আরণ্য/অদিতি সরকার

প্রথম পর্ব

ছবি- বিক্রমাদিত্য গুহ রায়

একটা আকাশ৷ উল্টোনো গামলার মত৷ একদম মাথার ওপর বরাবর ফ্যাকাশে নীল৷ যত গোল হয়ে নিচে নামছে তত চারদিকটা লালচে বেগুনি ছায়ামাখা দেখাচ্ছে৷ গামলার একেবারে কিনারে যেখানে আকাশ আর মাটি মিশে গেছে সেই জায়গাটা এখনও অস্পষ্ট, ধোঁয়াটে৷ রোদের আঙুল এখনও শাল সেগুনের চাঁদোয়া পার করে খোলা আকাশে পৌঁছোয় নি৷
একটা রাস্তা৷ চওড়া, ছড়ানো৷ কালচে ধূসর৷ ঠিক একটা না, অনেকগুলো রাস্তা মিলেমিশে একটা৷ পাহাড় থেকে জন্ম নিয়ে অনেকগুলো নদীর সরুমোটা ধারা যেমন একে একে এসে একটা চওড়া নদীতে মেলে ঠিক তেমনই৷ শহরের ঘিঞ্জি গলিঘুঁজি থেকে বেরোনো অনেকগুলো সঙ্গী সাথীকে বয়ে বয়ে এই পর্যন্ত এসে বেচারা রাস্তা এতক্ষণে একটু আরাম করে হাত পা মেলতে পেরেছে৷ এখন একলা রাস্তাটার দুপাশে চকচকে শহরী দোকান পসারের বদলে ট্রাক মেরামতির কালিঝুলি মাখা দোকান, ধাবার দড়ি ঝোলা খাটিয়া৷ ছাগল, মুরগি, কুকুর, ষাঁড়৷
রাস্তায় কিছু শহুরে লোক, কিছু দেহাতি৷ কিছু বড়, কিছু ছোট৷ কিছু পুরুষ, কিছু নারী৷ কিছু বুড়ো, কিছু আধবুড়ো, কিছু জোয়ান, কিছু নেহাতই অপোগণ্ড৷ কিছু সাইকেল, কিছু গাড়ি, কিছু পায়ে হাঁটা৷বেশির ভাগেরই পা রুটিরুজির ধান্ধায় শহরের দিকে৷কেউ কেউ যাচ্ছে বটে উলটো মুখে৷ তারা সংখ্যায় নেহাতই কম৷
উলটোমুখোদের দলে সবার আগে একটা জিপ৷ শহরটার দিকে পিঠ ফিরিয়ে চারটে ঘুরন্ত চাকা কালচে ধূসর অ্যাসফল্টের টানটান করে বিছানো চওড়া রিবনের ওপর দিয়ে অপরিসীম দ্রুততায় পিছলে পিছলে যাচ্ছে৷ প্রতিটা ঘূ্র্ণনের সঙ্গে সঙ্গে পিছিয়ে যাচ্ছে নগর, জনপদ, সভ্যতা৷ ক্রমশ নিকটবর্তী হচ্ছে অরণ্য৷ অসংস্কৃত,আদিম৷ আস্তে আস্তে খসে পড়ে যাচ্ছে রঙিন শহুরে নির্মোক৷ জোর করে চেপে রাখা গোপন উত্তেজনায় ভেতরে ভেতরে থরথর করে কাঁপছে শরীর৷ শিরা ধমনী ছাপিয়ে রক্ত বইছে জোরে, আরও জোরে৷ লালচে হয়ে উঠছে কানের লতি, ফুলে উঠছে নাকের পাটা৷ অল্প অল্প কাঁপছে গালের পেশি৷ দ্রুত থেকে আরও দ্রুত হয়ে উঠছে শ্বাসের গতি৷ স্টিয়ারিঙে শক্ত হচ্ছে হাতের মুঠি৷ পা চেপে বসে যাচ্ছে অ্যাকসিলারেটরে৷ দু পাশ থেকে হু হু করে চোখে মুখে ঝাপটা দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসে এখন পোড়া ডিজেলের গন্ধ নেই৷ তার বদলে হাওয়ায় এখন ভরপুর রোদের গন্ধ, ধুলোর গন্ধ৷ গন্ধ নিম তেলের, গন্ধ মহুয়ার, গন্ধ নির্ভেজাল উন্মাদনার৷
ড্রাইভার রামলাল জিপের পিছনের সিটে বসে আছে লাগেজ নিয়ে৷ স্টিয়ারিং আজ তার হাতে নেই৷ খোদ সাহেব চালাচ্ছেন আজ গাড়ি৷ ভাবলেশহীন মুখ রামলালের৷ মাথার মধ্যে কী চিন্তা ঘুরছে বাইরে থেকে কারো বোঝার সাধ্য নেই৷
চিন্তা অবশ্য ঘুরছে, ঘুরঘুরে পোকার মত অনেকরকম চিন্তাই ঘুরছে মগজে৷ কাণ্ড দেখে ভেতরে ভেতরে তার চোখ গোল হয়ে আছে৷ এতদিন হল এই সাহেবের গাড়ি চালাচ্ছে রামলাল, আজকের মত কাণ্ড এর আগে কোনোদিনও দেখে নি৷ আজকের ব্যাপারস্যাপার সবটাই একটু অন্য রকম৷
অন্যান্যবার ফরেস্টে সাহেব একলাই আসেন ইনস্পেকশনে৷ সে সার্কলের যে ব্লক, কি যে ফরেস্টই হোক৷ সেই ডিএফও যখন ছিলেন সাহেব তখন থেকে রামলাল তাঁর গাড়ি চালায়, এ নিয়মের অন্যথা কখনও হতে দেখে নি৷ এখন এত বড় পোস্টে উঠে গেছেন সাহেব, কনজাভটার না কি বলে সবাই, এখনও এই ভাবেই চলছে৷ জঙ্গল ভিজিট মানেই শুধু সাহেব আর রামলাল৷
কিন্তু আজ ভোরে গাড়ি নিয়ে গিয়ে বেধড়ক চমকে গেল রামলাল৷ অবশ্য পোড় খাওয়া ড্রাইভার সে,কাজেই চমকটা একটুও বুঝতে দেয় নি৷ সাহেবের সঙ্গে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে তার চুল পেকে গেল, কোথায় কেমন তমিজ রাখতে হয় তা রামলালকে শেখাতে হবে না৷ কিন্তু নিজে মনে মনে ঠিকই বুঝেছে, এবার একটু অসুবিধে তো হবেই৷ তার, সাহেবের, বাংলোতে সব ঠিকঠাক করে অপেক্ষা করতে থাকা শিউচরণের, সকলেরই একটু অসুবিধে তো হবেই৷ এবার যে সঙ্গে মেমসাহেবও এসেছেন৷
রামলাল তাই চুপচাপ পেছনের সিটে বসে চাকা যে দিকে গড়াচ্ছে গড়াতে দেয়৷
বেলা এখনও তেমন চড়ে নি৷ রাস্তায় খুব একটা ভিড় নেই সেই কারণেই৷ অবশ্য এই রাস্তায় সাধারণ গাড়িঘোড়া খুব একটা চলে না৷ টাউনের দিকেই ভিড়টা চোখে পড়ে৷ হাইওয়েতে মোড় নিলে অত ছোট গাড়ি কি পায়দল চলা লোকের উৎপাত ততটা নেই৷ এ দিক দিয়ে দূরপাল্লার ভারি ভারি ট্রাকই চলে বেশি৷ দূরে দূরে কিছু দেহাতি গ্রাম আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, তাদের বয়েল গাড়ি কি গাধার গাড়ি হাইওয়েতে বিশেষ ওঠে না৷ এর পরে তো গাড়ি জঙ্গলের দিকে ঘুরে যাবে৷ সেখানে দু একটা ফৌজি গাড়ি কি ফরেস্টের গাড়ি যদি চোখে পড়ল তো পড়ল, নইলে গাড়িটাড়ির ব্যাপারই নেই৷ এ জঙ্গলে ট্যুরিস্টও আসে না যে তাদের গাড়ি দেখা যাবে৷
ফেব্রুয়ারির শেষ প্রায়, হাওয়ায় তাপ আসে নি এখনও৷ শীত শীত আমেজ আছে বেশ৷ আর দু মাস পরেই চড় চড় করে পারা উঠে যাবে কোথা থেকে কোথায়৷ সেন্ট্রাল ইণ্ডিয়ার দুর্দান্ত গরম মানুষ তো কোন ছার, অমন যে জাঁদরেল জানোয়ার বাঘ তাকে পর্যন্ত খাবি খাইয়ে ছাড়ে৷ তখন আর দিনে রাতে এসি গাড়ি ছাড়া পথে বেরোনোর কথা ভাবাই যাবে না৷ এখন অবশ্য ছুটন্ত জিপের দু পাশ দিয়ে বইতে থাকা শনশনে হাওয়ায় কানে গলায় একটু ঠাণ্ডাই লাগছে বেশ৷
কিছুক্ষণ আগে থেকে রাস্তার দু ধারে পাতলা শালের বন শুরু হয়েছে৷ মধ্যে মধ্যে একটা দুটো করে মোটা মোটা সেগুন৷ আস্তে আস্তে এই বনই ঘন নিবিড় হয়ে আসবে৷ রহস্যময় গভীর গোপনতার গন্ধমাখা নিভৃত অরণ্য৷বেশি দেরি নেই আর৷
রণবীর আড়চোখে একবার পাশের আসনে বসা শালিনীর দিকে তাকায়৷ ঢাউস রোদচশমায় মুখের আধখানাই ঢাকা বলে অভিব্যক্তি বিশেষ ঠাহর করা যাচ্ছে না৷ ঘাড়ও বাইরের দিকেই ঘোরানো৷ একদিকের গাল গলাই যা দেখা যাচ্ছে৷ তাতে আর কতটুকু কী বোঝা যায়৷ মাথায় বাঁধা সিল্কের স্কার্ফের শাসন ছাড়িয়ে কয়েক গোছা চুল বেরিয়ে এসেছে৷ অবাধ্য হাওয়ার পাল্লায় পড়ে সেগুলো এলোমেলো ঝাপট দিয়ে যাচ্ছে চোখেমুখে, গালে গলায়৷
কোনওবার করে না, এবার যে কেন শালিনী এমন জেদ করল তার সঙ্গে জঙ্গলে আসার কে জানে৷সঙ্গে বউ নিয়ে ইন্সপেকশনে আসার অনেকগুলো অসুবিধে আছে, সেটা শালিনীকে বোঝানো মুশকিল৷ বেশি বারণও করা যায় না৷তাহলে আবার অন্য ঝামেলার সম্ভাবনা৷ যাক গে, ঠিক আছে, একবারই তো৷ বরাবর তো আর আসতে যাচ্ছে না৷ একবার ম্যানেজ করাই যায়৷ তবে আগে থেকে কিছু প্ল্যান হয়ে আছে, সেগুলোকে একটু এদিকওদিক করতে হবে, এই যা৷
অবশ্য হ্যাঁ, জঙ্গলের চোখ ঝলসানো রূপ দেখতে চাইলে এটাই তার ঠিকঠাক সময়, তাতে কোনও সন্দেহ নেই৷ পলাশ আর শিমুলের খুনখারাবি আগুনের শিখায় মাইলকে মাইল লালে লাল হয়ে আছে৷ লালের কত রকম যে শেড৷ চোখে ঘোর লাগিয়ে দেয় একেবারে৷ এত লাল, এত লাল, কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মাথায় ঝিমঝিম করে মাদল বাজতে শুরু করে৷ শালিনী সেই কখন থেকে বাইরের দিকেই চেয়ে আছে৷
রণবীর শালিনীর দিক থেকে চোখ সরিয়ে আবার সামনের রাস্তায় মন দেয় এবং সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ির উদ্দাম পাখা মেলা গতিটা সামান্য কমিয়ে আনে৷
পাকা রাস্তার ধার ঘেঁষে এক সারিতে চলেছে ওরা৷ এখন জঙ্গলে ঢুকছে, আবার বিকেলে ওইভাবেই দল বেঁধে বন থেকে কুড়িয়ে আনা শুকনো কাঠের বোঝা নিয়ে ফিরে আসবে৷ চকচকে কালো শরীরে আঁটোসাটো করে বেড় দেওয়া শুধু একটা খাটো কাপড়৷ শাড়ি কোনওমতেই বলা যায় না সেটাকে৷ এ পাশ ওপাশ দিয়ে গায়ের অনেক খানিই দেখা যাচ্ছে৷ সবল পায়ের গোছ৷ নির্মেদ পিঠ, সরু কোমর৷ কালো চুলে, কালো শরীরে জড়িয়ে থাকা সাদা রূপদস্তার গয়নায় অদ্ভুত কনট্রাস্ট তৈরি হয়েছে৷ সবারই দু হাত দিয়ে মাথার উপরে কিছু ধরে রাখা, খুব সম্ভবত খাবারের পুঁটলি৷ বাঁকাচোরা রেখাগুলো তাতে আরও স্পষ্ট, টানটান৷ হাঁটার তালে তালে তাদের সুপুষ্ট দৃঢ় ঊর্ধ্বাঙ্গ দুলে দুলে উঠছে৷ রণবীরের দৃষ্টি এই লোভনীয় দৃশ্যকে লেহন করে যায়৷ রিরংসা সম্মোহিত অবস্থায় সে আদৌ লক্ষ্যই করে না যে রোদচশমার ভেতর থেকে শালিনী তার দিকে খুব সূক্ষ্ম, প্রায় অদৃশ্য একটা হাসি ঠোঁটে নিয়ে চেয়ে আছে৷
যথেষ্ট সকাল সকাল বেরোনো সত্ত্বেও ফরেস্ট বাংলোতে এসে পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় সাড়ে এগারোটা বেজে গেল৷
হর্ন দিতে হয় নি, শিউচরণের অভ্যস্ত কান সজাগই ছিল৷ চেনা গাড়ির শব্দ পেয়েই সে গেট খুলতে দৌড়ে এসেছে৷ রণবীরের পাশে শালিনীকে দেখে তার বিস্মিত দৃষ্টি নিজের অজ্ঞাতেই চমকে রামলালের দিকে ঘোরে৷ রামলালের বহুদর্শী প্রবীণ চোখ না দেখি না দেখি ভঙ্গিতে উদাসভাবে অন্যদিকে চাওয়া৷ শিউচরণ যা বোঝার বুঝে নিয়ে চটপট মুখে বিগলিত হাসি টেনে আনে৷
-‘রামরাম সাব৷ রামরাম মেমসাব৷ কত ভাগ আমাদের কে ইসবার মেমসাব ভি আসলেন৷ আইয়ে মেমসাব, ভিতর আইয়ে৷’
শালিনী মৃদু হেসে মাথা ঝোঁকায়৷
অভিবাদন প্রত্যভিবাদন বিনিময়ের মধ্যেই প্রভু ও ভৃত্যের মধ্যে অতি সঙ্গোপনে একটি গভীর অর্থপূর্ণ সাংকেতিক দৃষ্টি চালাচালি হয়৷ ইশারায় নীরব বার্তা পৌঁছে যায় যেখানে পৌঁছবার৷
শিউচরণ আর রামলাল দু জনে মিলে গাড়ি থেকে চটপট মালপত্র নামিয়ে ফেলছিল৷ মাল আর কী, দুজনের দুটো ট্রলি ব্যাগ শুধু৷ দু তিন দিনের মত জামাকাপড়, কিছু টুকটাক ওষুধপত্র, সাধারণ প্রসাধনী কিছু, এই তো৷ দুটো পাঁচ লিটারের জলের বোতল৷ জঙ্গলে এর বেশি আর কী-ই বা লাগবে৷ এ ছাড়া আর যা যা সব দরকারি ব্যবস্থা এখানে তার সবই পাওয়া যায়৷ শিউচরণ ওস্তাদ লোক৷ না পারে হেন কাজ নেই৷
দু চোখে কৌতূহল মেখে শালিনী এদিক ওদিক দেখছিল৷ সানগ্লাস এখন চোখ ছেড়ে কপালে উঠেছে৷ ক্যামেরা ঝুলছে কাঁধে৷
পুরনো ব্রিটিশ কলোনিয়াল স্থাপত্য৷ মোটা মোটা দেওয়াল৷ বিরাট উঁচু সিলিং ঢালু হয়ে নেমে এসেছে৷ চারদিক ঘুরিয়ে চওড়া বারান্দা৷ বাংলোর থেকে আলাদা করে একটু পেছন ঘেঁষে আরও একসারি ঘর রয়েছে, বোধহয় চাকরবাকরদের থাকার ব্যবস্থা৷ একটা মস্ত ইঁদারাও আছে ওই দিকেই৷ইঁদারার ঠিক পাশে একটা বিরাট মহুয়া গাছ৷ রোদের তাতে ঝরা মহুয়ার গালিচা থেকে ঝিম ধরানো ভাপ উঠছে৷ তার ওপরে ছাতারে পাখির দলের প্রচণ্ড ক্যাঁচরম্যাচর৷ কাছাকাছিই কোথাও পাতার আড়ালে বসে একটা কোকিল ক্রমশ চড়া থেকে আরও চড়ায় সুর তুলে এক নাগাড়ে ডেকেই চলেছে৷ গলা চিরে যাচ্ছে পাখিটার তবু ডাক থামছে না৷
বাংলোর হাতার মধ্যেও প্রচুর পলাশ৷ দাউ দাউ জ্বলছে৷
-‘কী, কেমন লাগছে? বললাম বোর হবে, শুনলে না তো৷ এখানে কেবল টেবল কিচ্ছু পাবে না৷ মোবাইলের টাওয়ারও নেই ধারে কাছে৷’
রণবীর এসে আর কোনওদিকে তাকায় নি৷ এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে বাংলোর ভেতরে চলে গিয়েছিল৷ শিউচরণকে খুব জরুরি কতগুলো নির্দেশ দেওয়ার দরকার হয়ে পড়েছিল৷ কথাগুলো এক্ষুণি না বলতে পারলে সব গড়বড় হয়ে যাবে৷ কাজটা শালিনীর সামনে করায় সমস্যা ছিল৷ অবশ্য শিউচরণ পাকা লোক, তাকে সব কিছু মুখ ফুটে বলার প্রয়োজনও হয় না, তবু শুধু শুধু কেন ঝুঁকি নেওয়া৷ যাক্,যাকে যা বলা-কওয়ার সব হয়ে গেছে, এখন রণবীর অনেকটাই নিশ্চিন্ত৷ রান্নাঘরে শিউচরণের ভরে রাখা ফলের ঝুড়ি থেকে একখানা আপেল তুলে নিয়ে কামড়াতে কামড়াতে এবার সে বাইরে এসেছে৷
শালিনী মুখ না ঘুরিয়েই হালকা হাসে, জবাব দেয় না রণবীরের প্রশ্নের৷ ক্যামেরা তার কাঁধ থেকে চোখে উঠেছে৷ কোনও একটা ছবিই কম্পোজ করছিল বোধহয় মন দিয়ে৷ সেদিকেই মনোযোগ স্থির৷ রণবীরের দিকে তাকায় না শালিনী৷
-‘জলটল খেয়েছ কিছু? একটু ফ্রেশ হয়ে নিলে পারতে৷ এতটা জার্নি, রাস্তার ধুলো৷ রেস্ট নিতে পারো তো একটু৷ কিচ্ছুই তো করার নেই তোমার এখানে৷’
-‘আমার টায়ার্ড লাগছে না তো৷বোরও লাগছে না একটুও ৷ আমার জন্য অত ভাবতে হবে না৷’ চোখ থেকে ক্যামেরা নামিয়ে এবারে উত্তর দেয় শালিনী৷ হাসিমুখেই উত্তর দেয়৷ ‘তুমি চিন্তা কোরো না, আমার সময় ঠিক কেটে যাবে৷’
-‘আচ্ছা? গুড, ভেরি গুড৷’ রণবীর স্পষ্টতই অন্যমনস্ক৷শালিনী সেটা লক্ষ্য করেছে কি না অবশ্য তার মুখ দেখে বোঝা যায় না৷
-‘ওকে, তাহলে তুমি থাকো এখানে, ঘুরে দ্যাখো এদিক ওদিক, ছবিটবি তোলো৷ আমি বরং বেরিয়ে পড়ি৷ এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে অনেক৷’
রণবীর হঠাৎই ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে৷
–‘শিউচরণ রইল, কিছু লাগলে টাগলে ওকে বোলো৷ আর হ্যাঁ, বাংলো থেকে একা বেরিও না৷’
-‘কেন? বাঘ আসবে নাকি এখানে? এই দিনের বেলায়?’-শালিনী হাসে৷
-‘বাঘ আসে না মেমসাব, তবে তেন্দুয়া, মানে লেপার্ড এসে যায় কভি কভি৷’- শিউচরণ কাছাকাছিই ছিল কোথাও, সবিনয়ে এগিয়ে আসে৷–‘বাংলোর বাইরে আকেলা না যাওয়াই ভালো৷’
-‘মেমসাবের খেয়াল রেখো শিউচরণ, আমি চললাম৷ আসতে রাত হবে শালিনী, চিন্তা কোরো না৷চল রামলাল৷সি ইউ দেন শালিনী, টেক কেয়ার’৷
একটা অনির্দিষ্ট হাত নেড়ে লাফিয়ে জিপে উঠে বসে রণবীর৷ এখানে এবার চালানোর দায়িত্ব রামলালের৷ একরাশ ধুলো উড়িয়ে রণবীরকে নিয়ে জিপ বেরিয়ে যায়৷
-‘লাঞ্চে কী হুকুম মেমসাব?’
শালিনী দূর থেকে আরও দূরে ক্রমশ ছোট থেকে আরও ছোট বিন্দু হয়ে যাওয়া জিপটার দিকে চেয়ে ছিল, শিউচরণের বিনীত প্রশ্নে ঘাড় ফেরায়৷ তার দুই ভ্রূর মাঝে আবছা ছায়ার মত খুব অস্পষ্ট ভাঁজ৷
-‘কী আছে তোমার ভাঁড়ারে শিউচরণ?’
#
দিনের বেলাতেও প্রায়ান্ধকার এই মাটির ঘরে অদ্ভুত একটা বন্য গন্ধ৷ খুব একটা খারাপ লাগে না কিন্তু গন্ধটা৷ ছায়াচ্ছন্ন গোপন দুপুরে বেশ ঝিমঝিমে নেশা ছড়ায়৷ শুকনো ঘাস, গোবর মাটি এগুলো চেনা৷ বোধহয় শুকনো মহুয়াও৷এ সব ছাড়াও আরও কিছু অন্য অচেনা গন্ধ এখানে হাওয়ায় মিশে আছে৷ জমাট, কঠিন৷ এতটাই কঠিন যেন মনে হয় ছুরি দিয়ে সেই গন্ধের পরতকে টুকরো টুকরো করে কাটা যাবে৷
আর আছে নিমতেল৷ সব কিছুকে ছাপিয়ে নিম তেলের তীব্র চড়া গন্ধ সারা ঘরে ভাসে৷ অভ্যেস না থাকলে সহ্য করা মুশকিল৷ রসুন আর চিনেবাদামের গন্ধ একসঙ্গে মেশালে যেমন হয় অনেকটা ঠিক সেই রকম৷ উগ্র, আঠালো৷ একবার গায়ে কি জামাকাপড়ে লাগলে সহজে যেতে চায় না৷ অথচ এই তেলই নারী পুরুষ নির্বিশেষে অরণ্যের সন্তানদের সবথেকে প্রিয়৷ প্রসাধন বললে প্রসাধন, ওষুধ বললে ওষুধ৷মাথার চুল থেকে পায়ের নখ, সর্বত্র তাদের নিমতেলে চকচকে মসৃণ ৷ বনবালার সে তৈলচিক্কণ দেহের স্পর্শ শহুরে তাতমাখা রুক্ষ পুরুষ শরীরের গরমের শীতলপাটি, শীতের উষ্ণ রজাইয়ের ওম৷
এও একটা বেশ নতুন অভিজ্ঞতা৷ বরাবর শিউচরণ বাংলোতেই ব্যবস্থা করে৷ এবার শালিনী সঙ্গে থাকাতেই জায়গা পালটাতে হয়েছে৷ তবে এই বা মন্দ কী? একটু মুখ বদল৷ অন্যরকম স্বাদ৷ঘাসের দড়ির খাটিয়াতে আধশোওয়া রণবীর আস্তে আস্তে আলো আঁধারিতে চোখ সইয়ে নিতে থাকে৷ ঘরের কোনে ছায়া আরও গভীর৷ সেখানে কী যেন নড়াচড়া করে, আকার নেয়৷ ছায়া ধীরে ধীরে কায়ার রূপ ধরে কাছে এগিয়ে আসতে থাকে৷ নিমতেলের গন্ধ জোরালো হয়৷ অন্ধকারের মধ্যে আরও গাঢ় অন্ধকারের প্রতিমা হয়ে নির্বাক নিরাবরণ অরণ্যদুহিতা রণবীরের সামনে আনতমুখে দাঁড়ায়৷

(আগামীকাল সমাপ্য)

আপনার মতামত জানান