বাকি কলিগদের নাম দিয়েছেন কি উনি? দেন নি। ইন ফ্যাক্ট, আরো কয়েকটা পোস্ট পড়লাম লোকটার। সবগুলোই কায়দা করে নিজের প্রচার।
-এই সময়টা শুধু আমাদের। অন্য কাউকে নিয়ে এখন এত কথা বলার দরকার নেই দীপ।
আদুরে গলায় বলল রাই।
-বলতে চাই না তো সোনা। কিন্তু তুমি অডাসিটিটা ভাব, তোমার আঁচল সরে যাওয়াতে উনি ঠিক করে দিচ্ছেন। কেন? স্বপ্নে আমাকে দেখা যায় না তোমার পাশে? তারপর, ‘নিভৃতে যায় চুমি!’ হাউ ডেয়ার হি সে দ্যাট! এইটাই তো খুব গন্ডগোলের।
-থাক না দীপ। এখন আর কারো কথা ভাল্লাগছে না একদম।
-জানি। আমারো লাগছে না। তবে এঁদের ভরসা নেই। আবার কবে কী লিখবেন তোমাকে। খারাপ লাগবে। মেলাতে বসবে তুমি- একজন মাস্টারমশাই কেন এই রকম হবেন, কেন এই রকম বলবেন, কেন এই কথা লিখবেন এটসেট্রা এটসেট্রা। তোমাকে চিনি তো। তাই আগে থেকে বলে রাখছি।

দৃশ্য ১২।
আগের মেসেজ-এর উত্তর দেয়নি রাই। তাই আবার মেসেজ নীতিশ দত্তর। 'ভীষণ ভীষণ চিন্তার মধ্যে আছি সোনা বোন! তুমি ভাল আছ তো!'
বিবিদিও টিচার কলকাতায়। ইনি বিবিদির ফেসবুক ফ্রেন্ড। বিবিদির সঙ্গেও কি এইরকম করে কথা বলেন? এর মধ্যে আরোও কিছু ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসেছিল। নীতিশ দত্ত আর বিবিদি সেখানে মিউচুয়াল ফ্রেন্ড। আর কাউকে নিয়ে কখনো এত ভাবতে হয়নি। আদৌ ভাবতেই হয়নি কোনোদিন। এই ভদ্রলোক যেন অপেক্ষা করে থাকেন। রাই কোথাও কিছু লিখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে ঝড়ের বেগে লাইক। আবার নিজেও লেখেন। রাইয়ের লেখা নিয়ে গদগদ। রাইয়ের এক একটা পোস্ট-এ তিন চার বার কমেন্ট করেন। আরও একটা নতুন ব্যাপার খেয়াল করেছে রাই। তার ফ্রেন্ডলিস্টে নতুন অ্যাড হওয়া একটি মেয়ে, অনেক সময় রাই পড়ে লাইক কি কমেন্ট করার আগেই নীতিশ দত্তের সব কমেন্ট লাইক করে ফেলে। কে এ? নীতিশের ভক্ত? অ্যাডমায়ারার? হবে হয়তো! এত ভাবার সময় নেই। ‘ভালো আছি। কাজের খুব চাপ এখন;’ লিখে সেন্ড-এ ক্লিক করে উঠে পড়ল রাই।

এর দু’ সপ্তাহ পর
-----------
দৃশ্য ১৩
ঈশিতাদি দেশে গেছে তিন সপ্তাহের জন্য। অরিন্দমদা একা। অরিন্দম দীপ্তর কলিগ। কার্ডিওলজিস্ট। অরিন্দমদাকে রাত্তিরে খেতে বলেছে দীপ্ত আর রাই। সাড়ে ছ’টা নাগাদ দুটো ওয়াইনের বোতল নিয়ে ঢুকলো অরিন্দমদা।
-আবার দুটো কেন?
-একটা তোর বউয়ের আর একটা তোর। রেড, হোয়াইট দু’রকমই হোক।
-ফিশ ফ্রাইগুলো রেডি। দিয়ে দিই?
রাই জিজ্ঞেস করল।
-তুমি বোস। আমি বের করছি।
দীপ্ত আভেন থেকে বের করতে গেল ফিশ ফ্রাইগুলো।
-কি রে! দীপ্তর ফোনে ফেসবুক খোলা! ওর তো এই রোগ ছিল না! কেসটা কী?
রাইকে জিজ্ঞেস করল অরিন্দমদা।
-দেখিস, দীপ্ত আবার প্রেম ট্রেম করছে না তো?
রাই হেসে ফেলল,
-না বোধহয়। বউকে পাহারা দিচ্ছে।
দীপ্ত এসে দাঁড়াল।
-ঠিক অরিনদা। আগে সপ্তাহে একবার দেখতাম। সময় কোথায় অত? এখন দিনে একবার দেখতেই হয়। রাইয়ের এক লাইক দাদা জুটেছেন। তাই খেয়াল রাখতে হচ্ছে।
বটল-ওপনারটা দিয়ে রেড ওয়াইনটা ওপেন করতে করতে বলল দীপ্ত।
-লাইক দাদা? তার মানে?
-সে এক বিরাট গল্প।
অরিন্দমকে সংক্ষেপে পুরোটা বলে দীপ্ত।
-‘সোনা বোন?’ সে কি রে! কদিন পর ওই ‘বোন’ ঝরে যাবে, পড়ে থাকবে শুধু সোনা। তারপর আবার বলছে মোনালিসা। তার থেকে নেবে ‘মোনা।‘ শেষে ‘সোনা মোনা’ বলা শুরু হবে।
-বলে দেখুক একবার। প্রাণে বাঁচে কিনা লোকটা!
-না না, সিরিয়াসলি রাই। এটা ডেঞ্জারাস ট্রেন্ড। বয়স কত লোকটার?
-ক্লোজ টু ফিফটি হবে। দু’ দুটো গ্রোন আপ ছেলে মেয়ে আছে।
দীপ্ত বলল।
-ব্যস। আর দেখতে হবে না। মিডলাইফ ক্রাইসিস। ওর থেকে দূরে থাক রাই।
-তবে কদিন দেখছি না। রাইয়ের লাস্ট দুটো পোস্ট-এ কোন কমেন্ট বা লাইক নেই।
-যাক বাঁচিয়েছে। তবে বলা যায় না, ‘আবার সে এসেছে ফিরিয়া’ বলে উদয় হতেও পারে। গট টু বি কেয়ারফুল রাই।
-অ্যাকচুয়েলি কমেন্ট যে করেননি তা নয়,
রাই বলল।
-মানে? আমি দেখলাম না তো?
ওয়াইনটা ঢালছিল দীপ্ত। থেমে গেল।
-আসলে ইনবক্সে কমেন্ট করছেন ভদ্রলোক।
-কেন? ওপেন পোস্টের কমেন্ট ইনবক্সে করবেন কেন রাই?
-ঠিক কথা, আর তোর পোস্টগুলো যখন বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে, সেখানে একজন টিচারের তো ওপেনলি কমেন্ট করা উচিত। সরাসরি পোস্টে।
-পোস্ট নিয়েই কমেন্ট করছেন মেনলি; সঙ্গে কেমন আছি, কী করছি এটসেট্রা। কিন্তু কমেন্টটা কেন পোস্টে নয়, ইনবক্সে- এটা আমি জিজ্ঞেস করিনি। তবে হ্যাঁ- আমারো খুব অদ্ভুত লাগছে ব্যাপারটা।
-কটা বাজে রে?
-সাড়ে সাত।
-তার মানে দেশে এগারোটা হবে। একটা কাজ কর তো রাই। মেসেজ করে জিজ্ঞেস কর কায়দা করে, ওপেন পোস্টের কমেন্ট কেন ইনবক্সে করছে। জেগে আছে নিশ্চয়ই। অরিন্দম বলল।
-জেগে আছে মানে? রাইয়ের ছবি বা পোস্টে রাত তিনটেতেও কমেন্ট করে লোকটা। আর একটা ব্যাপার আমি খেয়াল করেছি অরিনদা, রাইয়ের খারাপ লাগবে ভেবে বলিনি এতদিন; লোকটা সেই ছবিগুলোই লাইক করে আর কমেন্টের জন্যে পছন্দ করে যাতে রাই একা। আমাদের দু’জনের কোন ছবি কোনওদিন লাইক করেনি।
-এর থেকেই তো লোকটার মেন্টালিটি পরিষ্কার! রাই, বুঝছিস তো? দীপ্ত খেয়াল করছে কিন্ত সব।
-আমি কোনোদিন এসব নিয়ে মাথা ঘামাইনি অরিনদা। রাইও জানে সেটা ভালই। কিন্তু ওই অসহ্য পোস্টটার পর থেকে আমি সত্যি একটু খেয়াল রাখছি। ঝামেলায় পড়লে তো আমাকেই সামলাতে হবে।
-অসহ্য পোস্ট মানে?
-গা জ্বালানি কবিতা লিখেছিল একটা। মানে লোকটার মতে কবিতা। আমার মতে ট্র্যাশ। তারপর রাইকে বলেছে কবিতাটা ওকে ভেবে লেখা।
-মাই গুডনেস! সে কি রে! তোকে যেটা বললাম কর তো রাই। এক্ষুণি। জিজ্ঞেস কর একটু ঘুরিয়ে, ওপেন পোস্টের কমেন্ট কেন আজকাল ইনবক্সে করছে।

দৃশ্য ১৪।
পর পর কয়েকটা মেসেজ এল ইনবক্সে।
এক সঙ্গে বসে ‘ট্রান্সফরমার্স- এজ অফ এক্সটিঙ্কশন’ দেখছিল সবাই মিলে। দীপ্ত পজ করে দিল মুভিটা। মেসেজ ওপেন করল রাই। পড়তে পড়তে ভুরু কোঁচকাল।
-কি হল? কি লিখেছে?
-খুব জটিল। ভীষণ গন্ডগোলের কেস।
-মানে?
-বলছেন, আমার পোস্টে ওঁকে এত কমেন্ট আর লাইক করতে দেখে ওনার এক সহকর্মী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
-অ্যাঁ? তার মানেটা কী? হোয়াট দ্য হেল ইজ দিস?
-আঃ শেষ করতে দাও না দীপ।
-ওঁর এই সহকর্মী, অ্যাকচুয়লি সহকর্মিনীকে একজন বুঝিয়েছেন, কিহে, তোমার নীতিশদা তো আর তোমার এক্সক্লুসিভ রইল না গো! সে তো রাইকমলিনীর হয়ে গেল! তিনি নাকি ওই নীতিশ দত্ত আর আমাকে নিয়ে আরো কি সব বাজে কথা বলেছেন এই মেয়েটিকে। প্রোভোক করেছেন। আর তার জেরে সে মানসিক যন্ত্রণায় অসুস্থ।
-হা ভগবান। আর তাই তিনি ওপেন পেজে না লিখে, ইনবক্সে খেলে যাচ্ছেন! তা এই মেঘনাদটি কে? যিনি আড়ালে থেকে এইসব বললেন ওই সহকর্মিনীটিকে?
অরিন্দম জিজ্ঞেস করল।
-অরিনদা, তুমি কি এই বোগাস গল্পটা বিশ্বাস করছ নাকি?
-সহকর্মিনীটি কে, সেটা আমি গেজ করতে পারছি। কিন্তু আড়ালে থাকা মেঘনাদটি কে জানি না। বাট...ওয়েট আ মিনিট! তাহলে সে বা তিনিও তো আমার ফ্রেন্ড লিস্টেরই কেউ! আমার পোস্ট তো পাব্লিক থাকে না কখনো!
-আর এটাও বোঝা যাচ্ছে যে নীতিশ দত্ত এই মেয়েটির ব্যথা; অ্যান্ড অর ভাইসি-ভার্সা। নাহলে অসুস্থ হবে কেন?
দীপ্ত বলল।
-লে হালুয়া! এবার বোঝো! নাম আবার নীতিশ। হোয়াট আ জোক!
ভীষণ বিরক্তিতে সোফা ছেড়ে উঠে পড়ল দীপ্ত।
-শিক্ষক! শালা, এই নোবেল প্রোফেশনে ঘেন্না ধরে গেল মাইরি!
রাই উঠে পাশে গিয়ে দীপ্তর পিঠে হাত রাখল।
-দীপ, প্লিইজ! কি হচ্ছে! একজনের জন্যে সবাইকে দোষ দিও না। এরকম কোর না!
-করলাম আর কই! কিছুই তো করতে পারছি না! আর সেই জন্যেই তো রাগ হচ্ছে। শোন, এবার স্ট্রেট জিজ্ঞেস কর, ওই দ্বিতীয় মহাপ্রভুটি কে।
-কি ভাবছিস তুই? জিজ্ঞেস করলেই বলে দেবে? গভীর জলের মাছ এই মালগুলো।
-তাও জিজ্ঞেস কর। ওটাই বল; বল, আমার পোস্টগুলো তো পাব্লিক ছিল না। তাহলে আমার লিস্টেরই কেউ বলেছে নিশ্চয়ই। কে বলেছে, আমি তাকে চিনতে চাই।
-বেশ লিখছি।
-হ্যাঁ, লেখ। যতক্ষণ না নাম বলবে, কথা চালিয়ে যাও।

দৃশ্য ১৫।
-তাহলে কী দাঁড়াল রাই?
-দাঁড়াল এই যে, নীতিশ দত্ত বলছেন তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক নিয়ে মনোনীতার মনে সন্দেহ গুঁজে দেন ঋদ্ধিমান চ্যাটার্জি। এই ঋদ্ধিমান একজন সি.এ.। ইনি থাকেন কোলকাতাতে। এইসব শুনে নীতিশকে হারাবার ভয়ে পুরুলিয়াতে মনোনীতা অসুস্থ।
-না না, সেখানেই বা শেষ হল কই! এই কোলকাতা পুরুলিয়ার গল্পে তো প্যারিসের দাম্পত্য মান- অভিমানও অ্যাড হয়ে গেল! কী ঘাপলা মাইরি! ‘ফেসবুকে যুক্ত হল প্যারিস আর পুরুলিয়াআআআ/ দুনিয়া ডট-কম, দুনিয়া ডট-কম, দুনিয়া ডট-কম নম নমঃ।’
গেয়ে উঠল অরিন্দম।
-এক কাজ কর রাই। তুই এবার লেখ, আপনি মনোনীতার সেবায় মনোনিবেশ করুন। আমাকে আপনাদের এই থার্ড ক্লাস ক্যাঁচাল থেকে বাদ দিন।
-কি জানো, ওই ঋদ্ধিমান চ্যাটার্জির গল্পটা পুরো বানানোও হতে পারে। কেননা আবার বলছেন, আসলে ঋদ্ধিমান চ্যাটার্জিই নাকি মনোনীতাকে উলটো পালটা মেসেজ করে অ্যাপ্রোচ করেছিলেন। পাত্তা না পেয়ে আমাকে আর নীতিশকে জড়িয়ে এইসব কথা বলে মনোনীতার মনে বিষ ঢালছেন।
-এই মনোনীতা কি বিবাহিতা?
অরিন্দম জিজ্ঞেস করল।
-আঃ অরিনদা, তাতে তোমার কি? অবিবাহিতা হলে কি তুমি বিয়ের সম্বন্ধ খুঁজবে?
-শোন শোন, মাথা গরম করিস না দীপ্ত। রাই, বোস এখানে। আসলে অগুন্তি রসিক নাগর অ্যান্ড নাগরীর চারণক্ষেত্র হল এই ফেসবুক। দেয়ার্স সাম কমন অ্যান্ড ফ্রিকোএন্টলি ইউজড টেকনিকস বাই দেম। ফার্স্ট– তোর পোস্টের নীচে ‘অউসাম’ ইত্যাদি কমেন্ট করে সেন্টার অফ অ্যাট্র্যাকশন হওয়ার চেষ্টা করবে। সেকেন্ডলি- ইনবক্সে ঢুকে জ্ঞানদানের বাহানায় ঘনিষ্ঠতা তৈরির চেষ্টা করবে। থার্ডলি- একটু রাত হলেই আলোচনাটাকে শরীরের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। হ্যাঁ, মানছি- অ্যাট টাইমস ফ্লার্টিং ইজ অলসো এসেনশিয়াল। তবে এ একেবারে এত ব্লান্ট ফ্লার্টিং করছে যে পাতে দেওয়া যায় না। তোকে তো নিজের কমফোর্ট, নিজের ফ্রীডম, আর সেফটি দেখতে হবে, না কি রাই? যা বুঝছি, এই মাস্টারমশাই মনোনীতার সঙ্গে রিলেশন চালিয়ে যাচ্ছিলেন বহুদিন। এখন রাইকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠাতে মনোনীতা ক্ষেপে গেছে। স্বাভাবিক; সে ভাবছে নীতিশ দত্ত হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে! নীতিশ দত্ত আবার শ্যামও চান আর কুলও। তাই একজনকে ওপেন পেজে লিখে তুষ্ট করছেন আর তাকে দেখাচ্ছেন রাইকে কিছু লিখছেন না। এদিকে মোনালিসা রাইকেই বা ছাড়েন কি করে! তাই রাইকে ইনবক্সে মেসেজ করছেন।
-কি কমপ্লিকেশন রে ভাই! এ স্কুলে পড়ায় কি করে বলো তো! এই মানসিকতা নিয়ে বাচ্চাদের পড়াবে! দেশের ভবিষ্যৎ তৈরি করবে!
-রাই, তুই এক কাজ কর। সোজা বল, ইনবক্সে ডিস্টার্ব না করতে। না শুনলে স্প্যাম রিপোর্ট করে তারপর ব্লক করে দে। তার আগে মেসেজ-গুলোর স্ক্রিনশট নিয়ে রাখবি।
-আচ্ছা…কিন্তু আর একটা ব্যাপার…
-আবার কী?
-নীতিশ দত্ত আমার ফোন নম্বর জানেন।
-ওহ্ নোও!
মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল দীপ্ত।
-রাই, প্লিইজ, আমি আর নিতে পারছি না।
-তোর ফোন নাম্বার পায় কি করে লোকটা?
-আমি দিই নি। আমার সেটিং-এ ফোন নাম্বারটার অপশনে ‘ফ্রেন্ডস’ সিলেক্ট করা ছিল। পরশু দেশের রাতের দিকে একটা কল এল, কেটেও গেল। দেশের অচেনা নাম্বার থেকে রাতে ফোন এলে টেনশন হয় না? আমি তাই কল ব্যাক করেছিলাম।
-অরিনদা, এটা কিন্তু রাই আমাকে আগে বলেনি।
-সারাদিনের পর ফিরে এইরকম সব অন্য লোকদের নিয়ে কথা বলতে বা শুনতে কি কারো ভাল লাগে দীপ, বলো তো?
-এই, এইটাই আমারো কথা রাই! ভারচুয়্যাল ওয়ার্ল্ডের একটা লোক, তাকে চিনি না, জানি না, কোনওদিন চিনতে চাইও না, সে আমাদের মধ্যে ঢুকে পড়ে ইম্পর্ট্যান্স ডিম্যান্ড করছে! তাকে নিয়ে আমরা ডিসকাস করে চলেছি! এটা সহ্য করা যায়! ‘সোনা বোন!’ বুলশিট! অ্যাডাল্ট অনাত্মীয় নারী পুরুষের মধ্যে ওইসব ভাই বোনের সম্পর্ক হয় না এভাবে। আই ডোন্ট বিলিভ!
-দীপ্ত, কাম ডাউন ভাই। আর রাই, তোর প্রিভেসি সেটিং তো তুই কন্ট্রোল করবি। কি করে সব ফ্রেন্ডসদের জন্যে কনট্যাক্ট ডিটেল দিয়ে রাখলি? যার সঙ্গে সেইরকম দরকার হবে, তাকে তো প্রাইভেটলি দিবি! তুই একটা হাইলি কোয়ালিফায়েড মেয়ে, ইন্সটিট্যুট পাস্তুর-এর মত জায়গায় একটা রেস্পসিবল পজিশনে আছিস; তোকে এটা মানায় বল?
-ইন্সটিট্যুট থেকে বেরোনর সময় কমন সেন্সগুলো সব মাইনাস এইট্টি ডিগ্রি ফ্রীজারে ঢুকিয়ে রেখে আসে। তাই বাইরে কোনও কমন সেন্স আর কাজ করে না।
-আচ্ছা থাক এসব কথা। রাই, ডিনারের আগেই তুই মেসেজ করে জানিয়ে দে যা যা বললাম।

দৃশ্য ১৬।
অরিন্দমদাকে অত রাতে ফিরতে দেয়নি দীপ্ত আর রাই। ড্রিঙ্ক করে গাড়ি চালানো ঠিক হত না। গেস্ট রুমে থেকে গেছেন। রাই কিচেনটা একটু গুছিয়ে নিচ্ছিল। সকালে উঠে সব চারদিকে ছড়ানো ছিটোন দেখলে বিরক্ত লাগে।
দীপ্ত এসে দাঁড়াল।
-এখন থাক না এসব।
-একটু গুছিয়ে নিই। অ্যাট লিস্ট, ডিশ ওয়াশারে ঢুকিয়ে দিই ডিশগুলো।
-ওটা তো আমার কাজ।
-একই হল।
-স্যরি রাই। দুম করে ওরকম রিঅ্যাক্ট করাটা ঠিক হয়নি। রাগ করে আছ, সোনা?
রাইয়ের কাঁধে হাত রাখল দীপ্ত।
-কে বলল রাগ করেছি?
-তাহলে এত গম্ভীর যে? অরিন্দমদার সামনে ওভাবে বললাম তখন। জানি রাগ করেছ।
-ভুল জানো। আর অরিন্দমদা তো নিজেদের লোক। রাগ হয়নি। অ্যাকচুয়েলি...আমার ভাল লেগেছে দীপ।
-মানে? তুমি...
-টেনশন যে একটুও হচ্ছিল না, তা নয়। তবে তোমার রেগে যাওয়াটা আমি খুব চেরিশ করেছি। এতটা কন্সার্ন, এত পজেসিভনেস- এই রকম একটা ঘটনা না হলে তো দেখতেই পেতাম না!
-চেরিশ করেছ, না? চেরিশ করেছ? চেরিশ করার হয়েছে কি এখনই! দাঁড়াও!
রাইকে কোলে তুলে ঘরের দিকে পা বাড়াল দীপ্ত।

দৃশ্য ১৭।
নোত্যরদ্যম চার্চের কোনাকুনি উল্টোদিকের রেস্তোরাঁ থেকে ফ্রাইজ আর কফি কিনে এনে শ্যেন এর ধারে বাঁধানো সিঁড়ি দিয়ে অর্ধেকটা নেমে গিয়ে বাঁ দিকে নদীর ওপর ঝুলে থাকা ছোট চাতালটায় বসল রাই আর দীপ্ত। রাইয়ের মুখে দুটো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই তুলে দিল দীপ্ত। রাই খেতে যেতেই বলল-
-আরে আরে সবটা নয়। ওর হাফ আমার। রাইয়ের ঠোঁট ছুঁয়ে অর্ধেক ভাগ নিয়ে নিল দীপ্ত। তারপর রাইকে আরো কাছে টেনে নিয়ে দীপ্ত বলল,
-পুজোর সময় যখন দেশে যাব আমরা, ভালোপাহাড়েও ঘুরে আসব একবার। যাবে তো?
-হ্যাঁ। খুব ইচ্ছে করে যেতে।
-আর...ওই স্কুলটায় যেতে চাও?
-আবার ওইসব কথা?
-তুমি কিন্তু অন্য কিছু একটা ভেবেছিলে...
-তোমার মনে আছে? এখনো?
-তোমার ইচ্ছেগুলো ভুলি কি করে? অনেককিছুই পারি না হয়তো। তবু কিছু তো করা যায়! স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে বাচ্চাদের জন্য ডেফিনিটলি কিছু করব আমরা। যেরকম তুমি ভেবেছিলে। ওই রকম লোক তো সবাই নয়, বলো! আর বাচ্চাগুলো? ওই লোকটার ওপর বিরক্ত হয়ে তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেব কেন?
দীপ্তর গলা জড়িয়ে ধরে গালে গাল রাখল রাই।

আপনার মতামত জানান