আরণ্য/অদিতি সরকার

শেষ পর্ব


#
গাড়ি দূরেই রেখেছে রামলাল৷ পায়ে হেঁটে গিয়ে উঠতে হবে৷ এই সুঁড়িপথে জিপ আনা যেত না৷পথের ওপর এসে পড়া লতাপাতা এড়াতে রণবীরকেই অনেক জায়গায় মাথা নিচু করে আসতে হয়েছে৷ বলিহারি শিউচরণ৷ যখন যেমন তখন তেমন ব্যবস্থা করতে তার মত পাকা লোক দুটো মিলবে না আর৷
একটু ঘুমোতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু ইচ্ছেটাকে প্রশ্রয় দেয় না রণবীর৷ এখন ঘুমোলে গা ছেড়ে দেবে একদম৷আরাম পেলেই শরীর ব্যাটা পেয়ে বসে৷
তা আরাম হয়েছে, ভালোই আরাম হয়েছে৷ এই জংলি মেয়েগুলো আর কিছু না পারুক, জি খুশ করে দিতে পারে৷ আদ্ধেক দিন পেট ভরে খেতে পায় না, অথচ এ রকম টানটান কী করে থাকে এও এক রহস্য৷ ওহ্, এ যে কী নেশা, কী নেশা৷ এতগুলো জঙ্গলের এতগুলো শরীরকে এতরকম ভাবে উলটেপালটে চেটেপুটে এতগুলো বছর কেটে গেল, তবু নেশার টান যদি এতটুকুও কমে৷ বরং দিনে দিনে আরও বাড়ছেই৷ ভরপুর আলোয় সামনে দাঁড় করিয়ে দিলে একটারও মুখ চিনতে পারবে না অবশ্য রণবীর৷তা চেনার দরকারই বা কী পড়ছে তার৷ সুখের সঙ্গে মুখের কী৷
তবে হ্যাঁ, রণবীর ফোকটে মজা লোটে এমন কথা তার অতি বড় শত্রুও বলতে পারবে না৷ যেমন মাল, তেমন দাম৷ চিরকাল তাই দিয়ে এসেছে সে৷ আজকের এই মেয়েটাও চলে যাওয়ার সময় ওর ওই মোটা কাপড়ের খুঁটে যথাযোগ্য মূল্যই বেঁধে নিয়ে গেছে৷
রক্তের কামড় ঠাণ্ডা হয়েছে,এবার অফিসিয়ালি যে কাজের জন্য জঙ্গলে আসা তার প্রথমটা সারতে হবে৷ অর্থাৎ স্টাফ মিটিং৷ কাল সকাল থেকে জঙ্গল ইনস্পেকশন৷ এই এরিয়াটায় বেশ কিছুদিন ধরেই কাঠ পাচার নিয়ে একটা ঝামেলা পাকিয়ে উঠছে৷ এটাকে এখনই শক্ত হাতে ধরতে না পারলে মুশকিল৷ এ ব্যাপারগুলো একেবারে বন্ধ করা যে যায় না তা অতিবড় গাধাও জানে৷ অনেক অনেক রাঘববোয়ালদের বিশাল হাঁ জড়িয়ে আছে এতে৷ কিন্তু একেবারে খুল্লমখুল্লা চালাতে দেওয়াটাও তো উচিত নয়৷ সরকারি লোক হিসাবে মাঝে মধ্যে একটু আধটু লাগাম তো টানতেই হয় কিনা৷
খাটিয়া থেকে নেমে বড় করে আড়মোড়া ভাঙে রণবীর, হাত পা ছাড়িয়ে নেয়৷ মনটা একটু চা চা করছে তার এখন৷ চা রেঞ্জ অফিসে গেলেই পাওয়া যাবে অবশ্য৷ কনজার্ভেটর সাহেব ইনস্পেকশনে এসেছেন এ খবর তো অনেক আগেই যথাস্থানে পৌঁছে গেছে৷ সবাই এতক্ষণে তৈরি নিশ্চয়ই৷ জামার বোতাম আঁটতে আঁটতে ঘরের বাইরে আসে রণবীর৷
ঝুপড়ি ঘরের অন্ধকার থেকে বাইরের আলোতে এলে হঠাৎ চোখ ধাঁধিয়ে যায়৷ তা বুঝেই ঝপ করে বার হয় নি রণবীর৷ চোখে সানগ্লাস পরে নিয়েছে৷ তবু দেখতে একটু অসুবিধে হচ্ছিলই৷ তারই মধ্যে ঘরের বাইরে একটা পা রেখেছে কি রাখে নি, তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বন্যার জলের মত চারদিক থেকে তাকে কী যেন এক ভয়ংকর সম্ভাবনার সংকেত পাঠাতে থাকে৷ কী সেই সম্ভাবনা পরিষ্কার করে না বুঝলেও এমনই জোরালো সে সংকেত যে তাকে অগ্রাহ্য করে রণবীর আর একচুলও নড়তে পারে না৷ বাড়ানো পা পিছিয়ে নিয়ে সে তীক্ষ্ণ চোখে চারদিক খুঁজতে থাকে৷ কোথায় বিপদ? কোথায়?
ঠিক তার পায়ের সামনে কী ওটা? শিমুল গাছটার তলায় জমা শুকনো পাতার স্তূপ না একটা? কিন্তু পাতার স্তূপ কি অমন পাক খেয়ে ফুলে ফুলে ওঠে? না তার ভেতর থেকে অমন প্রেশার কুকারের মত তীব্র তীক্ষ্ণ শিস বেজে ওঠে?নিরীহ পাতার স্তূপ দেখলে শিমুল গাছের ওপর থেকে একজোড়া ফিঙে ঝাপট মেরে মেরে অমন পরিত্রাহি চেঁচাবেই বা কেন?
রণবীর সম্মোহিতের মত তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে থাকে হলুদে বাদামিতে ছোপ ছোপ আঁকা স্তূপটা এঁকে বেঁকে প্যাঁচখেতে থাকে কেমন৷প্যাঁচ খেতে খেতে স্তূপটা আস্তে আস্তে পাক খুলে একটা লম্বাটে ঢেউয়ের চেহারা নেয়৷ একটাভোঁতা তিনকোণা মাথা বার হয়ে আসে সেই অবিরাম ঢেউ থেকে৷পাতলা চেরা জিভ বিদ্যুৎ ঝলকের মত ঘন ঘন বার হয় আর ঢোকে৷চকচকে পুঁতির মত দুটো বিন্দু রণবীরের চোখের দিকেই স্থির৷
শীত শেষ হয়ে গরম পড়তে শুরু করেছে সবে৷ তিন মাস হিমঘুম আস্তে আস্তে ভাঙছে৷ একে একে অন্ধকারের আড়াল থেকে জড় হয়ে যাওয়া শরীরটাকে সেঁকে নিতে বেরোচ্ছেতারা৷ এখন চেতনা জুড়ে খিদে, শুধু খিদে৷একটা কাঠবেড়ালি, কি একটা দুটো মোটাসোটা মেঠো ইঁদুর, নিদেন কটা গিরগিটি৷যা জোটে৷ সামনের বড়সড় অবয়বটা কি খাদ্য, না বিপদ? চেরা জিভ বার বার গন্ধ শোঁকে, মাটি থেকে নিজের দেহটার প্রায় তিনভাগের একভাগ তুলে ফেলে ডাইনে বাঁয়ে দোলে সুদীর্ঘ চিত্রল সরীসৃপ৷৷
প্রথম চমকটা কেটে যেতেই রণবীর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় কোমরে হাত নিয়ে যায়৷ খুব সন্তর্পণে অবশ্যই৷ সামনের মূর্তিমান যমদূত যেন তার সামান্যতম নড়াচড়াও টের না পায় এমনই সন্তর্পণে৷ হাত দিয়ে কোমরের কাছে অনুভব করে এবং করেই হতাশ হয়৷ মনে মনে নিজেকেই অকথ্য গালি দেয় সে৷ অস্ত্রসহ বেল্ট জিপেই রয়ে গেছে৷ এমন ভুল তার সচরাচর হয় না৷ ভুল নয়৷ অপরাধ৷ ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ৷ চাকরি চলে যেতে পারে এমন অপরাধ৷ এমন বেখেয়ালি তার স্বভাব নয়৷আজ মাথার মধ্যে অন্য নেশার পাগলাটে হাতছানি দিক ভুলিয়ে টানছিল যে৷ তাতেই৷ নিরুপায় অসহায় রণবীর অতএব সাপটার চলে যাওয়ার অপেক্ষাতেই কাঠের পুতুলের মত দাঁড়িয়ে থাকে৷
কতক্ষণ ওইভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল রণবীর কোনো হিসেব নেই৷ হয়তো অনেকক্ষণ, হয়তো কয়েক মুহূর্ত মাত্র৷সময় তখন স্তব্ধ, স্থাণু৷ জগৎ লুপ্ত, চরাচর লুপ্ত৷ পায়ে ঝিঁঝিঁ ধরে অবশ হয়ে আসছে তবু নড়ার উপায় নেই৷ চন্দ্রবোড়ার বিষ মারাত্মক, নাক মুখ দিয়ে রক্ত ছুটিয়ে মারে৷ দেখা আছে রণবীরের৷
শিস বাজে, ঝিমঝিমে স্তব্ধ অপরাহ্নের হাওয়া কেটে কেটে শিস বাজতেই থাকে৷ রণবীরের চোখের পাতা ভারি হয়ে জড়িয়ে আসে, পা টলমল করে৷ জোর করে নিজেকে খাড়া করে রাখে সে,জানে এতটুকু নড়লেই সাক্ষাৎ মৃত্যু এসে আছড়ে পড়বে তার উপর৷
কে জানে কতক্ষণ কাটে, অনেকক্ষণ না অল্পক্ষণ৷ আস্তে আস্তে সাপটা নিজেকে গুটিয়ে নেয়৷ চিত্র বিচিত্র দীঘল অঙ্গে ঢেউ তুলে পেছন ফেরে৷ ঢেউ তুলে তুলে চলে যায় শিমুল গাছ ছাড়িয়ে দূরে, আরও দূরে, রণবীরের চোখের আড়ালে৷
সাপটা চলে গেলেও আরও কিছুক্ষণ ওইভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে রণবীর৷ এতক্ষণ ধরে প্রায় দমবন্ধ করে থাকার দরুণ শরীর তার এখন আকুলিবিকুলি করে বড় বড় ঢোঁকে হাওয়া গেলে৷ বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা হঠাৎ যেন একটা লাফ দিয়ে উথালপাথাল দৌড়তে থাকে৷
রামলালকে কিছু বুঝতে দেওয়া চলবে না এ খেয়ালটা ছিল৷ কাজেই জিপের কাছাকাছি আসতে আসতেই রণবীর নিজের বেতালা নিংশ্বাস প্রশ্বাসকে জোর করে ছন্দে ফিরিয়ে আনে৷ জিপের মধ্যে ঝিমোতে থাকা রামলালকে হাঁক দিয়ে তোলার সময় তার গলা শুনে কারও বোঝার সাধ্য ছিল না যে এক লহমা আগেই এই লোকটার ভেতরে কী তোলপাড় হচ্ছিল৷ শুধু প্রায় এক বোতল জল ঢকঢক করে শুষে ফেলার ধরনটা দেখে কেউ অবাক হলেও হতে পারত৷ রামলাল অবশ্য মনে মনে মুচকি হাসে৷ সে অবধারিত ভাবেই নিজস্ব বুদ্ধি দিয়ে এই আকণ্ঠ তৃষ্ণার একটা অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রাকৃত কারণ বার করেছে৷
রেঞ্জ অফিসে পৌঁছতে পৌঁছতে রণবীর নিজেকে সম্পূর্ণ সংহত করে নেয়৷ অন্য ব্যাপারে যাই হোক, কাজের বেলায় তার কোনও আপোস নেই৷ দক্ষ এবং কড়া অফিসার হিসাবে নাম আছে তার৷
সরকারি দফতরের মিটিং আবহমান কাল ধরে সবখানে যেমন হয়ে আসছে তেমনই হল৷ তবুও নিয়মরক্ষা করতে তো হয়ই৷
সবার সঙ্গে কথাবার্তা বলে টলে খাতাপত্রের ওপর চোখ বুলিয়ে উঠতে উঠতে বেশ সন্ধ্যেই হয়ে গেল৷ডিএফও উমাকান্ত প্রতিহারের সঙ্গে সঙ্গে রেঞ্জার মোহন পাসিও রণবীরকে জিপে তুলে দিতে বাইরে আসে৷
-‘একটা আর্মড গার্ড সঙ্গে থাকলে ভালো হত না স্যার? এই অন্ধকারে একদম একা বাংলোয় ফিরবেন?’ উমাকান্তের গলায় একটু চাপা উদ্বেগ মনে হয়৷
-‘কেন?এখানেও ঝামেলা শুরু হয়েছে নাকি? সেসব তো ছত্তিসগড় বর্ডারের দিকে৷’
-‘না, ওই ঝামেলা এদিকে তেমন নেই৷ তাও বলা তো যায় না৷ অ্যানিম্যাল যদি কিছু চলে আসে৷’
-‘আমার সঙ্গে আর্মস আছে, ঘাবড়াবেন না৷ রামলালও চৌকস লোক, ছোটখাটো ঝামেলা ঠিক ট্যাকল করে নিতে পারবে৷’
মোহন এতক্ষণ চুপ করে ছিল৷ এবার সেও মুখ খোলে৷-‘না স্যার, তাও একটু সাবধানে চলা ভালো৷ এই ব্যাটা ট্রাইব্যালগুলোকে কিচ্ছু ভরসা নেই৷ মাথায় একফোঁটা বুদ্ধি নেই, ও দিকে চুটকিতে খেপে ওঠে শালারা৷ দু পয়সা দিলেই ওদের দিয়ে যে যা খুশি করিয়ে নিতে পারে৷’

-‘আরে পুরুষমানুষের অত ভয় পেলে জিন্দগি চলে না৷ যো হোগা সো হোগা৷’ রণবীর আর কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে জিপে উঠে বসে৷-‘ঠিক আছে তাহলে, আজ চলি প্রতিহার৷ পরে কথা হবে৷ চলি মোহন৷ গুড নাইট৷’
সন্ধ্যে হয়ে গেলেও সে রকম অন্ধকার হয় নি৷আকাশে চাঁদ আছে৷ আজ কালের মধ্যেই বোধহয় পূর্ণিমা৷ এ চাঁদ শহরের চাঁদের মত ধুলোমাখা লালচে নয়৷ ঝকঝকে সাদা রুপোর থালা একখানা৷গাছের চাঁদোয়া ভেদ করে এসে পড়া সেই আশ্চর্য রকম সাদা চাঁদের আলোয় জঙ্গল জুড়ে অদ্ভুত এক আলো আঁধারের আলপনা তৈরি হয়েছে৷
সারাদিনের ক্লান্তি এবার ধীরে ধীরে রণবীরের ওপর চেপে বসতে শুরু করে৷ চোখ বন্ধ হয়ে আসতে চায়৷ বাংলোতে ফিরে আগে ভালোভাবে স্নান করতে হবে৷ সেই কোন সকাল থেকে হটরানি চলছে, বহুত ধুলোময়লা জমেছে গায়ে৷ বেশ করে স্নান না করলে তাজা লাগবে না নিজেকে৷ শালিনী একা আছে এতক্ষণ৷ তাকেও একটু সঙ্গ তো দিতেই হবে৷
রামলাল আচমকা কর্কশ শব্দে সজোরে ব্রেক কষায় রণবীর ছিটকে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলায়৷ বিশ্রী একটা গালি দেয় রামলাল৷
ঘুমক্লান্ত চোখে প্রথমটা রণবীর ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারে নি৷ এক ঝলকে মনে হয়েছিল বুঝি বা কোনও জংলি জানোয়ারই গাড়ির সামনে এসে পড়েছে৷ পরে নজর করে দেখল জানোয়ার নয়, মানুষ৷
রাস্তার ঠিক মাঝখানে প্রায় উলঙ্গ এক কৃষ্ণকায় পুরুষ৷ কৌপিনের মত কিছু একটা কোমরের নিচে জড়ানো৷ অঙ্গে কাপড় বলতে ওইটুকুই৷ গলায় পুঁতি না বীজ কে জানে কিসের কটা মালা৷ দুই বাহুতে তাবিজের মত কিছু বাঁধা৷ আর সারা গায়ে অসংখ্য উলকি৷ জিপের সামনে পাথরের মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ নিস্পন্দ, নির্বাক, প্রাগৈতিহাসিক৷ পথের দু ধারে দীর্ঘ ছায়া ফেলে ঝুঁকে আসা যুগপ্রাচীন শালের অরণ্যে আরও এক আদিম মহাবৃক্ষই যেন৷ কিংবা বৃক্ষের ফসিল৷ জটাধরা লম্বা পিঙ্গল চুল৷ দড়িপাকানো দেহ৷ ডান হাতে লম্বা একটা বল্লমের মত কিছু৷ ঘোলাটে চোখের পলকহীন চাহনি সটান রণবীরের দিকেই৷
আধো অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যে এই বিচিত্র মূর্তির আকস্মিক আবির্ভাবে রণবীরের কেমন যেন গা ছমছম করে ওঠে৷ অনতি অতীত অপরাহ্নের ভয়ংকর অনুভূতি আবার তাকে অধিকার করে৷ দুপুরবেলার সেই সাপটার মত এও যেন নিজের সারা শরীরে কী একটা ভীষণ প্রাণঘাতী সম্ভাবনা নিয়ে তার সামনে সটান দাঁড়িয়ে উঠেছে৷ যে কোনও সময় মারাত্মক আঘাত হানতে পারে৷ রণবীরের মধ্যে আবার সেই আচ্ছন্ন সম্মোহিত ভাব ফিরে আসতে থাকে৷ বিশ্ব চরাচর ধীরে ধীরে লোপ পেয়ে যায়৷ শুধু এক ছায়াচ্ছন্ন অপার্থিব সুড়ঙ্গে মুখোমুখি তারা দুই পুরুষ পরস্পরের দিকে একদৃষ্টে অনড় চেয়ে থাকে৷ আসন্ন রাত্রির অন্ধকারের জালে বাঁধা পড়া দুটি জীব৷ রণবীরের মনে অদ্ভুত অবাস্তব কিছু কল্পনা বুদবুদ কাটতে থাকে৷ কেন যেন নিজেকে তার মনে হতে থাকে ফাঁদে পড়া এক জন্তু৷ অরণ্যের ঘেরাটোপে তারা দু জন যেন শুধুই এক নামহীন শিকারি ও তার শিকার৷ প্রেডেটর অ্যাণ্ড প্রে৷
রামলাল শব্দ করে থুতু ফেলায় ঘোরটা কেটে যায় রণবীরের৷ মনে মনে নিজেকে একটা ঝাঁকি দিয়ে সজাগ করে সে৷ কিসের শিকারি, কিসের শিকার৷ সামনের মানুষটাকে হঠাৎ কেন যে এত ভীতিপ্রদ লেগেছিল ভেবে নিজের কাছে নিজেই লজ্জা পায় সে৷ আরে দূর, কী যে হয়েছে আজ তার৷ গোটা মধ্যপ্রদেশের ষোলোটা ফরেস্ট সার্কল তন্নতন্ন করে খুঁজলেও যার মত ডেয়ারডেভিল অফিসার আর একটা পাওয়া যাবে না, শতাব্দী প্রাচীন সাহসিক রাজপুত রক্ত সগৌরবে বয়ে যাচ্ছে যার শিরায় শিরায়,এই একটা না খেতে পাওয়া জংলি ভূতকে দেখে সেই রণবীরের এমন ভয় পাওয়ার কোনও মানে হয়৷ এ তো এখানকারই কোনও আদিবাসী টাসি হবে মনে হচ্ছে৷ ছোঃ৷
ওই সাপটার সঙ্গে আচমকা মোলাকাতই তাকে নাড়িয়ে দিয়েছে আসলে৷ তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ওই ব্যাটা ডরপোক রেঞ্জারটার আনওয়াণ্টেড চেতাবনি৷ এই জঙ্গুলে পরিবেশে চারদিকে কতরকম অজানা বিপদের ফাঁদ৷ এখানে মাথা সব সময় ঠাণ্ডা করে চলতে হয়৷ খোলা রাখতে হয় চোখ কান৷ এখানে মাথায় একটু উলটোপালটা ভাবনা ঢুকতে দিয়েছ কি মরেছ৷ যো ডর গয়া, সমঝো মর গয়া৷ রণবীর ডরে না কখনও৷ ডরলে তার চলে না৷
-‘ডরিয়ো মত সাব, ও আপনা ফাগুয়া বাইগা হ্যায়৷ কোই কামকা নহি বান্দা৷ পুরা পিয়ক্কড়৷ যব দেখো সালে নশেমে ধুৎ৷’
-‘ফাগুয়া বাইগাটা আবার কে?তুমি চেনো নাকি?’
-‘আরে ওই সাওনির মরদটা সাব৷ যে আওরতটা দুপহরে আপনার সাথে-’, রামলাল একটু অপ্রতিভ হয়ে গলা নিচু করে ফেলে৷-‘দো পাঁচ রুপইয়ার জন্য ঘুরঘুর করছে সাব৷দারুর টাকা৷ টাকা পেলেই চলে যাবে৷ আপ চিন্তা মত করো জি, আমি দেখে নিচ্ছি৷’
রামলাল লাফ দিয়ে জিপ থেকে নামে৷লোকটা একই ভাবে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে৷ পাথুরে মুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই৷ রামলালকে এগোতে দেখেও তার শরীরের ভঙ্গির কোনওরকম পরিবর্তন হয় না৷ যেমন ছিল তেমনই দাঁড়িয়ে থাকে৷ নির্বাক, নিস্পন্দ৷ রণবীরখুব সচেতনভাবে অন্য দিকে চেয়ে আড়ষ্ট হয়ে বসে থাকে৷ চোখের কোণে টের পায় রামলালের হাত থেকে কিছু একটা ওই অর্ধনগ্ন লোকটার হাতে গেল৷
সামান্য সরেছে লোকটা৷ সরু পথে রামলাল সাবধানে পাশ কাটিয়ে জিপ এগিয়ে নেয়৷ লোকটাকে পেরিয়ে চলে যেতে যেতে অন্যদিকে তাকিয়ে থেকেও রণবীর স্পষ্ট টের পায় জংলিটার অদ্ভুত চাউনি তার পিঠে বল্লমের ফলার মত গেঁথে আছে৷ কেন যেন তার ঘাড়ের কাছটা আবারও শিরশির করে ওঠে৷ অকারণ দুর্বলতা জেনেও যে সে এই অনুভূতিটাকে তাড়াতে পারছে না এটাও তাকে অত্যন্ত আশ্চর্য করে৷
#
স্নানটা খুবই দরকার ছিল৷ তার থেকেও দরকার ছিল গ্লাসভরা এই স্বর্ণালি তরল৷ অনেক ঝড় গেছে আজ স্নায়ুর উপর দিয়ে৷ বলতে হয় নি, শিউচরণ বাংলোর বারান্দায় আগে থেকেই সব গুছিয়ে রেখেছিল৷ রণবীরের সবরকম পছন্দই তার নখদর্পণে৷ দ্রুত শেষ করা প্রথম গ্লাসটা কোনও কাজই করে নি৷ দ্বিতীয় গ্লাসের মাঝামাঝিতে পৌঁছে আস্তে আস্তে এখন টানধরা শরীর শিথিল হচ্ছে৷
স্নান করে ঘরে এসে মারাত্মক চমকে উঠেছিল রণবীর৷ ম্লান হলুদ বালবের আলোয় হঠাৎ মনে হয়েছিল খাটের ওপরে যেন আবার সেই পাতার স্তূপটা মোচড়াচ্ছে৷ এক পলকের জন্য হৃৎস্পন্দন থেমে এসেছিল৷ পরক্ষণেই অবশ্য নিজের বোকামিতে নিজেই হেসে ফেলে সে৷ ওটা শালিনী৷ হলুদে বাদামিতে ছোপছোপ একটা চাদর জড়িয়ে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে৷
আসলে শালিনীর উপস্থিতিটাই রণবীর বেমালুম ভুলে গিয়েছিল৷ মনে থাকার কথাও না৷ প্রতিবার তো রণবীর একাই থাকে জঙ্গলের সন্ধ্যায়৷
-‘তারপর? কী করলে সারাটা দিন? শিউচরণ ঠিকঠাক লুক আফটার করেছে তো?’
উত্তর এল না কিছু৷ শালিনী বোধহয় গভীর ঘুমে৷ রণবীর আর পুনরাবৃত্তি করে না নিজের কথার৷ আহা, ঘুমোচ্ছে ঘুমোক৷ এতটা ড্রাইভের ধকল তো কম নয়৷ অভ্যেস নেই, ক্লান্ত হয়ে গেছে৷ রণবীর ঘাড়ে গলায় পাউডার ছড়ায়৷ বারান্দায় গিয়ে আরাম করে কুরসিতে গা ছেড়ে দেয়৷
তিনটে গ্লাস শেষ করে রণবীরের মাথার মধ্যে এখন হালকা রিমঝিম শুরু হয়েছে৷ মাতাল সে কখনও হয় না৷ মাতাল হওয়ার জন্য পানও সে করে না৷ ক্লান্ত শরীর আর শ্রান্ত মনকে চাঙ্গা করতে যেটুকু দরকার তার বেশি কক্ষনও নয়৷ আজ মনের ওপর দিয়ে এত ঝড় ঝাপটাতেও তাকে মাত্রা ছাড়াতে বাধ্য করে নি৷ এখন তবিয়ত ফ্রেশ, মাথা হালকা, মেজাজ ফুরফুরে৷ আর দরকার নেই৷ এবার খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়তে হবে৷ শিউচরণ দু বার উঁকি দিয়ে গেছে৷ তার মানেই ডিনার রেডি৷
শালিনী যে মাঝেমধ্যে হার্ড লিকার নেয় না তা নয়৷ আজ কিন্তু কিছুতেই রাজি হল না৷ উঠলই না বিছানা থেকে৷ রণবীর একাই বারান্দায়৷ চাঁদ অনেকটা ওপরে উঠে এসেছে এখন৷ বাংলোর উঠোনে আলোছায়ার জাফরি৷ দূর থেকে একটা পাপিয়ার গলাচেরা অবিশ্রাম কাতর প্রশ্ন ভেসে আসছে-পি কঁহা, পি কঁহা, পি কঁহা? ধাপে ধাপে ওপরে উঠে ডাকটা সমস্ত জঙ্গল জুড়ে ফেটে পড়ছে৷ চার পাশে ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই৷
-‘চলো তাহলে, এবার খেয়ে নেওয়া যাক৷ কী বানাতে বলেছ রাতে?’ রণবীর চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায়৷
-‘কই, কী হল, ওঠো? খাবে না?’
আশ্চর্য তো, এবারও কোনও উত্তর নেই৷
সত্যি বলতে আজ সন্ধ্যে থেকে শালিনীর আচরণ রণবীরের কাছে সাদা কথায় অত্যন্ত দুর্বোধ্য ঠেকছে৷ সেই যে শুয়ে আছে তো শুয়েই আছে, ওঠার নাম নেই৷ কথাবার্তাও বিশেষ বলছে না৷পানে তো সঙ্গ দিলই না, রাতের খাবার খেতেও উঠছে না৷ রণবীরকে হাত নেড়ে বুঝিয়ে দিল খাবে না৷এ কি সারাদিন একলা থাকার দরুন রাগের বহিঃপ্রকাশ না কি? তা এটা তো আর হানিমুন ট্যুর নয় যে সারাদিন বউয়ের ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে বসে থাকতে হবে৷ শালিনী তো আগেই জানত তাকে বাংলোয় একা রেখে রণবীরকে বেরোতে হবে৷ জোর করে সঙ্গে আসতেই বা কে মাথার দিব্যি দিয়েছিল? এখন নখরা করার কোনও মানে হয়? নখরাই তো? না কি অন্য কিছু?শরীর টরির খারাপ হল না তো?
-‘খাবে না?খাবে না কেন শালিনী?শরীর খারাপ লাগছে না কি?কিছু প্রবলেম হচ্ছে?’
-‘নাঃ৷ শরীর ঠিক আছে৷ তুমি খেয়ে নাও৷ আমার বড্ড ঘুম পাচ্ছে৷’ শালিনী শরীর মুচড়ে উলটো দিকে ফেরে৷ কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক৷ রাগ অভিমান কিছু তো বোঝা গেল না৷ একটু শুধু ঘুমজড়ানো ভাব৷
অগত্যা৷
টেবিল সাজিয়ে রেখেছিল শিউচরণ৷ উরদ ডাল, দেশি মুরগির কারি, ফুলকা আর স্যালাড৷ একা একাই খাওয়া সারে রণবীর৷ শিউচরণ বশংবদ ভঙ্গিতে অদূরে দাঁড়িয়ে তত্ত্বাবধান করে৷
-‘মেমসাবকে ঠিকমত দেখাশোনা করেছিলে তো শিউচরণ?’
-‘জি সাব৷’
-‘এখানে তো কিছু করার নেই, বোরই হল তোমার মেমসাব৷’
-‘মেমসাব তো ঘুরতে বেরিয়েছিলেন’-
-‘সেকি?একা একা? তুমি ছাড়লে কেন? কতদূরে গিয়েছিল?’ রণবীর চমকে ওঠে৷
-‘জি আমি মানা করেছিলাম৷ মেমসাব শুনলেন না৷ বললেন বেশি দূরে যাব না, আশেপাশে একটু ঘুরেফিরে দেখেচলে আসব৷’
-‘তোমার একদম উচিত হয় নি শিউচরণ, তুমি জান না এখানে কতরকম বিপদ হতে পারে?মেমসাব জঙ্গলের হালচাল কিচ্ছু জানে না, তুমি তাকে অচেনা অজানা জায়গায় একলা ছেড়ে দিলে?’
-‘জি কসুর হয়ে গেছে৷’ শিউচরণ অপরাধী মুখে মাথা ঝোলায়৷
শিউচরণকে দোষ দিয়ে লাভ নেই৷ শালিনী একবার জেদ ধরলে তাকে ফেরানো সাধ্যের অতীত৷ রণবীরই হার মানতে বাধ্য হয়, শিউচরণ তো কোন ছার৷ এইবারে এইভাবে জঙ্গলে আসাটাও তো সেই জেদেরই ফল৷ বিরক্তি চেপে চুপচাপ খাওয়া শেষ করে রণবীর৷ মুখহাত ধোয়৷
কিন্তু শুধু কী খাওয়া আর ঘুমের জন্যই এই অরণ্যে রাত্রিযাপন?
শালিনীর গা থেকে এখন চাদরের ঢাকা সরে গেছে৷ পায়ের কাছে শুকনো পাতার স্তূপের মত গুটিয়ে পড়ে রয়েছে চাদরটা৷ স্বচ্ছ রাতপোশাকের আড়ালে তার শরীরের সর্পিল বিভঙ্গের আবছা আভাস ম্লান আলোতেও রণবীরের চোখে স্পষ্ট৷ ঈষৎরক্তাভতার দু চোখ হঠাৎই তীক্ষ্ণ হয়৷ তিন পাত্র মদিরা এখনও তার রক্তে সম্পূর্ণ জারিত হয় নি৷ তার সঙ্গে এবার মেশে এই অদ্ভুত নিস্তব্ধ আরণ্য রাত্রির ঝিমধরা পরিবেশ৷ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের মধ্যে দোলা লাগে৷ নিঃশ্বাস দ্রুত হয়৷ রণবীর বুঝতে পারে তার পা থেকে একটা শিরশিরে অনুভূতি আবার ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠছে৷ সারা শরীরের রক্ত এসে জড়ো হচ্ছে এক জায়গায়৷ জাগছে, সে জাগছে আবার৷
এতক্ষণে সে উপলব্ধি করে কেন শালিনী সন্ধ্যা থেকে অমন সুদূর, অপরিচিত৷ এ তো সেই চিরাচরিত নারী স্বভাব৷ দূরে থেকেই যে আরও বেশি করে কাছে টানা যায় তা ওদের থেকে কে আর বেশি জানে৷উদাসীনতা তো নয়- আহ্বান, এ শালিনীর আহ্বান৷সেই সন্ধ্যে থেকে তিলে তিলে নিপুণ রহস্যময়তা দিয়ে সে নির্মাণ করেছে এই নিবিড় নিভৃত আহ্বান৷ রণবীর কি পারে সাড়া না দিয়ে?
অথচ কী আশ্চর্য, শালিনী তার ব্যগ্র অধৈর্য হাতের টানে ধরা দেয় না৷ কাঁধ উঁচু করে হাত সরিয়ে দেয়৷
শালিনীর এই নীরব আপত্তি রণবীরকে আরও উত্তেজিত, আরও উন্মুখ করে তোলে৷শয্যায় ওর ওই পিছন ফিরে শুয়ে থাকার শিথিল ভঙ্গিতাকে মন্দিরগাত্রের ভাস্কর্য মনে পড়িয়ে দেয়৷ সেটের পায় তার কান গরম হয়ে উঠেছে, রক্তে আবার জেগেছে বিপুল জলোচ্ছ্বাস৷ গোপন কল্পনায় দুপুরের অমার্জিত কষ্টিপাথরের সঙ্গে শালিনীর সুগন্ধিত মসৃণ শ্বেতমর্মর দেহের তুলনা করে রণবীর নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না৷ আপত্তির আর কোনও সুযোগ না দিয়েই শালিনীর গলার মাদকখাঁজে সে তার উত্তপ্ত মুখ গুঁজে দেয়৷
এবং সেই অমোঘআলগ্ন মুহূর্তে শালিনীর আপাদমস্তক নাগরিক শরীরের প্রতিটি রোমছিদ্র থেকে রণবীরের বিস্মিত অপ্রস্তুত নাসারন্ধ্রে অপ্রত্যাশিত ভাবে প্রবেশ করে নিমতেলের নির্ভুল কটু ঘ্রাণ৷
(সমাপ্ত)

আপনার মতামত জানান