বাঁশি/অন্বেষা বসু

শেষ পর্ব



“পা থেকে মাথা পর্যন্ত টলমল করে, দেয়ালে দেয়াল, কার্নিশে কার্নিশ,
ফুটপাত বদল হয় মধ্যরাতে
বাড়ি ফেরার সময়। বাড়ির ভিতর বাড়ি, পায়ের ভিতর পা,
বুকের ভিতরে বুক
আর কিছু নয়”।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়। এই বুঝি প্রতিটি মানুষের অবস্থা ও অবস্থান। এই বুঝি প্রতিটি মানুষের পরিস্থিতি। একটা ঘুণ ধরে নড়বড়ে হয়ে যাওয়া সমাজ। কতকগুলো insensitive মানুষ। তাদের নিজের নিজের রাগ, আক্রোশ, প্রতিশোধস্পৃহার আগুনে ছারখার হয়ে যাচ্ছে গোটা দুনিয়া। প্রতিটা প্রাণ মার খাচ্ছে। ক্ষয়ে যাচ্ছে। মৃতপ্রায় হয়ে যাচ্ছে। তবু শালা, জীবনের মায়া ছাড়তে পারছে না। অসম্ভব রাগ হয় রাইয়ের। নিজের জীবনটার প্রতি। ওর জীবন একটা, একটা কাম- রক্ত- ঘামের পুত্তলি। এর বাইরে ও কী? ও কে? এই গোটা বিশ্বসংসারে ওর প্রয়োজনীয়তাটা কোথায়? একটা পচে যাওয়া সময়, আর একটা equally পচে যাওয়া জীবন। একটা হেরে যাওয়া জীবন। ও আলাদা কিছু নয়, ও আলাদা কেউ নয়। ও সবার মত। সব্বার মত। একটা fragmented, disintegrated, dehumanized entity! শুধু একটা অস্তিত্ব। এক ফোঁটা জল, বা এক কণা ধুলোর মত insignificant! অতএব, ও কামনা করে মৃত্যুর।
“সারবন্দী জানলা, দরজা, গোরস্থান- ওলট পালট কঙ্কাল
কঙ্কালের ভিতরে শাদা ঘুণ, ঘুণের ভিতরে জীবন, জীবনের ভিতরে
মৃত্যু সুতরাং
মৃত্যুর ভিতরে মৃত্যু
আর কিছু নয়!”
মায়ের মৃত্যুটা সহজ ভাবেই তো মেনে নিয়েছিল রাই। গতবছর জুন মাসের মাঝামাঝি। সেদিন সকাল থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিল। অফিস যেতে একেবারেই ইচ্ছে করছিল না রাইয়ের। মা ও বারবার বারণ করেছিলেন বেরতে। কারণ, কদিন আগেই জ্বর ছেড়ে উঠেছিল রাই। শরীর তখনো বেশ দুর্বল। আর বৃষ্টিতে ভেজা মানেই আবার জ্বরে পড়া। তবু, অগত্যা, বেরোতেই হল রাইকে। কাজে মন বসছিলনা সেদিন। পর পর তিন চার কাপ কফি খেয়েও মাথাটা ঝিমঝিম করছিল। দুপুরের দিকে ডেস্কে মাথা রেখে চোখটা কেমন লেগে এসেছিল। এমন সময় এসেছিল ফোনটা। রান্নার মাসির গলা। এলোমেলো একটা ভয়মেশান কাঁদো কাঁদো গলা। “রাই, তাড়াতাড়ি বাড়ি এসো। তোমার মা কেমন করছে!”
“কি হয়েছে মাসি?” চমকে উঠেছিল রাই। “ কী হয়েছে খুলে বল। exactly কী হয়েছে?”
“বুঝতে পারছি না। দুপুরে খাওয়ার পর দুজনে বারান্দায় বসে গল্প করছিলুম। হঠাৎ বলল, মাথা ঘুরছে। ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লো। তারপর আর মাথা তুলতে পারছে না, আর দরদর করে ঘেমে যাচ্ছে। পাখা চলছে তবুও। আর বলছে বুকে ব্যাথা”।
হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছিল রাইয়ের। ফোন কানে নিয়েই ঝটপট তৈরি হয়ে গিয়েছিল বেরনোর জন্য। তবু বলে চলল__
“কী রান্না করেছিলে দুপুরে? কী খেয়েছিল মা?”
“আসলে বৃষ্টি হচ্ছে বলে খিচুড়ি করতে বলল, বলল তুমি এসে খাবে। আর মামলেট করেছিলাম”।
“কেন ঝোল- ভাত করতে পার নি? দেখছ দুদিন বাদে বাদে অসুস্থ হচ্ছে মানুষটা! তোমায় খিচুড়ি করতে বলল আর তুমি করলে? অসহ্য!”
“আমি কী করব? আমায় বলল তাই” কাঁদো কাঁদো গলায় বলল মাসি।
“যাকগে। আমি আসছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। তুমি ঘরের সব জানলা খুলে দাও। পাখা ফুল স্পীডে চালিয়ে দাও। আর শুয়ে থাকলে হবে না। উঠে বসতে বল। হেলান দিয়ে বসুক। মাথায়, মুখে, ঘাড়ে জল দাও। আর শাড়ি, জামা আলগা করে দাও। কোনও ওষুধ খেয়েছে?”
“হ্যাঁ, একটা সাদা বড়ি খেল তো”।
“হুম, ঠিক আছে। বমি করে কিনা দেখ। আর পাশের বাড়ির বাবাইদাকে পারলে ডাকো। আর আমি যতক্ষণ না আসি, তুমি থেকো একটু। শরীর বেশি খারাপ হলেই ফোন করো কিন্তু। আমি ডাক্তার কাকা কে ফোন করে দিচ্ছি। এখন রাখছি, কেমন?”
ডাক্তার কাকা ওদের ফ্যামিলি- ফিজিশিয়ান। ও চটপট ফোন করে গোটা ব্যাপারটা জানালো ওনাকে। উনি চেম্বারে ছিলেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওদের বাড়ি পৌঁছে যাবেন বলে আশ্বাস দিলেন। আর ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল রাই। মেট্রো অবধি পৌঁছনর আগেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো আবার। কাকভেজা হয়ে স্টেশনে পৌঁছল। সেখানে গিয়ে দেখে মেট্রো বন্ধ। ঘণ্টা খানেক আগে এসপ্ল্যানেডে কেউ আত্মহত্যা করেছে। কাজেই বেড়িয়ে এসে বাস ধরল। বাসও থেমে থেমে হাজার বার জ্যামে আটকা পরে শেষপর্যন্ত যখন দমদম পৌঁছল রাই, আবার ফোন। হাউমাউ করে কান্না। রান্নার মাসি। এবং ক্রমে রাইয়ের চুল থেকে নখ অসাড় হয়ে গেল। বাস থেকে নেমে মাথা ঘুরে পড়ে গেল রাই। সাথে সাথেই চার পাঁচ জন এগিয়ে এল ওকে সাহায্য করতে। তাদেরই কারো একজনের গায়ে এলিয়ে পড়লো ও। তারপর সব অন্ধকার। সবটা ফাঁকা। এক অসীম শূন্যতা। সেই শূন্যতা আজো পূরণ হয়নি। ও কিন্তু কাঁদে নি। চীৎকার করেনি। প্রতিরোধ করেনি। কিছু করেনি। শুধু অস্বাভাবিক রকম নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিল ও। পাথরের মত স্তব্ধ, শান্ত, শীতল হয়ে গিয়েছিল। ওর শরীরের সমস্ত নার্ভ যেন শুকিয়ে গিয়েছিল সহসা। ও আর কিছু অনুভব করতে পারছিল না। শুধু ক্রিমেশানের পর অস্থি বিসর্জন দিয়ে, গঙ্গাস্নান সেরে, যখন শাড়ি বদলে এলো ওর দানবিক খিদে পেল। ওর মনে পড়লো, ও সারাদিন কিছু খায়নি। আত্মীয় পরিজনের ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল যেখানে ঋত একা দাঁড়িয়ে নীরবে সিগারেট খাচ্ছে। ওর কাছে এগিয়ে যেতেই অভিভাবকরূপী আত্মীয়রা এর ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। ও সহজ ভাবে ঋত কে গিয়ে বলল, “খুব খিদে পেয়েছে। চল খেয়ে আসি”।
ঋত বুঝতে পারল ভেতরে ভেতরে ছারখার হয়ে যাচ্ছে রাই। ও পালাতে চাইছে ওই পরিবেশ টা থেকে। তবু শান্ত স্বরে বলল, “কি খাবি বল? চা আনি? দাঁড়া, আর কে কে খাবেন জেনে আসি”।
“না, চা নয়। খাবার। খিদে পেয়েছে আমার। সারাদিন খাইনি আমি। আর সবাই, দুপুরে গাণ্ডেপিণ্ডে গিলে, ঢেঁকুর তুলে, ঘুমিয়ে, সেজেগুজে এসেছে আমার মায়ের শেষকৃত্য টা উদ্ধার করে দিতে”।
সবাই চমকে উঠলো ওর কথা শুনে। সবার চোখের মেকী জল শুকিয়ে রাগ দানা বাঁধতে লাগলো। শুধু, রাইয়ের কাকিমা মিষ্টি করে বললেন, “আহা রে। সত্যি তো, মেয়েটার ওপর যা চলছে সারাদিন। চল রে। বাড়ি গিয়ে খাবি একেবারে। আয়, গাড়িতে উঠে বস”।
রাই কিছু বলবার আগে ঋত বলল, “সেই ভালো। তুই বাড়ি গিয়ে রেস্ট নে। হাল্কা কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে পর। আমি কাল তোর বাড়ি যাব”।
একটু হাসার চেষ্টা করতে গিয়ে সেই প্রথম চোখের কোণ থেকে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো রাইয়ের। আর ঋতর বুকটা মুচড়ে উঠলো। মনে হল, তক্ষুনি কাছে টেনে নেয়, কিন্তু এতো লোকজনের মাঝে পারল না। শুধু, কোনও রকমে বলল, “যা, বাড়ি যা। আমি যাব কাল”।
সেই দিনটার পর থেকে মাকে প্রায়ই স্বপ্নে দেখে রাই। আর প্রতিটা স্বপ্নে ওই বারান্দাটা ঘুরে ফিরে আসে। ওই শিউলি গাছটা, আর ওই ঠাকুর দালানটা। কোথায় দেখেছিল রাই এই বারান্দাটা? এটা কি ওর কল্পনা? নাকি, সত্যি কোথাও দেখেছিল এমন একটা বারান্দা? মনে করতে পারে না কিছুতেই। তবে কি কারো কাছে গল্প শুনেছিল? জানেনা রাই। কিন্তু, ওর রহস্যময় লাগে সবটা। আর একটা অদ্ভুত বিষয় হল, ইদানীং, মায়ের স্বপ্নে কেমন করে ঋত এসে পড়ছে। এই দুটোকে মেলাতে পারেনা রাই। বুঝতে পারেনা সংযোগটা। শুধু, ঘুমে, জাগরণে সবসময়, সর্বত্র ও একটা গন্ধ পায়। একটা আভাস পায়। ঋতর চলে যাবার। ওর মনে হয়, ঋত আর বেশীদিন থাকবেনা ওর কাছে। ও চলে যাবে। অন্য কারো কাছে? জানেনা রাই। শুধু জানে, ওকে একা করে দিয়ে চলে যাবে ও। দূরে, অনেক, অনেক, অনেক দূরে। হাত বাড়ালেই আর ধরা দেবে না ও। কক্ষনো না। কোনোদিন না। রাই একা, একা, একা একটা শবদেহ হয়ে ঘুরে বেড়াবে পৃথিবীর সমস্ত আবর্জনার স্তূপে।

গোটা সপ্তাহটা ঋতুপর্ণকে নিয়ে লেখাটা লিখতেই কেটে গেল। তার মাঝেই ঘুরে এলো প্রেসিতে আয়োজিত independent ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আর স্যাফো ফর ইকুয়ালিটির ন্যাশনাল ক্যুইয়ার কনফারেন্সে। শুধু যে কভার করতেই যাওয়া তা নয়, এই ধরণের সম্মেলন, অনুষ্ঠান গুলোয় যেতে খুব ভালো লাগে রাইয়ের। কত কিছু জানা যায়, শেখা হয়। প্রতিটা মানুষ নিজের নিজের মত করে কাজ করছে, সৃষ্টি করছে, অজানা কে জানছে, অচেনা কে চিনছে। সকলে মেধা, বুদ্ধি আর উৎকর্ষতা দিয়ে পৃথিবীটাকে দেখছে, নতুন নতুন রাস্তা খুলে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত, সত্যের কাছে পৌঁছনর। লড়াই করছে সব্বাই। ভীষণ ভাললাগে এই মানুষ গুলোর সাথে মিশতে। আর তারপর, নিজের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, কী নিকৃষ্ট, মধ্যমেধার একটা জীবন যাপন করে চলে ও। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে।
আজ তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেড়িয়ে পড়েছে রাই। সন্ধ্যে নামছে কোলকাতার বুকে। আকাশের নীলে দ্রবীভূত হচ্ছে সূর্যের রক্তিম আলো। মাতাল করা হাওয়া বইছে। হঠাৎ ভীষণ নির্ভার, মুক্ত লাগছে নিজেকে। অফিস পাড়া দিয়ে একা একা হাঁটতে দিব্যি লাগছে রাইয়ের। চাঁদনী তে এসে মেট্রো ধরল রাই। আহা! এ সি মেট্রো টা এসেছে। কী মজা! বাড়ি পৌঁছে অনেকক্ষণ ধরে স্নান করলো রাই। দামী বিদেশী সাবান ও শ্যাম্পু সহযোগে। মাথাটা আঙুল দিয়ে চেপে চেপে মাসাজ করলো অনেকক্ষণ ধরে। আঃ! কী আরাম লাগছে! লুফায় বেশি করে শাওয়ার জেল নিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করলো শরীরের প্রতিটি খাঁজ, গোপন, অদৃশ্য সব কোটর। তারপর নির্মল বারিরাশি অপার ভেজালো রাইকে, আশিরনখ। ধারাস্নানে ধুয়ে গেল সমস্ত প্রাচীন। স্নাত হয়ে আয়নায় নিজেকে পরীক্ষা করলো রাই। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল নিজের পাঁচ ফুট ছ’ ইঞ্চির ফর্সা, মেদবহুল শরীর টাকে। ভারী বুক। পেট, কোমর আর উরুতে জমে রয়েছে থাক থাক চর্বি! কী বিশ্রী, কী বিবমিষাময়! চোখের চারপাশে বিশ্রী কালো ছোপ! ডার্ক সার্কলস! মোটা পুরু ঠোঁট। চ্যাপ্টা নাক। ফর্সা রং টাও রোদে সেঁকে, পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এই শরীরের প্রতি ও এতো লোভ? হাসি পায় রাইয়ের। আসল কথা হল নারী মাংস। ফর্সা-কালো, রোগা-মোটা, লম্বা-বেঁটে__ এগুলো লিস্ট ইম্পরট্যান্ট। যেটা জরুরি সেটা হল যে কোনও উপায়ে নারী কে শরীরে ও মনে কন্ট্রোল করা, অধিকার করা, সম্ভোগ করা। আসলে মানুষ শুধু সিভিলাইজড হয়েছে কাগজে কলমে, ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু, নারী পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্কের কোনও উন্নতি হয়নি। সেই patriarchy, সেই exploitation। পৃথিবীর সমস্ত চাকরি তেই বোধহয় মেয়েদের এসেন্সিয়াল স্কিল হল বেশ্যাবৃত্তির পারদর্শিতা। তার জ্ঞান, যোগ্যতা, কাজের দক্ষতা এগুলো সমস্তই গৌণ। রাইয়ের আর রাগ হয় না, কান্নাও পায় না, বরং হাসি পায়। পেট গুলিয়ে হাসি পায়। বমির মত উপচে ওঠে হাসি। ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত ঘরে। হাসতে হাসতে খিল ধরে যায় পেটে। পেট চেপে মাটিতে বসে পড়ে রাই। আর খিদে পায় ভীষণ। কোনোরকমে গায়ে একটা জামা গলিয়ে রান্নাঘরে এসে দাঁড়ায়। চায়ের জল চাপায়। ফ্রিজ খুলে গাজর, ক্যাপ্সিকাম, টোম্যাটো, লঙ্কা বের করে। ম্যাগির প্যাকেট খুলে সেদ্ধ করতে দেয়। সবজি কেটে, ধুয়ে ভাজা বসিয়ে দেয়। আস্তে আস্তে চা আর ম্যাগি তৈরি করে ঘরে এসে বসে। গরম গরম চেটেপুটে খেয়ে ফেলে সব টা। চা টাও এক চুমুকেই শেষ। আহ, শান্তি! বিকেল থেকেই বেশ হাওয়া বইছিল। এবার বৃষ্টি নামলো। জানলা গুলো আর বন্ধ করতে ইচ্ছে করলো না। যা ভিজে যায় ভিজে যাক। জানলা খোলা থাকবে। জানলা বন্ধ করবে না রাই। বুকের মধ্যে একটা তোলপাড় অনুভব করতে শুরু করলো রাই। কী কারণে বুঝতে পারল না। কিন্তু ওর হঠাৎই সব কিছু বড় ভাললাগছে। বিছানায় আধ শোয়া হয়ে ল্যাপটপ টা টেনে নিল। অনেকদিন গান শোনা হয়নি। রবীন্দ্রনাথ শুনবে? ভানু সিংহের পদাবলী? কত যুগ শোনেনি সিডি টা! মনে আছে, স্কুলে ওরা ভানু সিংহের পদাবলীর একটা নাট্যরূপ দিয়েছিল। নৃত্যনাট্য। স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন বাংলার অপরাজিতা দি। পাঠের দায়িত্বে ছিলেন শুভাশিস দা আর কৃষ্ণকলি দি। গান শিখিয়েছিলেন কমলিকা দি আর সঞ্জীব বাবু, আর নাচ শেখাতে এসেছিলেন মউসম দা। মনিপুরী শিখিয়েছিলেন। কী অসম্ভব সুন্দর প্রযোজনা হয়েছিল সেটি। রাইরা তখন ক্লাস ইলেভেন। সেই প্রথম চেনা রাধা কে, রাই কে। তার প্রেম, বিরহ, যন্ত্রণা, আর জীবনদর্শন কে। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম যে আসলে নিছক নারী পুরুষের প্রেম নয়, সেই প্রেম যে আসলে ভক্ত ও ভগবানের মিলন, ক্ষুদ্র ও বিশালতার মিলন, ক্ষণিকের সাথে অনন্তের মিলন বুঝতে শিখেছিল রাই। রাধিকার অনন্ত বিরহিণী মূর্তি শিহরিত করেছিল রাই কে। বিরহেই রাধার মুক্তি। বিরহেই রাধার আনন্দ। আর বিরহেই পাওয়া শ্রী কৃষ্ণ কে। সে পাওয়া কেবল রক্তমাংসের পাওয়া নয়। সে পাওয়া আধিকার করা নয়। সেই পাওয়ার মানে আত্মনিবেদন, আত্মসমর্পণ। সমর্পণ বিশালতার কাছে, অনন্তের কাছে। কী এই জীবন? শূন্য থেকে শুরু করে শূন্যে বিলীন হয়ে যাওয়া। অন্তহীন থেকে শুরু করে অন্তহীনে মিশে যাওয়া। এক ফোঁটা জীবন। তার আগে, তার পরে অনন্ত শূন্যতা। অতএব, সেই বিশাল, সুন্দর, পরম কে জানতে, সেই অতল, গভীর, সুদূর কে চিনতে, অসীম, অনন্ত কে ছুঁয়ে দেখতে রাই মৃত্যুর অভিসারী হয়।
“মরণ রে, তুঁহুঁ মম শ্যামসমান
মেঘবরণ তুঝ, মেঘজটাজুট, রক্তকমল কর, রক্ত-অধরপুট
তাপবিমোচন করুণ কোর তব মৃত্যু-অমৃত করে দান__
আকুল রাধা-রিঝ অতি জরজর, ঝরই নয়নদউ অনুখন ঝরঝর
তুঁহুঁ মম মাধব, তুঁহুঁ মম দোসর, তুঁহুঁ মম তাপ ঘুচাও
মরণ তু আও রে আও”।

“তুই কখনো চোখের সামনে কাউকে মারা যেতে দেখেছিস?”
“হ্যাঁ, দেখেছি। ঠাকুরদা কে। আমরা সব ভাই বোনেরা তখন ঠাকুরদার আরামকেদারার চারপাশে গোল হয়ে বসে গল্প বলা খেলা খেলছি। ঠাকুরদা গল্পের শুরু টা বলে দিয়ে চোখ বুজে শুয়ে থাকতো, আর আমরা প্রত্যেকে একটু একটু করে ওই গল্পটাকে বাড়িয়ে নিয়ে যেতাম। সেদিনও এমন গল্প বলা খেলা চলছিল। কিন্তু গল্পটা কেউ শেষ করতে পারছিল না। ক্রমশ বেড়েই চলছিল। তারপর আমরা অধৈর্য হয়ে ঠাকুরদা কে ডাকতে লাগলাম। কোনও সাড়া নেই। আমরা ভাবলাম উনি ঘুমিয়ে পরেছেন। আরাম কেদারায় শুয়ে আছেন উনি, ঠোঁট দুটো ঈষৎ ফাঁক। বিকেলের শেষ আলো টুকু শুষে নিচ্ছে মুখ খানি। বুকের ওপর খোলা উপনিষদ। ঘুমের মধ্যেই নীরবে চলে গেছেন উনি। কাউকে না বলে। নিঃশব্দে”।
“হুম। মারা যাওয়া টা বুঝলি কীভাবে?”
“মা চা দিতে এসে বুঝতে পারে। চীৎকার করে কেঁদে ওঠে মা। বুঝতে পারি একটা অনেক বড় অঘটন ঘটে গেছে”।
“ওনাকে স্বপ্নে দেখেছিস কখনো?”
“হুম, ছোটবেলায় প্রায়ই দেখতাম। তারপর আস্তে আস্তে বড় হয়ে গেলাম। আর দেখি না। কেন রে? হঠাৎ এগুলো জিগ্যেস করছিস?”
“জানিস, মা কে আমি প্রায়ই স্বপ্নে দেখছি। আর অদ্ভুত ভাবে একটা বারান্দা দেখতে পাচ্ছি। লম্বা একটা বারান্দা। একটা শিউলি গাছ। ঠাকুরদালান। আর। আর__”
“আরে, এগুলো তো সবটাই আমার বাড়ির কথা বললি। আমার বর্ধমানের বাড়ির গল্প বলেছিলাম না তোকে?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস। আমি তোর ঠাকুরদাকেও দেখেছি”।
“হা হা হা! ধন্যি তোর কল্পনা শক্তি! একদিন ও তো গেলিই না। শুধু শুনেই স্বপ্ন দেখে ফেললি?”
“কাল ও দেখলাম মাকে। স্বপ্নে। সেটা অন্যরকম। দেখলাম পুরীতে বেড়াতে গেছি আমরা। আমি, মা আর বাবা। আমি খুব ছোট তখন। সবে তিন বছর বয়স। ঢেউ দেখে ভীষণ ভয় পাচ্ছি। মা, বাবার হাত ধরে বালির ওপর হাঁটছে। ভিজে বালির ওপর পায়ের ছাপ পরে যাচ্ছে। বাবা এক হাতে আমায় কোলে নিয়ে আছে। ওরা দুজনেই খুব হাসছে। মা একটা টুকটুকে লাল শাড়ি পরেছে। অমন লাল শাড়ি আমি কোনোদিন মাকে পরতে দেখেছি বলে মনে পরে না। হঠাৎ দেখলাম তুই। কিন্তু এখনকার তুই। ছোট্ট তুই নয়। দেখলাম তুই বাবার কোল থেকে আমায় নিজের কোলে টেনে নিলি। তারপর তোর কোলে গিয়ে আমার ঢেউ কে আর ভয় করলো না”।
“হুম। ইলেক্ট্রা কমপ্লেক্স। বাবা কে তুই অসম্ভব ভালবাসিস। আর আমার মধ্যে তুই বাবাকে খুঁজে পাস। এবার প্রশ্ন পুরীতে কেন দেখলি। মনে করে দেখ, আমিই তোকে একদিন বলেছিলাম, তিন বছর বয়সে আমি পুরী বেড়াতে গিয়েছিলাম। আর তুই ও গেছিলি। কিন্তু তখন আমরা কেউ কাউকে চিনতাম না। কিন্তু হতেও তো পারে, তোর সাথে আমার দেখা হয়েছিল সমুদ্র সৈকতে?”
“হ্যাঁ রে। কিন্তু__”
“কী রে?”
“আমার ভীষণ ভয় করছে জানিস? মনে হচ্ছে, বাবা মায়ের মত তোকেও হারিয়ে ফেলব আমি। তাই বোধহয় সব স্বপ্নে তোকেও দেখছি”।
“ধুর পাগলী! কোথায় যাব আমি তোকে ছেড়ে? যাওয়ার জায়গাও তো নেই আর”।
“থাকলে চলে যেতিস? সত্যি বল? আর কেউ যদি ফিরে আসে? কী করবি তখন?”
“আত্রেয়ী আর ফিরবেনা রাই। ও ভালোই আছে। আমাকে ছাড়াই। আর কেন ফিরবে? কী দরকার?”
“আর তুই? তুই খারাপ আছিস ওকে ছাড়া?”
“না। একেবারেই না। আসলে আমাদের ভালো বা খারাপ থাকা টা আমাদের নিজেদের উপর নির্ভর করে। আমরা কীভাবে দেখি জীবন টাকে তার ওপর। জানিস রাই, তুই সব সময় বলিস না, তোর ওই চাকরি টা, ওই অফিস টা অসহনীয় লাগছে? জানিস, আমার স্কুলের চাকরি তেও কিন্তু অনেক অনেক খারাপ লাগার জায়গা আছে। স্টাফ রুমে আমি বেশীক্ষণ থাকতে পারিনা এমন নোংরা আলোচনা হয় ওখানে। সবাই সবার পিছনে নিন্দে করে। কে যে কার বন্ধু, কে কার শত্রু বোঝা দায়। নোংরা রাজনীতি চলে শিক্ষক দের মধ্যে। কেউ ভালো পড়ালেই তার নামে সমালোচনা। কোনও পুরুষ কোনও মহিলার সাথে কথা বললেই সেটা নিয়ে নোংরা কথা। জনপ্রিয় হবার জন্য শিক্ষক অন্য শিক্ষককে নিয়ে রসালো আলোচনা করছে ছাত্র ছাত্রীদের সাথে, পরীক্ষার প্রশ্ন আউট করে দিচ্ছে। আরও শুনবি? উঁচু ক্লাশের মেয়েদের গায়ে হাত দিচ্ছে পিতৃতুল্য শিক্ষক। চারিদিকে corruption, নোংরামি, ভণ্ডামি। কিন্তু তবু ওই স্কুলটাকে ভালোবাসি আমি। রাতে যত খারাপ লাগা, মনখারাপ নিয়ে শুতে যাই না কেন, রোজ ভোরে যখন ঘুম ভাঙে, আমার বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়ে গুলোর নিষ্পাপ, লাবণ্যে ভরা মুখ গুলো মনে পরে। মনে হয় কতক্ষণে স্কুলে গিয়ে সবাই সমবেত হয়ে উপাসনা করবো। ক্লাসে যখন সবচেয়ে দস্যি ছেলেটাও শান্ত হয়ে পড়া শোনে, যখন যে কোনও সমস্যায় নির্দ্বিধায় ওরা আমার কাছে আসে, যখন নিজেদের টিফিনটাও আমার সাথে ভাগ করে নেয়, তখন মনে হয় এই মুহূর্ত গুলোর জন্যই শতায়ু হতে চাই আমি”।
“তুই খুব ভাগ্যবান রে। সবাই ভালোবাসে তোকে। বাবা আর মা এর পর আর কেউ ভালবাসেনি আমায়। কেউ না”।
“কেউ না? আমি কেউ না? আমি ভালোবাসি না তোকে?”
“না। তোরা কেউ ভালবাসিস না আমায়। কেউ ভালবাসেনি আমায় কোনোদিন। কেউ না, কেউ না। শুধু নিজেদের ইচ্ছে মত ব্যবহার করেছে আমায়। আমার অনুভূতি নিয়ে খেলেছে। আর প্রয়োজন মিটে গেলেই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে আর ফিরেও তাকায়নি। অথবা, অবহেলা করেছে। চরম অবহেলা। কিন্তু কেন? কেন? কেন আমায় ভালোবাসা যায় না? আমি কি এতটাই খারাপ? এতটাই insignificant সবার কাছে? সবাই আঘাত দেয় আমায়। সবাই। including তুই। তুই আমায় একটুও ভালবাসিস না আর। একটুও বুঝতে চাস না আর। আমি বেঁচে আছি কি মরে গেছি জানতেও চাস না। আমি না ফোন করলে কথাই হয় না আমাদের। ফেসবুকে অনলাইন থাকা সত্তেও কথা বলিস না আমার সাথে। আমি টেক্সট করলে একটা রিপ্লাই অবধি দিস না। আগে তুই নিজের সব কথা বলতিস, আমার সব কথা শুনতিস। এখন তোর আমার জন্য কোনও সময়ই নেই। আগে সামান্য কিছু লিখলেই সবার আগে আমায় দেখাতিস। এখন তোর একটা লেখাও দেখি না। তোর হাতের লেখাটাই ভুলতে বসেছি। কেন এমন করিস ঋত? আমায় আর ভালো লাগছে না তোর? একঘেয়ে লাগছে আমায়? এতোদিন ধরে, এতোবার বলার পর সবে আজ তোর সময় হল আমার বাড়ি আসার। কী হয়েছে বল তো? আর কাউকে ভালো লাগছে?”
কান্নায় গলা বুজে আসলো রাইয়ের। দু চোখ ভেসে গেলো নোনাজলে। দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলে রাই। আর কাছে টেনে নেয় ঋত। রাই মাথা রাখে ঋতর বুকে। আর ঘুমে চোখ জুড়ে আসে ওর। যেন এই আশ্রয়টাই খুজছিল কত যুগ যুগান্ত ধরে। বুকের মধ্যে দমকে দমকে কাঁদতে থাকে রাই। আর ওর মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে দেয় ঋত। ওকে সময় দেয় ঋত। সমস্ত আবেগের নিরসনের সময় দেয়। ধীরে ধীরে শান্ত হয় রাই। ধরা গলায় বলে, “ সত্যি করে বল, তুই আমায় এখনও ভালবাসিস?” ওর কথায় হেসে ফেলে ঋত। সস্নেহে চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলে, “ভালোবাসার কি আর এখন, তখন বলে কিছু হয়? একবার যখন ভালবেসেছি, মৃত্যুর আগে মুক্তি নেই”। নাক টেনে বলে রাই, “ঠাট্টা করছিস? কর। আমি সবার কাছে একটা খোরাক হয়ে গেছি এখন”।
“কেন এভাবে বলিস রাই? আমার খারাপ লাগে না? তোকে ভালোবাসি আমি। আর সবসময় বাসবো। এইটুকু আমি জানি। ব্যাস”।
“সত্যি বলছিস? আমায় ছেড়ে কোনোদিন যাবি না তো? কথা দে, সবসময় থাকবি আমার কাছে। ছায়ার মত থাকবি আমার পাশে”।
“হ্যাঁ রে সোনা। এই তো, তোর কাছেই তো আছি”। এক চিলতে রোদ্দুর এসে পরে রাইয়ের মুখে। চোখ দুটো হেসে ওঠে। ও গলা জড়িয়ে ধরে চুমু খায় ঋতর গালে। আর সেই হাসি ছুঁয়ে যায় ঋত কেও। পরম স্নেহে চুমু দেয় রাইয়ের কপালে আর দুই চোখে।

রাইয়ের ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছিল ঋত। ঋতুপর্ণকে নিয়ে ফিচারটা দিব্য লিখেছে রাই। স্নান সেরে ঘরে ঢুকল রাই। আজ শাড়ি পরেছে ও। একটা ছাই ছাই রঙের সম্বলপুরী। মহালয়ার দিন ছোট থেকেই শাড়ি পরে রাই। আজ পিতৃপক্ষের শেষ, দেবীপক্ষের শুরু। ঋতর হাতে ম্যাগাজিনটা দেখে রাই বলল, “নেক্সট ইস্যুটা বিশেষ কবিতা সংখ্যা হচ্ছে। তোর লেখা পাঠিয়ে দিস”।
“ধুর। আমার আর লেখালিখি হবে না রে”।
“কেন হবে না? চাইলেই হবে। চাইছিস না। তাই হচ্ছে না”।
“কী জানি? তাই হবে। একদম ঘেঁটে আছি রে। স্কুলের পরিবেশটা দিন দিন বড্ড খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তারপর কাজের চাপ। আর পড়াশোনাটাও নতুন করে শুরু করেছি আবার। ভাবছি রিসার্চ করবো”।
চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে থেমে গেলো রাই। “কী বললি? রিসার্চ করবি? গ্রেট! বলিস নি তো আমায় কিছু! দেখেছিস তো কেন তখন বলছিলাম ওই কথাগুলো?”
“আরে দাঁড়া। এখনও ঢের দেরী। রিসার্চ করলে যাদবপুর থেকে করবো। এই সেশানে আর হবে না। নেক্সট সেশানে ট্রাই করবো। আপাতত নিখাদ, নির্ভেজাল পড়াশোনা। বুঝলি?”
“সত্যি রে। আমিও ভাবছি রিসার্চ করবো। মিডিয়া সায়েন্স নিয়ে। তারপর কোনও কলেজ বা institution-এ অধ্যাপনা করবো। এই চাকরিটায় থাকলে আর বাঁচবো না আমি। যত দ্রুত সম্ভব পালাতে হবে এখান থেকে। আপাতত দেখি, যদি ন্যাশানাল চ্যানেলে ঢুকতে পারি। প্রসার ভারতী রিক্রুট করছে। ভাবছি আপ্লাই করে দেব”।
“হ্যাঁ রে, সেটাই কর। ন্যাশানাল চ্যানেল এ অনেক এক্সপোজার পাবি। আর তাছাড়া, অন্যায়ের সাথে আপোষ করিস না। যা করলে নিজেকে ছোট করা হয় সেটা করিস না। যা করলে ভালো থাকবি সেটাই কর। তবে কী জানিস, কাজটাকে ভালো না বাসতে পারলে কিছুতেই শান্তি পাবি না। কাজেই, যেটাই করবি ভালোবেসে করবি। গ্রাসাচ্ছাদনটাই শেষ কথা নয় রে। শেষ কথা হল, মাথা উঁচু করে, জীবন কে ভালোবেসে বেঁচে থাকা। বুঝলি?”
“বুঝলাম”।
“কী বুঝলি? এদিকে আয়”।
রাই কাছে আসতেই জড়িয়ে ধরল ঋত। বুকে মুখ রেখে বলল, “সবসময় এতো গ্লুমি কালার পরিস কেন রাই?” রাই আলতো করে ওর চুলে আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “আসলে কী জানিস, ছোট থেকেই মাকে দেখছি সাদা শাড়িতে। এমনকি বাবা থাকাকালীনও মা খুব একটা রঙিন শাড়ি পরত না মা। কেমন করে ওই সাদা রং টায় হারিয়ে গেছি আমি। তাই আমারও রং ভালো লাগেনা। মাকে আমি কোনোদিন সাজতে দেখিনি। তাই আমারও সাজ ভালো লাগে না”। মুখ তুলে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, “না সাজতেও তুই ভীষণ সুন্দর”।
“হুহ। আমি আর সুন্দর! আমি জানি আমি কী!”
“সুন্দর কে এতো লিটারালি দেখছিস কেন? সৌন্দর্য মানুষের চামড়ায় নয়, মানুষের সত্তায় থাকে। আর আমি জানি, তুই সেখানেই সুন্দর। আর যেটা থাকে, সেটা ব্যক্তিত্ব। সেখানেও তুই অনন্য”।
“না রে ঋত। আমি আর পাঁচটা সাধারন মেয়ের মতই সস্তা। একঘেয়ে। আমি আলাদা কিছু নই”।
“পৃথিবীর কেউ সস্তা নয়। প্রত্যেকের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সহস্র সম্ভাবনা। তাই আজ যে সাধারণ, কালকেই সে অসাধারণ হতে পারে। পুরোটাই তার হাতে। আর অবশ্যই তার পারিপার্শ্বিকতা, তার অবস্থান”।
“হুম”। রাইকে আরও কাছে টেনে নিল ঋত। ওর ভিজে চুল সরিয়ে দিল কপাল থেকে। আলতো চুমু খেল সেখানে। তারপর শিশির ভেজা ঠোঁট রাখল রাইয়ের শুকনো পাতার মত ঠোঁটে। ক্রমে ওর সমস্ত ভালোবাসার স্থানগুলি ঋত ভিজিয়ে দিল আদরে আদরে। ভালোবাসায় ভিজিয়ে দিল রাইকে। ওর সমগ্র সত্তাকে। আর প্রতিটি স্পর্শ রাইকে নতুন নতুন মুক্তির পথ খুলে দিল। ও ছেড়ে দিল নিজেকে। নিঃসংকোচে, নির্দ্বিধায়। আর আঁকড়ে ধরল ঋতকে। আলিঙ্গনে, আশ্লেষে বাঁধতে চাইল ওকে। অত ভাললাগার মধ্যেও চোখে জল এলো ওর। ঋতর বুকে মাথা রেখে প্রলাপের মত বলে যেতে লাগলো, “আমায় ছেড়ে যাস না ঋত। যাস না। প্লীজ। প্লীজ। কেউ থাকে না আমার কাছে। আমি যাকেই ভালোবাসি, সেই চলে যায়। যাস না তুই। যাবি না বল। বল। কথা দে আমায়”। আর ঋত নিজের বুকের মধ্যে ওকে মিশিয়ে নিয়ে বলল, “যাব না। যাব না। যাব না”।


“The beginning of Autumn:
She floats in her autumn,
Yellowed like a leaf
And free...”
কাল থেকে শারদীয়ার ছুটি। আঃ! ভাবলেই মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখী রাই। আগামী পাঁচদিন ও সম্রাজ্ঞী! অফিস ফেরতা একবার কলেজ স্ট্রীটে ঢুকেছিল রাই। প্রায় দু তিনটে প্রকাশনার পূজাবার্ষিকী কিনল। পুজোয় এবার কোথাও বেরবে না আর। অফিস থেকে অনেক পাস, ভি আই পি কার্ড ইত্যাদি পেত। একটাও নেয়নি। এমনকি কোলকাতার বিশেষ বিশেষ পুজো গুলো কভার করতে যাওয়ার কথা ছিল। ও সেই assignment টাও নেয়নি। এই পাঁচ দিন ও কোনও কাজ করবে না। একদম নিজের সাথে কাটাবে। বই পড়ে, গান শুনে আর মুভি দেখে। দেবায়ুধের থেকে গোটা দশেক মুভি নিয়ে এসেছে। এই পাঁচদিন শুধু সেলিব্রেশান। অফিস থেকে ফিরে স্নান সেরে বই এর পুড়নো আলমারি টা ঘাঁটছিল রাই। এই বই গুলো ছুঁলেই যেন বাবাকে ফিল করতে পারে রাই। প্রায় সব কটা বইই বাবার কিনে দেওয়া। আর কিছু কিছু উপহারে পাওয়া। কিছু মায়ের দেওয়া। মায়ের শাড়ি গুলো অনেক দিন রোদে দেওয়া হয়না। কাল রোদে দিতে হবে। মায়ের আলমারির ডালা খুলে একটা একটা করে শাড়ি বের করতে লাগলো ও। শাড়ির ভাঁজে হঠাৎ খুঁজে পেল একটা পুড়নো খয়েরী মলাটের ডায়েরি। এই ডায়েরি টা তো রাইয়ের অনেক ছোটবেলার ডায়েরি। স্কুলে পড়াকালীন এই ডায়েরিটায় রোজ কিছু না কিছু লিখে রাখতো ও! সব্বনাশ! এটা এখানে এলো কী করে? মা কি লুকিয়ে লুকিয়ে ওর ডায়েরি পড়ত নাকি? কি কাণ্ড! মায়ের আলমারি মা ই গুছত সবসময়। তাই, সেই আলমারির ভেতরের রহস্য সম্পর্কে রাইয়ের কোনও ধারনাই নেই। ভীষণ ইচ্ছে করলো সবটা জানার। আর কী কী লুকোনো আছে মায়ের আলমারিতে? মায়ের শাড়ি গুলো নাকের কাছে আনতেই ন্যাপথালিনের হাল্কা গন্ধ পেলো। তার সাথে মিশে আছে কালো জিরে আর শুকনো লঙ্কার ঝাঁজাল গন্ধ। মন টা বড় খারাপ হয়ে গেলো। বাবা মায়ের একসাথে বাঁধানো ছবিটার দিকে তাকিয়ে জল ভরে এলো চোখে। নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস ফেললো রাই। নাহ, শুধু শুধু মনখারাপ করবে না ও। বরং ডায়েরি টা পড়া যাক। ডায়েরিটা মোটে অর্ধেকটা শেষ হয়েছে। পাতা ওলটাল রাই। নাকের কাছে এনে ঘ্রাণ নিল। পুড়নো ডায়েরির ঘ্রাণ। হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলার ঘ্রাণ।
১৩ই জানুয়ারি, ১৯৯৭, রাত ৯ টাঃ
এইটা আমার নতুন ডায়েরি। বাবা দিয়েছে। একটা পেন ও দিয়েছে। সেটা দিয়েই লিখছি। আজ আমাদের স্কুলে নতুন একজন স্যার এসেছেন। বিজ্ঞান এর। আমাদের একটুও পছন্দ হয়নি। উনি নাকি আমাদের অঙ্ক করাবেন। ওনার গোঁফ টা শুঁয়ো পোকার মত দেখতে। চোখ গুলো বনবিড়ালের মত। আমি এমনিতেই অঙ্ক বুঝি না। উনি পড়ালে নির্ঘাত ফেল করবো এবার।
১৯ শে জানুয়ারি, ১৯৯৭, রাত ১০ টা ২০
মা সবসময় আমায় বকে। আমি আজ কোনও দোষ না করা সত্তেও বকুনি খেলাম। চানাচুরের শিশিটা কি আমি ইচ্ছে করে ভেঙেছি? খেতে ইচ্ছে হলে কী করবো? মা ওপরের তাকে রাখে কেন? বাবা আমায় কক্ষনো বকেনা। বাবা খুব ভালো। বাবা আমায় রোববার museum নিয়ে যাবে বলেছে। বাবা কে বলে দেব, যেন মাকে সঙ্গে না নেয়।
৩ রা মার্চ, ১৯৯৭, দুপুর ৩ টে
কি মজা! আজ পরীক্ষা শেষ হল আমাদের। মা আজ মাংসের দো পেঁয়াজি রান্না করেছে। খুব ভালো খেতে হয়েছে। আমি কবে মায়ের মত রান্না শিখব? মা এতো ভালো রান্না করে, রান্নার মাসিকে যে কেন রেখেছে কে জানে! শুধু শুধু পয়সা নষ্ট! পয়সা কি খোলামকুচি?
৯ ই জুন, ১৯৯৭, সন্ধ্যে ৭ টা ২৫
সিদ্ধার্থ একটা কথা বলেছে আমায়। বুঝতে পারছি না কি করবো। ও বলল, আমি নাকি খুব ফর্সা। তাই, আমায় নাকি ও বিয়ে করবে। কারণ, ওর ফর্সা বউ ভালো লাগে। আমি শুনেই ওর বাঁ-কানটা আচ্ছা করে মুলে দিয়েছি। আর বলেছি ফের এমন বললে মিস কে বলে দেব। কিন্তু আমার খুব ভয় করছে। মা যদি জানতে পারে খুব বকবে আমায়। কী যে করি।
পড়তে পড়তে হেসে ফেললো রাই। উফ, কী পাকাটাই না ছিল ও। মনটা হঠাৎ ভালো লাগছে ওর। এই তো জীবনের মজা। এই আঁধার, তো এই আলো। কোনটাই চিরস্থায়ী নয়। এই এক একটা মুহূর্ত ই তো জীবন। এই সব ফেলে আসা মুহূর্ত গুলোই তো এক একটা নীলকণ্ঠ পাখি। যারা বয়ে আনে আনন্দের সংবাদ, জীবনের সংবাদ।
কলিং বেল বেজে উঠলো। এ সময় আবার কে এলো? উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই দেখে, হাসি মুখে দাঁড়িয়ে ঋত। আনন্দে লাফিয়ে উঠলো রাই।
“কি রে? তুই? হঠাৎ ? না জানিয়ে?”
“বলছি বলছি। ভেতরে তো ঢুকতে দিবি”। কাঁধে ব্যাগ আর হাতে একটা নামকরা শাড়ির দোকানের প্যাকেট নিয়ে ঢুকল ও। প্যাকেটটা ওর হাতে দিয়ে বলল, “দেখ। পছন্দ কিনা বল”। রাই তো পুরো থ! ঋত শাড়ি কিনেছে? কার জন্য? ওর জন্য? সূর্য কোনদিকে উঠেছিল আজ?
“কী রে, দেখ! তুই দেখ, আমি হাত মুখ ধুয়ে আসি। চা কর। কিছু খেতে দে। কুকুরের মত খিদে পেয়েছে মাইরি”।
প্যাকেটটা খুলে দেখে একটা ঘননীল রঙের ঢাকাই। নিজের চোখ কে বিশ্বাস হয় না। এটা ওর জন্য কিনেছে ঋত? নিজে পছন্দ করে? শাড়িটা যত খুলছে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে রাইয়ের। কী সুন্দর কাজ। কী অপূর্ব রং। তেমনি ফাইন ফেব্রিক! দু চোখ ভরে দেখল শাড়ি টাকে। এমন রঙিন শাড়ি এর আগে কোনোদিন পরেনি রাই। হঠাৎ ই শরীরটা কী হাল্কা লাগলো ওর! ও চট করে রান্নাঘরে গিয়ে চা এর জল বসিয়ে দিল। ভালো কামিনী-ধানের চিঁড়ে কিনেছে রাই। ফ্রিজে সব্জিও মজুত আছে। অতএব, চিঁড়ের পোলাও করার সিদ্ধান্ত নিল রাই।
হাত মুখ ধুয়ে এসে মাটিতে বসে পড়লো ঋত। বলল, “কী রে? পছন্দ?”
“ভীষণ!”
“তোর পুজোর গিফট!”
“থ্যাঙ্ক ইয়ু! কিন্তু তুই নিজে পছন্দ করে কিনেছিস? এসব আবার কবে শিখলি তুই? উন্নতি হয়েছে ছেলের!”
“হা হা হা। হুম, পছন্দ টা আমার। তবে, একজন আমায় সাহায্য করেছে”।
“সাহায্য? কে?”
“শ্যামা। আমাদের স্কুলে নতুন জয়েন করেছে। ও ইতিহাস পড়ায়। অসম্ভব ব্রাইট। সদ্য মাস্টার্স করেছে। ভীষণ ভালো মেয়ে। ছোট্ট গুড়গুড়ে। কিন্তু কী তেজ!”
“ওহ। বুঝলাম”। ভালোলাগাটা হঠাৎ যেন মিয়িয়ে গেলো। মুখটা ভার হয়ে গেলো রাইয়ের। কিন্তু মুখে কিছু বলল না। শুধু বলল, “তুই বস। আমি চা জলখাবার নিয়ে আসি”।
রান্নাঘরে গিয়ে আড়ালে দু ফোঁটা চোখের জল ফেললো রাই। তারপর ভাবল, ধুর। এসব কী যাতা ভাবছে। যার সাথেই গিয়ে কিনে থাকুক, কিনেছে তো রাইয়ের জন্যই।
চা আর খাবার নিয়ে ঢুকে দেখল দেওয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুজে বসে আছে ঋত। কী কোমল ওর মুখটা। কী মায়ায় ভরা ওর চোখ দুটো। এক মাথা এলোমেলো চুল। ঋতকে দেখলে রাইয়ের মনে হয়, বুঝি বা ওরই না-জন্মানো ছেলে ও। নিজের মনেই হেসে ফেললো রাই।
“কিন্তু, তুই আমার জন্য শাড়ি কিনলি। আমি তো কিছুই কিনিনি রে। কী দেব তোকে পুজোয়?”
“কী আবার দিবি? সবসময়ই তো দিচ্ছিস কিছু না কিছু। আমার ইচ্ছে হল, তাই দিলাম। ফর্মালিটি করিস কেন?”
“না রে। ফর্মালিটি নয়। আসলে, মা ই তো কেনাকাটা করতো। আমি নিজের আর মায়ের জন্য ছাড়া আর কারুর জন্যই কিনিনি কখনো। আর হ্যাঁ তোর জন্য ও। কিন্তু, পুজোর হিসেবে তো। মানে আমি নিজের জন্য ও কিছু__”
“তুই থামবি এবার? কী পাগলামি করছিস?”
“না না, তোকে কিছু একটা নিতেই হবে। কী নিবি বল”।
“যা চাইব তাই দিবি?”
“একদম। ডিল। বল কী চাই?”
“বেশ। তাহলে তুই আমার সাথে বর্ধমান যাচ্ছিস। আমার বাড়ি। পুজর ছুটি আমরা একসাথে কাটাবো। রাজী?”
“সত্যি বলছিস? তুই নিয়ে যাবি আমায়? অবশ্যই যাব! কবে যাচ্ছিস তুই?”
“কাল। ভোরে”।
“কাল? আগে বলবি তো? কিছু গোছানো নেই তো!”
“কিচ্ছু নিতে হবে না। শুধু টাকা পয়সা সঙ্গে নিস। তোকে ঘাড়ে করে ঘোরাতে পারব না। আর আমার মা, জ্যাঠাইমা, দিদিরা, বোনেরা আছে। অতএব জামাকাপড়ের সমস্যা হবে না। ও হ্যাঁ, দাঁত মাজার ব্রাশ টা সাথে নিস। ওটা ইম্পরট্যান্ট। আর__”
“উফ! থামবি তুই? আমায় লিস্ট করতে হবে সব। ধুর। একটা জামা ইস্ত্রি করা নেই। ল্যাপটপে চার্জ নেই। এতো দেরী করে বললি না?” সসব্যস্ত হয়ে পড়লো রাই। চটপট লিস্ট করতে বসে গেলো। হঠাৎ বলল, “আমি কি দশমী অবধি থাকবো?” হেসে ফেলে ঋত। ওর কাছে গিয়ে গালে একটা আলতো চুমু খেয়ে বলে, “তোর যতদিন খুশি থাকবি”। একটু ভেবে নিয়ে রাই বলে, “একাদশীর দিন অফিস জয়েন করতে হবে। অর্থাৎ নবমী অবধি থেকে দশমীর দিন সকাল সকাল রওনা দিতে হবে”। ঋত ওর পাশে বসে পড়ে। ও বলতে থাকে__ “আমাদের বাড়িতে পুজো হয় শুনে স্কুলের সবাই প্ল্যান করেছিল এবার যাবে বলে। শেষ মুহূর্তে ক্যান্সেল করলো ওরা। বেচারি শ্যামা। ও কত আশা করেছিল যাবে! কেউ যাচ্ছে না বলে ওর ও যাওয়া হল না! ওকে দেখলেই না আমার ফেলে আসা দিন গুলোর কথা মনে পড়ে যায়। ইউনিভার্সিটির দিন গুলোর কথা। আমারাও একদিন এরকম সহজ ছিলাম। কত স্বপ্ন দেখতাম আমরা বল? সব কিছু পাল্টে দেবার। সমাজ টা বদলে দেবার। জীবনের নিয়ম গুলো উল্টে দেবার। কিন্তু, কিছুই পারলাম না রে। সময় চলে গেলো। বয়স বেড়ে গেলো। যে অচলায়তনে ছিলাম, সেখানেই থেকে গেলাম। না পারলাম বেরোতে। না পারলাম ভাঙতে”। ভেতরে ভেতরে ব্যাথা পাক দিয়ে উঠলো রাইয়ের। আবার ওর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। শ্যামা নাম্নী মেয়েটিকে মারাত্মক হিংসে হচ্ছে ওর। তবু, চুপ করে রইল। ব্যাগ গোছানোয় মন দিল। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে একটা পূজাবার্ষিকী তুলে নিল ঋত। কিছুক্ষণ এলোমেলো পাতা ওলটানোর পর বলতে শুরু করলো__ “আমরা যখন এম এ সেকেন্ড ইয়ার, তুই বাদে আমাদের গোটা দলটাই গিয়েছিল আমাদের বাড়িতে। সপ্তমীর দিন গিয়ে নবমীর দিন ফিরে এসেছিল। এতো মজা হয়েছিল সেবার! তুই তো গেলি না!”
“মা যেতে দেয় নি। তাছাড়া, মাকে একা রেখে আমি যেতাম ও না কোথাও”। কেটে কেটে বলল রাই।
“হ্যাঁ। জানি। কিন্তু তোকে খুব মিস করেছিলাম। আমরা সারাদিন কত ঘুরেছি, খেয়েছি। দুপুরে ঠাকুর দালানে বসে গল্প করেছি। এমনকি আমাদের দোতলার দক্ষিণের বারান্দায় সারা রাত জেগে আড্ডা মেরেছি। আর অয়ন ওর ডি এস এল আর টা নিয়ে গেছিল। প্রাণ ভরে ছবি তুলেছিল ও। প্রতিটা মুহূর্তই যেন ক্যাপচার করে রাখতে চায়! আমাদের বাড়ীটা সবার মারাত্মক পছন্দ হয়েছিল। জানিস? অষ্টমীর দিন শাড়ি পরেছিল আত্রেয়ী। কী সুন্দরী যে লাগছিল ওকে সেদিন। একেবারে অন্য রকম। জানিস রাই? সেদিন প্রথম ওকে ছুঁয়েছিলাম। আদর করেছিলাম ওকে। কী সহজ ছিল আত্রেয়ী। সহজ, সুন্দর। কেমন করে যে ও এমন বদলে গেলো? কে জানে কেমন আছে ও এখন?” আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না রাই। দাঁতে দাঁত চেপে কান্না চাপল ও। শুধু কাঁধ থেকে ঋতর হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল, “তুই বরং একটা কাজ কর। শ্যামা কে নিয়ে যা তোর সাথে”।
খেয়ালে ডুবে ছিল ঋত। অস্ফুটে বলল, “হুম? শ্যামা?”
“হ্যাঁ। শ্যামা। ওকে নিয়ে যা। আত্রেয়ী কে তো কাছে পাচ্ছিস না। আপাতত শ্যামাকে দিয়ে কাজ চালিয়ে নে। আর এই শাড়িটাও তুই ওকেই দিস। আমার চাইনা। তাছাড়া, শাড়ির রং টা বড্ড ক্যাঁটকেটে। এটা নিশ্চয়ই ওরই পছন্দ? এটা নিয়ে যাস। ওকেই দিয়ে দিস”।
নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারছিল না ঋত। “কী বলছিস এসব তুই? তোর মাথা ঠিক আছে তো? তোকে ভালো কথা বলছি ডাক্তার দেখা রাই। তুই অসুস্থ। চিকিৎসা দরকার তোর”।
“হ্যাঁ সেই। আমারই তো দরকার চিকিৎসার! আমি তো পাগল! আর তোরা সবাই ভীষণ ভাবে সুস্থ। সত্যিটা বললাম বলে খুব গায়ে লাগলো না রে?”
“কোনও কিছু না জেনে, না বুঝে কথা বলার অভ্যেসটা বন্ধ করবি একটু? রাই, শ্যামা আমার বোন। একটা বাচ্চা মেয়ে। তাকে নিয়ে নোংরা কথা বলিস না প্লীজ”।
“বললেই নোংরা হয়ে যায়। করলে হয় না। না?”
“তুই চুপ কর প্লীজ। আমি আর সহ্য করতে পারছিনা তোকে”। কান্নায় ভেঙে পড়লো রাই। ঋত চুপ করে রইল। কোনও কথা বলল না। ওকে কাছেও টেনে নিল না। অনড় বসে রইল। কাঁদতে কাঁদতে বলল রাই, “ তুই একবারও ভাবিস না, আমার কেমন লাগে কথা গুলো শুনতে। আমি বেশ বুঝতে পারছি আমাকে তোর আর ভালো লাগছে না। আমায় তুই কোনও দিনই ভালো বাসিস নি ঋত। আজ আত্রেয়ী তোর সাথে থাকলে আমার দিকে ফিরেও তাকাতিস না। ও নেই বলে, আমার কাছে আশ্রয় পেতে চেয়েছিলি। আমায় চাস নি তুই”।
“রাই, কী হলে কী হতো, এগুলো ভেবে কোনও লাভ আছে? যা হওয়ার নয়, তা হয়নি, ব্যাস। ফুরিয়ে গেলো। এই মুহূর্ত টার কথা ভাব। এই মুহূর্তে আমি তোকেই ভালোবাসি। তোকেই চাই সারাজীবনের জন্য। কিন্তু এটাও ঠিক, একটা সময় আমি আত্রেয়ী কে ভালোবেসে ছিলাম। আর সেই ভালোবাসাকে আমি সম্মান করি। কী হয়েছে, কী হয়নি, সেটা লিস্ট ইম্পরট্যান্ট। ভালবেসেছিলাম সেটাই শেষ কথা। আর সারাজীবন ভালবাসবো। সেই ভালোবাসায় কোনও চাওয়া নেই। কিছু পাওয়ারও নেই”।
“আমার আপত্তি টা এখানেই। তুই একই সাথে আমাকেও ভালবাসবি? ওকেও ভালবাসবি? এটা হয়না ঋত। একটু ভেবে দেখ। এটা ভীষণ ভীষণ insulting! আমি যদি আজ বলি, যে আমার সমস্ত পুড়নো প্রেমিক দের আমি সারাজীবন ভালবাসবো। আবার তোকেও ভালবাসবো। কেমন লাগবে তোর?”
“কেমন লাগবে? আমায় তো ভালবাসছিস। আমার আর কী চাই? বাস না যাকে খুশি ভালো। আমার কী? তুই খুশি থাকলেই আমি খুশি”।
“শোন, এই সব বড় বড় কথা বলা সহজ। মেনে নেওয়া কঠিন। খুব খুব কঠিন। আমি যদি তোকে লুকিয়ে অন্য কাউকে ভালোবাসি? অন্য কাউকে কামনা করি? কেমন লাগবে তোর?”
“তোর যদি ভালো লাগে কর না। বললাম তো, তোর যা ভাললাগে তাই কর। আমার কোনও সমস্যা নেই। শুধু আমার জায়গাটা অন্য কাউকে দিয়ে দিস না, তাহলে কষ্ট পাবো”।
“সেটাই রে। সবাই নিজের একটা জায়গা চায়। আমিও তাই চাই। আমার খুব লোভ হয় ওই জায়গাটার জন্য, যেটা তুই আত্রেয়ী কে দিয়েছিলি। তুই আমায় কোনও দিন ওর মত করে ভালবাসিস নি ঋত। তোর মনে, প্রাণে, চেতনায়, সব জায়গায় ও রয়েছে। তোর সব লেখায় আমি ওর অস্তিত্ব টা ফিল করতে পারি। তোর সব স্মৃতিচারণে ও ঘুরে ফিরে আসে। কেন ঋত? কই আমার তো মনে পড়ে না কারো কথা? আমি তো তোকে ছাড়া কারো কথা ভাবতে পারি না। আমার তো কোনও পিছুটান নেই? রিগ্রেট নেই? কারণ, আমি তোর মধ্যে পরিপূর্ণতা পাই। আমার আর কাউকে চাই না। কিচ্ছু চাই না”।
“তোর কারো কথা মনে পড়ে না, কারণ, তোর প্রতিটা সম্পর্কই কষ্টের। অন্তত, তুই তাই মনে করিস। তুই পালাতে চাস ওই অতীত গুলো থেকে। তোর মনে করার মত কোনও ভালো স্মৃতি নেই। তাই মনে পড়ে না তোর। আর, প্রতিটা মানুষ স্বয়ং-সম্পূর্ণ। তোর ভালো থাকা, খারাপ থাকা, সমস্তটাই তোর ওপর। তুই কী ভাবে দেখছিস জীবন টাকে, তার ওপর। তুই নিজেই নিজের জন্য এনাফ। তোর, আমাকে বা অন্য কাউকেই দরকার নেই ভালো থাকার জন্য। জীবন কে তুই আসলে কিছু টুকরো থেকে দেখিস। আর সেই টুকরোগুলোকেই জীবন বলে ভাবিস। জীবনটা কে পরিপূর্ণতা দিয়ে ভাব। দেখবি, হাসি, কান্না, ভাল, মন্দ, সুখ, দুঃখ সব কিছু সমান সমান। কোনটার পাল্লা ভারী নয়। জীবনটাকে চিনতে শেখ রাই। জীবনটা আনন্দের বা স্বপ্নের জায়গা নয়। জীবন বড় কঠিন জায়গা। কিন্তু, সেটা যদি তুই ভালবাসতে পারিস, তাহলেই সুন্দর। জীবন আসলে একটা কঠিন অঙ্কের মত। যতক্ষণ না বুঝবি, যন্ত্রণায় ছটফট করবি, কিন্তু একবার বুঝে গেলেই দেখবি জলের মত সহজ। তুই না ঋতুপর্ণর ছবি ভালবাসিস? “উৎসব” দেখিস নি? কী বলেছে সেখানে? এই জীবনটাই আসলে একটা উৎসব। আমরাই শুধু এক একটা ঘটনাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলি। ওভাররিয়্যাক্‌ট করি। সহজ করে ভাব। দেখবি, জীবন সহজ। জটিল করে ভাবলেই জটিল”।
“আমার প্রতিটা মুহূর্তে মরে যেতে ইচ্ছে করে জানিস? কী নিয়ে বাঁচবো বলত আমি? কী নিয়ে? কাকে নিয়ে? কিচ্ছু নেই আমার। মা বাবা নেই। একটা চাকরি আছে, যেখানে ঢুকলে মনে হয় নড়কে ঢুকলাম। একটা বন্ধু নেই যার কাছে নিজেকে খোলা যায়। পৃথিবীতে আর একটা মানুষ অবশিষ্ট নেই যে আমায় ভালোবাসে, বোঝে, সম্মান করে। এই সব গুলো আমি শুধু তোর কাছেই পাই ঋত। তাই তো তোকে আঁকড়ে ধরি বার বার। কিন্তু আমি যত তোর কাছে যাই, তত দূরে সরে যাস তুই। কেন এমন করিস বল তো? তুই তো জানিস অবহেলা, অনাদর সহ্য হয় না আমার। তাও কষ্ট দিস আমায়। আমি যে তোকে ছুঁয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম রে। তুই না থাকলে মৃত্যুর কাছে যাওয়া ছাড়া আর উপায় নেই আমার। ঋত। তুই হয় আমায় শান্তি দে, নয়ত মুক্তি দে। প্লীজ”।
“মরে যেতে ইচ্ছে হয়? তুই বোধহয় চোখের সামনে তিলে তিলে কাউকে মরে যেতে দেখিস নি। মৃত্যুর বীভৎসতা কী তা তুই জানিস না। আমার এক দূরসম্পর্কের পিসি ছিলেন জানিস? বিধবা পিসি। আমাদের বাড়িতেই থাকতেন। সারাজীবন সবার জন্য নিঃস্বার্থ ভাবে করেছেন, কিন্তু নিজে কখনো কিচ্ছু পাননি। সব সময় বলতেন, আমি মরে গেলে বেঁচে যাই। তারপর যখন সত্যি সত্যিই মারণরোগে আক্রান্ত হলেন, প্রতিটা মুহূর্তে জীবনটাকে ফিল করতে পারলেন। প্রতিটা মুহূর্তে কী তীব্র বাঁচার আকাঙ্ক্ষা! লিভার ক্যান্সার হয়েছিল ওনার। অনেক চিকিৎসা করেও কোনও লাভ হয়নি। একেবারে শেষ অবস্থায় আর তাকানো যেত না জানিস? অস্থিসার চেহারা হয়ে গিয়েছিল। যখন যন্ত্রণা উঠত, ওনার ঘরের পাশে দাঁড়াতে পারতাম না। বাবা আর জ্যাঠা কে সবসময় বলতেন, আমি এখানে বাঁচবো না রে। আমায় কোলকাতায় নিয়ে চল। আমি মরতে চাই না। আমায় তোরা বাঁচা। এখনও মনে পরলে গায়ে কাঁটা দেয়। শেষ দিকে ওনার কাছে যাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছিলাম। এতো কষ্ট হতো। অজানা একটা ভয় হতো। মৃত্যু কে দেখে ফেলার ভয়! মারা যাবার পরেও ওনার মুখের দিকে তাকাইনি আমি। ওনাকে দেখে বুঝেছিলাম জীবনের মায়া কতো প্রবল। আসলে তুই, আমি ভীষণ ভালো আছি তো! না চাইতেই সব কিছু পেয়ে যাচ্ছি। তাই আমাদের থেকেও যারা হাজার গুণ বেশি কষ্টে আছে, তাদের কথা ভাবিনা। আর মৃত্যু মানে কী? পালিয়ে যাওয়া। হেরে যাওয়া। মরবি কেন তুই? সাহস করে একবার বেঁচে দেখ না? বীরাঙ্গনার মত বাঁচ! ভালবাস নিজেকে রাই। নিখাদ, নির্ভেজাল ভালবাস। সেল্‌ফ-পিটি খুব খারাপ জানিস তো? আর নিহিলিজম ও। এগুলো থেকে বেড়িয়ে আয়। প্লীজ”।
“জানিনা রে। আমি বাঁচতেই চাই বিশ্বাস কর। কিন্তু, আমার খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। জীবনটা আমায় যন্ত্রণা দিচ্ছে। আর তুইও”।
“বেশ। আমি চেষ্টা করবো নিজেকে rectify করার। দোষগুলোকে তুই চিনিয়ে দিস, আমি চেষ্টা করবো বদলানোর। আফটার অল, তোর প্রতি আমারও কিছু দায়িত্ব আছে, সেগুলো আমায় পালন করতেই হবে। আর, তোকে এতো কষ্ট দেবার জন্য, আয়াম রীয়েলি সরি। খুব অন্তর থেকে বললাম”। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল ঋত। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল রাই। ওর আর কিছু ভাললাগছে না। বাথরুমে গিয়ে ঠাণ্ডা জলের ঝাপটা দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে চোখ মুখ ধুলো রাই। অসম্ভব শূন্য লাগছে। কোনও যন্ত্রণা নেই, শুধু একটা শূন্যতা। কান্নাও আসছে না। একেবারে অসাড়, নাম্ব লাগছে নিজেকে। ধীর পায়ে ঝুল বারান্দায় এসে দাঁড়াল রাই। বড় সুন্দর একটা হাওয়া বইছে। রাস্তাটা একেবারে শুনশান। স্ট্রীট লাইটের নীচে মন কেমনের আলো। চার পাশের ঘন সন্নিবিষ্ট ফ্ল্যাট বাড়ি গুলো যেন ভূতুড়ে বাড়ির মত দাঁড়িয়ে আছে। পাশের বাড়িতে বাবাইদার মেয়ে গান গাইছে, “শরতে আজ কোন অতিথি এলো প্রাণের দ্বারে__” আর, দূরে কোথাও শিউলি ফুটছে। নিঃশব্দে। ফুলের গন্ধে ভীষণ ঘুম পাচ্ছে রাইয়ের। মনে হচ্ছে, যেন কত জন্ম ঘুমোয়নি ও। বড় শান্ত, মুক্ত লাগছে নিজেকে। ও দ্রবীভূত হয়ে যাচ্ছে হাওয়ায়, আবছায়া আলোয়, সুদূর থেকে ভেসে আসা শিউলির গন্ধে, শিশির পতনে, আর বহুদূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দে। কাল দেবীর বোধন। প্রকৃতি আজ তারই আগমনী গাইছে। হঠাৎ সব কিছু ভাললাগছে রাইয়ের। গলার কাছটা কেমন ব্যাথা করে উঠলো। কতদিন গান গায় না ও! বাবাইদার মেয়ের গলাটা ভারী মিষ্টি হয়েছে তো!
“যে এসেছে তাহার মুখে
দেখ রে চেয়ে গভীর সুখে
দুয়ার খুলে তাহার সাথে বাহির হয়ে যা রে
শরতে আজ কোন অতিথি এলো প্রাণের দ্বারে
আনন্দ গান গা রে হৃদয়, আনন্দ গান গা রে”
নিজের মনেই হেসে ফেললো রাই। আর বুক ভরে শিউলির ঘ্রাণ নিল। ঋত তখনও একই ভাবে বসে শুকতারার পাতা ওলটাচ্ছিল। ওর কপালে ভাঁজ পরেছে। আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট। ওর মুখের দিকে কিছুক্ষন চুপ করে তাকিয়ে রইল রাই। তারপর ধরা গলায় বলল, “কাল কটায় ট্রেন?”
মুখ না তুলেই ঋত জানালো, “সকাল সাতটা পঁয়ত্রিশ”।
“ওকে। তুই বাড়ি যা। রেস্ট নে। আমার বিস্তর কাজ বাকি। আর__ আমার টিকিটটা কেটে নিস। আমি station এ পৌঁছে যাব সময় মত। তাহলে কত টাকা দেব?”
এবার মুখ তুলে সরাসরি রাইয়ের দিকে তাকাল ঋত। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে, একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলল, “কুড়ি টাকা। দে”।
দুজনেই একসাথে হা হা করে হেসে উঠলো। বাইরে তখন, ওদের হাসি ছুঁয়ে নিঃশব্দে ফুটছে শিউলি, আর শিশির মেখে, ক্লান্ত ঘাসফুল নীরবে ঘুম যাচ্ছে সোঁদা মাটির কোলে।
__________

আপনার মতামত জানান